কবিতাগুচ্ছ ।। ক্রিস্টাল রক্তজবা গুচ্ছ ।। ফেরদৌস নাহার

খাঁচা
উলটো দিকে কখনোই তাকাইনি
উঁচু উঁচু বনভূমি,  মাটির পাহাড় মাথা তুলে আকাশে তাকিয়ে আছে
সবুজের মৌতাত মাখা আনন্দ
এসব দেখতে দেখতে চলছি
বিপরীতে কখনই চেয়ে দেখিনি
এখন দেখতে পাচ্ছি বারান্দায় ঝুলে আছে কয়েকশ শূন্য খাঁচা
কোনো পাখি নেই, বিমর্ষমাখা, দুলছে
কারা যেন বলেছিল, শূন্যখাঁচায় এবার অনিবার্য পাখি পোরা হবে

সেই থেকে ওদিকে আর কখনই পা বাড়াইনি

প্রিয় জামা
কেউ কোথাও হারিয়ে গেলে
এখনও খুঁজতে যাই দূর কোনো বনে
সারারাত বৃষ্টি ও গানের সাথে
ডেকে ডেকে কেঁদে ফেলি
এভাবেই বরাদ্দ করি হারানো সন্ধান

চেহারার তাপ নিয়ে দর্জি বানালো  প্রিয় জামা
তাতে কোনো গলা নেই  আছে দুটো হাত
ভোরের আগেই শিশিরের প্রস্তুতি সংবাদ
যেভাবে পৌঁছে যায় বাতাসে, সেভাবেই
তাপের ভেতরে বয় দীর্ঘ অনুতাপ
 
 
সংসার
প্রথম দিনের সংসার ভেসে যায়
প্রথম দিনের সংসার দম খায়
দেবদূত অপেক্ষা, অন্তর বাজে রোদের সঙ্গে দর কষাকষি করে
বিজলী বোন তোর হাতের রান্না করা সালুন পাঠিয়ে  দিস
আমার রাঁধতে ভালো লাগে না। ঝিমধরা লাটিমের শব্দ বোঁ-
সারা রাত ভোঁ-কাট্টা কথাবার্তার স্রোত
উড়ে যায় চারকোণায় খাটানো মশারীর ফ্রক

একটু দেরি হয়ে গেল, প্রথম দিনেই ভুলভাল প্রথম দিনের সংসার
আপাদমস্তক ডুবে যাচ্ছে , ভেসে যাচ্ছে
কে আছো  ওকে ধর ওকে টেনে তোলো

 
একই আঁক কাটে
দুঃখের স্মৃতি নাই, সবই কষ্টের
মধ্যাহ্নের কোঠাবাড়ি ভদ্রভাগ্যে নিরাপদ আশ্রয় হয় যদি
কখনো নতুন করে অদ্ভুত উষ্ণতায় কেঁদে উঠো না, তাহলে
জাঁদরেল ক্যাপ্টেন সারাদিন শাস্তি দেবেন তক্তা পোড়া রোদে

কোথায় সে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান তুষার, কোথায়ই বা ঝুরো হাওয়া
মরে যাবার আগে হেমলেট  দেয়ালে হেলান দিয়ে ওফেলিয়াকে ডাকে
সবই কষ্টের ব্যাপার,  দুঃখ এখানে জলভাত
তপ্তদিনে খেরোখাতায় একই আঁক কাটে  রাজপুত্র ও জনতা সবাই
 
 
গ্রান্ডফাদার ক্লক
দোকানে ঝুলে আছে পুরানো ঘড়ি
ধুলো জমেছে মাথায়, কাচের জানালা দিয়ে চেয়ে আছে
গ্রান্ডফাদার ক্লকের মুখ
শরীরে ক্লান্তি নিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে সাড়া দেয়
ঢং ঢং ঢং

না কোনো ঘড়ি বিষয়ক কিছু লিখতে শুরু করিনি
এখন বাজে বেলা তিনটে তাই মধ্যাহ্নের প্রহর ভেঙে
ঢং ঢং ঢং ভেসে আসে
সেই ট্রেনটার সময়ও ছিল তিনটে বেজে পাঁচ

কথাগুলো আজও গ্রান্ডফাদার ক্লকের মনে আছে
যেমন মনে থাকে ফিরে না আসা কারো চলে যাওয়া

 
পুড়তে থাকি
প্রতিদিন জঙ্গলে যাই, শুকনো কাঠ কুড়াই
জঙ্গল আমাকে জিজ্ঞেস করে, কী করবি এতো কাঠ দিয়ে
বলি, আগুন ধরাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিছুদিন বাকি
জঙ্গল মৃদু হেসে বলে, বেশ

মাথায় করে নিয়ে আসি, প্রতিদিন আনি, জমাই
প্রাণ ভরে আগুন লাগাবার সময় যেন কম না পড়ে

জঙ্গল শুধু মৃদু হাসে
অসংখ্য শুকনো কাঠের বুকে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি

আগুন লাগাবার বহু আগেই আমি পুড়তে থাকি

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top