আওয়ারা খেয়াল ।। পর্ব-৫ ।। খাজা বখতিয়ার কাকী-এক হৃদয়ের জন্য এত আয়োজন ।। জাভেদ হুসেন

(সুফিদের জগতের সঙ্গে পরিচয় না থাকলে উর্দু কবিতা বোঝা সম্ভব নয়। সে কবিতা চতুর্দশ শতাব্দীর আমির খুসরো’র হোক, হোক ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া কমর এর। এই অবস্থা বাংলার ‘কানু বিনে গীত নাই’ এর মতো। এই বাহানায় তাই পরিচয় হয়ে যেতে পারে একজন অসাধারণ সুফি সাধক আর কবির সঙ্গে।)

ফুলওয়ালোঁ কি স্যায়ের মানে ফুলওয়ালাদের শোভাযাত্রা। ফুল বিক্রেতাদের বার্ষিক উৎসব। ফুলওয়ালারা আগামী মৌসুমে ভালো ফুলের ফলন চেয়ে এই উৎসব করে। দিল্লির মানুষ পালন করে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর পর। হয় মেহরৌলিতে। গালিবের প্রিয় জায়গা। ইংরেজরা ১৮৪২ সালে এই উৎসব বন্ধ করে দিয়েছিল। গালিব এক চিঠিতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন – জামা মসজিদের ভীড়, চাঁদনি চওকে হেটে বেড়ানো আর ফুলওয়ালদের মেলা – এই তিন জিনিশ না থাকলে আর দিল্লি কোথায় থাকে!  এই উৎসব চলে তিন দিন। ফুলের শোভাযাত্রা, সবার সামনে সানাই বাজিয়ে আর নৃত্যশিল্পীরা এই হলো রেয়াজ। একেবারে সামনে বিশাল এক ফুলের পাখা। সেই পাখা নিবেদন করা হবে যোগমায়া মন্দিরে। তার পর সেই শোভাযাত্রা মেহরৌলি হয়ে যায় খাজা বখতিয়ার কাকি’র দরবারে। এই উৎসব শুরু হয় ১৮১২ সালে। সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহের ছেলে মির্জা জাহাঙ্গীর লাল কেল্লার ব্রিটিশ রেসিডেন্ট স্যার আর্চিবাল্ড সেটনের ক্রোধের স্বীকার হন। রানী মুমতাজ মহল মানত করেন যদি শাহজাদা  এলাহাবাদের নির্বাসন থেকে নিরাপদে দিল্লি ফিরতে পারেন তবে যোগমায়ার মন্দিরে ফুলের পাখা আর হজরত বখতিয়ার কাকীর দরবারে ফুলের চাদর আর পাখা দেবেন। মানত পূর্ণ হয়। আর সেই থেকে শুরু হয় ফুলওয়ালাদের উৎসব। ব্রিটিশরা ১৯৪২ সালে উৎসব বন্ধ করে দেয়। জওহরলাল নেহরু আবার তা চালু করেন ১৯৬১ সালে হিন্দু-মুসলিমের ভাংগা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে।

চিশতী ঘরাণার নিয়ম মতো হজরত বখতিয়ার কাকী ক্ষমতার সঙ্গে তিনি কোন সংশ্রব রাখতেন না। কিন্তু সব শাসকেরা তাঁর সঙ্গে নিজেদের জুড়তে পারলে ধন্য মনে করতো। কুতুব মিনারের নাম দেয়া হয় তাঁর নামে। সম্রাট ইলতুতমিশ নিজে তাঁর জানাজার নামায পড়েছিলেন।  দ্বিতীয় আকবর শাহ, প্রথম বাহাদুর শাহ, দ্বিতীয় শাহ আলম – সবাই সমাধিস্ত হয়েছেন বখতিয়ার কাকির দরবারের পাশে। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরেরও ইচ্ছে ছিল সেই দেয়ালের ভেতরেই সমাধিস্ত হওয়ার। তিনি নির্বাসনে রেঙ্গুনে সমাহিত হন। কিন্তু দিল্লিতে সেখানে এখনও একটা শুন্য কবর দেখা যায়। এখানেই সম্রাটের সমাধি হওয়ার কথা ছিল। লোকেরা একে ডাকে ‘সর্দগাহ’, মানে যে জায়গা অশ্রুতে সর্বদা ভিজে থাকে। ইতিহাস তাঁকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে রাষ্ট্রের মুখোমুখি করে। ১৯৪৮ সালে মোহনদাস গান্ধী সাম্প্রদায়িক হানাহানি শেষ করার দাবি নিয়ে তাঁর শেষ উপবাস শুরু করেন। উপবাস ভাঙার ছয়টি দাবির একটি ছিল হিন্দু আর শিখেরা মিলে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত বখতিয়ার কাকির দরগাহ সংস্কার করে দিতে হবে।

কে এই খাজা বখতিয়ার কাকী?  তাঁর শিষ্যদের পরিচয় দিলেও ঠিক আন্দাজ করা যাবে তাঁর সম্পর্কে। বখতিয়ার কাকির শিষ্য ও উত্তরাধিকারি ছিলেন বাবা ফরিদউদ্দিন গনজেশকর। তিনি ছিলেন কায়দামাফিক পানজাবি কাব্যের জনক। বাবা ফরিদউদ্দিনের শিষ্য আর উত্তরাধিকারি দিল্লির বিখ্যাত বাবা নিজামউদ্দিন আউলিয়া। বাবা নিজাম ছিলেন আমির খুসরো আর নাসিরউদ্দিন চারাগে দেহলির গুরু। আর বাবা বখতিয়ার কাকী নিজে ছিলেন খাজা মুইনুদ্দিন চিশতির সাজ্জদানশিন মানে উত্তরাধিকার।

কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকি জন্মেছিলেন আজকের কিরঘিজিস্তানে ১১৭৩ সালে। খাজা মুইনউদ্দিন চিশতি ইসফাহান যাবার পথে বখতিয়ারের শহর ওশ পার হচ্ছিলেন। সেখানেই তাঁর দেখা পান বখতিয়ারউদ্দিন। কী আশ্চর্য এই বিরাট সাধক সামান্য পরিচয়েই এই যুবকের মাঝে নিজের উত্তরাধিকারীকে চিনতে পারলেন। মৃত্যুর মাত্র চল্লিশ দিন আগে খাজা মুইনউদ্দিন কুতুবউদ্দিন বখতিয়ারকে নিজের খলিফা মনোনিত করে নিজ খিরকা মানে সুফি জোব্বা প্রদান করলেন। তাঁর নির্দেশে বখতিয়ার ভারতে এলেন। দিল্লিতে তাঁর নাম হলো ‘কাকী’। কাকী এক রকমের রুটি। কি করে এই নাম এলো সে আরেক গল্প।

অন্য চিশতি সাধকদের মতই বখতিয়ার কাকী কোন তত্ত্ব তৈরি করেননি। প্রতিদিন মজলিস বসতো। সেখানেই গল্প, গান, কবিতায় তিনি অনুসারীদের পরামর্শ দিতেন। সে সব কথার সার ছিলো সত্যের প্রতি পূর্ণ সমর্পন, সকল মানুষকে সমান জানা আর কোন ভেদ না মেনে যে কোন মানুষকে যতটা সম্ভব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তাঁর দরবারে যা দান আসতো, নিয়ম ছিলো সেই দিনের মাঝেই দরিদ্রদের খাদ্য আর সহায়তা দিয়ে তা শেষ করা।

খাজা বখতিয়ারউদ্দিন কাকী তাঁর প্রাত্যহিক আসরের সঙ্গে ম্যাহফিলে ‘সামা’ মানে সঙ্গীতের আসর আয়োজন করতেন। চিশতি তরিকায় এই প্রথা চলে আসছে আগে থেকেই। খাজা বখতিয়ার সুরের মাঝ দিয়ে এমন সত্যের অনূভব পেতেন যা তাঁকে প্রিয়র পরম রহস্যের নিকটে নিয়ে যেত। নিজের এক পংতিতে তিনি লিখছেন:

কী এই সুর, কেন তাতে এমন প্রেমের জাদু ভরা?
সংগীত প্রেমের রহস্য আর প্রেম প্রিয়র রহস্য
(সরোদ চিস্ত কে চন্দিন ফসুঁয়ে ইশক দারোয়াস্ত
সরোদ মেহরমে ইশক আস্ত ও ইশক মেহরামে ই উস্ত)

এমনি এক ম্যাহফিল চলছে ১২৩৫ সালের ২৭ নভেম্বর। গাওয়া হচ্ছে কবি আহমেদ-ই-জাম এর কবিতা:

কুশতগানে খনযরে তসলিম রা
হর যমান আয গ্যায়েব জানে দিগর আস্ত
(নিজেকে সমর্পনের ছুরিতে মরলো যে
অদৃশ্য হতে প্রতি ক্ষণে সে নতুন নতুন প্রাণ পায়)

এই পংতি যখন সুরের সঙ্গে মিশে খাজা বখতিয়ার কাকির শ্রবনে পৌঁছাল, তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। ভাবোন্মত্ত হয়ে হালে এসে পড়লেন। বাহ্যজ্ঞানশুন্য হয়ে অচেতন পড়লেন। সেই অবস্থাতেই চার দিন পর তিনি গত হলেন।

খাজা বখতিয়ার কাকী নিজে ছিলেন বড় একজন কবি। কবিতা লিখতেন ফারসি ভাষায়। অধিকাংশ বড় সুফি সাধকরা একেকজন অসামান্য কবি। বড় পীর সাহেব থেকে খাজা মুইনউদ্দিন চিশতী – কে নন! প্রিয়কে এই জগতের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে অনুভব করায় তাঁদের কবিতা সবাইকে স্পর্শ করে যায়। আর এই কবিতাগুলো গাওয়া হয় জনসমাগমের মাঝে। গাওয়ার ধরণ কাওয়ালি। শব্দটি এসেছে ‘কওল’ মানে বচন থেকে। গাওয়ার ধরণে তথাকথিত পেলবতা নেই। তীব্র আর্তনাদ যেন বুক চিঁড়ে বিরহের আগুনকে শ্রোতার চোখের সামনে জ্বাজ্যল্যমান করে তোলে। নজির হিসেবে খাজা বখতিয়ার কাকী’র একটি গজল নিবেদন করা হলো:

দিল পরিশাঁ দিদা হ্যায়রাঁ কার্দাহ ই
জানে মন তু কার্দাহ ই হাঁ কার্দাহ ই
(হৃদয় উদ্ভ্রান্ত করে নয়ন বিভ্রান্ত করে গেছ
ও আমার প্রাণ, এমন তুমিই  করেছ, তুমিই করেছ)

দিদা গিরিয়া সিনা বিরিয়াঁ কার্দাহ ই
এয় সরত গর্দম চে এহসাঁ কার্দাহ ই
(চোখে অঝোর বর্ষণ হৃদয় ছাই করে গেছ
ওগো প্রিয়, এই কৃপার দানের জন্যই তোমায় ভালবাসি)

শোখিও বেবাকিও নায ও আদা
বেহরে ইয়াক দিল ই চে সামাঁ কার্দাহ ই
(ছল, লীলা-লাস্য আর এমন আপন করার খেলা
আমার এক হৃদয়ের জন্য এতো আয়োজন করে গেলে)

আয কুজা মি আয়ি এয় তুফানে হুস্ন
আলমে রা খানা বিরাঁ কার্দাহ ই
(কোথা থেকে এসেছ হে সুন্দরের ঝড়
জানি না, তবে পুরো জগতকে গৃহহীন বিরাণ করে গেছ)

জান হাম শুকরানা আস্ত এয় দর্দে ইশক
মুর্দানে দুশওয়ার আয আসাঁ কার্দাহ ই
( আমার প্রাণ তুচ্ছ নৈবেদ্য তোমার চরণে হে প্রেমের বেদনা
আমার সহজ মৃত্যু তুমি কঠিন করে গেলে)

মুর্গে জাঁ দর কফস আফগান্দাহ ই
বে গুনাহে রা বা যিন্দান কার্দাহ ই
(প্রাণ পাখি এমন খাঁচায় বন্দী করে কেউ?
বিনা অপরাধে তাকে খাঁচায় রেখে গেলে)

মন চে গোয়াম হস্ত তু খাজা মুয়িন
আবদে খুদ রা কুতবে দওরাঁ কার্দাহ ই
( আমার বৃথা বাক্য, তোমার কথা সত্য দর্শন হে খাজা মুয়িন
তোমার দাসকে তুমি কালের কুতুব বানিয়ে গেলে)

দিল পরিশাঁ দিদা হ্যায়রাঁ-কাওয়ালিটি শুনতে ক্লিক করুন

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top