নির্বাচিত বই ।। মিঞা অসমিয়া এনআরসি-আসামে জাতিবাদী বিদ্বেষ ও বাংলাদেশ ।। আলতাফ পারভেজ

মিঞা অসমিয়া এন আরসি
(আসামে জাতিবাদী বিদ্বেষ ও এনআরসি)

লেখক: আলতাফ পারভেজ 
ধরন: প্রবন্ধ
প্রকাশক: প্রথমা 
প্রচ্ছদ:
মূদ্রিত মূল্য: — 
স্টল:

বই সম্পর্কে 
পুস্তক পর্যালোচনা অসমিয়া বনাম বাংলাভাষী এথনো-পলিটিক্সের ময়নাতদন্ত সেলিম সারোয়ার আসাম বাংলাদেশের প্রতিবেশী। একদা উভয় অঞ্চল একদেশও ছিল দীর্ঘসময়। উভয় স্থানে রয়েছে বিপুল বাংলাভাষী। রয়েছে বিরাট সংখ্যক মুসলমানও। উভয় অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশও অনেকখানি একসঙ্গে শুরু। এতসব কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের পরও বাংলাদেশে আসামচর্চা প্রায় শূন্য। আসাম-বাংলা সাংস্কৃতিক যোগাযোগও অতি ক্ষীণ। ‘প্রথমা’ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত আলতাফ পারভেজ-এর ‘মিঞা অসমিয়া এনআরসি: আসামে জাতিবাদী বিদ্বেষ ও বাংলাদেশ’ সেই অর্থেই কেবল একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা নয় এই গবেষণাধর্মী কাজের গুরুত্ব বরং ভিন্ন কারণে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আসামে যে প্রধান প্রচারণাটি চলছেÑ অর্থাৎ লাখো লাখো বাংলাদেশী আসামে ঢুকছে এবং থাকছেÑ তার সত্যাসত্য অনুসন্ধান করা হয়েছে এই গ্রন্থে। এই অনুসন্ধান এই কারণে জরুরি ছিল যে, ঐ প্রচার কেবল আসামে সীমাবদ্ধ নেই এখন আর। সেটা চলছে পশ্চিমবঙ্গে এবং ভারতের অন্যত্রও। দশকের পর দশক বাংলাদেশ ও বাংলাদেশীরা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কল্পিত এক খলনায়ক হয়ে আছে। অথচ ভুলে যাওয়া হয় যে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বাংলাদেশ একদা এই প্রশাসন ও সীমান্তের অধীনে থাকার কারণে এই জনপদের একদিক থেকে অপরদিকে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ছিল। রাজনৈতিক কারণে আজ সীমানা পাল্টালেও মানুষগুলো ‘বিদেশী’ বলে রাষ্ট্রনৈতিক পরিচয় কেড়ে নেয়া মানবাধিকারের ভয়ংকর বরখেলাপ। আসামের ক্ষেত্রে ‘বিদেশী’ প্রচারণার রাজনৈতিক তাৎপর্য বহুমুখী। রাজ্যটি খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে অতি সমৃদ্ধ। অথচ ভারতের অন্যতম প্রধান দরিদ্র এলাকা এটা এখন। সম্পদশালী হয়েও আসামের এই যে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা সেটা স্থানীয় রাজনীতিতে প্রবল কোন ইস্যু হতে পারছে না। আসামের শাসকশ্রেণী সেখানে রাজনীতির প্রধান ইস্যু করে রেখেছে ‘বিদেশী’দের। এই বিদেশী মানে বাংলাভাষীরা। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে বাংলাভাষী মুসলমানরা। স্থানীয়ভাবে যাঁদের বিরাট অংশকে ‘মিঞা’ নামে অবজ্ঞা করা হয়। অসমিয়ারা রাজনীতির প্রধান এক ‘অপর’ হলো এই মিঞারা। এই ‘মিঞা’সহ বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলমানদের ‘বিদেশী’ সাব্যস্ত করে আসামে দশকের পর দশক ধরে ‘বিদেশী খেদাও’ আন্দোলন চলেছে। এই আন্দোলনেরই সর্বশেষ ফল এনআরসি, তথা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি। আসাম থেকে চর্চা শুরু হওয়া জন্ম নেয়া এনআরসি ধারণায় এখন ভারত তোড়পাড়। বিজেপি এনআরসিকে ভারতজুড়ে মুসলমান বিদ্বেষের অন্যতম হাতিয়ার করেছে বলে বিরুদ্ধবাদীদের অভিযোগ। এনআরসি প্রক্রিয়ার অন্যতম ধারণাগত ভিত্তি হলো এই প্রচারণা যে, বাংলাদেশ থেকে বিপুল মানুষ ভারতে ঢুকে আছে এবং ঢুকছে। অর্থাৎ এনআরসি হলো আসামে শুরু হওয়া বাংলাদেশবিদ্বেষের সর্বভারতীয় এক ব্যাপকতা। অথচ ভুলে যাওয়া হচ্ছে যে, আসামের চেয়ে বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন সূচক এবং রাজনৈতিক-অর্থনীতির বিকাশ অনেক বেশি। বাংলাদেশ থেকে সাধারণ মানুষের কাজের সূত্রে বা থাকার জন্য আসামে যাওয়ার বিশ্বাসযোগ্য কারণ থাকতে পারে না। আলতাফ পারভেজ এই পুরো বিষয়টিকে আসাম-বাংলা সম্পর্কের ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তকে হাজির করে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর গ্রন্থটির ভিত্তি প্রধানত পরিসংখ্যান ও ইতিহাস। তবে তিনি আসাম ও বাংলার ইতিহাসে ব্রহ্মপুত্রের মতো আরও অনেক অপ্রথাগত প্রসঙ্গকে হাজির করে ব্যাখ্যা করেছেন। এই অঞ্চলে রেলপথের বিকাশকেও তিনি তাঁর বক্তব্যের অন্যতম নির্দেশক হিসেবে হাজির করেন। তিনি বারবার দেখিয়েছেন, কীভাবে মূলধারার গবেষকরা অতিযান্ত্রিকভাবে এবং ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আসামের জনমিতিকে তুলে ধরে এবং বাংলাদেশবিরোধী কল্পিত এক বয়ান তৈরি করে। আসামকেন্দ্রীক উক্তরূপ ভারতীয় গবেষণাবিদ্যার বিপরীতে এই গ্রন্থটি কার্যত একটা প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির হলো এখন থেকে। দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যার রাজনীতির এক উদাহরণমূলক ময়নাতদন্ত বলা যায় এই বইকে। যার প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে অসংখ্য সারণী ও লেখচিত্র। ‘মিঞা অসমিয়া এনআরসি’তে ২১০ পৃষ্ঠার পরিসরে ভূমিকা ও উপসংহার বাদে নি¤েœাক্ত ছয়টি অধ্যায় রয়েছে। এক. আসামের ভৌগলিক পরিবর্তনশীলতা ও বাংলাদেশ; দুই. আসাম-বাংলা সম্পর্ক এবং জাতিঘৃণার ঐতিহাসিক পটভূমির খোঁজে ; তিন. আসামের আন্তঃজাতি সংঘাত যেভাবে বাংলাদেশ ও মুসলমান বিদ্বেষে পৌঁছালো; চার. আসামের মুসলমানরা কী সবাই বাংলাদেশী: সত্য-মিথ্যার খোঁজে; পাঁচ. আসামে নাগরিকপঞ্জি, আইন ও মানবাধিকার প্রশ্ন; এবং ছয়. আসামের অর্থনীতি ও দারিদ্র্য বনাম আসামের রাজনীতি। উপরের উপ-শিরোনামগুলো থেকেই স্পষ্ট, ‘মিঞা অসমিয়া এনআরসি’তে লেখক আসাম ও বাংলাদেশের সম্পর্কের পূর্বতন প্রায় দুই শতাব্দিকে সংক্ষিপ্তভাবে পর্যালোচনা করেছেন এখানে। এই পর্যালোচনা কেবল আসামের বহুল আলোচিত ‘বিদেশী খেদাও’ আন্দোলনেরই একটা ময়নাতদন্ত নয়Ñ বরং একটা বৃহত্তর তাৎপর্যও রয়েছে। ১৭৫৭-এ ব্রিটিশদের দখলকৃত ভারত এবং ১৯৪৭-এ তাদের রেখে যাওয়া ভারতের মাঝে যে বহু ব্যবধান এবং তার জের হিসেবেই যে আজ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ‘পরিচয়’-এর রাজনীতির তীব্র জোয়ার বইছে সেটাও লেখক পরোক্ষে ব্যাখ্যা করেছেন।

লেখক পরিচিতিঃ 



আলতাফ পারভেজ
গবেষক ও সাংবাদিক। জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারি। এমএ (দর্শনশাস্ত্র), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মূলত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর কাজ করে থাকেন। মাঝে মাঝে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষার কবিতাও অনুবাদ করেন। সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ— শ্রী লঙ্কার তামিল ইলম : দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিরাষ্ট্রের সংকট [ঐতিহ্য, ২০১৭] , রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ -লুই আলথুসের (সংহতি, ২০২০)।  

ই-মেইল : altafparvez@yahoo.com

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top