মহামারী দিনের গল্পরা ।। রোমেল রহমান

♦♦♦  একজন ষাঁড়ের শেষকৃত্য ♦♦♦
মহান ষাঁড়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রামটা তুলকালাম হয়ে উঠলো! যথারীতি পক্ষ হবার কথা ছিল দুটো! কিন্তু এই মহান ষাঁড়ের বেলায় পক্ষ হল আড়াইটা! আড়াই নম্বর পক্ষটা পুলিশ! তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখল কিংবা তামাশা দেখা ছাড়া উপায় ছিল না! কেননা হানাহানিতে নেমে আসা দুই পক্ষের লোকের সংখ্যার সামনে পুলিশ এবং তাদের কার্তুজের সংখ্যা সিকি পরিমাণ! জমায়েতের মূলপক্ষ দুই ভাগ হয়ে ছিল যথারীতি দুটো বিখ্যাত ধর্মীয় লোগোর আবডালে! এক পক্ষ বলল, এই মহান ষাঁড় আমাদের ধর্মের! তাকে আমরা শেষ বিদায় জানাবো আমাদের আচার অনুযায়ী! অন্যপক্ষ বলল, মোটেই না উনি, মানে মহান ষাঁড় জন্মেছিলেন আমাদের সম্প্রদায়ের শান্তিবাহন হয়ে! ফলে একদল মুচি এসে কিছুক্ষণ পুরো ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো এবং বুঝে ফেলল, এখানে চামড়ার দামের চেয়ে মূল্যবান অনুভূতি সরব, ফলে তারা সটকে পড়লো! জবুথবু পুলিশেরা শুধু ওয়াকিটকিতে কেন্দ্রে খবর জানাতে লাগলো যে, উদ্ভুত পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে ধাবমান, এহেন হালত নিয়ন্ত্রণে আরও ফৌজ পাঠান অন্যথায় আমাদের সরিয়ে নিয়ে বাঁচান!

দুই পক্ষ মাইকে চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলো এই ষাঁড়ের মহাত্ম! কেউ কেউ তার শৈশবের স্মৃতি খুলে বসলো, কিভাবে সে ষাঁড়কে খাবার দিয়েছিলো কিংবা কেউ কেউ বলল, মানত করে ষাঁড়কে ঘাস খাওয়ানোর পর তার মানত পূর্ণ হবার আধিলৌকিক কাহিনী! কিন্তু সব থেকে ভালো ব্যাপার ছিল, এইসব বাকোয়াজি, চিৎকার কেউই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল না! মাঝখানে মাঠের মধ্যে ষাঁড়টা পড়ে থাকলো আর আকাশে কয়েকটা শকুন ড্রোনের মতো ঘোরাঘুরি করে টের পেয়ে গেলো মানুষই একে ছিঁড়ে খাচ্ছে! কিন্তু লগডাউন ভেঙে জমায়েত হওয়া এইসব মানুষের আবেগকে ছুঁড়ে ফেলতে না পেরে স্থানীয় নেতারা এসে বলল, আপনারা যা-ই করেন্না কেন মুখে মাস্ক এবং হাতে গ্লোভস্‌ পিন্দে করবেন! তারপর তারাও এই গ্রামের কল্যাণে এই ষাঁড়ের অবদান এবং যারতার ক্ষেতের বেড়া ভেঙে ঢুকে পড়ার যে অবাধ পাসপোর্ট ভিসা এই ষাঁড়ের ছিল সেই মহাত্ম বর্ণনা করে ক্ষান্ত হলেন! সাংবাদিকেরা ছিল সবচে’ ব্যস্ত! তারা চারদিকে এতো নিউজের ভিড়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলতে লাগলো এবং তারা জানলো যে, করোনা ভাইরাস থেকে গ্রামকে বাঁচানোর জন্য ষাঁড় কমিটি থেকে ষাঁড়ের গলায় মন্ত্রপড়া ঘণ্টা বেঁধে দেয়া হয়েছিল সপ্তাখানেক আগে! ফলে সারা গ্রাম ষাঁড়টা ঘুরে বেড়াতো আর তার ঘণ্টার শব্দে করোনা ভাইরাস ঘাঁটি গাড়তে পারতো না গ্রামের কোথাও! কিন্তু দুপুরের দিকে যখন সূর্য তার তাপ দিয়ে সবাইকে কাহিল করে ফেলতে শুরু করলো তখন ভিড়ের মধ্যে একজন মাথা ঘুরে পড়ে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে শোনা গেলো প্রতিপক্ষ নাকি বান নিক্ষেপ করে লোকটাকে ফেলে দিয়েছে এমন গুঞ্জন এবং তার জ্ঞান না ফেরায় মুহূর্তের মধ্যে হাঙ্গামা লেগে গেলো! ফলে সঙ্গে বয়ে আনা দাউ সড়কি বল্লম কিংবা তীর জাতীয় দেশীয় অস্ত্রের এস্তেমাল শুরু হল আর সাংবাদিকেরা পুলিশের কাছে এসে বলল, এখন কি হবে? পুলিশ বলল, ইয়া নফ্‌সি ইয়া নফ্‌সি করেন আর ছবি তুলেন! কিছুই করার নাই!

সন্ধ্যায় রক্তারক্তি শেষ হলে হাঁসপাতালের বারান্দা ভরে উঠলো রক্তাক্ত ষাঁড়প্রেমী যোদ্ধাদের ভিড়ে! তাদেরকে দেখতে এলো জাতীয় ষাঁড় কমিটির নেতারা এবং তারা দুইপক্ষকে আশ্বাস দিয়ে গেলো উচ্চতর তদন্ত হবে এই ঘটনার! কিন্তু ষাঁড়টার কোন ব্যবস্থা হল না, মুচিদের দলটা আবার এসে একটা বাগানের আড়ালে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো সমাজ সেবার দায়িত্বটা তারা তুলে নেবে নাকি কর্পোরেশন? সাংবাদিকেরা সারা দেশে এই সংবাদের ডজন ডজন ফুটেজ ছড়িয়ে দিলো! সেইসব ফুটেজে দেখা যায় উল্লোসিত তরুণেরা হল্লা করে জানাচ্ছে, খুনোখুনির সময় সকলেই তারা মুখে মাস্ক এবং হাতে গ্লোভস্‌ পরে মারামারি করেছে যাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন না ঘটে! ফলে আসামি হিসেবে একদল মুখোশধারী মানুষের নামে মামলা দায়ের করা হল এবং গ্রামটার নাম হল, ষাঁড়গ্রাম!

১৯ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ কাকালাপ ♦♦♦
রাস্তার উপ্রে বিদ্যুতের তারে বসে থাকা দুই কাকের সংলাপ

-বস ঐ দেখো ময়লার গাড়ি আসতেছে!
-হ! কিন্তু লাভ নাই! পাওয়া যাবে না কিচ্ছু!
-সকালে আসবার পথে দেখলাম এক পিচ্চিরে হ্যাঁর মায় খাবার খাওয়াইতেছে ছাদে বইসা! ভাবলাম ছোঁ দেই!
-এহ! দিলি না ক্যা?
-দিতাম কিন্তু পাশে দেহি বাচ্চাডার বাপে বইসা আছে লাঠি নিয়া! ভয়ে আর দিলাম না!
-উম্ম! লকডাউনে সব শালা বাড়ি বইসা দারোয়ান হইসে! আমরা পড়ছি ফান্দে!
-মাছ মুর্গির নাড়িভুঁড়িও নাই কোথাও!
-সব খায়া ফেলতেছে মানুষ নাইলে বিলাই কুত্তা!
-আমাগোর হবে কি ওস্তাদ!
-গু খায়া বাইচা থাকবো! তারপর আবার মানুষ বাইর হইলে খানাখাদ্যে ভরপুর জীবন!
-ওস্তাদ ময়লা তো এক গাড়ি ফেলায় গেছে! চলেন দেখি কিছু আছে কিনা?
-চল যাই!
-ওস্তাদ…!
-পাইছস কিছু?
-হ ওস্তাদ! এই দেখেন আমাগোর কয়জন ভাইবেরাদারের লাশ!
-সর্বনাশ! মরল কেম্নে? বিদ্যুতের তারে নাকি বিষ খাবারে!
-ওস্তাদ আমার তো ভীষণ খিদা লাগছে!
-করবি কি?
-কাক হইয়া কি কাকের মাংস খাওয়া জায়েজ?
-দুর্দিনে সবই খাওয়া যায়! তয় আমি খাবো না!
-তাইলে কেম্নে কি?
-তুই খা, আমি কাউরে বলবো নানে!
-নাহ! কেমন লাগতেছে যেন!
-আরে বাল খা দিহি!
-ওস্তাদ, কাক না হইয়া যদি মরা মানুষ হইত তাইলে কি আপনে খাইতেন?
-হ!
-হে হে বুঝছি!
-কিছুই বুঝস নাই!
-কি বুঝি নাই?
-আমি কাক হইয়া কাকের মাংস খাইতে চাই না! কিন্তু মানুষ এমুন এক জীব যারা দুঃসময়েও নিজেগোর মাংস খায়!
-এহ!! কি কন হাবিজাবি! দেখলাম না তো কোথাও!
-ক্যা দেখস না গরিবের ত্রাণের খানাখাইদ্দ্য কেম্নে নিজেরা লুইটা নিয়া যাইতেছে! স্বজাতিরে না খাওয়ায়া মাইরা যে খায় সে তো নিজেগোরেই খায়!
-বুঝলাম!
-কি বুঝলি?
-আমি ঐ মরা কাক খাবো না!
-খাবি কি তাইলে?
-চলেন গু খুঁজি!
-ল যাই! গু খুঁজতে খুঁজতে খানাখাইদ্দ্য পাইয়াও যাইতে পারি!

০৭ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ ঘিঞ্জি ♦♦♦

জেনেভা ক্যাম্পের ঘিঞ্জি জীবনে লগডাউন আসে। পুলিশ প্রতি বিকালে মাইকিং করে যায়! জহুরা বিবি তার একমাত্র লন্ডা জুম্মানকে বলে…

-কাঁহাঁ যা রাহাহে তুঁ? ছুনা নেহি? বাহার আর্মি খাড়ি হ্যাঁয়! বিমারকি দিনমে তুঁ ঘারছে বাহার নেহি নিক্লেগি খোদা কছম!

জুম্মান ভীষণ দ্বিধা নিয়ে তাকায় মায়ের মুখের দিকে! বারান্দার চকিতে শুয়ে অসুস্থ বাপ, দরজার বাইরে টুলে ঝিমোয় খুনখুনে দাদা! পানের দোকানটা কিছুক্ষণের জন্য না খুললে খাবে কি? খুব শান্ত সুরে সে মাকে বলে…

-কারোনা হুঁয়া তো গায়া, অর নেহি হুয়া তো ভি হাম গায়া; খাওগী কিয়া আম্মা?

জহুরা বিবি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বুক চাপড়ে!

♦♦♦ চালবৃষ্টি ♦♦♦
ঝুম বৃষ্টি শুরু হয় সন্ধ্যামালতী ফুল যখন ফোটে তার পরপর! মানুষেরা হতভম্ব হয়ে পড়ে কেননা এই বৃষ্টিতে জল পড়ে না একফোঁটাও! সবাই নেমে গিয়ে দেখে বৃষ্টি ধারার মতো আকাশ থেকে অবিরাম চাল পড়ছে! ক্ষুধার্ত মানুষেরা বিশ্বাস করতে পারে না এটা কি ঘটতে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে, ফলে তারা জড় হয়ে দেখতে থাকে! এবং ক্রমশ রাস্তা ঘাট নর্দমা পুকুর উঠোন মাঠ চালে ভরে ওঠে! কিন্তু কেউ সাহস করে নামে না চাল কুড়াতে! কেননা পুলিশি রাষ্ট্রের কড়া নিয়ন্ত্রণবাদ তাদের মজ্জার মধ্যে দ্বিধা এবং ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে! তারা অপেক্ষা করে ব্যাপারটা বোঝার জন্য! এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দেখতে পায়, চার হাতপায়ে হেঁটে আসছে দলে দলে সরকারী দলের চেয়ারম্যান মেম্বার নেতা ডিলারেরা! তারা তাদের হিংস্র চোয়াল বের করে ঘষ্‌ ঘষ্‌ স্বরে হুঙ্কার দিয়ে বলে, কোন খানকির পুত একদানা চাউল ধরবার না! এগুলা আমাগোর বাপের সম্পত্তি! আমরা এগুলান গুছায়া গোডাউনে গুইজা থুবো, গর্ত খুইড়া পুইতা থুবো! ক্ষুধার্ত মানুষরা তাকিয়ে তাকিয়ে শোনে! তারপর চতুষ্পদগুলো বলে, কেউ এক পা নড়লে খবর আছে! স্যাটেলাইট দিয়া দেখতেছি আমরা সব! কেউ যদি একদানা চাইল চুরি করছ তাইলে ফালাফালা কইরা ফেলা হবে তারে! আমরা এহন বস্তা আনতে যাইতেছি! ফলে তারা চাল লুটে নেবার জন্য বস্তা আনতে বেরিয়ে যায়! এবং যখন তারা ফিরে আসে তখন দেখা যায় এই চতুষ্পদেরা একজন অন্যজনের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছে! কে কতো বেশি চাল নিতে পারে সেই প্রতিযোগিতায়! ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর চোখে ঘুম এসে যায়, চালধোয়া আকাশে চাঁদ ওঠে! সেই আলোর মধ্যে এইসব নিরন্ন মানুষগুলোর কারো কারো মনে হয়, কতো আর ক্ষুধা সহ্য করবে, তার চেয়ে এই জানোয়ারগুলোকে খুন করে ফেলা উত্তম! কারো কারো মনে হয়, এইসব দেখার চেয়ে আত্মহত্যা উত্তম! আবার কারো কারো মনে হয়, একজন মানুষের কতোটুকু চাল প্রয়োজন এক জীবনে?

২১ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ দুঃস্বপ্ন ♦♦♦
বস্তিতে এক ট্রাক ত্রাণের চাল হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে! ক্ষুধার্ত বস্তিবাসী ক্ষেপে গিয়ে ঘিরে ধরে ট্রাকটা, আরেকটু হলেই তাদের ঘরের বেড়া ভেঙে চাপা দিতো! ড্রাইভারকে বস্তিবাসীরা জিজ্ঞাস করে…

-আচোদা লোক নাকি? আরেকটু হইলে তো গেছিলাম আমরা!
-মরেন তো নাই! আমি সামছু ড্রাইভার! হেল্পারেরা কয় কোপা সামছু ওস্তাদ! আমি ট্রাক চালাই না উড়াই!
-রাখেন মিয়া! সামছু চোদার টাইম নাই! পেটে খিদা!
-এই তো লাইনে আইছেন! নেন! বস্তা গুলান নামায় নেন!
-বস্তায় কি?
-খুইলা দেহেন!
-নাহ! বস্তা খুলবো আর চোর বইলা ফাঁসায় দিবেন! এইগুলান নির্ঘাত চুরির চাইল, আমাগোর কান্ধে সাঁটায় দিতে আনছেন!
-নারে ভাই! খুইলাই দেখেন ভিত্রে মানুষ আছে! চাইল নাই!
-মানুষ দিয়া করবো কি আমরা? মানুষ কি খাওয়া যায়?
-হে হে! দামি কথা! কিন্তু না খুললে তো বুঝবেন না! দেখেন না কি মাল নিয়াসছি! পাইলে খুশি হবেন! আমি আপ্নাগোরই লোক!

বস্তিবাসীরা দ্বিধায় পড়ে যায়! তাদের মধ্যে একজন অতি সাহসী ট্রাকে উঠে যায়! একটা বস্তার সেলাই করা মুখ খুলেই চিৎকার দিয়ে বস্তাটা নিচে ফেলে দেয়! বস্তায় বন্দি একজন চাল চোর! সবাই দেখে হাতপা গুড়ো করে থ্যাঁতলানো একজন চাল চোর কাৎরাচ্ছে! ড্রাইভার সামছু তার পান খাওয়া লাল মুখ খুলে বলে…

-নেন বস্তা গুলান নামায় নেন! সব গুলাতে চাইল চোর আছে! রান্না কইরা খায়া ফেলান!

বস্তিবাসী খিঁচ মেরে যায়! তারা ভাবে ড্রাইভার লোকটা রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতিয়ার এবং এটা নির্ঘাত কোন খেলা! তারা জলদি দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে ওঠে এবং টের পায় ঘরে চাল নেই, কোথাও কোন চালচোর ভর্তি ট্রাক আসে নাই!

১২ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ তৃতীয়শাস্ত্র ♦♦♦
কুকুরগুলো খিদের যন্ত্রণায় টাল খাচ্ছে! মাথা খারাপ হয়ে গেছে প্রায়! যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে! প্রথমদিকে কয়েকটা সংগঠন কিছু খাবার দিচ্ছিল কিন্তু এখন সেটা কমে গেছে! মানুষই খাবারের অভাবে গলায় দড়ি দিচ্ছে! খাবার নষ্ট করার মতো কেউ নেই আর! কয়েকটা সিটকি মেরে যাওয়া কুকুর বাজারের মোড়ে জড়ো হয় রাতে। খাবারের জন্য আজ চরম পথ বেছে নিতে হচ্ছে তাদের! একটা পাগলি ছিল এই মোড়ে! গত পরশু ঠিক করেছিলো আজ গতকাল খাবার না পায় তবে আজ পাগলিটাকে ছিঁড়ে খাবে! কিন্তু কপাল এমন মন্দ যে পাগলিটা উধাও হয়েছে আজ সকাল থেকে! দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল মাছের আড়তের পাহারাদার বুড়োটাকে! যে কিনা এখন ফাঁকা বাজারে একলা থাকে! সম্ভবত বুড়ো বাড়ি যেতে পারেনি এই মহামারীর মধ্যে! কিন্তু আজ সকালে বুড়টার লাশ পাওয়া গেছে! কারা যেন গলাকেটে রেখে গেছে! হয়তো বোকার দল ভেবেছিলো বাজারের আড়তগুলোয় কিছু টাকাপয়সা এখনো আছে! কিন্তু সকল রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবার পর আজ চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়েছে! সামনের মোড়ে কুকুরদের যেই গোত্রটা আছে সেটাকে আক্রমণ করা হবে! সেই দলে আছে একটা নেড়ি কুকুর আর একটা খোঁড়া কুকুর! সবাই পালাতে পারলেও এরা দুজন খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে না হয়তো! এদেরকে পেলে অন্তত আজকের খাবারে ব্যবস্থা হয়ে যাবে! ফলে তারা সবাই হাঁটা শুরু করে! একটা ক্ষিপ্র মত্ততা তাদের সবার মধ্যে ঘড়ঘড় করে! ধীরে তারা এগোতে থাকে! দূরে রাস্তার মোড়টা দেখা যাচ্ছে! শহরের ব্যস্ত মোড়! এখন গোরস্তানের মতন শুনশান! বায়ে একটা গলি রেখে তারা এগিয়ে যায়! এখন পুরোপুরি শিকারি ছন্দে তারা এগোয়! যেন ওদিকে খবর পৌঁছে না যায়! কিছুদূর যাবার পর মুহূর্তের মধ্যে পেছনে ফেলে আসা গলিটা থেকে অন্য একদল কুকুর ক্ষিপ্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে! সবাই তারা দলের নেতা কুকুরটাকে ধরাশায়ী করে ফেলে! ওরা জানে নেতাটাকে খেয়ে ফেলতে পারলে অন্যগুলো এক দুই করে ধরা যাবে! ওগুলোর মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি কম! তবে এদের নেতার মাথায়ও বুদ্ধি নিচু স্তরের! সে শুধু শিকারের কথা চিন্তা করেছে অন্য শিকারিদের কথা ভাবেনি, ফলে তাকেই খাবার হতে হয়েছে শেষমেশ!

১৪ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ বাঘে পাওয়া ♦♦♦
শোনা যায় সুন্দরবন থেকে একটা মানুষ খেকো বাঘ লোকালয়ে এসেছে গত দুদিন আগে! খাদ্যাভাবের এই দিনগুলোতে মানুষ যখন ত্রাণ যোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে তখন বাঘ লোকালয়ে নেমে আসাটা কিসের ইঙ্গিত? বাঘের খাবারও লুট করে নিচ্ছে চোর মজুদদারেরা? সাধারণ লোকেরা এসব নিয়ে চিন্তিত হয় না কেননা তারা বাঘের চেয়ে বেশি চিন্তিত থাকে মহামারীর মধ্যে খাবার চাল যোগাড় করতে! কিন্তু একে একে খবর আসতে থাকে চারদিকের গ্রাম এবং শহরে বাঘের হানায় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী, নেতা, চালের ডিলার, মজুদদার মারা পড়েছে! কোথাও কোথাও শিকার হওয়া তাদের লাশের ছিটেফোঁটা খুঁজে পাওয়া যায়নি! ফলে জীবিতরা আতঙ্কে দিন কাটাতে থাকে! তারা লকডাউনের মধ্যে নিরাপত্তা চায় সরকারের কাছে! কিন্তু হত্যা ঠেকানো যায় না! বাঘ তো মানুষ না যে রাষ্ট্রের কানুন মানবে! ফলে, যখন তখন বাঘ যেখানে সেখানে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে! এ রকম চলতে থাকে বেশ কিছুদিন। ফলে, ঐ অঞ্চলে বাঘের হাতে মারা পড়ে গোটা তিরিশেক এবং বাঘের বদৌলতে আচানক চালের সুষম বিক্রিবণ্টন হয়! কিন্তু বাঘটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না!

মহামারী শেষ হলে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হয়! যার ফলাফল হিসেবে অনেকদিন পর জানা যায়, মহামারীর ঐ সময়ে ঐ এলাকার সবার মোবাইলের রিংটোন ‘বাঘের হুঙ্কার’ ছিল, এবং ঐ সময়ে ঐ অঞ্চলের লোকদের বাঘে পায়!

২২ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ নসিব ♦♦♦
চার পাঁচদিন ভাত জোটেনি! বুনো আলু আর হাবিজাবি খেয়ে কাটাতে হয়েছে! ত্রাণের টিকিট জোটানো লিয়াজুর ব্যাপার! তবে ভাগ্য আজ ভালো, আচমকা আর্মিদের একটা ট্রাক এসে কয়েকশ মানুষকে একেকটা ভারী বস্তা ধরিয়ে দিয়ে গেছে! উত্তেজনায় সিঁদুর হাঁপানির টান উঠে গেলো! সে ভাবেই নি তার কপালে জুটবে! ডোমপাড়ার মাঝবয়সী সিঁদু হাঁপানির জন্য পরিশ্রমের কাজ করতে পারে না ভালো! কয়েকটা পাঁপড় টাপর বিক্রি করে টিকে ছিল কিন্তু মহামারী লাগায় তার কপালের ভাত কয়েকদিনের মধ্যে উবে গেলো! ভরসা হিসেবে তখন জঙ্গলে নেমে যেতে হল। সেখানে জন্মানো বুনো আলু খেয়ে কাটাতে হয়েছে গেছে ৪/৫ দিন। আজ সে ভাত খাবে! ত্রাণের বস্তাটা কাঁখে তুলেই তার শ্বাসকষ্টটা জাঁকিয়ে উঠলো! বাড়ি কোন মতে পৌঁছাতে পারলেই হাড়িতে চাল তুলে দেবে! ফলে হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁদু ছুটতে লাগলো বাড়ির দিকে! পথে কয়েকটা ছেলেপেলে যারা কদিন আগেও মাঠে খেলে বেড়াতো তারা ঘিরে ধরল সিঁদুকে! একজনের হাতে চাকু দুজনের হাতে দুটো গরান! সিঁদু বুঝে ফেলল কপাল মন্দ তার! একজন হ্যাঁচকা টানে ত্রাণের বস্তাটা ছিনিয়ে নিলো! সিঁদু জড়ানো কণ্ঠে বলে উঠলো…

-চালটুকু দিয়ে দে বাপ!
-ভাগ্‌!
-আর সব নিয়ে যা শুধু চালটুকু দে বাপ!
-চুপ হারামজাদা! আরেকটা কথা বললে পেট নামিয়ে দেবো!
-চারদিন ভাত খাই না, একটু ভাত খাবো, চালটুকুন দে!
-মর তুই!
-এক মুঠো দে বাপ! পায়ে ধরি! এক মুঠো চাল দে!

ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বস্তাটার মুখ আলগা করে উঁকি দিয়ে একটা পুটুলি বের করে ছুঁড়ে দিলো সিঁদুর দিকে!

-নে আলু খা!

২৩ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ ফাঁদ ♦♦♦
একটা মরা কুকুরকে কয়েকটা কাক ছিঁড়ে খাচ্ছে, ফলে একটু দূরে বসে থাকা একজন ক্ষুধার্ত মানুষ চিন্তা করতে লাগলো, কাকগুলোকে ধরার জন্য সে কুকুরটার মতো মরে পড়ে থাকবে!

১৪ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ ফেরেশতা ♦♦♦
আমিনা বুড়ি রাতে খোয়াব দেখে ফেরেশতা এসে তার ঘরে বাজার রেখে গেছে! ঘুম থেকে উঠে আমিনা বুড়ি হতাশ হয়! পেচ্ছাবে তার তলপেট ফেটে যেতে চায় কিন্তু উঠতে ইচ্ছা হয় না! মুতলেই খিদে পাবে! আবার সে ঘুমানোর চেষ্টা নেয়! ঘুমের মধ্যে যখন চালডাল যখন রেখে গেছে এবার ঘুমালে নিশ্চয়ই রান্নাবান্নাও হবে!

১১ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ ফটোগ্রাফি ♦♦♦
একজন নেতা মাইকিং করে ত্রাণ দিতে এলেন! তারপর প্রচুর বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন! ক্ষুধার্ত মানুষগুলো ক্লান্ত হয়ে গেলো! নেতার সঙ্গে বয়ে আনা এক দঙ্গল ফটোগ্রাফার অভাবী মানুষদের ছবি এবং নেতার বিভিন্ন মুদ্রার ছবি তুলতে লাগলো! এক বুড়ো অস্থির হয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো…

-বাবা গো শুরু থিকা খালি ছবি তুলতেছেন! ত্রাণ দিবেন তো? নাকি ছবি তুইলা মুড়ি খাওয়ায় যাবেন?

২৭ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ ফুঁ ♦♦♦
মহামারীর দিনে এক শিষ্য তার গুরুর পায়ের কাছে বসে বলল…

-বাবা একটা ফুঁ দিয়ে দেন!
-কেন?
-ভয় লাগতেছে বাবা!
-কিসের?
-মৃত্যুর!
-ফুঁ দিলে কি হবে?
-ভয় কেটে যাবে!
-প্রতি মুহূর্তে তোকে ফুঁ দেবে কে?

২৭ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ মাতোয়ালা ♦♦♦
একদল মাতাল মদের দাবিতে ডিসির কাছে স্মারক লিপি পেশ করলো! যেখানে তারা জানালো, ‘…মহামারীর এই দিনে লকডাউনজনিত কারণে নিয়মিত মদের যোগান পাওয়া যাচ্ছে না! এহেন পরিস্থিতে ডিসি মহোদয় যেন মদের দোকান দুই ঘণ্টার জন্য খোলা রাখার আদেশ জারি করেন! ডিসি চিঠিটা পড়ে বুঝল, লজ্জায় আসল কথাটা এরা কেউ বলতে পারছে না! ফলে ডিসি তার ত্রাণ কার্যক্রম থেকে প্রত্যেককে দশ কেজি করে চাল দিয়ে বিদেয় করে দিলো! মাতালেরা বুঝল ডিসি তাদের পক্ষেই আছে!

২৭ এপ্রিল ২০২০

♦♦♦ গোত্রপিতা ♦♦♦
এক অন্ধ ভিখেরি রোজ রাস্তায় নেমে চিৎকার দিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে, ‘ আমার ত্রাণ নিয়া গেলো! আমার ত্রাণ ছিনায় নিয়া গেলো… কেউ কি আছেন…?’ ফলে দয়ালু কেউ না কেউ কেউ এসে তার খোঁজ নেয় এবং কাউকে খুঁজে না পেয়ে অন্ধ ভিখেরিকে চাল ডাল কিনে দেয়! পরের দিন অন্য কোথাও ভিখেরিকে আবার চিৎকার দিয়ে কাঁদতে দেখা যায়! একজন লোক একই দৃশ্য তৃতীয়বার দেখবার পর ভিখেরির পিছু নেয়! বস্তিতে তার ঘরে উঁকি দিয়ে জানতে পায় এই অন্ধ খোঁড়াদের একটা ভিখেরি গোত্রের প্রধান! অভাবের দিনে সে এভাবে চাল ডাল রোজগার করে এনে সবাইকে ভাগ করে দেয়!

২৭ এপ্রিল ২০২০

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top