আওয়ারা খেয়াল ।। পর্ব-৬ ।। সারা শাগুফতার কাঁটার লেবাস ।। জাভেদ হুসেন

আঙ্গিনায় রোদ না এলে বুঝে নিও
তুমি অন্য কারো এলাকায় বাস করো
আর এদিকে মাটিতে আমার শরীরের
কিছু টুকরো ছড়িয়ে আছে
আমাদের স্বপ্নে কে রেখে যায়
পায়ের আওয়াজ? তারপর
লুট হয়ে যায় আমাদের মরবার অবসর
বাসনার খাপে কি
রাখা থাকে স্পর্ধা আমাদের…!
সারা সাগুফতার একটি কবিতা শুনতে ক্লিক করুন
সারা শাগুফতার স্পর্ধা ছিল! স্বপ্নের জন্য বৈরি পৃথিবীতে সারা কবিতা লিখে গেছেন। নিতান্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের এক মেয়ে। অবিভক্ত পাঞ্জাবে বাস ছিল পরিবারের। ১৯৫৪ সালে দেশ ছেড়ে আসা পরিবারে পাকিস্তানে জন্ম। মেট্রিক পাস করে উঠতে পারেননি। মা বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু এর আগেই কিশোরী সারার মনে মগজে কবিতা বাসা বেঁধেছে। কেন যে মানুষ কবিতা লেখে কে জানে! যে লেখে সেও বোধ হয় কবিতা লিখেই লেখার কারণ খুঁজতে থাকে। সারাও কবিতা লিখতেন। এই কবিতা তাঁর জীবনে একের পর এক দূর্যোগ নিয়ে এলো। শেষ স্পর্ধা তিনি দেখিয়ে গেলেন ২৯ বছর বয়সে আত্মহত্যা করে।

অল্প বয়সে মরে যাওয়া কবিদের কবিতা আর জীবনে তফাত খুঁজে পাওয়া যায় না। সারা’র জীবন আর কবিতাতে ফারাক নেই। কবিতা নিজেই যথেষ্ট কাউকে দলছুট করতে। আর সে ঘর যদি সারার জন্য জন্মসুত্রেই কারাগার হয় তবে তো কথাই নেই!নারী হিসেবে তিনি জেলখানার ভেতরেই আরেক জেলখানার মানুষ! মানুষের জন্য কোন অনাগত সৌভাগ্যের কথা ভাবতেন তিনি। ছিলেন অনন্ত অস্থিরতার সঙ্গে বসত করা মানুষ। কোন এক প্রেমের খোঁজ করতেন। কবিতায় হয়তো সেই প্রেম ছোঁয়া যায়। কিন্তু আমাদের বহাল বাস্তব একে ধারণ করার যোগ্য হয়ে ওঠেনি আজও । তবু সারা শাগুফতার এই অন্বেষণ কবিতা হয়ে আমাদের কাছে রয়ে গেছে।
১৭ বছর বয়সে যখন সারার প্রথম বিয়ে হলো, তিনি চেষ্টা করেছিলেন মায়ের বলা পথে চলতে। কিন্তু নিজেকে কতটা বদলানো যায়? নিজের ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধি আর অনুভূতিপ্রবণতা কাল হলো। স্বামীর সঙ্গে ঝামেলা শুরু হলো। সে ঘর ছাড়লেন। বিয়ে করলেন এক কবিকে। শাগুফতার গর্ভে তখন সাত মাসের সন্তান। সারার প্রিয় বন্ধু ছিলেন অমৃতা প্রিতম। অমৃতার সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ চলেছে নিয়মিত। চিঠিতে সারা নিজের জীবন আর ভাবনা বয়ান করতেন। বন্ধু অমৃতাকে লিখছেন:
“সাত মাসের সন্তান গর্ভে। শরীরে অসহ্য বেদনা। জ্ঞানের অহংকার সাত আসমানে আমার স্বামীর। চোখের পলক না ফেলে চলে গেলেন কোন আসর রঙিন করতে। ব্যথায় আমি তখন চিৎকার করছি। বাড়িওয়ালি তাই শুনে হাসপাতালে দিয়ে এলেন। … আমার শরীরে অসহ্য ব্যথা,হাতে পাঁচটা এক টাকার নোট। পাশে শুয়ে তোয়ালে মোড়া ব্যথার মধ্য দিয়ে জন্মানো আমার সন্তান। পাঁচ মিনিটের জন্য ও চোখ খুলে কাফনের খোঁজে বের হয়ে গেল”।
সারা শাগুফতার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে শুনতে ক্লিক করুন
এক মাসের ভেতর পাশে সেই সন্তান। মৃত। আর হাতে সেই পাঁচ টাকা। ডাক্তার ২৯৫ টাকার বিল ধরিয়ে দিল। কোন মতে ঘরে পৌঁছলেন। ঘর কী, বস্তির এক ঝুপড়ি। সদ্য প্রসুতি, বুক থেকে দুধ ঝরছে। একটা গেলাসে ভরে সেই দুধ রাখলেন! কবি স্বামীকে খবর দেওয়া হলো। চিরাচরিত নীরবতা। এরপর কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা। “আমি উঠলাম। ধুকতে ধুকতে এক বন্ধুর কাছে গিয়ে ৩০০ টাকা ধার নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। ২৯৫ টাকা বিল শোধ করলাম। আমার কাছে থাকলো এক মৃত শিশু আর নগদ পাঁচ টাকা। ডাক্তারদের বললাম− আপনারা চাঁদা তুলে ওর কবর দিয়ে দিন”।
“বোধশুন্য আমি বাসে চড়লাম। টিকেট কাটিনি। কন্ডাকটরকে শেষ ৫ টাকা হাতে গুঁজে দিলাম। ঘরে পৌঁছলাম। গ্লাসে রাখা দুধ। তার রঙ সাদা কাফনের চেয়েও উজ্জ্বল”।
“আমি গ্লাস হাতে নিলাম। কবিতা লিখবো। আমাকে কবিতা লিখতে হবে। গেলাসের দুধ বাসি হওয়ার আগেই একটা কবিতা লিখলাম। কিন্তু আমার সন্তানকে তো কাফন কিনে দিতে পারলাম না! ওর আসল কবর তো আমার হৃদয়ে।… ওকে আমি আর কী দিতে পারি! আমার কবরের প্রদীপের তাপে হাত শেকছে পঙ্গু সময়। একদিন তাকে দেখে আমিও কেঁপে উঠেছিলাম!”
ফিরে যেতে সারার জন্ম হয়নি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে কবি হলেন। তখনো তিনি মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে বলছেন:
মৃত্যুর খোঁজ নিও না
মানুষেরও আগে মৃত্যু বেঁচে ছিল
ভঙ্গুর যারা মাটিতে রয়ে গেছে
তারা থাক
আমি বৃক্ষ থেকে পড়ে যাওয়া ছায়া
শেষ উচ্চারিত শব্দের আগে মৃত্যু নেই আমার
আমার চোখে কবর অনেক মৃত হৃদয়ের
সারা সাগুফতার আরেকটি কবিতা পড়তে শুনতে ক্লিক করুন
জীবনের এই মোড়ে সারা শাগুফতা আপন থেকে বাহির হয়ে দাঁড়ালেন। চলার পা কখনও নিজেরই পায়ের রক্তে ভিজে চিহ্ন ফেলে আসে পথে। কিন্তু সে রক্তের আলপনা ফিরে তাকানোর সময় থাকে না। তখন কবিতা অবতীর্ণ শ্লোক হয়ে ওঠে:
আমার গোত্রের গর্ভ থেকে
কেবল চিৎকার জন্ম নেয়
কোল থেকে ছুঁড়ে ফেললাম শিশু
আর দত্তক নিলাম চিৎকার

অমৃতা সারার ভাবনা বুঝতেন খুব কাছে থেকে জেনে। সেই সূত্র ধরে বন্ধুর বয়ানে লিখেছেন:
“হে খোদা!আমি তীক্ত,খুব তীক্ত। কিন্তু যাই হই,আমি তো তোমারই তৈরি মদ!আমি সারার দৃষ্টি আর তার চিঠি পড়তে পড়তে খোদার তৈরি সেই মদিরার বিন্দু বিন্দু পান করি”। এমন বৈরি জীবন কেন বেছে নিলেন সারা? অমৃতা এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিজের কবিতায়:
তোমার প্রেমের এক বিন্দু মিশে গিয়েছিল
আয়ুর সকল তিক্ততা পান করে গেছি তাই
(তেরে ইশক কি ইক বুন্দ ইস মেঁ মিল গ্যায়ি থি
ইস লিয়ে ম্যায় নে উম্র কি সারি করোয়াহাট পিলি)
কার প্রেম? সারা জানতেন না। তবে খুঁজে গেছেন।
সারা শাগুফতা কেবল নিজের জীবন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন না। জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনের সময় যে কয়জন বিপদজনক কবিকে নিয়ে প্রশাসন ব্যস্ত থাকতো সারা শাগুফতা তাঁদের অন্যতম। গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন তিনি ১৯৮০ সালে। জেলে বসে লিখেছেন:
এই অঙ্গারের পাত্র হতে
তুলে নাও নিজের জ্বলন্ত হৃদয়
নইলে শেষে কোন একদিন
ওরা আগুন আর পোড়া কাঠকেই
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করবে

সারার বাবা দরিদ্র পরিবারটিকে হেলায় ফেলে আবার বিয়ে করে নতুন সংসার পাতেন। মা নিতান্ত কায়ক্লেশে টেনে নিয়ে গেছেন সংসার। না খেয়ে কেটেছে দিনের পর দিন। সারার বিয়ে হয়েছে সতের বছর বয়সে। স্বামীর মার খেয়ে দিন কেটেছে। হয়েছে তালাক। বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে নিজের সন্তানের কাছ থেকে। এ তো আমাদের নারীদের গড়পড়তা জীবন। সারা শাগুফতা একটা জায়গায় অন্তত তাদের থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। তিনি ছিলেন অসামান্য কাব্য প্রতিভার মানুষ। সেই সুত্রে ঢুকতে চেয়েছেন মধ্যবিত্ত বলয়ের ইজ্জতের জায়গায়। এই ডিঙ্গিয়ে যাওয়া তারা পছন্দ করেনি। কবিদের আড্ডাতেই পরামর্শ ভেসে আসতো, “সারা, নিজের কবিতা আর শরীরটাকে আলাদা রেখো”। তাঁর জীবনের ধরণ কানাঘুষার জন্ম দিয়েছে। শাগুফতার জীবন আর কবিতা দুইই এই মধ্যবিত্ত ইজ্জতদারদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। তাঁর কবিতার বয়ানে:
ইজ্জতের অনেক চেহারা
কখনো পর্দা, কখনো গালে চড়ের কালসিটে
ইজ্জতের কফিনে বন্দীত্বের পেরেক ঠোকা আছে
এই ঘর, এই ফুটপাথ আমাদের নয়
ইজ্জতের বর্শায় আমরা এফোড়-ওফোঁড় হয়ে আছি
শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ইজ্জত কমতে থাকে
রাত্রির অন্ধকারে একবার চেখে ফেললে নুন
সারা জীবন তুমি বাসি রুটি

সারা এসেছেন সমাজের গরীব অংশ থেকে। সমাজের এলিট অংশের যে চলন সেখানে জন্মালে সারা এতো অসহনীয় হয়ে উঠতেন না। তিনি ধাক্কা দিয়েছেন মধ্যবিত্তের নৈতিকতার দেয়ালে। এই দেয়াল তৈরি হয় এলিটদের সামাজিক গঠনের আদলে। সারার জীবন, কবিতা উপমহাদেশের সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা দৃশ্যমান করে। যারা আমাদের ভাবনার, নৈতিক অবস্থান আর মুক্তির রাজনীতি যে মধ্যবিত্ত গোয়ালে আটক, তার থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়।

তাঁর রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকা, প্রথার বাইরে গিয়ে নারী জীবন আর অনূভুতি নিয়ে কবিতা লেখা বিশাল হইচই ফেলে দিলো। সারার জীবন নারী আর কবি হওয়ার অপরাধে দু:সহ হয়ে উঠলো। সেই জীবন ছেড়ে আসার সাহস তাঁর ছিল। কোথায় যাবেন জানতেন না। কিন্তু কোথায় বেঁচে থাকা যায় না তা তিনি জানতেন।

সারা’র নামে চরিত্রহীনতার অভিযোগ এলো। আবার তালাক হলো। ওর বাচ্চাকে কেড়ে নেয়া হলো। সারা লিখলেন:
এই খোলা প্রান্তর আমার সাহস
অঙ্গার আমার বাসনা
মাথায় কাফন বেঁধে জন্ম আমার
কোন হীরের আংটি পরে নয়
তোমরা কী কেড়ে নেবে আমার?

এর পর সারার চতুর্থ বিয়েও ভেঙে গেল। এবার সারা ভেঙে পড়লেন। বার কয়েক চেষ্টা করলেন আত্মহননের । শেষ চেষ্টার আগে লিখলেন:“আমার পায়ের তলার মাটি চুরি হয়ে গেছে। ঘোষণা হয়েছে− আমার শরীরই আমার দেশ। এ আর কত দিন মানা যায়? মানুষের কলঙ্কের দাগ ধুতে ধুতে আমার হাতেই দাগ পড়ে গেছে। আমার ছোট্ট নৌকোয় চড়ে বসেছে মন খারাপের এক বিশাল সমুদ্র। খোদা তো চাঁদের কালি দিয়ে রাত লেখেন। কিন্তু তার বান্দারা রাতের কালি দিয়ে আমার দিন লিখে দেয়। দুনিয়ার সংকীর্ণতা আমার ভঙ্গুর শরীর আগেই ধ্বসিয়ে দিয়েছে। বাকি ছিল প্রাণ। একে আমি মসজিদের ইটের মতো বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। শরীরে অনেক দিন কয়েদ থাকলে প্রাণে অসারতা আসে। তাই জুন ৪, ১৯৮৪ সালে আমি সেই বন্ধন খুলে দিলাম”।
এই শেষ লেখার শেষে লেখা ছিল:
আমার অশ্রুগুলোকে চোখ বানিয়ে দিয়েছি
আমার ঝড়গুলো থেকে বানিয়ে নিয়েছি পথ
আকাশ শোনে না নক্ষত্রের চিৎকার
সে চিৎকার পৃথিবী শোনে কান পেতে
আমি মৃত্যুর বেনি খুলে
মিথ্যের ওপর দিয়েছি বিছিয়ে
… মৃত্যুর হাতে ধরা প্রদীপ আমি
জন্মের চাকায় দেখি সওয়ার মৃত্যুর রথ

১৯৮৪ সালের ৪ জুন। রাত এগারোটায় করাচির দ্রিঘ কলোনি রেলওয়ে স্টেশনে লোকাল ট্রেনে কাটা পড়লো একজন । প্রত্যক্ষদর্শীরা বললেন যে মানুষটা নাকি কাটা পড়ার আগে ট্রেনের দিকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিলেন। তাঁর কাটা শরীরের পাশে পাওয়া গেল এক প্যাকেট আগরবাতি। আর একটা বই। কুররাতুলাইন হায়দারের ‘শিশে কা ঘর’, মানে কাঁচের ঘর। বইয়ে নাম লেখা – সারা শাগুফতা!
অমৃতা তাঁর বন্ধুকে নিয়ে শেষ কথা বলছেন:
“এই পৃথিবী সেই পৃথিবী নয় যেখানে সারা নিজের ঘর বানাতে পারতো। তাই সে ঘরের বদলে নিজের জন্য বানিয়ে নিলো একটা কবর। তবে আমি একটা কথা জানি। সারা কবর হয়ে গেলেও কবরের নিস্তব্ধতা হতে পারবে না। তোমার যদি হৃদয় থাকে, সারার কবরের পাশে গেলেই ওর কন্ঠস্বর শুনতে পাবে”।

এক থি সারা বইয়ের প্রচ্ছদ

সত্যিই তো! সারা শাগুফতা নীরব হবেন কেমন করে? তিনি তো জানেন যে আঘাতেই বীণা বাজে। তাই এত আঘাত সওয়ার পর মৃত্যুতেও তাঁর কবিতা বলার পালা ফুরোয় না:
সব শব্দ ঝুলে আছে ক্রুশে
বেদনার জিভে কাঁপছে শব্দ থরথর
(সলিবোঁ পর টাংগে হুয়ে হ্যাঁয় লফয
দর্দ কি যুবাঁ পর লরয রহে হ্যাঁয় লফয)
সারা শাগুফতার জীবনী নিয়ে রচিত নাটকটি দেখতে ক্লিক করুন

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top