নান্দনিক পাখিদের উড়াল ।। ফেরদৌস নাহার

কেন এখানে এসেছিলাম, কেন বুক চিড়ে ঝরে পড়ে বুনোফুল
কেন লাল প্যান্টে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে মনে হল সব শূন্য
বারবার সুতো ছিঁড়ে যায়, ফিরে ফিরে দেখলাম
আজ পৃথিবীর সমস্ত বাতিঘরে আলো নেভানো
নাগালের বাইরে দাঁড়িয়ে ওই বেহদ্দ পাগলামি
আমাকেও পাগল করবে বলে বারবার ডেকে গেল

[লাল প্যান্টে সিঁড়ি ভেঙে/ পাখিদের ধর্মগ্রন্থ]

বাইরে ঠান্ডা বাতাস আর উড়ে চলা তুলো তুলো তুষার মাথায় নিয়ে এসেছি এখানে। বসে আছি কফি শপের টেবিলে। সন্ধ্যা নেমে গেছে সেই কখন। আমি একাকী কোণার দিকের একটি টেবিলে, মিডিয়াম ডার্ক রোস্ট কফি হাতে, ভাবছি, এখন আমার কোথায় থাকার কথা ছিল? কতদূর সেই দেশে? কলকাতা না বাংলাদেশে? যেখানে যেতে চেয়েছি কবিতার জন্য, যে উৎসবে থাকতে চেয়েছি শুধুই কবিতাকে ভালোবেসে। এই ভালোবাসা কোন যে নান্দনিক পাখি হয়ে উড়ে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে!

কফিতে হালকা চুমুক দিয়ে নিজের কাছেই নিজে স্বীকার করি- কবিতা ছাড়া কিছুই এত ভেতর থেকে দেখিনি আমি। তাকে চিনি বা না-চিনি, তবু ভালোবেসেছি প্রগাঢ় তৃষ্ণায়। জড়িয়ে ধরেছি উন্মাদ প্রেমাস্পদের শক্তিতে। সেও চেয়েছে তাই-ই যেন করি আমি, হয়তো সে কারণেই কখনোই ছেড়ে যায়নি। জীবনের নানান প্রতিকূলতা, বেদনা এবং বিচ্ছেদে সে থেকেছে আমার পাশে, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। কখনো কি কিছু চেয়েছে? আসলে সে যা চায় বা চাইতে পারে, তা আমার রক্তের অণু-পরমাণুতে জেগে থাকে প্রতিনিয়ত। কবে তাকে এত ভালোবাসলাম, সে কথা আজ আর হিসাব নিকাশের ধার ধারে না। এটাই সত্য- আমরা ভালোবেসেছি পরস্পরকে, কেবলি দিয়েছে, দিয়েছি একে অন্যকে। কখনোই ছেড়ে যাইনি। মাঝে মাঝে তার এই ছেড়ে না-যাবার ক্ষমতায় আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছি!

কে কী ভাবছে আমার কবিতা নিয়ে, বা কবিতা লিখে কোনো অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারছি কী পারছি না, সেসব নিয়ে কখনোই আকুল হইনি, বরং আমার কবিতা আমাকে কতটা ভাবাচ্ছে কিংবা সে-ও আমাকে নিয়ে কী ভাবছে, তারই সন্ধান করে গেছি। দেখতে দেখতে তো কেটে গেল তার সঙ্গে জীবন উদযাপনের প্রায় তিনটি দশক।

১৯৮৬-র ফেব্রুয়ারি মাস। প্রথম থেকেই অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের রূপ ধরে প্রকাশিত হল প্রথম কবিতা সংকলন, তাকেই সকলে ডাকল- কবিতার বই বলে। ‘ছিঁড়ে যাই বিংশতি বন্ধন’ যে দিন উপস্থিত হয়েছিল বাংলা একাডেমির বইমেলা প্রাঙ্গণে, সে দিন কী এক অনুভূতি ঘিরে ধরেছিল, তা হয়তো লিখে বা বলে বোঝাতে পারব না। জীবনে প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই, প্রথম বইমেলাতে এলো, অনুভব করছি সম্পূর্ণ নতুন এক অনুভূতি, কেমন যেন পা থেকে মাটি সরে যাওয়া একটি শিরশিরে অনুরণন সারাক্ষণ আমাকে জড়িয়ে থাকল। ভেতরে ভেতরে- উড়ে যাচ্ছি, না পড়ে পড়ে যাচ্ছি ঠিক ঠাহর করতে পারি না। কত কাজ, কত আয়োজন- সামাল দিতে দিতে বন্ধুদের ছায়ায় মায়ায় আশ্রয়ে নিঃশ্বাস নিতে আসি। সেসব কথা কতবার যে কতভাবে বলেছি, তারপরও যেন বলা শেষ হয় না। হয়তো যতদিন বাঁচব ততদিনই বারবার বলব, আরো অনেকবার বলব, এই বলা আমার ফুরাবে না।
নিজস্ব আয়নায় যে ছবি মুছে গেছে সেখানে অন্য কেউ
ঠিক তোমার মতো তার দিকে বাড়িয়েছে হাত, দুটি হাত
এইসব গল্পেরা আলোর মিছিল নিয়ে চলছে আগুন গায়ে
শীতল হাত একবার স্পর্শ দিতে পারে অসুখী ঘায়ে
মুছে নাও সব পরিচয়,
দিনের শেষে টানটান পরিচয়হীন হেঁটে গেলে দেখেছি
কেমন হালকা লাগে, কেমন আশ্চর্য আহুতিবেলা কাছে আসে
গভীর গোপন এক জ্বলন্ত অগ্নিদাহে

[গভীর গোপন অগ্নিদাহে/ পাখিদের ধর্মগ্রন্থ]

পুরো ২০১৩ আর ২০১৪ তে যে এত কবিতা লিখেছি ভাবতেই পারিনি। সেসব তরতাজা আনকোরা নতুন কবিতা দিয়ে তৈরি হল দুটি পাণ্ডুলিপি। কোথায়, কোন প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করব, তার-চাইতেও নাম নির্বাচন নিয়ে দারুণ উৎকণ্ঠা। যথারীতি প্রতিবারের মতো এবারও অনেক নামের আনাগোনা, বাছাই মাজাই। অবশেষে অজস্র নির্ঘুম রাত্রির বোঝাপড়ায় নির্ধারণ হল দুখানা পাণ্ডুলিপির জন্য দুখানা নাম। একটি ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’ এবং অন্যটি ‘নাভি ও নন্দন’।
কৌরব লিটিলম্যাগের সঙ্গে পরিচয় বহুকাল ধরে। লেখালেখির প্রথম অবস্থা থেকেই যে কটা লিটিলম্যাগ ও পত্র-পত্রিকার নাম জানতাম, কৌরব তাদের মধ্যে অন্যতম একটি। তখন এই পত্রিকাটি কমল চক্রবর্তী, বারীন ঘোষালসহ আরো বেশ কয়েকজন মিলে জামশেদপুর থেকে প্রকাশ করতেন। একদিন সেই ঠিকানায় ঢাকা থেকে ডাক যোগে কবিতাও পাঠিয়ে দিলাম, ২৫এ এগ্রিকো বাগান, জামশেদপুর। কয়েকটি সংখ্যায় আমার কবিতা প্রকাশিতও হল। লেখা পাঠিয়েছি এবং সেগুলো ছাপা হয়েছে। পত্রিকা সবসময় হাতে না পেলেও, ছাপা হবার খবর ঠিক ঠিকই পেয়ে যেতাম। কমল চক্রবর্তী, বারীন ঘোষাল ততদিনে আমার কাছে পরিচিত নাম।

বেশ মনে আছে, ২০০২ এর সেপ্টেম্বর শেষাশেষি ঢাকাতে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সভাপতিত্বে ‘অনিরুদ্ধ আশি’ নামে একটি কবিতা উৎসবে শ্যামলকান্তি দাশ, ধূর্জটি চন্দ, কমল চক্রবর্তী, সুবোধ সরকার, মৃদুল দাশগুপ্তসহ আরো অনেক কবি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন। সেই উৎসবে টি-ব্রেকে কমল চক্রবর্তীর সঙ্গে চা খেতে খেতে অনেক গল্প হয়েছিল। বলেছিলাম, পৃথিবীর পথে বেরিয়ে যাব, হয়তো একদিন ঘুরতে ঘুরতে জামশেদপুরও চলে যেতে পারি। কমলদা বলেছিলেন- এসো, এসো!
ওরা গান গাইছিল কয়েকশো বছরের পুরানো কফি শ্রমিকের কণ্ঠে
গাঢ় আলিঙ্গনের প্রাচীন উত্তাপে, হাওয়ার বুকে লিখে চলছিল ইতিহাস।
যেখানে কেউ কেউ তাদের ন্যায্য পাওনায় বারবার বাধ সেধেছে।
ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাই ইথোপিয়া, কঙ্গো বা কেনিয়ার কফি শ্রমিক
যখন হাসপাতালে। যারা কোনোদিনও চুমুক দেয়নি কফি কাপে

[কফি শ্রমিকের গান/ নাভি ও নন্দন]

আমার আর যাওয়া হয়নি। হাজার হাজার কিলোমিটার পারি দিয়ে, ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাই উত্তরের এক দেশে। কিন্তু বাড়ির পাশে জামশেদপুর কিংবা কৌরবের কারো কাছেই আর যাওয়া হল না। তবে কবিতার কাছে বারবার ফিরে ফিরে গিয়েছি বলে, প্রকারন্তে সকলের কাছেই যাওয়া হয় আমার। অবশেষে ২০১৪-তে কবি বারীন ঘোষালের প্রশ্রয়ে কৌরব প্রকাশন থেকে বই প্রকাশের প্রস্তুতিও নিলাম। কিন্তু সে বছর বইমেলার সময় কলকাতা যাওয়া হয়ে উঠবে না বলে, বই প্রকাশের বিষয়টিও আপাতত ঘুম পাড়িয়ে রাখলাম। কিন্তু ২০১৫-তে এসে সেসব চিন্তা বাদ দিয়ে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলাম কৌরব প্রকাশনীর ঠিকানায়। ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’ প্রকাশিত হবে কলকাতার কৌরব প্রকাশনী থেকে। কে জানে এবারও যাওয়া হয় কী হয় না! আর হলও তাই। দীর্ঘ এক অসুস্থতায় আটকে গেলাম। এবারও যেতে পারলাম না কলকাতা বইমেলায়, কিন্তু আমার বইটি এলো, পাখিদের ধর্মগ্রন্থ হয়ে।

এবারের ৩৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা আমার জন্য ভিন্নমাত্রা নিয়ে এসেছিল। এই প্রথমবারের মতো এই বইমেলা থেকে আমার একটি একক কবিতার বই প্রকাশিত হল। মন চনমন করেছে, আহা যদি থাকতে পেতাম! তাহলে পাখিদের ধর্মগ্রন্থের জন্মটা অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতাম। অথচ যেতে পারিনি। জীবন বাস্তবতার কঠিন নাগপাশে লটকে কষ্ট বুকে দূর থেকেই প্রতিদিন অপেক্ষা করেছি মেলার খবর, কৌরবের খবর এবং পাখিদের ধর্মগ্রন্থের খবর জানার জন্য। বইটি যেদিন প্রথম মেলায় পা রাখল সেদিন সারারাত ঘুম হল না আমার। ফোনে কথা বললাম কবি বারীন ঘোষালসহ অনেকের সঙ্গে।
বইটির প্রচ্ছদের ছবি এঁকে দিয়েছে আমার গ্রিস দেশীয় বন্ধু ক্যাতেরিনা দ্রামিতিনো। সে একজন সত্যিকারের চমৎকার মনের মানুষ বলেই, একজন ভিন্নভাষী কবির অনুরোধে, কবিতা বইয়ের প্রচ্ছদে নিজের ছবি ব্যবহার করার অনু্মতি দিয়ে দিল এক লহমায়। আমি নিজেও এতে খুব খুশি। ক্যাতেরিনার আর্ট ওয়ার্ক আমার বরাবরই ভালো লাগে, এবারে তা যুক্ত হল আমার সৃষ্টির সঙ্গে। এতে আমি বেজায় আনন্দিত, বইটি তার হাতে পৌঁছানোর পর আশা করি সেও কম খুশি হবে না।
বরিশালের মেয়েটি। যে কিনা বগুড়া রোডের সর্বানন্দ ভবনের বাসিন্দা
কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে বিশেষ অন্তরঙ্গ ছিল বলে, সেও দেখেছিল
শহরের গ্যাসের আলো ও উঁচু-উঁচু মিনারের ওপরে নক্ষত্রেরা অজস্র
বুনোহাঁস হয়ে দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে উড়ে চলছে। আর তা দেখতে দেখতে
দূরতম ট্রাম লাইন তাদের বুকে ছায়া ফেলে, ডাকে। কেউ-ই সময় মতো
আসেনি, এবার সে-ও জ্যোৎস্না মগ্নতায় জীবনানন্দের হাত ধরে হাঁটতে থাকে

[জ্যোৎস্না মগ্নতায়/ নাভি ও নন্দন]

অবশেষে তারও একদিন সমাপ্তি টানল হল। শেষ হয়ে গেল কলকাতা বইমেলা। যে কোনো শুরুই তো শেষ আছে এও তা থেকে আলাদা নয়। এত সাজ সাজ আয়োজন, এত প্রস্তুতি, এত আগ্রহ, প্রচারণা সব একসময় শেষ হয়ে যায়। হাজার বছরের পুরানো সময়-বুড়ির হাতের ঘণ্টাটি, ঢং ঢং করে বাজিয়ে জানান দিয়ে যায় বিদায়ের সংকেত ধ্বনি। আমি যেমন এবারের কলকাতা বইমেলায় থাকতে পারিনি, তেমনই থাকছি না বাংলাদেশের অমর একুশে বইমেলাতে।

আবার এসেছে ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মাস, বাংলাভাষা অধিকার আদায়ের মাস। তাই একুশে বইমেলা মানে প্রাণের মেলা। ২০১৩-র একুশে বইমেলায় আড়িয়াল প্রকাশনা থেকে দুটো কবিতা বই প্রকাশের পর, এবার দুইদেশের দুইটি বইমেলায় আবারো আমার দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেল। কলকাতারটির কথা তো বলেছি, ‘নাভি ও নন্দন’ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের সিলেট শহরে গড়ে ওঠা তরুণতম প্রকাশনা চৈতন্য থেকে।

চৈতন্যের কর্ণধার প্রকাশনা শিল্পীরের আরেকজন তরুণ যোদ্ধা রাজীব। রাজীবের সঙ্গে এত দূর থেকে ফেসবুক, ই-মেইল এবং টেলিফোনের মাধ্যমে বইয়ের ধারাবাহিক কাজ সেরেছি। বইয়ের ইনার, প্রুফ, গেট-আপ, মেক-আপ থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ে বারবার কথা বলেছি, জানতে চেয়েছি, কখনো কখনো উচ্ছ্বসিত হয়েছি। এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন এই প্রজন্মের কবি ও শিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। সকলে পছন্দ করেছে নির্ঝরের প্রচ্ছদ। আমিও তাতে খুব খুশি। এভাবেই এক একটি সৃষ্টির সঙ্গে লেগে থেকে, দিন-রাতের তফাৎ ভুলে ‘নাভি ও নন্দন’ এবং ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’-র জন্ম কাহিনি গড়েছি। তাই বলছিলাম, এবারে আমার বই এসেছে দুইদেশের দুই বইমেলাতেই, শুধু আমিই নেই সেইসব উৎসবে। তখন উত্তরের প্রায় সাড়ে বারো হাজার কি.মি. দূরের, এক শীতালু শহর টরন্টোতে বসে, প্রতিদিন আগ্রহ ও উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষায় থাকি, মেলার সংবাদ জানতে। বাংলাদেশের চলমান অবরোধ, হরতাল, আর পেট্রলবোমায় আক্রান্ত অগ্নিদগ্ধ জনজীবনে, বইমেলা তাদেরকে কতটা কাছে টানতে পারছে কে জানে।
আমার বয়স যখন বৃষ্টিদিন, সাইকেল চালিয়ে যাব বলে
প্যাডেলে চাপ দিয়েছি, সে যাওয়া এখনো থামেনি
ঝরা পাতার সাথে উড়ে উড়ে বৃষ্টি গায়ে মেখে
আমার সাইকেল যায় দূর কোনো পর্তুগিজ শহরে
যেখানে গিটার বাজিয়ে গান গায় কয়েকশো বছরের পুরানো ডিকস্টা

[কয়েকশো বছরের পুরানো ডিকস্টা/ পাখিদের ধর্মগ্রন্থ]

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি নিজেই কি সেই পুরানো ডিকস্টা? যার অনেক কথা জমে আছে, আর তা গান হয়ে ঝরে পড়ে ঝরা পাতার সঙ্গে? আজকাল আমার গদ্য পড়ে কাছের বন্ধু থেকে শুরু করে অনেকেই জিজ্ঞেস করছেন, এমন কী হয়েছে? আমি নাকি খুব স্মৃতির কাছে চলে যাচ্ছি? উত্তরে কিছুই বলি না, শুধু মনে মনে বলি- এই দূরতম প্রবাস জীবনে স্মৃতির গুরুত্ব যে কী, তা একজন প্রবাসী ছাড়া আর কে জানে। তাই তো যেতেই হবে তার কাছে, বারবার ঘুরে-ঘুরে ফিরে-ফিরে। তাছাড়া এই করোটি আচ্ছাদনের নিচে স্মৃতি ছাড়া আর কী সঞ্চয়ই বা জমা হয়েছে এতদিনে। আজ যেখানে এসে পৌঁছেছি, তাতে করে মনের সাথে দীর্ঘ বোঝা-পড়ায় বেশ বুঝতে পারছি, বোধের পরিমাপ মাপজোকের সময় শুরু হয়ে গেছে। পরিণত অথবা অপরিণত যে পথেই মাপি না কেন, জীবনচক্রের হিসাব-নিকাশ কিছুটা তো স্মৃতি ভারাক্রান্ত করবেই। আমি তাকে অভিজ্ঞতা অথবা পরিণত হয়ে ওঠা, যাই ভাবি না কেন। আমার লেখনী জুড়ে যে কথারা কথা বলে, তারা এসেছে সবুজের প্রান্ত হয়ে এবং কুয়াশা জড়ানো শীতের তুষারের কাছে। কাকে আমি অস্বীকার করব, সবই তো আমি। দুই ভূখণ্ডের দুইধারা আমাকে জড়িয়ে আমারই মাঝে বেড়ে ওঠে, এতো বেঁচে থাকারই আরেকটি নাম। আজ অবশ্য বর্তমানের পঞ্জিকার কথাই বলেছি। যা আমার জীবনেরই সমার্থক, আমি এবং আমার লেখালিখি।

একে একে কেটে গেল কত দিন ও বছর। আরো কিছু বইয়ের জন্মও হল। এভাবে দেখতে দেখতে কত না অগ্নিদাহে নিজেকে পুড়িয়ে কত পথ চলা। একে একে প্রকাশ পেল আরো কয়েকটি মৌলিক কবিতা ও প্রবন্ধের বই। কলকাতা ও বাংলাদেশ থেকে সম্পাদিত বেশ কিছু বইয়ে গুচ্ছ কবিতারাশি। এভাবেই সবকিছু জমা হতে থাকল আমার সৃষ্টির গোলাঘরে। তবে একটি চরম সত্যি কথা দিনে দিনে জেনেছি, কবি হওয়ার তৃষ্ণা মানে, সুদীর্ঘ বন্ধুর এই যাত্রায় এ এক দুরারোগ্য ব্যাধি বৈকি। এই ব্যাধি নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় রোগিকে। যার কোনো চিকিৎসা নেই। আছে কেবল যন্ত্রণা। সেই রোগীর নামই কবি, পথ্য কি তাহলে ওই কবিতাই?
বইমেলা থেকে হেঁটে আসতে আসতে মনে পড়ল, তোর দূর গন্তব্য
একসঙ্গে বেশি দূর হবে না যাওয়া। তার চেয়ে এই ভালো
নেমে যাব বিবর্ণ ঘাসে, পথের পাশে। তোর জন্য রেখে যাচ্ছি
নতজানু কিছু। পাশের বাড়ির ছেলেটিকে সঙ্গে করে ফিরে আসিস কিন্তু

[শাহাবাগ থেকে বইমেলা/ নাভি ও নন্দন]

———————

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top