ফেদরিকো গার্সিয়া লোরকার পাঁচটি কবিতা অনুবাদ: স্বপঞ্জয় চৌধুরী

[ফেদরিকো গার্সিয়া লোরকা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্পেনীয় কবি ও নাট্যকার। তিনি ১৮৯৮ সালের ৫ জুন গ্রানাডার অদূরে ফুয়েন্ট ভ্যাকুয়েরস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। স্যাকরেড হার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্র পড়েন। ১৯১৯ সালে তাঁর প্রথম বই Impresiones y Viajes প্রকাশিত হয়। ১৯১৯ সালে গার্সিয়া লোরকা মাদ্রিদ ভ্রমণ করেন এবং সেখানেই তিনি ১৫ বছর থেকে যান। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর তিনি শিল্পকলা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। মাদ্রিদ থাকাকালীন ১৯২০ সালে তিনি লিখেন El Maleficio de la mariposa নাটক । ১৯২১ সালে তিনি লিখেন Libro de poemas বইটির মূল প্রাতিপাদ্য বিষয় স্পেনের লোকগাঁথা। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় তার গীতিকবিতার বই Romancero Gitano (“The Gypsy Ballads”), তার জীবদ্দশাতেই বইটি সাতবার পুনঃমুদ্রিত হয়েছে। ১৯২৯ সালে গার্সিয়া লোকরা নিউইয়র্কে আসেন। ১৯৩০ সালে লোরকা স্পেনে ফিরে আসলেন। ১৯৩৬ সালের গৃহযুদ্ধ বিরতির সময় ১৯ আগস্ট তিনি ফ্র্যাঙ্কুইস্ট সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হন, কিছুদিন জেলে থাকা পর সৈন্যরা লোরকাকে বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করেন,বুলেট দিয়ে ঝাঝরা করে দেয় তার শরীর। সেই থেকে আজ অবধি কেউ জানে না এই কালজয়ী মেধাবী কবি কোথায় শায়িত আছেন। তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, উইকিপিডিয়া]

কলহ

মধ্য গিরিখাতে
একটি স্বচ্ছ ধারালো ছুরি
শত্রুর রক্তে রঞ্জিত হয়ে
উজ্জ্বল মাছের মতো সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে,
একটি দূর্গম আলো যেন
তাসের চালের মতো দোল খাচ্ছে
আর উজ্জ্বল সবুজের বুকে মসীবর্ণ ছায়া ফেলছে
গিরিখাতে ডেকে যাচ্ছে যেন
ক্ষীপ্র অশ্বপাল আর অশ্বারোহীর রেখাচিত্র।
একটি জলপাই বৃক্ষের হৃদয় থেকে
ভেসে আসছে দুজন বৃদ্ধার আহাজারি,
ক্ষ্যাপা ষাড়টি গিরিখাতের প্রাচীর মাড়িয়ে উঠতে চাচ্ছে উপরে।
কালো দেবদূত বয়ে বেড়াচ্ছে শিশিরে ভেজা স্নিগ্ধ রূমাল ,
দেবদূত তার মস্তকায় ডানা ঝাপটাচ্ছে
সেই স্বচ্ছ ছুরির মতো।
স্কার্ফ পরিহিত এন্টিনিও
আর কিছু মৃত সুড়ঙ্গ দিয়ে পড়ছে গড়িয়ে নিচে
তার মৃতদেহটি মোড়ানো পদ্মফুলে
এবং কয়েকটি বেদানাফল ঝুলছে তার কপালের ওপরে
এখন সে অগ্নিকে মাড়িয়ে
হেঁটে যাবে মৃত্যুর পথ ধরে।

জলপাই বন পেরিয়ে এদিকেই আসছেন
একজন বিচারক তার সঙ্গে আছেন সাধারণ রক্ষী,
পিচ্ছিল রক্তবিন্দু টগবগ করে
গাইছে শব্দহীন শুনশান সর্প সঙ্গীত।
ভদ্র মহোদয়গণ ও সাধারণ রক্ষীরা
এখানেই থাকেন সব সময়।
এখানে আরো আছে চারজন মৃত রোমান
আর পাঁচজন রাখাল শ্রেণির যুবক,
বিকেল বেলায় গিরিপথ
উন্মাদ হয়ে ওঠে অসম্ভব কাল্পনিকতায়
সে নির্গত করে উত্তপ্ত কলকল বুদবুদ
অচেতন অশ্বারোহীদের উরুতে
আঘাত করে কতল করা হয়,
তারপর পশ্চিম দিকের বাতাসে ভর করে
দেবদূতেরা উড়ে যায়,
বাতাসে উড়ে বেড়ায় দেবদূতেদের দীর্ঘকায় চুলগুচ্ছ
আর চুলে মাখানো জলপাই তেলের হৃদয়।
(The Quarrel)

যাযাবর সন্ন্যাসিনী

চিরহরিৎ বনে বইছে শুনশান নীরবতা
বনের ফাঁক গলিয়ে পড়ছে সরু আলো।
লিকলিকে বৃক্ষের গা বের উঠে গেছে গুল্মবিশেষ
একজন যাযাবর সন্ন্যাসিনী সেই গুল্মের রঙিন ফুল
আর কিছু খড়কুটো দিয়ে আচ্ছাদিত করছে নিজেকে
ঝাড়বাতির মতো বহুমুখী আলো মাড়িয়ে
সাতটি রঙিন পাখি যাচ্ছে উড়ে দূরে।
গীর্জার পোষ্য শুকরগুলো একটু দূরে গিয়ে
উদোর উঁচু করে ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করছে।
কি মুগ্ধতা নিয়ে সে করছে সেলাই!
তার খড়কুটো আর রঙিন ফুলের পোশাক,
সে চাইছে তার পোশাকে উঠুক ফুলের নকশী বুনন
আর তার চোখে খেলা করুক কল্পনা।
কি সুন্দর সূর্যমুখী! কি সুন্দর ম্যাগনোলিয়ার
মুদ্রণ এবং রঙিন ফিতের কারুকাজ!
চাঁদের আলোয় প্রকৃতি তাকে দেখবে সজাগ দৃষ্টিতে!
রান্নাঘরের কাছে পাঁচটি জাম্বুরা ঝুলছে
খ্রীস্টের পাঁচটি সৌন্দর্য আর সব বৃক্ষরাজির মতো
পাচ্ছে শোভা আসবাবে।
সহসা সন্ন্যাসিনীর দৃষ্টি চলে যায়
বিদ্যুৎবেগে ধাবমান দুই অশ্বারোহীর দিকে
একটি শান্ত কলকাকলিতে মুগ্ধ আবহ
নিমিষেই লুটিয়ে গেল অন্তর্বাসের মতো
এবং তার অপলক দৃষ্টি পৌঁছেছে
মেঘ এবং পাহাড়ের গায়ে
একটি সীমাবদ্ধ দূরত্বে আটকে গেছে চোখ
থমকে গেছে তার হৃদয়ের শর্করা
এবং ভেঙে গেছে দর্ভ বিন্যাস।
হায় কি উচ্চ আশা ছিল
ওপরের বিংশ গ্রহপতির সাথে তার হবে দেখা!
কি এক অভাবিত কল্পনা বিছানো
ছিল তার চলমান নদীটির সাথে!
কিন্তু সে যাচ্ছে চলে ফুলেদের সঙ্গে করে
যখন তিনি দাঁড়িয়েছিল, তখন বইছিল মৃদুমন্দ বাতাস
উর্ধ্বে বসে জাফরির জানালা দিয়ে আলো যেন খেলছিল দাবা।

(The Gypsy Nun)


কালো দুঃখের কাব্যগাঁথা

ভোরবেলার আহারের জন্য মুরগীর ছানাগুলো
ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে করছে খনন মাটি,
তাদের পিতা মনটোয়া যখন
পাহাড়ের নিচে আধারের কাছে এলো
তার শরীরের পশমি আচ্ছাদন তাম্র বর্ণের হলো।
ঘোড়ার উটকো গন্ধ আর ছায়া দেখা যাচ্ছে
তার বক্ষ কামারখানার ধোয়াটে নেহাইয়ের মতো লাগছে
তাকে ঘিরে এক বৃত্তাকার মূর্ছনার আবহ তৈরি হয়েছে।
ওহে পিতা, কে তুমি একাকী
কী খুজছো এ বেলায়?
“আমি খুঁজছি,কার জন্যে খুঁজছি”
বল, এসব কি তোমার জন্য?
“আমি খুঁজতে এসেছি যা আমার খোঁজা প্রয়োজন
আমার সুখের জন্য এবং নিজের জন্য।”
পিতা আমি অনুতপ্ত
এই বলে ঘোটকী দৌড়ে চলে গেল
অবশেষে সে সাগরের দেখা পেল
এবং ঢকঢক করে গিলে খেল ঢেউ থেকে জল
ও সাগর আমাকে পিছু ডেকো না
তোমার বুকে চেপে থাকা কালো দুঃখ দেখাতে,
সবুজ জলপাইয়ের ভূমি থেকে আমি এসেছি
শুকনো পাতা ভেঙে ভেঙে
পিতা, কী দুঃখ তোমার!
এত দুঃখ, এত যাতনা!
তোমার চোখের জল গড়িয়ে পড়বে ঠোঁটে
অম্লময় লেবুর সুস্বাদে।
কী অসহনীয় দুঃখ! দৌড়ে পালালাম আমি
বাড়িকে পেছনে ফেলে উন্মাদিনীর মতো
আমার দুটো কোমল কবরী লুটিয়ে রয়েছে মেঝেতে
পাকশাল হতে শয়নকক্ষ অবধি
কি যাতনা! আমি দেখেছি আমার নকশী পরিচ্ছদ
এবং গোশতের সিদ্ধ হওয়া বাষ্পীয় ফিনকি।
ও আমার শনের ছোট্ট পোষাক!
হে আমার উরুর আফিম সুখ আজ কোথায়!
পিতা তোমার দেহ সিক্ত করো
ভরতপক্ষীর মতো ধাবমান জলে
এবং তোমার হৃদয় হোক শান্তিতে উচ্ছল, পিতা মনটোয়া।
নদীর কলতানকে পেছনে ফেলে
আকাশ এবং পাতাদের কাছ থেকে পালিয়ে এসে
যেনবা সে নতুন আলোর মুকুট পরেছে
কুমড়ো ফুলের সৌরভ মেখে গায়ে।
ও আমার দুঃখসিক্ত যাযাবর মন!
দুঃখ তুমিতো খাঁটি এবং সর্বদাই একা
তুমি গোধূলীবেলায় নদীর শয্যা
এবং দূরে থাকা একরাশ প্রভাতবেলা
(Ballad of the Black Sorrow)

বাকহীন ছোট্ট বালক

ছোট্ট বালকটি খুঁজে বেড়াচ্ছিল তার কণ্ঠস্বর
(যা আছে ঝিঁঝিঁ রাজার কব্জায়)
এক ফোটা জলের শব্দের ভেতর
ছোট্ট বালকটি খুঁজে বেড়াচ্ছিল তার কণ্ঠস্বর।

আমি কথা বলার জন্য চাচ্ছি না এ স্বর
আমি একে করে রাখবো আমার অঙ্গুরি
যা আমার ছোট্ট আঙুলকে আচ্ছাদিত করে
মিলিয়ে যাবে আমার নীরবতায়।

এক ফোটা জলের শব্দের ভেতর
ছোট বালকটি খুঁজে বেড়াচ্ছিল তার কণ্ঠস্বর।

বন্দী সে কণ্ঠস্বর, ভেসে চলেছে দূরে
যেনবা ঝিঁঝিঁর অঙ্গে জড়িয়ে আছে নীরব পরিচ্ছদে ।

(The Little Mute Boy)

রহস্যময় ঘুঘু
ক্লাউডিও গুইলিনকে নিবেদিত

চিরসবুজ বুনো জলপাই বৃক্ষের শাখায়
আমি দু’টো ঘুঘুকে দেখেছিলাম
একটি ছিল সূর্যের মতো তীব্র
অন্যটি ছিল চাঁদের মতো শীতল
ক্ষুদ্র প্রতিবেশের মতো আমি তাদের শুধাই
কোথায় আমার সমাধি-
সূর্যের মতো ঘুঘুটি বলল- এতো আমার পুচ্ছে
চাঁদের মতো ঘুঘুটি বলল- এতো লেগে আছে আমার গ্রীবায়।
আমার কটিদেশের চতুর্দিকে আচ্ছাদিত
বনভূমিকে আবর্তিত করে আমি হাঁটছিলাম
আমি দেখেছিলাম দুটো তুষারিত ঈগল
এবং একটি নগ্ন বালিকা
একটি প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল অন্যটি দ্বারা
এবং বালিকাটি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল
ছোট্ট ঈগলদের আমি শুধাই
কোথায় আমার সমাধি-
সূর্যের মতোটি বলল- এতো আমার পুচ্ছে
চাঁদের মতোটি বলল- এতো লেগে আছে আমার গ্রীবায়।
চিরসবুজ বুনো জলপাই বৃক্ষের শাখায়
আমি দুটো ঘুঘুকে দেখছিলাম
একটি প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল অন্যটি দ্বারা
অতঃপর তারা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

(Of the Dark Doves)

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top