পশু ও কীট সমাজের গল্প ।। রাহুল বিশ্বাস

মহামারী দিনের গল্প……

তালিকা

মহামারীর এই দিনে পশু সমাজের অধিপতি হাতিমশাই তার পা মালিশকারী ষাঁড়কে কড়া নির্দেশ দিলেন সনাক্ত নম্বরসহ গরিব ও দুঃস্থ মৃগ ও ছাগের তালিকা পাঁচদিনের মধ্যে তার হাতে হস্তান্তর করতে। নইলে তার পাছায় দুই লাথি, সাথে এক আছাড়। পশুপতির মোটা শরীরের স্তম্ভের মতো পায়ের লাথি আর মস্ত বড় শুঁড়ের আছাড়ের বিপদের কথা ভেবে ষাঁড় প্রায় পাগল হয়ে ল্যাজে পাক মেরে তিড়িং-বিড়িং ঠ্যাং ছুঁড়তে ছুঁড়তে চলল তার নিম্নপদস্থ প্রতিমন্ত্রী শূকরের নিকট। একদিন সময় হাতে রেখে প্রতিমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে সে নির্দেশ দিল যে তিনদিনের মধ্যে গরিব ও দুঃস্থদের তালিকা তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। অন্যথায় তার পাছায় চার লাথি, আর দুইবার দুই শিংয়ের গুতা তাকে হামেশায় সহ্য করতে হবে। ষাঁড় যার মল হাতে ডলাডলি-চ্যাপ্টাচ্যাপটি করে নামিদামি বেটিরা ঘুঁটে তৈরি করে, যা দিয়ে ঘরের জ্বালানীর চাহিদা মেটায়—চড়াদামে হাঁট-বাজারে বিক্রি পর্যন্ত হয়, সেথায় কিনা শুকরের গুর পাশ দিয়ে কেউ ভুলেও হাঁটার কথা ভাবে না; এই নিয়ে ষাঁড়ের গর্বের শেষ নেই। সে যাই হোক, শুকর সেও নিজের হাতে একদিন সময় রেখে নেড়ি কুত্তাকে নির্দেশ দিল একদিনের মধ্যে তার হাতে অসহায়দের তালিকাটা তুলে দিতে হবে। নইলে তার পোঙ্গার মধ্যিখানে ছয় লাথি, সাথে এলাকায় তার হোপাগিরি পুরাই ছুটে যাবে। লাথির ভয় নেড়ি কুত্তার নেই। দিনে সে কতো লাথি গুঁতা খায়! আর হোপাগিরি, বেইজ্জতির ভয় সেতো হামেশা কত মাদারি না তাকে দেখায়! যাইহোক, অর্থ সাহায্যের ব্যাপার স্যাপার! সেটা ভাবতেই নেড়ি কুত্তা দারুণ রোমাঞ্চিত। পথে তার সাথে একটা ছাগলের দেখা হল। হাড্ডিসার ছাগলটিকে সে বলল, ‘তোমার নাম কি হে?’
‘মটকা ছাগল।’
‘ওটা তো তোমার ডাক নাম। আসল মানে পুরো নামটা বল।’
‘মটকা ডেরাং ডুরাং খাটাশ খুটাশ।’
‘এতো বড় নাম! আমাদের নেড়ি কুত্তাদের মতো দুই-তিন শব্দে যেটা হয় তেমন করে বল?’
‘আপনের য্যামন পচোন্দ।’ নেড়ি কুত্তা তার নামটা নিজের মতো করে তালিকায় লিখে নেয়।
এরপর নেড়ি কুত্তা তাকে একশো জন ছাগলের নাম বলতে বলল। কিন্তু টেনেটুনে ত্রিশ জনের বেশি ছাগলের নাম মটকা বলতে পারলো না। শেষমেশ তাকে বানিয়ে বানিয়ে নাম বলতে বলা হল। মটকা ছিল তীব্র ক্ষুধার্ত।
‘কমু? কিন্তু কইলে হামারে কি দ্যাবেন?’ নেড়ি কুত্তা বুঝে ফেলল মটকার মটকা সত্যিই গরম আছে। এ জন্য হয়তো তার নাম মটকা—খাটাশ। আহা! ছাগদের নামের সাথে স্বভাবের কতো মিল!
‘দিমু নে। তোরে খুশি কইরা দিমুনে।’
সব মিলিয়ে একশো নাম উদ্ধার করার পর নেড়ি কুত্তা তার হাতে দশটা টাকা দিয়ে তাকে বিদায় জানালো। মটকা নেড়ি কুত্তাটির কাছে তাদের নাম জানতে চাইবার কারণ জিজ্ঞাসা করলে প্রত্যুত্তরে নেড়ি কুত্তা বলল, ‘সে কিছু না। তোদের সম্পর্কে একটু খোঁজ-খবর নেয়া। আর কি।’ মটকা ছিল ভীষণ রকমের ক্ষুধার্ত। দশটা টাকা পেয়ে সে মহাখুশি হল।
এবার নেড়ি কুত্তার আসল খেলাটা তবে শুরু। গরিব ও দুঃস্থদের সনাক্ত নম্বরের জায়গায় সে নিজের, তার বউ, ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা এদের নম্বরটা বসিয়ে দিল। তালিকাটি সঠিক সময়মতো হাতির মুল্লুকে পৌঁছে গেল।
এরপর কিছুদিন যেতে না যেতেই পতিতাদের নামের তালিকা করার দায়িত্ব একইভাবে নেড়ি কুত্তার হাতে বর্তালো। এবার আগের মতো রোমাঞ্চিত না হয়ে নেড়ি কুত্তা কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। কিন্তু তার সে ইতস্তত বোধকে সে বেশিক্ষণ পাত্তা দিল না। তালিকাটিতে একইভাবে সে তার পত্নী, মাতা ও কন্যাকে অগ্রাধিকার দিল।

চালের বস্তা

কি অদ্ভুত ব্যাপার! গরিব ও দুস্থদের জন্য বরাদ্দ ত্রাণের চালের বস্তা কিনা নদীতে ফেলানো রয়েছে। তাতে করে ত্রাণ বিতরণে দায়িত্বরত কর্তাবাবু শেয়াল বলল হয়তো ডাঙ্গায় এসে কুমির ব্যাটা এ অকামটি করেছে। এতে করে এলাকাবাসী কুমিরের উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হল। কেউ কেউ কুমির ব্যাটার প্রাণনাশের পরিকল্পনা পর্যন্ত এঁটে ফেলল। সন্ধ্যা রাতে একটা হাঁস মনের সুখে প্যাঁকপ্যাঁকানি শব্দে গান গাইতে গাইতে নদীতে চরে কিছুটা অলস ভঙ্গিতে ছোটখাটো মাছ ধরার চেষ্টায় ছিল। পেট তার প্রায় ভরাই ছিল। হঠাৎ করে তার নজর পড়ে নদীর কিনারার ঘুপচি রাস্তাটির উপর। সে দেখে কর্তাবাবু শেয়াল তার দলবল নিয়ে নদীতে একের পর এক চালের বস্তা ফেলছে। হাঁস বুঝতে পারলো এই তাহলে কর্তামশাইয়ের ধড়িবাজি। তল্লাশির ভয়ে কর্তা কিনা শেষমেশ এই কামটাই শুরু করল।

পরদিন থেকে হাঁসটার আর হদিশ পাওয়া গেল না।

মহামারী দিনের পূর্বের কিছু গল্প……

হৈ চৈ

যখন কিনা শুটকির হাট থেকে কয়েকটন শুটকি উধাও হলো ওমনিই বিভিন্ন মহলে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। সেই হৈ চৈ থামাতে ‘জাতীয় শুটকি রক্ষা কমিশন’ গঠন করা হল। কমিশন হতে শুটকি রক্ষার্থে বিড়ালদের কাছে শুটকিবাজারের চৌকিদারের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হল। কিছুদিন পর সে হৈ চৈ থেমে গেল। এরপর শুরু হলো নতুন ঝামেলা। একটা ফার্ম থেকে অনেকগুলো দেশি মুরগি নিখোঁজ হলো। আবারও একইভাবে বিভিন্ন মহলে কানাঘুষা, হৈ চৈ শুরু হলো। অনেকে প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন। সে মর্মে দেশি মুরগি উদ্ধারে শেয়ালের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। কিছুদিন পর যেন ঘটনাটা সবাই ভুলেই গেল। এরপর রাস্তার মধ্যে নিকন নামের এক নেড়ি কুকুরের পায়ের তলে পড়ে একটা পাতিহাঁসের বাচ্চা মারা গেল। আবারও চারদিকে হৈ চৈ রব উঠলো। এবার সেই পাতিহাঁসের বাচ্চার মৃত্যুর সঠিক কারণ অনুসন্ধান করতে চার সদস্য বিশিষ্ট ‘নেড়ি কুত্তা তদন্ত কমিটি’ গঠন করা হল। সেই তদন্ত কমিটিতে আবার নিকন নামের সেই নেড়ি কুত্তাটিকে অন্তভুক্ত করা হল। বিষয়টি চারদিকে যখন জানাজানি হল তখন বিভিন্ন জনকে তা নিয়ে প্রতিবাদের চাইতে হাসি ঠাট্টায় বেশি মশগুল হতে দেখা গেল। তারপর একসময় হঠাৎ করে মূঢ়গণের অধিক প্রিয় ও অধিক ক্রয়কৃত একটি কন্দবিশেষের দাম দশগুন বেড়ে গেল। কিন্তু তা নিয়ে কেউ আর প্রতিবাদ করলো না। সকলে কেবল তুমুল হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকলো।

শাস্তি

বনের ধূর্ত শেয়ালেরা সকলের কাছে জারে ঔরসজাত সন্তান বলেই পরিচিত ছিল। অবশ্য সেকথা কেউ সামনাসামনি বলতে সাহস পেতোনা। বোকা-সহজ-সরল গাধাটা ধূর্ত শেয়ালদের সেই নামে একদিন ডেকে ফেলল। পাশে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকা ধূর্ত শেয়ালরা তার সে কথা শুনতে পেল। পরিণামে ধূর্ত শেয়ালরা গাধাটাকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করল। হত্যাটাকে জায়েজ করতে হত্যাশেষে বলা হল শকুনের আদর্শের ধারণকৃত এক বিপথগামী গাধাকে হত্যা করা হয়েছে। যেখানে আদর্শগত কারণে শকুনদের হত্যা জায়েজ ছিল।
ভূখণ্ডের শেয়ালদের সত্যিকার আদর্শ ছিল ‘খাই খাই’। যদিও তারা মুখে বলতো তাদের মহান নেতার ‘হুক্কা হুয়া দিই’ তাদের একমাত্র আদর্শ।
একদিন এক গাধা হাঁটছিল জল পানের উদ্দেশ্যে। বালুময় ধূ ধূ প্রান্তর পেরিয়ে তবেই মিলবে নদী। তারপর কিনা গাধাটা মেটাতে পারবে তার জলের পিপাসা। গাধাটার তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। নদীটা তখন বিরাট খরস্রোতা নদী ছিল। পাড়ে মোটেও তখন বালু জন্মায়নি। এপার থেকে ওপার দেখতে গেলে চোখে ধাঁধাঁ লেগে যেত। তারপর নদীতে বাঁধ দেওয়া হল। তা দেখে নদীটার কান্না পেল। রাগে সে তার চোখ-পেট বুজতে শুরু করল। যাই হোক, গাধাটাকে জল পানের জন্য অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হলো। জল পান শেষে ফিরতে না ফিরতেই তার আবার জলের তেষ্টা পেল। গাধাটা তখন তার এহেন দশার কারণ স্বরূপ নদীর বাঁধটাকে দোষারোপ করতে লাগল। নদীটা শুকিয়ে মরা দশার অন্যতম কারণ ছিল অন্য ভূখন্ডের ঘোঁৎ ঘোঁৎ পশুদের সৃষ্ট বাঁধ। তার উপর আবার প্রতিদিন সে ভূখন্ডের ঘোঁৎ ঘোঁৎ বণিকরা তার পিঠে মালামাল দিয়ে ফ্রিতে সব সে রাজ্যে নিয়ে যায়। ফলে ঘোঁৎ ঘোঁৎ পশুদের কাজ সে আর করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করল। ধূর্ত শেয়ালরা গাধাটার প্রতিজ্ঞা শুনে ফেলল। তারপর তারা সমান তিন ঘণ্টা ধরে গাধাটাকে ইচ্ছেমত পেটাল। মুখ দিয়ে ফেনা তুলতে তুলতে গাধাটা একসময় মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করল। ধূর্ত শেয়ালরা এবারও সেই একই ফন্দি আঁটল। বলবে যে গাধাটা শকুনের আদর্শ লালন করতো। কিন্তু শেষমেশ তাদের সে কুমন্ত্র কাজে আসল না। সারা রাজ্যের সব পশুদের মাঝে ধূর্ত শেয়ালদের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের সে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেল। সকাল হতে না হতেই সকল গাধা, ছাগ, মেষ একত্রিত হয়ে গাধাহত্যার বিচার দাবি করল। শেয়াল পণ্ডিতকে উপায়ান্তর না পেয়ে তার পালিত সে শেয়ালগুলোকে খাঁচার মধ্যে ভরার নির্দেশ দিতে হলো। শেয়ালপণ্ডিত তার গদিতে বসে কাঁপছিল। পরে এই ভেবে স্বস্তি পেল যে পূর্বেও এমন ঘটনায় খাঁচাবন্দীর পরে শাস্তির বিধান হলেও আসলে শাস্তির ব্যাপারটা পুরোটাইতো তার হাতেই। শেয়ালপতি ক্ষমা বলে তাদের সুরক্ষা কে ঠেকাতে পারে?

কান নিয়ে গেল চিলে

সেনেগাল শুধু তাঁর স্বজাতি কুকুরদের নয়, সে ছিল সমস্ত পশু সমাজের অধিপতি। একদিন তাঁর পোষ মানানো এক কুকুরদের ইচ্ছে হলো কাচ্চি-বিরিয়ানিতো অনেক খাওয়া হলো, এখন খুব করে তাঁর শরীরের জন্য ফুর্তি দরকার। কিন্তু সুন্দরী রমণীর সাথে ফুর্তির জন্য অনেক অর্থের দরকার। তার হাতে তখন যৎসামান্য অর্থ। তখন তার কুকুরপতি বেনেগালের কথা মনে পড়ল। নতুন পাঠশালা নির্মাণের বাজেটের অর্থ এসেছে তাঁর হাতে। কুকুরপতি বেনেগালের কাছ থেকে ঠিকই তার অর্থের যোগান হল। কিন্তু এতো টাকা রাখার জন্য একটা ব্যাগ দরকার। চারদিক তাকাতাকি করে সে কোন ব্যাগের সন্ধান পেল না। এমতবস্থায় অন্যের নজর এড়াতে সে মুখে করেই সব টাকা নিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল। একটা দেশি মুরগি সেটা দেখে ফেলল। ঘটনাটা চারদিকে রটে গেল।
মহান অধিপতি সেনেগাল বেকায়দায় পড়লেন। এ বিষয়ে ফিসফাস করা পশুদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার দায়ভার তার উপর বর্তালো। তিনি তাঁর বক্তব্যে বললেন, ‘দেশি মুরগিরা ফার্মটাকে অশান্ত করতে চাইছে। ফার্মটাকে যারা অশান্ত করতে চাইছে প্রয়োজনে তাদের জ্যান্ত সিদ্ধ করে আস্ত কাবাব বানানো হবে। ওসব টাকা পয়সা কিছু না। সবই নৈরাজ্যবাদী মুরগীদের রটনা। গুজবে কেউ কান দিবেন না। কান দিলে কি হয় জানেনতো।’ অতীতে এমন ঘটনায় কান দেবার জন্য সেনেগালের পোষা চিলে তাদের অনেকের কান নিয়ে গেছে। তাই কানের কথা বলতেই সভায় উপস্থিত সকলে একবার তাদের কানে হাত দিয়ে সেটা জায়গামতো ঠিকঠাক আছে কিনা বুঝে নিল। অতীতে চিলে যাদের কান ছিঁড়ে নিয়ে গেছে তারা পুনরায় খুবই দুঃখিত হলো। যাদের কান এখনো রয়েছে তারা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করতে লাগল। অতঃপর তারা সেনেগালের কথার প্রত্যুত্তরে বলতে লাগলেন, ‘তা ঠিক বটে, তা ঠিক বটে।’ কিন্তু মনে মনে তারা সেনেগালকে ঠিকই বিদ্রুপ করতে লাগলেন।

কীট

শুঁয়া পোকাদের অবাধ চলাফেরা, বেপরোয়া, বেফাঁস কথাবার্তা বড্ড বেশি বেড়ে গিয়েছিলো। তাই কীটরাজ তাদেরকে মন্ত্রিসভা থেকে বিতাড়িত করে চেলে পোকা ও মাজরা পোকাদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করলেন। অনেকের অলক্ষে পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে মাজরা—চেলে পোকারা ধান-পাটের কান্ডের ভেতর মজ্জাতে প্রবেশ করে ফসলগুলোকে আক্রান্ত করতে থাকলো।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top