বাহাদুর শাহ জাফরের গজল ।। ভূমিকা ও ভাষান্তর- জাভেদ হুসেন


১.
পুরোনো ঢাকার লক্ষীবাজার। খুব ব্যস্ত এলাকা। এখানে আছে বাহাদুর শাহ জাফর পার্ক। অবশ্য এই নামে পার্কটি প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি এই পার্ক দাঁড় করানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ইংরেজদের ঘনিষ্ঠ নবাবের প্রশ্নই ছিল না শেষ মোগল সম্রাটের নামে কিছু করার।
পার্কের আগে এখানে ছিল ঢাকার আর্মানিদের ক্লাব। ইংরেজরা ক্লাব তুলে দেয়। পাশে ছিল একটা ময়দান। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ইংরেজরা প্রকাশ্যে এখানে ময়দানের গাছে সিপাহিদের ফাঁসি দেয়া হয়। এর পরের বছর একই জায়গায় ঢাকা বিভাগের কমিশনার একটা ঘোষণা পাঠ করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কো¤পানির শাসন শেষ। ভারতবর্ষ এখন রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনের অধীন। এখানেই গড়ে ওঠা পার্কের নামও ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৯৫৭ সালে বিদ্রোহের শতবর্ষ পূর্তিতে এর নাম হয় Ñ বাহাদুর শাহ পার্ক। পার্কে দুটো স্তম্ভ। বড়টা সিপাহীদের স্মৃতিতে। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর (১৭৭৫-১৮৬২) আমাদের খুব দুরের কেউ নন।

২.
ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার ধ্বসে পড়া রাজ্যগুলোর দরবারের ফারসি কবিদের আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছিল মোগল সাম্রাজ্য। সম্রাট, রাজপুত্র আর আমিরদের দরবারে তাদের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। শুধু বাদশাহ আকবরের আনুক‚ল্য পাওয়া উনষাট জন কবির নাম দিয়েছেন আবুল ফজল তাঁর ‘আইনে আকবরি’তে। আরো পাওয়া যায় পঞ্চাশ জন কবিরা নাম যারা পারস্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে আকবরের কাছে কবিতা পাঠাতেন সম্মান আর আর্থিক প্রণোদনার জন্য।
মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর নিজে ছিলেন ফারসি আর তুর্কি ভাষায় দক্ষ। হুমায়ুন নিজে জ্ঞানানুরাগী মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগত বিরাট পাঠাগার গড়ে তুলেছিলেন।
আকবর নিজে জ্ঞান আর সাহিত্য চর্চার অনুরাগী ছিলেন। তাঁর সময়ে রচিত হয় আকবর নামা, সুর সাগর, রামচরিতমানস। সম্রাট জাহাঙ্গীর সাহিত্যের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দরবারে ইওরোপের বিভিন্ন দেশের পন্ডিতরাও ভিড় জমাতেন। আওরঙ্গজেবের স্থানে যার বাদশাহ হওয়ার কথা সেই দারা শিকোহ ছিলেন বড় সাহিত্যিক, কবি, পন্ডিত ও সুফি সাধক। আওরঙ্গজেবের নিজের সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বালাই ছিল না। কিন্তু তাঁর নিজের কন্যা জেবুন্নিসা ছিলেন উঁচু দরের কবি। ফারসিতে লিখতেন মাখফি নামে। মাখফি মানে লুকোনো জন।
আকবর থেকে সু¯পষ্ট হয় ভারতের নিজস্ব ভাবনার সঙ্গে মোগল বিশ্বাসের সমন্বয়ের চেষ্টা। দারা শিকোহ হয়ে তাকে বহন করে নিয়ে গেছেন বাহাদুর শাহ জাফর। বাহাদুর শাহ ব্রজ ভাষাতে কবিতা লিখতেন। সেখানে তাঁর ভনিতাÑ শোখ। দিল্লির হোলি উৎসবে তাঁর লেখা এই গান খুব জনপ্রিয় ছিল:

আজ বহুদিন পর হাতে পেয়েছি তোমায়, যেতে দেব না
তোমার উত্তরীয় ধরে আটকে কৃষ্ণ হোলি খেলবো তোমার সাথে
(বহোত দিনন মেঁ হাথ লাগে হো ক্যায়সে জানে দেউঁ
আজ ম্যায় ফাগওয়া তা সও কানহা ফ্যায়তা পাকাড় কর লেউঁ)

৩.
সেই সময়েই উর্দু কবিতার স্বর্ণযুগ এল, যার অন্যতম সংগঠক কবি সম্রাট নিজে। তাঁকে ঘিরে মির্জা গালিব, মোমিন, যওক, আযুর্দা, শেফতা…কবিদের নক্ষত্রসভা। বাহাদুর শাহ জাফর নিজে নিবেদিত প্রাণ সুফি ভাবনার মানুষ ছিলেন। দিল্লিতে তাঁকে পীর বলে মানুষ গন্য করতো। সম্রাট হওয়ার আগে তিনি একজন দরিদ্র জ্ঞানি ও দরবেশের মতো জীবনযাপন করতেন।
জাফরের কবিতায় তাঁর কালের ভাবনার ছাপ স্পষ্ট ভাবেই ছিল। সুফিদের প্রেম ভাবনা এর প্রাণ। পরম সত্যের কাছে যাওয়ার নিশ্চিততম পথ এই প্রেম। সেই পরম সত্য কোন দূর অন্তরীক্ষে বাস করেন না। তিনি মানুষেরই হৃদয়ের গভীরে বাস করেন। হৃদয়ের এই জগত সুফি ভাবনার কেন্দ্রে আছে। মোগল আমলের শেষ যুগের কবিতারও কেন্দ্রেও এই হৃদয়ের জগতের আধিপত্য। বিশেষ করে গজল নামে গীতি কবিতায়। এখানে যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয় সে কখন দেবতা আর কখন প্রিয় তা ঠাহর করা দায়।
বাহাদুর শাহ নিজেকে ভারতবর্ষের সকল প্রজার রক্ষক ভাবতেন। সেই কারণে এই প্রথা উত্তীর্ণ হয়ে আসার সুফি ভাবনা তাঁর সকল বিশ্বাসের প্রজাদের আপন করে নিতে ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখতে পারত।
বাহাদুর শাহ জাফরের গজলে বারবার এসেছে খাঁচায় বন্দী পাখি, তার উড়ে যাওয়ার বাসনা। এগুলো উর্দু গজলের প্রিয় বিষয়। কিন্তু এর সঙ্গে তাঁর কবিতায় মানুষের স্বার্থপরতা, বিশ্বাসহীনতা, প্রিয়র গলির ধুলো হবার বাসনা, বৃথা সম্রাট হবার বাস্তবতার সঙ্গে ত‚লনা হয়ে আসে। তখন তাঁর কবিতা ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালীন পর্বের বয়ান হয়ে ওঠে।

৪.
বাহাদুর শাহকে কেবল ট্র্যাজিক রোমান্টিক এক কবি, বিশাল সাম্রাজ্যের করুণ শেষ সম্রাট হিসেবে দেখার মধ্যে গলদ আছে। তাঁর কিছু স্বপ্ন ছিল, লক্ষ্য ছিল। তিনি নিষ্ক্রিয় পরিণতি নিয়ে জীবন শেষ করেননি। তাঁর জীবনে বহু ট্র্যাজেডি ছিল। এও সত্য যে তিনি কবিতা আর সংগীতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন, রাজনীতিতে ততটা নন। তাঁর সম্রাট হওয়ার কথাও ছিল না। ১৮৩৭ সালে সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ মৃত্যুশয্যায়। ফারসি, উর্দু আর আওধি ভাষার কবি মির্জা আবু জাফর সিরাজুদ্দিন মুহাম্মদ ছিলেন কার্যত ইংরেজদের হাতে গৃহবন্দী। সবাই জানে, এরপর সম্রাট হবেন মির্জা জাহাঙ্গীর বখত। কিন্তু এর মধ্যেই মির্জা জাহাঙ্গীর বখত হঠাৎ দিল্লির ইংরেজ রেসিডেন্টকে আক্রমণ করলেন একদিন। ফলাফল তাঁর নির্বাসন। মির্জা আবু জাফর সিরাজুদ্দিন মুহাম্মদ সম্রাট হলেন, নামের সঙ্গে যুক্ত হলো বাহাদুর শাহ। এর আগেই মোগল সাম্রাজ্য আটকে পড়েছে দিল্লির দেয়ালঘেরা শহরের মাঝে, আছে শুধু সাম্রাজ্যের বিগত মহিমার স্মৃতির চাপ আর শূণ্য কোষাগার। সম্রাটের খরচ চলে ইংরেজদের বেঁধে দেওয়া মাসোহারায়।
১৮৫৭ সালের ১১ মে বিদ্রোহী সিপাহিরা দিল্লিতে প্রবেশ করল। এর আগে তারা মিরাটে ইংরেজ অফিসারকে হত্যা করেছে। পথে সব ইংরেজ অবস্থান গুঁড়িয়ে, যমুনা নদীর পারে টোলঘর পুড়িয়ে এসেছে। তারা ইংরেজদের মাসোহারাভোগী সম্রাটের কাছে নিবেদন করল তাদের নেতা হওয়ার আবেদন। ১৮৪২ সন থেকে যে রাজসিংহাসন দূর্গের মাটির নিচের ঘরে ফেলে রাখা ছিল তা আবার দিওয়ানে আম মানে সাধারণ সভাকক্ষে নিয়ে আসা হল। বাহাদুর শাহ সিপাহিদের আবেদনে রাজি হয়ে বিদ্রোহকে সারা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা দিলেন। সম্রাটের নামে মুদ্রাও চালু হলো।
কিস্তু পরের বছর ২৭ জানুয়ারি সম্রাটকে ইংরেজরা বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র আর হত্যার দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করলো। সিদ্ধান্ত হলো বাদশাহকে নির্বাসনে পাঠানো হবে। রাজপরিবারকে প্রথমে পাঠানো হলো এলাহাবাদে। এর পর কোলকাতায়। ১৮৫৮ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁদের নিয়ে কোলকাতার ডায়মন্ড হারবার থেকে মেগোরা নামের জাহাজে করে রেংগুনের পথে যাত্রা করা হয়। নীরবে সবার অজান্তে তাঁরা রেংগুনে নামেন ১০ ডিসেম্বর। তিনি যাতে কিছু লিখতে না পারেন, সেদিকে ইংরেজদের তীক্ষ নজর। যে প্রদীপ তাঁকে সন্ধ্যায় জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, তারই সলতের তলায় জমে ওঠা কালি দিয়ে তিনি দেয়ালে কবিতা লিখতেন। তবে সেই কবিতা কে কীভাবে ইংরেজদের চোখ এড়িয়ে ছড়িয়ে গেল, সে কথা আর জানা যায় না। সম্রাটকে কয়েদ করেও কবির যন্ত্রণা বন্দী করে রাখা সম্ভব হয়নি।

৫.
দ্বিতীয় আকবর শাহ, প্রথম বাহাদুর শাহ, দ্বিতীয় শাহ আলমÑ সবাই সমাধিস্ত হয়েছেন বখতিয়ার কাকির দরবারের পাশে। শেষ মোগল সম্রাটেরও ইচ্ছে ছিল সেই দেয়ালের ভেতরেই সমাধিস্ত হওয়ার। সেই স্থান শুন্য হয়ে রয়ে আছে আজও। সেখানে একটা শুন্য কবর দেখা যায়। এখানেই সম্রাটের সমাধি হওয়ার কথা ছিল। এই তাঁর “প্রিয়র গলির দুই গজ জমিন”।
ভারতবর্ষের শেষ সম্রাটকে সমাধিস্থ করা হয় রেংগুনে তাঁর শেষ আবাসের চৌহদ্দিতে। ১৯০৭ সালে ব্রিটিশরা একটা পাথরের ফলক বসায়। তাতে লেখা, “বাহাদুর শাহ, দিল্লির সাবেক রাজা। মৃত্যু রেংগুন নভেম্বর ৭, ১৮৬২। এই স্থানের কাছে সমাধিস্থ করা হয়”। কিন্তু সমাধির নির্দিষ্ট স্থান হারিয়ে যায়। স্থানীয়রা কেবল জানেন যে শেদাগন প্যাগোডার কাছে সম্রাটের সমাধি আছে।
এরপর কেটে গেছে বহুদিন। ১৯৯১ সালে ঐ জায়গাতে শ্রমিকরা ড্রেইন বানানোর জন্য মাটি খুঁড়ছিল। অকস্মাৎ বেড়িয়ে পড়ে পোড়া ইটের দেয়াল দেয়া এক কবর। ওপরে কিছু লেখা। সেই লেখা পড়ে জানা যায় এ কার সমাধি। এবার নতুন করে গড়ে ওঠে দরগাহ। ১৯৯৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর সেই স্থান দর্শণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। স্থানীয়দের কাছে শেষ মোগল সম্রাটের সমাধি হয়ে ওঠে – সম্রাট দরবেশের দরগাহ।
(সংক্ষেপিত)
—————————

হামেঁ রোনে সে তু কিউঁ রোকতা হ্যায় দমবাদম নাসেহ
তুঝে কেয়া হাম হ্যায় আশকে খুঁ বাহাতে আপনি আঁখো সে

(বার বার কাঁদায় বাধা দাও কেন আমায় হে উপদেশক
তোমার কী, রক্তঅশ্রু বহাই সে তো আমার চোখ হতে)


জাফর গিরিয়া হামারা কুছ না কুছ তাসির রাখতা হ্যায়
উনহে হাম দেখতে হ্যায় মুসকুরাতে আপনি আঁখো সে

(জাফর এই কান্না আমার একেবারে ব্যর্থ তো নয়
তাকে হাসতে দেখি আমার কান্নায় নিজের চোখে)


হ্যায় কুছ সবব কি আব তলক আয়ি নেহিঁ আযল
য়া তো আভি চলি নেহিঁ য়া চল কে থাম গ্যায়ি

(এখনো এলো না মৃত্যু আছে নিশ্চয়ই কোন কারণ
হয়তো রওনা হয়নি নয়তো হয়ে থেমে গেল)


উড়কর পহুঁচতি কুচে মেঁ উসকে হামারি খাক
পর কেয়া করে জাফর কি হাওয়া চল কে থাম গ্যায়ি

(তার গলিতে পৌঁছত জানি উড়ে আমার ধুলো
কিন্তু করি কী জাফর, হাওয়া যে চলে থেমে গেল)


হামসে তু কিস ওয়াস্তে খামরু হ্যায় এয় আবরুয়ে য়ার
আপনি গর্দান খাম তহে শামশির হামনে কি তো হ্যায়

(ক্রুদ্ধ কেন আমার ওপর হে প্রিয়র বাঁকা ভুরু
তলোয়ারের নিচে নিজ মাথা ঝুঁকিয়েছি তো আমি)


জায়ে মু নিকলে হ্যায় তন সে ইক সদায়ে দর্দনাক
বন গ্যায়া হর ইস্তখাঁ বেজিস্ম সারা ইশক হ্যায়

(শরীরের প্রতি রোমকুপ হতে এলো বেদনার্ত ডাক
শরীরে অস্থি নেই এখন আর, পুরোটাই প্রেম)


সর্দ মেহরি পর জাফর তুম ইশক কি মাত জাইও
রাখতা ইস সরদি মে আতিশ কা শারারা ইশক হ্যায়

(প্রেমের নির্দয়তায় তুমি ধোঁকা খেও না জাফর
এই শীতলতার আড়ালে আগুনের ফুলকি রাখে প্রেম)


মুহাব্বত চাহিয়ে বাহম হামেঁ ভি হো তুমহে ভি হো
খুশি হো ইস মেঁ য়া গম হামেঁ ভি হো তুমহে ভি হো

(ভালবাসা চাই পরস্পর, আমারও হোক তোমারও
প্রেমে দুঃখ হোক কি আনন্দ, আমারও হোক তোমারও)


য়ে দিল হি থা নাদাঁ কি তেরি যুলফ সে উলঝা
য়ুঁ আপনে লিয়ে খার না বোতা কোয়ি হোতা

(এই হৃদয়ই অবুঝ তোমার কেশের জালে জড়ালো
এমন নিজের জন্য কাঁটা বুনতো না অন্য কেউ হলে)

১০
তানহায়ি মেঁ ইতনা তো না ঘাবরাতা জাফর ম্যায়
দিল গর্চে মেরে পাস না হোতা কোয়ি হোতা

(নিঃসঙ্গতায় এমন অস্থির হতাম না জাফর আমি
হৃদয় না হোক সঙ্গী আমার অন্য কেউ হলে)

১১
আব্র মিজগাঁ সে বাঁধে জিস তরহে আশকোঁ কি ঝড়ি
ইস তরহে সে কব ঘটা কোয়ি বরসতি অওর হ্যায়

(মেঘের মতো চোখের পলকে জমে অশ্রুর সারি
তেমন কবে বর্ষেছে? সে মেঘ জেনো অন্য রকম)

১২
নিম গমজা পর তেরে হাম বেচতে হ্যায় আপনা দিল
ইসসে ভি কোয়ি যিয়াদা জিনস সস্তি অওর হ্যায়

(তোমার আধো ইশারাতেই বেচে দিই হৃদয় আমার
এর চেয়ে সস্তা কিছু থাকলে সে জিনিস অন্য রকম)

১৩
মেরে দম তক হ্যাঁয় তেরা এয় দিলে বিমার ইলাজ
কোয়ি করনে কা নেহিঁ তেরি দাওয়া মেরে বাদ

(আমি আছি যতক্ষণ আছে তোমার নিদান হে রুগ্ন হৃদয়
আর কেউ করবে না চিকিৎসা তোমার আমার পরে)

১৪
কব হুজুমে গম সে মেরি জান ঘাবরাতি নেহিঁ
ম্যায় তো মর জাউঁ করুঁ পর কেয়া কি মওত আতি নেহিঁ

(অস্থির হয় না বেদনার ভীড়ে প্রাণ এমন তো ক্ষণ নেই
মরে তো যেতেই চাই, কী করি, মৃত্যু যে আসে না)

১৫
করুঁ কেয়া য়াদে যুলফে দিলবরে জানি নেহিঁ জাতি
নেহিঁ জাতি মেরে দিল কি পরেশানি নেহিঁ জাতি

(কী করি! প্রিয়র কেশরাজির স্মৃতি আজও যায় না কিছুতেই
যায় না আমার হৃদয়ের অস্থিরতা, যায় না কিছুতেই)

১৬
করুঁ খত মেঁ কেয়া হালে ত্যাহরির প্যাহলে
ওয়াহাঁ চাকে খত কি হ্যায় তদবির প্যাহলে

(চিঠিতে আমার হাল আগে লিখে কী হবে!
সেখানে পড়ার আগেই চিঠি টুকরো করা হয়)

১৭
তুমহারে হুস্ন কে কুচে মেঁ লে কে কাসায়ে চশম
বাগওর দেখিয়ে করতা হুঁ ম্যায় গদায়ি আজ

(তোমার সৌন্দর্যের গলিতে নিয়ে এই চোখের ভিক্ষাপাত্র
ভালো করে দেখ, ভিক্ষাবৃত্তি করছি আমি আজ)

১৮
কিসি কো হামনে য়াঁ আপনা না পায়া
জিসে পায়া উসে বেগানা পায়া

(কাউকে এখানে আপন পেলাম না
যাকে পাই, সেই দেখি পর)

১৯
কাহাঁ ঢুন্ডা উসে কিস জা না পায়া
কোয়ি পর ডুন্ডনেওয়ালা না পায়া

(কোথায় না খুঁজেছি, কোথায় পাইনি তাকে
শুধু যে খোঁজে, এমন কাউকে পাইনি আমি)

২০
কেয়া কহুঁ তুমনে মুঝসে ক্যায়সি কি
জি হি জানে হ্যায় মেরা জ্যায়সি কি

(কী বলি, আমার সাথে তুমি করেছ কেমন
আমার মনই জানে শুধু করেছ যেমন)

২১
কিউকি হাম দুমিয়া মেঁ আয়ে কুছ সবব খুলতা নেহিঁ
ইক সবব কেয়া ভেদ ওয়াঁ কা সব কা সব খুলতা নেহিঁ

(কেন এলাম পৃথিবীতে কোন কারণ বুঝি না
কারন নয় শুধু সেখানের কোন রহস্য বুঝি না)

২২
শাহিদে মকসুদ তক পহুচেংগে কিউঁকর দেখিয়ে
বন্দ হ্যায় বাবে তামান্না হ্যায় গযব খুলতা নেহিঁ

(দেখো, কী করে পৌঁছই গন্তব্যের অভিপ্রায়ে
বাসনার দুয়ার বন্ধ, সে সর্বনাশা কিছুতেই খোলে না)

২৩
হাযারোঁ তরহ কে হ্যাঁয় পেঁচ উসকি যুলফে প্যাচাঁ মেঁ
বানায়ি হ্যায় কিসি সান্নাআ নে যনজির মুশকিল সে

(তার কেশের কুঞ্চিত পথে কত সহস্র যে জটিলতা
কি জানি কোন কারিগর বানালো এ শেকল বড় কষ্টে)

২৪
নযর আতা হ্যায় প্যাহলু মুঝকো খালি
দিলে গুমগশতা না জানে কাহাঁ হ্যায়

(তাকিয়ে দেখি বুকের ভেতর যে ফাঁকা
কোথায় আছে নিখোঁজ হৃদয় কে জানে)

২৫
মেরে নালোঁ সে হ্যায় শাব কা জিগার চাক
ফলক পর য়ে জো খত এ ক্যাহকাশাঁ হ্যায়

(আমার হাহাকারে রাতের হৃদয় দীর্ণ হয়
আকাশে নক্ষত্রের কেয়ারি বলো যাকে)

২৬
জাফর ইস মেঁ সামঝকর পাওঁ রাখনা
মুহাব্বর ইক ব্যাহরে বেকারাঁ হ্যায়

(জাফর, এখানে সাবধানে রেখো পা
প্রেম, সে তো এক অস্থির সমুদ্র)

২৭
জব কি রোতে হুয়ে আ জায়েঙ্গে হাম
বযম মেঁ সব কো রুলা জায়েঙ্গে হাম

(যখন কাঁদতে কাঁদতে চলে আসবো আমি
আসরে সবাইকে কাঁদিয়ে যাব আমি)

২৮
কওন জা সাকতে হ্যাঁয় উসকে কুচে মেঁ
য়া তো দিল জায়েগা য়া জায়েঙ্গে হাম

(তার গলিতে যে কেউ কি পারে যেতে
যাবে হৃদয় আর নয় তো যাব আমি)

২৯
দর্দে সর ইতনা কাভি দেংগে তুমহে
দর্দে দিল আপনা সুনা জায়েঙ্গে হাম

(এটুকু কষ্ট কোন দিন দেবো তোমায়
হৃদয় বেদনা নিজের শুনিয়ে যাব আমি)

৩০
মেরি চশম মেঁ কেয়া হ্যায় তেরা তাসাব্বুর
মেরে দিল মেঁ কেয়া হ্যায় তেরি আরযু হ্যায়

(আমার চোখ তোমার ধ্যান ছাড়া আর কী
আমার হৃদয়ে আছে বাসনা, যার নাম তুমি)

৩১
জো তামাশা দেখনে দুনিয়া মেঁ থে আয়ে হুয়ে
কুছ না দেখা ফির চলে আখির ও পছতায়ে হুয়ে

(যে দৃশ্য দেখবো বলে এসেছিলাম পৃথিবীতে
না দেখে কিছু শেষে ফিরে চললাম অনুতাপে)

৩২
কদম কিঁউকর ব্যাহরে মুহাব্বত মেঁ ডালে
কি হর মৌজ মৌজে খতর দেখতে হ্যায়

(কী করে প্রেমের সমুদ্রে রাখি পা
প্রতি ঢেউয়ে যে সর্বনাশের ঢেউ দেখতে পাই)

৩৩
তু জো নাআশনা হুয়া হামসে
য়ে গুনাহ হ্যায় কি আশনা হ্যায় হাম

(তুমি যে এমন অপরিচিত হলে আমার
তোমাকে চিনি এই তো অপরাধ করেছি আমি)

৩৪
করো ইশকবাযি জাফর তুম সামঝকর
য়ে হ্যায় কাম মুশকিল না আসান সামঝো

(প্রেমের খেলা খেলো জাফর বুঝে শুনে
এ বড় কঠিন কাজ, সহজ ভেবো না)

৩৫
দ্যায়র ও কাবা মেঁ ঢুড়তা হ্যায় কেয়া
দেখ দিল মেঁ কি বস য়েহি কুছ হ্যায়

(মন্দির আর কাবায় কী খোঁজো
হৃদয়ে দেখ, এখানেই কিছু আছে)

৩৬
ব্যাহরে গম মেঁ দস্তো পা ইক উম্র মারে জায়েঙ্গে
ইস কিনারে সে কাহিঁ জব উস কিনারে জায়েঙ্গে

(দুঃখের সমুদ্রে এক জীবন সাঁতার কেটে যেতে হবে
এই কিনারা হতে যখন ঐ কিনারায় যেতে হবে)

৩৭
মেরা দিল তু নে কিউঁ ছোড়া তেরা ঘর তো ইস জা থা
মাকাঁ পর্দে কা এয় পর্দানশিঁ গর থা তো ইস জা থা

(আমার হৃদয় ছেড়ে গেলে কেন, তোমার ঘর তো এখানেই ছিল
ওগো অন্তরালবাসি, অন্তরালে থাকলে ঘর সে তো এখানেই ছিল)

৩৮
উঠায়া এয় ফলক কিউঁ তু নে হামকো কুয়ে জানাঁ সে
মুনাসিব খাকসারোঁ কে জো বিস্তর থা তো ইস জা থা

(হে ভাগ্য, কেন উঠিয়ে নিয়ে এলে আমাকে প্রিয়র গলি হতে
এই অধমের কোন শয্যা থাকলে উপযুক্ত সে তো এখানেই ছিল)

৩৯
ইন হসরতোঁ সে কহো কাহিঁ অওর জা বসে
ইতনি জাগা কাহাঁ হ্যায় দিলে দাগদার মেঁ

(এই বাসনাদের বলে দাও ঠাঁই অন্য কোথাও নিক
স্থান কোথায় এত এই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে)

৪০
উমরে দারায মাংগ কে লায়ে থে চার দিন
দো আরযু মেঁ কাট গ্যায়ে দো ইন্তেযার মেঁ

(দীর্ঘ আয়ু চেয়ে এনেছিলাম মাত্র চার দিনের
দু’দিন কাটলো আকাঙ্খায় দু’দিন অপেক্ষাতে)

৪১
হ্যাঁয় ইতনা বদনসিন জাফর দাফন কে লিয়ে
দো গয যমিন ভি না মিলি কুয়ে য়ার মেঁ

(এমন হতভাগ্য জাফর সমাধি নেবে বলে
দুই গজ জমিনও পেলো না প্রিয়র গলি মাঝে)

৪২
এয় জাফর দম কি হ্যাঁয় জো আমদ ও শুদ
হ্যাঁয় ইসে হসতি ও আদম ক্যাহতে

(ও জাফর, এই যে নিঃশ্বাসের শুধু আসা-যাওয়া
একেই জীবন আর মৃত্যু বলি তাকে)

৪৩
কোয়ি গুনচা খিলা কি বুলবুল কো
বেকলি যেরে দাম হোতি হ্যায়

(কোন কলি ফুটেছে নইলে বুলবুল
কেন ফাঁদের তলে অস্থির হয়ে আছে)

৪৪
আব কি জো রাহে মুহাব্বত মেঁ উঠায়ি তকলিফ
সখত হোতি হামেঁ মনযিল কাভি এয়সি তো না থি

(প্রেমের পথে এবার যে পেয়েছি কষ্ট বন্ধুরতার
গন্তব্য আমার আগে এত কঠিন কখনও তো ছিল না)

৪৫
না থা শেহর দেহলি য়ে থা চমন কহো কিস তারাহ কা থা য়াঁ আমন
জো খিতাব থা ও মিটা দিয়া ফকত আব তো উজড়া দায়ার হ্যায়

(দিল্লি শহর নয় ছিল ফুলবাগান, বলো, কেমন শান্তি ছিল এখানে
যত উপাধি ধ্বংস হয়েছে চিহ্ন তার, রয়েছে শুধু ধ্বংসস্তুপ)

৪৬
হাম নে তেরি খাতির সে দিলে যার ভি ছোড়া
তু ভি না হুয়া য়ার অওর ইক য়ার ভি ছোড়া

(তোমার জন্য আমি উৎপীড়িত হৃদয় ছেড়েছি
তুমিও বন্ধু হলে না আর সব বন্ধুকে ছেড়েছি)

৪৭
রনয ও তাব মুসিবত ও গম য়াস ও দর্দ ও দাঘ
আহ ও ফুগাঁ রফিক হ্যাঁয় য়ে দিল কে চার পাঁচ

(দুঃখ ও ধৈর্য, বিপদ ও বেদনা, হতাশা, কষ্ট ও ক্ষত
দীর্ঘশ্বাস ও হাহাকার এই কয়েকজন আছে বন্ধু হৃদয়ের)

৪৮
গর আনজুমে ফলক সে ভি তাদাদ কিজিয়ে
নিকলে যিয়াদা দাগ মেরে দিল কে চার পাঁচ

(আকাশের নক্ষত্রের সঙ্গেও যদি মিলিয়ে দেখ
আমার বুকের ক্ষত কয়েকটা বেশি পাওয়া যাবে)

৪৯
হোতে হোতে চশম সে আজ আশকবারি র‌্যাহ গ্যায়ি
আবরু বারে তেরি আব্রে বাহারি র‌্যাহ গ্যায়ি

(ঝরতে গিয়েও চোখ থেকে আজ অশ্রু থেমে গেল
ওগো বসন্তের মেঘ তোমার ভাগ্যিস সম্মান রক্ষা হলো)

৫০
আও গর আনা হ্যায় কিউঁ গিন গিন কে রাখতে হো কদম
অওর কোয়ি দম কি হ্যায় য়াঁ দমশুমারি র‌্যাহ গ্যায়ি

(আসবে যদি এসো, কেন গুণে গুণে রাখো পা
নেবার জন্য আর যে অল্প কয়েক নিঃশ^াসই বাকি আছে)

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top