রিক্লেইমিং আইডেনটিটি – আসামের মিঞা কবিতান্দোলন // মাজহার জীবন

কারা মিঞা

বৃটিশ আমলে বেঙ্গল প্রভিন্স বা ইস্টবেঙল পরবর্তীতে পূর্ববঙ্গ থেকে আসামে বসবাসকারী চর অঞ্চলের মুসলমানরা মিঞা নামে পরিচিত। এরা মূলত নামনি আসামের ব্রহ্মপুত্র বেসিনের চরচাপারি এলাকার কৃষিজীবী যাদের অধিকাংশ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছেন। ব্রহ্মপুত্রের কারণে বন্যা এ অঞ্চলের মানুষের নিত্য সঙ্গী। এদের সংখ্যা প্রায় ৬৪ লাখ যা রাজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ। তারা বাস করছেন মূলত: ব্রহ্মপুত্র বেসিনের বড়পেটা, ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, কামরূপ, নগাঁও, হোজাই, দরাং, চিরাং, কোকরাঝাড় দক্ষিণ সালমারা, নলবাড়ি, মরিগাঁও, বঙ্গাইগাও প্রভৃতি জেলায়। মিঞা ছাড়াও এরা অঞ্চলভেদে শেখ, ভাটিয়া, ময়মনসিংগিয়া, ন-অসমীয়া, পমুয়া মুসলমান, চরুয়া মুসলমান নামেও পরিচিত। তবে কাল পরিক্রমায় এরা এখন মিঞা নামেই অধিক পরিচিত। এদের দারিদ্র আর শিক্ষার গড় হার আসাম ও সর্বভারতীয়র তুলনায় কম।

https://www.youtube.com/watch?v=KUyhrxnWw-I

মিঞা নামের সংকট

মিঞা একটি উর্দু শব্দ যার অর্থ ভদ্রলোক। কিন্তু আসামে এ শব্দটি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য অপমানসূচক হিসেবেই পরিচিতি। আসামের অপরাপর জাতিগোষ্ঠী, ধর্মের লোকজন মিঞা মুসলমানদের ব্যঙ্গাত্মক অর্থে এ শব্দ ব্যবহার করে। তাদের কাছে মিঞা মানে পূর্ববাংলা মূলের মুসলমান – নিজ গ্রামে কৃষিজীবী আর শহরে এরা রিক্সা চালায়, সব্জি বেচে বা কামলা খাটে। আর উগ্র জাতীয়তাবাদীদের কাছে এরা বাংলাদেশী। লুঙ্গি পরা মুখে দাঁড়িওয়ালা পুরুষ আর অতিরঙা শাড়ি পরা দারিদ্রপীড়িত নারী মুসলমানের প্রতীক মিঞারা। জাতিবিদ্বেষ এদের আজন্ম সাথী। ফলে তারা জন্ম-জন্মান্তর বৈষম্যের শিকার।

কিঞ্চিত আসামের ইতিহাস দেখা

বর্তমান আসামের আয়তন ৭৮ হাজার ৪৩৮ বর্গ কিলোমিটার। কিন্তু ভূ-রাজনীতিতে আসামের চিত্র বারবার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে জনমিতি ও জনসংখ্যাও বারবার পাল্টেছে। ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা তিন কোটি ১২ লাখের মতো। মুঘলরা বারবার চেষ্টা করেও পুরো আসামকে বশে আনতে পারেনি কখনই যদিও তারা আংশিক শাসন করতে পেরেছে। সুমনা রহমান চৌধুরীর ‘মিঞা কবিতা-কবিতার মশাল’ প্রবন্ধ আর আলতাফ পারভেজের ‘মিঞা অসমিয়া এনআরসি’ গ্রন্থের বরাত দিয়ে বলা যায়, ১৭৬৫ সালে ইংরেজদের অধীনে আসে করিমগঞ্জ, ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বঙ্গাইগাও, কোকরাঝাড় এবং চিরাং জেলার কিছু অংশ যা করিমগঞ্জকে বাদ দিয়ে অবিভক্ত বাংলার রংপুর জেলার সাথে একত্রিত করা হয়। আর ১৮২৬ সালে বার্মার রাজার সাথে ইয়ান্ডাবু চুক্তির মাধ্যমে আসাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চলে আসে। ১৮৬৭ সালে নয়া গোয়ালপাড়া জেলাকে কোচবিহারের সাথে যুক্ত করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ১৫৬২ সাল পর্যন্ত কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলা ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৮৭৪ সালে সিলেট, কাছাড়, গোয়ালপাড়া – তিনটি বাংলাভাষী জেলাকে ঢাকা ডিভিশন থেকে কেটে এনে আসামের সাথে যোগ করা হয়। এবং এর ফলেই আসামে বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠে আর মুসলমানদের সংখ্যায় দিন দিন বেড়ে গিয়ে ২৮.৮ শতাংশে উঠে আসে। ১৮৩৮ সালে আসাম বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভূক্ত হয় আর ১৮৭৪ সালে শিলংকে রাজধানী করে আবার তাকে পৃথক সত্তা দেয়া হয়। ১৯০৫ থেকে ১৯১২ পূর্ব বাংলা এবং আসাম এক প্রদেশ ছিল- এই সময়ে দু এলাকার মানুষের মধ্যেই প্রশাসনিক, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি কারণে যাতায়াত বেড়ে যায়। ১৯৪৭ সালে সিলেট জেলা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হলে প্রায় তিন লাখ চাশ্রমিক যাদের অধিকাংশ হিন্দু আসামে চলে যায়। অনেক অবস্থাপন্ন হিন্দু পরিবারও সিলেট ছেড়ে আসামে চলে যায়। এর সাথে যোগ হয় যখন ইংরেজরা আসামে চা শিল্পের বিকাশ ঘটায়। ওডিশা, বিহার আর ছত্রিশগড় থেকে চা বাগিচার শ্রমিকরা আসামে আসে যাদের সংখ্যা আসামের বর্তমান মোট জনসংখ্যার ১৫-১৬ শতাংশ।

উপরের আলোচনাটার একটাই উদ্দেশ্য, আসামে নানাভাবে ঔপনেবেশিক এমনকি তারও আগ থেকে আসাম ভৌগলিক ও জাতিগত ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে গেছে। আর আসামের অসমীয়া জাতিসত্তার ধারনা একটি কলোনিয়াল কন্সট্রাক্ট যেখানে জাতিগত বৈচিত্রকে নানাভাবে অস্বীকার করা হয়েছে যেমনটা উপমহাদেশের অন্যান্য এলাকাতেও প্রবল উপস্থিতি দেখা যায়।

মুসলমানদের উপর সিসটেমেটিক বৈষম্য

একদিকে মুসলমান আর অন্য দিকে ‘বিদেশী’ তকমার কারণে বাহ্যত মিঞারা ‘সেকেন্ড ক্লাস’ নাগরিক – হয়ে পড়েছে নিজভূমে পরবাসী তথা ‘অপরজন’। আসামে ‘বিদেশী খেদাও’ আন্দোলন যা মূলত মিঞা মুসলমান বিরোধী কর্মকাণ্ডের ভিত্তি ১৯৭৯ সাল বলা যেতে পারে। বিদেশীর নামে মিঞা মুসলমান দমনের সশস্ত্র বহিঃপ্রকাশ নেলি হত্যাকাণ্ড। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার নেলি এলাকার ১৪টি গ্রামে একযোগে হামলা চালিয়ে নারী ও শিশুসহ নির্বিচারে হত্যা করা হয় প্রায় ৫ হাজার জনকে পুলিশের বিনা বাধায়। যদিও সরকার ১ হাজার ৮১৯ জনের কথা স্বীকার করে। এ হত্যাকাণ্ডের আজও সুরাহা করতে পারেনি সে দেশের আইন আদালত।

তবে আসামে জাতিগত বৈষম্যের ভিত্তি আরো পাকাপোক্ত হয় রাজিব গান্ধি সরকারের আমলে ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট দিল্লীতে সাক্ষরিত আসামচুক্তির মাধ্যমে। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর এ চুক্তির মাধ্যমে আসামে ‘অবৈধ অভিবাসী’দের আসাম থেকে বের করে দেয়ার অঙ্গীকার করা হয় যা মূল টার্গেট ছিল মিঞা মুসলিমরা।

এরই ধারাবাহিকতায় সিস্টেমেটিক রাষ্ট্রীয় বৈরিতার একটা উদাহরণ হতে পারে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল কোর্ট। সন্দেহভাজনদের নিয়ে যাওয়া হয় ‘ডিটেনশন ক্যাম্পে’। ভারতীয় হয়েও এসব ক্যাম্পে অবস্থান করার মানসিক চাপ সহ্য করতে না পারায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

https://www.youtube.com/watch?v=d8vQ3elEZUQ&list=TLPQMDIwOTIwMjCxjc_iNXZpvw&index=1

একটু অন্য বিষয়ের উল্লেখ করি, ১৯৬১ সালে আসাম সরকার সমগ্র আসামে অসমীয়াকে রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা ঘোষণার পর বাংলা ভাষা রক্ষায় বাঙালীরা এর প্রতিবাদ করলে ১৯ মে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ১১ জন। পরে বরাক ভ্যালির দাপ্তরিক ভাষা বাংলা স্বীকৃতি পায়। অথচ ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত আসামের সরকারি ভাষা ছিল বাংলা। এদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীরা অসমীয়া ভাষাকে বাংলা ভাষারই উপভাষা মনে করতেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, বঙ্গ-কামরূপী ভাষার দুটি শাখা হলো বাংলা এবং অসমীয়া।

মওলানা ভাসানী প্রসঙ্গ

পুরোটাই অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখি, আসামের প্রসঙ্গ আসলেই বাংলাদেশের মানুষের মানসপটে ভেসে আসে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর চেহারা। তিনি সেখানে কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। গড়ে তোলেন ‘আসাম চাষী মজুর সমিতি’। রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের কারণেই ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভায় নির্বাচিত হন তিনি। তিনিই সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি এই সভায় বাংলায় বক্তৃতা করতেন। বলাবাহুল্য, আসামের জাতিবিদ্বেষী রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনিই আন্দোলন গড়ে তোলেন।

মিঞা কবিতান্দোলন

উপরোক্ত প্রেক্ষিতে নিজেদের আইডেন্টিটি আর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং তাদের প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক মূর্ত প্রতিবাদ মিঞা কবিতা আন্দোলন। প্রক্রিয়াটি শুরু হয় হাফিজ আহমেদের “লেখো আমি মিঞা” কবিতাটির মাধ্যমে যেটি তিনি ২০১৬ সালে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। কবিতাটির সাথে প্যালেস্টাইনের কবি মাহমুদ দারবিশের ‘আইডেনটিটি কার্ড’ কবিতার সাথে মিল পাওয়া যাবে। ভারতে নাগরিকপঞ্জি নিয়ে আসামের বাঙালী মুসলমানেরা যে ভীতি, অনিশ্চয়তার আর নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল সে প্রেক্ষিতে এ কবিতাটা লেখা। শুরুটা এভাবে:
“লিখে নাও
আমি একজন মিঞা’
নাগরিকপঞ্চিতে আমার নম্বর ২০০৫৪৩”

এর সাথে একে একে যোগ হতে থাকেন কাজী নীল, রেহনা সুলতানা, সালিম এম হোসেন, আশরাফুল হোসেন প্রমুখ কবি। আমেরিকার কালো মানুষরা নিজেদের যেমন নিগার বলে গর্ববোধ করে ঠিক তেমনি মিঞা ভাষায় কবিতা লিখে এই সব কবি আত্মসত্তা প্রকাশের গর্ব খুঁজে পেলেন। পাশাপাশি জাতিহিংসার বর্তমান বাস্তবতাকে সামনে তুলে ধরতে শুরু করেছেন মিঞা কবিরা। যেমন কাজী নীলের “মিঞা হয় নে নহয়” (মিঞা হ্যা কি না?) কবিতায় আমরা দেখি একটা সাদামাটা মুসলিম জীবনে “পরবাসীর” বোধ দিয়ে হঠাৎ বড় প্রশ্নের সম্মুখিন করে তুলছে।

এখানে বলে রাখি, মিঞা কবিতার সূত্রপাত হয় ১৯৩৯ সালে মৌলানা বন্দে আলীর “এক চরুয়ার উক্তি” নামক কবিতার মাধ্যমে। এ কবিতায় তিনি নিজেকে আসামের নাগরিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। এরপর ১৯৮৫ সালে খবীর উদ্দীন লেখেন “বিনীত নিবেদন এই যে” যে কবিতায় তিনি “পমুয়া আর লাঞ্চিত মিঞা” হিসেবে পরিচয় তুলে ধরেছেন।

মিঞা কবি কাজী নীল জিরোগ্রাউন্ড মিডিয়ায় এক সাক্ষাতকারে বলেন, `আমি যদি ব্যক্তিগতভাবে দেখতে চাই তাহলে মিঞা কবিতা হচ্ছে যে লোকগুলোকে আমরা মিঞা বলে ডাকি, যাদের মিঞা বলে গালাগালি দেওয়া হয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় বা বিভিন্ন সময় তারা কাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি বলে, মিঞা বলে উপেক্ষিত হয় – এটা তাদের নিয়ে কবিতা, তাদের এক্সপ্রেশন। সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর যে যন্ত্রণা, তাদের যে ধরনের জীবন তাদের যে সাংস্কৃতিক পরিচিতি তার যে এক্সপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে তাকেই আমি মিঞা কবিতা বলি।’ মিঞা কবিতার বিষয়বস্তু মূলত চর-চাপারী মানুষের নিত্যদিনের সুখদু:খের কাহিনি, বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রভৃতি। কবিতার বর্ণনা অতি সাধারণ এখানে খুব কমই ইমেজ, প্রতীক, মেটাফোরের সাক্ষাৎ মেলে। আর মিঞা কবিতার এই অতি সরলতাই হলো তার শক্তি যেখানে সাধারণ মানুষের কথা সাধারণ মানুষের মত করে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের ফেসবুক পেজ ইটামুগুর (https://www.facebook.com/itamugur/) এবং মিডিয়া চ্যানেল আংগো খবর (https://www.youtube.com/channel/UCdVidWb6n9VqUD-dqx4LZtA) ব্যাপক জনপ্রিয় যুব সমাজের কাছে।

মিঞা কবিতার বিরুদ্ধে অসমীয়া রেজিসটেন্স

অতি দ্রুত এ সকল কবিতা সাড়া ফেলতে থাকে। দেশ বিদেশে এ নিয়ে ডকুমেন্টারি এবং ফিচার বেরুতে থাকে। ফলে জাতীয়তাবাদী অসমীয়ারা অস্বস্থি পড়ে যায়। উঠে পড়ে লাগে মিঞা কবিতার বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ মিঞা কবিতার মাধ্যমে কবিরা অসমীয়া সমাজের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়াচ্ছে। ভারতীয় অন্যান্যদের সামনে এবং বিদেশীদের কাছে জেনোফোবিক তথা ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে বলে প্রচার করা হয়। আসামের অন্যতম বামপন্থী বুদ্ধিজীবী হীরেণ গোহাই, অধ্যাপক দিলীপ বোরা প্রভৃতি সুশীলরা মিঞা কবিতার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে বলেন, মিঞা কোন ভাষা না। তাই তারা মিঞা কবিদের অসমীয়া ভাষায় লেখার পরামর্শ দেন যা আসলে মিঞা কবিতার বিরুদ্ধে উগ্রবাদীদের হাতকেই শক্তিশালী করেছে। এ নিয়ে অন্তত চারটি এফআইআর হয়েছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ১০ জনের বিরুদ্ধে প্রণবজিৎ দোলই গোয়াহাটির পানবাজার পুলিশ স্টেশনে আইপিসির ১২০বি, ১৫৩, ২৯৫এ এবং ১৮৮ ধারায় এফআইআর দাখিল করা হয়। মূল অভিযোগ মিঞা কবিরা দুনিয়ার সামনে অসমীয়াদের জেনোফোবিক হিসেবে তুলে ধরছে (“create communal disturbances in the state” and “defame the Assamese people as xenophobic”)| অভিযুক্ত দশজন হলেন হাফিজ আহমেদ, আশরাফুল হোসেন, সালিম এম হোসেন, রেহনা সুলতানা, আব্দুল রহিম, কাজী সারোয়ার হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, বনমল্লিকা চৌধুরী এবং ফরহাদ ভুঁইয়া, করিশমা হাজরিকা। বনমল্লিকা চৌধুরী আর করিশমা হাজরিকা মিঞা কবি নন শুধু মিঞা কবিতার সমর্থক তাই তারাও বাদ পড়েননি। কবি রেহনা সুলতানা এক প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভের সাথে ক্যারাভান জার্নালে বলেন, “আমরা অসমীয়া বলি, অসমিয়া মিডিয়াম স্কুলে পড়ি, অসমীয়া পোষাক পরি, অসমীয়া খাবার খাই তারপরও আমরা কেন অসমীয়া না? ” এসবের ভিত্তিতে আসামের তিনসুকিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সুশান্ত কর মনে করেন, “এর কনটেন্ট যেমন অহমিয়া শভিনিজমকে চ্যালেঞ্জ করছে, তেমনি এর ভাষার মধ্যেও লুকিয়ে আছে আসামের ভাষা রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।”

মিঞা কবিতা – শ্রেণি, জাতি আর ধর্মীয় বঞ্চনার ত্রয়ী

একদিকে দারিদ্র, জাতি ও ধর্মীয়ভাবে তার সাথে ভাষাগত পার্থক্য থাকায় মিঞারা আসামে ‘অপরজন’। দারিদ্র বঞ্চনার শ্রেণিগত দিকের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মিঞা কবিদের তাই লড়াইটাও বহুমুখী ও বহুমাত্রিক। আর এভাবেই মিঞা কবিতা প্যালেস্টাইন, কাশ্মির, বেলুচিস্তান, ইউরোপ আমেরিকার নিগার, আরবের দ্রুজ, ইয়াজেদী আর সর্বোপরী তৃতীয় বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের লড়াই সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র:

– আলতাফ পারভেজ: মিঞা অসমীয়া এনআরসি: আসামে জাতিবাদী বিদ্বেষ ও বাংলাদেশ (ঢাকা, জানুয়ারী ২০২০)
– https://www.huffingtonpost.in/entry/nrc-miya-poets-assam-woman_in_5d3f3e2ee4b0d24cde03f6d6
– https://bengali.indianexpress.com/opinion/assam-miya-poetry-history-politics-identity-135975/
– https://www.bbc.com/bengali/news-48994118
– https://www.indiatoday.in/india/story/assam-poets-miya-poem-bengali-muslims-harsh-mander-1571025-2019-07-18
– https://www.aljazeera.com/indepth/features/2016/12/protest-poetry-assam-bengali-muslims-stand-161219094434005.html
– মুসলিমদের ‘মিঞা কবিতা’ নিয়ে আসামে বিতর্ক কেন? – দেবর্ষি দাস
– মিঞা কবিতা — কবিতার মশাল : সুমনা রহমান চৌধুরী (https://4numberplatform.com/?p=12856&fbclid=IwAR2ip6OCAOC53J1jkG6id-WoZNK6r1NSIaqVevbBA4gGDGg60-7fngC3nrY)

পাঠকের জন্য নিচে কয়েকটি মিঞা কবিতা সন্নিবেশিত করা হলো:

লিখে নাও, আমি একজন `মিঞা’// হাফিজ আহমেদ
অনুবাদ: আলতাফ পারভেজ

লেখো
লিখে নাও
আমি একজন `মিঞা’
নাগরিকপঞ্চিতে আমার নম্বর ২০০৫৪৩।
দুই সন্তানের পিতা আমি
আরেকজন জন্ম নেবে শিগগির, আসন্ন গ্রীষ্মে
তুমি তাকেও ঘৃণা করবে কি
যেভাবে আমাকে করতে ?

লেখো
আমি একজন `মিঞা’
পতিত জমি, জঙ্গলকে – আমিই সবুজ খেত বানিয়েছি
তোমাদের খাওয়াতে;
ভবনগুলো বানানোর সময়
আমিই ইট বয়ে নিয়ে যেতাম;
তোমাদের গাড়ি চালাতাম – আরাম দিয়েছি তোমাদের;
নর্দমাগুলো পরিষ্কার রাখতাম
তোমাদের সুস্থ-পরিচ্ছন্ন রাখতে;
সব সময় তোমাদের সেবায় হাজির থেকেছি
কিন্তু এখনো তুমি অসন্তুষ্ট!

লিখে নাও
আমি একজন `মিঞা’
কোন অধিকার ছাড়াই
গণতান্ত্রিক, ধর্মনরিপেক্ষ এক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক
আর, আমার মা একজন ‘ডি-ভোটার’
যদিও তার মা-বাবা ভারতীয় ছিলেন!
চাইলেই তুমি আমাকে মারতেও পারো –
আমার সবুজ ক্ষেত কেড়ে নিয়ে – গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিতে পার
বুলডোজার এনে আমার ওপর দিয়ে চালিয়ে দিতে পারো
তোমার গুলির ঝাঁক
আমার বুক বিদ্ধ করে চলে যেতে পারে
সেটা কোনো অপরাধ হবে না।

লেখো
আমি ব্রহ্মপুত্রের একজন মিঞা
তোমার অত্যাচারেই আমার শরীর কালো চিকচিকে হয়েছে
আমার চোখ যে আগুনে লাল – সে-ও তোমার কারণে;
সাবধান!
এই ক্ষোভ ছাড়া – আমার সংগ্রহে কিছু নেই
দূরে থাকো
নতুবা ছাই হয়ে যাবে!


নানা মুই মিঞা// সালিম এম হোসেইন

অনুবাদ: অভিষেক ঝা

নানা মুই লিখে লিয়েছি, এটেস্টেড কাউন্টারসাইন কইরে
পাব্লিক নোটারিকে দিয়া ভেরিফাই করি নিয়েছি যে
মুই এক মিঞা
এহন দেখো হামারে
বানের জল থেকি উঠি
ধ্বসের উপর ভাসি
বালুচর, পাঁক আর সাপ মাড়িয়ে আসিতেছি
মাটির অনিচ্ছায় কুড়াল দিয়ে আঁকিছি পরিখা
হামাগুড়ি দিতেছি ধান ক্ষেতির ভিতর দিয়া
ডাইরিয়া আর আখের ক্ষেতের ভিতর দিয়া
১০% সাক্ষরতা হারের ভিতর দিয়াও
দেখো হামারে কাঁধ ঝাঁকায়ে কেমনে দুলাইচ্ছি ঝামড়া চুল
পড়ো দু’ডা কবিতা, কষো কিছু অঙ্ক
কেমন ভেবলে আছে দেখো পাষণ্ডরা হামারে বাংলাদেশি বলা কালে
আর আমার ধুকপুকে কলিজাকে বলে দিও
মুই কিন্তু মিঞা।
দেখো মুই হাতে ধরি আছি
সংবিধান
দিল্লির দিকে আঙুল তুলি আছি
হামার পার্লামেন্ট, হামার সুপ্রিম কোর্ট, হামার কনটপ্লেসের দিকে হাঁটিছি
এমপিদের, মান্যিগণ্যি জাজেদের
আর যে মেয়েটি জনপথে বেচে ঝুটো সোনার গয়না আর তার রূপ
তাদের সবাইরে বলে দিও
হ মুই এক মিঞা।
হামারে দেখতে পাবে কলকাতায়, নাগপুরে, সীমাপুরী বস্তিতেও
হামারে দেখতে পাবে স্যুট পড়ি সিলিকন ভ্যালিতে, ম্যাকডোনাল্ডেও
হামারে দেখতে পাবে মেওয়াটে চালান হয়ে যাওয়া বিয়ার কনেতেও
হামার ছোটোবেলার ছোপগুলি দেখো
দেখো হামার পিএইচডির সার্টিফিকেটের উপর ঝোলা গোল্ড মেডেলগুলি
তারিপর হামারে সালমা বলি ডাকিও, ডাকিও আমান বলি,
আব্দুল বলি ডাকিও, ডাকিও বাহাতন বলি
কিংবা গোলাম।
হামারে দেখো প্লেন ধরিতে, ভিসা পাইতে, বুলেট ট্রেনে চড়িতে
বুলেট ধরিতে
স্রোতে বইতে
রকেটে চড়িতে
লুঙ্গি পরিয়া মহাকাশে যাইতে
আর অইখানে তোমার চিল্লামিল্লি শুনিবার কেউ নাই,
বাজ পড়ে যেন কোথাও
মুই এক মিঞা।
মুই গর্বিত।

আমার মা // রেহনা সুলতানা
অনুবাদ: মাজহার জীবন

তুমি আমার মা
তোমার কোলেতে জন্ম আমার
তোমার কোলেতেই জন্ম আমার বাবা-দাদা-পরদাদার
তবু তুমি বলো আমি তোমার আপন না
আমি তোমার কেও না।
মা, তুমি আমাকে ঘৃণা করো
কারণ আমার পরিচয়
তোমার কোলে জন্ম নেয়া
আমি সেই ‘ অভিশপ্ত মিঞা’।
তুমি আমায় অবিশ্বাস করো মা
কারণ আমার মুখে বড় দাড়ি
পরণে লুঙ্গি
মা, তোমার কাছে আমি আমার পরিচয় দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যায়
তবুও হাজার কষ্ট, লাঞ্চনা-বঞ্চনা সহ্য করেও
আমি চিৎকার করে আমি বলি
মা আমি তোমাকেই ভালবাসি।
মাঝে মাঝে ভাবি
তোমার কোলে জন্ম নিয়ে কি পেলাম আমি?
আজ নাই আমার পরিচয়
নাই আমার অস্তিত্ব
আমি হারিয়েছি নিজেকে
হারিয়েছি আমার কৃষ্টি-কৃতি-সংস্কৃতি
আমি আমার সব কিছু হারিয়েও
মাত্ৰ তোমাকেই বুকে রেখেছি।
আমি তোমার কাছে থেকে কিছুই তো চাইনি মা
চেয়েছি মাত্ৰ তোমার চরণে একটু জায়গা
মাথা উচু করে, সন্মান নিয়ে
তোমার বুকে বেঁচে থাকার ইচ্ছা আমার মা।
আমার দিকে চক্ষু মেলে একবার দেখ মা
তোমার অন্য সন্তানগুলোকেও বলে দাও
আমরা সবাই ভাই ভাই
আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
আমি আবার বলছি মা
আমি তোমারই অন্য এক সন্তান
আমি ‘কেলার মিঞা’ না
আমি কোন ‘বাংলাদেশী’ না
মুখে দাঁড়ি আর পরণে লুঙ্গির সাথে
সহজ সরল
মিঞা আমি
মিঞা আমি
বি. দ্র. শব্দের মালা দিয়ে কবিতা লেখার
ক্ষমতা আমার নাই
এটা কষ্ট প্রকাশের সামান্য প্রয়াস

সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না// কাজী নীল
অনুবাদ: সুমনা রহমান চৌধুরী

যে দেশ আমার বাবাকে বিদেশি বানায়
যে দেশ আমার ভাইকে গুলি করে মারে
যে দেশে আমার বোন মরে গণধর্ষণে
যে দেশে আমার মা বুকে আগুন চেপে রাখে
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।
যে দেশে লুঙ্গি পরার অধিকার নাই
যে দেশে কান্না শুনার মানুষ নাই
যে দেশে সত্য বললে ভূত কিলায়
যে দেশ আমার আজীবন দাসত্ব চায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।
যে দেশে টুপি মানেই মৌলবাদী
যে দেশে মিঞা মানে নীচজাতি
যে দেশে ‘চরুয়ারা’ সব বাংলাদেশি
যে দেশ টাটা বিড়লা আম্বানির হাতে বিক্রি হয়ে যায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।
যে দেশে আমাদের লাশের পর লাশ কুপিয়ে কেটে
নদীতে ভাসিয়ে দেয়
যে দেশে ৮৩তে মানুষ মেরে শালার বেটারা জল্লাদের
মতো উল্লাস নৃত্য নাচে
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।
যে দেশে আমার ভিটা বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়
যে দেশে আমার অস্তিত্বকে বাতিল করা হয়
যে দেশ আমাকে অন্ধকারে রাখার ষড়যন্ত্র চালায়
যে দেশ আমার থালাতে পান্তার বদলে পাথর ঢালতে চায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।
যে দেশে আমি গলা ছিঁড়ে চিৎকার করলেও কেউ শুনে না
যে দেশে আমার খুনের জন্য কেউ দায়ী না
যে দেশে আমার ছেলের কফিন নিয়ে রাজনীতি চলে
যে দেশ আমার বোনের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলে
যে দেশে আমি জানোয়ারের মতো বেঁচে থাকি
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

https://www.youtube.com/watch?v=j1CPvxpSP9E

আমি ভাই চরের মানুষ// আশরাফুল হোসেন
অনুবাদ: মাজহার জীবন

আমি ভাই চরের মানুষ
ব্রহ্মপুত্র চরের কাইশা, ঝাউ-ইকরা আর
নলখাগড়ার ছায়ায় আমার পাটকাঠির ঘর।
লোকে আমাকে কয় চরুয়া,
পমুয়া, মিঞা, ভাটিয়া, অভিবাসী, শেখ,
ন-অসমীয়া, ময়মনসিঙিয়া
সন্দেহভাজন বাংলাদেশী, অন-আদিবাসী বাংলাদেশী
আরো কত কি—
আসামে জন্ম আমার
অসামীয়া পরিচয়ে করি গৌরব
যদিও জানি না সুশীল অসমীয়া
আমার বাবা নীল চেকের লুঙ্গী পরে
মা পরে শাড়ী
বোন পরে মেখেলা কিংবা চুড়িদার
আর ভাইরে, আমি পরি জিন্স প্যান্ট।
বাবার থুতনিতে এক মুঠো দাঁড়ি
মাথায় টুপি
হাতে তসবী, কাধে পাটের ঝোলা
ভাঙ্গা ভাঙ্গা অসমীয়া বলতে পারে
কামলা দিতে গিয়ে আশ্রয় হয় থানায়
কখনো বাংলাদেশী, কখনো মৌলবাদী বলে।
মহাজন চাচা চাচা বলে
থানা থেকে ছাড়িয়ে আনে
আবার মজুর দিতে যায় পরের দিন
পুলিশকে দেয়া ঘুষের টাকা
শোধ দিতে হবে বলে।

ঐ জেলে আমার মা থাকে // গাজী রহমান
অনুবাদ: মাজহার জীবন

আমার মা আমাকে মেলা ভালবাসে
এখন আর ভালবাসে না
কেমন করে ভালবাসবে
আমার মা তো বাড়িতেই নাই–
ঐ জেলে আমার মা থাকে!

আমাদের মা নাকি বিদেশী
ঐ দেশ থেকে এসেছে
আমার খালা, আমার মামা
এখানেই থাকে
আমার নানী নাই
নানা মারা যাওয়া অনেক বছর হলো
আমি দেখিনি
নানার নামে কাগজ আছে
ওরা বিদেশি না
কেবল আমার মা–
আমার মাকে স্কুলে পাঠাইনি
ছোট থাকতেই বিয়ে দিয়েছিল
বাড়িতে খুব আকাল ছিল!

আমি জানি আমার মা কাঁদে
আমার জন্য
আমিও কাঁদি আমার মায়ের জন্য
আমি আগে রাতে সহজেই ঘুমিয়ে পড়েছি
এখন ঘুম আসে না
আমার মা নাই যে –!
মাথায় হাত দিয়ে
আমার মা গুনগুন করে গান করতো
আমি কখন ঘুমিয়ে গেছি
টেরই পাইনি

এ কাত ও কাত হই
আমার মা নাই
কেমন করে থাকবে
আমার মা যে ঐ জেলে থাকে
আমি জানি আমার মার মেলা দুঃখ
আগেও ছিল
গরীব মানুষ আমরা
আমার বাবা মানুষের বাড়ি কামলা খাটে
ভালমন্দ খেতে পাই না
আমার মাকে সেই ঈদের সময়
দেড়শ টাকা দামের একটা কাপড় দেয়
এখন তাও দিতে পারে না
কি করে দেবে
আমার মা যে বাড়াতে নাই
ঐ যে একটা জেল
ঐ জেলে আমার মা থাকে!

জানেন
আমার শরীরে ছাতা পড়ে গেছে
আমার মা পিড়াতে বসিয়ে
গা ঘসে ঘসে
গা ধুয়ে দিত
আমি এখন একাই ধুই—
কচলাতে পারি না
আমি সে রকম সুন্দর ছিলাম
কালো হয়ে গেছি
বাবার তো সময়ই নাই
কামলা দেয়া লাগে
না হলে খাব কি
আবার আমার জন্য ভাত রাঁধে
আমাদের বাবারও মেলা দুঃখ
মাঝে মাঝে একা একা কাঁদে
আমারও চোখ দিয়ে পানি বের হয় –!

আমার মাকে কে এনে দিবে?
আমার মা ছাড়া কেমন যেন লাগে
আমার মা আমাকে স্কুলে এগিয়ে দিয়ে আসতো
অনেক দূর আমার স্কুল
রাস্তার মাঝে কটা কুকুর শুয়ে থাকে
আমি আবার কুকুর দেখে ভয় পাই
আমি এখন স্কুলে যাই না
আমার অনেক পড়তে ইচ্ছা করে
যা আমি পারি না
কেমন করে যাবো
আমার মা যে বাড়িতে নাই
ঐ যে একটা জেল
ঐ জেলে আমার মা থাকে!

আমার মার শরীর শুকিয়ে গেছে
এমনিতেই মার শরীরে মাংশ নাই
কেবল কয়টা হাড্ডি
তাও গোনা যায়!

আমি আমার মার কাছে যাব
আমিও জেলেই থাকবো
আমি বলব যে আমি বিদেশি
হ্যাঁ আমিও বাংলাদেশী
কে নিয়ে যাবে আমাকে
আমার মায়ের কাছে?
বাবাকে অনেকবার বলেছি
নিয়ে যায় না
বাবার নাকি কান্না আসে
আসবেই তো
আমার বাবা আমার মাকে
অনেক ভালবাসে, আমিও ভালবাসি
আমার মাও ভালবাসে, আদর করে
এখন আর করতে পারে না
কেমন করে করবে
আমার মা তো এখানে নাই
ঐ যে একটা রাক্ষস জেল

ঐ জেলে আমাদের মা থাকে!


আমি দুনিয়াটা দেখতে চাই //মির্জা লুৎফর রহমান

অনুবাদ: মাজহার জীবন

আমি নিজেকে একটু উঁচু করে ধরেছি ভাই,
আমি দুনিয়াটা দেখতে চাই।
আমি দেখতে চাই

ম্যান্ডেলার কলিজাটা কত বড়,
কতখানি যুক্তি দিয়ে গান গাইতে
বব মার্লের গিটারে হলুদ বুক কাঁপাত!

একবার ইতিহাস দেখে আসি,
কেমন করে ইংরেজ একটা জাতি হলো
ওরাও তো কয়েক দলে ছিল বিভক্ত।

আমার কথা শুনে মিঞাভাই রেগে বলেঃ
“একবার হিটলারের দেশে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের খবর নিয়ে আয়,
তারপর শুনিস পল রবসন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি গান গাইতো,
সারা দুনিয়া দেখা হলে আমাদের ক্যাম্পের খবর নিস!”

আরে ভাই তো আর জানে না,
আমি দুনিয়াটা দেখতে চাই
ক্যাম্পের প্রসঙ্গটাই শেষ করবার জন্য!!

লাঙলের সাথে নড়ি গেড়ে
মিঞাভাই আলে বসে বিড়ি ধরায় যখন,
আমি মিঞাভাইকে কথাগুলো বুঝাই,
এমন করে একদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকে,
আমার বুকের ভেতর একটা আইফেল টাওয়ার দাঁড়ায় তখন!
নেপোলিয়নের ঘোড়াটা এসে আমার হাতের আঙুল চাটে!
মিঞাভায়ের পেছন পেছন হাল বাইতেই
মনে হয় লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠি,
আমি একবার দুনিয়াটা দেখতে চাই ভাই!!

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top