কবিতা ।। চুম্বনের ক্ষুন্নিবৃত্তি ।। নুসরাত জাহান


খিদে – ১
আমার কচকচ শব্দ করে
কিছু একটা খেতে ইচ্ছে করছে!
হতে পারে সেটা সদ্যফোটা
সাদা ধপধপে গোলাপফুল।
অথবা, লালজবার উঁকি দিতে থাকা
কচকচে লাল কুঁড়ি।
প্রবল বর্ষণের পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে
তাতে জোনাকিপোকার মতো ফুটে থাকা
তারাও খাওয়া যেতে পারে।
শরতে যে সুনীল আকাশ থাকে কাচের মতো,
তাতে কামড় বসালে কচকচ না হোক,
কড়মড় শব্দ তো হবেই!
পেঁজা তুলোর মতো মেঘগুলোকে
হাওয়াই মেঠাইয়ের মতো মুখে দিয়ে
চোখ বন্ধ করে
আরাম আরাম করে খাওয়া যাবে বেশ।
কদমফুলের ভর্তাটা অশ্লীল লাগলেও
কদম ফুল চিবিয়ে খেতে আমার আপত্তি নেই।
আপত্তি নেই কাঁঠালিচাঁপার
মাতাল করা সুবাস খেতেও।
আমার ঘাসফুলও খেতে ইচ্ছে করে খুব!
শিশিরভেজা শিউলির সাথে
খানিকটা নীল-বেগুনী ঘাসফুল মিশিয়ে
খেতে পারলে বেশ লাগত!

আমার জীবনকে খেয়ে ফেলার
খিদে ভর করেছে চোখে।
যে জীবন বেঁচে না থাকলে
খাওয়া হবে না কোনোদিনই!
•••••••


খিদে – ২
মাঝে মাঝে এমন থমকে থাকা দুপুরগুলোতে
খুব খিদে পায়!
ভাতের ধোঁয়া বা বাটিভর্তি ম্যাগির জো থাকে না
এই খিদে নিবারনের।
কড়া লিকারের দুধ চায়ে ডুবিয়ে খাওয়া টোস্টও
মিটিয়ে দিতে পারে না এই অদ্ভুত খিদে।
মনে হয় পাউরুটিতে মাখিয়ে কোনো শিশুর
চার-দেঁতো হাসি যদি খেতে পারতাম!
অথবা সদ্য বৃষ্টিতে ভেজা পাতাগুলোর সবুজ
খাওয়া যেত বেলীর ফটফটে সাদাতে মাখিয়ে!
কারো চোখের গাম্ভীর্য কিংবা গালের টোল
তাহলে খেতাম ভীষণ ঝাল আর নুন দিয়ে।
অথবা কারো বাহুতে জ্বলজ্বল করা গভীর কালো তিল
খেতে পারতাম যদি চিতই পিঠা দিয়ে!
এসবে কি খিদে যেত? জানি না!
খেয়ে দেখা হয় নি।
বুভুক্ষের মতো চেয়ে থাকায় যদি স্বাদ পাওয়া যেত
কোনো খাবারের
তাহলে লোভী হতো কি কেউ?
পৃথিবীর সব সুন্দর জিনিস যদি খিদে মিটিয়ে দিতো,
তাহলে তো অনাহারে থাকত না কেউ।

আমিও এই কটকটে রোদ আর
আকাশভরা মেঘ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।
•••••••


ভুল বোঝাবুঝি
নিপাট ভদ্রলোকের মতো পথের শেষ মাথায়
দাঁড়িয়ে থাকে অশত্থ গাছটা।
বট বা পাকুড় বলে অবশ্য
অনেকেই ভুল করে বসে মাঝে মাঝে!
কিন্তু তাতে কী?
গাছে বাসা বাঁধা পাখিগুলোর তাতে
তেমন কিছু যায়-আসে না।
যায় আসে না গাছে নিচে বসে থাকা ভিক্ষুকটিরও।
অথবা তার পাশে বসা মুচিটারও।
শুধু শীতল চোখে তাকিয়ে থাকা ছেলেটারই
যত আপত্তি গাছ না চেনাতে!
কেন রে বাবা!
অশত্থ আর বটে পার্থক্য না জানলে বুঝি প্রেম হয় না?
অন্য কারো হতে পারে, কিন্তু তার নাকি হয় না!
এ ভারি জ্বালা হল দেখি!
মেয়েটা চুপি চুপি কাঁদে গাছ চেনে না বলে।
বোঝে না, ছেলেটা তার জন্যই গাছ সাজে।
হাওয়ায় দোলায় ছোট ছোট পাতা,
যেমন দোলে মেয়েটার মন!
বোকা মেয়েটা অশ্বত্থ গাছকে ভুলে বট ভাবে।
ভাবে, ছেলেটা তাকে ভালবাসে না।
•••••••


আদিম
কোটি বছরের পুরোনো জীবাশ্ম মনে হয় নিজেকে।
নিজেকে মনে হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম আত্মা।
মনে হয়, কালের সৃষ্টি থেকে অপেক্ষা করছি কারো।
অনন্ত নক্ষত্রবিথী আর কৃষ্ণগহ্বর
যেন চিরচেনা আমার।
মনে হয়, পৃথিবীর প্রথম শিশিরকণা
ছুঁয়েছিল আমার কপাল।
আদিমতার কামড় যেন রক্তকণিকার স্রোতে বহমান
প্রথম নদীর মতো।
পাহাড়ের বুক ফেটে হাহাকারের মতো
ছিটকে বেরিয়েছিল যে ঝরণা,
মনে হয় সে যেন আমার সবচেয়ে পুরোনো সই।
তারপরও,
তারপরও নিজেকে সদ্য ফোটা কিশোরী ফুল মনে হয়
তুমি ছুঁয়ে দিলে!
•••••••


চুম্বনের ক্ষুন্নিবৃত্তি
চুম্বনের মতো এসো আয়ু বদল করি।
মুগ্ধতায় যে দৃষ্টি থমকায়, এসো
তাকে দেই এক যোজন মহাকাল।
এসো, বিষ হতে থাকা দূরত্বকে
পান করি নীলকণ্ঠের মতো।
আর মন্থন করি তীব্র আলিঙ্গনে
প্রকট প্রেমের প্রকাশকে।
ফুল হয়ে ফুটে থাকা থোকা থোকা ভালবাসা
বদল করি এসো পরিণয়ের মালার মতো।
এসো, নিকট হতে নিকটতর হওয়া
শ্বাসের উষ্ণতা বদল করি বেঁচে থাকার মতো।
•••••••


অভিমানলিপি
এইসব মিস করাকরি আর ভালবাসাবাসি
জগদ্দল পাথরের মতো বুকে চেপে বসে।
প্রবল পাহাড়ি ঝর্ণার মতো
ঠেলে বেরুতে চাওয়া অভিমানও
চাপা পড়ে যায় সেই পাথরের নিচে।
তিলতিল করে জমানো সব ক্ষোভ তরল হয়,
তরল হয় মাথার ভেতর থরে থরে থাকা দুঃসহ স্মৃতিও।
কী এক অদ্ভুত মায়ায়
আঙুলগুলো ছুঁতে চায় তোমার কপাল।
অথচ তুমি থাকো শত কোটি আলোকবর্ষ দূরে।
•••••••


সাক্ষী
শোনো,
দিনের পর দিন কথা না হলে
ভালবাসা কমে যায় না,
ভালবাসা কমে না অন্ধ দূরত্বেও।
হয় না দেখা? তাতে কী!
হৃদয় তো হাত বাড়ালেই ছুঁতে পাও!
শোনো,
ভালবাসায় ঘাটতি বলে কোনো শব্দ নেই,
ওসব প্রজাপতিদের কানাঘুঁষা!
তুমি তো জানো, তোমার কফির কাপে
আমার কতশত চুম্বন জমা আছে
ভালবাসার সাক্ষী হয়ে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top