গোধূলী রঙের গল্প // মিজানুর রহমান নাসিম

ক’দিন থেকেই হেঁটে বেড়াচ্ছি শহরের এ মাথা ও মাথা। আমার কোন তাড়া বা গন্তব্য নেই। পায়ে পায়ে চলেছি যেখানে যেদিকে খুশি। ধরাবাঁধা কোন পথ না। কানাগলি থেকে রাজপথ – সব। আর সব পথই আমার জন্যে অবারিত। এবারই আমি এত চোখ লাগিয়ে শহরকে দেখলাম মনে হয়। কখনো দেখিনি এমন একটা ভাব। আমার দেখতে ভালো লাগলো যে, কাকের সাথে পাল্লা দিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে ওরা। মাছির মত লোভাতুর। ব্যতিব্যস্ত। এ শহরে আমি জন্মেছিলাম কোন এক কালে। তার সমস্ত অলিগলিতে আমার চিহ্ন জড়িয়ে আছে।

লোকে কখন না আমাকে নিয়ে সন্দেহ করা শুরু করে! করুক। তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। আমিই তো প্রথম জীবনবাদী মন্ত্র দিয়ে ওদেরকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত করেছিলাম রাজপথ। উজ্জীবিত করেছিলাম দিন আসবে বলে। শহরের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিবাদের যে শ্লোগান তা আমিই এঁকে দিয়েছিলাম। এখন আমার যা ভালো লাগে তাই করবো। কাজলা থেকে অকট্রয় মোড়, সেখান থেকে সাহেববাজার, নিউমার্কেট থেকে লক্ষীবাজার আর জেলরোড। সব পথে নতুন করে আমার পায়ের গোড়ালি ঠুকে দিয়েছি। আর কোথায় যেতে পারি আমি যেখানে আমার যাওয়া দরকার? আমার আসলেই কি কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন আছে? একবার মনে হল, কিছু একটা বাধিয়ে জেলখানায় গিয়ে ঢুকি, জায়গাটা নেহাৎ মন্দ না। অথবা পাগলাগারদের অতি জাগতিক সঙ্গীদের মাঝে যারা হাসতে হাসতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকেই পায়রার মত নিমেষে উড়িয়ে দিতে পারে।

সপ্তাটাই মুড অফে যাচ্ছে। কেন অর্থহীন এমন মন খারাপ করে থাকা। যখন আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, ঠিকঠাক কোন জবাব পাই না। বরাবরই দেখেছি, হাজারটা বিষয় এসে সামনে দাঁড়ায়। কত রকম চটপট ব্যাখ্যা – পার্টি, পারভীন, বন্ধুহীনতা, বেকারত্ব। কোনটা দিয়ে নিজের অবস্থা বিচার করবো? কিশোরবেলা থেকে এই পঞ্চাশের আমি। ওসব ভাবতে ভাবতে শুধু ক্লান্ত হওয়া। অথচ আমার উড়ুনচণ্ডী মন বাঁধাহীন। কত অসীম তার ক্ষমতা। আমি পরাজিত হতে পারি না। আমাকে অবশ্যই একটা বোঝাপড়ার মধ্যে আসতে হবে। কাল সন্ধ্যায় নিউমার্কেটের পুরোনা আড্ডার আশপাশে ঘুরেছি। বারবার মনে পড়েছে সেইসব দিনের কথা। চোখে চোখে ভেসেছে কমরেডদের মুখ যারা এখন ডিডো পাখির মত বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মুন ইলেকট্রনিক্স থেকে দুটো রেকর্ডিং নিয়েছি – ধ্রুপদ আর সন্তুর। ধ্রুপদখুব কম শোনা হয়েছে। ক্যাঙারুর মত লাফিয়ে লাফিয়ে তো আর ধ্রুপদ শুনা যায় না! ধ্রুপদ শুনতে ভীষণ একাগ্রতা লাগে। কাল প্রায় সারা রাত শুয়ে শুয়ে শুনেছি। বাহাউদ্দিন ডাগর অসাধারণ। সাতশ বছর থেকে ধ্রুপদে ডাগরদের সমতুল্য কে আছে।

সকালে মা কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে মুখ বাঁকিয়ে গেছেন। নাস্তাটা সারার জন্য। মা’র কত কাকুতি মিনতি তার অপদার্থ ছেলের নাস্তা খাওয়া নিয়ে। অথচ আমি দুপুর পর্যন্ত রুমেই কাটিয়ে দিলাম। বাবা-মা’র আমাকে নিয়েই যত দুঃশ্চিন্তা। সামনে কিছুই বলেন না, আড়ালে আহাজারি। কখনও আমি শুনে ফেলি, কখনও শুনি না। ওরা আমাকে খোঁচা দিতে চান না। আমি তার পড়ন্ত সংসারের হাল ধরা ছেলে হলেও মানাতো। একটা বোঝা নিয়ে…। মা’রা তো সাম্যবাদে বিশ্বাসী।

রাহুল শর্মা বাবার মতই নিজেকে দিন দিন মেলে ধরছে। ওর সন্তুরে প্রাণ ফিরে পাওয়া যায়।

২.

শান্তনু এগারোটায় এসেছে। সম্ভবত আজ ওর অফ ডে। কোন তাড়া দেখাচ্ছে না। আমি খুব খুশি। শান্তনু মাঝেমধ্যে এমন করে একটু যদি আসতো! শহরেই তো থাকে, সপ্তায় অন্তত একটা দিন। অযথাই আমি এসব বলছি। নিজের কেন্দ্রমুখে ঘুরপাঁক করতেই সবাইকে আজকাল ভিমরি খেতে হয়, কখন সে মুক্ত হবে। আমি একটুও অবাক হইনি যখন শুনেছি শান্তনুও আমার মত বদলে গেছে। একদিন সবাই বদলে যাবে। হাজারো শান্তনুকে ওরা বদলে যেতে বাধ্য করেছে। অথচ কি সুন্দর দিন আমরা শুরু করেছিলাম। সব ওরা পয়মাল করে দিল!

আমরা বেশ একবেলা কাটিয়ে দিলাম। আজকের দিনটি সত্যিই চমৎকার। শুধু গরমটা ছাড়া। কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত আমরা গান নিয়ে মত্ত ছিলাম। শান্তনু বললো, বুঝলেন বাচ্চু ভাই, নিখিল ব্যানার্জ্জীর টানাটাই আলাদা। বিলায়েৎ খাঁ বা রবিশংকরের ছিটেফোঁটাও সেখানে নেই। কলকল স্রোত বয়ে যাচ্ছে দু’পাড় ছাপিয়ে। আহা।

রশিদ খানের মালকোশ আলাপ চললো। এরপর কিশোরী আমোনকারের ভূপালী। ইদানীং আমি এ দুটো প্রায়ই শুনছি। আজ এত কিছুতে আমার নিঃসঙ্গ ঘরটা ম ম করে উঠলো। শান্তনু বল্ল,আজ থাকবে এখানে।

শান্তনু আমার এক্স কমরেড। ওকে চিনিয়ে দেয়া এভাবেই সহজ। যদিও কমরেড ডাকটা এখন আমার কাছে পায়রার বাকবাকুমের মত একঘেঁয়ে, বিরক্তিকর। ওসব ঠাট্টা কবে ঠোঁট থেকে মুছে গেছে। ভুলেভালে এসে পড়ে আর কি!

দিনের আরো কিছুটা সময় বাকি। দুইদিনে একদিন হয়ে গেল নাকি। হোক। আর এক মুহূর্তও আমার ঘরে থাকার ইচ্ছে নেই। শান্তনুর মনটাও নিশ্চয় তাই বলছে। হাবভাব দেখেই তো বুঝা যায়। আমার মত তারও উঠি উঠি ভাব। বলতেই শান্তনু চটজলদি টুক করে সম্মতি জানায়। সেটি শার্ট গায়ে চাপালো, আমি ফিনফিনে ফতোয়াটা।

শেষ বোশাখের তাতানো আকাশ তখনো দাঁত দেখাচ্ছে। গুরুমণ্ডল থেকে মাটি ফুঁড়ে যেন ভ্যাপার ছড়িয়ে পড়ছে। এ বছর বোশেখের শুরুতেই চোখ ধাঁধানো দিন। কি বিষ্টিবাওর কি কালবোশেখি সব নাই হয়ে গেছে। এ শহরে মানুষের টেকা দায় হবে। পুরো বরেন্দ্রভূমি মরু হয়ে যাবে একদিন। এ নিয়ে কথা বলতে বলতে বাবা বারান্দার ঈজি চেয়ারে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেন। হয়তো তিনি মেঘকালো আকাশের হিমেল বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে চান। বাবার আক্ষেপ চলতে থাকে। তাছাড়া তিনি আর কি নিয়েই বা বলবেন! একটা কিছু তো তার বলা চাই!

৩.

পড়ন্ত বিকেলেও দুপুর বুঝি আজ জেদ ধরেছে। তবু শহরের এ দিকটায় লোকজনের বেশ জটলা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গলির ন্যাড়া মেহেদী গাছটার নিচে দাঁড়ালেই বুঝা যায়। এখান থেকে পাড়াটা তিনদিকে ভাগ হয়ে গেছে। মেহেদী গাছটা কত কালের পুরোনো অখচ ওর পাতাই থাকে না। যার যখন ইচ্ছে ওর ডালপাতা পটাপট ছিঁড়ে নেয়। পাড়ার বৌ-ঝিরা তো গানিয়ার বা ডাবর কিনতে পারে না। করবেটাবা কি।

গমগমে শব্দ আসছে মেইন রোড থেকে। এই শব্দটা আমার বেশ ভালো লাগে। এটা যুথবদ্ধ সমাজজীবনের একটা প্রতীক। সন্ধ্যা হতে হতে শব্দটা আরও বাড়বে। তখন চায়ের দোকান উপচে পড়বে খরিদ্দারে। রাত দশটা কি এগারোটা নাগাদ লিকার নাড়ার টুংটাং আর আড্ডা চলবে।

পশ্চিমে লাল আভা ছড়িয়ে আছে। রাস্তার উঁচু উঁচু রেইন ট্রির ডালপাতায় লেপ্টে আছে লালচে আকাশ। কেমন যাবে না যাবে না ভাব। গপ্পবাজ গমগমে শহর থেকে কে বিদায় নিতে চায়! দিনশেষে পাখিদের নীড়ে ফেরার দিকে তাকালেই বোঝা যায় কত বিষন্নতাই ওরা আড়াল নিচ্ছে। আসলে, কোলাহল ছাড়া পুরো দুনিয়াটাই মৃত্যুপুরী। শব্দ, কোলাহল, ঝনঝনানি।

সপ্তাহে এই প্রথম গলিটায় পারভীন নেই। নইলে তো মুখ বাড়াতোই। আমি কখন কখন বেরোবো সেটি তার মুখস্ত। শান্তনুর কথা জানে নিশ্চয়। তাই আর বেরোনোর চিন্তা করেনি। দরোজার বাইরে পা রেখেই আমি বুঝতে পারি। প্রত্যেকেই নিজেকে নিজের মত করে প্রকাশ করতে চায়।

ডানে হেরিংয়ের গলিপথ, আঁকাবাঁকা। সেন্ডেলের ঘষা খেয়ে খেয়ে পিঠটা তেলাপোকার পাখার মতো চকচকেও মসৃণ হয়ে গেছে। আমাদের পাড়ার অধিকাংশ বাড়িই সেকেলে। হাফ বিল্ডিং,টিনসেড,ছাপরা। নতুন যেসব উঠছে তা অবশ্য রংচংয়ে। দু-চারতলা। ডানের এই গলির দুইশ গজ পেরোলেই পদ্মাপাড় যাওয়ার কাছাকাছি পথ। শান্তনু আমার সাথে পা মিলিয়ে চললো। মেইন রোডে এখন দিন শেষের ক্লান্ত পথচারী; ঘামঝরা ওদের মুখ। গরম ধোয়া ছাড়া গাড়ি, অটোরিক্সা, ভ্যান। ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা চলছে। রিক্সার টুংটাং, গাড়ির হর্ণের ক্লান্ত শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের দালানে। পাল্লা দিচ্ছে পথচারীর সংলাপ। সব মিলিয়ে জমজমাট। শহরই দিনটাকে আটকে রেখেছে।

ডানের ক্রস রাস্তাটা নদীপাড়ে চলে গেছে। আধাকিলো হবে। আমরা তার বায়ের ফুটপাথ ধরে হাঁটছি। নদীপাড়ের মসৃণ এই পথটায় বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে চার্চ। চারাপাশে গাছগাছালিতে ছাওয়া। যিশু কি অরণ্যের সন্তান? কে জানে। চার্চের সন্মুখ দেয়ালে আটকানো মস্ত পুরোনো ঘড়িটা বেশ দূর থেকেও দেখা যায়। ঘড়ির দোলকটি ব্যালে ড্যান্সারের মতো ছন্দ তুলে নাচছে। চার্চ পেরিয়ে আমরা এতোক্ষণে নদীর পাড় চলে এসেছি।

পদ্মার খাড়া পাড়। কোথাও কোথাও পিরামিডের মত ঢাল। নদী শাসনের অনেকগুলো ঢালাই ব্লক নিচে এলোমেলো পড়ে আছে। নদীটাও এলামেলো। কোথাও তার ছন্দ নেই। নদীটা চোতে মরে ছিল, বোশেখেও মরছে। বিষ্টি-বাওর শুরু হলে প্রাণ পাবে হয়তো। পদ্মার বালুচর দিগন্ত জোড়া। এখান থেকে দেখলে মনে হয়, ওপারের জনপদ যেন আলাদা এক পৃথিবী। তার কোন যোগ নেই এখানকার সাথে। সবকিছুই তার আলাদা আয়োজন। ছোটবেলা থেকেই ওপার নিয়ে আমার বিস্তর কল্পনা। সব সময়ই রহস্যময়, কাল্পনিক রাজ্য এঁকেছি মনে মনে।

৪.

টি বাঁধের ঘাসে বসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গরমে হাঁটা যা তা কথা না। বাদাম টেপার মত করে আঙুল ফুটিয়ে নিজেকে আস্বস্ত করলাম। শান্তনুও শার্টের ওপরের বোতাম খুলে দিল। ওর মুখে আমার মতই বুটিবুটি ঘাম। পদ্মার ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটা গায়ে ফুরফুরি তুলছে। একটু আগেও পৃথিবীটা নরকের চুলোর মতো ফুটছিলো। এখানে সব থির। তবে এখানেও লোকজন ভিড়তে শুরু করবে। ভিড়লেও খুব একটা হুল্লোড় থাকবে না। অনাগত দিনগুলোর মত এই সময়টাও আমাদের দু’জনের কাছেই উদ্দেশ্যহীন। অলস পায়ে হেলেদুলে হেঁটে যাওয়া পথচারীদের কাছেও হয়তো তাই। একটু আগে শান্তনু তার লম্বা লম্বা হাত-পা নেড়ে বাস্তবের এই দুনিয়াটাকেই যেন প্রাণপণে অস্বীকার করতে চাইছিল।

পদ্মার জল এখন রঙয়ে গুলানো শরবতের মত লাগছে। তোকমার মত বুটিবুটি নৌকা ভাসছে। সময় বেশি নেই বলে উঠে পড়লাম। আবার পাড় ধরে আধঘন্টা হাঁটাহাঁটি। নিচে নেমে পড়লাম। বালি পেরিয়ে জলের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম। আবার ব্লকে পা রেখে পাড়ে উঠা। কাজটা আমাদের জন্য বেশ কঠিন হল। মনে হল পাহাড়ী চড়াই উৎরাই পেরোচ্ছি।

দু’জনেই হাঁপিয়ে উঠেছি। আবার ঘাসে হাত ঠেস দিয়ে বসলাম। নিজের নিজের মত চুপচাপ। পারভীন এখানে এসেও আমার সামনাসামনি খাড়া। পারভীন চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। মেয়েটা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, অনধিকার খাটাচ্ছে যা ওর করা মানায় না। কিন্তু ওকে আমি সামলাবো কেমন করে! তেমন কিছইু না, শুধু একদিন ভদ্রতা করে কথা বলা। এতেই এত বেপোরোয়া হয়ে উঠলো। উন্মাদ হয়ে গেছে নাকি। কি করতে পারি আমি ওর জন্য? আজকাল তার কারণে অকারণে হাজির হওয়া। ঘর-বাইর, তন্দ্রা বা ঘুম বা অবসরে। মেয়েটি কি জেনে গেছে আমার হাল-হকিকত? পার্টি থেকে বেরিয়ে আসার খবর? হবে হয়তো, নইলে এত মরিয়া হয়ে উঠছে কেন? দুর্বলতা বুঝেই হয়তো ঘা দিচ্ছে পারভীন। এতোদিনকার সকাল-সন্ধ্যায় নাই কাজের বাগাড়ম্বর ধরে ফেলেছে। হয়তো এও বুঝে গেছে, এই পরিত্যক্ত প্রায় বাড়ির যুবকটির বড়াই করার মত খুব বেশি কিছু নেই। ওর তাচ্ছিল্য ভরা তাকানো। আমি যেন এক হ্যাবলা। নইলে এভাবে জীবনটাকে বাজি রাখে? আজকালকার দিনে কে এমন করে নিজেকে উজাড় করে! মুখের সামনে এসে হয়তো পারভীনের বলতে ইচ্ছে হয়, নেতাদের সাউদগিরি খোঁজ নিয়ে দেখো। খোঁজ নিয়ে দেখেছো কোনোদিন? স্বর্গের দেশ গড়বে বলে নিজেরাই আগেভাগে ভোগে নেমেছে। তোমাদের বিপ্লবের টাকা এখন শেয়ার বাজারে খাটে বুঝলে! কোটি টাকার ফ্লাট ওদের নামে। বিপ্লব হলেই কি আর না হলেই কি, ওরা যা পাওয়ার তার সবটুকু পেয়েছে। মিছেমিছি তোমার বোকারামেরা জীবন বিলিয়ে দিলে। আর দেখো গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। যারা তোমার সাথে মিছিল করেছে, আজীবন রাজনীতি করবে বলে ওয়াদা করেছিলো তারা এখন কেমন ফার্স্টক্লাস জীবন কাটাচ্ছে। ওদের কাছেও বিপ্লবটা ছিল মুখের বুলি। তুমিই শুধু বুঝলে না। নিজেকে প্রায় খরচ করে ফেললে। কি লাভ হলো! ভবঘুরে। বিয়ারিং। এই বয়সেও বিয়ারিং চলছো। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছো, বুড়ো বাপটার পেনশন না থাকলে কি হাল হতো? এসব বুঝতে হয়! আজকাল কে কাকে দেখে বলো!

স্রেফ পাশের ঘর মাত্র, এর বেশি কিছু না। পারভীনকে কি আমি কখনও ঠারেঠোরে কিছু বলেছি। কোনো আক্ষেপ? কেন বলবো? পারভীনকে পাত্তা দেবার সময় কোথায় আমার! ওসব আবেগের ছিটেফোঁটাই ছিল না আমার রোটিনে। মিছিল, মিটিং, স্কুলিং, কালেকশন…কত কি? আর দশজনের থেকে কত আলাদা জীবন। যৌবনের ডাকে সাড়া দেয়া মানে পেটি বুর্জুয়া বনে যাওয়া। তাই নিজেকে আসন্ন বিপ্লবের জন্যে সঁপে দিয়েছিলাম। এক সময় বুঝলাম, নেতারা আড়ালে আবডালে চালিয়ে যাচ্ছেন সবই। যার দিকেই তাকাই দেখি মুখোশ। নিখুঁত মুখোশ সেঁটে থাকা ভণ্ডের দল। ঘেন্না ধরে গেল। এসবের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে চক্ষুশূল হলাম। ক্ষোভে যন্ত্রণায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়া ছাড়া করার আর কিছুই থাকলো না। ভণ্ডদের মুখে তখন মিটমিটে হাসি।

কিন্তু মেয়েটিকে এসব বলার অধিকার কে দিয়েছে যে ঘর-বাইরের ভুলচুক ঘাটাঘাটি করবে? পারভীনের স্রেফ গায়েপড়া বাড়াবাড়ি। তবু ওকে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব না। কেন সম্ভব না সেটাই ঠিক ঠিক আমি বুঝি না। সত্যি বলতে, আজকাল পারভীনের কথা ভাবতে গেলেই মাথাটা কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়। পাড়ার গলিতে বৌচি খেলা মিষ্টি কিশোরী মেয়েটা দেখতে দেখতে বাপের সংসারে আইবুড়ি। কৃষ্ণ কলিরা শুধু রবীন্দ্রনাথের গানেই শোভা পায়। সে জন্যেই কি পারভীন আজকাল বড় বড় চোখে ঘৃণা ফুটিয়ে তুলে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় তার জীবনের দুর্ভোগের জন্য আমিই দায়ী। আসলে মাতাল বাবার সংসারটা তার কাছে বিষিয়ে উঠেছে। ঘানি টানতে টানতে সে ক্লান্ত। এখন যে করে হোক মুক্তি চায়। তার মুক্তি দরকার। আমার মত একটা নড়বড়ে খুঁটিও হাতছাড়া করতে রাজি নয় সে। জোর করে চাপিয়ে রাখা বাঁধটা জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। আমার পক্ষে আর সম্ভব না সেটা আটকানো। গত দু’ বছর থেকে আমি বুঝতে শিখেছি পৃথিবীতে ঠুনকো আবেগেরও মূল্য আছে। জীবন শুধু শ্লোগানময় না। আমি পারভীনকে কিছুই বলবো না।

৫.

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। প্রায় সবাই উঠে গেছে। অন্যদিন হলে আমিও অনেক আগেই উঠে যেতাম। শান্তনু আছে বলে তাড়া করছি না কিন্তু আর থাকা যায় না। ছিনতাইকারী বা নেশাখোরের সামনে পড়লেই পকেট খুলে নেবে। একটু পা চালিয়ে গির্জার রাস্তায় এসে পড়লাম। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় এখন সন্ধ্যার মেইনরোড আলোকিত। ফুরফুরে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।

রাতে আবার শুরু হল, যেখানে আমরা বাদ দিয়েছিলাম। কবেকার এই বাড়ি। কোনকালে বাহির সর্বমঙ্গলা রোড থেকে এখানে চলে এসেছিলেন বাবা, তখন প্রায় নিঃসঙ্গ। আস্তে আস্তে এলাকাটা ওপারের মাইগ্রেটেড লোক দিয়ে ভরে গেল। লোকজনের থিতু হওয়ার কি প্রাণান্ত পড়িমড়ি। কে কোথায় ছিটকে গেল তার হিসেব কে রাখে, কার কি আসে যায় তাতে। তখন মাড়োয়াড়ীর বাড়ি। লাভটা ওদেরই হয়েছে বেশি। জিটি রোডে দশ শতকের উপর চকচকে পাকা বাড়ি। অথচ তার বদলে বাবাকে নিতে হল গলির ছাতাপড়া হাফবিল্ডিংটা। অসম বিনিময় হোক আর যাই হোক দরকারের সময় না পাওয়া গেলে কি করবে? বাপকে ওতেই রাজি হতে হলো। অত খোঁজাখুঁজির সময় কোথায়? হিসেবটা ছিলো ঠাঁই নিতে পারলেই হলো। সময়েই সব গুছিয়ে যাবে। আর, গুছানো না হলেও বা কি, জীবনের নিরাপত্তা যেখান নেই সেখানে সোনামোড়া বাড়ি হয়েই লাভ কি! তবে একটাই চিন্তা ছিলো নতুন করে আবার উচ্ছেদ হতে না হয়। কথা উঠেলে মা আর্তনাদ করে বলতেন, আহারে কি ছবির মতো বাড়ি ছিলো গো খোদা! বাবা মাকে ধমক দিতেন। মা’ও আস্তে আস্তে বলা বন্ধ করলেন। তবে, দিনে দিনে বাবাও কেমন অস্থির হয়ে গেলেন। মাঝরাত অব্দি বারান্দায় পায়চারী করেন। সুযোগ পেলেই একে ওকে বলেন, সবাই কি এলো? কত মুশলমান আছে না ওখানে, তবে? আর আগে এলেও তো কথা ছিল, ঊনসত্তরে এসেও কেন তিনি মুশলমানের দেশের লোভে বিভ্রান্ত হলেন?

বাবা রোটিন করে জিন্না নেহেরুকে দাঁত খিচিয়ে গালি দিতে লাগলেন। মাঝেমধ্যে আমরা ঘর থেকে মনে করতাম বাবা বুঝি প্রতিবেশী কাউকে গালাগালি করছেন। তবে কিছুদিন পরেই বাবা চুপ।

শান্তনু আসতেই বাবার সাথে খায়খাতিরটা জমে গেলো। বারান্দার ঈজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে তিনি চোখ বুজে শুরু করলেন, ‘মনে করো পঞ্চাশ বছর। পাক-ভারত যুদ্ধ থেমে গেলো। কিন্তু মনে কি আর শান্তি আছে। আর আমরাও এসে ঠাঁই নিলুম, বুঝলে। ছেচল্লিশে নাঙা তলোয়ারের তাণ্ডব এরপর সাতচল্লিশের ফয়সালার পর এই ধরো ঘেন্না লেগে গেলো সবার। হিন্দু মুসলমানে আসতে যেতে শুরু করলো। এরপর পয়ষট্টির যুদ্ধ। থামলো তো কিন্তু কোথায় ফয়সালা হলো বলো দিকিন? এরপরেও তো এলো! আমরাও এলুম। আসা যাওয়ার ঐ মিছিল অনেক দিন ছিলো বুঝলে। পাক-ভারতের কতো কিরতি দেখো! লুড়ুর ঘুটির মতো লাখ লাখ মানুষকে দিব্যি চেলে দিলো। কে কোন নরকে গিয়ে পড়ে পড়ুক। জিন্না নেহেরু কারও চোখের পাতা কাঁপলো না। ভাগ্যিস একটা সার্টিফিকেটের জোর ছিলো রেলওয়ের চাকরিটা নিয়ে জান বাঁচালুম। ওপার আর কখনই টানে নি।যাবো কি করতে? সব তো বিকিয়ে দিয়েছি।

সংসারের খুটিনাটি নিয়ে বাবাই মাথা ঘামান। আমি প্রায় আগের মতোই উদাসীন। তিনি বুঝেন, সাবেক কমরেড ছেলেটাকে বলে লাভ নেই। বলতেও চান না তিনি। তিনি জানেন, ঐ ভোঁতা লোহায় আর ধার উঠবে না। কদাচিৎ সামান্য ফুট ফরমাশ এই যা। ওটুকুনই। ও বেলার পাতি নেই, লিয়াসতে হবে কিন্তু বুঝলে…

এটুকু বলেই বাবা বহু পুরোনো সিরামিকের মগে হাত ঢুকিয়ে পরিষ্কার করতে থাকেন। পেটটা ফের মুচড়াচ্চে দেখ্যো, একদুটো মেট্রোও লিয়ে আসবে। মা গজর গজর করে বাবাকে বলবেন, বুয়াটা একেবারেই কথা শুনছে না। তেলটা বেশি বেশি ঢালছেই। এতো তেলে কি পেট ভালো থাকে! শাহিনের সাথে কথা কহেছিলে? কি বুললো? টাকা পাঠাবে না চলে আসবে?হারামজাদা ছেলেকে কি বুলবো বল দেখিন, ঈদটাতো বাড়ি এসে করবে!চালের দামটা হু হু করে বাড়ছেই, মানুশজনকে না খাওয়িয়ে মারবে নাখি!

প্লেয়ার চলছিল। একটু আগে শান্তনু নিজেই উঠে বন্ধ করে দিল। দেখতে দেখতে রাত ফুরিয়ে যাচ্ছে। দেশভাগ, বিপ্লব, বাবা, সঙ্গীত…। ওপাশে নিশ্চয় মাথা হাতে রেখে ঘুমাচ্ছে মা। অনেকক্ষণ আমরা কেউ কোন কথা বলিনি। আমরা দু’জনেই হয়তো নীরব থাকতে চেয়েছিলাম। হঠাৎ শান্তনুর দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়লো কিন্তু আলো নেভানো থাকায় ওর মুখটা দেখা গেল না। আমি দেয়ালের দিকে পাশ ফিরলাম।হঠাৎ অবরুদ্ধ অন্ধকার থেকে বোবা দেয়াল বা তন্দ্রাচ্ছন্ন শান্তনুর দীর্ঘশ্বাস শুনা গেল।

বিশ বিশটি বছর…

আসন্ন ঘুমের ঘন মাদকতা ফুঁড়ে আমিও লম্বা শ্বাস টানলাম।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top