ইরাকি কবি আনোয়ার ঘানি’র কবিতা II ভাষান্তর গৌরাঙ্গ হালদার

যুদ্ধের পুত্র

শৈশব থেকে আমি খুঁজছি আমার মুখ
মুখ চুরি করে নিয়ে গেছে যুদ্ধ
আমি যুদ্ধের পুত্র
আমার হৃদয় এক অন্ধ মরুভূমি
আমার স্মৃতি একটি ভাঙা আয়না
আয়না টুকরো টুকরো হয়ে গেছে
কঠিন যুদ্ধের নাচে।

আমি এক ইরাকি লোক
আমার জীবন মুলতুবি করা হয়েছে
আমার দৃষ্টি সৌন্দর্যের কিছু জানে না
আমার স্বপ্নের পিরাণ খুব ছোট
আমার হাত জনশূন্য রাস্তার মতো ফাঁকা
আমার কামনা কেবল রক্ত আর অশ্রুবিহীন ফোরাত দেখা
আমি বাঁচতে চাই মিসাইল বিহীন শিম ক্ষেতের মাঝে
মিসাইল ভেঙ্গে দিয়েছে ব্যাবিলনের পাঁজর
যুদ্ধের কন্যা ব্যাবিলন, তুমি তো আমারই মতো
তোমার মুখ নেই, স্বপ্ন নেই
তুমি ঘুমাও শুকনো মাঠে হাসি ছাড়া।

ধ্বংস করে দেয়া দেশের লোক আমি
যুদ্ধের দেশের মুখবিহীন লোক আমি
এখানে নেই কোনো গোলাপ
পাখিরা তাদের গান ভোলার কথা ভেবেছে
এখানে নেই কোনো ঠোঁট
ফোরাত নিজেই বেঁকে গেছে
একটি বাদামি সজারুর মতো।

ইরাকে সূর্য হলুদ নয়
ধোঁয়া তার গালে লেপে দিয়েছে কালো রঙ
চাঁদ এখানে ফ্যাকাশে আর আমি
এই ভচকানো দুনিয়ায় শেষ প্রেমিক।
আমার হৃদয়ের দিকে তাকাও
তুমি দেখবে তা শূন্য
আমার চোখের দিকে তাকাও
তুমি দেখবে তা অন্ধ ও লাল
ইরাকে কোনো সুন্দর নেই
আমাদের নারীরা ভুলে গেছে তাদের প্রদীপ্ত ত্বকের কথা।

আমি অন্ধ একটি গাছ
সন্ধ্যার মৃদু সমীরের গুঞ্জন আমি জানি না
আমি জানি শুধু এই জগতের
জীর্ণ ধ্বংসের অবশেষ
ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা।

আমার পাতাগুলো বিবর্ণ
আমার স্বপ্ন বসে আছে সূর্যাস্তহীন আবছা সন্ধ্যায়
অন্ধ দরোজার কাছে।
ধূসর পাখিটা তার মিলিয়ে যাওয়া ফিসফিস ভালবাসে
তবে যখন সে খোঁজে তার বাস্তব মুখ
দুঃখী শাখা প্রশাখা ছাড়া সে পায় না কিছু আর।

আমি যুদ্ধের পুত্র
আমার স্মৃতি চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে
তার পাথরের নাচে।
আমার হৃদয় রঙিন তার তমসাময় আত্মার সাথে
তার ঠাণ্ডা হাঁটুর কাছে
শেষ হয়ে যায় পর্বতমালার গল্প,
তুমি আমাকে প্রকম্পিত খুঁজে পাবে ভয়ানক
ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মাঝে।

আমার জলের দিকে তাকাও
কেমন নোংরা হয়ে আছে দেখ
আমার আগামির দিকে তাকাও
সে অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছু নয়।
আমি সুপুত্র, আমি তার আয়না
আমি দিতে পারি ঘুম ঘুম সকালের সবগুলো ফুল
আমি খেয়ে নিতে পারি সকল গাভীর দুধ
আমি ধ্বংস করে দিতে পারি সিডার বনের সবগুলো আত্মা।
এখানে, আমার বুকের তলে আছে পৌরাণিক আগুনের স্বর;
যে স্বর সমস্ত সুন্দর আয়নাগুলো টুকরো টুকরো করে দেয়
আর একটি বাসনা খুন করে চাঁদের স্বপ্নকে।

আমি এক ইরাকি লোক
আমার জীবন মুলতুবি করা হয়েছে
যুদ্ধ আমার মুখ চুরি করে নিয়ে গেছে
আমার স্বর ছায়ার মতো বাষ্পময়
আমার স্বপ্নের পিরাণ একটা হাসির মতো ক্ষণিক
সৌন্দর্য আর প্রেম সম্পর্কে আমি কিছু জানি না
আমি চাই না কোনো রঙিন টুপি
চাই না কোনো সোনার ঘড়ি
আমার চাওয়া একটি দিন অন্তত
ফোরাতের জল দেখি রক্তবিহীন
দেখি ব্যাবিলনের পাজর ভাঙ্গে না মিসাইল।
যখন তুমি আমার বাগানে আসবে
দুঃখ ছাড়া পাবে না কিছু খুঁজে
দেখবে না কিছু চুরি হওয়া মুখ ছাড়া।

এই আমি তো যুদ্ধের পুত্র
আমি কবিতা পড়তে পারি না
আমার চোখ চুরি হয়ে গেছে;
যে চোখ দেখেছিল জীবন তা হয়ে গেছে কোণঠাসা।

আমি কবিতা বিরোধী নই
মানুষের আত্মা মিরাকেল
কিন্তু তুমি যেমন দেখছ, তা সৌন্দর্যের কোনো মিরাকেল নয়
এ আমার শূন্য জীবন।

আমার সবুজ শৈশব আর নেই
মহিমা দেখার জন্য আমার মাঝে আর কিছু দাঁড়াতে পারে না
আমি নিশ্চিত, কবিতা যদি আমার বেদনার কথা জানে
সে কাঁদবে তিক্ততায়, সে ভুলে যাবে তার তৃষ্ণার্ত শাশ্বতিক।
আমি জানি মহিমাময় ভূমি, মহিমান্বিত বংশধর
আর মহিমান্বিত মহাদেশের কথা
কিন্তু আমি তো কেবল একটি রাস্তা ও লক্কর ঝক্কর গাড়ি
এই সব প্রস্ফুটনে,
আমি জানি মানুষের আত্মা এক বিশাল মহাবিশ্ব
আমি জানি কবিতা মরবে না
কিন্তু আমি তো শুধু জীবনহীন একটি ছায়া মাত্র।

আমার জোব্বা লাল
আমি যুদ্ধের পুত্র
তুমি যা দেখতে পাবে তা দুমড়ানো মুচড়ানো অবশেষ,
শান্তিপূর্ণ কোনো জামার কথা আমার মনে পড়ে না
আমাদের শহরের নববধূ তার
বিয়ের আগেই খুন হয়ে গেছে
অচেনা লোকেরা থেতলে দিয়েছে আমাদের ভূমির মুখ
এখন আমরা প্রেম নিশূন্য
চাঁদের গল্প আর আমরা জানি না
আমরা খুঁজে বেড়াই আমাদের হারানো জামা
এই সাদা ও বিশাল জগতে।
এখানে আমরা দেখতে পাই না কোনো হাত
যুদ্ধের মুখের মাঝে তারা গুম হয়ে গেছে
আমরা কোনো স্বর শুনতে পারি না
তারা হারিয়ে গেছে তার অবর্তমান সাগরে।

দরদি বন্ধু আমার, যুদ্ধের পুত্র আমি
ধোঁয়া ছাড়া কিছু চিনি না
অন্ধত্ব ছাড়া দেখি না কিছু
আমার নদী ভরা লোনা অশ্রুতে
আমার মরা বাচ্চারা শুয়ে আছে শুকনো রাস্তায়
সস্তা নুড়ি পাথরের মতো।
আমার হাতের দিকে দেখো
তারা থ্যাতলানো বাতিল কাগজের মতো
আমার মুখের দিকে চাও
প্রকাশ্য দিবালোকে তা চুরি হয়ে গেছে
আমি কোনো উৎসব চাই না
চাই না কোনো গান
আমার দেখার আশা শুধু
আমার নারীদের চোখে কান্না নাই
আমার পাখিটা না কেঁদেই গুনগুন করে।
ও অন্ধ জগত, কে আমার
স্বপ্ন খুন করেছে ঠাণ্ডা মাথায়?

আমি যুদ্ধকে চিনি
চিনি তাদের কদাকার গলা কেননা
আমি তাদের পুত্র।

যুদ্ধ এক ধূসর কাহিনী
নিঃসঙ্গ রাতে সে পরে তার লাল রাত্রিবাস
সে চুরি করেছে আমার রক্ত ও হাসি
আর তাই, ব্যথার ক্ষণ ছাড়া তুমি কিছু দেখবে না।
আমাদের শিশুরা সকালে তাদের চোখ ভরে
ঝাপসা মেঘে,
সন্ধ্যায় তুমি গন্ধ পাবে ক্ষুধার্ত আত্মার।

আমাদের ঘরের দেয়ালগুলো
থ্যাতলানো আত্মার মতো ফাটলে ভরা
আমাদের রাস্তার রঙের মতো
আমাদের নববধূর ফুলশয্যা রক্তে লাল
বুড়ো আর তরুণেরা বসে থাকে অন্ধকারের কোণে
তাদের অপেক্ষা শুধু ঝাপসা নিয়তির জন্য।
প্রতিটি হাত এখানে প্যারালাইজড
কোনো পাপ ছাড়াই আমরা ডুবে যাচ্ছি
আগুনের নরকে
আর তুমি, প্রিয় পাঠক কিছুই করতে পার না।

আমি রঙহীন গল্পের এক জীবনহীন গাছ
আমি এক লোক পারি না নির্ভয়ে বাঁচতে
ধ্বংস করে দেয়া এই দেশে মর্যাদা নেই
নেই কোনো কবিতা
তুমি দেখতে পাবে শুধু ফ্যাকাশে মৃত্যু।

আমাদের ঘরগুলো কালো তিক্ততায় ভরা
আমাদের ঘাস সবুজ নয়
আমাদের মেয়েরা বেদনার মাঠ
রাস্তাগুলো যুদ্ধের আয়না।
আমরা অন্ধ মৃত্যুর পুত্র
কিন্তু আমাদের কোনো দোষ নেই
আমাদের জামায় লেগে নেই কোনো রক্ত।

============================
মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে ইরাক অঞ্চলের প্রাচীনতা সুবিদিত। তার প্রাচীন কৃতি, সংস্কৃতি ও অবদান এড়িয়ে যাওয়ার দুঃসাহস পৃথিবীর নেই। তবে, হাজার বছরের সুপ্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলো গুড়িয়ে দিতে, ‘আধুনিক’ দুনিয়ার বুক কাঁপেনি। সমকালীন পৃথিবীতে যুদ্ধক্ষেত্র মানে, কামানের নলের সামনে ভেসে ওঠা প্রাচ্যের শিশুর ছবি। প্রাচ্যের নারীর ছবি। প্রাচ্য মানে যেন গোলাগুলি। প্রাচ্য মানে যেন বারুদ ঠাসা ভূমি। অথচ পুরো দুনিয়ার সভ্য হয়ে ওঠার ইতিহাসে, প্রাচ্যের অবদান অবিস্মরণীয়।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে, বহুমাত্রিক সংঘাতে রক্তে ভিজে গেছে মরুভূমির বালুকারাশি। কিন্তু বালুকারাশি রক্তের চিহ্ন ধরে রাখতে জানে না। কেবল কবি পেতে দেন তার বুক। সংবেদনে ধরে রাখেন রক্তের ইতিহাস। অত্যাচারের ইতিহাস। ইরাকি কবি আনোয়ার ঘানি তাঁর তুলনাহীন দরদে, ধ্বংসযজ্ঞের সেই কাহিনী তুলে ধরেছেন। তাঁর বলার ধরণ সরল। তবে বালুকারাশির নিচের জগতের মতো তা গভীর।

কবির অনুমতিক্রমে বাংলায় অনূদিত কবিতাটি নেয়া হয়েছে তাঁর ‘কালার্ড হুইসপার্স’ গ্রন্থ থেকে। কৃতজ্ঞতা জানাই আমার বন্ধু, কবি মালেকুল হক’কে। যিনি ছিলেন কবি আনোয়ার ঘানির সঙ্গে আমার সংযোগ স্থাপনের সূত্রধর। ‘লেখালেখির উঠান’ এর পাঠকদের জন্য শুভেচ্ছা।

আনোয়ার ঘানি: জন্ম ১৯৭৩ সালে। ইরাকের ব্যাবিলনে। একাধারে তিনি একজন কবি, চিকিৎসক ও মুহাদ্দিস। আরবি ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আশিটিরও বেশি। নিজের দেশে তো বটেই, যুক্তরাজ্য, আমেরিকা ও এশিয়ায় পঞ্চাশটিরও বেশি নামকরা সাহিত্য ম্যাগাজিনে লেখা ছাপা হয়েছে। দেশে বিদেশে অনেকগুলো সম্মানজনক পুরষ্কার পেয়েছেন। ইংরেজিতে সর্বাধিক পঠিত কাজের মাঝে আছে, ‘আই অ্যাম অ্যান ইরাকি ম্যান’; ‘ইট ইজ আ ম্যাটার অফ লাভ’; ‘মঞ্জুনাথ’; ‘ট্রাভেল’; ‘রেইন শাওয়ার্স’; ‘হি ইজ আ সোলজার’; ‘আ ফার্মারস চ্যান্টস’; ও ‘কালার্ড হুইসপার্স’।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top