জাদুকর // মাসুম বিল্লাহ

পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে…ও জীবনবাবু শুনছেন, আজ আমাকে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে আসতে হলো! সম্পাদক সাহেব তার রুমে ঢেকে পাঠালেন, তারপর পিয়নকে চা দিতে বললেন… তিনি খুব ভালো করে জানেন আমি চা খাই না, তারপরও এই খাতির, না খাতির তো নয়-ই, অদ্ভুতরকমের একটা সম্মান বলা যেতে পারে, আমার তেমনটিই মনে হয়েছিল তখন।…সঙ্গে সঙ্গে ‘না না’ করে উঠে সম্পাদক সাহেকে বলেছি— রফিক ভাই, আমি চা-সিগারেট কিছু খাই না, আপনিও তা জানেন!’

রফিকভাইও বললেন, ‘আরে নিয়াজ আপনি দেখি এখনো বাচ্চাদের মতো আছেন, খাননি বলে আর কখনো খাবেন না—এমন তো কোনো কথা নেই, আজ থেকেই নাহয় শুরু করলেন…’

তারপর তিনি বেশ মজার কৌতুক বলেছেন মনে করে হাসতে লাগলেন, আমাকেও সে হাসি উপভোগ করার অভিনয় করতে হয়—

ঠোঁটেও এক কোণে সে ব্যর্থ চেষ্টাটুকু করার চেষ্টা করেছি…কিন্তু ঠিকঠাক ফুটে উঠেনি জানি…

তারপর নিজেই বললাম— রফিক ভাই, জরুরি কোনো অ্যাসাইন্টমেন্ট আছে নাকি, থাকলে বলেন, করে দিচ্ছি…’

রফিক ভাই মুখ খুলছেন না, ইচ্ছাকৃত দেরি করছেন, দেড় মিনিটের মতো সময় নিয়ে খুব সুন্দর করে ‘আমার চাকরি না থাকার’ কথাটা বুঝিয়ে বললেন…!’

আমিও আর কথা খরচ না করে…স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রুম থেকে বেরিয়ে আসি!

অফিস থেকে চলে আসার সময় সবাই জানল— আমি চাকরিটা আর করছি না!…এইটুকুই।

ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত সড়কে নেমে এত মানুষের ভিড় আমার চোখে পড়ল না, যতদূর চোখ যায় সব শাদা… কেমন একটা ঘোলাটে দৃশ্য… চেনা শহরে কেমন অবাক করা একটা ব্যাপার! বুঝতে পারি, একটু আগের ঘোর।

ব্যাপারটা মন থেকে তাড়াতে চেষ্টা করি। এখন বরং লড়াই করে একটা বাসে উঠে বসতে হবে…কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলাম না ঠিক কোন বাসে উঠবো আমি, চোখের সামনে দিয়ে একটার পর একটা বাস চলে যাচ্ছে… যাত্রীরা যত দ্রুত নেমে আসতে চাইছে, তারচেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে যাত্রীরা বাসে উঠতে চাইছে, এতে করে লেগে গেল নিত্যকার ঠোকাঠুকি…

আমার আর ভিড় ঠেলে বাসে ওঠার সাহস হলো না, শরীরেও রাজ্যের আড়ষ্টতা জেকে ধরল, কেমন বোধশক্তিহীন হয়ে পড়লাম…

এতদিনের চেনা শহর, চেনা রাস্তা, তিন নম্বর, সাত নম্বর, আট নম্বর বাস…সব কেমন যেন অচেনা মনে হলো…একবার নিজের উপর রাগও হলো, আবার হাসিও পেল…যাহ্ শালা…পাগল-টাগল হয়ে গেলাম নাকি…’

বাসে চড়ার ইচ্ছেটা দমন করে ফেলি। তারপর অদ্ভুত ঘোরলাগা এক বিভ্রম নিয়ে হেঁটে হেটেই চলে আসি পার্ক অবধি…,

নিজেকেই ধন্যবাদ দিলাম, গুড জব, নিয়াজ হাওলাদার।

আহা, এই পদবীটা কতদিন পর মুখ ফুটে বের হলো…কেবলমাত্র আমার মরহুম নানাজানই অদ্ভুত এক ঢঙে উচ্চারণে ডাকতেন—

‘ভাই নিয়াজ হাওলাদার দুপুরের খানা খাইছেন, নাকি আমার লগে আরেকবার খাইবেন?’

কিন্তু এই শহর এই পদবীটাকে টুপ করে হাপিস করে দিয়েছিল, তার জায়গায় ‘হাসান’ বসিয়ে হয়ে গেলাম ‘নিয়াজ হাসান’!… আমার না যত দায় তারচে আমার  কবি সত্তা ও কবিবন্ধুদের দায় বহুগুণ বেশি, তারা বলেছিল— ‘এসব ক্ষ্যাত্ নাম চলবো না কবি’!

আমাকে মেনে নিতে হয়েছিল। এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমি মূলত কবি হলেও পেট চালানোর জন্য ‘গল্প’ লেখার জন্য বাড়তি একটা কলম ধরতে হয়েছে…

সবার ধারণা কবিরা গল্প ভালো লিখতে পারেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমি একমত না, কবি কবিতারই ইবাদত করবে, আর গল্পকার শুধুর গল্পের-ই পথে হাঁটবে…

তবুও সময়ের ফাঁদে পড়ে আজ আমি নিজেই একটা ‘গল্প’ হয়ে গেছি! একেই বলে ভাগ্য!—  মন্দভাগ্য কি?

এই অবেলায় ঘরে ফেরার মতো বোকামি করা যাবে না, পরিচতদের কাছেও না… বরং পার্কের বৃক্ষসমাজের মাঝে নিজেকে সঁপে দেওয়াই সমীচীন, ওদের ভেতর কূটকথার চাল নেই, নেই প্রভাব ও প্রতিপত্তি জানান দেওয়ার সূক্ষ্ম চেষ্টা…

পার্কের ভেতরও কেমন একটা থমকে থাকা গুমোট হাওয়া, চঞ্চলতার ছোঁয়া দেখতে পাচ্ছি না প্রকৃতির মাঝে… হলোটা কী!

একা কোথাও বসতে মন টানল না। ভিড় চাই, নয়ত কারোর সঙ্গে একটা বেঞ্চ ভাগাভাগি করে বসা যেতে পারে… ইতিউতি চেয়ে মনের মতো পেয়েও গেলাম, তবে একজন নয় দুইজন মানুষ; গায়ে গায়ে লেপ্টে আলাপে মশগুল!

আমি উপযাজক হয়ে তাদের পাশে বসতে গেলে তারা যদি ওখান থেকে উঠে অন্য কোথাও গিয়ে বসে? তবু ঝুঁকিটা আমাকে নিতে হবে… না দেখার ভঙ্গি করে বেঞ্চের এক পাশে টুপ করে বসে পড়লাম…

আশ্চর্য হলাম! হওয়ার মতোই তো কথা, আরে দুইজন মানুষের একজনও আমার উপস্থিতি টের পেল না কেন! দুইজনের একজনও ফিরে দেখবে না তাদের পাশে এসে কে বসল?

এটা অদ্ভুতুড়ে কী?

এ নিয়ে আর ভাবতে চাইলাম না…

আমার অপেক্ষা বাড়তে থাকে… গল্পে মশগুল মানুষ দুইজন… ‘যেচে আলাপ করবো’ কি না—  ভাবি, পরমুহূর্তে সিদ্ধান্ত পাল্টাই, কতক্ষণ এভাবে চলে দেখা যাক না…

এই দুইজনের বয়স আমার চেয়ে খুব বেশি একটা নয়, তবে দ্বিতীয়জনের চেয়ে প্রথমজনকে বয়সে ভারি মনে হলো, আমার বাঁ পাশেই তিনি… আবার এমনও হতে পারে সাজ-পোশাকে বয়স ঢেকে রাখার চেষ্টা তাদের দুজনের মধ্যে নেই!…

তাদের সব কথা আমি শুনতে পাচ্ছি, পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি…আমি গল্প লেখার রসদ এখান থেকেও তো নিতে পারি ভেবে… আমি আরো সর্তক হলাম, আমি যেন তাদের দুজনের বিরক্তির কারণ না হই…

প্রথমজনের শরীর থেকে অন্যরকম মোহময় গন্ধ আমার নাকের ভেতর ঢুকছে তা টের টাচ্ছি, কিন্তু গন্ধটা কীসের হতে পারে… কপুর্র না ন্যাপথলিন….তাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না… শরীরে সঙ্গে ঢিলেঢালা পাঞ্জাবীর পূর্বের রং যে দিনে দিনে মলিন হয়েছে সেটা সহজেই অনুমেয়…তবে এখনকার ঠিক রঙের নামটাও এই মুহূর্তে দিতে পারছি না আমি!

লোকটার পায়ের কাছে ছোট মতোন একটা ব্যাগ, ঠিক ব্যাগও নয়… আহা কী বিপদ, ঠিকঠাক শব্দ, উপমা মাথায় আসছে না কেন! চাকরি হারানোর সঙ্গে এর কী সম্পর্ক!

নাকি কম্পিউটারের হার্ডডিক্স যেমন বলা নেই কওয়া নেই ধাম করে বসে যায়, আর কাজ করে না— তেমনি আমার মাথাও বসে গেল? যেতেও পারে, অস্বাভাবিক তো কিছু নয়…

ধ্যাত্ তাদের কথাগুলো ত মিস করে যাচ্ছি এই  বাড়তি চিন্তা করতে গিয়ে…

তখন আমার পাশের মানে বাঁ পাশের মানুষটি বেশ ভরাটকণ্ঠে তার পাশে বসা মানু্ষটিকে বলল— ‘না রে ভাই, অখন আর কেউ জাদুটাদু দ্যাখতে চায় না, বুঝোই তো, দ্যাশ ডিজিটাল হইছে, বুড়া-গুড়া ব্যাবাকতে খালি দিন-রাইত মোবাইল টিপে…মোবাইলের মইদ্যেই জাদু দ্যাহে…আমগো দিন শ্যাষ!… তয়কামের মইদ্যে এইডা ছাড়া আর কিছু পারি না… সংসার কেমনে যে চলতাছে…উপরআলায় জানে… বুঝলা, ঘরে এক হালি মাইয়া-পোলা…কী খায় না খায় কইতে পারি না কিছু…’

জাদুকর! এই লোকটা, এ আর এমন কী! আমার মনে হলো জাদুকর লোকটা ইচ্ছে করে মাঝ পথেই তার কথা থামিয়ে দিল!

তখন সঙ্গে সঙ্গে তার পাশের বসে থাকা মানুষটি বেশ বিনীতস্বরে বলল, ‘আমাকেও দুই-একটা জাদু শেখাবেন, জাদুকর ভাই?

— আরে মিয়া কী কও, তুমি হইলা একজন লেখক মানু, তুমি জাদু শিইখ্যা কী করবা?’

জাদুকরের মুখে ‘লেখক’ শব্দটি শুনে আমার বুকের ভেতর দশমীর ঢোলের বাদ্য বেজে উঠল! বুকের উপর হাত রাখলাম— ঢিপ ঢিপ শুনতে পাচ্ছি। কী আশ্চর্য! দুই পাশে দুই লেখক, মাঝখানে জাদুকর!

যদিও আমি নিজেকে কবি ভাবতেই পছন্দ করি।

পাশের অচেনা লেখকভাই তখন মলিনকণ্ঠে বলল, ‘জাদুকর ভাই, আপনাকে বলতে লজ্জার কিছু নেই— আমার সংসারও টিমটিম করে চলে, চলে আবার চলে না, গ্রামের মানুষ সারাদিনে আর কয় কাপ চা খায়, বলেন?’

— তুমি না কইলা তুমি লেখক! অহন আবার চায়ের দোকানের কতা কইতাছো, কাহিনিডা বুঝতাছি না, খুইল্লা কও তো মিয়া!’

জাদুকরের সঙ্গে সঙ্গে আমিও অবাক হই, লেখকের— টি-স্টল! লেখক চা বিক্রি করে! আবার নিজের কথাও মনে এল— ছিলাম কবি, করি চাকরি, এখন কবিতা ও চাকরির পাশাপাশি গল্পের উঠোনে অযাচিতের মতো ঢুকতে হয়েছে— পেট চালানোর জন্য এই বাড়তি খাটুনি। যে চাকরি করি তাতে মাস চলা মুশকিল— একটা দৈনিক পত্রিকায়, মালিকপক্ষের টাকার অভাব নেই, কর্মচারীর বেতনের বেলায় সুদান রাষ্ট্রের সরকারের মতো আচরণ! গরীবের চেয়েও গরীব। তবে চাকরিটা আমার পছন্দের বটে, সাহিত্যপাতার সাহিত্য সম্পাদকের পদ!

বাইরে থেকে মনে হবে খুব বিশাল কিছু, আদতে তেমন বড় কিছু না, বেতন নামমাত্র, বাড়তি খাটুনি, মাসের পর মাস বেতন বন্ধ থাকে, শেষে এর কাছে ওর কাছে হাত পাততে হয়… থাক, আমার কথা পরে বলার সুযোগ পাওয়া যাবে, এখন পাশের দুইজনের গল্প শুনি, নয়ত অনেকটা কাহিনি মিস করে যাবো…

কান পাতি সন্তপর্ণে জাদুকরের চমকে ওঠা প্রশ্নে লেখকভাই এবার ঠোঁটের কার্ণিশে এক চিলতে হাসি ধরে রেখে বলল, ‘আমার মতো গ্রামের ছেলে লেখক হওয়ার স্বপ্ন যে দেখেছিলাম সে কথা ভাবলে এখনও আমার শরীর কেঁপে ওঠে জাদুকর ভাই, সত্যি বলছি, আমার ভীষণ লজ্জাও লাগে!… আমরা গরীরই ছিলাম, বাবা অন্যের জমিতে কৃষাণ দিত, অকালে একদিন বাবাও মারা গেলেন। মনে হলো রাতের অন্ধকারে আমাদের নৌকাটি ডুবে গেল গভীর সমুদ্রে! আমাদের আর বাঁচার আশা নেই, তারপর একদিন মা-ও বাবার শোক সামলাতে পারেননি, চলে গেলেন বাবার জগতে। আমি একা হয়ে গেলাম।… স্কুলে থাকতেই আমি টের পেলাম আমি লিখতে পারি, কিন্তু তা কাউকে বলা বা দেখানোর সাহস হয়নি। তারপর কলেজে উঠার পর দুই একজন বন্ধুর কানে যেতেই তা ছড়িয়ে যায়। স্থানীয় পত্রিকায় আমার প্রচুর লেখাও ছাপা হয়েছে, কিন্তু শহরের পত্রিকায় কেন যেন ছাপা হয়নি, কারণটা আমিও ঠিক জানি না। তবে আমার ধারণা, আমার লেখা ওসব পত্রিকায় ছাপানোর মতো হতো না বলেই ছাপা হতো না।… ধরেন, আমার পকেটে আছে একশ টাকা, এই একশা টাকা দিয়ে আমি তো এক হাজার টাকার কেনাকাটা করতে পারবো না! লেখাও তেমনই একটা ব্যাপার, একেকজনের লেখা একেক রকম। যার পকেটে রসদ যেমন, রসদ বলতে টাকা-পয়সার কথা বলছি না, লেখার জন্য রসদ যার পকেটে যেমন থাকবে, তার লেখাও তেমন হবে; কারোর লেখা খুব ভালো, কারোর একটু কম ভালো…আমি বোধহয় শেষ দলেরই হবো! এ নিয়ে আমার কোনো দুঃখ নেই। তবে আমি মনে করি, লেখালেখি আমার ভেতরকার একটা ব্যাপার— যা আমার ভেতরে সৃষ্টিকর্তাই দিয়ে পাঠিয়েছেন! জানেন, এই লেখালেখি আমার কাছে ইবাদতের মতো একটা ব্যাপার।… বিয়ের পরও আমি লেখালেখি ছাড়িনি, চায়ের দোকান চালাই আর সুযোগ বুঝে লেখালেখি করি… তবে জাদুকর ভাই, আমার লেখার মধ্যে একটা কমতি কিন্তু আছে, যেমন ধরেন, আমার সব লেখাই গ্রামকেন্দ্রিক! আমার ইচ্ছে করে শহরের মানুষ, উঁচতলার মানুষ, ধনীদের ড্রয়িংরুমের গল্প, বেডরুমের গল্প, ব্যালকনির গল্প…তারপর ধরেন, মন্ত্রীটন্ত্রীদের জীবন নিয়ে…কিন্তু কলমে  এসব উঠে আসে না, আসবে কীভাবে—

কখনো তো শহরেই আসিনি, এদের সঙ্গে মেশারও সুযোগ হয়নি, তাই জানিও না কিছু… ধারণা করে কল্পনায় লেখা যায়, কিন্তু আমার মন সায় দেয় না…’

জাদুকর মনে হয় লেখকভাইয়ের লম্বাকাহিনিতে অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন! সেকারণে কিছু একটা বলে লেখকভাইকে থামিয়ে দিলেন। এই ফাঁকে আমারও মনে হলো, আমিও এখনো গ্রাম নিয়ে গল্প লিখতে পারিনি—তার মানে আমাদের দুজনের একই সমস্যা!

জাদুকর লেখকভাইটিকে বললেন, ‘মুই তো তোমার মতো লেখক না… হেরপরও বুঝলাম কিছুডা, তা কও তো জাদুবিদ্যা শিখতে চাইছো ক্যান? জাদু বিদ্যা তোমার কোন কামে লাগব? চায়ের দোকান, খাতা-কলম ছাইড়া দিয়া জাদু দেখাবা… হা হা… হোনো জাদু খেলার আর খানা নাই, চায়ের দোকানে বইসা তাও ডাইল-ভাত জোডাইতে পারো…’

— জাদুকর ভাই, চায়ের দোকান দিয়ে অনেকে রমরমিয়ে চলে ঠিক-ই, কিন্তু আমার একদমই চলছে না! আমার বউও সবসময় বলে, ‘মাথার মধ্যে সারাদিন লেখার চিন্তা থাকলে চায়ের দোকান কী আর চলে’?…কিন্তু বিশ্বাস করেন জাদুকর ভাই, আমার কাজেকর্মে কোনো ফাঁকি নেই— মন দিয়ে সব কাজ করি! তাও বেচাবিক্রি নেই… জানেন, আমার একটা মাত্র ছেলে— ওর কোনো শখ আমি পূরণ করতে পারি না… এই অক্ষমতাই যে কত বড় পরাজয় তা বোঝাতে পারবো না…

— দোকানে বেচাবিক্রি না হইলে পেট চলে না, আবার পোলার শখ কেমনে মিটাইবা!’

— জাদুকর ভাই, ব্যাপারটা আপনি ঠিকই বুঝতে পারছেন… একটা ঘটনা বলি, তাহলেই বুঝবেন আমার কষ্ট… ছেলের বয়স তিন শেষ হয়ে চারে পড়বে, কিন্তু এখনই সে মোনাজাত করে…বিড়বিড় করে…প্রথম প্রথম আমি তেমন গুরুত্ব দেইনি, ভেবেছি, বাচ্চাদের খেয়াল, কিন্তু একদিন আমি ছেলের  মোনাজাত শুনতে পেলাম—

‘আল্লা আমারে চকলেট দেন, একটা গাড়ি দেন, তারপর একটা ঘোড়ার গাড়ি দেন…’

শুনে আমি লজ্জায় মরে গেলাম যেন।  দ্রুত ওখান থেকে সরে আসি…পিতার পরাজিত মুখ সন্তান যত কম দেখতে পায়!

— এ ছাড়া আর কী করতে পারতা তহন!’ জাদুকর মুখ মলিন করে বলল।

— পরদিন ছেলেকে কাছে টেনে বললাম, আজ তুমি আল্লাহর কাছে কী চেয়েছো, বাবা?

ছেলে বেশ খুশি হয়ে উঠল, ‘তারপর বললো— ‘স্ট্রবেরি’!

আমি একটু অবাকই হয়ে ছেলের কাছে জানতে চাই, ‘বাবা, তুমি স্ট্রবেরি চেনো?’

ওইটুকুন ছেলে বলে, ‘চিনি ত, লাল লাল, গায়ে কাঁটা কাঁটা…’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা আমারে স্ট্রাবেরি কিনে দিবা?’

জাদুকর ভাই আমি এখনও ছেলের জন্য স্ট্রাবেরি কিনতে পারি নি।

— ক্যান, ক্যান, তোমাগো বাজারে পাওন যায় না এই জিনিস?’ জাদুকরের চোখে বিস্ময়।

— চোখে পড়েনি এখনও।

— এইটা কোনো কথা কইলা মিয়া!

— বিশ্বাস করেন জাদুকর ভাই… তাই বাড়ির কাউকে কিছু না বলে আজ শহরে চলে এলাম…কিন্তু খুঁজে পেলাম না!

— আসলেই মিয়া তুমি একটা গ্রাইম্মা ভূত! শহরে অভাব আছেনি… রাস্তায় রাস্তায় ব্যাচতাছে দেহি…আর তুমি পাইতেছো না, আজব কতা কইলা একখান!

— জাদুকর ভাই, আপনি আমাকে ভুল বুঝতেছেন, শোনেন, আজ শহরের রাস্তাঘাটে কোনো মানুষজন নেই…গাড়িও চলছে না…সব নাকি বন্ধ করছে সরকার… ‘করোনা ভাইরাস’ এর কারণে…আমিও ঠিক জানতাম না যে আজ থেকে ‘লক ডাউন’!

— হায় হায় দেখছোনি কি কারবার, ব্যাবাক ভুইল্লা খাইছি…’

জাদুকরের মুখে আষাঢের থমথমে কালো মেঘ জড়ো হলো হঠাৎ। তারপর ভেজা গলায় বলল, ‘বুঝলা লেখক, ঘরে কোনো খাওন নাই… গেল পরশু তিন কেজি চাল পাইছি… ঘরে অহন আর কিছু নাই… মোর মাথা ঠিক নাই, ঠিক নাই…’

গ্রামের লেখকের চোখে আরো উদাসীনতার চিহ্ন, তাকে দেখে মনে হচ্ছে— জাদুকরের শেষ কথাটাও সে শুনেনি, যেন এই মাত্র হাজির হলো, এবং বলল, ‘জাদুকর ভাই, আমাকে দুই- একটা জাদু শিখিয়ে দেন… না করবেন না…’

একথায় জাদুকর হুংকার ছাড়লেন, ‘ওই মিয়া, তুমি খালি আছো জাদু শিখান, জাদু শিখান…, একদিনের মইদ্যে কেউ জাদু শিখাইতে পারে নি, না কেউ শিখতে পারে?…অই মিয়া, অহন পারবা জাদু দিয়া ময়না পাখি দেহাইতে, পারবা খালি ভাতের থালে শাদা ফকফকা ভাত দেহাইতে…পারবা, পারবা…কও?

—না।’ চোখ মাটিতে রেখে লেখকভাই বলল।

— জানি তো পারবা না,… এত্ত সোজা না জাদু… বলদের লাহান কথা কও মিয়া…দিলা তো মেজাজের বারোডা বাজাইয়া…’

— আমার ভুল হয়েছে, মাফ করে দিন… তাও একটা জাদু শেখান, মাত্র একটা…

— আইচ্ছা, শিখামুনে, তার আগে দিয়া কও, তুমি জাদু শিখার লাইগা এত পেরেশান হইছো ক্যান?

— জাদু দেখিয়ে ছেলেরে খুশি করবো… ও যখন যা চাইবে— চললেট, আইসক্রীস… তারপর…লাল লাল স্ট্রবেরি…প্রতিদিন একটা স্ট্রবেরি…!

— কও কী তুমি… এইডা তো পুরাই ফাঁকিজুকি…গ্যাদা পোলাডার লগে এমুন বাটপারি তুমি করতে পারবা?…তুমি কী পাগল হইছো মিয়া?

— পাগল না জাদুকর ভাই, এইটা আমার অক্ষমতা ঢাকার একটা চেষ্টা, ঠিক চেষ্টা না, অপচেষ্টা বলতে পারেন… কেন, ঘরে আপনিও কী এই চালাকিটা আপনার সন্তানদের সঙ্গে করেন না…অস্বীকার করতে পারবেন?

— তুমি কথা বেশি বলো, আসো, একটা জাদু শিখাই তোমারে…স্ট্রবেরির দেখানোর জাদু…তয় খবরদার! কাউরে এই জাদু শিখাইতে পারবা না…কও কসম, তিন কসম…

— কসম…কসম…কসম!’ গ্রামের লেখকভাই বেশ দরদ ও মায়া নিয়ে উচ্চারণ করল।

পাশ থেকে আমিও জাদুটা শিখে নিয়ে মনে মনে বললাম— কসম…কসম…কসম! এই স্ট্রবেরি আনার জাদুটা কখনো কাউকে শেখাবো না…

আমার মাথার ভেতরটা এখন আর ফাঁকা ফাঁকা লাগছে না, মাথা ঠিক আছে…কিচ্ছু বিকল হয়নি, চোখের বিভ্রমও কেটে গেছে…

পত্রিকার অফিস থেকে বের হয়ে রাস্তায় মানুষের ভিড় দেখাটা ছিল আমার— বিভ্রম!  বাসযাত্রীদের বাস থেকে ওঠা-নামার দৃশ্যটাও কল্পিত ছিল, পুরোটা-ই—বিভ্রম!…হা হা…হা

শহরটা জনশূন্য…ভূতুড়ে… চারপাশ কেবল খাঁ খাঁ করছে…শূন্যতার চাদরে ঢেকে গেছে শহরটা…চারপাশে নিস্তব্ধতা কেমন ভয় ধরানো…

গত তিন সপ্তাহ অফিসে আমাকে কোনো কাজ করতে হয়নি…পত্রিকার পৃষ্ঠা কমানো হয়েছে, সাপ্তাহিক কয়েকটা বিভাগের সঙ্গে সাহিত্যপাতাও বন্ধ করা হয়েছে…

খেলাধুলা ও বিনোদন পাতাটা অবশ্য আছে… যে জাতির যেটা বেশি প্রয়োজন…!

এসব বলার বা দেখার আমি কে?…কেউ না, আমার চাকরি নেই, পকেটে টাকা-পয়সা নেই… এটাই আসল সত্য, বাকিসব মিথ্যা…

সংসার খরচ, বাড়ি ভাড়া…আর আমার মেয়ের  একটা আবদার— ‘কথাবলা মেমসাহেব পুতুল’!

আজ মেয়েটাকে শুধু ‘স্ট্রবেরি’ দেখিয়েই খুশি রাখবো…

তারপর ঠিক-ই একদিন জাদু দিয়ে মেয়ের হাতে ‘ কথাবলা মেমসাহেব পুতুল’ এনে দেবো…অবশ্যই দেবো…

এই জাদুটাও একদিন আমাকে শিখে নিতে হবে…অবশ্যই শিখে নিতে হবে…

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top