পার্পল হিবিস্কাস (২য় পর্ব) // চিমামান্ডা নগোজি আদিচে // ভাষান্তর: দিলশাদ চৌধুরী

জাজা মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে হাতের চার্চ বুলেটিনটাকে একটা ডাস্টপ্যানের মত করে তার ওপর ভাঙা সিরামিকের একটা টুকরো তুলে রাখতে রাখতে বলল, “সাবধানে মা, তোমার আঙুল কেটে যাবে।”
আমি আমার গির্জায় যাবার কালো স্কার্ফের নিচ থেকে আমার কর্নরো করা চুলের একটা ধরে টান দিয়ে নিশ্চিত হতে চাইলাম যে আমি স্বপ্ন দেখছি কিনা। এরা এমন স্বাভাবিক ব্যবহার করছে কেন? জাজা আর মা? যেন তারা জানেই না কি হয়েছে! আর বাবাই বা এত ধীরেসুস্থে চা শেষ করছে কেন? যেন জাজা তার মুখে মুখে কথাই বলেনি!

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে রবিবারের বিশেষ লাল জামাটা বদলে নিতে উপরে চললাম। জামা বদলে শোবার ঘরের জানালার ধারে বসলাম। কাজুবাদাম গাছটা ডালপালা ছড়িয়ে এত কাছে এসে গেছে যে আমি বাইরে হাত দিলেই একটা পাতা ছিড়ে আনতে পারতাম যদি না জানালায় রূপালী রঙা এই খাঁজকাটা মশার জালগুলো দেয়া থাকতো। ঘন্টার মত ঝুলতে থাকা হলুদ ফলগুলো অলসভাবে দুলছিলো আর আমার জানালার মশার জালের সাথে ধাক্কা খেয়ে ভোঁ ভোঁ করা মৌমাছিগুলোকে নিজের দিকে টানছিলো। শুনতে পেলাম বাবা উপরে এসে নিজের ঘরে গেলো তার রবিবারের দুপুরের খাওয়ার আগের ছোট্ট ঘুমটা দেয়ার জন্য। আমি চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ বসে রইলাম, অপেক্ষা করলাম কখন বাবা জাজাকে ডাকবে আর জাজার বাবার ঘরে যাওয়ার শব্দ শুনব। কিন্তু এক দীর্ঘস্থায়ী নৈঃশব্দের পর আমি চোখ খুললাম আর জানালার সাথে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমাদের উঠোনটা এত বড় যে একশ লোক এখানে আরামসে আতিলোগু নাচ নাচতে পারবে। আর এত জায়গা আছে যে প্রত্যেক নাচিয়ে প্রচলিত সমারসল্ট নেচে উঁচুতে লাফ দিয়ে সামনের নাচিয়ের কাঁধে অবতরণ করতে পারবে। ওপরে প্যাঁচানো ইলেকট্রিক তার দিয়ে বাড়ি ঘিরে রেখেছে যে দেয়াল, সেটা এতটাই উঁচু যে আমি সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনো গাড়িই দেখতে পাই না। বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেছে, দেয়ালের ধার ঘেঁষে লাগানো কাঠগোলাপ গাছগুলোর ফুলের গা গোলানো মিষ্টি গন্ধে উঠান ছেয়ে আছে। ব্যুফে টেবিলের মত করে কাটা, সোজা ও মসৃন এক সারি বাগানবিলাস গাড়িবারান্দা থেকে বৃদ্ধ প্যাঁচানো শরীরের গাছগুলোকে পৃথক করে রেখেছে। বাড়ির একদম কাছে, উজ্জ্বল জবা গাছের ঝাড়গুলো ঝাঁকড়া হয়ে একে অন্যকে এমনভাবে জাপটে ধরেছে যেন পাপড়ি বিনিময় করবে। বেগুনি ফুলের গাছগুলো যদিও কলি ছাড়তে শুরু করেছে, তবু লাল ফুলের গাছটাতেই বেশি ফুল দেখা যাচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি ফুটে যায় এই লাল জবাগাছগুলোতে! মা যেভাবে প্রায়ই গির্জার বেদি সাজানোর জন্য ওগুলো কাটে অথবা অতিথিরা গাড়িবারান্দার দিকে যেতে যেতে ছিঁড়ে নিয়ে যায়, সে তুলনায় বেশ জলদিই ফোটে । মায়ের ধর্মসমিতির সদস্যরাই বেশিরভাগ ফুল ছিঁড়ত। একবার এক নারী ফুল ছিঁড়ে কানের পেছনে গুঁজেছিলো, আমার জানালা থেকে তা স্পষ্ট দেখেছিলাম। কিছুদিন আগে আসা কালো জ্যাকেট পরা দুজন সরকারি এজেন্ট, তারা পর্যন্ত যাবার সময় হ্যাচকা টান মেরে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে গেলো। তারা একটা পিকআপ ট্রাকে এসেছিলো যেটায় ফেডারেল সরকারের মোহর আঁকা ছিলো। গাড়িটাকে তারা রেখেছিলো ঠিক জবা ফুলের ঝাড়টার কাছেই। তারা বেশিক্ষণ থাকেনি। পরে জাজা বলছিলো, লোকগুলো নাকি বাবাকে ঘুষ দিতে এসেছিলো, তারা নাকি বলছিলো যে তাদের গাড়ি ভর্তি ডলার। জাজা কি শুনতে কি শুনেছে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু এখনো প্রায়ই সেদিনের কথা ভাবি। কল্পনা করি, বান্ডিল বান্ডিল বিদেশি টাকায় ভরা ওই ট্রাকটার কথা। ভাবি, যদি ওরা টাকাটা অনেকগুলো বাক্সে রাখত, কিংবা বড় সাইজের একটা বাক্সে রাখত, তবে সেটা নিশ্চয়ই আমাদের ফ্রিজের সমান হত।

মা যখন আমার ঘরে এলো তখনও আমি জানালার কাছেই বসে ছিলাম। প্রতি রবিবার, দুপুরের খাবারের আগে, বাবা যখন ছোট্ট একটা ঘুম দিত, মা সিসিকে স্যুপে একটু বেশি পামতেল, নারকেল ভাতে একটু কম পানি এগুলো বলতে বলতে আমার চুল বিনুনি করে দিত। রান্নাঘরের দরজার কাছে একটা চেয়ার নিয়ে মা বসত আর আমি বসতাম তার দুই জঙ্ঘার মাঝে মাথা গলিয়ে পেছন ফিরে মাটিতে। যদিও খোলা জানালা দিয়ে রান্নাঘরটায় সদাই বাতাস চলাচল করত, তবুও আমার চুল যেন কীভাবে কীভাবে সমস্ত তেল মশলা শুষে নিতো। আর তারপর যতবার আমি আমার বিনুনির ঘ্রাণ নিতাম, নাকে আসত ইগুসি স্যুপ, উটাজি আর তরকারির গন্ধ। কিন্তু আজ মা তেল চিরুনির থলে নিয়ে আমায় নিচে ডাকতে আসেনি। তার বদলে বলল, “দুপুরের খাবার তৈরি, ননে।” আমি খুব করে বলতে চাইছিলাম দুঃখিত মা, বাবা তোমার যত্নে রাখা মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলল। কিন্তু আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো, “তোমার মূর্তিগুলো ভেঙে যাওয়ায় দুঃখিত, মা।”

সে ঘাড় ঘোরালো, তারপর এমনভাবে তাড়াতাড়ি মাথাটাকে এদিক ওদিক নাড়ালো যেন মূর্তিগুলো তার কাছে তেমন কিছুই ছিলোনা। যদিও, সেগুলো বিশেষ ছিলো। অনেক বছর আগে, যখন আমি ঠিকভাবে বুঝতেও শিখিনি, ভাবতাম যখনই তাদের ঘর থেকে দরজার ওপর কারো আছড়ে পড়ার মত শব্দ শোনা যেত, তখনই কেন মাকে দেখতাম মূর্তিগুলো মুছতে। তার রাবারের চটিতে শব্দ হত না, কিন্তু খাবার ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ পেলেই আমি বুঝতে পারতাম যে মা নিচে গেছে। সে কি করছে দেখতে আমিও নিচে যেতাম আর প্রতিবারই দেখতাম সে একটা সাবান পানিতে ভেজা তোয়ালে নিয়ে মূর্তির তাকটার পাশে দাঁড়িয়ে। প্রতিটি ব্যালে নাচিয়ের মূর্তির পেছনে সে অন্তত পৌনে এক ঘন্টা সময় ব্যয় করত। তার চেহারায় কোনদিনও কান্নার আভাস পাইনি। এইতো, স্রেফ দু’সপ্তাহ আগে শেষবারের মত, যখন তার চোখগুলো বেশি পেকে যাওয়া আভোকাডোর মত কালচে বেগুনি হয়ে ফুলে উঠেছিলো, তাকে দেখেছিলাম মূর্তিগুলোকে ভালো করে মুছে সাজিয়ে রাখতে।
” আমি দুপুরের খাবারের পর তোমার চুল বেঁধে দেব”, মা বলল।
” আচ্ছা মা”, আমি তার পেছন পেছন নিচে চললাম। সে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছিলো, যেন তার এক পা অন্য পায়ের চেয়ে ছোট, তার চলার ভঙ্গিতে তাকে স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট মনে হচ্ছিলো।

সিঁড়িটা অভিজাত কায়দায় S আকৃতিতে নিচের দিকে নেমে গেছে। সিঁড়ির অর্ধেক নেমে আমি জাজাকে নিচের হলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সাধারণত ও দুপুরে খাওয়ার আগে পড়তে বসে, কিন্তু আজ ও উপরে আসেনি। ও এই পুরোটা সময় মা আর সিসির সাথে রান্নাঘরে ছিলো।
“কি খবর?”, আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদিও ওর খবর জানার কোন প্রয়োজনই ছিলো না। শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই আমার আয়ত্বের মধ্যে ছিলো। ওর সতের বছরের মুখটুকু জুড়ে সর্পিল বলিরেখা কপালে ভাঁজ তৈরি করেছে আর প্রত্যেক ভাঁজে যেন একটা করে চিন্তার ছায়া জায়গা করে নিয়েছে। আমি এগিয়ে ওর হাতটা ধরে সাহস দেয়ার জন্য একটা হালকা চাপ দিলাম, তারপর দুজনে খাবার ঘরে চললাম।

বাবা মা বসে গিয়েছিলো, সিসির ধরে রাখা পানিভরা বাটিতে বাবা হাত ধুচ্ছিল। আমার আর জাজার বসা অব্দি অপেক্ষা করে বাবা প্রার্থনা শুরু করল। বিশ মিনিট ধরে সে খাবারে বরকত দেয়ার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল। তারপর, সে গলাটা আরেকটু উঁচু করে বিভিন্ন খেতাব উচ্চারণ করে কুমারী মাতার প্রতি প্রার্থনা করতে লাগল৷ আমরাও সাথে সাথে একটু পর পর বললাম, “আশীর্বাদ করো।” তার সবচেয়ে পছন্দের খেতাবটি ছিলো, ‘আমাদের মাতা, নাইজেরিয়ার মানুষের বর্ম’। এটা তার নিজেরই তৈরি ছিলো। বাবা বলত, মানুষ এই খেতাবটা ব্যবহার করে যদি প্রতিদিন প্রার্থনা করত, তাহলে নাইজেরিয়ার এমন রুগ্ন শিশুসুলভ পা-ওয়ালা বিরাট মানুষের মত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হত না।

দুপুরের খাবারে ছিলো ফুফু আর ওনুগবু স্যুপ। ফুফুটা ছিলো নরম তুলতুলে। সিসি খাবারটা ভালোই বানিয়েছে – গায়ের শক্তি দিয়ে আলু থেঁতলে সেগুলোকে কয়েক ফোঁটা পানির সাথে হামানদিস্তায় পিষে। হামানদিস্তার মুষলের ঠক ঠক শব্দের সাথে যেন ওর গালের কোন গোপন চুক্তি আছে। সেদ্ধ গরুর মাংস আর শুকনো মাছের ছোট টুকরো আর গাঢ় সবুজ ওনুগবু পাতা স্যুপটাকে ঘন করে রেখেছিলো। আমরা চুপচাপ খেতে লাগলাম। আমি আমার ফুফু থেকে নিয়ে আঙুল দিয়ে ছোট ছোট বল তৈরি করে স্যুপের মধ্যে ডুবিয়ে দিলাম, তারপর মাছের টুকরোসহ তুলে মুখের মধ্যে দিতে লাগলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম স্যুপটা ভালোই হয়েছে, কিন্তু কোন স্বাদ পাচ্ছিলাম না। খেতেও ভালো লাগছিলো না। জিভটাকে পুরো শুকনো কাগজের মত রসহীন মনে হচ্ছিলো।
” লবনটা দাও তো”, বাবা বলল।
আমরা সবাই লবনের পাত্রের দিকে একসাথেই হাত বাড়ালাম। জাজা আর আমি দুজনেই ক্রিস্টালের লবনদানীটার একই জায়গায় হাত দিলাম। আমি আঙুল দিয়ে ওর হাতে আলতো একটা ঘষা দিলে ও হাতটা সরিয়ে নিলো। আমি তখন কৌটোটা বাবাকে দিলাম। ঘরের নিশ্চুপ ভাবটা যেন আরও দীর্ঘায়িত হলো।

“আজ বিকেলে ওরা কাজুর শরবতটা নিয়ে এসেছিল। বেশ লেগেছে খেতে, ভালোই বিক্রি হবে মনে হচ্ছে,” মা বলল।
“ওই মেয়েটাকে বলো নিয়ে আসতে,” বাবা বলে।

স্বচ্ছ তারের একটা ঘন্টা ছাদ থেকে খাবার টেবিলের ওপর ঝুলছিল, মা ঘন্টাটা বাজালো। সিসি চলে এলো, ” জ্বি ম্যাডাম”।
“আজ ফ্যাক্টরি থেকে যে শরবতটা এসেছে ওটার দুটো বোতল নিয়ে এসো।”
“ঠিক আছে ম্যাডাম।”

আমি খুশি হতাম যদি সিসি বলত ‘কোন বোতল ম্যাডাম?’ অথবা ‘সেগুলো কোথায় ম্যাডাম?’ অথবা অন্য যেকোনো কিছু যাতে তাদের কথোপকথনটা আরও বেশ কিছুক্ষণ চলত। তাতে অন্তত জাজার ফুফুর দলা নিয়ে ভয়ার্ত নাড়াচাড়ার দৃশ্যটা থেকে আমি চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারতাম।
সিসি জলদিই ফিরে এসে শরবতের দুটো বোতল বাবার সামনে রাখলো। বাবার ফ্যাক্টরিতে যা-ই তৈরি হয় — ওয়েফার, ক্রিম বিস্কুট, বোতলের জুস বা কলার চিপস, সবকিছুর ওপরেই একই রকম এই জীর্ণ লেবেলটা লাগানো থাকে। বাবা সবার জন্যই হলদেটে শরবতটা ঢালল।

(চলবে…)
পার্পল হিবিস্কাস (পর্ব-১) // চিমামান্ডা নগোজি আদিচে // ভাষান্তর: দিলশাদ চৌধুরী 
পার্পল হিবিস্কাস (৩য় পর্ব) // চিমামান্ডা নগোজি আদিচে, ভাষান্তর: দিলশাদ চৌধুরী

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top