ত্রিপুরার লোকগল্প ।। অনুবাদ: ম্যাগডিলিনা মৃ

হাতির অহংকার

একটা হাতি নদীর ধারে গেল জল পান করতে। সে দেখলো নদীর জল অনেক ঘোলা হয়ে আছে। হাতিটি ভাবলো হয়তো কিছুক্ষণ আগে কেউ স্নান করে গেছে। হাতিটির খুব তৃষ্ণা পেয়েছিলো। ঘোলাজল পান করতে না পেরে হাতিটি খুব বিরক্ত হয়ে যে জল ঘোলা করেছে তাকে মনে মনে শাস্তি দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করলো।

হাতিটি লক্ষ করলো একটা কাঁটাওয়ালা ছোট প্রাণী নদীতে স্নান শেষ করে গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। দ্রুত গর্তে ঢুকে যাওয়ার কারণে হাতিটি প্রাণীটিকে ঠিক মতো দেখতে পারেনি তাই বুঝতে পারেনি এটা ঠিক কি প্রাণী। হাতিটি চিৎকার করে সেই প্রাণীটিকে বললো, ‘তুমি আমার খাওয়ার জল ঘোলা করেছ কেন?’

এদিকে কাঁটাওয়ালা সজারু তার পুরো শরীর গর্তের ভেতরে রেখে মুখটি গর্তের বাইরে বের করে জবাব দিল,’তুমি আমার উপর মিথ্যে অভিযোগ এনেছ, আমাকে এভাবে চোখ রাঙিয়ে কথা বলবে না। তুমি জান না আমি এই জঙ্গলের রাজা। এখনই আমার গর্তের সামনে থেকে তুমি দূর হও।’

হাতিটি আরো রেগে গিয়ে হুংকার দিয়ে বললো, ‘আমি বলছি তুমি এখনই গর্ত থেকে বাইরে আসো। সজারুটি বুঝে গেছে যে হাতিটি তাকে দেখতে চাইছে। সে বাইরে না বের হয়ে চুপ করে রইলো, গর্তের ভেতর থেকে শরীরের একটি কাটা হাতিটির সামনে ঢিল মেরে বললো, এই দেখ এইটা হলো আমার শরীরের মাত্র একটা পশম। এমন অসংখ্য পশম দিয়ে ঢাকা আমার শরীর।

হাতিটি দেখলো সজারুর এই পশম শক্ত আর সূচালো । এমন কাঁটা কোনো প্রাণীর গায়ে সে আগে দেখেনি। এইটা ভেবে হাতিটি সজারুর গর্তের সামনে থেকে সরে গেল। সজারুটি হাসতে হাসতে গর্তের ভেতর থেকে বললো, ‘হাতি শরীরের দিক থেকে আমার চেয়ে কয়েকগুণ বড় হলেও বুদ্ধিতে আমার চেয়ে কয়েকগুণ ছোট। ‘

⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨

মৃত্যুর উৎসব

কপিলনগরীর রাজা দেবরাজ তাঁর মন্ত্রীর জ্ঞান আর চেতনা দেখে বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। একবার মন্ত্রীর জন্মদিনে সবাই খুশিতে আনন্দ করছিল, ঠিক তখনই এক সৈনিকের মাধ্যমে রাজা খবর পাঠালেন, আজ বিকেলে মন্ত্রীকে ফাঁসিতে চড়ানো হবে। এই খবর শুনে আনন্দ-উৎসবে সবার মন খারাপ হয়ে গেল। সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। কিন্তু মন্ত্রী শান্তমনে, আনন্দচিত্তে সঙ্গীত আর নৃত্যরস উপভোগ করছিলেন। এমন মনে হচ্ছিলো যে, তিনি রাজার কোনো আদেশ পাননি। এই দৃশ্য দেখে সৈনিকটি দ্বিতীয়বার রাজার আদেশ মন্ত্রীকে পড়ে শুনালেন। মন্ত্রী তখন সৈনিককে বললেন, রাজা দেবরাজকে আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দিও, কেননা মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে জানিয়ে বেশ ভালই করেছেন। এই সময়টুকু আমি অন্তত সঙ্গীত আর নৃত্যের আনন্দ উপভোগ করতে পারবো। তিনি সত্যি আমার বড় উপকার করেছেন।’এই কথা বলে মন্ত্রী আবারও সংগীত আর নৃত্যেরসে ডুবে গেলেন।

এদিকে মৃত্যু খবর নিয়ে যাওয়া সৈনিকের কাছে রাজা জানতে চাইলেন মৃত্যু সংবাদে মন্ত্রীর অনুভূতি কেমন ছিল। সৈনিকরা মন্ত্রীর অনুভূতি রীতিমতো অবাক হয়ে রাজার কাছে পেশ করলেন। রাজা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি নিজে সরাসরি জানার জন্য যখন মন্ত্রীর মহলে গেলেন এবং মন্ত্রীকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, আজকে সন্ধ্যায় তোমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে আর তুমি আনন্দে ডুবে আছ? মন্ত্রী রাজাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললো, এত আরাম আয়েশে থেকেও জীবনে এত আনন্দ আমি কখনো উপভোগ করতে পারিনি, আজ আমার মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে আমি যতটা আনন্দ উপভোগ করতে পেরেছি। আপনি মৃত্যুর খবর আগে থেকে জানিয়ে বড়ই কৃপা করেছেন। মৃত্যুর উৎসব পালন করা আমার জন্য সহজ হয়ে গেল। নিজের কানে মন্ত্রীর এমন কথা শুনে রাজা দেবরাজ বিস্মিত হয়ে গেলেন আর বললেন, ‘যেহেতু তুমি মৃত্যু খবরে বিন্দু পরিমাণ দুঃখী নও সেহেতু এখন আর তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে লাভ নেই।’

⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨

বধির পরিবার

এক বধির মেয়ে নদীর ধারে স্নান করছিল। সেই সময়ে রাজার এক সৈন্য নদীর ধারে এসে সেই বধির মেয়েটির কাছে নতুন রাস্তা কোনদিকে জিজ্ঞেস করলো। উত্তরে সেই মেয়েটি বললো, ‘এই নদীর ঘাট আমার, আমি প্রতিদিন এখানে স্নান করি।’ এরপর সৈন্যটি চলে গেল।

সেই মেয়েটি স্নান শেষে আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরল। আর তার মাকে রাজার সৈন্যের সাথে কথা বলতে পারার খুশির কথা জানালো। সেই মেয়েটির মাও বধির ছিলো। মেয়েটির মা ভাবলো তার মেয়ে বিয়ে করেছে এক বছর হয়নি আর এখনই সে স্বামীর সঙ্গে আলাদা হয়ে যেতে চায়। এতে করে মেয়েটির মা রাগ করে মেয়েটির বাবার কাছে গেল। বাবা তখন উঠানে বসে টুকরি বুনছিলো। স্ত্রীর কথা শুনে সে বুঝলো তার স্ত্রী মেয়েকে সবগুলো রান্না করা মাছ খেয়ে ফেলার অভিযোগ করছে। এতে সে রাগান্বিত হয়ে হাতে তৈরি টুকরি ভেঙ্গে ফেললো এবং স্ত্রীকে মারধর করতে শুরু করে দিল।

চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা দৌঁড়ে এসে সব ঘটনা শুনে তাদেরকে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলার কৌশল শেখার উপদেশ দিল।

⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨

গোপন কথা

ত্রিপুরার এক গ্রামে মৃত্যুশয্যায় এক বৃদ্ধ তার ছেলেকে ডেকে বললো, ‘দেখ বাবা, আমার মৃত্যুর পূর্বে আমি তোমাকে একটা উপদেশ দিয়ে রাখতে চাই, যদি তুমি আমাদের এই উপদেশ পালন করতে না পার তাহলে তোমার জীবনে দুঃখ অনিবার্য।’

ছেলে উত্তর দিল, ‘বলুন বাবা, আপনার কি উপদেশ’
‘নারীদের কখনোই কোনো গোপন কথা বলবে না, হোক সে তোমার স্ত্রী, কারণ তাদের ভেতর কোনো কথা গোপন থাকে না।’
পিতার মৃত্যুর পর ছেলেও চাষবাস আর সংসারে মনযোগী হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তার বাবার দেওয়া সেই উপদেশের কথাও ভুলে গেল।

একদিন ছেলেটি তার স্ত্রীকে বললো- আমাদের আয় বেশ ভালই হচ্ছে। ভাবছি আমাদের ভিটাবাড়িটা ভেঙ্গে এখানে একটি বড় দালানঘর তুলবো।
দ্বিতীয় দিন ছেলেটির এক বন্ধুর সাথে রাস্তায় দেখা তখন তার বন্ধুটি বললো, আরে বন্ধু আমিতো ভিটাবাড়ি ভেঙ্গে নতুন দালানঘর তুলতে চাই।
ছেলেটির মনে হলো নতুন দালান তোলার বিষয়ে গতকালই সে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলো, আজই তার বন্ধু তাকে বলছে। সে ভাবলো তার স্ত্রী বলে দিল কিনা। সে তার স্ত্রীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিল।

পরদিন সে একটা পাগল কুকুর মেরে তার ক্ষেতের মাঝে পুতে রাখলো। আর রাতে ঘরে ফিরে স্ত্রীকে এই ঘটনার কথা বললো, ‘আজ আমি একটা অপরাধ করে ফেলেছি, খবরদার এই কথা কাউকে বলো না। আজকে আমি ভুল করে এক লোককে মেরে আমাদের ক্ষেতের মাঝে পুতে রেখেছি’।

সন্ধ্যাবেলা তার স্ত্রী কুয়ায় জল তুলতে গেল। সে নিজেকে আটকাতে পারল না। সে সবাইকে ঘটনাটি বলে দিল। সেখানে পানি তুলতে এক পুলিশ ইন্সপেক্টরের স্ত্রীও ছিল। সে গিয়ে তার স্বামীকে ঘটনাটা বলে দিল। পরদিন পুলিশ ছেলেটির বাসায় গিয়ে তাকে ধরে থানায় নিয়ে গেল। তাকে কোর্টে চালান করে দিল।
কোর্টে সে ঘটনাটা খুলে বললো যে, সে তার স্ত্রীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এমন একটি মিথ্যে ঘটনা বানিয়েছে। আদালতের নির্দেশে ঘটনার প্রমাণ হলো এবং তাকে নির্দোষ হিসেবে মুক্তি দেওয়া হলো। সেই থেকে সেই ছেলেটি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার স্ত্রীকে কোনো গোপন কথা বলেনি।

⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨

অদ্ভুত ন্যায়কর্তা

ত্রিপুরার কোনো এক গ্রামে এক সর্দার ছিলেন। ন্যায়বিচারের জন্য কয়েক গ্রামে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। কোনো বিচারকাজে তিনি যখন রায় শুনাতেন তখন বলতেন, ‘যদি আমি বিন্দু পরিমাণ কোনো অন্যায় বিচার করে থাকি তাহলে আগামীকাল যেনো আমার সন্তানের মৃত্যু হয়।’

সর্দারের সতের বছরের ছেলে পিতার এমন শপথে বিরক্ত হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় অন্য একটি গ্রামে। সেখানে একটি বাড়িতে কয়েকদিন থাকা সিদ্ধান্ত নেয়। যে বাড়িতে সে থাকতো সেখানে এক রাতে ধীরে ধীরে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনা গেল। সে ঘুম থেকে জেগে দরজা খুলতেই এক লোক ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। সে বাড়ির মালিকের স্ত্রী এবং সেই লোকটি মিলে বাড়ির মালিককে খুন করে চলে যায়। লোকটির স্ত্রী কাঁদতে থাকে। এই ঘটনার পর সেই রাতে সর্দারের ছেলে পালিয়ে যায় সেখান থেকে।
পরদিন এই ঘটনার বিচারের জন্য ছেলেটির বাবাকে ডাকা হলো। তিনি সমগ্র গ্রামবাসীকে সেখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। এদিকে সর্দারের ছেলে যেহেতু আসল ঘটনা জানে তাই সে মনস্থির করলো, সে উপস্থিত না থাকলে তার বাবা কিভাবে ন্যায়বিচার করে সেটি সে দেখতে চাইলো। গ্রামের সবাই উপস্থিত হওয়ার পর সর্দার তার ছেলেকে অনুপস্থিত দেখে তাকে খুঁজে আনার নির্দেশ দিলেন। সবশেষে হত্যাকারীদেরও ধরে আনা হলো। সর্দার হত্যাকারী যুবক আর সেই বাড়ির মালিকের স্ত্রীকে নির্দেশ করে বললো তারা দুজনেই হত্যাকারী দেখ এই যুবকের গলায় রক্ত লেগে আছে। ঠিক তখনই যুবকটি গলায় পেচানো গামছা দিয়ে ঘাড় মুছতে লাগলো। এরপর ন্যায়বিচারক সেই আগের শপথ নিলেন। সর্দারের ছেলেটিও তাঁর বাবার কাছে ক্ষমা চাইলো।

⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨⍨

নাগুরাই আর নখলিপি

অনেক অনেক বছর আগে ত্রিপুরায় অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। এই জনগোষ্ঠীর লোকগুলো নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস না করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবস্থান করত। সেই সময়ে তারা সেখানে জুমচাষ করে খাদ্য চাহিদা মেটাত। কয়েক বছর পর সেখানকার মাটি অনুর্বর হয়ে গেলে আবার স্থান পরিবর্তন করে অন্য দিকে চলে যেত। নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানরত কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর লোকজন মিলেমিশে জুমচাষ করতো। কেননা জুমচাষের জন্য কারো ব্যক্তিমালিকানার জমি ছিল না। জুমচাষের জমি যে ব্যক্তি ভাগ করে দিতেন তাকে বলা হতো ‘রাই’। এক উচু পাহাড়ের পাদদেশে নদীর কিনারায় জুমচাষ শুরু হয়েছিলো। সেই জুমের প্রধান ছিলেন চম্পারাই আর তার স্ত্রীর নাম ছিলো খুলমতি। চম্পারাই আর খুলমতির একটাই সন্তান ছিল। নাম নাগুরাই। নাগুরাইকে তার বাবা মা অত্যন্ত ভালবাসতেন। নাগুরাই দেখতে বেশ সুন্দর, সুঠাম দেহের অধিকারী আর শক্তিশালী ছিল। তার দৈহিক কাঠামো, সৌন্দর্য আর শক্তির কারণে তাকে অন্যান্য যুবক থেকে আলাদা করে চেনা যে।

একবার খুলমতি নদীতে স্নান করছিল। পাশেই নাগুরাই জুম ক্ষেতে কাজ করছিল। হঠাৎ তার মায়ের চিৎকার শুনতে পেল, ‘নাগুরাই… নাগুরাই…।’ নাগুরাই দৌড়ে সেখানে পৌঁছে গিয়ে দেখল তার মা স্নান করছে এবং নদীর দিকে ইশারা করছে। নাগুরাই দেখতে পেল নদীর মাঝ দিয়ে প্রচণ্ড স্রোতে একটা মেয়ে ভেসে যাচ্ছে। নাগুরাই দ্রুত লাফিয়ে পড়লো নদীতে এবং সাঁতরে মেয়েটিকে উদ্ধার করলো। উদ্ধার করে নাগুরাই মেয়েটিকে নদীর কিনারে নিয়ে এলো এবং মাটিতে শুইয়ে দিল। ততক্ষণে সেখানে অনেক লোক ভীড় করেছে দেখার জন্য। এদিকে নাগুরাই দ্রুত সেখান থেকে বাড়িতে গিয়ে বাঁশের কঞ্চি জোগাড় করলো সেটি বেঁধে একরকম ঝুলোনির মতো করে মেয়েটিকে তার মধ্যে দিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলো। এরমধ্যে সে ওঝাকেও খবর দিয়েছিলো। ওঝা বিভিন্ন ঔষুধী গাছপালা নিয়ে তাদের বাড়িতে পৌঁছে গেল। ওঝার সাহায্যের মেয়েটির পেট থেকে সব পানি বের হয়ে গেল।
মেয়েটিকে দেখার দায়ভার তখন নাগুরাইয়ের মায়ের উপর পড়লো। জ্ঞান ফেরার পর মেয়েটি তার নাম নখলিপি বললো। তবে তার বাবা মায়ের বিষয়ে যখনই কিছু জিজ্ঞেস করা হতো তখনই সে নিশ্চুপ থাকতো। তাই ধীরে ধীরে খুলমতি মেয়েটির বাবা মা বিষয়ে জিজ্ঞেস করা বন্ধ করে দিল।

খুলমতির কোনো মেয়ে ছিল না তাই সে নখলিপিকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতে শুরু করলো। অল্পদিনেই নখলিপি জুমের সকল ছেলে মেয়ের সাথে মিলেমিশে গেল। জুমের ছেলে মেয়েরা তাকে নাগুরাই কিভাবে তাকে উদ্ধার করেছে সেই গল্প শুনাতো। কিভাবে ভালবেসে তার সেবা করেছে সেই গল্পও করতো। ধীরে ধীরে নখলিপি নাগুরাই এর প্রেমে পড়তে শুরু করে, কিন্তু সে মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস পেতো না। ভাবতো নাগুরাইয়ের মনে তাকে নিয়ে এমন ভাবনা যদি না থাকে? কিন্তু সেও জানতো না যে নাগুরাইও তাকে ধীরে ধীরে ভালবেসে ফেলেছিল।

গ্রীষ্মকালীন সময়। জুমের তরুণ যুবক-যুবতীরা জঙ্গলের ভেতরে বিভিন্ন ফুল আর ফলমূল সংগ্রহের জন্য চলে গেল। তাদের সঙ্গে নখলিপিও ছিল। সবার পিঠে ফল সংগ্রহের ঝুড়ি। মাথায় বাঁধা একরকম পট্টি। সবার হাতে ছোট ছোট দা। জঙ্গলের ভেতর একটা নির্দিষ্ট জায়গা সকলে বেঁছে নিয়ে সেখানে সংগ্রহ করা ফল জমা করছিল। নখলিপিও একটি ঝোপ থেকে ফল সংগ্রহ করছিলো এমন সময় ঝোপের মধ্যে খচখচ আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো। সে মাথা উঁচিয়ে দেখলে ঝোপের ভেতর একটি বিশাল অজগর সাপ। সাপটি ধীরে ধীরে কুন্ডলি পাকিয়ে নখলিপির দিকে আসছিল। নখলিপি ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো। নির্জন পাহাড়ে নখলিপির চিৎকার শুনে নিচ থেকে নাগুরাই ছুটে এলো। দুই হাতে অজগর সাপটিকে ধরে ছিড়ে ফেললো। তারপর জুমের অন্যান্য যুবক যুবতীরা এসে অজগর সাপটি নিয়ে গ্রামে চলে গেল। এদিকে নাগুরাই নখলিপি হাত ধরে নদীতে গিয়ে স্নান শেষ করে বাড়ি চলে গেল। দূর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা পাওয়া উপলক্ষে সেই রাতে গ্রামে পাঠা বলি দেওয়া হলো। এদিকে নাগুরাই এর বাবা-মা তার বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে গেল। গ্রামে গ্রামে যোগ্য কন্যার খোঁজ করতে লাগলো। এই জন্য গ্রামের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ সহযোগীতা চেয়েছিলো নাগুরাইয়ের মা। একবার নাগুরাইয়ের কাকীমাকে ডেকে বলেছিলো, আপনি আশেপাশে নাগুরাইয়ের জন্য কন্যা খোঁজে বেড়াচ্ছেন অথচ কন্যা আপনার ঘরেই আছে। নাগুরাইয়ের বাবা চম্পারাই জবাব দিল তা ঠিক বলেছ কিন্তু নাগু আর নখলিপি কি দুজন দুজনকে ভালবাসে!

দেখতে দেখতে নাগুরাই এর বাবা মায়ের ইচ্ছায় বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল। বেজে উঠলো ঢাক ঢোল। দলবেঁধে নখলিপিকে গ্রামের কন্যারা স্নানে নিয়ে গেল। স্নান শেষে বিয়ের পোশাক আর ফুলে, লতাপাতার গহনা দিয়ে সাজিয়ে দিল। দেখতে একদম বন্যকন্যার মত অপরূপ লাগছিলো নখলিপিকে। ঘুরেফিরে নাগুরাইও উঁকি দিয়ে একপলক দেখে গিয়েছিল তাকে। সত্যি যেনো নখলিপিকে অপ্সরার মতো লাগছিল।

ছেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে খবর দেওয়া হয়েছিল নাগুর কাকা, কাকীমা আর তাদের মেয়েকে। কাকার বাড়ির সকলেই বিয়ের দিন দুপুরে এসে হাজির হলো। কাকা আনন্দে মেতে থাকলেন গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে। হাসি, ঠাট্টা, খাওয়া দাওয়া আর গান বাজনা চলছিল। আর কাকীমা বিয়ে বাড়ির কন্যাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লেগে গেল বিয়ের কাজে। কাকার মেয়ে মনে মনে ভাবলো আসার পর একবারও কনেকে দেখা হয়নি তাই একপলক দেখতে চলে গেল কনের ঘরে। কনের ঘরে মেয়েদের হাসি ঠাট্টা আর বাহারী গল্প চলছিল।

কাকার মেয়ে কনের ঘরে ঢুকে কনেকে দেখে চমকে গেল। এটা কি করে সম্ভব! এ যে তার দিদি, নাগুর বোন। গতবছর তাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। অথচ সে বেঁচে আছে! সঙ্গে সঙ্গে সে দৌঁড়ে গেল তার মা বাবাকে খবর দিতে। নাগুরাই এর কাকীমা যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলো।

নাগুর মাকে খোঁজে জানালো, নিজের আপন খুড়তুতো বোনের সঙ্গেই বিয়ে হচ্ছে নাগুর। তোমরা কি সেটা জান? নাগুরাই কি সেটা জানে? না জানলে শুন এই মেয়ে তোমাদের কাকার প্রথম স্ত্রীর সন্তান। কাকীমার কথা পুরো বিয়ে বাড়ির আনন্দ ফিকে হয়ে গেল। ঢাক ঢোল, বাদ্য বাজানো বন্ধ হয়ে গেল। নাগুরাই এর বাবা ছুটে এলো। কাকীমা বিয়ে বাড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা খুলে বললো। আর প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ভাই বোনের কি বিয়ে হয় কখনো?

রাগে ক্ষোভে নাগুরাই কাকীমাকে বললো, ‘নিশ্চয় হবে কাকীমা, তোমাদের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে সে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। আমরাই তুলে এনে তাকে নতুন জীবন দিয়েছি। আর আমি তাকে ভালবাসি। দেখি কার ক্ষমতা আছে আমার কাছ থেকে নখলিপিকে আলাদা করে। কাকাও এগিয়ে গিয়ে কাকীমাকে চুপ করতে বললো। কিন্তু কাকীমা নাছোড়বান্দা সে এই বিয়ে হতেই দিবে না। সে সবার সামনে চিৎকার করে প্রতিবাদ করতেই লাগলো। এই বিয়ে হলে মানসম্মান থাকবে না। ভাই বোনের বিয়ে কোনোদিন সম্ভব না। গ্রামবাসীরে সায় দিতে লাগলো। এই বিয়ে সম্ভব না বলে তারাও বিয়ে বন্ধ করতে চাইলো। এই বিয়ে হলে ঈশ্বরের অমঙ্গল হবে বলে জানালো গ্রামবাসীরা।

নখলিপি ঘরের ভেতরে থেকে সব শুনছিল। বুক ফেটে আর্তনাদ করতে ইচ্ছে করছিলো তার। সে সত্যি মনস্থির করলো তার বেঁচে থাকা উচিৎ হয়নি সেদিনই নদীতে ডুবে মরে গেলে ভাল হতো। নিজের ভাগ্যকে দোষ দিয়ে নখলিপি মরে গিয়েই সবাইকে মুক্তি দিতে চাইছিল। এই ভেবে নখলিপি কাউকে কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। নাগুরাই সেটা দেখতে পেয়ে চিৎকার করে ওর পিছু নিতে নিতে ছুটে গেল। পেছন থেকে ডাকছিলো দাঁড়াও, দাঁড়াও নখলিপি, আমার কথা শুন।

নখলিপি ততক্ষণে পাহাড়ি খাদের কাছে গিয়ে সেখান থেকে লাফ দিতে গেলে পেছন থেকে নাগুরাই তাকে ধরে ফেলল। বুকে জড়িয়ে নিল। সে নখলিপিকে মিনতি করলো, এরকম করো না, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। নখলিপি কিছুতে মানতে রাজি ছিলো না। কান্না জড়ানো কন্ঠে সে নাগুরাই কে বললো, ‘আমি সরে যাচ্ছি তোমার জীবন থেকে, তুমি নতুন জীবন শুরু কর।’ নাগুরাই কিছুতেই রাজি না বরং সে বললো ‘তাহলে চল দুজন একসঙ্গে মরি। তোমাকে ছাড়া আমি বেঁচে থাকতে পারবো না।’ এই বলে দুজনে পাহাড়ের খাদ থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পরলো। ততক্ষণে গ্রামবাসীরে এসে পৌঁছালো কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। প্রেমের জন্য আত্মত্যাগ করলো দুই প্রেমিক প্রেমিকা।

সন্তানের মৃত্যু চোখের সামনে সহ্য করতে না পেরে নাগুরাই এর মা আর্তনাদ করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। বারবার মন থেকে বলছিলো, ‘আমি তোদের বিয়ে দিবোই তোরা ফিরে আয় নাগুরাই-নখলিপি, তোরা ফিরে আয়। মাকে এত বড় শাস্তি দিয়ে যাসনে।’

ঠিক তখনই যে নদীতে তারা ঝাঁপ দিয়েছিল সেই নদী থেকে উজ্জ্বল এক আলো আকাশে মিশে গেল। শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়া বইতে লাগলো। প্রকৃতিও যেন ভেঙ্গে পড়ছে প্রেমিক যুগলের মৃত্যুতে।

শোনা যায় আজও ত্রিপুরাসহ ভারতের প্রত্যন্ত আদিবাসী অঞ্চলে ঝড়বাদলের দিনে অমর প্রেমিক যুগল নাগুরাই আর নখলিপির প্রেমের গল্প স্মরণ করে। বেঁচে থেকে সম্ভব না হলেও মরে গিয়ে তারা প্রমাণ করেছে প্রেম এক চিরন্তন সত্য।

সুত্র: :: গল্প ঋণ গিরিজারানী আস্থানা 

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top