অপহৃতা তারকা // উইলিয়াম ক্যাম্পেবেল গল্ট, রূপান্তর: মনোজিৎকুমার দাস

আমি ইচ্ছে করেই দেরিতে খাবার খেলাম। স্থানীয় কাগজগুলোতে জাপানীদের সারেন্ডার সম্পর্কীয় খবরের চেয়ে এ খবরটা বেশি গুরুত্ব দিয়ে ছাপিয়েছে দেখছি ! মনে হল, উপকূল থেকে উপকূলে ছড়িয়ে পড়ার মতো এটাই এখনকার প্রধান খবর। লরা স্পেনকে কিডন্যাপ করা হয়েছে।
লরা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের সবচেয়ে বয়ঃকনিষ্ঠ নায়িকা না হলেও সে এখনো তার ফিগার সুন্দর রাখতে পেরেছে । তিরিশ বছরের বেশি বয়স হলেও সে যে কোন থিয়েটারের বেশি দর্শককে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। স্থানীয় পুলিশ মনে করেছিল , হয়তো ওখানে জুয়েলারি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্ত কিডন্যাপিং? একজন সুস্থ মানুষ পার্টি দেওয়ার সময় সুইমিংপুল শ্যাম্পেনে ভরতে পারে! একজন প্রকৃতিস্থ মানুষ এ ধরনের কাজের লিপ্ত থাকতে পারে বলে যুক্তিযুক্ত মনে হয় না।। লরা কিন্তু কয়েক বছর আগে এমনটাই করেছিল। এ কারণে এফবিআই-কে ডাকা হয়েছিল না, তবে স্থানীয় পুলিশ কিন্তু মুখ বুঁজে ছিল না।

কিডন্যাপাররা লরাকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, যদিও তার বাড়িতে তিনটি বিলেতি কুকুর ও দু’জন চাকর আছে। তার কিডন্যাপের কথা লোকের মুখে মুখে ফিরছিল । নানা জনের নানা মন্তব্য। লরার কিডন্যাপ সম্বন্ধে নানা ধরনের গুজব বাতাসে ভাসছিল।

কিডন্যাপ হওয়ার খবর প্রকাশ পাওয়ার আটচল্লিশ ঘন্টা পরের কাহিনি । হাল স্লোটকিন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। মি. হাল বিবাহবিচ্ছেদ ও ক্রিমিনাল বিষয় সংক্রান্ত আইনজীবী। তিনি এ শহরের একজন নামডাকওয়ালা ব্যারিস্টার। তার সঙ্গে আগে আমার আগে কখনো সাক্ষাৎ ঘটেনি। তিনি আমাকে ডেকে না পাঠিয়ে নিজেই আমার কাছে এলেন। তাকে দেখে চিন্তিত মনে হল। “ মি.পুমা, অনেকদিন থেকেই আমি আপনার নামডাক শুনে আসছি।” তিনি বললেন। “ আমিও আপনার খ্যাতির কথা জানি, স্যার।” আমি জবাবে বললাম। “ আপনি কি বসবেন না? ” তিনি বসবার আগে আমার সাদামাটা অফিসের চারদিকটা দেখে নিলেন। কোথায়ও কোন টেপরেকর্ডার আছে কিনা তা দেখার জন্যেই হয়তো তিনি চারপাশে চোখ বুলালেন । তিনি চেয়ারে বসে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,“ আপনার অমায়িক ব্যবহার ও সাহসের কথা শুনেছি ” ।
মি.হাল স্লোটকিন দেখতে ছোটখাট ও মোটাসোটা, আর কন্ঠের ভাষা আভিজাত্যপূর্ণ। এ সত্ত্বেও আমি তার কথায় অভিভূত । তাকে দেখে আমার মনে হল, তিনি যেন বনের উপজাতিদের রাজা। “মাঝে মাঝে আমার সাহস বেড়ে যায়। ” আমি বললাম,“ তবে বিগত বছরগুলোতে আমার সাহসের কিন্তু ভাঁটা পড়েছে।” তিনি আমার কথা শুনে তার খাটো হাত দিয়ে নিজের মোটাসোটা গলাটা ঘষতে ঘষতে আমার পেছনের বাঁশের ছাঁদটার দিকে ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে বললেন,“গত দু’দিন আপনি খুব উত্তেজনার মধ্যে কাটিয়েছেন, তাই না?” “ না তেমন ব্যস্ত ছিলাম না, স্যার।” আমি বললাম। “ আমার ধারণা, মিস স্পেনের আইনজীবী হিসাবে আপনি খুই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। ” তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন,“ যদি এর বাইরে কিছু করার থাকতো তবে করপোরেশনের আইনের আশ্রয় নিয়ে বেশ কিছু ডলার আয় করা যেত।” আমি তার কথা শুনে কোন মন্তব্য না করে একটু মুচকি হাসলাম।

মি.স্লোটকিন হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন,“ আপনি কিভাবে দু’ঘন্টা কাজের জন্যে এক হাজার ডলার চাচ্ছেন?” “ আমি কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে অর্থকড়ি নিয়ে থাকি, মি. স্লোটকিন।” আমি স্পষ্ট করে বললাম। “ অপহরণ সম্বন্ধে আপনি কী কিছু অনুমান করতে পেরেছেন ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। “ মনে হয় মিস স্পেনের অপহরণকারীদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।” “ আধা ঘন্টা আগেও আমাদের যোগাযোগ ছিল।” “ আপনি কি বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছেন? তিনি আমার কথায় মাথা নাড়িয়ে বললেন,“ আমি পুলিশকে জানাতে আগ্রহী হইনি।” আমি বললাম,“ মি. স্লোটকিন, এ কিডন্যাপিং কেস হাতে নিলে আমার লাইসেন্স বাতিল কিংবা আমাকে জেলে পুরে দেওয়া হবে না।” “ আপনাকে কাজের দায়িত্ব না দিলে আপনি এ শহরে থাকবেন না। আমার সাথে কাজ করতে চাইলে আমি এ কাজের দায়িত্ব আপনাকে দিতে পারি। ” তিনি বলেন । “আমাকে কী করতে হবে তা আপনি বিস্তারিত ভাবে এখনো বলেননি।” আমি বললাম। “ আপনি আমাকে খুলে না বললে আমি কেমন করে জানবো আমাকে কী করতে হবে? যদি ছেলেগুলো মিস স্পেনকে খুন করে ফেলে তবে প্রাইভেট ডিটেকডিভ হিসেবে আমি কেঁদে বুক ভাসিয়ে বসে থাকবো না। অবশ্য তাদেরকে এক হাত দেখে নেব, তা তারা এক সময় বুঝতে পারবে।” “ ঠিক আছে।” তিনি বললেন,“ আমি আপনাকে দু’হাজার ডলার করেই দেব, আর ওই অর্থটা তো আমার নয়।” “আপনার নিজের অর্থ দেবেন না, এটা তো ঠিক কথা।” আমি বললাম। “ আপনি কাজ করতে না চাইলে আমাকে অন্য কারো শরণাপন্ন হতে হবে। আপনি কাজ করতে রাজি না হলে ব্যাপারটা গোপন রাখবেন মিস স্পেন নিরাপদে যে পর্যন্ত না বাড়ি ফেরে। ” ” অবশ্যই রাখবো, তবে আমাকে একটু ভাববার সময় দিন। ” আমি তার কথার প্রেক্ষিতে বললাম। মাথা নুইয়ে আমার কথায় সম্মতি জানানোর পর তিনি তার চোখ দুটো বন্ধ করলেন। তার মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। আমি কাজটা হাতে নেওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা ভেবে দেখতে চেষ্টা করলাম। ব্যাংক আমার কাছে পাঁচশ’ ডলার পাবে আর একটা নতুন স্যুটও কিনতে হবে।
“ তাহলে আপনি কী বলছেন?” স্লোটকিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। “ আমি রাজি, তবে কোথায়, কী কাজ করতে হবে?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম। “ কাজটা ক্যানিয়ন স্প্রিং এর কাছের মরুভূমিতে।” তিনি বললেন। “ আমার মনে হয়, জায়গাটা সমতল হওয়ায় তারা মরুভূমিটা পাড়ি দেওয়ার সময় আপনাকে দেখতে পাবে। মিস স্পেনের মুক্তিপণ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না, মুক্তিপণের অর্থ আপনাকে যথাসময়ে সরবরাহ করা হবে। ” “ তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে কেনই বা ভয় পেতে যাব?” আমি বললাম। “ তবে,আমি জানি না এ খবরটা কাগজের হেডলাইন হবে কিনা। এ শহরে তো এমনটাই হয়ে থাকে।” তিনি আমার হাতে এক টুকরো কাগজ তুলে দিয়ে বললেন, “এটাতে ঠিকানা আছে।” তিনি কিছু সময় নীরব থেকে আবার বললেন,“ মিস স্পেনকে জীবন্ত না পাওয়া পর্যন্ত মুক্তিপণ ওদের কিন্তু দেবেন না।” “ তাকে জীবন্ত উদ্ধার করতে না পারলে কি আমাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না?” তাকে জিজ্ঞেস করলাম। “ এখনই আপনার পাওনা পরিশোধ করে দিচ্ছি।” তিনি একটা চেকবই বের করতে করতে বললেন। আমি ভাবলাম, তারা মেয়েটিকে ফিরিয়ে দেবে এটা নিশ্চিত ভেবেই তিনি আমাকে অগ্রিম অর্থ দিতে যাচ্ছেন। আমাকে আবার কোনরকমের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে না হয় কিনা ভেবে চিন্তিত হলাম। জোসেফ পুমাকে দু’হাজার ডলার মাত্র প্রদান করুন লেখা চেক তিনি আমাকে দিয়ে বললেন যে মুক্তিপণের অর্থ এক ঘন্টার মধ্যে তার অফিস থেকে দেওয়া হবে। ব্যাংক তখনো খোলা ছিল। আমি তাৎক্ষণিক ব্যাংকে চেক জমা দিলাম। তারপর আমি টমি ভার্চকে ফোন করে বললাম যে আপনাকে আমার কাজে সহযোগী হতে হবে। একটা কথা বলে রাখি, স্লোটকিনের সঙ্গে চুক্তি করিনি যে একাই বের হতে হবে। টমি তার কাজে ব্যস্ত, তার অফিস ভেনিসে, তিনি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন না। আমি তাকে বললাম, “ আজ রাতের কাজের জন্যে আপনি কত চার্জ করতে চান?” “ কী ধরনের কাজ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি ফোনে এ সব কথা বলতে চাই না, তবে কিছু অর্থকড়ি ডেলিভারি দেওয়া সংক্রান্ত বিষয়।” তিনি একটু থেমে বললেন,“ খবরের হেডলাইন হয়েছে নাকি, জো?”
“ আপনি ঠিকই ধরেছেন।” একটু নীরবতার পর তিনি বললেন,“ আপনি তো আমার রেট জানেন।” “ হ্যাঁ, আমি এই কাজের জন্যে দু’হাজার ডলার পেয়েছি। ” আমার রেটের কথা পরে বলবো, তবে সর্বসাকুল্যে দু’শ ডলার কি পাওয়া যাবে?” “ এটা একটু বেশি।” “ জো, আপনি কি আমাকে সশস্ত্র অবস্থায় চান।” “ অবশ্যই,” আমি বললাম। “ আমি শীর্ঘ্রই পৌঁছাচ্ছি। ” তিনি বললেন। তিনি সেখানে পৌঁছালে আমি বললাম,“ প্রথমে আপনি খাওয়াদাওয়া করে নিতে পারেন। আমি চেক ভাঙাতে যাচ্ছি।”
“খেয়ে নিচ্ছি।” বলে তিনি সেখান থেকে বের হলেন। লোকটা উচ্চতা মাঝারি, মুখটা সমতল, নাকটা থ্যাবড়া ।

স্লোটকিনকে তার অফিসে না পেয়ে তার একজন তরুণ সহকারীর কাছে একটা প্যাকেট রেখে এলাম। ডলারগুলো সাথে নিয়েই খেতে গেলাম। বিকালে মিরর নিওস এর অফিস থেকে জানতে পারলাম লরা স্পেন কিডন্যাপিং এর বিষয়ে নতুন কোন অগ্রগতি হয়নি। এ খবরে আমি চিন্তিত হলাম। কাল সকালের মধ্যে মিস লারা স্পেনের উদ্ধারে অগ্রগতি না হলে এফবিআই-কে ডাকা হতে পারে। গাড়িতে ফিরে এসে দেখতে পেলাম আমার গাড়ির পেছনের সিটের ওপর থেকে কম্বলটা টেনে নামানো হয়েছে। আমি ওটা যথাস্থানে রেখে বললাম,“ টমি , সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো?”
টমিকে আরো বললাম,“ এখন আপনি কিছু সময়ের জন্যে বিশ্রাম নিতে পারেন। ” তিনি আমার কথা মতো বিশ্রামের জন্যে পেছনের সিটে বসে বললেন, “ দৈবক্রমে এখানে কোথায়ও কি মিস স্পেনকে খুঁজে পেতে পারেন?” “ কানিয়ন স্প্রিং এর ডান দিকে মরুভূমির একটা স্পটে তাকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।” তিনি আবার বললেন, “ তারা সেখান থেকে যে কোন দিকে যেতে পারে। জো, আপনি কি এটা ভেবে দেখেছেন?” আমি ঘাড় উচুঁ করে তাকালাম। টমি পেছনে ঠেস দিয়ে বললেন,“ মোট অর্থের দশ পার্সেন্ট মাত্র আমি পেতে যাচ্ছি।” “ এটাই আপনি পাবেন।” তাকে মনে করে দিলাম। “ আমি জানি।” আমি ভিউ গ্লাস দিয়ে তার মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম । দেখলাম তার চোখ দুটো বন্ধ। অতিরিক্ত পঞ্চাশ ডলার দেওয়ার জন্যে তাকে একটা চিরকুট দিলাম। যথাসময়ে বিয়মোন্টের দিকে রওনা দিয়ে কয়েক মাইল গিয়ে দক্ষিণে মোড় নিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম। আমাকে কেউই অনুসরণ করল না। উত্তর পশ্চিম দিকে পাহাড়। সূর্য ঢলে পড়ায় পাহাড়ের ছায়া পড়েছে। পেছনের সিটে টমি গা এলিয়ে বসে আছে। তিনি মাথা উঁচিয়ে বললেন,“ আমি মনে করি জনশূন্য এক রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তায় যাওয়াই ভাল।” মাথা নেড়ে তার কথায় সায় দিলাম। তিনি বললেন, “ যদি আপনি চান তবে আমি মেয়েটিকে দেখামাত্র আপনাকে সংকেত দেব। মনে হয় আমি এটা করতে পারব, আপনার কী মনে হয়?” “ কেন আপনি তাদেরকে ছোট ভাবছেন? তাকে জিজ্ঞেস করলাম। “ প্রয়োজন হলে আমি আপনাকে গুলি চালাতে বলব।” কিছু সময় নীরব থাকার পর টমি বললেন,“ আপনি নার্ভস হচেছন কেন, জো” আমি তার কথা মাথা নাড়ালাম। “ আমিও নার্ভাস ফিল করছি” তিনি গাড়ির ফোরের কম্বলে নিচে যেতে যেতে বললেন।
আমরা একটা ক্রস রোড়ে এসে পড়লাম। দুটো রাস্তার একটা ক্যানিয়ন স্পিং এর দিকে চলে গেছে। সরকারি একটা পেট্রোল কার ওখানটাতে পার্ক করা। স্লোটকিন আমার জন্যে অগ্রিম আয়োজন করায় তার উপর খুশি হলাম। ওখানে পাহারা বসানোয় রাস্তা ব্লক করে দেওয়া সম্ভব হবে। এটা করা হলে কিডন্যাপররা সতর্ক হয়ে যেতে পারে। কারটা রাস্তা ছাড়িয়ে বালির ওপরে পৌঁছিল। পেট্রোল কারের সামনের সিটে দু’জন পুলিশ বসে আছে। তাদের কাছ থেকে সংকেত পাওয়ার জন্য আমার কার স্লো করলাম । কিন্তু তাদের কেউ এগিয়ে এলো না। আমি কারের আয়নায় চোখ রেখে গাড়ি ক্রসরোডের দিকে ঘোরালাম। তাদের কার সেখান থেকে নড়লো না। টমিকে বললাম,“ ওখানে একটা পেট্রোল কার দাঁড়িয়ে আছে। ওটা আমাদের কাজের লাগতে পারে।”
ক্যানিয়ন স্পিংয়ের সামনের বিল্ডিংটা আমার নজরে এলো। আমাদের পেছনে পুলিশের কারটা একইভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। মরুভূমির গোধুলি আলো দূর হয়ে যাওয়ার পর পূর্ব আকাশে তারাগুলো জ্বলে উঠল। আমরা একটা কালভার্টের ওপর এসে পৌঁছালাম, আমাদের সামনে ডানদিকে কয়েকটি অট্টালিকা চোখে পড়ল।

মাথায় লাল রঙের জকি ক্যাপ পরা একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে , তাকেই আমি খুঁজছিলাম। তার সামনে কার থামিয়ে ডান দিকের দরজা খুলে গলা বাড়িয়ে বললাম,“ ডলার এনেছি।” লোকটা লিকলিকে চেহারায়, বেশই লম্বা, সরু মুখটাতে সপ্তাহ খানেকের সেভ না করা দাড়ি। সে এগিয়ে এসে কারের ভেতরে এসে আমার পাশে বসে বলল, “ কেবিন খুলুন ।” “ওখানে রাজ্য পুলিশের পেট্রোল কার দাঁড়িয়ে আছে । ” জবাবে তাকে বললাম। “ কীভাবে এখন অর্থটা বের করব। আমি কোন প্রকার সমস্যায় পড়তে চাই না।” “ ঠিক আছে।” সে বলল। “ রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে কেবিন খুলুন।” পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেবিনটা শূন্য বলে মনে হল। পুরনো কেতাদূরস্ত বিল্ডিংটার নির্মাণ আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। রাস্তাটা এখন পর্যন্ত নির্জন, বড় কেবিনটার পেছন দিকে দুটো কার পার্ক করা। ওখান থেকে কারের লাইসেন্স প্লেট পড়তে পারলাম না। এক সময় কেবিনে ঢুকলাম, কার দুটো বাইরের দিকে থাকায় এখন আর দেখা যাচ্ছে না। টমিকে বললাম “ আপনি দেখার আগেই আমি মিস স্পেনকে দেখতে পাব। তিনি জীবিত আছেন।” “ গোল্লায় যাক,” তিনি মুখটিপে হেসে বললেন। “ আমি আপনাকে গোল্লায় যাক বললাম কারণ আপনি এখন কী করবেন ভেবে।” “ আমি ঠিক করে বলতে পারছি না। অবস্থার বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” “ আপনার আর্মস?” “ সাথেই আছে।” আমি টমিকে বললাম। “ আমি কি রিভলভার বের করবো?” টমি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। “ না, প্রয়োজন নেই। অর্থ দিয়েই কাজ হবে। মিস স্পেনকে পেলেই আমাদের জয় হবে।” “ এখানে বোর্ডের লোকজন নেই।” টমি বললেন। “আপনার কি মনে হয় আমরা উদ্বিগ্ন ?” আমি বললাম । “ অর্থ হস্তান্তর করে আমরা একটা সিগন্যাল দেব আর সে সময়ই মিস স্পেন মুক্তি পাবে। আমরা এখানে দোটানা অবস্থার মধ্যে থেকে কি উদ্বিগ্ন না হয়ে থাকতে পারি?”

“ মিস স্পেন নিরাপদে আছেন তা তার এটর্নির কাছ থেকে জানার জন্যে অপেক্ষা করব। তারপর তুমি তোমার প্রাপ্য পাবে, ওকে?” আমি লোকটাকে বললাম। “ আপনার রিভলভারটা দিয়ে দিন,” সে বলল,“ আপনি চালাকি করবেন না, চালাকি করলে আপনাকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেব।” লোকটি তারপরই আমার দিক থেকে টমির দিকে ঘুরতেই লোকটার কপালের মাঝখানে রিভলভারের ব্যারেল তাক করে টমি পরিষ্কার কন্ঠে বললেন, “ চোখ পিট পিট করবে না, জোরে জোরে নি:শ্বাস নেবে না, নইলে আমার নিশানা ঠিক থাকবে না।” লোকটি তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মিনমিনে কন্ঠে বলল,“ আমি আমার রিভলভার নামিয়ে নিচ্ছি।”, আমি লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম,“ মিস স্পেন কি এখানে আছেন ?” “ না।” সে কর্কশকন্ঠে বলল,“ দেখুন, আমার কথা খারাপ শোনালেও আমার কথা বিশ্বাাস করুন, মিস স্পেন ভালই আছেন। ওই বাড়িতে অনেক রাইফেল বন্দুক আছে; তাই আপনারা অন্য কিছু ভাববার চেষ্টা করবেন না।” “ অর্থটা দিতে এসেছিলাম,” আমি বললাম। “ সরল বিশ্বাসেই এসেছিলাম। এখন আমার কথা মন দিয়ে শোন- আমি তোমাকে যাওয়ার অনুমতি দিলাম। রিভলভার বন্দুক ছাড়া তোমাদের একজন লোককে আমার সাথে ক্যানিয়ন স্প্রিং এ পাঠাতে পারবে। আমি স্লোটকিনকে এখান থেকে ফোন করব। মিস স্পেন মুক্তি পেয়েছেন তার মুখ থেকে শুনলেই আমি তোমাকে ডলারের এ ব্যাগটা দিয়ে দেব, আর তার সাথে তোমার রিভলভারটাও ফেরত দেব। আমার কাজ অর্থটা ডেলিভারি দেওয়া, কাজ সমাধা করেই চলে যাব । কথা পরিষ্কার তো?” তার চোখদুটো আমার দিক থেকে টমির দিকে ফিরিয়ে আবার আমার দিকে ফেরাল। আমি বললাম, “ এখানে বসেই তোমার মাথায় একটা ফুটো করে দিলে তা নরকের মতো অবস্থা হবে, তাই না? চোরদের জন্যে সম্মান দেখানোর কোন মানে হয় না। ” কয়েক মুহূর্তের জন্যে সেখানে নীরবতা নেমে এলো। তারপর আমি এক সময় বললাম,“ আমি বিপরীত দিকে যাচ্ছি, যে পথ দিয়ে আমরা এখানে এসেছিলাম। আমি তোমাকে আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়া বাড়িতে গিয়ে আমার ম্যাসেজটা জানানোর জন্যে অনুমতি দিচ্ছি। যদি তুমি তিন মিনিটের মধ্যে ফিরে না আস তবে তোমার হাতদু’খানা শরীর থেকে আলাদা করে দেব। ” তার পাশের দরজার দিকে তাকিয়ে বললাম, “ এখান থেকে বের হয়ে ওই বাড়িটাতে যাও।” সে ওখান থেকে বের হয়ে বাড়িটার দিকে চলে গেলে আমি সেখান থেকে দু’শ পা হেঁটে রাস্তায় এসে হাজির হলাম। টমি বললেন, “ আপনি ওকে বিশ্বাস করেন?” “ টমি, রিভলভার হাতে নেবেন না!”
“ আমি ওটা করতে পছন্দ না করলেও প্রয়োজন হলে ওটা হাতে তুলে নিতে পারি,” টমি বললেন। “ আমি আপনাকে আরো অতিরিক্ত পঞ্চাশ ডলার দেবার কথা ভাবছি, টমি ।” “ আমার মনে হয়, ওই বেজন্মাটা আবার আসবে।” “ তারা তো অন্য কাউকেও পাঠাতে পারে।” “ গোল্লাই যাক! ওরা যাকেই পাঠাক না কেন আমরা তাকে মোকাবিলা করতে পারব।” টমি আবার বলল,“ আমি আপনার সঙ্গে যাব। বাগে পেলে ওরা আপনাকে হত্যা করবে, আর যদি আপনি বেঁচে গিয়ে তাদের হাতে ধরা পড়েন তবে তারা আপনার লাইসেন্স নম্বর থেকে জানতে পারবে আপনি কে।” “ আমি তাদের কষ্ট লাঘব করবো।” আমি বললাম। “ আমার নাম জো পুমা, আর আমার অফিস বেভারলি হিলসে। আপনি দুঃচিন্তা করবেন না, টমি।”

লিকলিকে চেহারার লোকটা হাসি মুখে ফিরে আসতে দেখে আমি ভাবলাম এবার হয়তো ভাল কিছু আশা করা যেতে পারে। আমি টমিকে বললাম,“ টমি, আপনি লোকটাকে নিয়ে গাড়িতে বসুন, আমি স্লোটকিনের সাথে কথা বলে অর্থকড়ি নিয়ে ভেতরে আসছি।” “ঠিক আছে।” টমি বললেন। আমি হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম। হোটেলটা আলোয় আলোকিত। লোকটাকে হোটেলে নিয়ে আসতে চাইলাম না কারণ তাকে দেখে যে কোন ডেক্সের কেরানি পুলিশ ডেকে বসতে পারে। ভেতরে গিয়ে স্লোটকিন কে ফোন করলাম। তিনি তার ফোনের কাছেই ছিলেন। “ আমি পুমা বলছি, আপনি কি বলছেন?” “ ওদেরকে অর্থ দিয়ে দিন। স্পেন দু’মিনিট আগে হলিউডের একটা ওষুধের দোকান থেকে আমাকে ফোন করেছিলেন।” স্লোটকিন ফোনের ও প্রান্ত থেকে বললেন। ঠিক আছে বলে আমি ফোনের রিসিভারটা রেখে দিলাম। গাড়ি থেকে বাইরে যাওয়ায় পুলিশ কী ভাবছে কে জানে! মিস স্পেন মুক্তি পেয়েছেন তার অপহরণকারীরা মুক্তিপণ পাওয়ার প্রত্যাশায় আছে। লিকলিকে চেহারার লোকটাকে অর্থ প্রদান করার তাগিদ অনুভব করলাম। আমার দায়িত্ব পালন করার পর আমাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। এখানে একজন সৎ নাগরিকের মতো দায়িত্ব পালন করার সুযোগ নেই। আমি কিন্তু গাড়ির দরজাটা খোলার জন্যে গর্ববোধ করলাম না। “ খবর ভাল তো?” লিকলিকে চেহারার লোকটা জিজ্ঞেস করল। “ ডলারগুলো এখন তোমাকে দিতে হবে। তোমাকে এখানেই রেখে যেতে হবে, নাকি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে?” হোটেলের আলোয় তার মুখের হাসি দেখা গেল। “ আমাকে এখানেই রেখে যান। সারা রাস্তাই তো আমাকে অনুসরণ করেছেন।” ডলার ভর্তি থলিটা তাকে দিয়ে দিলে সে থলেটা বগলদাবা করে বলল,“ সাবধানে গাড়ি চালাবেন। আপনাদের সামনে বিশাল মরুভূমি ।” সে গাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তা ধরে পার্কিলটের দিকে এগিয়ে গেল। আমরা তাকে রাস্তার ওদিকে যেতে দেখলাম। টমি বলল,“ লোকটা বেজন্মা, তাই না? ও আমাদের পছন্দ করে বলে তো মনে হল না।” “ আমরা সম্ভবত আর কখনো তাকে দেখতে পাব না।” আমি বললাম। “ এখন কি সামনের দিকে যেতে চান, টমি?” টমি তার মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন ,“ আমি এখন পেছনের সিটে একটু চোখ বন্ধ করে থাকব।”
পুলিশের পেট্রোল কারটাকে আর সেখানে দেখা গেল না।

আধা মাইল গাড়ি চালানোর পর আমি পেছন থেকে আলো এগিয়ে আসতে দেখলাম। টমিকে বললাম,“ লোকটাটি কি আমাদের অনুসরণ করছে? ”
টমি ঝিমুতে ঝিমুতে বললেন,“ হতে পারে।”
ক্যানিয়ন স্পিংস রোড থেকে গাড়িটাটা পেছনের দিকে টার্ন নিল। আমি টমিকে বললাম, “ কারটা কি আমাদের ধরে ফেলবে। সাবধান হতে হবে।” টমি উঠে বসে বললো, “ কেন আমাদের পিছু নেবে। আমরা তো অর্থ পেইড করেছি, করিনি?” “ অবশ্যই করেছি। সে আশা করেছিল না আমরা সহজেই অর্থটা দিয়ে দেব। আপনি মনে রাখবেন লোকটা কিন্তু একজন পেশাধারী। ” পেছনের কারটার হেডলাইট নিকটবর্তী হচ্ছে। অন্যদিক থেকে আর একটা কার আসছে। আমি টমিকে বললাম,“ আপনি দেখেন তো পেছনের কারটার আলো কত দূরে আছে।” পেছনের কারটার আলো আর দেখা যাচ্ছে না, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পেছনের গাড়িটা কী উধাও হয়ে গেল। “ আমি পেছনের জানলায় চোখ লাগিয়ে রাখছি কারটার গতিবিধি নজর করার জন্যে।” টমি আমাকে বলল।
“ পেছনের জানালাটা বন্ধ করে রাখাই ভাল, তা না হলে ওরা আমাদেরকে দেখতে পেয়ে গুলি করে দিতে পারে।” আমি টমিকে বললাম।
“ ওরা গুলি করলে আমি কী গুলি না চালিয়ে বসে থাকবো” টমি বলল, “ আমি জানালার নিচের দিকে থাকছি।”
“ যাতে ওরা আমাদের কারের পাশ দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে কার জন্যে আমি ব্রেক করছি। তার জন্যে আপনি রেডি থাকবেন।” রেয়ারভিশন মিররে দেখতে পেলাম পেছনের কারের বড় আলো। তারা আমাদের কারের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় এ্যাস্কিলেটরটা পাদুটো দিয়ে চেপে ধরে রাখলাম। পেছনের কারের গতি সম্বন্ধে ভুল ধারণা করেছিলাম; আমি আমাদের কারের ব্রেক কশার আগেই পেছনের কারটা আমাদের পেছনে পৌঁছে গিয়েছিল। একটার পর একটা গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। ওদের গুলির জবাব দেওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম না। তাহলে টমি ওদের গুলির জবাব দেয়নি। তৃতীয়গুলিটি আমার কাঁধে বিদ্ধ হল। আমি হুইলের উপর আর্তনাদ করে পড়ে গেলাম। পা ব্রেক থেকে সরে যাওয়ায় আমাদের গাড়িটা রাস্তার ওপারের একটা গর্ত মতো জায়গায় গিয়ে পড়লো। আমার এটুকুই মনে আছে যে, ওখানকার বালি ঠান্ডা ছিল । বালি ঠান্ডা থাকায় আমি তখনো বেঁচে ছিলাম।


দু’দিনের মধ্যে আমার জ্ঞান ফেরে না। জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারলাম, আমি লসএঞ্জেল হাসপাতালে আছি। আমার বেডের পাশে স্লোটকিনের একজন সহকারী আইনজীবী একটা চেয়ারে বসে আছেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,“ আরামবোধ করছেন?”
“ আমি জানি না। এখন আমি কোথায় আছি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ টমি কী অবস্থায় আছে ?” “ টমি? আপনি কি ভার্চের কথা বলছেন?” “ ঠিকই ধরেছেন।” “ তিনি মারা গেছেন। কার উল্টে যাবার আগেই তিনি মারা যান।” তার কথা শুনে চোখ দুটো বন্ধ করলাম। তরুণ আইনজীবীটি বললেন, “ ওসব নিয়ে আপনি ভাববেন না। আপনি এখানে যত্নেই আছেন, আপনার গাড়িটাকে প্রায় পুরোপুরিই মেরামত করা হয়েছে। ওটাকেও ভাল জায়গায় রাখা হয়েছে।” “ কেন?” জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,“ কেন নয়?” “আমি মি. স্লোটকিনের থেকে যথেষ্ট সম্মান পেয়েছি।” আমি বললাম,“ কিন্তু কখনোই তাকে অবিশ্বাস করিনি।” তরুণটি মুচকি হেসে বললেন, ও সব কথা এখন থাক! আপনার ভাল হয়ে উঠাই এখন আসল বিষয়। আপনি দুঃচিন্তা করবেন না।” এটা আমার চিন্তার বিষয়। টমি ভার্চ আমার কারণেই মারা গেছেন। এ অবস্থায় আমি তরুণ আইনজীবীর সঙ্গে তর্কবিতর্ক লিপ্ত হতে চাইলাম না। একটু আরাম দেবার জন্যে আমাকে হাসপাতাল থেকে নদীর ধারের বিশ্রামাগারে আনা হয়েছে । আমার মধ্যে বলশক্তি ফিরিয়ে আনা ছাড়াও টমি ভার্চকে ভুলে যাবার জন্যেই হয়তো এটা করা হয়েছে। স্লোটকিনের সহকারী আইনজীবীদের মাঝ থেকে একজনকে সার্বক্ষণিক আমাকে দেখাশোনা করার জন্যে আমার বেডের পাশে রাখা হয়েছে। ব্যয়বহুল হলেও আমার দেখভালের জন্যে একটা নার্স আছে।
অন্যদিকে, লরা স্পেনও আমার উপর খুশি। পাঁচজন ফটোগ্রাফার, সাতজন রিপোর্টার, দু’জন পাবলিসিটি কর্মী এবং স্লোটকিনের একজন প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আমাকে দেখতে এসেছিলেন। যদি মিস লরা স্পেন আমার বেডরুমে আমাকে পুরস্কৃত করতে আসতেন, আর সেই আসাটা হতো একাকী তবে কী না আনন্দ পেতাম! তিনি নিশ্চয়ই অসাধারণ সুন্দরী। যদি তিনি একাকী এখানে আসতেন তবে আমার মনে হয়, আমি টমি ভার্চের কথা ভুলে যেতাম। তার আসার একদিন পর সকালে স্লোটকিনের সহকারী আইনজীবীর সাথে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কার পার্কিং লটে এলাম। আমার গাড়িটিকে ওখানে রেডি অবস্থায় দেখতে পেলাম। সহকারীটি বললেন, “ প্রয়োজন পড়লে আমাদেরকে কল করতে ইতস্তত করবেন না, ঠিক তো? ” “ আমি অন্যথা করবো না।” আমি তাকে কথা দিলাম। ওয়েস্ট সাইডে আমার অফিসে আমাকে পাবেন। আমরা কয়েকদিন এক সঙ্গে থাকলাম। আপনি নিজের যত্ন নেবেন।” কথা কয়েকটি বলে তার কাঁধ চাপড়িয়ে দিয়ে আমি আমার কারে উঠে বসলাম। পশ্চিমের ট্রাফিকে মোড় না নেওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন।

অফিসে পৌছে মেইল ও গোটা কয়েক বিল চেক করলাম। তারপর আন্টিকে একটা চিঠি লিখতে শুরু করলাম, আর ঠিক সেই সময় ফোন বেজে উঠলো। হাল স্লোটকিনের ফোন। তিনি বললেন, “ শুনেছি আপনি ভাল নেই। ভাল না থাকার কারণটা আপনি কী আমাকে বলবেন?”
তার প্রশ্নের জবাবে আমি বললাম , “ আমার অনুমান, মিস স্পেনের অপহরণের কেসটা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছে, এটা আমার কাছে মেকি বলে মনে হয়, মি.স্লোটকিন। ”
“ মেকি বলে আপনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন ?” তাকে সব কারণ বললাম। অল্প সময়ের মধ্যে মিস স্পেনকে মুক্তি দেওয়া, স্কিন্নি নামের লিকলিকে লোকটা মুক্তিপণের অর্থ গুনে না নেওয়া এবং স্টেট পুলিশকে দেখে তাকে চিন্তিত না হওয়া, কারে উঠার সময় তাকে আমার কারের পেছনে না দেখা। “ তাহলে লোকটি কি একজন সৌখিন অপহরণকারী?” “হতে পারে। ঠান্ডা মাথার অস্ত্রধারী সৌখিন অপহরণকারী। এমনও হতে পারে যে এটাই তার প্রথম অপহরণের ঘটনা।” কিছু সময় নীরব থাকার পর স্লোটকিন বললেন,“ ঠিক আছে, আমি একজন ক্লায়েন্টের প্রতিনিধিত্ব করেছি মাত্র। ব্যক্তিগতভাবে এ সব কাজের সঙ্গে জড়িত নই। আপনি তা বিশ্বাস করেন না?” “ তা আমিও বিশ্বাস করি, মি.স্লোটকিন।” “তাহলে আপনি মেকী খোঁজার চেষ্টা করছেন কেন? আপনি তো পুলিশ না, তাহলেও আপনি পারিশ্রমিক পেয়েছেন।” “ এক অর্থে আমি একজন পুলিশম্যান। রাষ্ট্র আমাকে লাইসেন্স দিয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হচ্ছে একজন লোককে মেরে ফেলা হয়েছে। ” “ ওটা কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?” “ হ্যাঁ, আপনার কাছে কি নয়?” “ এমনটা হতে পারে,” তিনি বললেন। “ আমি মনে করি এমনটা ঘটা স্বাভাবিক।” তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আবার বললেন, “ তা বেশ, আমার মনে হয় এখন আর আমাদের এ সব কথা নিয়ে আলাপ করার প্রয়োজন নেই, পুমা। ” “ আমি আর ভাবছি না।” আমি বললাম। “ যাক হোক আপনাকে ধন্যবাদ।” ফোনের রিসিভারটা ঝুলিয়ে রেখে আমি ওখানেই বসে পড়লাম, রাগান্বিত হওয়ার কোন কারণ দেখতে পেলাম না । আমি তো একজন নাইট খেতাবধারী নই। এমনকী আমার একটা ঘোড়াও নেই। তাহলে আমি কেন জ্বলেপুড়ে মরতে যাব? মিস স্পেনের ব্যক্তিগত ফোন নম্বরটা জানার জন্যে মি.স্লোটকিনকে আবার ফোন করলাম। মি.স্লোটকিনের অফিসগার্ল ফোন ধরে বললো, মি.স্লোটকিন অফিসে নেই, আর মিস স্পেন ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার কাউকে দেন না। যাক, আমি জানতে চাচ্ছি, মিস স্পেন কোথায় থাকেন? আমি তার সাথে দেখা করতে চাই।

পশ্চিমা ধাচের নিচু বাড়িটিতে স্থাপত্যের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নিচু ছাদটি যেন একটা ড্রয়িং বোর্ড। পরিচারিকাটি জিজ্ঞেস করলো,“ মি. পুমা , আপনার এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?”
“ না, নেওয়া নেই। মিস স্পেনের অপহরণকারীদের গুলির আঘাতে আহত থাকার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছি। না, তার সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্টে নেই।” পরিচারিকাটি ভ্রুকুটি করে বললো,“ আপনি কি—”
আমি সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকালাম।
“ প্লিজ , এক মুহুর্ত অপেক্ষা করুন।” সে বলল। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভেতর থেকে ঘুরে সে আমাকে বলল,“ এই পথে, প্লিজ।” সূর্যকরোজ্জ্বল দিন, লরা স্পেন বিকিনি পরে সুইমিং পুলের কাছেই ছিলেন। তার দেহবল্লরীতে একজন তরুণীর অভিব্যক্তি, তার মুখটাতে লাবণ্যের আভাস! “ মি. পুমা।” লরা আমাকে দেখে হেসে বললেন। “কী আনন্দ!” আমি সুইমিং পুলের নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করলাম। “ শ্যাম্পেন চলবে?” তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।
“ ঠিক আছে। ”
লরা স্পেন আসন গ্রহণ করলে আমি তার পাশে বসে বললাম.“ আমি কিডন্যাপিং সম্বন্ধে ভাবছি, মিস স্পেন। পুরোটার মধ্যে একটা সন্দেহের গন্ধ আছে।” তার যৌবনদীপ্ত মুখটা যেন শক্ত হয়ে উঠল। “ সত্যি? আর কেনই বা সন্দেহের গন্ধ পাচ্ছেন?” আমি মি.স্লোটকিনের কাছে যে যে কারণের কথা বলেছিলাম সেগুলোই তাকেও বললাম। তিনি আসন থেকে উঠে কাছেই রাখা নিচু একটা স্ট্যান্ড থেকে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এলেন। আমি তার কাছ থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরালাম। তিনি পুলের জলের দিকে তাকিয়ে বললেন,“ কিডন্যাপারদের সম্বন্ধে আমার কোন ধারণা নেই। আপনি তাদের সম্বন্ধে ভাল বলতে পারেন। কেন আপনি এমনটা মনে করছেন?” আমি বিষণ্ণ কন্ঠে বললাম,“ একটা লোক মারা গেছে, এটাই দুঃখজনক ব্যাপার।” “লক্ষ লক্ষ মানুষ মরছে,” তিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন। “ হাজার হাজার মানুষ প্রত্যেকদিন মরছে, আমার অনুমান।” “ আমরা যাদের জন্যে কাজ করছিলাম, তারা এভাবে আমাদেরকে মারে না।” আমি জবাবে বললাম। “ তার মৃত্যুর জন্যে কি আপনার দায়দায়িত্ব নেই।?” তিনি মাথা নেড়ে বললেন,“ এ সম্বন্ধে আমি কী করতে পারি।?”
“ আপনি আমাকে বলুন আপনারা কাকে ভাড়া করেছিলেন। আমি এটা নিশ্চিত যে আপনি প্রত্যাশা করেননি যে তারা আমার লোককে হত্যা করবে।”
আমার কথা শুনে স্পেনের মুখটা যেন পাথর হয়ে গেল। তিনি বললেন,“ আমি কাউকে ভাড়া করিনি। এটা আমার প্রচারপ্রসারের জন্যে কোন কৌশল গ্রহণ করিনি, মি. পুমা। আপনি কি মনে করছেন আমি প্রকৃতপক্ষে নিজের পাবলিসিটি জন্যে এটা করেছি?”
তার কথা শুনে আমি মিনমিনে কন্ঠে বললাম ,“ না, আমি বিষয়টা যাচাই করার চেষ্টা করছি মাত্র।”
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম ,“ তা বেশ, আমি লোকটাকে চিনি, যদি একবার তাকে পাই, তবে কী করতে হবে আমি জানি।”
আমার কথা শুনে লরা মাথা নেড়ে বললেন,“ আপনি উত্তেজিত হয়ে উঠছেন। আপনার কথাবার্তা ডিক ট্রাসির মতো। সেটা ১৯৫৭ সালের কথা, মি. পুমা।” “ অবশ্যই।” আমি বললাম।“ আমি ভায়োলেন্সের কথা না ভেবে তার সঙ্গে মোকাবিলা করার কথা ভাবছিলাম।” মিস স্পেন উদাস উদাস চোখে বললেন,“ আপনি ভায়োলেন্সের কথা ভাবছিলেন না!। ওটা হচ্ছে আপনার এক ধরনের অপারেশন, আমি বাজি ধরতে পারি।”
“ আমি তাদেরকে চিনি না।” তিনি একটু হালকা ভাবে আবার বললেন। “ কিন্তু তাদের যেন কোথায় দেখেছি, আমার মনে হয় আপনি ওদেরকে বেশি ভয় পাবেন না। ভাল থাকুন , পুমা। ”
কিছুই জানতে না পেরেই আমি ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি কি একটা ম্যাসেজ নিয়ে ওখান থেকে চলে এলাম? আর যদি তিনি এর মধ্যে সম্পৃক্ত থাকেন তবে এর মধ্যে একটা ম্যাসেজ থাকার কথা। আমি তার অপহরণকারীদের খুঁজতে চাইছিলাম না। কিন্তু এ চিন্তাটা ছিল আবেগ ও অল্প বয়সীদের ভাবনার মতো। শেষ পর্যন্ত আমি এবারলিখলিকে চেহারার স্কিনি নামের লোকটা সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম, যাতে আমি যাচাই করে দেখতে পারি মিস স্পেন প্রতারণামূলক আচরণ করছেন কিনা। তিনি এ সবের দায়দায়িত্ব থেকে পালিয়ে রক্ষা পাবেন কিনা। সম্পৃক্ত থাকলে তার ক্যারিয়ার প্রশ্নে মুখে পড়বে।

একজোড়া নাম ও দুটো ঠিকানা এখন খুঁজে বের করতে হবে। সান্তা মোনিকার অলিম্পিক বিল্ডিংয়ের একটা চার ইউনিটের অ্যাপার্টমেন্টে প্রথমে গেলাম । ওটাই লরা স্পেনের দ্বিতীয় স্বামীর ঠিকানা। তিনি এখন ডগলাস এয়ার ক্রাফ্টের একজন অ্যাসেম্বেলার। অ্যাপার্টমেন্টের ম্যানেজার আমাকে বললেন তিনি ৪:৩০ পর্যন্ত বাড়ি থাকেন না।
তার প্রথম স্বামীও নিঃসন্দেহে কর্মরত ছিলেন, তার কর্মক্ষেত্রটা ওখান থেকে দূরে নয়। তিনি ভেনিস ফোর্ড এজেন্সিতে কার সেলসম্যানের কাজ করেন।
মি. স্পেনের প্রথম স্বামী আমার মতোই একজন লম্বা চওড়া মানুষ। তার পরনে ইটালিয়ান সিল্কস্যুট, আর গলায় টাই। চোখে মুখে একজন মাতালের চেহারা বর্তমান থাকলেও দেখতেশুনতে কিন্তু সুদর্শন। কার লটেই আমি তাকে পেলাম। তিনি বললেন,“ পাঁচ মিনিটের মধ্যে কফি ব্রেক হবে। পাঁচ মিনিট পরেই আমরা রাস্তার ওপারে গিয়ে বসবো।” পাঁচ মিনিট পরে লরা স্পেনের প্রথম স্বামী জ্যাক ডুগানের সঙ্গে ভেনিসের কর্মব্যস্ত রাস্তার পাশের ছোট্ট পার্কটাতে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে লরা স্পেনের প্রথম দিকের রোমান্সের গল্প শোনালেন। তিনি বললেন, প্রথম সাক্ষাতের সময় ওকলাহোমা থেকে আসা হালকা পাতলা গড়নের অনিন্দ্যসুন্দরী রিফুজি মেয়ে লরা’র বয়স ছিল উনিশ, তখন থেকে পাঁচটা বছর সে ছিল নিষ্কলুষ ।
আমি বললাম,“ ফ্যান ম্যাগাজিনে কখনোই সে সময়ের তার চেহার ছবি দেখিনি। আমার ধারণা ছিল, সে তার অনিন্দ্য চেহারার জন্যে বিউটি কনটেস্টে জয়লাভ করেছিলেন।”
জ্যাক ডুগান মুচকি হেসে বললেন, “ এটা নিশ্চিত যে আমি লরাকে উদ্দীপ্ত না করলে বিউটি কনটেস্টে জয়লাভ হতো না। লরা এখনো মাঝেমধ্যেই আমাকে দামী পানীয় পাঠায়। মেয়েটির পক্ষে উপরে ওঠা একটা ব্যাপারই নয়!”
“ আপনি তো তাকে জানেন, তিনি কি পাবািলসিটি জন্যে মিথ্যা একটা কিডন্যাপিং এর কেস সাজাতে পারেন? ”
জ্যাক ডুগান বললেন, “ লরা আগে একটা কিডন্যাপ সাজিয়েছিলেন।” তিনি তার মাথা ঝাঁকিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন,“ আপনি জানেন, তিনি ওটা থেকে মুক্তিও পেয়েছিলেন।” “ তার ফ্যামেলিকে আপনি কী চোখে দেখেন? আপনি কি কখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন?”
“ তাদের সঙ্গে তার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল।”
জ্যাক ডুগান তাদের সম্বন্ধে আমাকে বললেন। ভেবে অবাক হলাম যে লোকটি এখনো মাঝে মধ্যে লরা’র কাছ থেকে মদিরার বোতল পেয়ে থাকে, আর এখন সে তার প্রাক্তন স্ত্রীর বিরুদ্ধে বলে চলেছে। আমি হতবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,“ আপনি এ সব কথা কেন বলছেন? আমাকে এ সব তথ্য দিয়ে আপনি কী সুবিধা আদায় করতে পারবেন?”
“ সুবিধা?” তিনি বললেন।“ দেখুন, আমি একটা মাতাল আর তুচ্ছ মানুষ। আমার অনেক কাজই প্রশংসার যোগ্য না হলেও আমি কিন্তু একজন মানুষ !”
“ আপনার কথা সঠিক, আমি আপনার কথার সঙ্গে একমত।”
জ্যাক ডুগানের ওখান থেকে আমার অফিসে ফিরে গেলাম। আমি ভাবলাম, এখন আর লরা’র দ্বিতীয় স্বামীর সাথে দেখা করার অর্থ হয় না। লরা যখন প্রথম তাকে বিয়ে করে তখন সে ছিল তরুণী। হলিউডে তার মূল্য আছে এ কথা লরা তাকে বলেছিল। তারপর থেকে সে আর তার সঙ্গে বসবাস করেননি। এ শহরটিতে একমাত্র সেই জানে লরার জীবনের গল্প।


অফিসে শান্ত হয়ে বসলাম। আর কিছুই ঘটলো না। অফিস থেকে বের হয়ে লাঞ্চ খেয়ে আবার ফিরে এলাম। টমির মৃত্যুর স্থানটাতে লোকজন নেই। টমি ভার্চকে যে খুন করেছে সে স্বাধীনভাবেই ঘুরে বেরাচ্ছে। আমাদের দু’জনেরই মেরে ফেলার পরিকল্পনা ছিল ওদের, কারণ আমরা তাকে চিনে ফেলেছিলাম। আমেরিকার সবচেয়ে পুলিশবহুল শহর বেভার্লি হিলসে কি লোকটা আবার আসবে? এ শহরে পুলিশের প্রটেকশন নেওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার । টমি ছিলেন একজন সাহসী সহকর্মী। একজন রসিক লোক। তিনি সৎভাবে জীবনযাপন করতেন। তিনি মাত্র দু’শ ডলারের জন্যে ঝুঁকি নিতে বাধ্য হয়েছিলন। টমি ভার্চ ছিলেন একজন দায়িত্ববান মানুষ।

কার পার্কিং লটে না রেখে আমার অফিসের সামনে রেখে দিলাম, যাতে যে কোন লোক বুঝতে পারে আমি অফিসেই আছি। আমি বাড়িতে গিয়েও অপেক্ষা করতে পারতাম, কিন্তু আমি আমার অফিসেই থাকলাম। দরজাটা খুলে ডাক্তারকে ভেতরে আসতে দেখলাম। আমার অফিসের পাশেই তরুণ ডেন্টটিস্ট’র চেম্বার। তিনি বললেন,“ আগামী বিকেলে গল্ফ খেলার বিষয়ে কি কিছু ভেবেছেন?”
“ রাতে আপনাকে জানিয়ে দেব।”
“ ব্যাপার কী ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ আপনাকে কেন এত নার্ভাস দেখাচ্ছে!”
“ এখনো আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি। আপনি হয়তো জানেন আমি আতঙ্কের দিন কাটাচ্ছি। অবস্থা খুবই খারাপ!”
“ তবে কি গল্ফ খেলা হবে না?” “ আমি রাতে যা হয় জানাব।” আমি আবার একই কথা বললাম। “ ঠিক আছে।” তিনি বললেন। “ আমি ওদের শয়তানীর কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছি।” আমি বললাম।
“ আমার বাড়িতে কল করবেন, জো।” আমি আমার বা’হাত নাড়িয়ে তার কথায় সম্মতি জানালাম।

আমার মা সব সময়ই আমাকে কাজে অনুপ্রাণিত করতেন। আমার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কুসংস্কার ছিল। আমি ভাবলাম, স্কিনি নামের লিকলিকে লোকটিকে খুঁজে বের করা এখন যুক্তিযুক্ত হবে। আমার মনে হলো, সে যেই হোক না কেন আমি তাকে চিনতে পারব।। যদি আমি তাকে খুঁজে না পাই তবে আমাকে পুলিশের সাহায্য নিতে হবে। আমি একজনের স্পষ্ট ছবি দেখতে পাচ্ছি। লরার প্রথম স্বামী জ্যাক ডুগান আমাকে যা বলেছিলেন তা থেকে আমার মনে হলো সেই লোকটাই হবে, তার কথাটা আমিও ভেবেছি। পেছনের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে। একটু পরেই পশ্চিমের পর্বত আঁধারে ডুবে যাবে। আমার অফিসের কাছের রাস্তায় গাড়ি ঘোড়ার চলাচল কমে আসবে। পেছনের হলঘর থেকে আমি পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। অল্প সময়ের মধ্যে সেকেন্ড ফ্লোরের অফিসটা জনশূন্য হয়ে গেল। একটা সিগারেট ধরিয়ে কয়েক সেকেন্ড জানালার পাশে রাস্তার দিকে মুখ করে তাকিয়ে থেকে আবার ডেক্সে ফিরে এলাম।

হাল স্লোটকিন সম্বন্ধে খোঁজখবর নেওয়া যেতে পারে, আমি ভাবলাম। স্লোটকিন নিশ্চয়ই ধাপ্পাবাজ নন। তিনি আইন পেশায় নিবেদিত, তাই মেকি কোন কিছু সঙ্গে তিনি আপস করতে পারেন না। যদি টমি ভার্চ মারা না যেত তবে আমি আমার পেশা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতাম।
অন্ধকার হয়ে আসছে। হলের বাইরের সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম । শব্দ স্পষ্ট হতে হতে তা ধীরে ধীরে হলের নিচের দিকে মিলিয়ে গেল। আমি ওখানেই বসে থাকলাম।

দরজাটি আস্তে আস্তে খুলে গেল। লিকলিকে চেহারার স্কিন্নিকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তার পরনে কালো রঙের সস্তা স্যুট, মাথায় লাল রঙের জকি ক্যাপ। তার মাথার চুল কাল। একটা হাত জ্যাকেটের পকেটে ভেতরে। সে তার পেছনের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলে আমি বললাম ,“ ওহ, আপনি কাজটা করেছিলেন? সে আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল,“ আপনি সহজে না মচকানোর মতো লোক।”
“ হ্যাঁ, আমি সহজে না মচকানোর মতো লোক।” আমি বললাম,“ তোমার ভাই কোথায় অপেক্ষা করছে, পেছনের দিকে নাকি, সেখানটাতে ইঞ্জিন চলছে?”
আমার কথা শুনে লোকটির মুখে হতাশা ভাব ফুটে উঠল। “ ভাই- ? আপনি কীভাবে অনুমান করতে পারলেন।” সে হতাশ কন্ঠে বলল,“ আসলে আপনি কিছুই জানেন না।”
“ আমি শুধু জানি, লোরনা স্প্যাঙ্গালার নামে একটি মেয়ের বোকাসোকা টাইপেরা দু’জন ভাই আছে । ভাই দুটোর সঙ্গে কিন্তু লোরনা’র সদ্ভাব ছিল না। ” আমি তার কথার পৃষ্ঠে বলে উঠলাম, “ তারা ভাবতো, ডিলিঙ্গার ও নেলসন এবং তাদের বংশধররা তাদের কালের বিখ্যাত আমেরিকান হিসাবে বিবেচিত হতেন। মেয়েটি বড় হয়ে লরা স্পেন হয়। বোকা বালকদুটোর ভাগ্যে কী ঘটেছিল? আমরা সেটাই খুঁজে বের করবো বলে স্থির করছি। ”
লোকটা আমার কথা শুনে কোন প্রকার উচ্চবাচ্য না করে আমার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
“ লোরনা বা লরা এমন কাউকে খুঁজছিল যে বা যারা তার জন্যে মজার একটা পাবলিসিটি করে দিতে পারে। সে ভাবল, বোকা ভাই দুটোকেই কাজে লাগানোই ভাল? ভাই দুটোর মধ্যে একজন লরা চেয়ে অনেক বেশি সেয়ানা ছিল, সেই লোকটি কি তুমি নও? তুমি নিজের প্রতি সচেতন নও। তুমি কারো কথায় নাচতে দ্বিধা কর না। ”
“ ওহ, আপনি আমাকে খারাপ ভাবছেন কেন?”
সে আমার দিকে একবার তাকিয়ে মাথা ঘুরিয়ে অন্য দিকে ফিরে বলল, “ আপনি কেন আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন?”
“ আমি তা ব্যাখ্যা করতে বিরক্ত বোধ করছি। ” আমি জবাবে বললাম। “ তুমি এখন এখানে কেন এসেছ?”
“ অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে ।” সে জবাবে বললো,“ আপনি এমন বড় কিছু নন, আপনি একটা আঙুলের সমান।”
“ আমি আশা করছিলাম তুমি আসবে।” আমি বললাম। “ ব্যাপারটা ছিল ব্যক্তিগত। এর ফলে মনে এক ধরনের আবেগের সৃষ্টি হয়েছে।”
আমার কথা শুনে সে হেসে বলে উঠল,“ আমি এখানে এসেছি।” সে পকেটে হাত দিয়ে রিভলভার বের করে ফেললো। আমি দ্রুততার সঙ্গে আমার কোলের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে আমার রিভলভারটা হাতে নিয়ে টিগার টানতে উদ্যত হয়ে তার গলায় গুলি চালাতে গেলাম। তার ভাইটা তখনও ইঞ্জিন চালু করে অপেক্ষা করছিল।
আর সে সময়ই অফিস পাহারারত চৌকিদাররা তার উপর অস্ত্র তাক করে গুলি চালাল।
গুলির শব্দ শোনার পর পরই স্কিনি আমার ওখান থেকে সেখানে গিয়ে হাজির হলো, চৌকিদাররা মনে করলো, লোকটি হয়তো তাদেরই লোক।

স্কিনি দাড়িগোঁফ কেটে না ফেললে তারা তাকে সে সিঁড়ি কাছ থেকেই ধরে ফেলত। দাড়ি গোঁফ না থাকায় তারা তাকে চিনতে পারেনি। স্কিনি দাড়িগোঁফ চেঁছে ফেলায় আমি সন্তুষ্ট হলাম এটা ভেবে যে সে একজন খুনি আর সে জন্যে তাকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে দেওয়া উচিত হবে। তাকে পাকড়াও করে চৌকিদারদের হাতে সমর্পণ করলাম। ফোনবুক দেখে এ শহরে ক্রিমিনাল কোর্টের একজন নামডাকওয়ালা আইজীবীকে এ কেসে নিয়োগ দিতে সিদ্ধান্ত নিলাম।

উইলিয়াম ক্যাম্পবেল গল্ট (১৯১০ -১৯৯৫) আমেরিকান ঔপন্যাসিক,গল্পকার ও ক্রাইম ফিকশন রাইটার। তিনি ১৯১০ সালে উইসকনসিনের মিলওয়াকিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর স্পোর্টস ফিকশন, বিশেষত তরুণ-পাঠকদের উপন্যাস তিনি ১৯৬০এর দশকের গোড়ার দিকে প্রকাশ করতে শুরু করেন। অপরাধ কল্পকাহিনীর জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন। গল্ট তার ক্রাইম ফিকশন ‘ডোন্ট ক্রাই ফর মি’ জন্য ১৯৫২ সালে অ্যাডগার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। তিনি সেরা পি.আই. এর শামুস পুরষ্কার জেতেন। পেপারব্যাক অরিজিনাল ১৯৮৩ সালে কানা ডাইভার্শনের জন্য এবং আমেরিকার দ্য প্রাইভেট আই রাইটার উভয়ই ১৯৮৪ সালে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের জন্য দ্য আই পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে তাকে বাউচারকনের লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। তিনি ১৯৫০ ও ১৯s০-এর দশকে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা জো পুমার বৈশিষ্ট্যযুক্ত একাধিক পেপারব্যাকের মূল রচনা লিখেন। তার লেখা ‘স্টোলেন স্টার’ ‘অপহৃতা তারকা’ নামে বাংলায় রূপান্তর হয়েছে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top