কবিতাগুচ্ছ // নন্দিনী সেনগুপ্ত

অসমাপ্ত

শহরের পথে অর্ধেক লেখা গল্প
নষ্ট হচ্ছে, গড়িয়ে পড়ছে রোজ
যদি পারে কেউ উপসংহার লিখতে
দুয়ারে দুয়ারে এ শহর করে খোঁজ

না ফুরোনো সব গল্পের মত ক্ষুধা
নিয়ে অজস্র পেট বাঁচে এ শহরে
অজানা অচেনা হঠাৎ নতুন মোড়
শোকের রাস্তা পেরোয় অলীক প্রহরে

অর্ধেক প্রেম এ শহরে স্বতঃসিদ্ধ
অর্ধেক চেনা অসুখের জ্বরজ্বালা
কোত্থাও কোনো নিটোল গল্প নেই
কাজ নেই। আছে দরজায় বড় তালা।

কাজ নেই, তাই তামাদি হয়েছে প্রেম
অর্ধেক খোলা জানালায় কার মুখ?
অপেক্ষারত মুখে অর্ধেক ঢাকা
কাছে দাঁড়াবার পায়ে দ্বিধা, ভুলচুক।

অর্ধেক জেগে এ শহরে সব গল্প
হচ্ছে না শেষ, কে লিখবে শেষ ভালো?
রাত্রির কাছে হেরে যাওয়া আধো কথা
ক্লান্তি মুছিয়ে হয়তো জ্বালাবে আলো।

চুক্তিপত্র

ব্যস্ত ঢেউগুলো উঠে এলো সমুদ্র থেকে,
শূন্য ঝুলিতে ভরে রেখেছি উদগ্রীব ঝিনুক।
শুকনো বালুকারাশিতে
যখন জলের ততখানি টান থাকেনা
তখনও ঢেউ গুণেগেঁথে রাখা যায়।

অবশ্য কবিদের এত চুলচেরা হিসেব মানায় না,
মগ্ন অক্ষরমালা পিছনেই পড়ে থাকে।
লতানে গাছের আকর্ষের
দিব্যচক্ষু নিয়ে মৃত্যু আসে আলিঙ্গন করতে।
বেঁচে ওঠাও এখন
বিষাদফুলের ছায়ার বাষ্পের মত ক্ষণস্থায়ী।

খোলা বইয়ের মগ্ন অক্ষরমালায়
পড়ে থাকে কিছু অবিশ্বাস্য স্বীকারোক্তি।

বৃদ্ধ রাখাল

অন্ধ শাখা, কোটরজীবন
বিহানবেলার বৃদ্ধ রাখাল।
অনন্তকাল অরণ্যপথ
স্মৃতির মাঝে সদ্য রাখা

সবুজ, তোমার মিথ্যাভাষণ,
বৃক্ষ চেনে তঞ্চকতা।
হৃদয় নিয়ে ভুলে গেছো
আদিম বনের শুনছো কথা?

অমন ভুলে যাওয়ার অসুখ
পুষছে শহর অহোরাত্রি।
যাচ্ছে ভুলে বীজমন্ত্র,
কে যে ছিল অন্নদাত্রী!

কে আর দেবে পথের খবর!
চলে গেছে বৃদ্ধ রাখাল।
আঁধার বনে পথ হারিয়ে
কাঁদছি আমি এমন কাঙাল!

কেমন সবুজ ঘিরে ছিলো,
মনটি ছিল সুখের গোচর।
সব ভুলিয়ে দিলো কারা
নগর জুড়ে নামছে কি ঝড়?

আমিই যেন অন্ধ সে গাছ,
কাটছে কারা আমার শাখা?
বৃদ্ধ রাখাল, ফিরে এসো
স্মৃতি ভরুক কথা রাখায়।

স্বপ্নে

এক মধ্যরাতে রবীন্দ্রপ্রণাম
স্বপ্নের মাঠ জুড়ে ঘটতেই থাকে।
প্রণাম নাকি নগর সংকীর্তন?
মাতৃস্বরূপা এসে বিলিয়ে যান প্রসাদ
শালপাতার বাটিতে
মুড়িতে মাখা গরম কাঁচাগোল্লা

হুলস্থূল সুর ওঠে বসন্তে
কারো মুখে মুখোশ নেই
তবুও কেউ কাউকে চিনতে পারছি না
ফাগ উড়ে যায়
কেউ কাউকে চিনতে পারিনা
বহুযুগের ওপার
স্বপ্নে কারো মুখে মুখোশ নেই
চিনি না কাউকে
তবুও…
রবীন্দ্রনাথের জন্য
স্বপ্নে জেগে থাকি।

দেওয়াল (১)

পশ্চিমের বারান্দায় যেওনা তুমি,
যেখানে একসময় বিকেলে বসে আমরা
চা এবং নানা অকেজো কথার ফাঁকে…
না… যেও না ওখানে।

প্রেমিক হাতে খুলোনা দরজার তালা
আমি জানি ওখানে
পড়ে আছে পাখিদের মৃতদেহ
একটি ধূসর পাখি, আরেকটি হাল্কা সবুজ…
ওদের ডানায়
এখনও আছে লেগে সমুদ্রের নীল গন্ধ
তাছাড়া বারান্দায় এখনও হয়তো আছে
পরিত্যক্ত পিপিই কিট।
যেওনা, দয়া করো।

এখন অভ্যেস হয়ে গেছে দেওয়ালে
বহু দূর না দেখা
এই চোখে বন্ধ দেওয়াল
দেওয়াল ছাড়া আর কেউ
যেন কাছে না আসে এখন।
আসলে, আমি না চাইলে
দেওয়াল আমাকে আঘাত করেনা,
অথচ ছিটকে পড়ে গেলে
আবার দেওয়াল ধরেই উঠে দাঁড়াই।

দেওয়াল (২)

লিখেছি বহুযুগ চারটি দেওয়ালে
চারটি দেওয়ালে আঙুলে জল ছাপ
আকাশে লিখবো, লিখবো মাটিতে
বিঁধিয়ে অক্ষর বাতাসে ঝরে পাপ

পায়ে পায়েই ঘোরে পোষ্য মার্জার
আদুরে স্বর থেকে কুড়িয়ে অক্ষর
কবিতা শ্বাস টানে বন্ধ ঘরেতে
ডিপফ্রিজের খোপ হিসেবী লাসঘর

লিখেছি কতকাল বালিশে আঙুলে
ক্যালরি মেপে নেওয়া কলম তির্যক
কী আছে ডায়েটে সবার জন্যই
আকাশে লিখবার বড্ড আছে শখ।

লিখবো মেঘেতে মীড়ের নৌকায়
বাতাসে পাপ নয়- ঝরবে মধু মধু
শীতের ফাটা ত্বকে দেওয়ালে কলি ফেরে
এই… কিছু না, লেখাই হোক শুধু।

জলের কাছে

আবার যাবোই কোনো ঝর্ণার কাছে
জলের গন্ধে খুঁজে নেবো কিছু খুশি
আমি তো নিয়েই যাই, প্রাণ চিরঋণী
দেবো কি বিষাদ যত এ আঙুলে পুষি?

ছুটি দেবো পোষমানা অলস ব্যথাকে
শোকাহত দুই চোখ ধুয়ে নেবো জলে
আবার ঝাপটে ডানা ঝরাবো পালক
ধূসর শহর থেকে দূরে যাবো চলে।

বিবর্ণ সুতো বাঁধা যত পিছুটান
চিরকুটে লেগে থাকা অভিমানী ধুলো
সব কিছু সাথী হতে চাইবে সেদিন
মেঘ, তুমি দূরে গিয়ে অঙ্গুরী খুলো।

অভিজ্ঞানের কথা মনে রেখো তুমি
আমি তো ভুলতে চাই সব স্মৃতিদাগ
চলে যাওয়া সোজা নয়, কঠিন কি খুব?
উৎসুক ভেসে যায় প্রিয় বাঁশি ডাক।

বাতাসে উপচে যায় আশা একরোখা
ঝর্ণার গতিবেগ খুঁজে নেওয়া পথে
শরীরী বাহানা যত ভাঙছে প্রাচীর
আবার জলের কাছে যাবো কোনমতে।

আবার জলের কাছে যাবো যে একাকী
নাগরিক গণ্ডির অসুখের শেষে
মুখোশের সুতো খুলে ফের নেবো শ্বাস
জলের আখরে নাম লিখি ভালোবেসে।

মেঘ বলেছে প্রেম

শহরের দিগন্তে দুঃসহ ব্যথা
চরাচরে মেঘ আসে নেমে
বিরহের আঁচলের ধূসর জমিতে
দিনশেষে কে জাগে প্রেমে!

জরিসুতো বিদ্যুতে ঘোমটার পাড়ে
অভিমানী হাওয়া আসে উড়ে,
মেঘ বুঝি পথ ভুলে এলো এ শহরে
যায়নি তো অরণ্যে দূরে।

শহরের ধমনীতে ক্ষতদাগ দেখে
চুম্বনে মেঘ যায় ছুঁয়ে
কষ্টের মায়াটানে বৃষ্টি নেমেছে
সব ব্যথা দেবে আজ ধুয়ে

অসুখের দিনরাতে রাস্তার ধারে
অশ্রু গড়ায় বাতিস্তম্ভে
ফুরিয়েছে অনাবিল শোকের মহিমা
শহর ভাবেনি মেঘ জমবে।

সন্ধের মুখোমুখি বোঝাপড়া বাকি
কাটবে কি রাত্রির দ্বিধা
দুঃখের নীড় ভাঙে প্রত্যেক ঝড়ে
শহরের শ্রম যায় বৃথা

অমৃত ঢেলে দাও এ শহরে মেঘ
গতি নিক স্থির যত চাকা
জটিলতা মুছে ফেলে জাগুক নগর
বৃষ্টির বিশ্বাসে আঁকা।

চাবি

চাবি টিপে টিপে উঠে আসে অক্ষর
শরীর ফুঁড়েছে ঘনবর্ষার জল
মাধবীলতার হাত উঠে যেতো ছাদে
ছিন্ন আমের শাখা পথে পড়ে ছিল
ঝড়ে নয়। ছাঁটে কারা করাতের ঘায়ে

ওরাও এবেলা ভাত ও মাংস খাবে
গাছ কেটে। ঝড়, বজ্রের ভয়ে ভীত
চাবি টিপে টিপে ডেকে এনেছে মানুষ
ছিন্ন শাখার হাতেই বন্ধ্যা সময়।
শরীর হঠাৎ ফুরোয় বর্ষারাতে

দরজায় রথ। চাকায় বাজার আসে।
ফলমূল ফ্রিজে ঢুকেছে নিরুত্তাপ।
রোগ প্রতিরোধ বিশাল ক্ষমতাবলে
চেষ্টা রয়েছে। গাছ কাটা পড়ে যায়
পাথরের সুখে ভাঁড়ার ভরছে খাদ্যে।

গাছ কেটে পথে রেখে গেছে ওরা আজ
স্তূপ ডালপালা পড়ে আছে হাতে পায়ে
চাবি টিপে টিপে ঘরের দরজা খুলে
পাল্লা নড়ে না। চাবি ঘুরছে না আর
শবদেহ পথে, শরীর ফুঁড়েছে চাবি…

বেহালাবাদক

বর্ষার সাথী বেহালাবাদক এলো
সুরে ভরে ওঠে শহরের রাস্তা
জাগছে শহর অসুখের ঘুম থেকে
ছড় টেনে যায় কী আজীব দাস্তা

অসুখের কথা ভুলিয়ে দিচ্ছে সুর
ভুখাপেটে দেখো শিল্পী বাজিয়ে চলে
শিরা বের করা হাতেই বৃষ্টি নামে
মেঘ কাঁধে টোকা দিচ্ছে খেলাচ্ছলে

বেহালাবাদক আঙুলে সবুজ ডাকে
লুপ্ত বীজের অঙ্কুর দেয় উঁকি
শিল্পী কি শেষে গাছ হবে বর্ষায়?
সুরের শিকড় নেমে যাবে বহুমুখী

ও শহর, তুমি কান পাতো আজ পথে
মেঘের মিড়ের মোচড়ে কান্না ক্ষত
দু দণ্ড আজ থামাও গাড়ির চাকা
সুরের নদীটি বইছে বেদনাহত

ও শহর, তুমি দুহাত বাড়াও আজ
বেহালাবাদক অসুখ ভোলাতে পারে,
ঐন্দ্রজালিক আঙুলের দিব্যি
তার ঝুলিটুকু ভরে দাও এইবারে

তার ভুখাপেটে অন্নের দানা নেই
সুরে সুরে ভরা শরীরের পরমাণু
বেহালাবাদক বর্ষায় পথ চলে
ও শহর, তুমি হও আজ নতজানু।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top