পার্পল হিবিস্কাস (পর্ব ১২) // চিমামান্ডা নগোজি আদিচে, ভাষান্তর: দিলশাদ চৌধুরী

“আমি বলছি না যে তুমি নিজেকে অনেক বড় মনে করো। আমি শুধু বলছি যে চিনউই আর অন্যান্য বেশিরভাগ মেয়ে কি ভাবে। হয়ত তোমার ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করা উচিত। হয়ত তোমার স্কুলের পরে ওভাবে দৌড়ে না গিয়ে আমাদের সাথে হেঁটে হেঁটে গেট অব্দি যাওয়া উচিত। এমনিতেও, তুমি ওভাবে দৌড়াও কেন?”

“আমার ওই একটু দৌড়াতে ভালো লাগে,” আমি বললাম আর ভাবলাম যে আমি যখন পরের শনিবারে গির্জায় স্বীকারোক্তি দেব তখন কি এটাকে মিথ্যা হিসেবে ধরব, নাকি এটাকে প্রথমবারে মাদার লুসির ডাক না শোনার মিথ্যেটার সাথে যোগ করে দেব। কেভিন সব সময় ঘন্টা বাজার সাথে সাথেই পগেট ৫০৫ গাড়িটা গেটের কাছে এনে থামিয়ে রাখত। কেভিনের হাতে বাবার দেয়া আরও অনেক কাজ থাকত আর আমার ওকে অপেক্ষা করানোর অনুমতি ছিল না। তাই আমি সব সময় ছুটে আমার শেষ ক্লাস থেকে বের হতাম। এমনভাবে ছুটতাম যেন আন্তঃবিভাগ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমি দু’শ মিটার দৌড়ে অংশ নিয়েছি। একবার, কেভিন বাবাকে বলেছিল যে আমি কিছু সময় বেশি নিয়েছি, আর বাবা সাথে সাথে আমার ডান-বাম দুই গালে চড় মেরেছিল আর তাই তার মস্ত তালু আমার দুই গালে সমান দাগ রেখে গিয়েছিল আর সেই সাথে দীর্ঘদিন কানে ঝনঝনানি।

“কেন?” ইজিন জিজ্ঞেস করলো, “যদি তুমি থাকো আর মানুষজনের সাথে কথাবার্তা বলো তাহলে হয়ত ওরা বুঝতে পারবে যে তুমি আসলে নাক উঁচু নও।”

“আমার আসলে দৌড়াতে ভালো লাগে,” আমি আবার বললাম।

আমার সহপাঠী বেশিরভাগ মেয়ের কাছেই আমি ওই সাময়িকীর শেষ অব্দি ঘরকুনো নাক-উঁচুই রইলাম। তবে আমি খুব বেশি চিন্তা করলাম না, কারণ আমার মাথায় এর চেয়েও বড় চাপ ছিল– এই সাময়িকীতে প্রথম স্থান নিশ্চিত করার চিন্তা। ব্যাপারটা কিছুটা এমন যে প্রতিদিন যেন মাথায় এক বস্তা পাথর নিয়ে ভারসাম্য রেখে রেখে আমার স্কুলে যেতে হত আর ওটাকে স্থির রাখতে হাত লাগানোর অনুমতিও ছিল না। আমি তখনও আমার পড়ার বইয়ের লেখাগুলো ঝাপসা লাল দেখতাম, তখনও দেখতাম আমার ছোট্ট ভাইটার আত্মা সরু রক্তরেখায় একত্র করে বাঁধা। আমি শিক্ষকদের কথা মুখস্থ করে নিতাম কারণ জানতাম যে পরে পড়ার চেষ্টা করলে পড়ার বইয়ের আগামাথা কিছুই বুঝতে পারবো না। প্রতি পরীক্ষার পর একটা কঠিন জটলা, অনেকটা অবহেলা করে বানানো ফুফুর মত, আমার গলায় দলা বাঁধতো আর অনুশীলনের খাতা ফেরত আসা অব্দি ওখানেই থাকত।

ডিসেম্বরের শুরুতে স্কুল বড়দিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল ৷ কেভিন আমাকে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পথে আমি ফলাফলপত্রে চোখ রাখলাম আর দেখলাম ১/২৫, এমন এক জটিল হাতের লেখায় লেখা যে আমার গবেষণা করতে হলো এটা বুঝতে যে ওটা ৭/২৫ নয়। ওই রাতে আমি ঘুমালাম বাবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠা মুখের ছবি জড়িয়ে ধরে, সাথে বাবার কণ্ঠের শব্দ যেটা আমায় বলছে যে, সে আমায় নিয়ে কতটা গর্বিত, আর কিভাবে আমি আমার ওপর অর্পিত ঈশ্বরের অভিলাষকে পূর্ণতা দিয়েছি।

ডিসেম্বর সাথে নিয়ে এলো ধুলোয় ভরা হারমাতান বাতাস। আর সেই বাতাসে ভেসে এলো সাহারা আর ক্রিসমাসের ঘ্রাণ, ফ্রাঙ্গিপনি থেকে সরু, ডিম্বাকৃতি পাতা আর শিষ দেয়া পাইন গাছের সূচের মত পাতা হ্যাচকা টানে আলাদা করে, আর প্রায় সবকিছুই খয়েরি রঙে ঢেকে দিয়ে। আমরা প্রতি ক্রিসমাসই আমাদের দেশের বাড়িতে কাটাতাম। সিস্টার ভেরোনিকা এটাকে বলতো ইগবুদের বাৎসরিক অভিবাসন। সে বুঝতে পারত না, একটা আইরিশ উচ্চারণে, যেটা তার জিভের সাথে কথাগুলোকে জড়িয়ে ফেলত, সে বলতো যে কেন ইগবুরা নিজেদের দেশের বাড়িতে এত বড় বড় ঘর তৈরি করে যেখানে তারা ডিসেম্বর মাসে কেবল এক বা দুই সপ্তাহ কাটায়, আর বছরের বাকি সময় শহরের পিঠে খিল ধরা ছোট্ট কোয়ার্টারগুলোতে দিন কাটায় আর সন্তুষ্টও থাকে। আমি মাঝেমধ্যেই ভাবতাম যে, সিস্টার ভেরোনিকার এখানে বোঝার কি আছে, এটা তো সাধারণত যা হয় তাই। আমাদের রওনা হওয়ার দিনে সকালের বাতাস বেশ বেগবান ছিল, শিষ বাজানো পাইন গাছগুলোকে টেনে ধরছিল আর ঠেলে দিচ্ছিল যাতে তারা মুড়িয়ে বেঁকে যায়, ঠিক যেন কোনো ধুলার দেবতাকে ঝুঁকে প্রণাম করছে, আর তাদের পাতা আর শাখাগুলো শব্দ করছে কোনো ফুটবল রেফারির বাঁশির মত করে। গাড়িগুলো গাড়িবারান্দায় থামানো ছিল, দরজা আর ডিক্কি খোলা, ভরতি হবার অপেক্ষায়। মাকে সামনের সিটে নিয়ে বাবা মার্সেডিজটা চালাবেন, আমি আর জাজা বসব পেছনে। কেভিন সিসিকে নিয়ে ফ্যাক্টরির গাড়িটা চালিয়ে আমাদের পেছন পেছন আসবে, আর ফ্যাক্টরির গাড়ির চালক, সান্ডে, যে কিনা বদলি হিসেবে থাকে যখন কেভিন তার বাৎসরিক এক সপ্তাহের ছুটিটা নেয়, ভলভোটা চালিয়ে আসবে। বাবা জবা ফুলের ঝাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছিল, তার এক হাত সাদা কোটের পকেটে আর আরেকটা বিভিন্ন জিনিস গাড়ির দিকে দেখিয়ে দিচ্ছিল, ” স্যুটকেসটা মার্সিডিজে যাবে, আর সবজিগুলোও। মিষ্টি আলুগুলো পগেট ৫০৫ এ যাবে রেমি মার্টিন আর জুসের বোতলগুলোর সাথে। দেখো যদি শুটকির গাদাগুলোও রাখা যায়। চালের বস্তা, গার্রি আর শিমের বীচি এবং সাথে কলাগুলোও ভলভোতে যাবে।”

অনেক কিছু গোছগাছ করা বাকি ছিল, আর আদামু গেট থেকে চলে এলো সান্ডে আর কেভিনকে সহযোগিতা করতে। শুধু মিষ্টি আলু একাই, প্রশস্ত নলে ঢোকানো ছোট ছোট কুকুরছানার মত, পগেট ৫০৫ এর ডিক্কি ভরে ফেললো আর এমনকি ভলভোর সামনের সিটেও এক বস্তা শিমের বীচি এমনভাবে পড়েছিল যেন কোনো যাত্রী ঘুমিয়ে পড়েছে।

কেভিন আর সান্ডে প্রথমে চালিয়ে গেল আর আমরা অনুসরণ করলাম, এর কারণ যদি রাস্তা আটকে রাখা সৈন্যরা ওদের আটকে দেয় তাহলে আমরা সতর্ক হয়ে থেমে যাব। গেট থেকে বের হবার আগে বাবা প্রার্থনা শুরু করলো। সে প্রথম স্তবকে থামলো যাতে মা মাতা মেরির দশ জয়টা বলে যেতে পারে, তার পরের স্তবক জাজা বলে, আর তারপর আমার পালা।

বাবা গাড়ি চালানোয় মন দিল। এক্সপ্রেসওয়েটা একমুখী, আর আমরা যখন একটা লরির পেছনে এলাম সে স্থির রইলো, বিড়বিড় করে বললো যে রাস্তাগুলো নিরাপদ নয়, আরও বললো যে আবুজার লোকজন এই রাস্তাটা দ্বিমুখী করার জন্য দেয়া সব টাকা চুরি করে নিয়েছে। অনেকগুলো গাড়ি হর্ণ বাজিয়ে আমাদের অতিক্রম করে গেল, আর তাদের মধ্যে কিছু তো এতই ভরা ছিল ক্রিসমাসের মিষ্টিআলু আর চালের বস্তা আর কোমল পানীয়ের বাক্সে যে তাদের ডিক্কি প্রায় রাস্তা ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

বাবা রুটি আর ওকপা কেনার জন্য নবম মাইলে থামলো। ফেরিওয়ালারা আমাদের গাড়ির ওপর ঝাপিয়ে পড়লো, প্রতিটি গাড়ির কাচের মধ্যে দিয়ে ঠেলে দিচ্ছিল সিদ্ধডিম, রোস্ট করা কাজুবাদাম, পানির বোতল, রুটি, ওকপা, আগিদি আর বলছিলো, “আমার থেকে নিন, আমি ভালো জিনিস দেব”, ” এদিকে দেখুন, যা খুঁজছেন আমার কাছেই পাবেন”। যদিও বাবা শুধু রুটি আর কলাপাতায় মোড়ানো ওকপাই কিনেছিল, তবু সে ওখানকার সব ফেরিওয়ালাকেই ২০ নায়রা করে দিল আর তাদের “ধন্যবাদ স্যার, ঈশ্বর মঙ্গল করুন” আমার কানে গুঞ্জন তুললো গাড়ি চালিয়ে আব্বায় পৌঁছানো অব্দি।

এক্সপ্রেসওয়েতে পথ প্রদর্শন করার জন্য সবুজ রঙের ‘আব্বা শহরে স্বাগতম’ চিহ্নটা আমরা সহজেই চোখ ফসকে চলে যেতে পারতাম কারণ ওটা অনেকটাই ছোট। বাবা মাটির রাস্তায় নামলো, আর অচিরেই আমরা শুনতে পেলাম স্ক্রিচ স্ক্রিচ স্ক্রিচ শব্দ, মার্সেডিজের পেটের নিচের অংশ উঁচুনিচু, সূর্যের তাপে পোড়া মাটির রাস্তায় ঘষা খাচ্ছিল। যেই আমরা গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আশেপাশের মানুষ হাত নাড়লো আর বাবার উপাধি ধরে চিৎকার করতে লাগল “ওমেলোরা!” মাটি আর খড়ের কুড়েঘরগুলো দাঁড়িয়ে ছিল তিনতলা বাড়িগুলোর পাশেই যে বাড়িগুলো চিত্রিত লোহার গেটের পেছনে বাসা বেঁধেছে। নগ্ন আর অর্ধনগ্ন বাচ্চারা খেলছিল নিস্তেজ ফুটবল নিয়ে। গাছের নিচের মাচায় লোকেরা বসেছিল, গরুর শিং আর ঝাপসা কাঁচের মগে করে তালের মদ খাচ্ছিল।

গাড়িটা ধুলোয় ঢাকা ছিল যতক্ষণে আমরা আমাদের দেশের বাড়ির কালো গেটের সামনে এসে থামলাম। আমাদের গেটের কাছের নির্জন উকওয়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তিনজন বয়োবৃদ্ধ লোক হাত নেড়ে চিৎকার করে বললো, “ননো নু! ননো নু! তুমি কি ফিরে এসেছ? আমরা শীঘ্রই আসব তোমায় স্বাগত জানাতে।”

আমাদের দারোয়ান গেট খুলে দিল। “ধন্যবাদ ঈশ্বর, নিরাপদ ভ্রমণের জন্য,” বাবা বললো উঠোনের দিকে গাড়ি চালাতে চালাতে বুকে ক্রুশ এঁকে।

“আমিন,” আমরা বললাম। আমাদের বাড়িটা এখনো আমাকে মুগ্ধ করে, চারতলা সফেদ ঐশ্বর্য। পানি ছুড়ে দেয়া ফোয়ারা সামনে, বাড়ির দুপাশে নারকেল গাছ ওটাকে ছায়া দিচ্ছে, আর সামনের উঠোনে কমলার গাছগুলো বিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তিনটে ছোট বাচ্চা ছেলে উঠোনে দৌড়ে এলো বাবাকে শুভেচ্ছা জানাতে। সেই মাটির রাস্তা থেকেই ওরা আমাদের গাড়ির পেছনে দৌড়ে আসছিল। “ওমেলোরা, বিকেলের সুবেচ্চা, ছ্যার!” ওরা সমস্বরে বললো। ওরা শুধু নেংটি পরা ছিলো আর একেকজনের নাভি যেন ছোট্ট বেলুনের মত। “কেদু নু?” বাবা ওদের প্রত্যেককে দশ নায়রা করে দিল তার টাকার ব্যাগ থেকে একটা নোটের তাড়া বের করে। ” তোমাদের বাবা মাকে শুভেচ্ছা জানিও, আর টাকাটা অবশ্যই তাদের দেখিয়ে নিও।”

” হে ছ্যার, দন্যবাদ ছ্যার।” ওরা একছুটে উঠোন থেকে বেরিয়ে গেলো, খুশিতে হাসতে হাসতে।

কেভিন আর সান্ডে খাবারের বস্তাগুলো খুলতে লাগলো যখন আমি আর জাজা মার্সেডিজ থেকে স্যুটকেসগুলো এনে সব গোছাতে লাগলাম। মা সিসির সাথে পেছনের উঠোনে গেল ঢালাই লোহার রান্নার টিপাইটাকে জায়গামতো রাখতে। আমাদের খাবার ঘরের মধ্যে গ্যাসের চুলাতেই রান্না হবে, কিন্তু ওই লোহার টিপাইটা বড় হাড়িগুলো সাম্যাবস্থায় রাখতে পারবে যেগুলোতে মেহমানদের জন্য ভাত, মাংসের ঝোল আর ডাল রান্না করা হবে। কিছু হাড়ি তো এতবড় যে পুরো একটা ছাগল ওতে এঁটে যাবে। মা বা সিসির পারতপক্ষে ওই রান্নায় হাত দিতে হত না; তারা শুধু আশেপাশে থাকত আর একটু লবন, বা একটু ম্যাগি মশলা, বা একটু বাসন এগিয়ে দিত কারণ আমাদের বংশসংঘ উমুন্নার সদস্যদের স্ত্রীরা আসত রান্না করতে। তারা চাইতো মা একটু বিশ্রাম নিক, তারা বলতো, শহরের এত ঝক্কির পরে। আর প্রতিবছরই তারা অতিরিক্ত খাবার নিয়ে যেত — মাংসের বড় বড় টুকরো, চাল আর শিমের বীচি, কোমল পানীয়ের বোতল, মল্টি আর বিয়ার — তাদের সাথে বাড়িতে। আমরা প্রতিবারই প্রস্তুত থাকতাম ক্রিসমাসে পুরো গ্রামের মানুষকে খাওয়াতে, সব সময় প্রস্তুত থাকতাম যাতে কোনো লোকই না খেয়ে আর না পান করে ফেরত না যায় আর এমনভাবে যেটাকে বাবা বলে খাওয়ার মত খেয়ে যাওয়া। বাবার উপাধি ছিলো ওমোলেরা, সেটা দেখতে হবে তো, সেই লোক যে তার সম্প্রদায়ের জন্য করে।

কিন্তু বাবাই একমাত্র ছিল না যার কাছে মেহমান আসত, গ্রামবাসীরা বড় গেটওয়ালা প্রত্যেক বাড়িতেই দল বেঁধে যেত, আবার মাঝেমধ্যে তারা প্লাস্টিকের ঢাকনাওয়ালা বাটিও নিয়ে যেত, যাই বলো, ক্রিসমাস বলে কথা।

জাজা আর আমি উপরে জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলাম যখন মা এসে বললো, “আদে চোকার এসেছে তার পরিবার নিয়ে ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানাতে। লাগোস যাচ্ছে তারা। নিচে এসো আর তাদের শুভেচ্ছা জানাও।”

আদে চোকার একজন ছোট্ট, গোলগাল, হাসিখুশি মানুষ। যতবার আমি তাকে দেখতাম, আমি কল্পনায় চেষ্টা করতাম তাকে দ্যা স্টান্ডার্ডের জন্য ওসব সম্পাদকীয় লিখতে দেখতে; তাকে দেখতাম সেনাশাসনের অবমাননাকারী হিসেবে। কিন্তু আমি ভাবতেই পারতাম না। তাকে একটা তুলো ভরা পুতুলের মত লাগত, আর যেহেতু সে সবসময়ই হাসতে থাকতো, তার বালিশের মত গালে গভীর টোলগুলো দেখাতো স্থায়ী স্থাপনার মত, যেন তার গালে কেউ লাঠি ঢুকিয়ে দিয়েছে। এমনকি তার চশমাটাও পুতুলের মত দেখাত, ওগুলো জানালার খড়খড়ির চেয়েও মোটা ছিল, একটা নীলচে আভা ছড়াত, আর ফ্রেমটা ছিল সাদা প্লাস্টিকের। সে তার বাচ্চাকে উপরের দিকে ছুড়ে দিচ্ছিলো যখন আমরা ভেতরে এলাম , বাচ্চাটাও একদম হুবহু গোলগাল তার মতই দেখতে। তার ছোট্ট মেয়েটা একদম তার কাছটায় দাঁড়িয়েছিল আর অনুরোধ করছিল তাকেও একটু হাওয়ায় ছুড়ে দিতে।

” জাজা, কাম্বিলি, তোমরা কেমন আছ?” সে বললো আর আমরা উত্তর দেয়ার আগেই তার খুনখুনে হাসিটা হেসে বাচ্চাটাকে দেখিয়ে বললো, “জানো সবাই বলে ছোটবেলায় ওদের যত উপরে ছুড়বে, ততটাই ওরা শিখবে কিভাবে উড়তে হয়।”

বাচ্চাটা খিলখিল করে হাসলো, ওর গোলাপি মাড়ি দেখিয়ে, আর তারপর ওর বাবার চশমার দিকে হাত বাড়ালো। আদে চোকার তার মাথাটা পেছনে হেলিয়ে বাচ্চাটাকে আবার উপরে ছুড়ে দিলো। তার স্ত্রী, ইউয়ান্ডে, আমাদের জড়িয়ে ধরলো, জিজ্ঞেস করলো আমরা কেমন আছি, তারপর আদে চোকারের কাধে খেলার ছলে একটা চাপড় মেরে বাচ্চাটাকে তার থেকে নিয়ে নিল। আমি তাকে দেখলাম আর মনে করলাম বাবার কাছে তার উচ্চস্বরে নিঃশ্বাস আটকানো কান্না।

“তোমাদের গ্রামে আসতে ভালো লাগে?” আদে চোকার আমাদের জিজ্ঞেস করলো।

আমরা একইসাথে দুভাইবোন বাবার দিকে তাকালাম, সে সোফায় বসেছিলো, একটা ক্রিসমাস কার্ড পড়ে হাসছিল। “হ্যাঁ,” আমরা বললাম।

“হ্যাঁ ? তোমাদের এই জংলা জায়গায় আসা পছন্দ?” তার চোখ নাটুকে ভঙ্গিতে বড় হয়ে গেল। “তোমাদের এখানে বন্ধু আছে?”

“নাহ,” আমরা বললাম।

“তাহলে এই বিরান প্রান্তরে তোমরা করোটা কী?” সে খেপানোর চেষ্টা করলো।

জাজা আর আমি হাসলাম, কিছুই বললাম না। “ওরা সব সময় খুব চুপচাপ,” সে বললো, বাবার দিকে ফিরে, “খুবই চুপচাপ।”

” ওরা ওসব অমার্জিত বাচ্চাদের মত না যাদের আজকাল লোকজন মানুষ করছে, কোনো পারিবারিক শিক্ষা নেই, ঈশ্বরের ভয় নেই,” বাবা বলল আর আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ওটা গর্বই ছিল যা বাবার ঠোঁটকে প্রসারিত করেছিল আর চোখে আলোর যোগান দিয়েছিল। “ভেবে দেখুন কেমন অবস্থা হবে দ্যা স্টান্ডার্ডের যদি আমরা সবাই চুপ হয়ে যাই?” এটা একটা কৌতুক ছিল। আদে চোকার হাসছিল, তার স্ত্রীও, ইউয়ান্ডে। কিন্তু বাবা হাসলো না।

জাজা আর আমি ঘুরে দাঁড়ালাম আর চুপচাপ উপরে চলে গেলাম।

নারকেল পাতার খচমচে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। উঁচু গেটের ওপাশে আমি শুনতে পেলাম ছাগলের ডাক, মুরগির কক কক, আর মানুষের চিৎকার করা শুভেচ্ছা উঠোন ঘেরা মাটির দেয়ালের ওপার থেকে। “ছোকালের সুবেচ্ছা। গুম তেকে উটেছেন,অ্যা? টিক করে উটেছেন?” “ছোকালের সুবেচ্ছা। আপনার পরিবারের সবাই টিক করে উটেছে? ওহ?”

আমি হেঁটে গেলাম আমার শোয়ার ঘরের জানালাটা টেনে খুলতে, শব্দগুলো আরও ভালোভাবে শুনতে আর ছাগলের নাদা আর পাকা কমলার গন্ধ মেশানো পরিষ্কার বাতাস ঘরে ঢোকাতে। জাজা দরজায় শব্দ করলো ঘরে ঢোকার আগে। আমাদের ঘর এখানে পাশাপাশি, ইনুগুতে  অনেকটা দূরে।

“উঠে গেছ?” ও জিজ্ঞেস করলো। ” চলো প্রার্থনার জন্য বাবা ডাকার আগেই নিচে যাই।”

আমি আমার চাদরটাকে বাঁধলাম যেটা আমি গরমের রাতে একটা হালকা ঢাকনি হিসেবে ব্যবহার করেছি আমার রাতের পোশাকের ওপর। ওটাকে আমি আমার হাতের নিচে বাঁধলাম আর জাজার পিছু পিছু নিচে চললাম।

বড় বড় বারান্দাগুলোর কারণে আমাদের বাড়িটাকে মনে হচ্ছিল যেন হোটেল, আরও ছিল বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখা দরজাগুলোর অচেনা গন্ধ, অব্যবহৃত বাথরুম, রান্নাঘর আর টয়লেট, খালি পড়ে থাকা কক্ষ। আমরা ব্যবহার করতাম কেবল নিচতলা আর দোতলা; অন্য দুই তলা শেষ ব্যবহৃত হয়েছিল বহু বছর পূর্বে, যখন বাবাকে গ্রামপ্রধান করা হয়েছিল আর ওমেলোরা উপাধি দেয়া হয়েছিল। আমাদের বংশসংঘের সদস্যেরা তাকে বহুদিন ধরে অনুরোধ করছিল, এমনকি যখন সে শুধু লেভেন্তিসের ম্যানেজার ছিল আর তার প্রথম ফ্যাক্টরিও কেনেনি, একটা উপাধি গ্রহণ করার জন্য। সে যথেষ্ট ধনী, তারা জোর দিয়ে বলেছিল; আর তার চেয়েও বড় কথা, আমাদের বংশসংঘের কেউ কোনোদিন কোনো উপাধি ধারণ করতে পারেনি। সুতরাং যখন বাবা শেষমেশ স্থানীয় যাজকের সাথে বিস্তর আলোচনা করে আর সকল মূর্তিপূজক পরিবারের লোক তার উপাধি গ্রহণ অনুষ্ঠানে নিষিদ্ধ করার শর্তে সিদ্ধান্ত নিলো একটা উপাধি গ্রহণ করার, সেটা ছিলো যেন এক ছোটোখাটো ‘নতুন মিঠে আলুর উৎসব’। আব্বার পরের মাটির রাস্তার প্রতিটা ইঞ্চি গাড়িতে ঢেকে গেল। তৃতীয় আর চতুর্থ তলা লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। এখন আমি সেখানে যাই যদি আমার আমাদের উঠোন ঘেরা দেয়ালের বাইরের রাস্তাটা ছাড়াও দূরের অন্য কিছু দেখার থাকে।

(চলবে…)

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top