বিরান // গোলাম রাশিদ 

১.
নমাজি ভোরে-ভোরে  ঘুম থেকে উঠে পেঁয়াজ-মরিচ  দিয়ে এক গামলা বাসি ভাত আর আমানিটুকু তৃপ্তিভরে খেয়ে লাঙলখানা উলটো করে জোয়ালের উপর চাপিয়ে গরু দুটোর ল্যাজে দু’হাত দিয়ে মোচড় দিতেই তারা চলতে শুরু করল।আজ ধান পোঁতার জন্য জমি পাকান করতেই হবে। কাল রাতে পানি হয়েছে।মাটি  নরম হয়েছে। পানি জমতেও পারে। কালিতলা দিয়ে যাওয়ার সময় নমাজি দেখল, ল্যাটাতে পানি দাঁড়িয়েছে। আজ দুই চাষ দিতে পারলেই কাল কাজটা শেষ করতে পারবে। দরকার হলে রইসুদ্দিনের শ্যালো থেকে একটু পানি দিয়ে নেবে। কাল একেবারে মই টেনে চৌরুস করবে।ধলুকে সঙ্গে নিতে হবে।সঙ্গে একজন থাকলে কাজে সুবিধা। মনে-মনে ভাবতে-ভাবতে সে রাইপুরের রাস্তায় এসে পড়ল।
রাইপুরের হারু মণ্ডলের বাঁশঝাড়ের তলা দিয়ে রমনার মাঠে পা দিতেই নমাজির চোখ মুখের ভাব পালটে গেল।সেখানটা জুড়ে খানিক বিস্ময়,অবিশ্বাস। সব জমি শুকনো,খটখটা।ধুলোও ভেজেনি পানিতে। তবুও সে এগিয়ে যায় নিজের জমির দিকে।তার সোয়া বিঘা জমির অবস্থাও এক।যেমন শুকনো চাষ দিয়ে গেছিল,তেমনই আছে।মাঝখান থেকে ঢিলভর্তি ভুঁই পেয়ে কোন বদমাশ পায়খানা করে গেছে।এত কাছে হারু মণ্ডলের বাঁশঝাড় আছে তবুও। চাষ দেওয়া জমিতে সানন্দে কাম সেরেছে।নমাজি পায়খানার দিকে তাকাতে-তাকাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।বাদাম না কিসের কয়েকটা দানা দেখা যাচ্ছে।
রইসুদ্দিন এগিয়ে আসে।পাশেই ওর জমি।বাবলা গাছের আড়ালে ছিল বলে নমাজি এতক্ষণ তাকে দেখতে পায়নি।
ভোরবেলায় উঠ্যা ভুইয়ে আ’স্যা অ্যা কী দেখনু গো নমাজি?
যা-ই দেখনু, ভালো কিছু না।আল্লার গজব না’ম্যা আ’স্যাছে রমনার মাঠের ওপর।কালিতলার পুরা বিল ভিজ্যা গেলছে।পানিও দাঁড়া’লছে।আর এক মাইল দূরের রমনা শুকন্যা হয়ে আছে।
এ কথা বলার পর মাঠের উদ্দেশে নমাজি একটা গাল দেয়,মেয়েদের গোপন অঙ্গের সঙ্গে মাঠের তুলনা করে।
নমাজির খিস্তি শুনে রইসুদ্দিন মজা পায়।খ্যা-খ্যা করে হাসতে থাকে।
কী আর কোরবা  বুলো,লোকজন সব পাপে ডু’ব্যা গ্যাছে।তাই অ্যামন গজব।
ক্যানে কালিতলার লোক তো দিনে-দুপ্পাহারে মাতাল হ’য়্যা প’ড়্যা থাকে। কই অধের তো কিছু হয়নি? নমাজি খেঁকিয়ে ওঠে।
মাতালধের তো জমি নাইখো । যাদের জমি তারা তো আর মাতাল হ’য়্যা প’ড়্যা থাকে না।রইসুদ্দিন যুক্তি দেখায়।
ক্যানে রমনায় যাধের জমি আছে,তারা সব কী পাপটা কর‍্যাছে শুনি?
কুনু পাপ করেনি?সভাইকে পাপ কোরতে হবে?একজুনা ক’ল্যেই তো সবার উপর আ’স্যা পড়বে পাপের বুঝা।
নমাজি চুপ করে যায়।রইসুদ্দিনের ইঙ্গিত সে বুঝে গেছে।কালুর বউ আর মোদাসসেরকে নিয়ে  পাড়ায় যে কানাঘুষো চলছে, সে-কথাই বলছে।তার রাগ হয় প্রচণ্ড। বউটাকে ঝাঁটাপেটা করা উচিত।মেয়্যাছেল্যার অ্যাত শরীরের খাই কিসের।কালু না-হয় কাঁঠাল গাছ থেকে পড়ে অক্ষম হয়ে গেছে,তাই ব’ল্যা পরপুরুষের কাছে যাওয়ার দরকার কী?এখন লোকজনের মুখ বন্ধ করবে কী ক’র‍্যা?
নমাজিকে চুপচাপ দেখে রইসুদ্দিন ফোঁড়ন কাটে,কি গো শেখ, চুপ হয়া গেল্যা ক্যানে?
এই রইসুদ্দি,তুমি বেশি কথা বুলবা না।সব পাখিই মাছ খায়,দোষ হয় মাছরাঙার।তুমাকে আমি চিনি ন্যা নাকি?হাবুর ধান কা’ট্যা লিয়্যাছিল্যা , উ নাকি তুমার বিষের দুকানে বাকি রা’খ্যাছে।সে বার লোকটার বাড়ির লোক সারাবচ্ছর উপ্যাস ক’র‍্যা কাটা’লছে।এডা কুনু পাপ না?কিন্তু, এই কথাগুলো নমাজি বলে না,মনে-মনে ভাবে।সব কথা প্রকাশ্যে বলা যায় না।রইসুদ্দিনকে তো বলাই যাবে না।এই রমনাতেই তার এক দাগে দশ বিঘা জমি।
কোনও কথা না-বলে সে লাঙলটা নামায় জোয়াল থেকে।গরু দুটো ভার নিয়ে অযথা কষ্ট পাচ্ছে।এরপর ট্যাঁক থেকে বিড়ি আর গ্যাস লাইটার বের করে বিড়ি ধরায়।একটা বিড়ি রইসুদ্দিনের দিকে এগিয়ে দেয়। ওরা বিড়ি টেনে ধোঁয়া ছাড়ে। দুজনের ধোঁয়া এক সঙ্গে মিশে ধীরে-ধীরে বাতাসে বিলীন হয়ে যায়।
২.
বিলপাড়া থেকে একটি রাস্তা, যেটি গরমের সময় শুধু ধুলো আর বর্ষার সময় কাদায় ডুবে থাকে ,এসে ডোমকলের রাস্তায় পড়েছে। বিলপাড়ার মানুষের গ্রাম পঞ্চায়েত মেম্বারের বাড়ি তিন মাইল দূরের রাইপুরে।মেম্বার তাই বিলপাড়ার মানুষদের অত গুরুত্ব দেয় না।রাইপুরের ভোটেই জয় নিশ্চিত। তাই এই রাস্তা পাকাও হয় না।
সেই কাঁচা রাস্তা ধরে মোদাসসের ধীরগতিতে হেঁটে এসে নমাজির বাড়িতে ঢোকে।
কই গো,বুবু।দুলাভাই কুঠে?
মোদাসসেরের ডাক শুনে হেঁসেল ঘর থেকে মাথায় আঁচল তুলে দিতে-দিতে সফিনা বেরিয়ে আসে।
উ তো ঘুম গেল গো ভাই।পায়ের যন্তণায় কাতরাতে-কাতরাতে এট্টু ঘুমা’লো।দাঁড়াও, ডা’ক্যা দিই।
না না,ডা’কতে হবে না।ঘুমা’ক।পরে আ’সবো।
কুনু কাজ ছিল নাকি?
হ্যা, ওই রমনার জমিতে তো তুমরা এব্যার ধান লাগাতে পা’রবা না।পানি হ’ল না ঠিকমতোন।জমিখ্যান আমাকে বন্ধুক দ্যাও।
আব্বা তো বুলছিলো এব্যার কিছু লাগাবে না।অই জমি নাকি অপয়া।
তার লাগিই তো বুলছি।আমাকে দিয়্যা দ্যাও।
আমাধের অর সাথে তো কথা বুল্যা লাভ নাই। ভাই,তুমি আব্বার সাথে কথা বুলো।
তুমার শ্বশুর  কুন্ঠে?
আব্বা মুড়ের দিকে গেলছে।
ঠিক আছে,পরে আ’স্যা দুলাভাইকে দে’খ্যা যাব, বলে মোদাসসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মোড়ের দিকে হাঁটতে থাকে।
সফিনা ঘরে গিয়ে দেখে কালু, তার স্বামী  ঘুমোচ্ছে। ডান পায়ের উপর কয়েকটা মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে।সে উসরা থেকে তালপাতার পাখাটা তুলে নিয়ে হাওয়া দিতে শুরু করে।
৩.
যেবার বর্ষা হয়, সেবার গাঁয়ের লোকের আনন্দের সীমা থাকে না।ধানের গোছা ভালো হয়। পাট পচাতেও সুবিধা হয়।বিলে মাছ আসে।সেই মাছ ধরতেও বেজায় আনন্দ।দু’বেলা ঝোল খেয়েও ফুরোয় না,  বেশি মাছ পড়লে বিক্রিও করা যায়।
এবার বর্ষা আসেনি।পাট জমিতে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিল শুকনো। কালিতলার বিল একটু নিচু। সেখানে কিছুটা পানি জমেছে।তবে পাট পচানো যাচ্ছে না। পাট শুকনো হয়ে জমিতে দাঁড়িয়ে আছে।মাছও তেমন আসেনি। সবাই মনমরা হয়ে আছে।
ধলু মাছ ধরতে ওস্তাদ। এর জন্য সে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়।বিত্তি, ঢ্যানা, এইসব মাছ ধরার  সরঞ্জাম বানায়।অন্য কোনও মাঠের কাজ,নিড়ানি,লাঙল দেওয়া, সে করতে চায় না।সে নবাবের মতো শুধু মাছ ধরতেই জানে। এবার বর্ষা না আসায় মাছও আসেনি বিলে।ধলু মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। নমাজি গরু দুটোর জন্য আউড় কাটতে বলে। ধলু বলে, পা’রবো না।
আর কী কাজই বা করবে।মাঠ ফুটিফাটা। লাঙলের কাজ নেই। পাট কাটা নেই।রইসুদ্দিনের বিশ বিঘা জমি।তার দুই ছেলে কলকাতায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতে চলে গেছে। গাঁয়ে কাজ নেই।
ধলু মোড়ে আসে।বটাকে চা দিতে বলে।
কড়া ক’র‍্যা লিকার দিবি।খাস্তা বিস্কুট দিস অ্যাখান।
তুমার মেলা টাকা বাকি হ’য়্যা গেলছে।কবে দিবা?
ক্যানে আব্বার কাছ থা’ক্যা চাহাসনি?
নমাজি চাচা দেয়নি। বুল্যাছে, যে-নবাব চা খা’য়্যাছে,সে-ই য্যান দ্যায়।
ঠিক আছে।লি’খ্যা রাখ।সব দিয়্যা দিব।
কবে দিবা?
মাছ বে’চ্যা সব শোধ দিয়ে দিব।
এইসময় মোদাসসের এসে মাচায় বসে।
কিরে ধলা, কেমুন আছিস?
ভালো,তুমি কেমুন আছ?
ভালো  আর থা’কতে পারনু কই?একটা মুনিষ পাছি ন্যা। পাট কাটতে হবে।শ্যালোর পানি দিয়্যা পাট জাগ দিব এব্যার। তুই কাজ কর-না। ভালো খরচ দিব।
না,উসব কাজ আমি করি ন্যা!
তুই অ্যাত নবাবের পুত্তুর। উসব কাজ করি ন্যা!কিসব কাজ করিস ?মাছ ধরিস?
তুমি অত বকব্যা না।তুমি জোচ্চোর লোক।
আমি কী জোচ্চুরি করনু?
কী করল্যা তা আবা শুধাছো?
পাড়ায় মোদাসসের-কালুর বউকে নিয়ে কানাঘুষো হয়। মোদাসসের বুঝতে পারে,ধলু সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সে জোর করে মুখে হাসি আনে।
তোর ভাবিকে আমি বুবু বলি রে।কালু আমার ছোটকালের দোস্ত।পাড়ার লোকে কী বুলছে তাই শুন্যা তরাও লাচছিস?  এক্ষুণি তোধের বাড়ি থা’ক্যা আনু।
ধলু কোনও কথা বলে না।চায়ের দোকানের মাচাতে আরও বেশ কয়েকজন ছিল। তারা কান খাড়া করেছিল।কিন্তু মোদাসসেরের উত্তর শুনে সবাই একটু হতাশই হয়।কেউ কোনও কথা বলে না।
ধলু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস নেয়।আকাশের দিকে তাকায়। তারপর বিস্তীর্ণ বিলের দিকে তাকায়। বিল শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে।কয়েকদিন আগে যেটুকু বৃষ্টি হয়েছিল,তার পানি বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে। মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
সবাই চায়ে চুমুক দেয়। কেউ কেউ টিভির খবরে মনোযোগ দেয়।হাটপাড়ার আসেরুদ্দি জিজ্ঞেস করে,
কীরে বটা, পানি-টানি কবে হবে কিছু বুলছে?
না চাচা।এর আগে একদিন বুল্যাছিল এক সপ্তার মধ্যি বসশা ঢুকবে।কই এখনু তো এক সপ্তা হলো না।
বটার কথা শুনে সবাই হাসতে লাগে। কিন্তু সেই হাসিতে সজীবতা কম,শুষ্কতা বেশি।
আসেরুদ্দি আবার বলে ওঠে,বসশা না আ’লে কিন্তু এব্যার জব্বর মুশকিলে পড়বে লোকজুন।
এখুন দু’এক পশলা পানি হলে জমিগিলা পাকান করা যায়।
কিন্তু, তুমার আবা কী মুশকিল?ছাগল কি’ন্যা ব্যাড়াও। বসশার সাথে সাথ কী?
আছে রে আছে,বুঝতে পারবি ন্যা। মাঠে ঘাস নাই,গাছে পাতা নাই।ছাগলে খাবে কী?তাজা ছাগল খুঁজে পাওয়াই যায় নাখো।
আর পানি বাগরে হযরতের গরুডা মরা গেল সেড্যা তুমরা জানো?
নতুন উদাহরণ নিয়ে আসে গাঁয়ের মুখলেস মেম্বার।এতক্ষণ সে চুপ ক’র‍্যা ছিল। তার কথা শোনা যেতেই সবাই তার দিকে মনোযোগ দিল। ধলু আলটপকা বলে বসল,
না, জানি ন্যা।কিন্তু তুমি গাঁয়ের মেম্বার হয়ে জমির স্যাচের কী ব্যবস্থা ক’রল্যা বুলো?
এভাবে সবাই কথা বলতে পারে না।গ্রামের সবাই জানে, ধলুই একমাত্র সাহস রাখে এমন কথা বলার।সেজন্য তাকে সবাই মনে মনে সমীহ করে চলে।সেই সমীহর সঙ্গে কিছুটা ভালোবাসা মিশে থাকে।
নারে, পঞ্চায়েতকে তো বুল্যাছি।ওরা  ব্যবস্থা ক’রতে  চাহাছে না।সুব্রতদাকে বুলনু, কিন্তু সে তো গাঁইগুঁই কর‍্যা উড়ে দিছে।বলে কিনা বিশটি হবে।আভা দপ্তর নাকি বুল্যাছে বসশা হবে।বঙ্গোপসাগর থ্যাকে কী নাকি আসবে।দিয়্যা সব ভাসাবে।
 অ্যাখুন পানি না-হলে পাট পচাবে কীসে? তুমার সুব্রতদাকে বুলো এখন বসশা লাগবে না। ভুই পাকান করা আর পাট পচান্যার পানি হলেই হবে।
ধলার কথায় সবাই সায় দেয়। পানি একটু দরকার। মাটির জন্য দরকার।গাছ-গাছালি,পশু-পাখির জন্য দরকার। নতুন একটা মরশুম শুরু করার জন্য একটা ঢল খুব দরকার।
৪.
রমনার জমি লাঙল দেওয়া হল না।কোনওমতে একটু বৃষ্টি হলে নমাজি চাষ দিয়ে ফেলত।তার জোয়ান বলদ ঠিক লাঙল টেনে উর্বর করে ফেলত।কিন্তু পানিই পড়ে না।চাষ দিয়ে লাভ নেই।
সে ঘরে সারা সকাল ঠায় বসে থাকে।দুপুরে ঘুমায়। বিকেলে চায়ের দোকানে যায়।এখন চায়ের দোকানে প্রচুর ভিড় হয়।মানুষের কাজ নেই।সবাই চা খাক বা না-খাক, এসে বসে থাকে।নানা আলোচনা করে।টিভিতে খবর আসে কোন রাজ্যে বন্যা হচ্ছে।সেসব দেখে এরা গালিগালাজ করে।হা-হুতাশ করে।নিজেদের কপালকে দোষ দিয়ে শান্ত হয়।
এরই মাঝে এক দিন খবর আসে পাশের গ্রামের সুলেমান, যে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিল দু বছর আগে, সে ফিরে এসেছে।সঙ্গে অনেক টাকা আর একটা চকচকে বড় চায়না ফোন।
তিন লাখ।আনারসের ভূই লিড়ান্যার কাজ করতোক।
ধুর,তিন লাখ তো পথে পড়ে আছে।ভূই লিড়িয়ে তিন লাখ হলে সবাই ক্যারালাতেই যা’য়্যা প’ড়্যা থাকত।
আমি লিজে কানে শুন্যাছি। উ আনারস তুলত জমি থা’ক্যা। আর এব্যার উ মেলা লোক লিয়ে যাবে সাথে করে।রসুনের ছেল্যা একরাম যাবে,উ পাড়ার সাইফুল,রুবেল,আসিরুল সবাই যাবে।
উরা খা’তে পায় না, ফকিরের বাচ্চা।যাবে যাবে।আমাধের পাড়ার কেহু যাবে না।ম’র‍্যা গেলেও যাবে না।
ঠিক, অ্যাখান ঠিক কথা বুল্যাছো তুমি।আমরা ওই ভিনদ্যাশে যা’য়্যা প’ড়্যা থাকব না।দ্যাশের মাটি,সুনার চা’হ্যা খাটি।
চারদিকে এইসব আলোচনা হয়। কিন্তু দিন কাটে আর মন দুর্বল হয় মানুষের।
৫.
ধলু বিলে-বিলে ঘুরে বেড়ায়। শুকনো, ফেঁটে চৌচির হয়ে যাওয়া জমির উপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ায়। মাটি ফেঁটে যে মানচিত্র তৈরি হয়েছে তা ঘুরে ঘুরে দেখে । তারপর ক্লান্ত পায়ে সুমিদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।যখনই মন খারাপ করে,সে সুমিদের বাড়ির দিকে চলে যায়।ওদের মাচাতে গিয়ে বসে থাকে।
গিয়ে দেখে সুমি মাচাতে শুয়ে আছে।তাকে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে।মিটিমিটি হাসে।
উঠল্যা ক্যানে?শুয়ে থাক।
না,থা’কব না। তুমি বসো।
ধলু এক কোনায় বসে। তারপর জিজ্ঞেস করে,
ক্যামুন আছো?
আমি কেমুন আছি সে খবরে তুমার কী কাজ। আসল জুনার খোঁজ ল্যাও কি?
লিই তো। উ কেমুন আছে?
 তুমি এত বদ ক্যানে?
ক্যানে,আমি তুমার কী করনু?
তুমি বুবুকে কী বুল্যাছো? বুবু খালি কান্দে।
ক’দিন আগে এই মাচাতেই বসেই ধলু বলেছিল,সে কেরালা চলে যাবে। সেখানে গিয়ে কোনও কাজ করবে।সে কথা শুনেই হয়ত শিমু কান্দে।
ডাকো তুমার বুবুকে।
অ্যাখুন আ’সবে না।ঘুম পা’ড়ছে।
আ’সবে। বুলো আমি ডাকছি। তাহালি আ’সবে।
সুমি ডাকতে গেল বাড়ির ভেতর।
মাচায় বসে ধলু  উপরে তাকিয়ে দেখে বোলগাছটায় একটা কাক বসে ঝিমোচ্ছে।সে ‘হ্যা’ করে তাড়িয়ে দিল। সে যদি যায়, তাহালে ফির‍্যা আ’সতে  দু’বছর। তখুন শিমুর বিহ্যা হ’য়্যা যাবে। অতদিন কেহু মেয়্যা ফে’ল্যা থুবে না।ধলুর লা’গ্যা তো না-ই। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা গাল দিয়ে বলে, শালা ম্যাঘ,আসুমাতে হুড়পুড় ক’র‍্যা আ’সবে। অ্যাখুন সব খটখট ক’রছে। আসার কুনু নাম নাই। একটা ঢল মারলেই বিলটা ডু’ব্যা যা’ত।তাহালি লোকের পাট কাটা হ’ত, ভুই পাকান হ’ত।উ মাছ ধরতোক। আগে থেকেই ঠিক ক’র‍্যা থুয়েছিল এবার মাছ পেলে সব বেচে অ্যাখান টুকটুকি কিনবে। তাই চা’ল্যা বিহ্যাডা ক’রবে।
কী বু’লছো? শিমু এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে।
তুমি নাকি খালি কান্দ?
আমার কান্দার কপাল আমি কান্দি, তাতে তুমার কি।তুমি তো বিদ্যাশ যাওয়ার লা’গ্যা লা’চ্ছ।
তুমি চিন্তা ক’রো না। আমি দু-অ্যাক বচ্ছরের মধ্যি ঘুরে আ’সব। আ’স্যাই তুমাকে বিহ্যা ক’রব।
বাপ আমার লা’গে ঘটক তুল্যাছে।
তাইলে তুমি বিহ্যা ক’র‍্যা ফেলবা?
শিমু নিরুত্তর থাকে। মুখ নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙুল মাটির সঙ্গে ঘষতে থাকে।
কালু এক দৃষ্টিতে শিমুর পায়ের আঙুলের দিকে চেয়ে থাকে।পল পল করে সময় বয়ে যায়।বাড়ির ভেতর থেকে সুমি বেরিয়ে আসে।
বুবু,মা ডা’কছে।
শিমু চলে যায়।ধলু মাচায় শুয়ে পড়ে। কাঁদতে ইচ্ছে করে।কিন্তু কাঁদতে পারে না কোনও এক অজানা কারণে।
৬.
আজ আকাশটা একটু ঘন ঘন দেখাচ্ছিল। রোদের তেজ কম এই দুপুর বেলাতেও।নমাজি ভাবল,বৃষ্টি হতে পারে।কিন্তু সে জানে শেষ পর্যন্ত আর হবে না। তার কোনও কথাই ঠিক হয় না আর। নিজের ছেলে যার কথা শুনে না,তার আবার কী হবে। ধলুকে সে আর আটকাতে পারবে না বোধহয়।  এক সপ্তাহ আগেও যে জোর ছিল, মনের মধ্যে তা আর এখন নেই। একটু বৃষ্টি সব কিছু কেড়ে নিচ্ছে তার। তার বাপ-দাদা জমিতে কাজ করেছে। সে করেছে।তার ছেলে এখন বিদেশে গিয়ে নাকি লোকের কামলা খাটবে। বাপদাদা চোদ্দপুরুষ যা করেনি তা-ই করবে। তার মন ক্ষোভে ভরে যায়।আবার পরক্ষণেই সেই চিন্তাটা বুদবুদের মতো ভেসে ওঠে, এই ভাবে কতদিন খরা লেগে থাকবে কে জানে। ছেলে-বউ নিয়ে খাবে কী? আরেকজন তো ল্যাংড়া হয়ে বসে আছে।ধলু যদি কিছু ইনকাম করে পাঠাতে পারে, তা হলে একটা শ্যালো পুঁতবে। পুরনো একটা মেশিনও কিনবে। তখন আর মেঘের পানির আশায় বসে থাকতে হবে না। সব সমস্যা মিটে যাবে। মনটাকে শক্ত করে সে। আর আটকাবে না ধলুকে।
এই সফিনা, ধলা কই?
হাটে গেলছে ব্যাগ কিনতে।
উ কবে যাবে বুল্যাছে কিছু?
পশু সকালে উঠ্যা চ’ল্যা যাবে।
অত দূরের রাস্তা একলা যা’তে পা’রবে গো?
অই পাড়ার ইনসাফ আলির ব্যাটা যাবে,সাহাজী পাড়া থা’ক্যাও ক’জুনা যাবে।
ও, বলে নমাজি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পাড়ার ছেলেপুলে আর বোধহয় থাকবে না। সে আবার আকাশের দিকে তাকায়।
ল্যাংড়ার বউ আবার  কী কাণ্ড করে রেখেছে। পাড়ার লোকের কাছে মুখ দেখানো যায় না। এ দিকে মেশামেশি আবার বন্ধ হয় না। অই ছোড়া আবার জমি বন্ধুক নিতে এসেছিল।
সে বলেছে,তুমার সাহস তো কম না। আমার কাছে আসো।
চাচা,আপনি রাগ করছেন ক্যনে। পাড়ার লোক ভাল কথা রটায় না। খারাপটাই রটায়।
তবু যা রটে, কিছুটা তো বটে।
না, চাচা। আমার একটা ছেল্যার কির‍্যা। আমি এমুন কাজ করিনি। পাড়ার লোকের কাজ নাই। সবাই বসা। তাই মুন্দ রটিয়ে মজা লুটছে। তুমি কিছু মনে রা’খো না, চাচা।
সে মোদাসসেরের কথায় বিশ্বাস করেছে। তবে জমি বন্ধক দেওয়ার ব্যাপারে এখনও ফাইনাল কিছু জানায়নি। আর দু’একদিন দেখে তারপর বলবে।
৭.
পিঠে আর হাতে ব্যাগ নিয়ে ধলুরা কজন হেঁটে গ্রামের রাস্তা পার হয়ে হাটের দিকে যাচ্ছে।  সেখানে ওরা বাস ধরবে। মোড়ে এই ভোরে দু-একটা লোক বসে আছে। ও একবার তাকাল মাচাটার দিকে।এখানে বসে কতদিন বটার চা খেয়েছে। চারদিক দেখে আর হাঁটতে থাকে। বুকের মধ্যে কেমন খালি খালি লাগে। এতদিনের চিরপরিচিত সব ছেড়েছুড়ে  চলে যাচ্ছে। শিমুকে হয়তো এসে আর দেখতে পাবে না। কোথায় বিয়ে হয়ে যাবে।তখন হয়তো তার হাতে অনেক টাকা থাকবে।দাঁতে দাঁত চেপে সব কষ্ট মন থেকে সরানোর চেষ্টা করে ধলু। জোরে জোরে পা ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে।
ধলারা হাট থেকে বাস ধর‍্যা চল্যা যাবে বহরমপুর। সেখ্যান থাক্যা ট্রেন ধর‍্যা শিয়ালদহ হ’য়্যা শালিমার। তারপর কুন মুলুকে কী করে যাবে আল্লাই জানে। কেরালা কী এখানডা! অতদূর যা’তেই তো ছুড়া শেষ হ’য়্যা যাবে। বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা লা’গবে। নমাজি ছেলেকে বিদায় দিয়ে এসে বিছানায় শুয়ে ভাবে এসব।ভাবতে ভাবতে তার কান্না পায়। কষ্ট দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে আসে। আবছা অন্ধকারে নমাজি অনেকদিন পর বালিশে মুখ চেপে কাঁদতে শুরু করে।ছেলে চলে যাওয়ার কষ্ট, ছেলে অন্যের মুনিষ খাটবে সেই কষ্ট, একটু পানি না হওয়ার কষ্ট, চারদিক বিরান হয়ে যাওয়ার কষ্ট একাকার হয়ে মিশে যায় সেই কান্নায়।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top