কেন এরিক হবসবম আমৃত্যু মার্কসবাদী রয়ে গেলেন? // টিমোথি স্নাইডার, তর্জমা: ইরফানুর রহমান রাফিন

কেন এরিক হবসবম, যিনি ছিলেন আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও মার্কসবাদী রয়ে গেলেন, আর এই একুশ শতকে এসেও কমিউনিজমের পক্ষে বাহাস করে গেলেন?
হবসবমের প্রজন্মের একজন মানুষ হওয়ার অর্থ ছিল মহামন্দায় পুঁজিবাদের ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতা লাভ করা। তাঁর প্রজন্মের একজন ইহুদি হওয়ার অর্থ ছিল হিটলার আর নাৎসি জার্মানির উত্থানটা প্রত্যক্ষ করা। ১৯৩০’এর দশকের অই বছরগুলোতে, যে-বছরগুলোতে হবসবম ছিলেন একজন মেধাবী তরুণ, পৃথিবী যেন একটা বাইনারি চয়েসের সম্মুখীন হয়েছিলঃ হয় তুমি নাৎসিদের পক্ষে আর না হয় তাদের বিরুদ্ধে। আর মনে হচ্ছিল যেন অন্য কেউই কমিউনিস্টদের চেয়ে বেশি নাৎসিবিরোধী নয়। হবসবম খুবই অল্প বয়সে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন, আর নিজের মত করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পার্টির প্রতি অনুগত থেকে গেছিলেন।
আজকের দিনে ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন কোন চিন্তাই যেটা করে না, কমিউনিজম সেটা করেছিল, সংঘবদ্ধতার একটা চেতনা প্রদান করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির একজন হওয়ার অর্থ ছিল একটা ষড়যন্ত্রের অনুভূতি লালন করা। সেই বন্ধুদের প্রতি আনুগত্যের একটা অনুভূতি লালন করা যারা যন্ত্রণা সয়েছে ও আরো সইবে। আর এমন একটা সমষ্টিগত চেতনা লালন করা যে লড়াইটা বৃথা যায়নি, আমরা আরো মহিমান্বিত একটা পৃথিবী পেতে পারি এবং পাব। আমেরিকানদের জন্য ধর্ম যেই কাজটা করে, বারবার বলতে থাকে, “যা হয় তা ভালোর জন্যই হয়”; কমিউনিজমও ঠিক সেইভাবে যন্ত্রণা আর প্রগতির একটা যুক্তি প্রদান করেছিল। প্রতিটা গ্রেপ্তার, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানোর প্রতিটা রায়, আর প্রতিটা হত্যাকাণ্ড শুধু এক মুহূর্তের আতঙ্কই ছিল না, পুঁজিবাদের অবক্ষয় আর দুবর্লতার আরো একটা প্রমাণও ছিল।
গল্পটা ছিল এরকমঃ কমিউনিজম একটা প্রজন্মকে সংহত করে তুলতে পারবে, কারণ এটা সব প্রজন্মকে পেরিয়ে যায়। উৎপাদনের উপকরণ হল ইতিহাসের চালিকাশক্তি। অর্থনীতির মৌল কাঠামোয় যখন পরিবর্তন এসেছিল, তখন গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্যগত সামন্তীয় ব্যবস্থা শহরাঞ্চলের পুঁজিবাদের জন্য পথ করে দিয়েছিল। একবার শিল্পগুলো গঠিত হয়ে গেলে আর শ্রমিক শ্রেণি বিশাল আকার ধারণ করলে, জনগণ তাদের নিজস্ব শ্রমের ফসলে অধিকার দাবি করবে, আর কারখানা ও শহরগুলো সকলের হবে। আদি পাপের জায়গাটা নিল ব্যক্তিগত সম্পত্তিঃ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দাগটা মুছে ফেলা হবে, আমরা আমাদের আদি স্বভাবে ফিরে যাব, এবং আমরা একইসাথে ভালো, সমৃদ্ধিশালী, ও শান্তিময় হয়ে উঠব।
গল্পটায় একটা যুক্তি ছিল, কিন্তু সেইসাথে এর একটা বিশ্বাসের উপাদানেরও দরকার ছিল। বিশ্বাস আর যুক্তিকে একসাথে কাজ করতে হত, এবং হবসবমের মত একটা মনে, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা একটা মনে, যুক্তি বিশ্বাসটাকে ছায়ায় ঠেলে দিতে সামর্থ ছিল। কিন্তু বিশ্বাসটা রয়ে গেছিল, আর শেষ পর্যন্ত সেটাই প্রাধান্যশীল হয়ে উঠেছিল। কমিউনিস্টরা মহান ঐতিহাসিক হতে পারেন (ফ্যাসিস্টরা পারে না), কারণ কমিউনিজম ইতিহাসকে একটা প্লট সহকারে সরবরাহ করে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে কমিউনিজম যেহেতু কেবল একটা ধারণাই ছিল না, একইসাথে একটা রাজনৈতিক বাস্তবতাও ছিল, এর গল্পটা আস্তে আস্তে ভবিষ্যৎবাণী থেকে অতীতসম্পর্কিত সম্পাদনায় রূপান্তরিত হয়েছিল। ব্রেঝনেভের ভাষা ধার করে বলা চলে, সোভিয়েত ইউনিয়ন “আসলেই অস্তিত্বশীল ছিল”, আর এর গণহারে লাশ ফেলার নীতিগুলো সুবিদিত ছিলঃ ১৯৩৩ সালে লক্ষ লক্ষ ইউক্রাইনীয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারজনিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া, ১৯৩৭ ও ১৯৩৮ সালে কৃষক ও নৃ সংখ্যালঘুর বুকে গণহারে গুলি চালানো, ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানির সাথে জোটবদ্ধ হওয়া, ১৯৪০ সালে পোলিশ যুদ্ধবন্দীদেরকে হত্যা করা, যুদ্ধোত্তর পূর্ব ইউরোপে দখলদারিত্ব, হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ায় রাজনৈতিক সংস্কার আন্দোলনগুলো পিষে ফেলা, এবং আর যা যা সে করেছে।
হবসবম (কয়েক খণ্ডে) আধুনিক পৃথিবীর যে-অসামান্য ইতিহাসটা লিখেছেন, তার শেষ খন্ডটাই সবচে’ দুর্বল। অংশত এর কারণ হল, তাঁকে একটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলঃ ইতিহাসের একটা কমিউনিস্ট পরিকল্পনার জন্য খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নই একটা মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কমিউনিজম যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা রাষ্ট্রটি বয়ে আনেনি, এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রটির পতন হয়েছে। কিন্তু এই ধারণাটির আবেদন ফুরোয়নি যে, ইতিহাস একটা দারুণ গল্প যার একটা চমৎকার উপসংহার রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের ধারাবাহিকতায়, আমরা পশ্চিমারা, ও বিশেষ করে আমেরিকানরা, ইতিহাসকে একটা প্লট সহকারে ভাবতে শিখেছি। তফাতটা স্রেফ এই যে, আমাদের প্লটটা কমিউনিস্ট প্লটটার ঠিক উল্টো। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপ করা হবে না, থাকবে। রাষ্ট্রকে বর্ধিত না, সংকুচিত করে আনতে হবে। ধনীরা খলনায়ক নয়, নায়ক। পুঁজিবাদ নিজের পতন ডেকে আনে না, স্থিতিশীলতাকে সম্প্রসারিত করে। আমরা যদি এই সরল ব্যবস্থাপত্রগুলো মেনে চলি, তাহলে আমাদের জন্যও অপেক্ষায় থাকবে একটা কল্পলোক। আমাদের অনেকের কাছেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাপ্তিটা মতাদর্শের সমাপ্তি ছিল না, ছিল একটা প্রমাণ, যে দুই মতাদর্শের মধ্যে আমাদের মতাদর্শটাই উত্তম।
এরিক হবসবম যা ভাবতেন তা কেন ভাবতেন, যা লিখতেন তা কেন লিখতেন, আর যেভাবে জীবনযাপন করতেন কেন সেভাবে জীবনযাপন করতেন; সেটা তার কোনো একজন সহকর্মীর ফয়সালা করার বিষয় নয়; আর হলেও সেটা করার জন্য আমার চেয়ে ঢের বেশি উপযুক্ত অনেকেই আছেন। কিন্তু আমি একটা সরল চিন্তা সামনে আনতে চাই। এরিক অবশ্যই পুরনো কমরেডদের স্মৃতির প্রতি বিশ্বস্থ ছিলেন। তিনি নিশ্চিতভাবেই নিজের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা তরুণ বয়সটার ব্যাপারে নস্টালজিক ছিলেন। ঠিক নিশ্চিত না হয়েও বলতে পারি, শেষ বয়সে এসে তিনি নিজেকে একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তে আবিষ্কার করেছিলেন। মুহূর্তটা আমাদের মুহূর্ত, যেটাকে এখনো একটা মতাদর্শের যুগ বলেই মনে হচ্ছিল, যেখানে তাঁর মতাদর্শটা দুর্বলতর অবস্থানে ছিল। আর তিনি একজন যোদ্ধা ছিলেন। যখন তিনি নিজের মতাদর্শের অনুসরণে ইতিহাস সম্পাদনা করছিলেন, এটাকে এমনভাবে পক্ষপাতদুষ্ট করে তুলছিলেন যা কেবল যন্ত্রণাই দিতে পারে, তিনি এমন একটা সোভিয়েত রাষ্ট্রের পক্ষে বাহাস করছিলেন যার আর অস্তিত্ব ছিল না এবং এমন সব ধারণার পক্ষে সাফাই গাচ্ছিলেন যেগুলোকে মৃত মনে হচ্ছিল। কিন্তু যত ভুলই হোক না কেন, কিছু অন্তর্নিহিত শক্তি এটা ঠিকই ধারণ করছিল। আখেরে, একটা কিছু তো বলতেই হবে, দুর্বলকে রক্ষা করার জন্য, এমনকি আজকের দিনেও, বিশেষত আজকের দিনেও।

[অনুবাদকের নোটঃ ২০১২ সালের ১ অক্টোবর মার্কসবাদী ঐতিহাসিক এরিক হবসবম ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম ১৯১৭ সালে, রুশ বিপ্লবের বছরে। তরুণ বয়সে হবসবম মার্কসবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত হয়েছিলেন, সেই দীক্ষা তাঁর আমৃত্যু রয়ে গেছিল। লিবারেল ঐতিহাসিক টিমোথি স্নাইডার সিএনএনের জন্য এই বিশেষ লেখাটি লিখেছিলেন হবসবমের মৃত্যুর দিনে। টিমোথি স্নাইডার মতাদর্শিকভাবে এরিক হবসবমের বিপরীত মেরুর হলেও লেখাটিতে মৃত সহকর্মীর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ লক্ষ্য করা যায়। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে এই চর্চাটির ঘাটতি আছে, এমন ধারণা থেকেই, এই লেখাটি বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য তর্জমা করলাম। আরেকটা উদ্দেশ্য কাজ করেছে এই তর্জমার পেছনে, মানুষের বিশ্বাসপ্রত্যয়ের অনেকটাই যে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় গঠিত হয়, সেটা দেখানো।]

লেখক পরিচিতিঃ টিমোথি স্নাইডার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসশাস্ত্রের লেভিন অধ্যাপক। তিনি ব্লাডল্যান্ডস: ইওরোপ বিটউইন হিটলার অ্যান্ড স্ট্যালিন এবং ব্ল্যাক আর্থ: দ্য হলোকাস্ট অ্যাজ হিস্টোরি অ্যান্ড ওয়ার্নিং গ্রন্থের রচয়িতা। স্নাইডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের দ্য কমিটি অন কনসায়েন্সের একজন সদস্য এবং ভিয়েনার দি ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান সায়েন্সেসের একজন স্থায়ী ফেলো।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top