বাঁকা পাঁজরের মেয়ে – পর্ব আঠারো (শেষ পর্ব) // // নুরুদ্দিন ফারাহ, অনুবাদ: লুনা রাহনুমা

২৯
দুপুরে খাওয়ার সময় হয়ে এসেছে প্রায়। বিছানায় শুয়ে আছে ইবলা অর্ধেক ঘুমে আর অর্ধেক জাগরণে, অর্ধেক ক্ষুধার্ত আর অর্ধেক তৃষ্ণার্ত, কিন্তু বিছানা ছেড়ে এখনই উঠতে নারাজ। জিহ্বায় টক স্বাদ আর পেটে একটা তিক্ত স্বাদ অনুভব করছে— এটি গর্ভধারণের সাধারণ লক্ষণের একটি, নিজেকে মনে করিয়ে দেয় ইবলা। তবে এই নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামানোর কিছু নেই, কারণ এটি হচ্ছে একজন মহিলার জন্য পালনীয় ভূমিকার একটি, এবং সবাইকে তার নিজের ভূমিকা পালন করতে হয়। ‘আমি যদি আরেকজন মানুষকে জীবন দান করি, তাহলে কেন আমি শরীর খারাপের অভিযোগ করবো— একটি শিশু আসতে যাচ্ছে, আমার নিজের সন্তান হবে সে, এখানে সংপ্রশ্ন থাকবে কেন? কেন আমি বিরক্ত হবো? কঠোর পরিশ্রম ছাড়া যেমন জমিতে ভালো ফসল ফলানো সম্ভব হয় না, ঠিক সেভাবেই এই শারীরিক নির্যাতনটুকু হচ্ছে আমার জন্য সন্তান জন্মদানের আগে অবশ্য পরিশ্রম। এই কষ্ট সহ্য করার ব্যাপারটি আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি আমার মায়ের কাছ থেকে। তিনিও একজন মহিলা ছিলেন।’
গ্রামে থাকার সময়ের একটি দিনের কথা মনে পড়ে যায় ইবলার। সে পাশের কুঁড়েঘরে গিয়েছিল আগুন জ্বালানোর কাঠ আনতে। সেই পরিবারের একটি মেয়ের সাথে ইবলা কথা বলছিল কিছুক্ষণের জন্য। তারা যখন কথা বলছিল, তখন মেয়েটির ছোট ভাই বোন দুজন ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে তাদের মা কোথায়।
‘মায়ের কাছে তুমি কী চাও?’ তাদের বড় বোন পাল্টা প্রশ্ন করেছে।
‘ঈদ চলে আসছে। আমি চাই মা আমাকে কিছু জামা কিনে দিক,’ ছেলেটি বলে।
‘দেখো ইবলা বোন, এই হচ্ছে আমার ভাই, সে একটা ছেলে আর সে আমার কথা শুনতে চায় না। আমি তাকে বলেছি যে আমি একটা মেয়ে, আর সে হচ্ছে ছেলে। মেয়েদের উচিত সব কথা মাকে বলা, আর ছেলেদের উচিত তাদের কথা বাবাকে বলা। সুতরাং, ওকে তুমি একটু বলো আমাদের বাবার সাথে গিয়ে কথা বলতে।’ সেদিন অনেক হৈচৈ হবার পর বাচ্চা দুটি বাবা-মায়ের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি হয়েছিল। এই নিষ্পাপ বাচ্চা দুটি যারা আসলে শিশু ছাড়া আর কিছু ছিল না, তাদের এই ঘটনাটি ইবলার মনে সর্বপ্রথম নিজের যৌনতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। ছেলে এবং মেয়ের তফাৎ নিয়ে চিন্তা এসেছে মাথায়। এখন পর্যন্ত, বাচ্চা দুটির কথার অর্থ বুঝতে পারে না সে।
ইবলা বিছানায় উঠে বসে এবার। দুপুরের খাবার তৈরী হয়েছে বলে আশার ডাকের অপেক্ষায় আছে। ‘আশা না থাকলে আমি কী করতাম?’ ইবলা ভাবে। ‘যখন আমার কিছুর প্রয়োজন হয় তখন আমি তাকে বকাঝকা করি, তার নাম ধরে ডাকি। কিন্তু সে না থাকলে এতদিনে আমি পতিত-মানুষ হয়ে যেতাম। হয়তো শেষ পর্যন্ত আমিও বেশ্যা হয়ে যেতাম। জানি না কীভাবে আমি আশাকে ধন্যবাদ দিবো। একদমই জানি না কীভাবে। হয়তো সে বুঝতে পারে আমি কতোটা কৃতজ্ঞ তার কাছে; আমি আশা করি সে বুঝতে পারে, কারণ আশা না থাকলে আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম।’
চিৎকার করে না ডেকে আশা ইবলার ঘরে চলে এসেছে।
‘কেমন লাগছে এখন?’ ইবলাকে জিজ্ঞেস করে আশা।
‘ভালো।’
‘এখনও পেটের ভেতর কিছু টের পাচ্ছো?’
‘হ্যাঁ। তবে আগের চেয়ে কম।’
‘তুমি কি মাসিক মিস করেছ?’
ইবলা জোরে মাথা নাড়ে। মাথা নাড়ানোর সাথে যোগ করে,‘আমি জানি না।’
‘আচ্ছা আসো। আমরা এখন দুপুরের খাবার খাবো।’
কিন্তু ইবলা পুরোপুরি তৈরী হবার আগেই টিফো দরজায় এসে হাজির হয়েছে। আশা নিচু হয়ে ইবলার জুতা বেঁধে দিচ্ছিলো বলে ঘরের ভেতরে চলে না আসা পর্যন্ত সে টিফোকে দেখতে পেল না।
‘আপনি, কী চান এখানে?’ ইবলা বলে, নগ্ন উরু এবং পাঁজর ঢাকতে গায়ের পোশাকটি টেনে ধরে শরীরের সাথে।
‘কিছু না,’ টিফো বলে। তারপর হেসে উঠে শব্দ করে।
‘তাহলে কেন এসেছেন?’ ফোঁস করে উঠলো আশা। ‘কিছু না চাইলে এখানে এসেছেন কেন?’
‘ইচ্ছে হলে আমি আসতে পারি না এখানে?’
‘হ্যাঁ, পারেন’ আশা বলে।
‘না, পারেন না’ ইবলা বলে।
ইবলা এবং টিফো পরস্পরের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তিকরভাবে হাসে।
‘আচ্ছা, তাহলে আমি এসেছি কারণ আমি আসতে চেয়েছি। এটাই একমাত্র কারণ।’
‘আমরা এক্ষুণি দুপুরের খাবার খেতে যাচ্ছিলাম,’ আশা বলে।
‘এটা কি তোমাদের সাথে আমার খাওয়ার দাওয়াত বলে ধরে নিবো?’
‘না,’ আশা বলে। ‘আহাম্মক লোক। কোনো দাওয়াত নেই তোর জন্য।’
‘আশা তুমি জানো আমি ইবলার সাথে কথা বলতে এসেছি, তোমার সাথে নয়,’ টিফো বলে, ‘তাই তুমি আমাদের মাঝে কথা না বলে দূরে থাকো না কেন?’
‘আশা দূরে থাকবে না,’ ইবলা বলে। ‘তিনি এখানে আছেন আমার জন্য।’
‘সে তোমার উকিল, তাই না?’ অর্ধেক সোমালি এবং অর্ধেক ইতালীয় ভাষায় টিফো প্রশ্ন করে। ইবলার চোখের দৃষ্টি ফাঁকা। মুখে কথা নেই, কারণ সে বুঝতে পারছে না ‘উকিল’ বলতে কী বোঝায়।
‘হ্যাঁ, আমি ইবলার উকিল,’ আশা বলে।
‘তাই নাকি?’ ইবলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে টিফো। ইবলা এক নজর টিফোকে দেখে আবার আশার দিকে তাকায়।
‘হ্যাঁ, তাই’ নিচু গলায় বলে ইবলা, ‘তবে আমি এখন কাপড় বদলাচ্ছি, তাই আপনি কি একটু বাইরে যেতে পারেন? কাপড় পরা শেষ হলে আমি আপনাকে ডাকবো।’
‘আচ্ছা, তাহলে হয়তো আমার নিজেরও একজন উকিল খুঁজতে হবে এখন গিয়ে।’
‘আপনি কি সেদিন ইবলাকে ডিভোর্স দেননি?’ ঘরের বাইরে দাঁড়াতেই আশা জিজ্ঞাসা করে টিফোকে।
‘হ্যাঁ, দিয়েছি।’
‘তাহলে আপনি এখানে কী চান?’
‘সমস্ত পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগে এবং আমাদের জন্মের মতো অনুশোচনা শুরু করার আগেই আমি কিছু ব্যাপার সোজা করে নিতে চাই। আমি নিশ্চিত যে শুধু ঠোঁট কামড়ালে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না।’
‘আমরা ভেতরে যেতে পারি, ইবলার কাপড় পরা হয়েছে,’ আশা বলে।‘কিন্তু আপনি কী সোজা করতে চান?’ ঘরে ঢুকে কথা বলতে থাকে আশা।
‘হয়তো পুরো বিষয়টি নিয়ে আগে আমাকে অনেক ভাবতে হবে। এবং যখন আমি নিজে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবো অথবা নিজের সাথে বোঝাপড়া করা হয়ে যাবে, তখন তোমাদের কাছে এসে জানিয়ে যাবো।’
‘কিন্তু আপনি কোন ঘটনার কথা বলছেন? কী সোজা করতে চান?’ আশা আবার প্রশ্ন করে। টিফোর দিকে তাকিয়ে একটা তীক্ষ্ণ শ্লেষাত্মক এবং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত হাসি ছুড়ে দেয়। বলে, ‘আমরা আপনাকে সবকিছু সোজা করতে সাহায্য করতে পারি।’
‘দেখো, আমার স্ত্রী ইবলার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা জেনে গিয়েছে। গতকাল মোগাদিসিওতে আসার সাথে সাথে সে ইবলাকে খুঁজতে আরম্ভ করেছে। ইবলাকে খুঁজে না পেয়েই সে আমার কাছে এসেছে। আমার স্ত্রী ভয়ংকর বদমেজাজি মহিলা। সে বলেছে ইবলাকে খুঁজে পেলে ওকে খুন করবে।’
‘কেন? কেন উনি ইবলাকে খুন করতে চাইবে? খুব জঘন্য লাগছে যে তিনি এমন একটি কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি কি মনে করেন যে তেমন একটি কাজ করে পালিয়ে যেতে পারবেন? আইনের লোকজন তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা তিনি কেন এটা করতে চাইবেন?’ আশা বলে।
‘কারণ ইবলা আমাকে বিয়ে করেছে। সেজন্য ওকে মেরে ফেলতে চায়।’
‘কিন্তু এটা ইবলার দোষ নয়,’ আশা জবাব দেয়।
‘আমার দোষও না। আর জানি, এটি আমার স্ত্রীর দোষও না। কিন্তু আমার স্ত্রী এবং তার আত্মীয়রা বহুবার এমন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং তারা কখনো ধরা পড়েনি— প্রতিবারই তারা কীভাবে যেন পার পেয়ে গিয়েছে। আমি জানি না তারা কীভাবে বেঁচে যায়। হয়তো পুলিশ, থানা কর্মকর্তা এবং বিচারকদেরকে ঘুষ দেয়। আমি বুঝতে পারছি তেমন করলে তা ইবলার সাথে অন্যায় করা হবে, যেহেতু আমিই তাকে বিয়ে করেছি। এই বিয়েতে ইবলা একটি অংশ ছিল শুধু— অংশীদার নয়। আমি আশা করি তুমি পার্থক্যটি বুঝতে পারছো,’ টিফো বলে।
‘আপনার স্ত্রীকে জানিয়েছেন যে আপনি অনেক আগেই ইবলাকে তালাক দিয়েছেন?’ আশা প্রশ্ন করে।
‘হ্যাঁ, আমি বলেছি তাকে। কিন্তু সে বিশ্বাস করেছে বলে মনে হয় না।’
‘তাহলে তিনি কী চান?’
‘আমাকে বলেছে যে মেয়েটি ওর স্বামীকে ভাগ করছে ওর সাথে, তাকে একবার দেখতে চায়। আমার স্ত্রী বলেছে ইবলাকে শুধু দেখবে, কিন্তু আমি জানি সে অন্য আরো কিছু করবে।’
‘যেমন?’
‘ওকে খুব মারবে। অনেক পিটাবে।’
‘কিন্তু আপনার স্ত্রী আমাদের উপস্থিতিতে ইবলার গায়ে হাত তুলতে পারবে না, তাই না?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই পারবো,’ আশার পিছন থেকে একটা কন্ঠ কথা বলে উঠে।
ইবলা দেখে চারজন মহিলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। চারজনই ভীষণ শান্ত এবং দাঁড়ানো দেখে মনে হচ্ছে তারা এক্ষুণি লড়াই করতে প্রস্তুত আছে। চারজনের ভেতর যিনি কথা বলছেন তিনি তাগড়া, মোটা, গায়ের রং ঘন কালো এবং দেখতে চিত্তাকর্ষক। মহিলা যখন হেসে উঠেছে তখন তার মুখের ভেতর নিচের দাঁতের পাটিতে সোনার দাঁত দেখা যায়। ইবলা সাংঘাতিক ভয় পেয়েছ। প্রথম মহিলাকে দেখা শেষ করে ইবলা অন্য মহিলাগুলোকে দেখে, যারা সবাই দেখতে একই রকম, ছোটো-খাটো, ঘন কৃষ্ণবর্ণ এবং দেখতে আকর্ষণীয়, সুশ্রী। সম্ভবত টেনশনের কারণে ইবলা আশাকে লক্ষ করলো না।
‘তুমি কী চাও, আরদো?’ যে মহিলাটি একটু আগে কথা বলেছে তাকে উদ্দেশ্য করে অনুনয়ের সুরে বলে টিফো, যে মহিলাটি তার স্ত্রী।
‘আমি আপনাকে বলেছিলাম মেয়েটিকে আমি দেখতে চাই, তাই না?’ মহিলা পাল্টা আঘাত করে জবাব দেয় টিফোকে।
‘হ্যাঁ, বলেছো।’
‘তাহলে আমাকে দেখতে দিন। ভালো করে দেখি তাকে আগে।’
‘তুমি তাকে দেখেছ এখন, তাহলে চলে যাচ্ছ না কেন?’
‘আমি এখনই চলে যেতে প্রস্তুত নই যে,’ বিদ্রূপভাবে হাসতে হাসতে বলে মহিলাটি।
ইবলা উঠে দাঁড়িয়েছে, লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সে। গায়ের পোশাকটি পেটের চারপাশে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। ইবলা এমনভাবে কাজগুলো করছে যেন কেউ তাকে দেখছে না। কিন্তু একটি মহিলা তাকে দেখছিল এবং সে আরদোর কানে ফিসফিস করে কিছু বললো। ইবলা আন্দাজ করতে পারছে মহিলা কী বলছে।‘আমার তাতে কী,’ ইবলা ভাবে।
‘তুমি বাড়ি যাও এখন, আরদো,’ টিফো আকুলভাবে বলে, ‘দয়া করে বাড়ি চলে যাও।’
‘সরে না দাঁড়ালে আপনাকেও আমি এখন এই জুতো দিয়ে মারবো,’ পায়ের একটি জুতো খুলে আরদো স্বামীর দিকে এগিয়ে যায়।
টিফো সংকুচিত হয়ে পেছনে সরে গেল ঠিক একটা ইঁদুরের মতো যে এইমাত্র একটি বিড়াল দেখেছে। টিফো নিজের পেটে হাত রাখে আর কোমরের বেল্ট ঠিকঠাক করে, তারপর বলে:
‘কিন্তু আরদো তুমি এখন বাড়ি চলে যাও।’
ইবলা ভাবে,‘কেমন জাতের স্বামী! আচ্ছা সব নারীই যদি এই মহিলার মতো হতো, তাহলে পৃথিবীটা কেমন হতো?’
‘না। আমি যাবো না।’
‘আমি তাহলে পুলিশ ডাকবো।’
ইবলা মনে মনে টিফোকে উপহাস করে বলে, ‘তোমার সকল আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবদেরকেও সাথে ডাকলে ভালো হবে!’
‘পুলিশ ডাকেন, আমাকে গ্রেপ্তার করান। আমি যখন কারাগারের ভেতর বন্দি থাকবো তখন আপনাকে আমার জন্য খাবার নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এখন যদি আপনি চুপ না থাকেন তাহলে আমি আপনাকে এই জুতো দিয়ে পিটাবো।’
এবার মহিলাটি সত্যি এগিয়ে গেল স্বামীর দিকে, জুতো ধরা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সামনে। টিফোকে মারতে উদ্ধত হয়েছে যখন, ঠিক তখন আশা কথা বলে, ‘না, আমাদের সামনে এই কাজটি করো না। তোমার দুই পায়ের মাঝখানে তাকাও একবার এবং সতর্ক হও।’
আরদো তাকায়, আর আশাকে দেখে থেমে যায় সঙ্গে সঙ্গে।
‘আশা, তুমি এখানে? আমি এই লোকটাকে আগে পিটাতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তারপর গিয়ে তোমাকে বলবো। তুমি কি জানো সে এই মেয়েটিকে বিয়ে করেছে? সে ওর স্বামী।’ ইবলার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে মহিলা।
‘কিন্তু এখন আর নেই। ওদের বিবাহবিচ্ছেদের কথাটি যেহেতু তোমাকে জানালাম, তুমি কি এখন আমার ঘর থেকে চলে যেতে পারো? আমরা দুজন দুজনকে ভালো করে জানি। সবকিছু মনে আছে তোমার- আমাদের ঝগড়া আর বন্ধুত্ব। আমি চাই না তুমি আমার বাড়িটাকে ব্যবহার করো; তুমি যদি তোমার স্বামীকে মারতে চাও তাহলে আমার বাড়ির বাইরে গিয়ে করো। ইবলা আমার জিম্মায় আছে, আর তোমার কনিষ্ঠ আঙুল দিয়েও তুমি ওকে স্পর্শ করতে পারবে না। তারচেয়ে বরং এসো আমরা পরস্পর শান্তিতে থাকি।’
‘আমি যাবো। আমি এক্ষুণি চলে যাবো,’ আরদো বলে। হাতের জুতোটি মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললো, জুতোটি পায়ে গলিয়ে অন্য মহিলাদেরকে ইশারা করে তাকে অনুসরণ করতে।
‘আপনি আর আমি, আমাদের বিবাদ মীমাংসা করবো আজ আপনি বাড়ি ফিরে আসলেই,’ টিফোকে শাসিয়ে বলে টিফোর স্ত্রী। এরপর মহিলা আক্রমণকারীর পুরো দলটি বেরিয়ে গেল আশার বাড়ি থেকে। ইবলা এবং আশাকে একা রেখে টিফোও চলে যায় দ্রুত।
‘আপনি কি আরদোকে আগে থেকে চিনতেন?’ আশাকে প্রশ্ন করে ইবলা।
‘হ্যাঁ। আমরা বাইদোয়াতে পরিচিত ছিলাম। একসাথে বড় হয়েছি। আমাদের দুজনের অনেক ঝগড়া হয়েছে। ওকে আমার মতো বয়স্ক দেখায় না, তাই না?’
‘না,’ ইবলা জবাব দেয়।
‘সে আমার চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু আমরা যখন ছোট ছিলাম এবং আমাদের বিয়ের আগে, আমি তাকে অনেকবার মেরেছি। সে জানে আমার সাথে ঝামেলা করে পার পাবে না। এই মহিলাগুলো সব সময় সবখানে একসঙ্গে যায় এবং তাদের চার স্বামীকে একসঙ্গে মারধর করে। এটা করা সাংঘাতিক অপরাধ।’
‘এরা সবাই কি বিবাহিত?’
‘হ্যাঁ— তবে শুধুই আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহিত। তুমি দেখতে পাচ্ছো এরা তাদের পুরুষদেরকে যখন খুশি বিয়ে করে আর তালাক দেয়, ঠিক যেভাবে তারা চায়।’
‘কিন্তু এটা আমাদের ধর্মের বিরুদ্ধে।’
‘এরা ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায় না, এমন বদমাশ এগুলো। এদের স্বামীগুলো ভীষণ অসহায়। তাদের মধ্যে একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমি তাকে ছোটবেলা থেকে চিনি। লোকটি এই দলের সবচেয়ে ছোট মহিলাটিকে বিয়ে করেছে। লোকটি তার অসুখী দাম্পত্য সম্পর্কের কথা কাউকে জানালে এই দলটি মিলে লোকটিকে মারে। এরা তাকে পানশালার ভিতরে, বড় রাস্তায় এবং লোকটির নিজের বাড়িতে মারধর করেছে। খুব কঠিন সময় গিয়েছে তার। সেদিন আমি তার সাথে দেখা করেছিলাম এবং বলেছি স্ত্রীকে তালাক দিতে (অথবা চারজন স্ত্রীকে, কারণ এরা সবসময় একসাথে থাকে)। আরো বলেছি যে আমি তাকে স্ত্রীর হাতে মার খাওয়া থেকে বাঁচাবো। তারা খুব খারাপ পুরুষ নয়, তাছাড়া, এসব তাদের পুরুষ-সুলভ সমস্যা মাত্র এবং পুরুষদের সত্যিই পিটানো দরকার।’
‘মাঝেমাঝে দরকার আছে,’ ইবলা বলে।
‘দুই ঘণ্টার মধ্যে আমি শহরের দিকে যাবো। তুমি কি আমার সাথে আসতে চাও?’
‘হ্যাঁ। আমিও যেতে চাই।’
কিন্তু ওরা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে, আশা এবং ইবলা আউইলের জিনিসপত্র ও কাপড়গুলো ইবলার ঘরে এনে রাখে। ইতালিতে যাওয়ার সময় এই ঘরে আউইল সবকিছু যেভাবে রেখে গিয়েছিল ঠিক সেভাবে আবার সাজিয়ে রাখে সবকিছু।

৩০
ইবলা এবং আশা শহরে গিয়েছে কেনাকাটা করতে। ইবলা মোগাদিসিওতে বেশি কোথাও যায়নি। প্রতিবার নতুন কিছু দেখার সঙ্গে সঙ্গে বারবার করে নিজেকে বলে, ‘এটা আমার জায়গা না। এখানে আমি এক অনুপ্রবেশকারী মাত্র। মনের ভেতর আমি আমার ভাইয়ের মতো একই রকম অনুভব করি, যদিও আমার স্বভাব তার চেয়ে ভিন্ন, এবং আমার মানসিক গঠন তার চেয়ে অনেক শান্ত প্রকৃতির।’ কিন্তু ভেতর থেকে জোর করে উঠে আসা এমন আপত্তিগুলি ইবলা ঝেড়ে ফেলে দিলো নিমিষে।
ওরা যখন শহরে কেনাকাটা করছে, আউইল তখন বাড়ি ফিরে এসেছে। কেউ একজন তাকে দেখিয়ে দিয়েছে ঘরের চাবি কোথায় লুকিয়ে রাখে ইবলা। আউইল তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করে, সবকিছু যেভাবে রেখে গিয়েছিল এখনো প্রায় তেমনই আছে। কিছু বেশি না, কিছু কমও নয়। আউইল ঘরের ভেতর ইতিউতি কিছু একটা খুঁজছে। যদিও জানে না ঠিক কী খুঁজছে। হঠাৎ করে আবিষ্কার করে জানালার পর্দার সাথে লাগানো একটি প্লেটের নিচে সেই ইতালীয় মেয়ের ছবিটি, যেটা সে অনেকদিন আগে জামাকে পাঠিয়েছিল। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না আউইল।
‘এটা কীভাবে সম্ভব?’ জোরে শব্দ করে কথা বলে আউইল, যেন সে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলছে। ‘জামা, হারামজাদা। আমাকে শেষ করে দিয়েছে। জানতাম সে এটা করবে। যে জাতির মানুষ, ওরা সবাই এমন। ওখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। জামা কেন এই ছবিটি ইবলাকে দিয়েছে? আমি একটা ভুল করেছি, কিন্তু সেটি কি খুব বড় অপরাধ— আর কার সাথে করেছি আমি এই অপরাধ? ইবলাকে আমি পছন্দ করি। আমাদের বিয়ের সময় আমি প্রথম প্রথম তাকে বেশি পছন্দ করতাম না— কীভাবে পছন্দ করবো? ইবলা আমার কাছে তখন প্রায় অপরিচিত একটি মেয়ে। কিন্তু এখন আমি তাকে আরও বেশি পছন্দ করি। আর শুধু সময় কাটানোর বিনোদনে একটি মেয়ের কারণে আমি তাকে হারাতে চাই না। আপনি একটা নতুন দেশে যাবেন, নতুন দৃশ্য দেখবেন। আপনি সেই দেশের একটি মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করতেই পারেন। আর এরপর আপনি আপনার পুরোনো বন্ধুদের সাথে সেই মেয়েটিকে নিয়ে কিংবা মেয়েটির বন্ধুত্ত্ব নিয়ে গল্প করতে পারেন। কিন্তু আমি সেই মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাইনি বা তাকে সিরিয়াসলি নেইনি। মেয়েটি সেখানে শুধুই আমার সময় কাটানোর উপকরণ হিসেবে ছিল।’
এমন সময় পেছনে ঘুরে দাঁড়াতেই আউইল দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ইবলা। নিজেকে শান্ত রাখে আউইল।
‘আমি আপনার কথা শুনছিলাম এতক্ষণ,’ ইবলা বলে।
‘তোমাকে কে জানালো আমি বাড়ি ফিরেছি?’
‘যে মহিলাটি আপনাকে চাবি দেখিয়ে দিয়েছে, সে বললো আপনি এসেছেন।’
‘নাবাদ,’ আউইল বলে।
‘নাবাদ,’ মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে ইবলা জবাব দেয়। দরজার সামনে থেকে সরে না ইবলা।
‘তুমি আরও মোটা হয়েছো,’ আউইল বলে, প্যান্টের পকেটে দুই হাত রেখে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ইবলাকে দেখছে।
‘তাই বুঝি?’ ইবলা বলে। ‘আর আপনি শুকিয়ে গিয়েছেন।’
‘আমাকে রোগা লাগছে নাকি?’ আউইল জিজ্ঞাসা করে।
‘হ্যাঁ। আপনি শুকরের মাংস খেয়েছেন বলে হয়তো।’
আউইল চুপ করে থাকে।
‘আমাকে বলুন, শুকরের মাংস খেয়েছেন আপনি?’
‘মাত্র দেখা হলো আমাদের। আমরা এখন অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি?’
‘হ্যাঁ, বলবো। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা কী? শুকরের মাংস খেয়েছেন কিনা এটা জিজ্ঞেস করাতে কোন দোষ আছে কোনো?’ কথা শেষ করে ইবলা ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো। গায়ের চাদরটি খুলে বিছানার উপর রাখে।
‘তোমাকে কে বলেছে আমি শুকরের মাংস খেয়েছি? বেশ হাস্যকর তো। আমি বলতে চাচ্ছি, আমরা এসব কী বিষয়ে কথা বলছি। এখনো পর্যন্ত নিজেদের ভেতর শুভেচ্ছা বিনিময় করিনি দুজন।’
‘হ্যাঁ, করেছি। প্রয়োজনীয় অভিবাদন জানানো শেষ হয়েছে আমাদের,’ ইবলা বলে।
‘ওহ, হ্যাঁ। আচ্ছা ঠিক আছে, হ্যাঁ, আমি শুকরের মাংস খেয়েছি, এবং শূকর খেতে খুব সুস্বাদু।’
‘এর জন্যই আপনাকে রোগা দেখাচ্ছে। আপনি আমাদের ধর্মে নিষিদ্ধ খাবার খেয়েছেন। এটি বেজন্মাদের খাবার। এটি আপনার পেটের সাথে তাল মেলাতে পারেনি। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন— কৃমি, পোকা, এই সমস্ত কিছু জন্মাবে আপনার পেটে।’
‘মাত্র দুবার খেয়েছি আমি,’ আউইল বলে।
‘আর আপনি মদ খেয়েছেন?’
‘দেখো, এসব কথা বলা বন্ধ করো এখন। আমি খুব ক্লান্ত। গোসল করে একটু ঘুমাতে চাই আগে। তারপর কথা বলবো তোমার সাথে। আমার খালা আসেনি?’
‘হ্যাঁ, এসেছিল। আপনি কীভাবে জানেন?’
‘তিনি আমাকে চিঠিতে জানিয়েছেন।’
‘আমার ভাইকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল, কিন্তু আমার ভাই মোগাদিসিও জায়গাটি পছন্দ করেনি। আপনি জানেন আমার দাদা মারা গেছেন।’
‘তোমার কি দাদা ছিল?’
‘হ্যাঁ। একটা ছিল। আমি আপনাকে তার কথা বলেছিলাম। আপনার স্মৃতিশক্তি খুব খারাপ: একদিন আপনি এটাও ভুলে যাবেন যে আমি আপনার স্ত্রী।’
‘না, ভুলে যাবো না। এ কথা আমি কখনো ভুলবো না।’
মনের ভেতর ইবলা চাচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব শুস্ক রুক্ষ মাটিতে পা রাখতে, এই ধরণের কথাবার্তা বন্ধ করে তার সমস্ত সন্দেহ অবসান করে আসল কথাটি জানার তাগিদ অনুভব করে তীব্রভাবে। এই সমস্ত পলায়নপরতায় ইবলা এখন ভীষণ ক্লান্তবোধ করে, তাছাড়া পালিয়ে বেড়ানোর স্বভাব সামান্যতম উপকার করেনি তাকে এপর্যন্ত। ইবলা ভাবে, হয়তো সময়ের সাথে সমস্যাগুলি নিজেরাই সমাধানের পথ খুঁজে পাবে।
‘জামা কি তোমাকে কিছু টাকা দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ,’ ইবলা বলে।
এই মুহূর্তে এক রহস্যময় অবস্থার ভেতর আছে ইবলা। আউইলের কালো, সুন্দর, সুগঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সে। মনে মনে ভাবছে, ইস যদি বুঝতে পারতো আউইলের মাথায় এখন কী চিন্তা চলছে! আউইলের মুখোচ্ছবিতে একটি দীর্ঘ নাক দেখা যায়, মুখের নিচে চিবুকটি ইবলা যতটা ভেবেছিল তারচেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ। যেন কিছু বিশেষ কথা বলার উদ্দেশ্যে ইবলা মুখ খুলতে চায়, কিন্তু তার মুখ থেকে একটি কথাও বের হয় না। শুধু স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, যিনি এইমাত্র বিদেশিদের দেশ থেকে ফিরে এসেছেন, এবং যার সামনে ইবলার খুব অস্বস্তি লাগছে। নিজের এই নীরবতা ইবলাকে অসাচ্ছন্দকর পরিস্থিতে ফেলেছে। এখন কথা বলতে চাইলেও স্বামীকে সে কী বলতে পারে?
‘তুমি তোমার ভাইকে এখানে থাকতে বললে না কেন?’ আউইল জিজ্ঞেস করে।
‘আমি তাকে থাকতে বলেছিলাম। কিন্তু সে রাজি হয়নি এখানে থাকতে।’
‘জোর করোনি কেন?’
‘জোর করবো কেন? সে যদি থাকতে না চায়, তাহলে তার গ্রামে ফিরে যাওয়াই ভালো।’
‘গ্রামে থেকে কী করবে সে?’
‘অবশ্যই পশুগুলোকে দেখাশোনা করবে। লালনপালন করবে। আর কী? দিনের বেলা আকাশে কয়টা তারা আছে, তাই গণনা করবে বসে বসে। ওই পশুগুলোই আমাদের সম্পদ, এই পৃথিবীতে একমাত্র যা কিছু আছে আমাদের জন্য, তার এবং আমার সম্পদ। আমি এখানে আছি, এখন আমি একজন গৃহবধূ। আর আমার ভাইয়ের থাকার কথা গ্রামে পশুদের সঙ্গেই। পশুগুলোকে ফেলে রেখে ওর এখানে আসাটাই একটা ভুল কাজ হয়েছিল প্রথমত।’
‘কিন্তু ছেলেটা এভাবে মূর্খ থেকেই মারা যাবে শেষপর্যন্ত । এই পৃথিবীর মাটি তার শরীরের হাড়গুলো চিবিয়ে খেয়ে ফেলার আগে সে কিছুই শিখবে না। আর সেটিই হবে তার জন্য জীবনের প্রথম শিক্ষা।’
‘মোগাদিসুও এবং এই শহরের মানুষদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই কীভাবে পশুদের পালতে হয়, কীভাবে তাদের দুধ দোহাতে হয়, কীভাবে পশুদেরকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে পশুদেরকে সুখী, মোটা ও স্বাস্থ্যবান করতে করতে মানুষের নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয়। এখানকার মানুষ শুধু জানে কীভাবে পশুর মাংস খেতে হয় এবং দুধ পান করতে হয়। এইটুকু কাজ তারা ভালো জানে। এখানকার মানুষগুলো কী ভীষণ অজ্ঞ এবং অহংকারী! সাদা মানুষের ভাষা জানাটা আসলে কোনো জ্ঞান নয়।’
‘কিন্তু পশুদের ভালোবাসা থেকেই তো তুমি পালিয়েছিলে একদিন, তাই না? নিজের কথা ভুলে যেয়ো না। আমি আশ্চর্য হবো যদি কোনো মহিলা আদৌ চূড়ান্তভাবে বলতে পারে সে আসলে কী চায়। তোমরা সবাই কেন এতো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগো; কেন তোমরা সবাই এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগো বলতে পারো?’
‘কারণ আমাদের ছুটে যাওয়ার আর কোন জায়গা নেই। আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে আমাদের সিদ্ধান্তহীনতা। আর আমরা জানি না, আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিলে আদৌ তা ফলপ্রসূ হবে কিনা।’
‘ছেলেটাকে গ্রামে ফেরত পাঠানোটা তোমার দিক থেকে ভুল কাজ হয়েছে ইবলা। ওর বয়স কত?’
‘ষোল।’
‘ষোল।’ ইবলা মনে করার চেষ্টা করে, ‘ষোল নাকি আঠারো?’
‘আর সে কখনো স্কুলে যায়নি?’
‘না। এবং কখনো যাবে না।’
‘কিন্তু তুমি কীভাবে তাকে গ্রামে ফেরত পাঠাতে পারলে? কেন এই শাস্তি ওর জন্য?’
‘এটা শাস্তি নয়। আমি চাই সে নিজের দায়িত্বটুকু শিখুক। আর গ্রামে সে সুখে আছে।’
‘তুমি জানো তোমাকে কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে?’ আউইল হেসে প্রশ্ন করে ইবলাকে।
‘জানি। আপনার মতো করেই, কাদামাটি থেকে তৈরী করা হয়েছে আমাকে,’ ইবলাও হেসে জবাব দেয়।
‘মাটি থেকে নয়! খোদা আদমকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। আমি জিজ্ঞেস করেছি নারীকে কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে।’
‘হ্যাঁ, আমি জানি সে কথা,’ ইবলা বলে।
‘কিন্তু তুমি কিছু বলো না। আমি বলছি তোমাকে, শোনো।’
‘আপনার বলতে হবে কেন? আমি জানি। আমি জানি নারীকে কোথা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।’
‘তবু তুমি বলো না। আমাকে বলতে দাও। নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে আদমের শরীরের একটি বাঁকা পাঁজর থেকে।’ কথাটি বলার পর আউইল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ইবলা, যে নিজেও কথা বলছিল, আউইলের কথা শুনছিল না, সে আউয়ালের কথার সাথে যুক্ত করে বললো, ‘আর যদি কোন পুরুষ এই বাঁকা পাঁজরটিকে সোজা করার চেষ্টা করে, তবে এটিকে তার ভাঙতে হবে।’
যদিও আকাশে সূর্য ডুবে যায়নি, তবুও ঘরের ভেতরটা বেশ অন্ধকার হয়ে আছে। ‘আমি কি তোমাকে সব কথা বলবো, আউইল?’ দীর্ঘ নীরবতার পর ইবলা কথা বলে।
‘বলবে। কিন্তু এখন নয়। হয়তো আগামীকাল, যখন তুমি চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে তখন,’ আউইল বলে। দরজা বন্ধ করে, গোসলখানায় গিয়ে গোসল করে আবার ঘরে ফিরে এসেছে আউইল। তারা দুজনেই এখন নগ্ন, একই চাদরের নিচে শুয়ে আছে। ইবলা চিন্তা করছে, আগামীকালের উদিত সূর্যটি কিছু সুখ নিয়ে আসবে কিনা, এবং সকালের আলোর সেই উজ্জ্বলতা তার জন্য কিছুটা প্রাণোচ্ছাস বয়ে আনবে কিনা। ইবলা এই মুহূর্তে এটাও ভাবছে, আউইলের অনুপস্থিতিতে সে যা যা করেছে সেই সবকিছু তাকে এখনই বলবে কিনা।
‘আগামীকাল,’ আউইল বলে ফিসফিস করে, উদ্দীপ্ত কামনা নিয়ে ঘনায় ইবলার দিকে।
‘আগামীকাল। আগামীকাল আমরা একে অপরকে সব কথা বলবো। তুমি আমাকে সব বলবে, আর আমি তোমাকে বলবো সব।’
ইবলা আউইলের পুরুষত্বমাখা গন্ধ শোঁকে। আউইলের কপাল স্পর্শ করে, এবং যথারীতি, আউয়াল উত্তপ্ত হয়ে আছে প্রগাঢ় কামনায়। ইবলার দিকে চেয়ে আউইল হাসে, আর বিনিময়ে ইবলাও এক টুকরো হাসি ফিরিয়ে দিলো স্বামীকে।
‘বেচারা লোকটা, আমাকে তার প্রয়োজন,’ ইবলা ভাবে। ‘সে যৌন-ক্ষুধার্ত।’
‘হ্যাঁ। আগামীকাল কথা হবে,’ বিড়বিড় করে বলে ইবলা। আউইলের উত্তপ্ত ও উষ্ণ পৃথিবীকে স্বাগত জানায় নিজের শান্ত ও সুস্থির সাম্রাজ্যে।

চন্ডিগড় (ভারত)
১৯ মার্চ — ১৫ এপ্রিল, ১৯৬৮।

(উপন্যাস সমাপ্ত)

বাঁকা পাঁজরের মেয়ে (পর্ব সতেরো ) // নুরুদ্দিন ফারাহ, অনুবাদ: লুনা রাহনুমা

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top