মধুশালা // হরিবংশ রায় বচ্চন, অনুবাদ : ইমন শেখ

মধুশালা

১.
পানশালাতে যাওয়ার লাগি সুরাসক্ত বাড়ালো পা,
কোন পথেতে যাবে সেথা মোটেও নেই তার জানা।
নানা জনের নানা পথ এবার আমার বলার পালা
যেকোনো পথে এগিয়ে যা পেয়ে যাবি পানশালা।
২.
হাসছে মাতাল নাচছে সাকি শরাব ঢালে পেয়ালায়,
মদির গন্ধ গায়ে মেখে ছুটছে রে দেখ মত্ত বায়।
আর নয়তো দূর বেশি এবার পথ শেষের পালা,
চারটি কদম হেঁটে গেলেই পৌছে যাবি পানশালা।
৩.
রক্ত রাঙা শারাব দেখে লাভা ভেবে কোরোনা ভুল,
ইহা ফেনিল সুরা কেবল নয় হিয়া ব্যথায় আকুল।
অতীত স্মৃতি মথিত সুরা নেশা ইহার দুঃখ-জ্বালা,
বেদনাতে আনন্দ যে পায় তার তরে এ পানশালা।
৪.
হিন্দু মুসলিম ভিন্ন বটে কিন্তু একই পান পেয়ালা,
একই তব শারাব আবার একই তাদের পানশালা।
মন্দির-মসজিদ যাওয়ার আগে একসাথে রয় দুজনা,
মন্দির-মসজিদ ভেদ বাড়ালেও মিলন ঘটায় পানশালা
৫.
যার অন্তরের-ই অগ্নিগিরি ধর্মগ্রন্থ সব করলো ছাই,
পুরুত ইমাম পাদ্রী সবার সংশ্রব যে ত্যাজিল হায়।
মন্দির মসজিদ গির্জা যে ভেঙেচুরে করলো খতম,
আজ জানাই তারে মহানন্দে পানাশালাতে স্বাগতম।
৬.
পেয়ালা হাতে শরাব সুধা চুমল না যে পরাণ ভরে,
হরষেতে নাচিল না যে ঐ তন্বী সাকির হাতটি ধরে।
আহা! তাহার জীবন-যৌবন সবি হইলো বৃথা হায়,
জীবনরূপী পানশালার-ই অমিয় বুঝি শুকিয়ে যায়।
৭.
সাকি নয় যেন পূজারিণী, শারাব নয় এ গঙ্গাজল,
পেয়ালা বুঝি জপমালা তার অবিরত সুরার ঢল।
আরেকটু নাও আরেকটু খাও যেন মন্ত্র জপে সাকিবালা,
আমি হলাম দেবতা শিব কৈলাশ আমার পানশালা।
৮.
হলি কিংবা দীপাবলি এক বছরে একটি বার,
রঙের খেলা দীপের শিখা ধরা ভাসায় একটি বার।
শোন শোন বন্ধু সকল পানশালাতে নাওনা খোঁজ,
দিনে হলি রাতে দীপালি আসে হেথায় হররোজ।
৯.
ঠোঁটের পরে যে রস পড়ুক মদিরার স্বাদ যে পাই
পাত্র হাতে দেখলে পরে পেয়ালা ভাবি হায়রে হায়।
সুরত সবার সাকির মতো মরি মরি কি যে জ্বালা!
নয়ন পানে যা-ই পড়ুক নয়নে কেবল পানশালা।
১০.
চকচকে এক সুরাহি যেন সুন্দর তোমার বদনখানি,
উপচে পড়ে বদনে তোমার রূপ মদিরার লাল পানি।
আমি বুঝি মাতাল আবার আমিই বুঝি সাকিবালা,
যেখানে বসি দুজন মোরা সেইখানেতেই পানশালা।
১১.
মাত্র দুদিন পান করিয়ে হাঁপিয়ে গেলো সাকিবালা,
সে হেলাভরে এগিয়ে ধরে শরাবের ঐ লাল পেয়ালা।
তার রঙ্গঢঙ্গ ঠমকঠামক কোথায় গেলো হারিয়ে হায়,
পানশালাতে সাকি এখন কোনরকমে সারে দায়।
১২.
কত দেবো ভালোবাসা, কতটুকুই-বা করবো পান,
আসার সাথেই বাজে হেথা বিদায়েরই করুণ গান।
প্রস্থানের আয়োজনে হেথা গলায় ওঠে বরণ মালা,
খোলার সাথে হয় যে বন্ধ জীবনের এই পানশালা।
১৩.
পিয়ে সুরা শান্ত কি হয় পোড়া হৃদয় ওরে সাকি?
দাওনা আরো একটুখানি বায়না ওঠে থাকি থাকি।
অতৃপ্ত মাতাল যায় যে চলে ইচ্ছাগুলো রয়ে যায়,
অপূর্ণ সব ইচ্ছেয় গড়া সৌধ বুঝি পানশালা হায়।
১৪.
কালো সুরা হাতে নিয়ে সাকির বেশে আসবে যম,
উন্মাদ তুই বেহুশ হবি পান করে ঐ কালো সোম।
পেয়ালা, সাকি অন্তিম সবি, বেহুশ হবি চিরতরে,
পাবি না আর পানশালা, পান করেনে পরাণ ভরে।
১৫.
একটু একটু করে প্রতিদিন জীবন সুধা হচ্ছে শেষ,
ভগ্ন হচ্ছে তনুর পেয়ালা,রইবেনা আর সুধার লেশ।
ধীরে ধীরে হচ্ছে যে পর রূপসী তন্বী সাকিবালা,
দিনে দিনে শুকায় আমার জীবনের এই পানশালা।
১৬.
জীবন সুধা ফুরাবে যবে রইবেনা আর কিছুই বাকী,
গরলের-ই পাত্র হাতে আসবে তখন অন্তিম সাকি।
পেয়ালা পরশ ভুলবে হস্ত, ওষ্ঠ মদির স্বাদ হারাবে,
আকুতি তখন কানে কানে পানশালারই গান শোনাবে।
১৭.
মরার পরে ছুঁইয়ো ঠোঁটে তুলসীর বদলে সুরা ভাই,
গঙ্গা জলের পরিবর্তে জিহবার ওপর শারাব চাই।
মোর শবযাত্রায় যাবে যারা তাদের কাছে মিনতি করি,
পানশালারই জয়গান করো, বলো না কেউ হরি হরি।
১৮.
লাশের পাশে কাঁদবে যাদের অশ্রুজলে সুরা আসে,
শোকে মাতম করবে মদির গন্ধ যাহার দীর্ঘ শ্বাসে।
খাটিয়া বহন করবে যাদের নেশার ঘোরে টলে পা,
দাহ আমার করো সেথা যেথা ছিল কভু পানশালা।
১৯.
চিতায় আমার ঘি না দিয়ে শারাব ঢেলো পেয়ালা ভরে,
ঘটের ভেতর জল না দিয়ে কেবল শারাব দিও যত্ন করে।
প্রিয়, শ্রাদ্ধ যদি করো আমার এই কথাটি যেওনা ভুলে,
সব মোদো মাতাল ডেকে এনে পানশালাটি দিও খুলে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top