কবিতাগুচ্ছ ।। শূন্য হয়ে বসে থাকি দুখের ডালপালায় ।। অজিত দাশ


ভৈরবী
::
আমার দুঃখগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার আগেই
ওদের ছুঁয়ে ফেলবে বধ্যভূমির ফুল

সবকটা প্রশ্নের উত্তর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তুমি
এদিকে, বোকা ফুলগুলোর পাপড়ি খসে পড়ে গেলে

আমি একটা ভাঙ্গা এস্রাজে রাগ ভৈরবী হতে চাইবো
…………..


মৃত্যুভয় অথবা উড়াল
::
পুরুষের নিঃসঙ্গতার কথা ভেবে
একদিন তাঁর পাজরের হার ভেঙ্গে
সঙ্গিনী বানিয়েছিল ঈশ্বর–

সেই থেকে তাঁর বুকে পুরানো আদিম ক্ষত

অসম্পূর্ণ এক কবিতার কলকল ছর ছর অবয়বহীনতায়
মগ্ন হয়ে নিজেকেই পৌঁছে দিতে চায়
শ্বাসরুদ্ধ গভীরতায় যেখানে তখনও জন্মায়নি
মৃত্যুভয় অথবা উড়াল
…………..


বৈষ্ণব বেদনা
::
গাছের শরীর থেকে ঝড়ে পড়া
প্রতিটি হলুদ চোখ এখন তোমার বিছানায়
বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার নিজস্ব গতিটুকু দেখতে
না পারার বৈষ্ণব বেদনা, অনামিকার খাপে মৃত
নগরীর ছায়াকে ঢেকে ফেলছে এই বেলা
অ্যাপসে বন্দী জীবন, এই শহরে ছুড়ির মতো
দু-ভাগ করছে আমাদের বৃষ্টির নেশা
তাচ্ছিল্যের খিলখিলে ঢেউয়ের চেয়েও নিম্নগামী
ওয়াইফাই তরঙ্গ একটি ঋতুকে দুমরে মুচরে
ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে যায় আমাদের চোখের সামনে
……………..


মায়া
::
পুরানো প্রেমিকের কথা ভাবতে ভাবতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে। নিয়ন্ত্রিত, পলকা অনুভূতিগুলো আরো সযত্নে গোছিয়ে রাখি নিজের মধ্যে। কোথাও একটানা গাড়ির হর্ণ বাজে। চায়ের লিকারের গন্ধ ভুলে গিয়ে আপাদমস্তক এক পুরুষ, অশ্বত্থের লাল ফলের দিকে তাকিয়ে ভুলতে চায় পাখির অভ্যাস থেকে ফিরে আসা জীবন। তখনই সে দৃশ্যমান হয়। তাঁর মাথার উপর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে গড়িয়ে পড়ে পূর্ণিমার চাঁদ। আধো আলো অন্ধকারে আমাকে গ্রাস করে মায়া। ভিজিয়ে দেয় অগোছাল। নিজেই নিজেকে পাঠ করি, আর ছিঁড়ে ফেলি। জানি, এভাবেই লিখতে হয়। অথচ কিছুই জানা হলো না ভেবে শূন্য হয়ে বসে থাকি দুখের ডালপালায়।
……………..


বোধিচিত্ত
::
এক মুঠো ধুলিকনা হয়ে বালিঘড়ির মতো চুইয়ে পড়ছে আমার ‘আমি’ কোনো এক সুরঙ্গ পথে। বিবশ পিঁপড়ে-চিনির দানা মাথায় নিয়ে জপ করছি তোমার নাম। এত শব্দহীন তরঙ্গের স্পর্শ গলে পড়ছে টেবিলে- ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সে ধুলিকনা। তোমার নামে ক্ষয়ে যাচ্ছে- হাওয়া, জল, বায়ু আর বৃহদ্রথের আত্মতত্ত্ব। আমি এখন নাবালক! দুখরোধী জ্যাকেট পরে ভাসছি জগতের ঘর-দোরে। আমার দুপাশে পা গলিয়ে ডুবে যাচ্ছে মাটির পুতুল, পৌষের নদী। অথচ এক ভঙ্গুর ভালবাসার শহরে কয়েকশ অনিশ্চয়তা ঠেলে আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি বোধিচিত্তের।
……………..


কাঠপাখির গান
::
তবু তুমি নেই যে পথে- সে পথে অবিরাম ফোটে
কাঠপাখির গান; পাতা-পাতা রোদ ছুটছে দিকবিদিক
আর ফিনকি দিয়ে জাগে বুকের আদিমতম প্রেম!
……………..


ঝরা পালক
::
যেমন জাহাজ পার হলে ডিঙ্গি। ডিঙ্গি পার হলে ভাসমান পাতা;
পাতার ওপরে পিঁপড়ে আর পাতার নিচে জল
ঠিক তেমনি মানুষ পার হলে মাটি। মাটি পার হলে ভাসমান ঝরা পালক;
পালকের ওপর নক্ষত্রের ছায়া আর পালকের নিচে অনুভূতির ভাঙ্গা হাত।
…………………


আয়ুর মতো ছোট
::
অনেক বছর গড়িয়ে চলে গেলে
স্ক্রল ডাউন করে এই কবিতা পড়ো একবার।
কি ছিলো কোথায় কতটুকু?
এই যে আয়ুর মতো ছোট হতে থাকো তুমি।
ঝাপসা স্ক্রীনে ক্ষয়ে পড়া নেটের গতির মতো
এখনো কিছু থমকে পড়া বাকি।
এক হৃদয় থেকে অন্য হৃদয়ে যাবার নীল ইচ্ছে
হয়তো একা পড়ে আছে কোথাও।
যদি সে পথে দেখা না হয় আর কখনো-
অনেক অনেক বছর পর,
ভুলে যাবার হাতবাক্স খুলে, গয়নার মতো সযত্নে
এই কবিতা পড়ো তুমি।
…………………


আয়ুরেখা 
::
বোধের উলটো পথে হাত বাড়াই
নিজেকে দেখার সাধ নিশ্চিহ্ন হলে;
ভেতরে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে এক নির্জন সন্ন্যাসীকে খুঁজে ফেরার দিন
ক্রমশ গিলে ফেলছে একটা ভাঙ্গা সেতু,
যার পিলার বহু আগে আটকে দিয়েছিল গন্তব্য
তোমার-আমার! আমাদের রক্তদানার।
এখন স্থির হয়ে গলে যাচ্ছে সময়; তার চারপাশে
ভিড় করেছে পিঁপড়েরা সারিবদ্ধ পথে
তোমার মুখের আয়ুরেখা যে পাখির ডানায় ভর করে
বদলি হবে দেশে দেশে সেখানে আমারও অধিকার ছিল।
আনমনে কোনো এক শীতের শুরুতে
তারা ফিরে আসবে ভেবে নিজের ভেতরে না গিয়ে
ভিজে কুয়াশার দুপুরে একাকী গাছ হয়ে রই।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top