হৃদয়ে লেখা নাম // লুনা রাহনুমা

মোবাইলের সাউন্ড অফ করা ছিল। সাগুফতা অফিস মিটিঙে থাকাকালীন অনেকবার মোবাইল বেজে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গুনে গুনে তেরটা মিস কল। একটি নাম্বার থেকে। নাম্বারটি অচেনা। একটা মিস কল হলে সাগুফতা কল ব্যাক করার কথা চিন্তা করতো না। কিন্তু তেরোটা মিসকল? কয়েক সেকেন্ড পরপর? তাই আর কল ব্যাক করার কৌতূহল সামলানো গেলো না।

‘হ্যালো। আমাকে এই নাম্বার থেকে কল করা হয়েছে অনেকবার। কে আপনি?’

‘আমি। আমি বলছি।’

‘আমি কে? আপনি কি আমার পরিচিত?’

‘নিঃসন্দেহে পরিচিত। খুব পরিচিত কেউ। অবশ্য সে অনেকদিন আগের কথা। তবুও আমি আপনার পরিচিতজন।’

ফোনের ওপাশে পুরুষ কণ্ঠস্বরটি বেশ গমগমে শোনায়। একটা খালি হলঘরে কথা বললে যেমন শোনায় মানুষের কণ্ঠস্বর। পাহাড়ের গুহায় চিৎকার করলে যেমন শোনায় কথার প্রতিধ্বনিরা। শব্দের বিপরীতে শব্দ দেওয়ালে আঘাত করে ফিরে আসলে যেমন দ্বিত শোনায় মুখের কথা, ঠিক তেমন সুনাদ কণ্ঠের একজন কথা বলছে ফোনের অপরপাশে। সাগুফতার কেমন চমক লাগে মনে। শিহরণ জাগে হৃদয়ে। প্রগাঢ় কন্ঠস্বর আর মসৃন বাংলা উচ্চারণ কতটা ব্যাকুল করে দিতে পারে একটি মেয়ের হৃদয় সেই কথা যদি জানতো বোকা পুরুষের দল!

‘পরিচয় দিন তাহলে। আমি চিনতে পারছি না আপনাকে। সরি।’

‘সরি হবেন না। সরি হবার কিচ্ছু নেই। হয়তো আমি আপনার মনে তেমন কাছের কেউ নই যতটা কাছের আপনি আমার জন্য।’

‘বুঝিনি। আরেকটু বুঝিয়ে বলবেন কি?’

‘বলবো। কিন্তু টেলিফোনে না। সামনাসামনি। দেখা করবেন আমার সাথে? একটুখানি শুধু! বেশিক্ষণ সময় চাইবো না।’

অনেকক্ষণ কথা বলতে পারে না সাগুফতা। কী বলবে বুঝে পায় না। যদিও বলতে চাইছে, সম্ভব না, কিন্তু মুখে আসছে না কথাটি। নীরবতা ভেঙে অপরপাশে প্রাণ কাঁপানো কণ্ঠস্বরটি কথা বলে ওঠে।

‘আমার নাম মাহক সরফরাজ। আপনার সাথে আমার বিয়ের কথা এগিয়েছিল অনেকদূর। মনে আছে আমার কথা? আরেকটু হলেই কিন্তু আমরা সাত জন্মের মতো বাঁধা পড়তে যাচ্ছিলাম একসাথে।’

সাগুফতার বুক এবার সত্যি কেঁপে উঠলো। নামটি চিনতে পারছে। নামের সাথে মনে পড়ছে আরো কিছু ঘটনা। ঘটনার সাথে পুরোনো সেই দিনগুলো ফিরে আসতে চাইছে মনের সামনে। কিন্তু সাগুফতার হাতে একদম সময় নেই এখন। তাই কোনো কথা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা না করে সে ফোনের লাইনটি কেটে দিলো। এক্ষুণি আরেকটা জরুরি মিটিং আছে ইন্টারন্যাশনাল বায়ারের সাথে। ঠিক মতো কথা বলে কনভেন্স করতে পারলে কোম্পানি একটা বিশাল অংকের অর্ডার পেয়ে যাবে। আর ওয়ান পার্সেন্ট হিসেবে সাগুফতা পাবে মোটা অংকের কমিশন। সুতরাং মোবাইলের লাল বাটনে আলতো আঙ্গুল ছুঁইয়ে মিটিংয়ের কাগজপত্রের দিকে মনোযোগ দিলো। আর পরক্ষণেই ভুলে গেল মোবাইলের ওপাশে আপনজন বলে দাবি করা মানুষটির কথা। আবৃত্তি শিল্পীদের মতো সমাকীর্ণ কণ্ঠ এবং কণ্ঠের মালিকটি মুছে যায় সাগুফতার মন থেকে অবলীলায় যেন তার কোন অস্তিত্ব ছিল না কখনো। পরের কয়েকটি ঘন্টায় অফিস মিটিঙে আত্মবিশ্বাসী সাগুফতা ঠিকই অর্জন করে নিতে সক্ষম হয় বায়ারের আস্থা এবং জিতে নেয় কমিশনের পাওনা অর্থ। ওয়েল ডান। কংগ্রাচুলেশন্স। সো প্রাউড অফ ইউ। ইত্যাদি নানান স্তুতি লেখা কার্ড আর ফুলে ভরে গিয়েছে সাগুফতার অফিসরুমটি। কর্মজীবনে ভীষণ পরিশ্রমী এবং একনিষ্ঠ মানুষ সে। আর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে আসা প্রতিটি সাফল্য উপভোগ করে চুটিয়ে।

রাতে ঘুমানোর আগে বিছানায় শুয়ে মোবাইটা হাতে নিতেই ঘটলো আবার সেই বিপত্তি। একই আননোন নাম্বার থেকে আবারো তেরোটা মিস কল দেখাচ্ছে। সাথে জমা হয়েছে দুটি মেসেজ। মেসেজ দুটি খুব সংক্ষিপ্ত, তবে বেশ ধারালো।

‘এভাবে বিদায় না জানিয়ে ফোনের লাইন কেটে দিলেন যে! আমি না হয় দেখতে চাষা, খেত, ভীষণ অসভ্য, কিন্তু আপনি তো মার্জিত, বুদ্ধিতে পরিপক্ক, কী হয় আমার সাথে এক কাপ চায়ের নিমন্ত্রণে গেলে, শুধু একটি দিনের জন্য?’

প্রথম মেসেজের আধ ঘন্টা পর পাঠিয়েছে দ্বিতীয় মেসেজটি। এই মেসেজটি আগেরটির চাইতে আকারে তিনগুন বড় বলা যায়।

‘কথা দিচ্ছি আমাকে বিয়ে করতে বলবো না। আমি এখন অন্য কারো বাগদত্ত। সামনের ১৮তারিখ আমার বাড়িকে নিজের বাড়ি বানিয়ে চিরকালের মতো চলে আসবে সুকন্যা। আমার খুব ইচ্ছে সুকন্যা স্ত্রী হয়ে পাকাপাকিভাবে আমার কাছে চলে আসার আগেই আমি একটু নিজের কাছে পরিচ্ছন্ন হই। সেই কবে থেকে আমার মনের ভেতর জাকিয়ে বসে থাকা মানুষটিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা খুব প্রয়োজন। এই মহৎ কাজে আপনার সাহায্য চাই একান্তভাবে। তাই অনুরোধ করছি, একবার দেখা হতে পারে কী আমাদের, কোনোভাবে?’

বছর পাঁচেক আগের কথা। মাহক সরফরাজ নামের একজনের সাথে বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল তার। সেইসময়ের কথা খুব মনে আছে এখনো। একটুও ভুলে যায়নি সাগুফতা। একটা ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিলো তখন তার জীবনে। কিন্তু সৌভাগ্যের কথা, একেবারে শেষ মুহূর্তে হলেও সে সেই দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছে। সাগুফতার বাবা তার এক বাল্যবন্ধুর ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন। যদিও বাবা আধুনিক মানুষ, কিন্তু কখনো কখনো আবেগের বসে ভীষণ সেকেলে কাজ করে বসেন। এই যেমন মেয়ের সাথে কথা না বলেই মেয়ের বিয়ে পাকা করে ফেলা। অদ্ভুত ব্যাপার হলো ওপাশে ছেলেটিও নাকি সাগুফতাকে দেখতে চায় না। সরাসরি বিয়ের পরেই দেখবে। প্রথমদিকে সাগুফতার কাছে ব্যাপারটিকে খুব রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে। গল্পের বইতে পড়া প্রেম কাহিনীর মতো। মায়ের সাথে সোনার দোকানে গিয়ে নিজের পছন্দে গহনা অর্ডার করেছে। বিয়ের শাড়ি, বৌভাতের ল্যাহেঙ্গা, গায়ে হলুদের জন্য কাঁচা ফুলের সেট- সব নিজের পছন্দে নির্বাচন করেছে সাগুফতা। আজাদ প্রোডাক্টসের শো-রুমে গিয়ে ধবধবে সাদা একটি বিয়ের কার্ড বেছে দিয়ে এসেছে। বাড়ির প্রথম বিয়ে, সাগুফতার বাবা মহানন্দে ধুমধাম করে যাচ্ছিলেন খরচের তোয়াক্কা ছাড়াই। কিন্তু ঘটনাটা ঘটলো গায়ে হলুদের দিন সকালে। ছেলের বাড়ি থেকে ততক্ষণে হলুদের তত্ত্ব এসে উপস্থিত হয়েছে। সবাই যখন তত্ত্ব দেখা নিয়ে মহাব্যস্ত, এমন সময় চাচাতো ভাই তাহের এসে সাগুফতাকে অন্য ঘরে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।

‘তাহের, কী হয়েছে জলদি বল। দরজা বন্ধ করেছিস কেন? সবাই কী মনে করবে? দরজা খোল।’

‘দরজা খুলবো এক্ষুণি। তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। তোকে লুকিয়ে দিতে চাই।’

‘কী সারপ্রাইজ?’ বিরক্ত হলেও বেশ কৌতূহল অনুভব করে সাগুফতা।

শার্টের পকেট থেকে একটা ছবি বের করে সাগুফতাকে দেখায় তাহের।

‘দেখে নে। তোর বর। আমি ভাবলাম বিয়ের রাতে তুই যদি অজ্ঞান টজ্ঞান হয়ে যাসতোর বিয়ে করা পতিদেবের মুখটি দেখে, তাহলে আমাদের পরিবারের ভীষণ বদনাম হয়ে যাবে। তারচেয়ে তুই আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাক। এই ছবি দেখে মনটাকে শক্ত করে নে।’

সাগুফতা ছবিটির দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ‘কী কুৎসিত! কী জঘন্য! কী ভয়ংকর দেখতে ছেলেটি। নিজের বাবা হয়ে এমন ভয়ংকরদর্শন একটি ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পারছে, কীভাবে?’ ভীষণ মনোকষ্ট নিয়ে সাগুফতা বলেছিল মনে মনে।

যৌবনের শুরুতে প্রতিটি মেয়েই একজন রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে। সাগুফতাও দেখেছিল। দোষের কিছু নেই তাতে। পরবর্তীতে স্বপ্নের রাজকুমার রূপ চটক নিচে নামতে নামতে সাধারণ এক যুবকে পরিণত হয়। মেয়েরা মেনেও নেয় তা। কিন্তু এমন একটা মুখের মানুষের সাথে সাগুফতার মতো আধুনিকা, চৌকস মেধা, আর ছুরির মতো ধারালো রূপবতী একটি মেয়েকে সমস্ত জীবন পার করতে হবে? ছবির মানুষটি দেখতে যতটা না রূপে কুৎসিত, তার চেয়েও বড় কথা হলো ছবির মুখটি দেখে সাগুফতা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে। রূপকথার গল্পের কোনো দানোর ছবি যেন এটি। এমন ভয় নিয়ে সারাটি জীবন পার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সেদিন তাহেরের বুদ্ধি মতো সাগুফতা কয়েক মিনিটের ভেতর বাড়ি থেকে পালিয়ে এক বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে ছিল দুই রাত। বিয়ে হবার নির্ধারিত তারিখটি পার হবার পর ফিরে এসেছিল তাদের বাড়িতে। স্বভাবতই বাবার বন্ধুর ছেলের সাথে সাগুফতার বিয়েটি ভেঙে গিয়েছিল সেইবার। এই ঘটনার কারণে সাগুফতার বাবা অনেক বছর কথা বলেনি মেয়ের সাথে। বন্ধুকে বেয়াই বানানোর খুব ইচ্ছে থাকলেও মেয়েকে জোর করেননি আর। নিজের ভুল বুঝতে পেরে মেয়ের ইচ্ছে মতোই চলতে দিয়েছেন তাকে। গত চার বছরে সাগুফতাকে বিয়ের কথা বলেনি বাড়ির কেউ। শুধু এই কুকর্মের মূল হোতা চাচাতো ভাই তাহের অনেকবার জানিয়েছে সে সাগুফতাকে বিয়ে করতে রাজি আছে। বলেছে আগের বিয়ের দুর্ঘটনাটি তার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাগুফতা অবশ্য তাহেরের কথার জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি কখনো। তাহেরকে নিয়ে কোনোকালেই সাগুফতার মনে আলাদা অনুভূতির জন্ম হয়নি।

নিজের মুখে জানতে না চাইলেও সাগুফতার বাবাই কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছে মাহক পিএচডি করতে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছে। ইচ্ছে ছিল বিয়ে করে সাগুফতাকে সাথে নিয়ে যাবে। কিন্তু বিয়েটি যেহেতু হলো না, তাই সে একাই গিয়েছে। সাগুফতা ভাবে, ভদ্রলোকের তো এতদিনে বিয়েশাদী করে সংসারী হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ কোথা থেকে ফোন নাম্বার জোগাড় করে বিরক্ত করা আরম্ভ করেছে। পুরোনো কথাগুলো মনে করে সাগুফতার একটু খারাপ লাগছে অবশ্য। বেচারাদের নিশ্চয়ই খুব অপমান লেগেছিল তখন। ছেলেপক্ষের সাথে মেয়েপক্ষ এমন কাজ করতে পারে এমনটি নিশ্চয়ই কেউ শোনেনি আগে। আহা, আত্মীয়স্বজনের সামনে নিশ্চয় নাক কান কাটা গিয়েছে তাদের পরিবারের সবার। এতদিন পর একবার দেখা করলে যদি পুরোনো অপরাধ কিছুটা কাটানো যায়, তাহলে দেখা করতে অসুবিধা কী! দয়া পরবশ হয়ে সাগুফতা মোবাইলে ছোট করে একটা রিপ্লাই পাঠালো এবার।

‘কাল সন্ধ্যায় আসবেন। ঠিক ছয়টায়। উত্তরা ৩ নাম্বার সেক্টর। খাজানা রেস্তোরা।’

তাহেরের সাথে বিয়েটা ভেঙে যাওয়ার পর সাগুফতা কয়েকটি বছর বেশ আনন্দে ছিল। উত্তরা ১১ নাম্বারে বাবার কিনে দেওয়া ফ্ল্যাটটিতে ওঠে এসেছে অফিসে যাতায়াতের সুবিধা হয় বলে। নিজের ইচ্ছায় আগে কখনো কাউকে এভাবে অপমান করেনি সে। করার প্রয়োজন পড়েনি। না দেখা মাহক লোকটি কয়েক বছর পর থেকে কেমন করে যেন বারবার সাগুফতার মনের ঘরে উঁকি দিতে শুরু করে। অবচেতন মনের অপরাধবোধের গ্লানি কিনা কে জানে। বায়িংহাউজে সারাদিনের হাড় ভাঙা খাটুনির পর রাতে একা ফ্ল্যাটটিতে এসে স্বীকার না করলেও মনটা বিষন্ন হয়ে যেত তার। বাবার মনে কষ্ট দিয়েছে বলেই এমন লাগতো কিনা তাও সে নিশ্চিত হতে পারেনি কখনো। মাহকের সাথে একটিবার দেখা করার ইচ্ছে তীব্র হয়ে জেগেছে মনে অনেকবার। কিন্তু লজ্জায় জানাতে পারেনি কাউকে কখনো। কতরাত নিজের সাথে নিজে কথা বলেছে মাহক হয়ে। মনের অতলে সূক্ষ্ম একটা আশা আলো ঢিমঢিম করে নিভু প্রদীপের মতো জ্বলেছে নিভেছে, অনুচ্চারিত বাসনারা তীব্রভাবে আশ্বাস দিয়েছে: মাহেক নিশ্চয়ই এখনো অপেক্ষা করছে তার জন্য। মনের এমন চঞ্চলতা এবং অবিমৃষ্যকারিতায় নিজের উপর রাগ হয়েছে কখনো কখনো। আর বারবার করে মনে হয়েছে সেদিন তাহেরের বুদ্ধিতে অমন করে বাড়ি থেকে পালিয়ে না গিয়ে সরাসরি মাহেকের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হলেই বরং বেশি ভালো হতো। বাঁদরটাকে নিজের চোখে দেখে আজকের এই আত্মগ্লানির হাত থেকে মুক্তি পেতে পারতো। কিন্তু তাহেরের দেখানো ছবিটি যে সত্যি মাহেকের ছবি নয়, তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর সেই ছবিটি যদি সত্যি মাহেকের ছবি হয়, তাহলে এমন ভয়ংকর দেখতে একটা লোকের সাথে সমস্ত জীবন কেমন করে কাটাতে পারতো সে? অসম্ভব। ভীষণ অসম্ভব। চিন্তাই করা যায় না ওই কথা।

মাহক নামের লোকটির সাথে আজ সত্যি দেখা করতে যাচ্ছে বলে মনের ভেতর কিছুটা আতঙ্ক আর অস্বস্তি থাকলেও সকাল থেকেই সাগুফতা কেমন একটা উত্তেজনা বোধ করতে থাকে। একবার মনে হলো বাবাকে ফোন করে কথাটা জানায়। বাবা নিশ্চয় খুব খুশি হবে। পরমুহূর্তেই আবার মনে হলো, থাক কোনো দরকার নেই। যে ঘটনা অনেক বছর আগেই মাটি চাপা পড়ে গিয়েছে তার কংকাল উদ্ঘাটন করার সচিত্র প্রতিবেদন বৃদ্ধ বাবাকে না জানালেও চলবে। সকাল থেকে অফিসের কাজেও মনোযোগ দিতে পারলো না ঠিক করে। খুব অস্থির লাগছে মনে মনে। সাগুফতা একবার চিন্তা করার চেষ্টা করে, কেন সে মাহকের সাথে দেখা হবে বলে এতটা উদগ্রীব হয়ে আছে? একদিন লোকটিকে সে চরমভাবে অপমান করে সুখ পেয়েছিল বলে? অপমানিত আর পরাজিত লোকটির পোড়া কালচে মুখের উপর ঝামা ঘষে দেওয়ার সুখ পুনর্বার পাওয়া গেলো, এই আশা জেগে আছে মনের সুপ্ত মনিকোঠায়! নাকি বুকের ভেতর কোথাও একটুখানি ভালোবাসা তবু জন্মে গিয়েছিল কুৎসিত মুখের মানুষটার জন্য! সাগুফতা নিজেও অপেক্ষা করেছিল এতোদিন মানুষটাকে দেখবে বলে! মাহকের জন্য যদি তার অপেক্ষা না-ই থাকতো, তাহলে সে সাব্বিরকে বিয়ে করে ফেলতো নিশ্চয়ই। সাগুফতার জন্য কী পাগলটাই না ছিল এক্স অফিস কলিগ সাব্বির। রাস্তায় নেমে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে বাকি রেখেছিল শুধু বোকা ছেলেটা। সাব্বিরের যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে অতো ভালো মার্কেটিংয়ের চাকরিটা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে পালিয়েছে সাগুফতা। পুরোনো কথা মনে করে আজ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক থেকে আলগোছে।

বিকেলে অফিস শেষ করে মুখে ফেইস পাউডার আরেকবার বুলিয়ে নিয়ে সাগুফতা খাজানায় পৌঁছেছে ছয়টা বাজার আধ ঘন্টা আগে। অফিসের কাজ জলদি শেষ হয়ে যাওয়ায় অফিসে আর বসে না থেকে রেস্তোরায় বসে এককাপ চা একা খাওয়া যাক, এই ভেবে চলে এসেছে। তাছাড়া মাহকের বিদঘুটে চেহারার সামনে বসে হয়তো কিছুই খেতে পারবে না সে। খাজনার ভেতর মাঝের দিকে একটি টেবিলে বসে এককাপ মালাই চা অর্ডার করলো। মনে মনে নিজেকে অনেক কথা শেখাতে থাকে সে। স্বগোক্তির মতো বলে, ‘আমার মনে কোনো অপরাধবোধ নেই।’ মাহকের বাবা এবং তার বাবা নিজেদের বন্ধুত্বকে সম্পর্কের বাঁধনে টিকিয়ে রাখতে যে বিবাহের আয়োজন করেছিল, সে বিবাহ করা সাগুফতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই সাগুফতা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে শুনেও মাহকের বাবা যখন বাড়ি এসে সাগুফতার সাথে কথা বলেছে, অনুনয় করে বলেছিল, ‘আমার ছেলে এখনো সাগুফতাকে বিয়ে করতে রাজি আছে, শুধু সাগুফতাই…..’ তখন বাবার বন্ধু হলেও পাত্রের বাবা হিসেবে একটুও ছাড় দেয়নি সাগুফতা ভদ্রলোককে সেদিন। উত্তরে মাহকের বাবাকে সাগুফতা যাচ্ছেতাই রকমের অপমান করে দিয়েছে। অমন ভয়ংকর দর্শন একটা লোকের সাথে সমস্ত জীবন কাটাতে হলে, সে বরং রাস্তায় ট্রাকের তলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে। প্রয়োজনে আইবুড়ি হয়ে থাকবে সমস্ত জীবন, তবুও সে ওই ছেলেকে বিয়ে করবে না।

‘ম্যাডাম, আপনার চা।’

‘ধন্যবাদ।’

খাজানার বাবুর্চির বিখ্যাত মশলা চা। ঘন দুধ আর এলাচের সৌরভ মিশ্রিত পানীয়টিকে চায়ের চেয়ে বেশি তরল ক্ষীর বলে মনে হয়। তবুও খেতে দারুন। সাগুফতা টেবিলের উপর বিছিয়ে রাখা একটি পত্রিকায় অর্থনীতির সংবাদে চোখ বুলাচ্ছে আর চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর শুনতে পেল কোকিলের ডাক। পিঠের ওপরে আছড়ে পড়ছে যেন সাগরের তীর ছুঁয়ে আসা মোলায়েম বাতাস। বৈশ্বিক অর্থনীতির সংবাদের পাতার উপর প্রেমের গানের মতো উষ্ণতা ছড়িয়ে কথা বলে ওঠেছে মাথার উপর একটি কণ্ঠস্বর। নারীর নরম বুকে তির বসানো এক মাদকতাময় গলার আওয়াজ। পত্রিকার পাতা থেকে মুখ না তুলেও সাগুফতা বুঝতে পারে, সে এসেছে। অবিকল সেই টেলিফোনের অপরপ্রান্তের বুক কাঁপানো কণ্ঠস্বর।

‘আমি সত্যি ভাবিনি আপনি আসবেন। সত্যি দেখা হবে আপনার সাথে বিশ্বাস হচ্ছিল না।’

সাগুফতার ইচ্ছে করে চোখ বন্ধ করে পান করে মাহকের পুরুষালি গলার পানোন্মত্ততা। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে সেই ছবির কথা। সেই মুখ! ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এখন! ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে সাগুফতার। টের পায় মাহক একটি চেয়ার টেনে বসেছে তারই টেবিলে। গমগমে গলাটি আবার কথা বলে, ‘কী হলো? এখনো ভয় পাচ্ছেন আমাকে? নাকি খুব ঘৃণা করেন আপনি আমাকে? তাকাচ্ছেন না যে আমার দিকে। নাকি কালো চশমা এনে দিবো আপনাকে একটা?

‘উফ, খুব বাচাল তো লোকটি। এতো কথা বলে সব সময়? নাকি আমার সামনে এসে বেশি প্রগলভতা দেখাচ্ছে?’ মনে মনে বলে সাগুফতা। পত্রিকাটি বন্ধ করে মুখ তুলে তাকায় মুখোমুখি বসে থাকা মানুষটির দিকে। নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না। মুখের কথা বন্ধ হয়ে যায়। আশ্চর্য! এটি কে? এই লোকটি তো মাহক নয়। তাহের সেদিন যার ছবি দেখিয়েছিল সেই লোক এই লোক হতে পারে না কিছুতেই।

‘আপনি?’ চেষ্টা করেও গলার অবাক ভাবটি লুকাতে পারলো না সাগুফতা।

‘আমি মাহক। আপনার ঘৃণার পাত্র। নিন, এবার থুথু ছিটিয়ে দিন আমার গায়ে।’

‘কিন্তু….’

‘কিন্তু কী?’

‘না, কিছু না।’ সাগুফতা বলে দ্বিধান্বিত গলায়।

মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার। বেশ অনুতাপ হচ্ছে এখন। নিজের উপর রাগ হচ্ছে সীমাহীন। চাচাতো ভাই তাহেরের সেদিন নিজে থেকে ছবি এনে লুকিয়ে দেখানোর রহস্যটা মনে হয় সে বুঝতে পারছে আজ পরিষ্কারভাবে।

‘আপনি কতদিন থাকবেন দেশে?’ নিজেকে স্বাভাবিক করতে ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে সাগুফতা। ভদ্রলোক উত্তর দিতে দিতে নিজেকে কিছুটা ধাতস্ত করে নেওয়া যাবে এই সুযোগে।

‘আমি চার সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এসেছি। আপনার ফোন নাম্বার জোগাড় করতেই একটি সপ্তাহ পার হয়ে গেল। তবু ভালো যে শেষপর্যন্ত আপনার দেখা পেলাম।’

‘দেখা পেয়ে ভালো লাগছে আপনার?’ কৌতুকের সুরে প্রশ্নটি করে সাগুফতা।

‘কী যে বলেন না, এটা কোন প্রশ্ন হলো নাকি আবার। তৃষ্ণার্ত চাতকের সামনে হাজির হয়েছে সুমিষ্ট ঝর্ণার জল, আর ঝর্ণা জানতে চাইছে চাতকের বুকে জলের হাহাকার আছে কিনা! অবান্তর প্রশ্ন। অন্য কিছু বলুন বরং।’

‘আপনি এতো সুন্দর করে কথা বলেন আমার জানা ছিল না।’বিড়বিড় করে বললো সাগুফতা।

‘জানা থাকলে কী হতো, আমার সাথে বিয়েটা ভেঙে দিতেন না বুঝি?’ মুচকি হেসে উত্তর দেয় মাহক।

সাগুফতা চুপ করে বসে আছে। দুইহাত দূরত্বে বসে থাকা অসম্ভব সুপুরুষ এই মানুষটির জন্য তার মনটা কেমন উতলা হয়ে উঠছে। অফিসের প্রয়োজনে নানা রকম মানুষের সাথে দেখা হয় তার। অবিবাহিত জেনে অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব এনেছে, পাত্র দেখিয়েছে। কিন্তু কাউকেই সাগুফতার মনে ধরেনি। কোন একটি বিশেষ মুখ খুঁজছিল হয়তো মনে মনে। আজ চোখের সামনে বসে থাকা মাহকের মুখটি দেখে নিঃসন্দেহে বলতে পারছে, এই মুখের, এই ব্যক্তিত্বের, এই কণ্ঠস্বরের একজনের জন্যই সে অপেক্ষা করেছিল এতকাল।

‘আমি বিয়ে ভেঙে দিয়েছি বলে আপনার তো আর পাত্রীর অভাব হবার কথা নয়। আপনি এখনো বিয়ে করেননি কেন?’

‘আপনাকে তো বলেছি টেলিফোনে, সুকন্যা নামে একটি মেয়ের সাথে আমার বাগদান হয়েছে। আমরা কেউ কাউকে দেখিনি এখনো। ঘটকের মাধ্যমে বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমাদের বাগদানের অনুষ্ঠানটি হয়েছে টেলিফোনে। আমার আব্বার শরীরটা বেশি ভালো নেই। তাই ভাবলাম আব্বা বেঁচে থাকতে পুত্রবধূর মুখটি দেখে যাক অন্তত।’

মাহকের ফর্সা মুখের নিম্নাংশটুকু কেমন সবুজাভ। ক্লিন সেইভ করা মুখে প্রখর গাম্ভীর্য। অথচ সাগুফতার সাথে অনর্গল হ্যাংলামো করে যাচ্ছে। সবুজ ঘাসের স্লিম শরীরের মতো কচি পাতার রঙে একটা টি-শার্ট আরো শ্যামল করে দিয়েছে পঁয়ত্রিশের মানুষটিকে। সাগুফতা চোখ ভরে দেখে। মনের ভেতর এঁকে নিতে থাকে মাহকের মুখের ছবি। এতো বড় একটা ভুল সে কেমন করে করলো? নিজের উপর খুব রাগ হতে থাকে সাগুফতার। মনে মনে বলে, ‘সুকন্যা! ছেহ, নাম খুঁজে পায়নি আর। সুকন্যা আর দুকন্যা এইসব নামই উপযুক্ত তোমার জন্য ছেলে।’

‘কিছু বলছেন না যে? আমাকে বিয়ে করবেন বলে কি আমার সাথে কথা বলাও বারণ আছে কারো?’ সাগুফতার চোখের উপর চোখ মিলিয়ে রেখে মাহক বলে।

সেই তখন থেকে চোখের দৃষ্টি পাল্টে আছে সাগুফতার মুখের উপর। যেন চোখ সরালেই সামনের মানুষটি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে অজানায়।

‘কী বলবো? আমার কিছু বলার নেই। আপনি বলুন। আমি শুনছি। আপনার হবু স্ত্রীর কথা বলুন। সুকন্যা উনার নাম?’

‘জি। এখনো কন্যা আছেন। কিন্তু অল্প কয়েকদিনের ভেতরেই তিনি স্ত্রী হয়ে যাবেন।’

‘তা কী করেন আপনার এই বর্তমান কন্যা এবং হবু স্ত্রীটি?’

‘বলছি। কিন্তু তার আগে আমি এককাপ চা অর্ডার করবো আমার জন্য। আপনি নিবেন আরেক কাপ চা?’

‘না। আমি ঠিক আছি। আপনার জন্য এককাপ দিতে বলুন।’

‘আচ্ছা। কিন্তু আমাদের খাবার? খাবার অর্ডার করবো কখন?’

‘আমি কিছু খাবো না এখানে। একেবারে বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খাবো।’

‘সেকি কথা? আপনি আমার সাথে ডিনার না করলে আমরা রেষ্টুরেন্টে এলাম কেন? নাকি আপনি যে কারণে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হননি সেই কারণেই আমার সাথে খেতেও রাজি হচ্ছেন না?’

‘ছি ছি। এসব আবার কেমন কথা? আমি এখন কিছু খেতে পারবো না। কিছু মনে করবেন না।’

‘কিছু মনে করবো অবশ্যই। আপনার সাথে হয়তো এই আমার শেষ দেখা। শেষ কথা বলা। আমার কিছু প্রশ্ন আছে আপনার কাছে। সেগুলো আপনাকে শুনতে হবে। জবাব দিতে হবে।’

‘তা শুনবো। বলুন কী জানতে চান?’

‘এখন বলছি না। আরো সময় লাগবে। চলুন কিছু খাবার অর্ডার দেই, নইলে শুধু চা নিয়ে আমাদেরকে বেশিক্ষণ বসতে দেবে না এখানে।’

‘কিন্তু আমি আর কিছুই খাবো না। সরি।’

‘সরি হবেন না প্লিজ। তাহলে চলুন আরেকটা কাজ করি। এখান থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও যাই।

‘কোথায়?’

‘বাইরে কোথাও। যেখানে যতক্ষণ ইচ্ছে থাকা যাবে আবার জোর করে কিছু খাওয়ার ঝামেলাও থাকবে না।’

‘চলুন। এক কথায় চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়ায় সাগুফতা।’

মাহকও ওঠে দাঁড়ালো চেয়ার থেকে। রেষ্টুরেন্ট থেকে বের হবার সময় মাহকের পূর্ণ অবয়ব লক্ষ্য করে সাগুফতা। ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা। সুঠাম দেহ। হাফ হাতা শার্টের নিচে বেরিয়ে থাকা পেশীবহুল হাত দুটি অবলীলায় লুফে নিতে পারবে সাগুফতাকে শূন্য থেকে নিজের বুকের উপর। পেটের কাছে সামান্য একটু চর্বি জমেছে। দেখে আদর লাগছে যেন। সাগুফতার উচাটন মন মাহকের পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খায় পাথুরে নদীর মতো। কাঁধের কাছে হাত রেখে ধরে ফেলার মতো করেই ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাসের হাওয়া ফেলে মাহক। সাগুফতার মনে হয় মাথাটা ঝাঁঝিয়ে উঠছে। কী কোলন ব্যবহার করে লোকটা, এমন মাথা আউলে দেওয়া সুগন্ধ!

ওরা দুজনেই আলাদা গাড়ি নিয়ে এসেছিল খাজানাতে। কিন্তু এবার কেউই গাড়ির কথা তুললো না। একটা রিকশায় ওঠে আশুলিয়ার দিকে আগাতে বলে রিক্সাওয়ালাকে। মাহক আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডির ক্লাসের নানান গল্প শোনায় সাগুফতাকে। সেখানকার লেখাপড়ার পদ্ধতি, ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কে বন্ধুতা, মুক্ত অর্থনীতির মতো মুক্ত হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে নর নারীর যখন তখন শরীর আর মন বদলাবদলি করার গল্প বলে যায়। সাগুফতা চুপ করে শোনে। মাহক আমেরিকায় দেখা বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের হোম সিকনেস এর কথা বলে। দেশে ফিরে তার কী করার পরিকল্পনা আছে সে কথাও জানায়। রিক্সায় সাগুফতার খুব ইচ্ছে করে মাহকের একটা হাত ধরে। এমনিতে রিকশার হালকা ঝাকুনিতে শরীরের একাংশ কিছুটা স্পর্শ করছে মাহকের শরীর। ভালোলাগার অনুভূতি অস্বীকার করতে পারে না সাগুফতা নিজের মনের কাছে। ফিনফিনে ডানার ফড়িঙের মতো থেকে থেকে নেচে উঠছে হৃদয়। আরেকটু পর পড়ন্ত বিকেলের কনে দেখা আলোয় সূর্যটা আশুলিয়ার পানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ডুবতে শুরু করবে। মাহক গলার স্বর নিচু করে কিছু বলে।

‘ওই লাল সূর্যটাকে টিপ্ করে পরিয়ে দেই আপনার কপালে। আপনার পরনের লাল শাড়িটির সঙ্গে আর আপনার লাল দুটি গালের সাথে এই লাল টিপটি কিন্তু খুব মানাবে।’

সাগুফতা লজ্জায় আর ভালোলাগায় অন্যদিকে মুখে করে থাকে। কিন্তু মুখে বলে অন্য কথা।

‘আমি টিপ পরি না। আমার কপাল চুলকায়।’

‘নাকি আমার কাছ থেকে টিপ নিতে আপত্তি?’

‘দুটোই।’

‘আমার দুর্ভাগ্য।’

‘আপনার টিপ সুকন্যার জন্য রেখে দিন। অন্য কাউকে আপনি টিপ পরালে তাকে ঠকানো হবে।

‘সুকন্যা খুব ভালো মেয়ে। অনেক সহনশীল আর উদার। মানে, টেলিফোনে কথা বলে আমার কাছে তাই মনে হয়েছে।’

‘দেখা করেননি কেন?’

‘বিয়ের দিন প্রথম দেখবো বলে নিজেকে সংবরণ করে রেখেছি।’

‘এমন কেন আপনি? আমার সাথে দেখা করতে পারতেন। দেখা না করলেও একটিবার টেলিফোনে কথা বলতে পারতেন অন্তত। তাহলে তো আর….’ কথা শেষ করে না সাগুফতা। বোবা আর বিমূঢ় হয়ে রইলো শুধু।

‘চোখের দেখাটাই কী সব? চোখ দিয়ে তো দূরের মানুষরা দেখে। কাছের মানুষগুলো মন দিয়ে দেখলে অসুবিধা কোথায়?’ উদাস গলায় বলে মাহক।

‘মনের দেখা তো চোখের দেখা থেকেই শুরু হয় তাই না? চোখে দেখার ছবি থেকেই তৈরী হয় মনে দেখার কল্পনা।’ তর্ক করার চেষ্টা করে সাগুফতা।

‘আমি আপনার সাথে একমত নই। মনে দেখা ছবিকেই মানুষ চোখের পর্দায় ফেলে। তাই যাকে মনে ভালো লাগে তাকে চোখেও ভালো দেখে।’ মাহকের সহজ উত্তর।

রিকশা থেকে নেমে ওরা কিছুক্ষণ আশুলিয়ার রাস্তায় হাঁটে। বড় একটা পাথরের উপর বসে পড়েছে সাগুফতা। শাড়ির আঁচলটি কোলের উপর টেনে নিয়ে পা দুটি সামনের দিকে প্রসারিত করে দিলো। বাতাস এসে দুলিয়ে দিচ্ছে মুখের চুল। কাছাকাছি আরেকটা পাথরের উপর বসেছে মাহক। চোখ দূরে, আকাশ আর পানির সীমানায়। কয়েকটি নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে পানিতে।

‘আপনাদের বিয়ে কবে হচ্ছে? তারিখ ঠিক হয়েছে? খোঁচা মারা গলায় প্রশ্ন করে সাগুফতা।’

‘হয়েছে। ১৮ তারিখ। আর পাঁচদিন পর। সাগুফতার কণ্ঠের কটাক্ষ যেন একটুও ধরতে পারে না মাহক।’

‘বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে আমেরিকায় স্থায়ী হবেন? নাকি দেশে ফিরে আসবেন?’

‘ওর ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে সবটা। আমি দেশে অথবা আমেরিকায়, দুটোতেই সমান ভালো দেখতে পাই। আমার কোনো মতামত নেই এই ব্যাপারে।’

‘আপনার স্ত্রী খুব ভাগ্যবতী।’

‘আপনি বলছেন?’

‘বলছি।’

‘আমাদের বিয়ের কার্ড এনেছি আপনার জন্য। নিজের হাতে আপনাকে দেব বলে। হাতের কালো ব্যাগটি থেকে একটা সাদা খাম বের করে এগিয়ে দেয় মাহক। বললো, ‘কিন্তু এখন দেখবেন না প্লিজ। আমার সামনে কেউ আমার বিয়ের কার্ড দেখছে এটা আমার কাছে কেমন বিব্রতকর লাগে।’

‘কেন? বিয়ে করতে লজ্জা পাচ্ছেন?’ খিলখিল করে হাসে সাগুফতা।

‘ঠিক লজ্জা পাচ্ছি না। কেমন যেন বেশি আপ্লুত হয়ে যাই আমি। বুড়ো বয়সের বৌ কিনা, মারাত্মক সোহাগের জিনিস।’

মুচকি হেসে মুখ নিচু করে মাহক। আর বুকের ভেতর থেকে মুখে ফুটে ওঠা কষ্টের ছাপ লুকাতে অন্যদিকে মুখ ঘোরায় সাগুফতা।

কিছুক্ষণ পর ফুচকা ভ্যান থেকে দুই প্লেট ফুচকা নিয়ে আসে মাহক। সাগুফতার হাতে একটি প্লেট দিয়ে নিজে রাখে আরেকটি প্লেট। সাগুফতার ইচ্ছে করছে মাহককে সেদিনের কথা বলে। তাহেরের দেখানো ভয়ংকর ছবিটির কথা বলে। ছবিতে তাকিয়ে থাকা কুচকুচে কালো চামড়ার মুখে টকটকে লাল দুটি চোখ, সারামুখে লোম আর ব্রণ, কুঁচকানো দুই ভ্রু, পুড়ে যাওয়া ঠোঁট দেখে কী ভয়টাই না সে পেয়েছিল, সেই কথা বলে। প্রচন্ড আতঙ্ক নিয়ে দুই রাত বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে থাকার কথা বলে। কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। কেমন কান্না পাচ্ছে ওর একটু পর পর। কতগুলো বছর পার হয়ে গিয়েছে এর মধ্যে। তখন মাহককে ফিরিয়ে না দিলে আজ হয়তো তাদের সংসার গুছানো হয়ে যেত অনেকখানি। একটি দুটি সন্তান থাকতো। অথচ এখনো সাগুফতা নিজের ফ্ল্যাটে একা থাকে। রাতে বাড়ি ফিরে নিজের হাতে তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করতে হয়। ভেতর থেকে দরজা খুলে দেওয়ার একজন কেউ নেই তার জীবনে। নিজের সাথে মাহকের জীবন থেকেও পাঁচটি বছর নষ্ট করে দিয়েছে সে। সত্যি খুব অনুতপ্ত বোধ করতে থাকে এইমুহূর্তে। সন্ধ্যা নেমে আসছে দ্রুত। খুব বেশিক্ষণ আর থাকা ঠিক হবে না এখানে। যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে তাদের দুজনকে এবার, পৃথক গন্তব্যে।

‘আপনার কিছু প্রশ্ন আছে বলছিলেন। বলে ফেলুন। এরপর তো চলে যাচ্ছি আমরা দুজন দুদিকে।’

‘প্রশ্নটা তো আপনি জানেনই।’

‘আপনার মুখে শুনতে চাই।’

‘আপনি বিয়েটা ভেঙে দিয়েছিলেন কেন সেদিন? আমার সম্পর্কে খারাপ কথা বলেছিল কেউ আপনাকে?’

‘না। তেমন কিছু নয়।’

‘আপনার কি পছন্দের কেউ ছিল? মানে আপনার প্রেমিক? আপনি কাউকে পছন্দ করতেন?’

‘না না। আমার কারো সাথে প্রেম ছিল না। এখনো নেই। আমার কাউকে ভালোই লাগে না। প্রেম করার তো প্রশ্নই আসে না।’

‘আমি তাহলে ঠিক বুঝতে পারছি না কোন অভাবে বিয়েটা ভেঙে দিলেন। গায়ে হলুদের জন্য আমি তৈরী হচ্ছিলাম তখন। মনে মনে আপনাকে কতভাবে কল্পনা করেছি। কখনো ভেবেছি আপনি হয়তো দেখতে আপনার বাবার মতো হবেন, বাবার আদরের মেয়ে যেহেতু। আবার ভেবেছি আপনি হয়তো দেখতে নায়িকা পূর্ণিমার মতো হবেন, পূর্ণিমা আবার আমার পছন্দের নায়িকা কিনা। কখনো ভেবেছি আপনি দেখতে মডেল মৌ এর মতো হবেন। আপনাকে নিয়ে আমার এমন সব চমৎকার ভাবনাগুলোকে আপনি কেমন ধুলিস্মাৎ করে দিয়ে আমার জীবন থেকে চলে গেলেন একেবারে দূরের তারার মতো, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম জানেন।’

‘আমি সরি। আমার খুব অন্যায় হয়েছে।’

‘এখন আর সরি বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি সেদিন বিয়ে করতে রাজি হননি বলেই হয়তো আমি খুব ভালো মতো নিজের পিএচডিটা শেষ করতে পেরেছি। এখন আমার ক্যারিয়ার নিয়ে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।’

‘তাহলে তো ধন্যবাদ একটা আমারই প্রাপ্য বলে মনে হচ্ছে।’

‘তা অবশ্য। কিন্তু আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না এখনো। কেন করলেন কাজটি?’

সাগুফতার বুকের ভেতর কী প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে সেকথা যদি মাহককে বলতে পারতো সে! কেবল নিজের টুকরো হয়ে যাওয়া সমস্ত অংশগুলোকে ঠিকঠাক গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই হয় আজ। এতদিন পর মাহকের সামনে ছোট হয়ে যাবার কোনো মানে হয় না। নিজের আবেগকে শাসন করে কী এক নির্লিপ্ততা ফুটিয়ে তোলে মুখে। শান্তভাবে সংক্ষেপে সেদিনের ঘটনাটি বলে, তাহেরের ছবি দেখানো এবং সাগুফতার ভয় পেয়ে যাওয়ার কথা বলে।

কথা শেষ হবার পর অনেকক্ষণ কথা বলে না দুজনেই। সন্ধ্যার চাদর ঢেকে দিয়ে রাতের প্রথম প্রহর আঁচল বিছিয়েছে চরাচরে। মুখোমুখি বসা মানব মানবীরা পরস্পরের সামনে রহস্যাবৃত। মাথার উপর দিয়ে দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে ঘরমুখো পাখিরা। পাখির ডানার ঝাপটা আর কর্কশ কণ্ঠের আওয়াজে কেমন একটা অপার্থিব সময়ের অনুভূতি তৈরী হয়েছে দুজনের চারপাশে। আক্ষেপের সুরে মাহক কথা বলে ওঠে প্রথম।

‘সুকন্যা আমাকে দেখতে চায়নি কখনো। অবশ্য আরো পাঁচদিন আছে। বিয়ের দিনেও সে আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারে আপনার মতো করেই। আমার নিজস্ব জেদের কারণেই হয়তো আমি কষ্ট পেয়েছি বোকার মতো। নিজেকে আমি কতবার প্রশ্ন করেছি, কেন আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিলেন? আমার অন্যায়টা কোথায় ছিল জানতে পারিনি এতদিন?’

‘যদি সম্ভব হয় আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। সব দোষ আমার। আপনার কোন দোষ নেই।’ অপরাধীর মতো মুখ করে সাগুফতা বললো।

‘এখন আর মাফ চাওয়ার কিছু নেই। যা হবার তা হয়েই গিয়েছে। জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া পাঁচটি বছর তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।’ হতাশা ফুটে উঠেছে কি মাহকের গলায়!

‘যা চলে গিয়েছে তার জন্য দুঃখ করে কী লাভ বলুন। তারচেয়ে এখন সামনের দিনের কথা ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।’ সাগুফতা জবাব দিলো।

‘জি। একদম ঠিক বলেছেন। একই ভুল আমি আবারো করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আর না। আমি সুকন্যার সাথে দেখা করতে যাবো আজ। এখনই। আর কোন রিস্ক নিতে চাই না আমি। সুকন্যার মনেও হয়তো আপনার মতো ভয় কাজ করছে। ভাবছে হয়তো, বাঘ ভাল্লুকের সাথে যদি বিয়ে হয়ে যায় তার! আচ্ছা বলুন তো, আপনার কী মনে হয়, সুকন্যা আমাকে পছন্দ করবে?’

অনেকক্ষণ ধরে নিজের ভেতরে নিজেকে সংযত করে রেখেছিল সাগুফতা। মোবাইলে কণ্ঠস্বরের প্রেমে পড়া, আর খাজানায় প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ার মতো নাটকীয় মুহূর্তগুলোকে সামলিয়ে ভালোই অভিনয় করে যাচ্ছিলো সে মাহককে অবজ্ঞা করার। কিন্তু শেষের এই প্রশ্নটি আর নিতে পারলো না। হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো সে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উগলে ওঠা কান্না থামিয়ে অনেক কষ্টে কথা বললো।

‘সুকন্যার জন্য খুব মায়া হচ্ছে তোমার মনে না? কই আমার জন্য তো একবারও মায়া জাগেনি তোমার। একবারও ইচ্ছে হয়নি আমার সাথে একটুখানি দেখা করতে। কথা বলতে। শুধু তোমার কণ্ঠস্বরটি শুনলেও তো আমি….’

মাহক কী যেন একটা উপলব্ধি করার ভাব করে কিছুক্ষণ। তারপর অকম্পিত কণ্ঠে বললো, ‘আপনি আমার চোখ খুলে দিয়েছেন সত্যি। সুকন্যার সাথে আমার সত্যি দেখা করা খুব প্রয়োজন। বিয়ের রাতে প্রথম দেখার ফ্যান্টাসি থেকে বের হতে হবে আমাকে।’

‘আমাকে কাঁদিয়ে খুব হুঁশ এসেছে তোমার, না? আমি যে কষ্টে মরে যাচ্ছি সে নিয়ে তোমার কোন চিন্তাই নেই। কেন দেখা করতে এলে এতো বছর পর? আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তোমার কথা। কেন এলে আমাকে এভাবে মেরে ফেলতে একেবারে?’ শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদে সাগুফতা।

আজ বুঝি সাগুফতার বিরুদ্ধে চতুর্পাশে চলছে ঘন দুর্যোগের এক সুনিপুন বৈরিতা। মাহক যেন সাগুফতার কথা কানেই শুনছে না। চারপাশে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে একটা খালি রিকশা খুঁজছে। এখন আশুলিয়ায় বেড়াতে আসা সকল দর্শনার্থীদের বাড়ি ফেরার পালা। সব রিক্সায় প্যাসেঞ্জার আছে। অনেকক্ষণ পর একটা খালি রিকশা পাওয়া গেলো। রিকশাটি পাশে এসে দাঁড়ালেও সাগুফতা নড়লো না। রাস্তায় দাঁড়িয়েই থাকে। মাহককে রিকশা দেখিয়ে চোখ ইশারায় ওঠে পড়তে বলে সাগুফতা। মাহক পাল্টা ইশারা করে সাগুফতাকে রিক্সায় ওঠে বসতে।

‘তুমি যাও। তোমার জলদি যাওয়া প্রয়োজন। সুকন্যা অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই ফ্ল্যাটে।’ কথা শেষ করে বাচ্চা মেয়ের মতো আবার কাঁদতে থাকে সাগুফতা।

মাহক এগিয়ে আসে সাগুফতার কাছে। মুখোমুখি দাঁড়ায় শরীর ঘেসে। একদিন যার খুব কাছের কেউ হবার কথা ছিল, দুর্ভাগ্যের কারণে যে মানুষটি আপন হতে পারেনি, আবার ঢেউয়ের দোলায় দুলে দুলে ঠিক ফিরে এসেছে কাছে, মূল্যবান বস্তুটি আজ হয়েছে মহামূল্যবান, তাকে খুব কাছ থেকে দেখার ইচ্ছে জাগছে মনে। মাহক দুইহাতে উঁচু করে ধরে সাগুফতার মুখখানি। আয়ত চক্ষু জোড়া অশ্রু নদীতে ভাসা গোপালের পাপড়ির মতো দুলছে। সাগুফতার কপালে একটি চুমু খায় মাহক। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তুমি এমন করে কাঁদলে আমি যাই কেমন করে?’

সেইরাতে ফ্ল্যাটে ফিরে সাগুফতা মাহকের বিয়ের কার্ডটি বের করে তার হাতব্যাগ থেকে। সন্ধ্যা থেকে ভুলেই গিয়েছিল কার্ডের কথা। আকাশি রঙের খাম। ভেতরে একটা সাদা কার্ড। একটা নীল প্রজাপতির ছবি আঁকা কার্ডের মাঝখানে। প্রজাপতির নিচে লেখা দুটি লাইন:

তোমার সাথে প্রথম দেখা, ভাসিয়ে নিলো প্রবল প্রেমের নিদারুণ বন্যা

তোমায় ডাকি একটি নামে, হৃদয় জুড়ে আছো তুমি, আমার সুকন্যা!

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top