আমি পার্থক্য করতে পারি না // সিরাজুদ দাহার খান

আমি পার্থক্য করতে পারি না

সকালে ও সন্ধ্যায় দেখি দু’জনকেই- প্রতিদিন;
তবুও পার্থক্য করতে পারিনা-
শিউলি ও শেফালির মধ্যে আমি পার্থক্য করতে পারি না।

সকালে শিউলি ঝরে;
সন্ধ্যায় শেফালি।
নাকি সন্ধ্যায় শিউলি ঝরে;
সকালে শেফালি!
আমি কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারি না।

ঘরের আঙিনায় কর্তৃত্বকারিণী ‘গোলাপ’
কতবার চিনিয়েছে-
‘ওই দেখো! রাতে ফোটে, আর সকালে ঝরে যায়- ওইতো শেফালি
সকালে ফোটে, আর সন্ধ্যায় ঝরে যায়- এইতো শিউলি।’
তবুও পার্থক্য করতে পারিনা-
শিউলি ও শেফালির কোল ঘেঁষে বহুকাল কাছাকাছি থেকেও
আমি আজ-ও ওদের পার্থক্য করতে পারি না।
ফুল ও পাঁপড়ির কাছে সমর্পিত আমি এক পুষ্পান্ধ মানুষ!

আমি এক বর্ণচোরা-
ধর্ম-বর্ণ-গন্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারি না।
নীল ও সবুজের মধ্যে বেগুনি ও নীলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারিনা
লাল ও গোলাপীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারিনা
আকাশি ও নীলের মধ্যে আমি পার্থক্য করতে পারিনা।
রঙধনুর সাত রঙ আমি গুলিয়ে ফেলি; পৃথক করতে পারি না।

সাদা ও কালো ছাড়া আমি কোনো বর্ণ চিনি না।
সাদাকে সাদা-ই দেখি; কালোকে কালো
শুধু এটুকু-ই শিখেছি জীবনে-
সাদার রঙ ‘সাদা’ আর কালোর রঙ ‘কালো’।
সাদার মুগ্ধতা শুভ্রতার মতোন,
আর কালোর সৌন্দর্য্য কৃষ্ণের মতোন।
সাদা আর কালো ছাড়া
আর কোনো বর্ণ আমি চিনতে পারি না-
আমি এক বর্ণান্ধ মানুষ!

জাতিতে জাতিতে আমি পার্থক্য করতে পারি না
ধর্মে ধর্মে আমি ভেদাভেদ করতে পারি না
মানুষে মানুষে আমি বিভেদ করতে পারি না।
যখন কৈশোর ছিল আমার হৃদয়ে
মানুষে-অমানুষে ছিল পার্থক্য তখন!

এখন পড়ন্ত বেলা-
মানুষ-অমানুষ সব ‘মানুষ’-এর রূপ ধরে আছে!!
আমার চেখের সামনে
এ দু’য়ের ভেদাভেদ একাকার লীন হয়ে গেছে-
আজকাল মানুষ ও অমানুষ আমি
আলাদা করতে পারি না।

আমি পাখি ও বন্দুকের মধ্যে
ফুল ও কাঁটার মধ্যে পার্থক্য করতে পারি।
পুষ্পস্পর্ষে আমি কণ্টকাকীর্ণ হই-
তাই পুষ্পঘ্রাণ আর কাঁটার আস্বাদ
আমি আলাদা করতে পারি।
গোলাপের সাথে হিরকজয়ন্তি বসবাস করে
কাঁটার ভালোবাসায় আমি শিহরিত হই-
আমি মানুষের সাথে সময়যাপন করে
অমানুষ চিনতে শিখি; কিন্তু মানুষকে পড়তে পারি না!

আমি ভালো ও মন্দের মধ্যে ব্যবধান করতে পারি না
ভালো বলে যা কিছু চিনতাম আগে,
মন্দ এসে নিয়ে গেছে তাকে;
ভালো ও মন্দের মধ্যে কোনটা বেছে নেব
আর কোনটা শেখাব, তা আমি শিখতে পারি না-
আগামি প্রজন্মের কাছে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি না।

আমি প্রেম ও ঘৃণার,
স্নেহ ও করুণার মধ্যে পার্থক্য শিখেছি
শৈশব-কৈশোর আর বাড়ন্ত বেলায়
অনুভবে-যাতনায়।
আমি প্রেমের জন্য ভালোবাসার জন্য
জীবন উৎসর্গ করতে শিখিনি-
আজন্ম কাঙাল আমি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য
গান আর সুর সেধে গেছি-
কাউকে উজাড় করে ভালোবাসতে শিখিনি, তাই
ভালোবাসার মর্ম বুঝিনি!

আমি এক প্রেমান্ধ মানুষ তবু
মানুষকে ভালোবেসে
জীবন উৎসর্গ করতে শিখিনি-
আমি ঘৃণা-কষ্ট-অমর্যাদা
এইসব বিনিময় করে করে
জীবন করেছি পার-
জীবনকে চিনতে পারিনি
জীবন-ও চেনেনি আমাকে।

বন্ধুবলয়ে বসে নিয়মিত আড্ডা দিই
বন্ধুত্বের ঘ্রাণ পেতে আপ্রাণ জেগে থাকি
আমি বন্ধু চিনিনা-
বন্ধুত্ব কাকে বলে যাচাই করার কোনো আয়না পাইনি।
আমি পানি ও পানীয়’র মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না।
বন্ধু ও অ-বন্ধুর মধ্যে ফারাক শিখিনি
নিজে কারো বন্ধু কি-না
আজ-অবধি পড়তে পারিনি;
শিখিনি যাচাই করতে কষ্টিপাথরে।

আমি মানবিক মাতাল আর
অ-মাতাল পরার্থপর মানুষের মধ্যে
কোনোরূপ ফারাক দেখিনি
আমি মমিন-মুসলমান আর ধার্মিক হিন্দুর মধ্যে
বিন্দুমাত্র বিরোধ দেখিনি।

আমি জাতিভেদ প্রত্যক্ষ করেছি;-
বাঙালি ‘বদর’ আর অবাঙালি খানসেনার মধ্যে
পশুত্বের পরাকাষ্ঠায় বিন্দুমাত্র পার্থক্য দেখিনি;
নরপশু রাজাকার আর নিরিহ মানুষের মধ্যে
দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠায় ব্যবধান দেখেছি আমি-
আসমান জমিন।
আমি ধর্ম-অধর্ম আর মানবতা ভূলুন্ঠিত
দেখেছি এই শৃঙ্খলিত দেশে-
আমি পরম ধর্মের নামে চরম অধর্ম দেখি
আমার এই রক্তাক্ত জমিনে।

আমি ধর্মপ্রাণ আস্তিক আর মানবিক নাস্তিকের মধ্যে
পার্থক্য করতে শিখিনি
আমি খুনি আস্তিক আর প্রতিবাদহীন নাস্তিকের মধ্যে
পার্থক্য করতে শিখিনি।
আমি সহিষ্ণু-অসহিষ্ণুর মধ্যে পার্থক্য করতে শিখেছি।
আমি গদ্য ও পদ্য’র মধ্যে
কবিতা ও গানের মধ্যে
প্রবন্ধ ও নিবন্ধের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না-
তাই আমি আজ-ও কোনো কবিতা বা গান লিখতে পারিনি।

গীত ও সংগীতের মধ্যে-
ধর্মের মর্মবাণী ও মরমী সাধকের সুরসুধার মধ্যে
জীবন ও জগতের মধ্যে
ইহকাল ও পরকালের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না।
আমি
জাহান্নাম ও জান্নাতের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি
পুরষ্কার ও শাস্তির মধ্যে পার্থক্য করতে পারি-
জান্নাত ও পুরষ্কারের লোভে অক্লান্ত হতে পারি না;
আশৈশবলালিত ভয়, অবচেতনে প্রবহমান
জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ড
বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মধ্যে আমাকে দোদুল্যমান করে দেয়।
অবদমিত করে দেয় আমার প্রগতি।
এরপর-ও আমি-
ইহকালের নগদ লেনদেন থেকে মুক্ত হতে পারিনি।

মানুষের লালিত স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেখেছি আমি
চোখের সামনে- তবু
মানুষের জন্য আমি জীবন বাজি রাখতে শিখিনি।
জীবন মৃত্যুর দিকে, না-কি মৃত্যু জীবনের দিকে
ধাবমান-
আজ-ও আমি সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি।
আমি জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে
পার্থক্য করতে পারিনি।

আজন্ম দ্বিধায় কেটে জীবন করেছি পার
প্রান্তিকের প্রারম্ভে এসে এখন-ও সিদ্ধান্তহীন-
সকালে শিউলি ঝরে, সন্ধ্যায় শেফালি;
শিউলি ও শেফালির মধ্যে আজ-ও কোনো
পার্থক্য করতে পারি না।

নিজেকেই এখন-ও আমি চিনতে পারিনি।
আমার ভেতরে থাকে একজন, আর বাইরে আরেক-
বাইরের ‘আমি’কে চেনে অন্য মানুষ
নিজে তাকে পুরোপুরি চিনতে পারি না;
মাঝেমাঝে ব্যবচ্ছেদ করি ভেতরের ‘আমি’-কে আমি
তাকে দেখে কুঁকড়ে উঠি; কুঞ্চিত হই
ভেতরের আমাকে-ও আমি নিশ্চিত চিনতে পারি না-
দু’জনের পার্থক্য দেখি; কিন্তু নিজেকে দেখি না।

সকালে শিউলি ঝরে;
সন্ধ্যায় শেফালি।
শিউলি ও শেফালি’র মধ্যে আজ-ও কোনো
পার্থক্য করতে পারি না।

২৫.১২.২০১৬

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top