শুভেচ্ছা // সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়

“ইসস ম্যাগো!! কি বিচ্ছিরি”!!

প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে চিৎকার করে ওঠে দোলনা।

“কি হল রে !”

মেয়ের ভয়ার্ত চিৎকার শুনে ভিতর থেকে ছুটে আসে পর্ণা। বারান্দার রেলিং এ বসে আছে কালো রঙের বিচ্ছিরি দেখতে একটা পাখি।

“দেখো মা কি বিচ্ছিরি পাখিটা! কুচকুচে কালো! তার মধ্যে চোখগুলো যমদূতের মতো। আর এই আঠারো তলার বারান্দায় উঠলই বা কি করে? কোনোদিন তো কোন পাখি আসতে দেখিনি! যত্তসব।”

মেয়ের কাঁধে হাত রেখে তাকে ঘরের দিকে নিয়ে যায় পর্ণা –

“ছাড়। বাদ দে। কোথাকার কোন পাখি । ও একসময় চলে যাবে । চল ঘরে চল।”

দোলনা, পর্ণা আর বিপ্লবের একমাত্র মেয়ে । বিয়ে হয়েছে বছর দুয়েক হল। দোলনার বর প্রসুন ভারী মিষ্টি আর সমঝদার ছেলে। সম্পর্কে জামাই হলেও প্রসুন আসলে পর্ণা আর বিপ্লবের একেবারে নিজের ছেলে। এতটাই নিজের যে মাঝে মাঝে দোলনাও একটু আধটু প্রতিবাদ করে ওঠে। পর্ণা আর বিপ্লবের এই দুই সন্তান কর্মসূত্রে থাকে অন্য শহরে। সন্তানদের থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হলেও মা বাবার মন সবসময় ওদের কাছেই পড়ে থাকে। তাই ছুটিছাটা পেলেই চলে আসে ওরা।

হেসে খেলে হইহই করে কাটিয়ে যায় কটাদিন। আসার সময় যে ব্যাগটা ভরে ছেলে মেয়ের পছন্দের খাবারদাবার জিনিসপত্র নিয়ে আসে, ফেরার সময় সেই ব্যাগটাতেই ভরে নিয়ে যায় ভরপুর আনন্দ। আবার পরের বার আসার আগে পর্যন্ত প্রশান্তির রসদ।

দোলনার সাজানো ড্রয়িংরুমে আড্ডার আসর বসেছে। তুমুল হইহল্লা চলছে। খুবই আধুনিক চিন্তার ছেলে মেয়ে প্রসুন আর দোলনা। প্রসুনের হাতের রান্না তারিফ করার মত বটে, তবে তার স্বাদ আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে পর্ণার দেওয়া টিপস। সবাই যখন প্রচুর হাসাহাসি করে বেশ ক্লান্ত ঠিক সেই সময় ফুলকো লুচি আর সাদা আলুর তরকারি নিয়ে ঘরে ঢুকল প্রসুন। পর্ণার প্রিয় জলখাবার। আজ ঠিক হয়েছে সারাদিনের সমস্ত কিছু পর্ণার পছন্দমতো হবে। ওর পছন্দের খাওয়া দাওয়া, ওর পছন্দের বিষয় নিয়ে আড্ডা, ওর পছন্দের গান সবকিছু। ডান দিকের কাউচটাতে থালা নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসেছে দোলনা। বরের বানানো আর মায়ের পছন্দের জলখাবার। একটুকরো মুখে তুলতে তুলতে চোখ গেল জানলার বাইরে বারান্দার দিকে –

“ইসস এখনো ঠায় বসে আছে পাখিটা। কি জ্বালাতন। এই শুনছ! পাখিটাকে তাড়িয়ে দিয়ে এসো তো! কি বিরক্তিকর।

কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।”

গরম লুচি ফেলে পাখি তাড়াতে যায় প্রসুন। বৌ এর হুকুম বলে কথা। কিছু একটা ছুঁড়ে মারার ভঙ্গিতে পাখিটাকে তাড়ায় প্রসুন। পাখিটা নড়ে না। খড়খড়ে পা দুটো দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে বারান্দার গ্রিলটা। কখনো বা হাঁটতে হাঁটতে সরে যাচ্ছে গ্রিলটার একদম শেষপ্রান্তে । পুরো শরীরটা নীচের দিকে ঝুলে গেলেও ছাড়ছে না গ্রিলটা। চোখের দৃষ্টিকোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে আছে। কি দেখছে পাখিটা? আশ্চর্য তো! প্রায় বছরখানেক প্রসুনরা এই বাড়িটায় আছে, কোনদিন দেখেনি এই নাছোড়বান্দা পাখিটাকে। তবু যদি দেখতে একটু সুন্দর হোত। অনেক চেষ্টা করেও পাখিটাকে ওড়াতে পারল না প্রসুন। এদিকে লুচি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে । পর্ণা বলল –

“ছাড়ো তো কোথাকার কোন পাখি তার জন্য সময় নষ্ট করছে। চলে এস।”

নরম লুচি গালে ফেলে পর্ণা প্রসুনের মাথায় হাত রাখে –

“বেঁচে থাকো বাবা। খুব সুখে থাকো দুজনে।”

প্রসুন আবদার করে – “একটা গান শোনান না!”

পর্ণার মধুর কন্ঠস্বর চারিদিকে ছড়িয়ে দেয় সুরের আঘ্রাণ –

‘আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে ’

মাকে জড়িয়ে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয় দোলনা –

“মা তুমি রবীন্দ্রসঙ্গীতের সেরা শিল্পী।”

মেয়ের চুম্বনে গাল দুটো চকচক করে ওঠে পর্ণার।

“মা দেখো, পাখিটা গ্রিল থেকে নেমে দরজার কাছে চলে এসেছে। এই যা:।”

হাতের সামনে রাখা একটা কি যেন নিয়ে তেড়ে যায় দোলনা। শান্ত ধীর গলায় বিপ্লব বলে ওঠে –

“আ: দোলনা ছেড়ে দে না। ও তোর মার গান শুনতে এসেছে।”

“বাবা, তুমি কিন্তু আমার মাকে এভাবে হিউমিলিয়েট করতে পারো না” – গর্জে ওঠে দোলনা। হাসির হিল্লোল ওঠে দোলনার সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমে।

পেটপুরে জলখাবার খেয়ে বাপ বেটায় ঠিক করল বাজার করতে যাবে । দোলনাদের বিলাসবহুল এলাকায় বাজার দোকান হাতের কাছে নয়। বেশির ভাগ সময়েই অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত ওরা। মা-বাবা এসেছে সেই আনন্দে ক’দিন অনলাইনকে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । বাপ বেটায় বেরিয়ে যেতেই দোলনা আয়েশ করে শুয়েছে মায়ের কোলে । মায়ের গালে হাত বুলোতে বুলোতে দোলনা বলে –

“মা, কতদিন তোমার কোলে শুইনি। এখানে টাকাপয়সা আছে, আড়ম্বর আছে, আনন্দ আছে, ফুর্তি আছে, শুধু আমার মা নেই। আমি তোমাকে বড্ড মিস করি মা।”

মেয়ের রেশমের মত চুলে বিলি কেটে দেয় পর্ণা –

“এই তো বাবু তোর মা এসেছে তোর কাছে।”

অভিমানী মেয়ের গাল, কপাল চিবুক চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয় পর্ণা। মনে মনে বলে – ‘আমি যে তোকে ছেড়ে কি করে থাকি সে শুধু আমার মনই জানে।’

নিজের অজান্তে কখন পর্ণার দৃষ্টি চলে গেছে বাইরের দিকে। বারান্দার ঠিক বাইরে একটা প্রকান্ড বাড়ি তৈরী হচ্ছে। সারাক্ষণ তার যন্ত্রপাতির ঠং ঠং আওয়াজ, কানে তালা লাগিয়ে দেয়। নগর সভ্যতার অহংকারী আস্ফালন। গুনগুন করে ওঠে পর্ণা-

‘কিছুদিন মনে মনে শ্যামের পিরীতি রাখ গোপনে ’

মায়ের গুনগুন শুনতে শুনতে তন্দ্রা এসে গিয়েছে দোলনার। সারাদিন কি হাড়ভাঙা খাটুনিটাই না খাটতে হয় ওদের। মায়ের কোলে শুয়ে পরম নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিচ্ছে মেয়েটা। পর্ণার এক চিলতে দুনিয়া। হঠাৎ পর্ণার চোখ পড়ে পাখিটার দিকে। ঠায় বসে আছে পাখিটা। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ঘরটার দিকে । কত কি যেন বলতে চায়। কত জিজ্ঞাসা, কৌতুহল। পাখিটার চোখটা দেখতে অদ্ভুত হলেও পর্ণার খুব পরিচিত। ভাসা ভাসা চোখগুলোর ভাষা পর্ণার খুব চেনা।

ডোরবেল বাজল। মায়ের কোল থেকে ধড়মড় করে উঠে দরজা খুলে দিল দোলনা। বাপবেটায় গলদঘর্ম হয়ে নিয়ে এল একগাদা বাজার। মাছ মাংস, তরিতরকারী, সেই সঙ্গে দামী বিদেশী পানীয় আর তার নোনতা অনুসঙ্গ।

“বাপরে ! এই এত কিছু! এসো এসো একটু ঠান্ডা হয়ে বসো তো দেখি !”

ঠান্ডাগরম জলের গ্লাস হাতে নিয়ে ছেলের সামনে ধরে পর্ণা।

“আমার কিন্তু একটা আবদার আছে আপনার কাছে – সরল ছোট ছেলের মত বলে ওঠে প্রসুন।”

“কি আবদার? বলোনা!”

“আজ লাঞ্চে বাসন্তী পোলাও আর কচি পাঁঠার ঝোল। আপনি রাঁধবেন। আমি সমস্ত হেল্প করে দেব। আপনার হাতের এই আইটেম গুলো না! জাস্ট ফাটাফাটি।”

প্রসুনের ফর্সা, হাল্কা দাড়িতে ভরা চিবুকটা নেড়ে দেয় পর্ণা –

“পাগল ছেলে। নিশ্চয়ই রাঁধব। তোমায় কিচ্ছু সাহায্য করতে হবে না। আমি এসেছিই তো ক’দিন তোমাদের যত্ন করে খাওয়াব বলে।”

গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরের দিকে যায় পর্ণা। ওদিকে বিপ্লব মেয়ে জামাইকে নিয়ে বসিয়ে ফেলেছে পানের আসর।

“কি গো তোমায় কি রান্নাঘরে পৌঁছে দিতে হবে ! নাকি বসবে আমাদের সাথে -”

উঁচুস্বরে জিজ্ঞেস করে বিপ্লব।

“ তোমরা শুরু করো না আমি আসছি। রান্নার জোগাড়টা একটু এগিয়ে নিই।”

রান্নাঘরটা বেশ অগোছালো হয়ে আছে। সত্যিই তো ওদের হাতে এত কম সময়, কখনই বা গুছিয়ে রাখবে।

পর্ণা মনে মনে ভাবে এই ক’দিনে রান্নাঘরটা সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়ে যাবে সে । রান্নাঘরের জানলাটা দিয়ে বেশ সুন্দর হাওয়া আসছে। সামনে একটা উঁচু টিলাও দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ধুলোর মেঘে তা বড়ই অস্পষ্ট। সেদিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিল পর্ণা। হঠাৎ খেয়াল করল সেই পাখিটা রান্নাঘরের জানলায় এসে বসেছে । একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পর্ণার দিকে।

কি করুণ সেই দৃষ্টি। কত যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে ওর চোখদুটোতে। পর্ণার চোখের দিকে তাকিয়ে পাখিটা যেন বলতে চায় অনেক কিছু, ভাগ করে নিতে চায় তার দুর্বিষহ কষ্ট।

“মা তুমি আসবে ? আমরা তোমার অপে ক্ষায় বসে আছি যে !”

চিৎকার করছে দোলনা। যে কটা দিন মাকে পায় এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করতে চায় না। মেয়ের চেঁচামেচিতে পড়িমড়ি করে ছুটে আসে পর্ণা। শৌখিন কাঁচের টেবিলে ফাইন কাটগ্লাসের ওয়াইন সেট সাজানো হয়েছে। পর্ণা আসতেই

বিপ্লব ভরতে শুরু করল গ্লাস। চার মূর্তি সম:স্বরে বলে উঠল – চিয়ার্স।

বন্ধুমহলে আড্ডাবাজ হিসাবে বিপ্লবের যথেষ্ট খ্যাতি আছে । অত্যন্ত গম্ভীর তাত্ত্বিক আলোচনা হোক বা নিছক রঙ্গরসিকতা সব জায়গাতেই বিপ্লব বেশ জনপ্রিয় বক্তা। এই ক’দিনে বিপ্লব দেশ বিদেশের কোন কোন জায়গা থেকে তার লেখার জন্য বাহবা পেয়েছে, কোন কোন সংস্থা তাকে সংবর্ধনা জানিয়েছে, কত বড় বড় গুণীজনদের সঙ্গে একই মঞ্চে আমন্ত্রিত হয়েছে সে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তার লেখা কিভাবে আলোড়ন তুলেছে, তার নির্ভুল খতিয়ান এক নাগাড়ে দিয়ে চলেছে বিপ্লব। এ সব গল্প ছোটবেলা থেকে অনেক শুনেছে দোলনা। প্রসুন স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে বিপ্লবের দিকে।

এরকম নামজাদা একজন মানুষের জামাই হিসেবে বোধহয় একটু গর্বও হয় তার। পর্ণা বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে এতগুলো বছরে এতটুকুও পাল্টালো না মানুষটা।

পর্ণা অত্যন্ত গুণী কিন্তু একেবারেই প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। সম্পূর্ণ বিপরীত, আত্মপ্রচার সর্বস্ব বিপ্লবের সাথে কোনো এক অদ্ভুত রসায়নে বাঁধা পড়ে আছে সে। হাজার অভিযোগ, অনুযোগ, অভিমান, অসন্তোষ বুকের মধ্যে চেপে রেখে বিপ্লবের সঙ্গে ‘নাম-গোত্রের’ সম্পর্কটা, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকিয়ে রেখেছে পর্ণা। সত্যি মিথ্যে যাইই হোক সমাজের চোখে ‘সুখী দম্পতি’ হওয়াটা খুব জরুরী। পরিবারের সকলের সামাজিক নিরাপত্তার চাবিকাঠি এই ‘সুখের’ দাম্পত্য।

গল্প করতে করতে সকলের গ্লাস খালি। দ্বিতীয় রাউন্ড ভর্তি করতে করতে প্রসুন ফরমাইশ পেশ করে –

“এতক্ষণ তো গল্প হল, এবার একটু গান হোক।”

পর্ণার গলায় স্বয়ং সরস্বতীর অধিষ্ঠান। আসর জমে উঠল সুর আর সুরায়। যে মন সুরেলা মা তার তেমন সুকন্ঠী মেয়ে।

অসাধারণ যুগলবন্দী। সবাই সুর আর সুরায় নিমগ্ন। কেউ চোখ বুঁজে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে , কেউ আবার মাথা নেড়ে গুনগুন করে সুরে সুর মেলাচ্ছে। ঘরের বাইরে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে এক নির্বাক গুণমুগ্ধ শ্রোতা – সেই কুচকুচে কালো বিচ্ছিরি পাখিটা।

ছেলের আবদারে ফাটাফাটি পোলাও-মাংস রান্না করে একে বারে গলদঘর্ম পর্ণা। বারান্দায় রোদের ঝাঁঝ অনেকটাই কমে এসেছে। একটু খোলা হাওয়ায় এসে দাঁড়াল সে। দোলনার বাড়ির এই খোলা বারান্দাটা পর্ণার খুব প্রিয় জায়গা। ঘরের মধ্যে যখন বিস্তর হইচই চলে, বারান্দার এই নিরিবিলিতে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়। মোবাইলটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে পর্ণা। কত মেসেজ এসেছে কত জায়গা থেকে। পর্ণার গুণমুগ্ধ বন্ধুর সংখ্যা গুনে শেষ করা খুব কঠিন। তার উপর আছে ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, আত্মীয় পরিজন। সবমিলিয়ে পরিচিতির বিপুল দুনিয়া তার। সমস্ত মেসেজ বাদ দিয়ে পর্ণা খুঁজে চলে বিশেষ কোন বন্ধুর পাঠানো খুব সাদামাটা মেসেজ। ছোট্ট একটা লাইন- কি কচ্চ? আহা! দেখলেই প্রাণটা জুড়িয়ে যেত। কিন্তু না, আজ সে মেসেজ আসেনি। মোবাইল থেকে চোখ তুলে সেই বন্ধুর কথা ভাবতে থাকে সে । এত উদাসীন মানুষ তো সে নয়! তবে বড্ড অভিমানী। ছেলে মানুষের মত অবুঝ। চোখ পড়ে যায় বারান্দার গ্রিলটায়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বারান্দা থেকে রোদ ঘুরে গিয়েছে। ক্লান্ত চোখে পর্ণা দেখতে পায় তখনও বসে আছে পাখিটা। ক্লান্তিহীন, অবিচল।

পর্ণার নিস্তেজ শরীরটার দিকে তাকিয়ে আছে মায়াভরা চোখে। যেন ভাগ করে নিতে চায় পর্ণার সমস্ত ক্লান্তি, শ্রান্তি আর অবসাদ। পর্ণার জিজ্ঞাসু মন পাখিটার সাথে আলাপ জমাতে চায় –

“কি চাও তুমি ! সারাদিন এমন একঠায়ে কেন বসে আছো? কি দেখতে চাও? কোথায় তোমার ঘর?”

ক্ষীণ স্বরে উত্তর আসে –

“ঘর! তুমি জানো না! তোমার বুকের ঠিক মাঝখানেই তো আমার ঘর। আমি তো শুধু তোমায় দেখতে এলাম। তোমার এই ছোট্ট বৃত্তে তুমি কত সুন্দর, সাবলীল, পরিপূর্ণ। কি মোহময়ী তুমি, তোমার ‘নিজের লোকের’ দুনিয়ায়। তোমার এই ‘আপনজন’ এর মেহফিলে আমি যে বড্ড বেমানান! “

“কি গো পোলাও কি রান্নাঘরেই থাকবে?”

পর্ণার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে বিপ্লব। নিঃশব্দে কখন যে পাশে এসে সে দাঁড়িয়েছে, পর্ণা খেয়ালই করেনি।

“না না চলো। সবার স্নান হয়ে গেছে?”

প্রসুন আর দোলনা সমস্বরে বলে ওঠে – “উই আর রেডি ফর লাঞ্চ ম্যাডাম।”

দোলনাকে পর্ণা খুব শৌখিন করে মানুষ করেছে। মার মত দোলনার সংসারটাও খুব শৌখিন। সুন্দর ছিমছাম ডিনার সেট, পরিপাটি ডিনার টেবিলের ঠিক মাঝখানে একটা দুধ সাদা ফুলদানি। আজ তাতে একগোছা গোলাপ রেখেছে দোলনা। সেন্টার টেবিলে রাখা কাটগ্লাসের ফুলদানিতে তাজা একগোছা রজনীগন্ধা রেখেছে বিপ্লব। গোলাপ আর রজনীগন্ধার গন্ধে সমস্ত ঘরটাতে ছড়িয়ে পড়েছে স্নিগ্ধতার আবেশ। যত্ন করে খাবার পরিবেশন করতে এগিয়ে এলো পর্ণা।

ছেলে তীব্র প্রতিবাদ করে বলল-

“আমি সার্ভ করব”

একটু লজ্জাই পেল পর্ণা। যতই ছেলের বাড়া হোক, জামাই পরিবেশন করবে আর পর্ণা বসে খাবে এটা যেন একটু… কোন আপত্তি শুনলনা প্রসুন। শুরু হল জমাটি খাওয়া দাওয়া। পোলাওটা এক চামচ মুখে তুলে চোখ বুজল দোলনা-

“মা, এত বছর ধরে এই এক স্বাদ কি করে ধরে রাখলে বলো তো!”

পর্ণা লজ্জা পাওয়ার ভান করলেও মনটা আনন্দে ভরে উঠল। একটু গর্বও হল বটে। বিপ্লব মৃদুস্বরে বলল-

“আমার মায়ের হাতের পোলাও তো খাসনি, তাহলে আর একথা বলতিস না।”

“বাবা, একদম বাজে বকবে না। আম্মা মোটেও ভাল রান্না করত না।”

হঠাৎ বারান্দা থেকে ডেকে উঠল পাখিটা। তার শ্রুতিমধুর কন্ঠেও প্রতিবাদের কলরোল। সেও বোধহয় মেনে নিতে পারল না বিপ্লবের মাতৃভক্তির এই হাস্যকর নিদর্শন।

“আচ্ছা পাখিটা কি আজ সারাদিন আমাদের জ্বালাবে?”

“জ্বালাচ্ছে কোথায় দোলনা! ও তো এক জায়গায় চুপ করে বসে আছে ” – পর্ণার গলায় মৃদু প্রশ্রয়।

বিপ্লবের মজার কথা, প্রসুনের সযত্ন পরিবেশন, দোলনার চেটে পুটে নেওয়া মায়ের রান্নার স্বাদ সব মিলিয়ে লাঞ্চ একদম জমজমাট। প্রচন্ড হাসি ঠাট্টা চলছে চারজনের। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে পর্ণা। এত আনন্দ বহুদিন পরে পেল সে। যতদিন মেয়েটা বাইরে আছে ততদিন থেকে এমন দিনগুলোর জন্য হাপিত্যেস করে বসে থাকে ওরা। সবাই যখন হাসতে হাসতে পাগল, পর্ণার চোখ যায় জানলার দিকে। পাখিটা জানলার কাছে এসে প্রাণপণে ডানা ঝাপটাচ্ছে। যেন আস্বাদ নিতে চাইছে ওদের ভরপুর আনন্দের।

পেটপুরে খেয়ে সবাই দিবানিদ্রায় আচ্ছন্ন। বারান্দায় এখন আর একটুও রোদ নেই। মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। একটা বই নিয়ে গিয়ে বসল পর্ণা। দু’এক লাইন পড়ার পরই পর্ণার কানে বেজে উঠল রিনিরিনে কন্ঠের সুর। পাখিটা ডাকছে। খুব মৃদুস্বরে। ভয়ে ভয়ে, পাছে কারো ঘুম ভেঙে যায়! চোখ দুটো সমূদ্রের মত গভীর। শিস দিতে দিতে এমনভাবে মাথা নাড়ছে, যেন প্রেমাস্পদের কাঁধে মাথা রেখে সমর্পণ করতে চায় তার সমস্ত অস্তিত্বটুকু। প্রথম দেখায় পাখিটাকে যত বিচ্ছিরি মনে হচ্ছিল, পাখিটা অতটা বিচ্ছিরি নয়। তেল চকচকে কালো গায়ে সরু লাল রঙা তুলির টান। গলায় উজ্জ্বল তিনটি রঙের রেখা যেন পান্না, হীরে আর চুনীর নেকলেস। লেজের পালক গুলো রেশমের মত মসৃণ, আর তাতে কত রঙের বাহার।

পায়ে পায়ে পাখিটার দিকে এগিয়ে গেল পর্ণা। ও কিন্তু একটুও ভয় পায়নি। ঠিক যে জায়গায় বসে ছিল, সেখানেই বসে আছে। পর্ণা ওর মখমলের মত মাথায় হাত রাখে। মাথা থেকে গায়ে বুলিয়ে দেয় নিবিড় আদরের স্পর্শ। পাখিটা আদুরীর মত মাথা নীচু করে নেয়। যেন লজ্জাবস্ত্রের আড়ালে, সদ্য পরানো সিঁদুরে লাল নববধু। চোখ তুলে পর্ণার দিকে তাকায় পাখিটা। সে দৃষ্টিতে কি অপরিসীম মায়া! কি রোম্যান্টিক সেই চোখ! পর্ণা মুগ্ধ হয়ে দেখে। কথা বলে পাখিটার সাথে।

আদরে আদরে ভরিয়ে দেয় তার সারা শরীর। পাখিটাও পর্ণার বুকের উপর ঝুঁকে বলতে চায়-

“আমায় চিনতে পারো! আমি তোমার নিজের কেউ না, কিন্তু আমি তোমার অনেক কিছু! চিনতে পারো আমায়!”

পর্ণা মনে মনে বলে – “পারি। তুমি আমার ইহকাল, আমার পরকাল, আমার অন্তরের অংশীদার।”

“মা!! তুমি ওই বিচ্ছিরি পাখিটার গায়ে হাত দিচ্ছ? কোন আক্কেল নেই তোমার!!”

আর্তনাদ করে ওঠে দোলনা। কুৎসিত ওই পাখিটাকে তার মায়ের মত নির্মল, পবিত্র একজন মানুষ স্পর্শ করছে! সত্যিই তো! এমন অনাসৃষ্টি কি করে মেনে নেয় সে! হ্যাঁচকা টানে মা’কে সরিয়ে আনে দোলনা। পর্ণাও ভারসাম্য হারায়। পর্ণার আদরের আবেশে পাখিটার শক্ত মুঠো বোধহয় একটু আলগা হয়ে গিয়েছিল। আচমকা তা ছেড়ে যায় বারান্দার গ্রিল থেকে।

লাট্টুর মত বন বন করে ঘুরতে ঘুরতে আঠারো তলার উপর থেকে পড়তে থাকে পাখিটা। দোলনার হাত এক ঝটকায় ছাড়িয়ে পর্ণা ছুটে যায় গ্রিলটার কাছে। নীচু হয়ে দেখে পাখিটা মিসাইলের মত মুখ গুঁজে পড়ছে আর ক্রমশ: ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে। যে ডানা দুটোয় ভর দিয়ে পাখিটা উঠে এসেছিল আঠারো তলায়, পড়ে যেতে যেতে সে ডানা দুটো তাদের বল হারিয়েছে। কালবৈশাখীর মেঘ অন্ধকারে ঢেকেছে চতুর্দিক। টিলাটার পিছন থেকে আকাশ চিড়ে বেরিয়ে এলো তীব্র বিদ্যুতের ঝলকানি। পর্ণার কানে বাজছে গগনভেদী আহবান –

‘বন্ধু ভালো থেকো -‘

চারিদিকের ইট, কাঠ, জঙ্গল, টিলা, উঁচুনীচু বাড়ি, রাস্তা সব কিছু থেকে যেন ঠিকরে আসছে এক মায়াবী শুভেচ্ছাবার্তা –

‘বন্ধু ভালো থেকো -’

অনেকটা সময় নীচে তাকিয়ে রইল পর্ণা। বুকের ভিতরটা একেবারে খালি হয়ে গেছে তার। ঘটনার আকস্মিকতায় দোলনা হতবম্ব, নির্বাক। পর্ণার দু’চোখের কোণে ঝিনুকের খোলায় লুকিয়ে রাখা দু’টুকরো মুক্তোদানা। মোবাইলে হঠাৎ মেসেজ আসার শব্দ হল। পর্ণার ঝাপসা চোখে ধরা দেয় সেই মেসেজ, যার জন্য সারাদিন অপেক্ষা করছিল সে –

‘বন্ধু ভালো থেকো। জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিও।’

Facebook Comments

comments

১ Reply to “শুভেচ্ছা // সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়”

  1. পম্পা চক্রবর্তী বলেছেন:

    অসাধারণ লেখা!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top