একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা (প্রথম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদঃবাসুদেব দাস


একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধযাত্রা‘য় প্রাত্যহিকতাকে প্রতীকরূপে রূপান্তরিত করে শৈশব স্মৃতিকে অবলম্বন করে যে শব্দ- শিল্প নির্মাণ করেছেন তার নেপথ্যে রয়েছে শৈশবের মুখোমুখি হওয়া লজ্জা, ভয়, নিরাপত্তাহীনতায় ক্ষতবিক্ষত সত্তাটি তিল তিল করে সঞ্চয় করা আত্মপ্রত্যয় এবং স্বাভিমানকে প্রকাশ করার তাড়না। এটি একটি আত্মবৃত্তান্ত মূলক দীর্ঘ কবিতা, যেখানে প্রতিটি সংবেদনশীল ব্যক্তি নিজের শৈশবের অবদমিত আত্মাকে নতুন করে আবিষ্কার করে এক বিষাদগম্ভীর আনন্দ অনুভব করতে পারে।

(নামহীন একটি গাছের মতো কোনো জঙ্গলে জন্মগ্রহণ করে জঙ্গলেই মৃত্যুবরণ করার একটি ইচ্ছার নামই আমার কাছে বন্য স্বপ্ন। যে স্বপ্ন অন্ধ। তাই আকাশ না দেখার ফলে আকাশ স্পর্শ করারও সেই জীবনের আগ্রহ নেই। কেবল কেঁচোর মতো শান্ত এক যাত্রা-অন্ধ যাত্রা। সেই যাত্রায় ভেজা এইসব শব্দ…)

আমাদের এই নায়কের নাম রাহুল। তার সঙ্গের ছেলেগুলি,যারা তার সঙ্গে স্কুলে এ্কসঙ্গে পড়াশোনা করেছিল,ভাবে-সে কীভাবে কবি হল। সেও তো আমাদের সঙ্গেই ছিল। সেও তো মাস্টারের বেতের কোপ খেয়েছিল,স্কুল থেকে পালিয়েছিল,হাইওয়ের পাশে পায়খানা করেছিল,পরের বাগানে ঢুকে কাঁচা আমের উৎকট টক, আমলকির কষা স্বাদ নিয়েছিল,মেয়ে দেখত। সেও ক্লাসে ‘নটখট তেরা লাল যশোদা নটখট তেরা লাল’ ও মুখস্থ করতে পারত না,যার জন্য তাকে সবসময় তাকে বেঞ্চির ওপরে দাঁড় করিয়ে রাখা হত (এই শাস্তিটা রাহুল অপছন্দ করত না-বেঞ্চে দাঁড়িয়ে সে জানালা দিয়ে অনেক দূর থেকে আকাশটা দেখতে পেত,পাখিগুলিকে উড়ে যেতে দেখত,গাছের শীর্ণ ডালগুলি দেখত)। তার সঙ্গদোষে আমরা যে কত মার খেয়েছিলাম-অ্যাসিস্টেন্ট হেড মাস্টারের বিচিত্র বর্ণের বেতের কোপ। বিচিত্রবর্ণের বেত নামে সেই স্কুলে একটা সাংঘাতিক বেত ছিল। সেই বিচিত্রবর্ণের কোপ খাওয়া ছাত্রটিই ছিল স্কুলের সবচেয়ে দাগী ছাত্র-যার নাম শ্রেণি থেকে শ্রেণিতে একটি বিজ্ঞপ্তি সহযোগে জানিয়ে দেওয়া হত। (বিজ্ঞপ্তিটা ছিল এই ধরনেরঃ এর দ্বারা সমূহ ছাত্র এবং শিক্ষক শিক্ষয়িত্রীদের জানানো হল যে আজ চার পিরিয়ডের পরে ষষ্ঠ শ্রেণির রমেন,রাহুল,দিগন্ত এবং ফটিককে অধ্যক্ষের ঘরে পাঁচটি করে বিচিত্রবর্ণের বেত মারা হবে।) অ্যাসিস্টেন্ট হেড মাস্টারটি -যার একটি মুদ্রাদোষ ছিল অনবরত মাথাটা কাঁধের ওপরে নড়তে থাকা, তিনি যখন ছাত্রদের বিচিত্রবর্ণের বেত দ্বারা বেত্রাঘাত করতেন তখন তার মাথাটার মহার্ঘ কম্পন কয়েকমুহূর্তের জন্য নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যেত। সেই মহান শাস্তি এবং অ্যাসিস্টেন্ট হেড মাস্টারের,যার জনপ্রিয় নাম আঁকাবাঁকা উঁচু এবং ক্ষীণ হওয়ার জন্য ‘হোকোটা’ ছিল,অহরহ কাঁপতে থাকা মাথাটার না নড়া দৃশ্য দেখার জন্য জানালার সামনে ছাত্ররা ভিড় করত। রাহুলের সঙ্গী রমেন,দিগন্ত,ফটিকরা ভাবে,সে আমাদের চেয়ে কোনদিক দিয়ে আলাদা ছিল? সেও তো বিচিত্রবর্ণের বেতের মার খেয়েছিল। সে কীভাবে কবি হল?
আর রাহুলের কাব্যজীবন আরম্ভ হয়েছিল সুড়সুড় করে সাপের গতির মতো শব্দহীন,খসে পড়া-পচা পাতার নিচে গোপনে, বিচিত্র বর্ণের আলোর ভাঁজে কলরোল থেকে ইতস্তত করে সরে যাওয়া নিঃসঙ্গ এক ভাবনায়। যেখানে তার সর্বোত্তম সঙ্গী ছিল একটা উঁইয়ের ঢিঁবি। আর সে সেখানে বসে নিঃসঙ্গতা নিয়ে বিলাপ করতে জানত না, বাঁশি বাজাতে জানতো না। কেবল নিজেকে গভীর করে তুলতে জানত। সেই উঁইয়ের ঢিঁবিটার নিচে কী ছিল সে জানত না। কিন্তু ওই ঢিঁবিটার কাছাকাছি গেলেই কী এক অজানা কারুণ্যে তার বুকের ভেতরটা মোচড় খেয়ে উঠত। প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু উঁইয়ের ঢিঁবিটা ছিল বাগানের প্রান্তে। আর উঁইয়ের ঢিঁবিটার চারপাশে ছিল বাঁশের ঝোঁপ। বাঁশগাছের ঝিরঝির খসে পড়া পাতা বাঁশের ঝোঁপে বাতাসের জন্য বিছানা পেতে রেখেছিল । কিন্তু খসে পড়া পাতা উঁইয়ের ঢিঁবির ওপরে বিছানা পাততে পারছিল না। কারণ সেটা থাকে দাঁড়িয়ে। তাতে বসা যেতে পারে, শোওয়া যায় না । সেটা যেন ছিল একমাত্র রাহুলের বিষাদ-সিংহাসন!
ভলুকা বাঁশের বিশাল ঝোপটার কাছে থাকে জাতিবাঁশের ঝোঁপটা। ভলুকা বাঁশ হল পুরুষ এবং জাতি বাঁশ হল সেই ভলুকার সুন্দরী স্ত্রী, যার আঁচল ধরে থাকে ক্ষীণ, জীর্ণ-শীর্ণ একদল ছেলে মেয়ে– বিজুলি বাঁশ।
ভলুকা বাঁশের ভয়ে বিজুলি বাঁশ প্রায়ই শান্ত হয়ে থাকে। ওরা ভলুকা বাঁশকে কেন ভয় করত? ওদের পিতা, সেইজন্য?
রাহুলরা ছিল বিজুলি বাঁশের মতো ক্ষীণ, দুর্বল। ওরা ছিল বারো জন। সাতজন মায়ের পেটের। আর বাকি পাঁচজন খুড়তুতো। কিন্তু একই আত্মা ওরা বারোজন ভাগিয়ে নিয়েছিল নিজেদের বুকে। অবশ্য রাহুলের মা এবং কাকিমার শেষের সন্তান দুটি যদিও নড়বড়ে পদক্ষেপে রাহুলদের পেছন পেছন বাগানে আসতে চেয়েছিল, ওদের আসতে দেওয়া হয়নি। কারণে অকারণে বুকের দুধ খেয়ে ওদের উচিত ছিল মায়ের কোলে থাকা।
বাগানটার মাঝখানে দুটো আনারস গাছ ছিল। তাতে বিষাক্ত সাপেরা বাস করত। সাপগুলি কোনোদিনই ওদের প্রতি অন্যায় করত না। হয়তো সাপগুলি ওদের ছোট্ট শরীরকে করুণা করত কিংবা ওরা জানত এই ছেলেমেয়েগুলির প্রতি অন্যায় করে কোনো লাভ নাই, কারণ ওদের দাদু সাপের মন্ত্র জানত। সেই অঞ্চলের সমস্ত সাপে কামড়ানো মানুষকে দাদু সুস্থ করে তুলত। যে দুই একজনের কখনও মৃত্যু হত, দাদু বলত–’ওদেরকে কালে দংশন করেছে।’

(২)

একবার রাহুলের জন্যই একটা সাপকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হল। একনাগারে চার দিন বৃষ্টি হয়ে থাকার জন্য ওরা বাগানে যেতে পারছিল না। চারদিন উঁইয়ের ঢিঁবির সিংহাসনটা শূন্য হয়ে পড়েছিল। চার দিনের পরে সেদিন রোদ উঠেছে। রাহুলরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
চার দিন আগে পেয়ারা গাছে ছেড়ে আসা সেই কাঁচা পেয়ারাগুলি বোধ হয় ইতিমধ্যে পেঁকে গেছে। চোখে অজস্র পেয়ারার স্বপ্ন নিয়ে প্রত্যেকেই বাগানের দিকে দৌড়ে গেল। অবশ্য পা টিপে টিপে। কারণ বাগানটা পিছল ছিল। এই পিচ্ছলতার সঙ্গে ওদের বিশেষ পরিচয় ছিল না। ওরা কেবল জানত পাকা কলাগুলি পিছল, পাকা কাঁঠালগুলি পিছল,ভূবিগুলি পিছল,কুম্ভজলৌকাগুলি পিছল, বৃষ্টির পরে বাগানটা পিছল। পা টিপে টিপে ওরা চিৎকার করে ছন্দে ছন্দে দৌড়ে গেল।
কিন্তু ওটা কি? একটা কালো সাইকেলের টায়ার রাস্তার মাঝখানে পড়ে রয়েছে।
রাহুল থেকে মাত্র দুই ফুট দূরে কালো টায়ারটা যখন ফণা তোলে ওদের রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়াল, তখন তাদের সম্বিত ফিরে এল। ওদের চিৎকার আর্তনাদ হয়ে পড়ল। রাহুল চিৎকার করল–’টায়ার নয়। ওটা বিষাক্ত সাপ। পালা।’
প্রত্যেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় লাগাল। কেবল রাহুল একবার পেছনে তাকিয়ে দেখল সাপটা আনারসের ঝোপের কাছে একটি গর্ত দিয়ে ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে। ওদের চোখ থেকে পেয়ারাগুলি কুড়িয়ে নিতে না পারার মতো জায়গায় গিয়ে খসে পড়ল।
রাহুলদের পিতা দাড়ি কাটার সরঞ্জামটুকু এনে বারান্দার বেঞ্চে রেখেছিল মাত্র। প্রত্যেকেই দৌড়ে এসে যখন টায়ারটার কথা বলল, মানুষটা ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল। তিনি ভাবলেন, এরা ছোট এবং সারাটা দিন বাগানে ঘোরাফেরা করে বলে সাপের পরিচিত। তাই বিষাক্ত সাপটা ওদের ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সাপ কি তাকে চেনে? সে তো মরতেও সেই বাগানে যায় না। সম্বন্ধে ওদের পিতা বলে সাপ তাকে কীভাবে চিনবে?
রাহুলদের পিতা সত্যিই এরকম ভেবেছিল কি?
অবশ্য ভয় মানুষকে সন্দিহান করে তোলে, আর সন্দেহ মানুষকে কুটিল করে ফেলে। যাই হোক না কেন, বাবা সাপটা মারার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল। কারণ সাপকে বিশ্বাস করা যায় না।
তিনি উদ্যোগ নিলেন। গজেন্দ্রনাথের চাকর বাহিনীকে ডাকলেন। গজেন্দ্রনাথ মানে রাহুলের দাদু। চাকর বাহিনী মানে গজেন্দ্রনাথের বিখ্যাত বেলের নিচের চায়ের দোকানে কাজ করা ছেলেগুলি। (এই বাহিনীটা রাহুলদের মতো ক্ষীণ, দুর্বল ছিল না। ওরা বরফির গুড়ো খেয়ে শক্ত হয়েছিল।) ফিনাইলের বোতল এবং হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে বাহিনী এগিয়ে গেল । রাহুল গর্তটা দেখিয়ে দিল। পিতার নির্দেশে একটা চাকর গর্তটিতে অনেকটা ফিনাইল ঢেলে দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সাপটা বেরিয়ে এল। ফণা তুলল না। সে নিশ্চয় তার নিশ্চিত মৃত্যুর কথা বুঝতে পেরেছিল। আর সেই বাহিনীটা ঘিরে ধরে সাপটাকে কুপিয়ে কুপিয়ে, খুঁচিয়ে মেরে ফেলল। সাপটার মাপ নেওয়া হল। বাবার হাতের স্কেল দিয়ে মাপ নিয়ে দেখা গেল সাড়ে ছয় ফুট। সেই সাপটা কারও কাল হতে পারল না।
রাহুল হয়েছিল সেই সাপটার কাল।
রাহুল না রাহুলের পিতা? কে ছিল সেই সাপটার কাল?
অবশ্য সেই বিষাক্ত সাপটাকে মারার সমস্ত গৌরব রাহুলের পিতা কেড়ে নিয়েছিল। ভেতরে ভেতরে হতাশ হয়ে পড়েছিল রাহুল। কারণ সে যদি সাপের গর্তটা দেখিয়ে না দিত তাহলে বাবা কীভাবে খুঁজে বের করতেন সাপটাকে? এখন সাপটিকে মারার সমস্ত গৌরবে অর্থাৎ সাহস নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিদীপ্ততায় ফুলে উঠল পিতা এবং রাহুল অবহেলিত হল উপেক্ষিত নায়কের মতো।
আরও অনেক সাপ ছিল সাপের মন্ত্র জানা গজেন্দ্রনাথের বাড়ি এবং বাগানের বিশাল সীমানার মধ্যে। কখন ও রাহুলদের উঠোন দিয়ে তীব্রবেগে পার হয়ে যেত শঙ্খচূড়। কখন ও বারান্দায় বিমর্ষভাবে পড়ে থাকত পাকানো বিষাক্ত সাপ। চিকাতো যেখানে সেখানে থাকেই। গোয়ালারা থাকে গোয়াল ঘরের বারান্দায়। আর গিরগিটিগুলি বাঁশের বেড়ার বর্গক্ষেত্রগুলির মাঝেমধ্যে ঘন ঘন আসা যাওয়া করত। রাহুলদের এক ডজন ভাই-বোন, তারই তিনজনের অনেক আগেই মৃত্যু হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ওরা ছিল নয় জন, কিন্তু ওরা ভাবত এক ডজন। সেই মৃত তিনজনকেও ওরা খেলার সঙ্গী করে নিয়েছিল। ওদের জন্য পেয়ারা পাড়ত আর সেগুলি ওদের নামে জলের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিত। এতটাই স্নেহ- ভালোবাসার বন‍্য জগতে বাস করত ওরা।
সেই গিরগিটিগুলি–রাহুলদের এক ডজন ভাই বোন, যারা গরমের দিনে খালি গায়ে থাকে এবং ওদের নাভিগুলি বেরিয়ে থাকে–সেই নাভিগুলি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে রক্তশুষে নিতে চেষ্টা করত। গিরগিটি দেখলেই ওরা নিজের নিজের থুথু আঙ্গুলে নিয়ে নাভিতে লাগিয়ে গিরগিটির রক্ত শোষার রাস্তাটা বন্ধ করে দিত। ওরা ভাবত গিরগিটি নাভির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রক্ত শোষে, যার জন্য গিরগিটির মাথাটা লাল হয়ে যায় এবং যার রক্ত শোষে সে রক্তহীন হয়ে মৃত্যুবরণ করে!
রাহুল একটা বাঁশের কঞ্চি ভেঙ্গে কটারি দিয়ে সুন্দর করে চেঁছে সাপ মারার অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছিল। আর সেই গিরগিটি দেখলে যদি কখন গেঞ্জি পরে থাকে– গেঞ্জিটা তুলে নাভি থেকে রক্ত চুষতে দিত। অস্ত্র দিয়ে গিরগিটিটার মাথায় আঘাত করে মেরে ফেলত। গিরগিটি মারাটা রাহুলের কাছে ছিল সাধারণ ব্যাপার।
ধীরে ধীরে রাহুল কার্শলা সাপ মারতে পারা, চিকামারলি সাপ মারতে পারার মতো হল। চালের সিলিংয়ে ঘুরে বেড়ানো চক্রগোম সাপ মারতে পারার মতো হল। শঙ্খচূড় সাপকে তেড়ে যাবার মতো হল। ধীরে ধীরে রাহুল সাপের তুখোড় হত্যাকারী হয়ে উঠল। সাপ দেখলেই রাহুল থাকতে পারত না। তার আঙ্গুলের গাঁটগুলিতে কিলবিল করে উঠত হিংস্রতা। আর সে ভেবেছিল,কখনও যদি তাকে সাপে কামড়ায়ও,তার দাদু তাকে সুস্থ করে তুলবে। তাই তার সাহস দ্বিগুণ বেড়ে গেল। তার ভয় হত কেবল আনারসের ঝোপে বাস করা বিষাক্ত সাপগুলিকে,কারণ বাবা বলেছিল,বিষাক্ত সাপে কামড়ালে গজেন্দ্রনাথ ভালো করতে পারে না।
রাহুলের এভাবে সাপ মারার কথাটা যেদিন তার দাদু গজেন্দ্রনাথ জানতে পারলেন, তিনি কথাটাকে সহজভাবে নিলেন না। কারণ গজেন্দ্রনাথের বাড়িতে সাপ মারা নিষেধ। বাড়িতে নাগপঞ্চমীর দিন সাপের পুজো হত। গজেন্দ্রনাথ যে কেবল সাপে কামড়ানো মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারত তাই নয়, তিনি সাপ ধরার মন্ত্রও জানতেন। ইচ্ছা করলে গজেন্দ্রনাথ পৃ্থিবীর সমস্ত সাপ ধরে ফেলতে পারেন। তিনি যদি সাপ ধরা মন্ত্র পড়ে কোনো সাপ ধরতে চান, সেই সাপ যেখানে আছে সেখান থেকে সুড়সুড় করে গজেন্দ্রনাথের কাছে চলে আসবে আর গজেন্দ্রনাথের সামনে থাকা দুধের বাটিতে মুখ দেবে আর জড়োসড়ো হয়ে নম্রভাবে গজেন্দ্রনাথের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় পড়ে থাকবে। গজেন্দ্রনাথ নাকি জীবনে একবার মাত্র সেই মন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন,মন্ত্রের প্রমাণ দেখার জন্য। সাধারণ বৈ্দ্যের মতো সেই মন্ত্র যেখানে সেখানে ব্যবহার করে তিনি চমক সৃষ্টি করতেন না। কারণ তিনি ওঝা ছিলেন না,তাকে মানুষ ‘ঠাকুর’ বলে ডাকত আর ঠাকুর মানে ঈশ্বর।
রাহুলের সাপ মারার এই কু-অভ্যাস বন্ধ করার জন্য দাদু একদিন নয় বছরের রাহুলকে সাপের মন্ত্র শিখিয়ে দিল। তাকে বলা হল, এখন থেকে সে আর কোনোদিন সাপ মারতে পারবে না। কখনও যদি স্বয়ং সাপের ওঝাকে সাপে কামড়ায়,তাহলে তাকে আর পৃথিবীর কেউ ভালো করতে পারবে না। তার শবটা ভেলায় তুলে নদীতে ভাসিয়ে দিলেও পৃথিবীর কোনো ওঝা তাকে বাঁচাতে পারবে না। তাই রাহুল,সাপ থেকে সাবধান।
রাহুল সাপমারা অস্ত্রটি একেবারে ছুঁড়ে ফেলে দিল না। গোয়ালের সিলিং এর উপরে রেখে দিল। রাহুল সামান্য গম্ভীর হল। সে এখন সাপে কামড়ানো মানুষকে ভাল করতে পারে। তার দুপাশে দুটি পাখা গজিয়ে উঠল। নিজেকে এক অলৌকিক শক্তির সত্তার অধিকারী বলে মনে করলো। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে তার অলৌকিক শক্তিকে। কে বিশ্বাস করবে সে একজন ওঝা।
সাপে কামড়ানো মানুষকে ভাল করার জন্য সবাই দাদুর কাছে আসে। দাদু কখনও রাহুলকে আঙ্গুল দেখিয়ে লোকদের বলে – `ওকে বল, ও সাপের মন্ত্র জানে।’
মন্ত্রটা ছিল চমৎকার। সম্মাননা দেওয়া নিষেধ। যাকে সাপে কামড়েছে তার আসার প্রয়োজন নেই। তাকে স্বচক্ষে দেখা মানুষ এসে গজেন্দ্রনাথের কাছে বলতে হয় যে অমুকের সাপে কামড়েছে। এই সাপে কামড়েছে শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে গজেন্দ্রনাথ নিঃশ্বাস বন্ধ করে মন্ত্র পড়ে সাপের বিষটুকু নিজের শরীরে নিয়ে আসে হয় তারপর পুনরায় একবার মন্ত্র পড়ে গালটা মুছে নিজের গালে টেনে নেওয়া বিষটুকু নিঃশেষ করে ফেলে। কিছু সাপে কামড়ালে কিন্তু মানুষকে এই সাধারণ পদ্ধতিতে ভাল করা যায় না। সেরকম ক্ষেত্রে তাকে বিষ ঢেঁকিয়া দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঝাঁড়তে হয়। এভাবে ঝাড়লে সবুজ বিষ ঢেঁকিয়াগুলি বিষে কালো হয়ে যায়।
জীবনে মাত্র দুবার তার মন্ত্র প্রয়োগ করার সুবিধা পেয়েছিল, দাদু বাড়িতে ছিল না বলে সে সেই সুযোগ পেয়েছিল। রাহুল নিঃশ্বাস বন্ধ করে মন্ত্র পড়েছিল, কিন্তু সে অনুভব করতে পারেনি সত্যিই তার গায়ে সাপে কামড়ানো মানুষটির শরীর থেকে বিষ এসেছিল কিনা। মন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী একটা গাল মুছে সে তার শরীর থেকে সাপের বিষ নাই করেছিল ।
গ্রাহক না থাকা দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো রাহুলেরও এই মানব সেবা বন্ধ হয়ে গেল। সেই মন্ত্রের প্রতি তার আস্থা কমে আসতে লাগল। আর একদিন সে পুনরায় একটি চিকা মারলি সাপ মেরে ফেলল।
দাদু তাকে বলল,’তোর সাপের মন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে মন্ত্রটি একটি বাঁশের পাতায় লিখে নদীতে ভাসিয়ে দে।’
রাহুল একটি বাঁশের পাতায় মন্ত্রটি লিখল এবং সাইকেল চালিয়ে পহুমারা নদীর কাছে পৌঁছাল। জলে নেমে বাঁশের পাতাটা ধীরে ধীরে জলে ভাসিয়ে দিল সে।
কাঁপতে কাঁপতে সরে যাওয়া পাতাটার দিকে তাকিয়ে রাহুল ফুঁপিয়ে উঠল‐- সে কেন মন্ত্রটা বিশ্বাস করতে পারল না। সে কেন সাপ মারা ছাড়তে পারে না। কোন জন্মে সাপ তার প্রতি অন্যায় করেছিল…?

[সাম্প্রতিক অসমের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত কবি নীলিম কুমার ১৯৬১ সনে অসমের পাঠশালায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় চিকিৎসক। প্রকাশিত গ্রন্থ অচিনার অসুখ,, স্বপ্নর রেলগাড়ি,জোনাক ভালপোয়া তিরোতাজনী’ , নীলিম কুমারের শ্রেষ্ঠ কবিতাইত্যাদি। আজ পর্যন্ত হাজারেরও বেশি কবিতা লিখেছেন। জীবনের ৩৫ বছরেরও অধিককাল কবিতা লেখার সঙ্গে জড়িত থেকে অসমিয়া কাব্য সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধ করাই নয়, নতুনত্বও প্রদান করেছেন। আধুনিক জীবনের জটিলতাকে সহজ-সরল ভাবে প্রকাশ করে তিনি অসমিয়া কবিতায় শব্দচয়নে চমৎকারিত্ব এবং বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচয় দান করেছেন। সুন্দর ব্যঞ্জনা, কম কথার মধ্য দিয়ে অনেক না বলা কথার আভাস, কাহিনি ধর্মী কথন কৌশল, অর্থের গভীরতা, আবেগময় অথচ নিরলঙ্কার ভাষা, গভীর আত্মজিজ্ঞাসা নীলিম কুমারের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লোক জীবন থেকে কুড়িয়ে নেওয়া উপাদানসমূহের যথোচিত উপস্থাপনা নীলিমের কবিতাকে একটি ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। নীলিমের কবিতা বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুথির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা চব্বিশ।]

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top