কালের সন্ততিঃমানবিক ইতিবৃত্তের দলিল (পর্ব-২) ।। এদুয়ার্দু গ্যালিয়ানো ।। অনুবাদ- মুহম্মদ রফিকুল ইসলাম

এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো (১৯৪০-২০১৫) উরুগুয়ের প্রখ্যাত লেখক কবি ও সাংবাদিক। লাতিন আমেরিকার এই লেখকের মন-প্রাণ জুড়ে রয়েছে অফুরান ভালোবাসা ও বিস্ময়। ভালোবাসা মানুষের প্রতি আর বিস্ময় জীবনের। জীবনকেও ভালোবেসেছেন অন্তহীন কৌতূহলে, আনন্দে আর নিবেদনে। দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে মানুষের জন্য মানবতার জন্য নিবেদিত হয়েছে তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম, বক্তৃতা-ভাষণ, আন্দোলন প্রতিবাদ। নির্বাসনে থেকেছেন, মৃত্যুর পরোয়ানা পেয়েছেন একাধিকবার তবু থেমে যায়নি অদম্য এই প্রাণ ।

লাতিন আমেরিকার ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ নিয়ে লিখেছেন ‘ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা’। তিনখন্ডে লিখিত মেমোরি অব ফায়ার’ আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসী জীবন ও সংগ্রামের প্রাণবন্ত ইতিহাস। শিল্প-সাহিত্য ইতিহাস যুদ্ধ প্রতিরোধ স্বৈরশাসন বর্ণবাদ নারী-স্বাধীনতা প্রভৃতির অনবদ্য কাব্যিক উপস্থাপন তাঁর ‘ মিরর’ ও ‘চিলড্রেন অব দ্য ডেজ’ বই দুটি।

‘চিলড্রেন অব দ্য ডেজ’ ৩৬৫ দিনের দিনলিপি। জগতের কত অদ্ভূত ইতিহাসের কত অনন্য বিষয় নিয়েই-না তিনি লিখেছেন কিন্তু কী আশ্চর্য সবকিছুই মনে হয় আজকের – এই সময়ের – এই জীবনের আর কাঙ্ক্ষিত বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিবাদের।

– মুহম্মদ রফিকুল ইসলাম

———
ফেব্রুয়ারি ১
আমার এই দেহখানি

১৬৮৯ সালে ব্লাস ডি লেজো স্পেনের গিপুসকোয়া প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। ‘স্প্যানিশ আর্মাদা’র এই এডমিরাল পেরুর সমুদ্র সৈকত থেকে ইংরেজ জলদস্যুদের বিতাড়িত করেন, জেনোয়ার মত শক্তিশালী শহরের নিয়ন্ত্রণ নেন, আলজেরিয়ার ওরান ও কলোম্বিয়ার কার্টেজেনায় শত্রুদের নাজেহাল পর্যুদস্ত করে দেন। বিশাল ব্রিটিশ বহরের বিপরীতে গুটিকয় যুদ্ধজাহাজ নিয়ে অমিত বিক্রমে তিনি লড়াই করে যান। তাঁর প্রধান হাতিয়ার দুর্নিবার সাহস আর অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্র কৌশল।
জীবনে পর পর বাইশ বার অসম যুদ্ধে শত্রুর মোকাবেলা করেন তিনি। কামানের গোলায় কোনো এক যুদ্ধে তাঁর এক পা উড়ে যায়। অন্য যুদ্ধে স্প্রিন্টারের আঘাতে এক চোখ উপড়ে পড়ে, ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বাম হাতের পুরোটাই প্রতিরোধের অদম্য কোনো এক যুদ্ধে।
ইংরেজদের চোখে তিনি এক বিস্ময়কর ‘অর্ধ-মানব’!
————

ফেব্রুয়ারি ২
কৃতদাসের আপন দেবী: উদযাপিত উদ্ভাসিত

লাতিন আমেরিকার উপকূলবর্তী জনগোষ্ঠী এই দিনে মহা আড়ম্বরে দেবী ‘ইয়েমানযা’র পূজা করেন।
সে অনেককাল আগে, আজকের এই রাতে, ফেনীল সমুদ্র থেকে উঠে এসে করুণার হাত বাড়িয়ে দেন মৎস্যদেবী ‘ইয়েমানযা’ । তিনি দাস ব্যবসায়ীদের জাহাজে জাহাজে সুদূর আফ্রিকা থেকে আমেরিকার উপকূলে এসে পৌঁছেন । সাগরের অন্তহীন ঢেউ তাঁর জন্য বয়ে আনে নাবিকের অবাধ প্রেম ও ভয়ের অঞ্জলি – চুলের চিরুনী ব্রাশ সুগন্ধি কেক ক্যান্ডি আরো কত কী! আরো কত কী!
আফ্রিকান ‘অলিম্পাস’ থেকে নেমে আসা দেবীর আত্মীয় পরিজনও আজ পূজার অর্ঘ্য পায়।
দেবীর আফ্রিকান নন্দীভৃঙ্গী যত:
জ্যাংগো – পুত্র, বৃষ্টির দেবতা; স্বর্গ থেকে বৃষ্টি আনেন শুস্ক ধরায়।
অক্সিমারে -রামধনু, অগ্নিকে যে প্রতিহত করেন অবলীলায়।
ওগান – অস্ত্র নির্মাতা ও যোদ্ধা – দুষ্টের চূড়ামণি, রমনীমোহন।
ওশান – প্রেমিকা, নদীই যাঁর স্থায়ী শয্যা; ভাগ্যদেবী।
এবং
এক্সুউ – একাধারে নরকের শয়তান ও নাজারাথের যিশু!
————

ফেব্রুয়ারি ৩
উড্ডীন উৎসব

১৮৯৯ সালের ‘রিও ডি জেনেরিও’ কার্নিভাল শুরু হয় ‘ Ô Abre Alas! ‘ গানের তালে উদ্দাম ধুন্ধুমার যুগল নাচের মধ্য দিয়ে। এই দুর্দান্ত দুর্বিনীত তাইরে নাইরে নাচ সাহেব সুবোদের গৎবাঁধা ‘বল’ নাচের ব্রাজিলীয় জবাব। ‘শিগিনিয়া গনজাগা’, উদাত্ত সেই গানের গীতিকার। শৈশব থেকেই তিনি গান লেখেন, সুর করেন।
মাত্র ষোল বছর বয়সে বাবা-মা তাঁর বিয়ে দেন। গান তবু চলতেই থাকে। আর বিয়ের চার বছর পর স্বামীর রুদ্রমূর্তি, ‘হয় গান ছাড়বে, না-হয় সংসার।’ তাঁর নির্বিকার বলিষ্ঠ উত্তর, ‘গান ছাড়া জীবন আমি একমুহুর্তও ভাবতে পারি না; আমি চললাম, রইলো তোমার সংসার – সামলাও!’
রাগে অগ্নিশর্মা বাবা বংশগৌরব ধূলিসাৎ করার অভিযোগ এনে বললেন, ‘ শিগিনিয়ার রক্তে যে-পাপ যে-বেলাল্লাপনা, তা ওর নিগ্রো ঠাকু’মা থেকেই পেয়েছে! আমি ত্যাজ্য করলাম এই কুলাঙ্গার মেয়েকে, আর আমার সামনে এ বাড়িতে ওর নাম যেন কেউ উচ্চারণ না করে।’
আজ শুধু সে-বাড়িতেই নয়, সারা দুনিয়ায় তাঁর নাম ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, হাওয়ায় হাওয়ায় গানে গানে।
————

ফেব্রুয়ারি ৪
বৃহৎ হুমকি

তাঁর নাম হুয়ানা আগুইলার, লোকে বলতো ‘বড় ইয়ে’ হুয়ানা। তাঁর ভগাঙ্কুরের বেমক্কা আকৃতি নিয়ে লোকে নানা কথা বলতো। তাই এই নাম।
আকারের এই গর্হিত বাহুল্য নিয়ে পুণ্যাত্মা বিচারকগণ একের পর এক অভিযোগ পাচ্ছিলেন। ১৮০৩ সালে গুয়েতেমালার রাজকীয় শুনানি পরিষদ বিষয়টি তদন্ত করার জন্য সার্জন নার্সিসো এস্পারাগোসাকে নিযুক্ত করে।
শারীরবিদ্যা বিশেষজ্ঞ এই ভদ্রলোক আশঙ্কা প্রকাশ করেন – বিশেষ প্রত্যঙ্গের মাত্রাধিক এই বৃদ্ধি সত্যিই ভয়াবহ, বিপদজনক। যুক্তি দেখান – মিশরসহ প্রাচ্যের দেশগুলোতে একে অপরাধ হিসেবেই ধরা হয়। আর শেষপর্যন্ত স্বাভাবিক আকার ছাপিয়ে যাওয়ার কারণে অভাগিনী হুয়ানাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়!
————

ফেব্রুয়ারি ৫
দ্বৈত সিম্ফনি

গিটার ও ‘ভায়োলেত্তা পাররা’ -অন্তরঙ্গ দোসর – বেড়ে উঠেছে এক সাথে।
কেউ একজন ডাকলে অন্যে সাড়া দেয়, বেজে উঠে নিমিষেই।
এক সাথে হাসে, কাঁদে – যুগল গেয়ে উঠে তাঁরা আনন্দে বিষাদে – অভিন্ন বিশ্বাসে।
গিটারের বুকে ছিল অতল গহ্বর, তাঁর বুকেও!
১৯৬৭ সাল। আজ এই দিনে গিটার আকুল ডেকে উঠে; ভায়োলেত্তা নিঃসাড় নিস্পন্দ।
দ্বৈত সঙ্গীত আর বাজেনি অপার্থিব রাগে, কখনোই!
————

ফেব্রুয়ারি ৬
উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল

হতদরিদ্র পরিবারে বব মার্লের জন্ম, শৈশব কেটেছে দারিদ্রে, অনিশ্চয়তায়। প্রথম দিকে, গান রেকর্ডের দিনগুলোতেও স্টুডিওর মেঝেতেই ঘুমাতে হয়েছে তাঁকে – নিরুপায় নিঃসম্বল।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রভূত যশ ও অর্থের মালিক হন বব। নরম তুলতুলে পালকের বিছানায় ঘুমান, ঘনিষ্ঠ সময় কাটান সুন্দরীশ্রেষ্ঠ ‘মিস ওয়ার্ল্ড’দের সাথে, সারা পৃথিবী চষে বেড়ান আড়ম্বরে আয়েসে।
কিন্তু মুহুর্তের জন্যেও মনে হয়নি স্বাচ্ছন্দ্যের এই জীবনই তাঁর সব। সব তাঁর একার বা তিনিই সব।
তাঁর কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে দূর অতীতের জীবন-গাঁথা, কৃতদাস ভাইদের সংগ্রাম ও ক্ষোভের কথা, দুইশো বছরের পরাধীনতার ভাষা ও সুর – উচ্চরবে আর্তনাদে।
————

ফেব্রুয়ারি ৭
কথাগ্নি

ভার্জিনিয়ার ফরেস্ট রেঞ্জার রয় সালিভান ১৯১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর ৭০ বছরের জীবনে তিনি ৭ বার বজ্রপাতের মুখোমুখি হন ও বিস্ময়করভাবে বেঁচে যান।
২৯৪২ সালে বজ্রপাত তাঁর পায়ের নখ উপড়ে নেয়।
১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় বজ্রপাত তাঁর চোখের পাপড়ি পুড়িয়ে দেয়।
১৯৭০ সালের বজ্র তাঁর কাঁধ ঝলসে দেয়।
১৯৭২ সালে হঠাৎ আলোর ঝলকানি তাঁর মাথার সব চুল কেড়ে নেয়।
১৯৭৩ সালে আসমানী আগুন তাঁর পা জ্বালিয়ে দেয়।
১৯৭৬ সালে স্বর্গীয় বজ্র তাঁর হাঁটুর গর্তে আশ্রয় নেয়।
১৯৭৭ সালে ৭ম বজ্র তাঁর বুকে কালো রেখা এঁকে দেয়।
কিন্তু ১৯৮৩ সালের যে বজ্রাঘাত তাঁর মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়, তা আকাশ থেকে আসেনি।
এসেছে এক নারীর ‘কথা’ থেকে।
বজ্রপাতের থেকেও ঢের শক্তিশালী!
————

ফেব্রুয়ারি ৮
আবেগঘন আপামর চুম্বন

১৯৮০ সালের এই দিনে ব্রাজিলের সরোকাবা শহরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়।
স্বৈরশাসকের আজ্ঞাবহ মহামান্য আদালত জনসাধারণের নৈতিক চরিত্র রক্ষার্থে জনসমক্ষে চুম্বন নিষিদ্ধ করেন। বিজ্ঞ জজ ম্যানুয়েল মোরালস তাঁর রায়ে এই নিষেধ অমান্যকারীদের জেল জরিমানা র ব্যবস্থা রাখেন। রায়ে তিনি উল্লেখ করেন,
‘কিছু চুম্বন খুবই উত্তেজক তাই তা নিষিদ্ধ হওয়া উচিৎ, যেমন ঘারের পিঠে বা গোপন প্রত্যঙ্গে আবেগঘন আদরসর্বস্ব চুম্বন। কিংবা সিনেমাটিক চুম্বন যাতে ঠোঁট কামনায় ভিজে ওঠে।’
মানুষ খুব দ্রুতই এই নিষেধাজ্ঞায় সাড়া দেন। শহরে এর আগে এত চুম্বনের ছড়াছড়ি কেউ কখনো দেখেনি। নিষিদ্ধ বলেই অনেকে এই উত্তেজক চুম্বনের স্বাদ নিতে চাইছিলেন।
সরোকাবা তাই গণচুম্বনের শহরে হয়ে ওঠে।
————

ফেব্রুয়ারি ৯
তুমি সুন্দর তাই

গ্রীক ভাস্কর্যের ইতিহাসে আফ্রোদিতিই প্রথম নারী ন্যূড মডেল।
প্রাক্সিটেলিস নিপুণ গড়ে তোলেন তাঁকে অনিন্দ্য সুষমায়। একখণ্ড সূক্ষ্ম মোলায়েম বস্ত্র শুধু কাঁধ থেকে আলতো গড়িয়ে পায়ের উপর পড়ছে। ‘কস’ নগরী দেবীকে এভাবেই সাজিয়েছিল। অন্য নগর ‘সিনিডাস’ তাঁকে জাঁকালো এক মন্দির উপহার দিল।
দেবীদের মধ্যে সেরা মানবী, মানবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দেবী সেদিন থেকে মন্দিরে অধিষ্ঠিত হলেন। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। দলে দলে হাজারে হাজারে মানুষ আসে তাঁকে একনজর দেখতে, তৃষ্ণা মেটাতে।
আজকের মতো কোনো একদিন দেবী তাই পালিয়ে বাঁচেন।
তাঁকে আর দেখা যায়নি!
————
ফেব্রুয়ারি ১০
সভ্যতার উল্লাস!

উরুগুয়ে নদীর উজানে উত্তরের এক জনপদে এই ঘটনার শুরু ও শেষ।
স্পেনের রাজা তাঁর শ্বশুর পুর্তগালের রাজাকে উপঢৌকন পাঠালেন জেস্যুইট পাদ্রীদের সাতটি প্রদেশ। রাজকীয় উপহারে আরো ছিল তিরিশ হাজার ‘গুয়ারানি’ আদিবাসীর বিশাল বহর। এই ভূমি আর জনতা ছিল মিলেমিশে একসাথে – একাত্ম অভিন্নহৃদয় । আদিবাসী ‘গুয়ারানি’ জনতা সভ্য রাজরাজড়াদের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করলেন আর মানবিক সমর্থনে তাঁদের পাশে দাঁড়ালেন সহৃদয় পাদ্রীরা। অসভ্য বর্বরদের সহযোগিতা করার অপরাধে জেস্যুইট ফাদারদের দেওয়া হল নির্বাসন- সুদূর ইউরোপে – আদি ভূমিতে।
১৭৫৬ সালের এই দিনে বীরবিক্রমে বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করা হয়। এবং যথারীতি স্পেনিয়ার্ড পুর্তগীজ সম্মিলিত বাহিনীই বিজয় উল্লাস করে। উল্লাসে নাচে চার হাজার সৈন্য, তাঁদের অশ্ব, কামান, ভূমিদস্যু, দাসব্যবসায়ী আর যত সুবিধাভোগীর দল।
মহাসমরের পরিসংখ্যানও তাঁদের এই জান্তব উল্লাসে নাচে বন্য হিংস্রতায় –
পুর্তগীজ হত: ১
স্প্যানিয়ার্ড নিহত: ৩
আদিবাসী মৃত: ১৭২৩ মাত্র।
————

ফেব্রুয়ারি ১১
বেদনা মধুর হল

১৯৬২ সালের শুরুতে এক অজ্ঞাত অখ্যাত ব্যান্ডদল আসে লন্ডনে। কোনো এক রেকর্ড কোম্পানিতে অডিশন দিতে। দু’টি গিটার, বেস আর ড্রামস থরো থরো বেজে ওঠে ভালোবাসায় নিষ্ঠায়।
পরদিন, আবেগ দীপ্ত তরুণেরা ফিরে যায় লিভারপুলে, তাঁদের আস্তানায়; আর অপেক্ষা করে লন্ডনের আমন্ত্রণের।
দিন যায়, মাস যায়, প্রতীক্ষার প্রহর তবু ফুরায় না। অবশেষে প্রত্যাশার ক্লাইমেক্সে আসে উত্তর।
ডেকা রেকুর্ডিং কোম্পানি লিখে পাঠায়, ‘ কিছু মনে করবেন না, খোলাখুলিই বলছি – আপনাদের সঙ্গীত আমাদের ভালো লাগে নি।’
গিটার হাতে তাঁরা আবারো বেড়িয়ে পরে, দূরে – আরো দূরে – অপার্থিব সুরের খোঁজে।
বিটলস সেদিন থেমে যায়নি!
————

ফেব্রুয়ারি ১২
শিক্ষা

সিচুয়ান প্রদেশের চ্যাংদু রেলওয়ে স্টেশন। কয়েকশত চিনা রমনী ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসছেন।
সবার পরনে আনকোরা নতুন এপ্রোন।
সবাই পরিপাটি গোছানো উজ্জ্বল।
সবার একিই পরিচয় সদ্য প্রসূত মা।
তাঁরা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন, গন্তব্য বেইজিং, সেখানে অন্যের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন।
এইসব দুগ্ধবতী মনুষ্য ‘গাভী’ সেখানে ভালো খাবেন, ভালো থাকবেন, ভালো মজুরিও পাবেন।
কিন্তু বেইজিং থেকে দূরে সিচুয়ান প্রদেশের গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে তাঁদের নিজের সন্তান মায়ের দুধ খাবে না, খাবে ‘মিল্ক পাউডার’।
মায়েদের সবার কথা, ‘ আমরা তো সন্তানের জন্যেই করছি, না-হলে ওর পড়ালেখা – স্কুলের খরচ আসবে কোত্থেকে!’
————

ফেব্রুয়ারি ১৩
নব্য দেবতার গ্রাস

২০০৮ সালের এইদিনে মেক্সিকো সিটির অদূরে ‘গুয়াদালাহারা’ শহরে খেলে বেড়াচ্ছিল এক ফুটফুটে প্রাণবন্ত শিশু – মিগুয়েল লোপাজ রোচা।
হ্ঠাৎ সে পা ফসকে পড়ে যায় সান্তিয়াগো নদীর গহ্বরে।
আট বছরের তরতাজা মিগুয়েল!
সে ডুবে মরে নি।
তাকে বিষ দিয়ে মারা হয়!
নদীর পানিতে ছিল আর্সেনিক, সালফিউরিক এসিড, মারকারি, ক্রোমিয়াম, সীসাসহ অন্য ধাতব তরল বিষ।
এইসব বিষাক্ত নির্যাস নিজের দেশে নিষিদ্ধ বলে এভেন্টিস বেয়ার নেসলে আইবিএম ডুপন্ট জেরক্স ইউনাইটেড প্লাস্টিকস সেলানিস প্রভৃতি কোম্পানি সান্তিয়াগোর জলেই বিসর্জন দিচ্ছিল তাদের উৎপাদনের উদবৃত্ত।
————

ফেব্রুয়ারি ১৪
গনিমতের সন্তান

আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসনের সময় যুদ্ধে, শত্রুর সন্তান গনিমতের মাল হিসেবে বিবেচিত হত। এই সেদিনও পাঁচ শতাধিক শিশু চুরি যায় এভাবে।
নজির আরো আছে, আরো দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে গণতান্ত্রিকভাবে – সভ্য সমাজের প্রশ্রয় ও প্রশংসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া এই চৌর্যবৃত্তি করে আসছে।
২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মায়ের কোল খালি করার জন্য আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
ইউরোপীয় রাস্ট্র ও খ্রিস্টান চার্চ সগর্বে কৃষ্ণাঙ্গ সন্তান কেড়ে নিত। কেড়ে নিয়ে শেতাঙ্গ পরিবারে কৃতদাস করত যাতে তারা দারিদ্র্য ও অপরাধ থেকে দূরে থাকে। দূরে থাকে অসভ্য বর্বর অন্ধকার কুসংস্কার থেকে।
‘কালোদের তো কিছুটা কলঙ্কমুক্ত ফর্সা করতে হবে, তাই না?’, – এই ছিল সভ্যজনের গাল ভরা বুলি।
————

ফেব্রুয়ারি ১৫
আরও গণিমতের সন্তান

ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্পেনে, মহামান্য প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কর্নেল আন্তোনিও ভায়েহো নাহেরা গবেষণার এক অদ্ভুদ ফল প্রকাশ করেন -‘মার্ক্সিজম মানসিক বৈকল্যের নিম্নতম স্তর।’
তিনি কারাগারে রিপাবলিকান মায়েদের উপর গবেষণা করে প্রমাণ করেন – বাইরে থেকে তাঁরা অপরাধ প্রবণতা আমদানি করেছে।
মার্ক্সিস্ট অধঃপতন ও মাতৃকুলের দুস্কৃতি থেকে আইবেরিয়ান জাতিসত্তার শুদ্ধতা রক্ষা করতে হাজার হাজার নবজাত শিশু অপহরণ করা হয়।
ক্রুশ ও তরবারির চর্চা আছে এমন পরিবারে প্রতিপালিত হয় এইসব অপহৃত শিশু।
আজ এত বৎসর পর কে বলবে কারা সেইসব শিশু!
কেউ জানে না।
ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসন সেইসব তথ্য মুছে ফেলেছে, ভুলতে বাধ্য করেছে জন্মপরিচয়।
শিশু ও স্মৃতি দুই-ই তাঁরা চুরি করেছে।
————

ফেব্রুয়ারি ১৬
রক্ত কথা বলে

ম্যাকারিনা গেলমান পাশবিক ‘কন্ডোর প্ল্যানে’র অভাগা ভুক্তভোগী। লাতিন আমেরিকার স্বৈরশাসকদের সম্মিলিত ত্রাস ও আতঙ্ক প্রদর্শনের মহাপরিকল্পনা এই ‘কন্ডোর প্ল্যান’।
ম্যাকেরিনার অন্তঃসত্ত্বা মাকে আর্জেন্টিনার জেনারেল উরুগুয়েতে নির্বাসনে পাঠায়। সেখানেই জন্ম হয় ম্যাকেরিনার। কিন্তু উরুগুয়ের স্বৈরশাসকের কাছে এই সদ্য সন্তান জন্মদানের কানাকড়ি মূল্য নেই, মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে নবজাতককে তুলে দেওয়া হয় এক পুলিশ কর্মকর্তার হাতে।
ম্যাকারিনার পুরো শৈশব অবিশ্বাস্য আতঙ্কে কাটে। আপাদমস্তক অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যরা তাকে তাড়া করে ফেরে, বন্দী করতে চায়। রাতের পর রাত জান্তব দুঃস্বপ্ন দেখে সে কেঁদে কেঁদে ওঠে।
পরে জানা যায় এই আতঙ্ক ও দুঃস্বপ্ন মূলত তাঁর মায়ের। নিদারুণ ভয়ে পাশবিক অত্যাচারের আতঙ্কে, মা যখন দিশেহারা ছুটছে দেশ থেকে দেশে – একটু আশ্রয় একটু নিরাপত্তার খোঁজে – ম্যাকারিনা তখন গর্ভে। গর্ভ থেকেই পেয়ে যাচ্ছে ভয় ও আতঙ্কের বীজাণু দুঃশাসনের জৈবিক চিহ্ন।

রক্তের এই সুপ্ত বীজাণু সন্ত্রাসের গুপ্ত প্ল্যান তাঁকে সারাজীবন তাড়া করে ফেরে।

————

ফেব্রুয়ারি ১৭
অপূর্ণ খায়েস

নগন্য মজুরি আর বাড়তি কাজের প্রতিবাদে আর্জেন্টিনার পাতাগোনিয়ার ডাকবিভাগের কর্মীরা কাজ বন্ধ করে দিলে সেনাবাহিনী সে-দায়িত্ব নেয় পরিস্থিতি সামাল দিতে। পরিস্থিতি সামলাতে তারা নির্বিচারে যথেচ্ছা হত্যাকাণ্ড শুরু করে।
সান হুলিয়ান বন্দরের আশেপাশে ১৯২২ সালের আজকের এই রাতে অগণন হত্যাকাণ্ডে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সৈন্যদল। ঘরে ঘরে নারকীয় ভীতি ও আতঙ্ক।
কিন্তু পাঁচজন সাহসী নারী যারা কাছাকাছিই কাজ করত, মুখের উপর দরজা বন্ধ করে সৈন্যদের তাড়িয়ে দিল। চিৎকার করে শুনিয়ে দিল , ‘তোরা খুনী তোরা হত্যাকারী, এক্ষুনি বেরিয়ে যা এখান থেকে’
সেই পাঁচজন –
কনসেওলো গার্সিয়া, এঞ্জেলা ফরচুনাতো, এমিলিয়া রড্রিগেজ, মারিয়া হুলিয়াচে, ও মঅদ ফস্টার।
পুণ্যাত্মা পাঁচ পতিতা।
————

ফেব্রুয়ারি ১৮
অন্তরতর হে

ফ্রান্সিসকোর মৃত্যু সংবাদে মিকেলাঞ্জেলো যারপরনাই হতবাক হন, মুষড়ে পড়েন ভীষণ শোকে। সামলাতে না পেরে হাতের হাতুড়ি দিয়ে নির্মেয়মান ভাস্কর্য ভেঙ্গে গুড়িয়া দেন। ফ্রান্সিসকো শুধু তাঁর সহযোগীই নন, ছিলেন অভিন্ন আত্মা প্রাণের দোসর।
শোকে মুহ্যমান শিল্পী লেখেন –
‘মৃত্যু হয়তো বিধাতার বিধান কিন্তু এই অকাল প্রস্থান বড় ক্ষতি করে গেল, অন্তহীন যাতনায় ভাসালো। বেঁচে থাকার আনন্দ যা-কিছু ছিল, সব তা ফ্রান্সিসকোর জন্যেই। জীবনে সে বাঁচার প্রেরণা আর মরনে শিখিয়ে গেল মৃত্যুতে আমার কোনো দুঃখ থাকবে না, পিছুটান মায়া থাকবে না। সুদীর্ঘ ছাব্বিশ বছর সে ছিল আমার অন্তরতর বন্ধু সখা.. এখন শুধুই অন্তহীন কষ্ট আর হতাশা… আমার যা ছিল সব তা চলে গেল ওর সাথে!’
ফ্লোরেন্সের সান্তা ক্রোচ চার্চে বান্ধবহীন ঘুমিয়ে আছেন মহান শিল্পী মিকেলাঞ্জেলো।
এই চার্চের সিঁড়িতে বসে কত রাত কত দিন কাটিয়েছেন দু’বন্ধুতে মিলে হাসি আনন্দে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর আর জীবন সামনে নিয়ে। এখানেই দুজনে পায়ে পায়ে খেলেছেন উল্লাসে ফেটে পড়েছেন অভিনব এক খেলায়।
আজ আমরা যাকে ‘ফুটবল’ বলি।
————

ফেব্রুয়ারি ১৯
যেমন হত হোরাশীয় কুইরোগার দিনলিপি

আজকের এই দিনে আমি মারা যাই।
আর ১৯৩৭ সালে মরণঘাতী ক্যান্সার ধরা পড়ে।
আমি জানতাম আমার পেছনে ছুটে ছুটে মৃত্যু ঠিকই একদিন আমাকে ধরে ফেলবে।
তাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালাম অকুতোভয় এই আমি। দৃপ্ত সাহসে বললাম, ‘ তোমার আমার যুদ্ধ এখানেই শেষ, ধরে নাও তুমিই জিতেছ; কিন্তু যুদ্ধের শেষটা আমার হাতে।’
মৃত্যু আমাকে হত্যা করার আগে আমিই আমাকে শেষ করে দিলাম।
————

ফেব্রুয়ারি ২০
আজ সামাজিক ন্যায়বিচার দিবস

উনিশ শতকের শেষ দিকে, হুয়ান পাইয়ো একস্তা উরুগুয়ে-ব্রাজিল সীমান্তের কাছাকাছি
কোথাও বাস করতেন। সেই নির্জন প্রত্যন্ত প্রদেশে কাজের স্বার্থে তাঁকে এ-শহর ও-
শহর করতে হত। ঘোড়ায় টানা মুড়ির টিন মার্কা পরিবহনে তিনি যাতায়াত করতেন।
গাড়িতে তাঁর সাথে আরও আটজন প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণির যাত্রী থাকতো।

দাম সবচেয়ে কম বলে হুয়ান সবসময় তৃতীয় শ্রেণির টিকিট কিনতো। কিন্তু তিনি এই
বিভিন্ন শ্রেণির পার্থক্য বুঝতে পারতেন না। একইরকম আসন, সবাই গাদাগাদি করে
বসে, ধূলা সবার গায়ে সমান হারেই লাগে, হোঁচট-ঝাঁকি সবার জন্য সমান বরাদ্দ।
তবু কেন আলাদা শ্রেণি – দামের ব্যবধান? তিনি ঠিক বুঝতে পারতেন না!

কোনো এক জল-কাদার বৃষ্টির দিনে তিনি শ্রেণি-রহস্য বুঝতে পারলেন।
গাড়ি কাদায় আটকে গেলে, কোচম্যান চিৎকার করে বলছেন –

‘ফাস্টো কেলাসের পেছেঞ্জার, জাগায় বইয়্যা থায়েন ছায়েব।
সেকেন কেলাস বেরাদার, ফাল দিয়্যা নাইম্যা পড়েন মছাই।
লাস্টো কেলাস, নাইম্যা ধাক্কা দাও মিয়া; নবাবের ল্যাহান গাট্টা দিয়া বইয়্যা আছো
ক্যালা?’
————

ফেব্রুয়ারি ২১
দীর্ণ ভাষার শীর্ণ বিশ্ব

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
আজ প্রত্যেক দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ভাষা বিলুপ্তির এই অপ্রতিরোধ্য গতি পৃথিবীকে ক্রমশ বৈচিত্র্যহীন নিস্প্রভ করে তুলছে।
১৯৭৪ সালে লাতিন আমেরিকার আদিবাসী এঞ্জেলা লইজ্যো মারা যান, তাঁর সাথে সাথে ‘ওনা’ ভাষাও হারিয়ে যায় ভাষা-বিশ্ব থেকে।
এঞ্জেলা নিজে নিজেই আপনমনে সুর তুলে গাইত, তাঁর গান বোঝার কেউ ছিল না, শোনারও কেউ নেই আজ।
আমি তোর পায়ের চিহ্নে
পথ চলি
আপন মনে এই ভূবনে
সুর তুলি
তোরা তো আমায় ফেলে
সব ভুলি
কোন জগতে কোন অতলে
ডুব দিলি
আমি আজ শূন্য করে কেমন করে
যাই চলি!

‘ওনা’ সম্প্রদায়ের অসংখ্য দেবতা ছিল। তাঁদের প্রধান দেবতার নাম ‘পেমক’।
‘পেমক’ মানে অক্ষর।
————

ফেব্রুয়ারি ২২
হিরন্ময় নীরবতা

৫৬৩ খৃষ্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলে মৌনবাক কবি ‘পল’ তাঁর পনেরতম প্রেমের কবিতা রচনা করেন। গ্রীক এই কবির নামের বিশেষণ তাঁর পেশার সাথে যুতসই মিলে যায়। তিনি সম্রাট জাস্টিনিয়ানের প্রাসাদে ‘মৌনব্রত’ বিভাগের প্রধান ছিলেন। এ দায়িত্ব তাঁর ঘরে এমনকি বিছানাতেও নিষ্ঠার সাথে পালন করিতেন তিনি।
তাঁর এক কবিতা –
তোমার বুকের উষ্ণতায় আমার নীরব বুক
তোমার নধর অধর ধারে আমার অধর চুপ,
মৌনব্রতের ব্রত নিয়ে আমার কাব্যকলা
সামলে চলি মুখর-সঙ্গ অধিক কথা বলা।
————

ফেব্রুয়ারি ২৩
বিস্ময়কর আসমানী কিতাব

১৪৫৫ সালের এমনি কোনো একদিনে ইউরোপের প্রথম পুস্তক ছাপা হয়। ছাপাখানা থেকে বের হওয়া এই গ্রন্থের নাম ‘বাইবেল’।
চীনারা যদিও আরো দুইশো বছর আগে থেকে বই ছেপে আসছে, তবু্ও আজ জোহান গুটেনবার্গের এই উদ্যোগে সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে পাঠক নন্দিত উপন্যাস সবার হাতে হাতে পৌঁছে যায়।
উপন্যাস শুধু গল্প বলে যায়, কিন্তু সে গল্প কেন বিশ্বাস করবো তা বলে না।
মহাপ্লাবনের সময় কী খেয়ে নূহ নবী ৭৫০ বছর বেঁচে ছিলেন – এই ব্যাখ্যা বাইবেলের নেই। অথবা ইব্রাহীম নবীর স্ত্রী কীভাবে নব্বই বছর বয়সে গর্ভবতী হলেন? কিংবা বালামের গর্দভ হিব্রু ভাষাতেই বা কথা বলে উঠলো কীভাবে?
————

ফেব্রুয়ারি ২৪
এই আমি সেই আমি

১৮১৫ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এলবা দ্বীপের বন্দীশালা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ফরাসি সিংহাসন পুনর্দখলের জন্যে যাত্রা শুরু করেন।
পথে দেখতে পান তাঁরই জন্ম দেওয়া পত্রিকা ‘লো মনিত্যর ইউনিভার্সেল’-এর উদ্দীপ্ত ঘোষণাঃ
‘ফ্রান্সের মানুষ তাঁদের সম্রাট অষ্টাদশ লুই -এর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। দুর্বৃত্ত নেপোলিয়ন পিতৃভূমির অমর্যাদা করেছে, সুনাম ধ্বংস করেছে, দেশটাকে ধর্ষন করেছে। এই লুটেরা দস্যু নেতা বিতাড়িত ভিনদেশি অবৈধ শাসক। বিশ্বাসঘাতক, নরকের জঘন্য কীট, ফ্রান্সের চরম শত্রু এই কুলাঙ্গার দেশকে কলুষিত করতে চেয়েছিল, তাই তাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবার যদি সে দেশে ফেরার দুঃসাহস দেখায় তো এটাই হবে তাঁর শেষ নির্বুদ্ধিতা।’
শেষে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই নেপোলিয়ন সিংহাসন দখল করেন;
রাজা লুই পালিয়ে বাঁচেন, আহা! কেউ তাঁর জন্য প্রাণ দেয়নি।
পরদিন সেই একিই পত্রিকা লেখেঃ
‘নেপোলিয়নের বিজয়দীপ্ত প্রত্যাবর্তনে রাজধানীর আপামর জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে,
আনন্দে সবাই কোলাকুলি করছেন, চিৎকার করে ধন্যবাদ জানাচ্ছে মহামান্য সম্রাট কে। দেশজুড়ে মানুষ খুশীতে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।
দৃপ্তকন্ঠে শপথ নিচ্ছে প্রাণ দিয়ে হলেও মহামহিম সম্রাটের আনুগত্য করবে।’
————

ফেব্রুয়ারি ২৫
প্রতিরোধের রজনী

একদা পানামা সরকার দেশের বর্বর অর্ধ-বর্বর অসভ্য জংলী জনগোষ্ঠীকে সভ্য আর আধুনিক করার আইন পাশ করে।
আইনে বলা হয় ‘কুনা’ সম্প্রদায় এখন থেকে তাঁদের নাক রাঙাতে পারবে না, নাকে দুল পরতে পারবে না; নেংটি পোশাক না পড়ে আধুনিক পরিচ্ছদ পড়তে হবে। সভ্যজনের ঈশ্বরকে ব্যাঙ্গবিদ্রূপ করে এমন ‘কুনা’ ধর্ম কেউ পালন করতে পারবে না আর নিজের বন্য ঐতিহ্য নিয়ে গোয়ার্তমি একদম সহ্য করা হবে না।
১৯২৫ সালের ফেব্রুয়ারির এই রাতে ‘কুনা’ নরনারী পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের নিজস্ব জীবনযাপনে বাধা দেওয়ায় আদিম অস্ত্র জেগে ওঠে- বন্য ছোরা ঝিকিয়ে ওঠে। সশস্ত্র পুলিশ বেঘোরে প্রাণ হারায় আপাত নিরীহ এই জনগোষ্ঠীর হাতে।
এরপর থেকে কুনা নারীপুরুষ অবাধে নাকে রঙ লাগায়, দুল পড়ে, নিজস্ব পোশাকে সাজে, নিজের রীতি ধর্ম পালন করে, আর প্রায় দুইহাজার দ্বীপের অনন্য সমাজে তাঁদের ঐতিহ্য উচিয়ে রাখে।
————

ফেব্রুয়ারি ২৬
আমার আফ্রিকা

উনিশ শতকের শেষদিকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক দেশগুলো বার্লিনে মিলিত হয় ‘আফ্রিকা’কে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। লুটের মালের মত আফ্রিকার জঙ্গল, নদী, পাহাড়, কৃষিজমি, অনাবাদি ভূমি, ভূমিজ সম্পদ প্রভৃতি নিয়ে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হয় সেদিন। ভাগবাটোয়ারার নতুন সীমানাও নির্ধারণ করা হল। সবাই যাতে সুখে-শান্তিতে শোষণ করতে পারে তার জন্য ১৮৮৫ সালের এই দিনে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নাম সাধারণ আইনও পাশ করা হয়।সভ্যতার অগ্রগতির প্রয়োজনে দাসব্যবসা অত্যন্ত জরুরি বলেও মত প্রকাশ করেন সভ্যতার বরপুত্ররা।
ভাগাভাগির সেই দিনে সেই স্থানে আফ্রিকার প্রতিনিধি কেউ ছিলেন না, দর্শক হিসেবেও না।
————

ফেব্রুয়ারি ২৭
তাহার মরন তবু হয়

পবিত্র বাইবেলে আছে, ‘ একদিন সবকিছু বিলীন হবে তুচ্ছ তৃণখন্ডের মতো!’
১৯৯৫ সালে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে প্রাচীন ব্যাংক ‘বারিংস ব্যাংক’ দেউলিয়া হয়ে যায়। সপ্তাহখানেক পর এই ব্যাংক সর্বসাকুল্যে এক (১) পাউন্ড স্টারলিং মূল্যে বিক্রি হয়!
মহা প্রতাপশালী এই বারিংস ব্যাংক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে অঢেল অর্থের জোগান দিত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে স্বাধীনতা ও বৈদেশিক ঋণের সূত্রপাত হয় মূলত একইসাথে, যুগ্মভাবে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই প্রত্যেক নাগরিকের জন্ম হয় এখানে। বিশ্বের এই দূর প্রান্তেও বারিংস ব্যাংক একের পর এক দেশ কিনে নিত, জাতির পিতাদের ভাড়ায় তল্পিবাহক বানাতো আর যুদ্ধের পর যুদ্ধে প্রভূত বিনিয়োগ করতো।
তাঁদের বিশ্বাস ছিল এই ব্যাংক অমর অক্ষয় অবিনশ্বর।
————

ফেব্রুয়ারি ২৮
যখন তিনি

একদিন যখন তিনি জাহাজের প্যাঁচানো সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন, তাঁর মনে হল প্রোটিন অণুও হয়তো এ রকম প্যাঁচানো অসমতল বক্র পথেই ঘুরে বেড়ায়।
গাড়ির ধোঁয়ায় যখন তাঁর প্রচন্ড কাশি দেখা দেয়, তখন তিনি বৈদ্যুতিক গাড়ি-ই আবিষ্কার করেন।
মারাত্মক কিডনিরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর যখন ওষুধেও কিছু হচ্ছিল না, তখন তিনি স্বাস্থ্যকর খাবার ও প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ খাওয়া শুরু করলেন। দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠলেন।
এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হিরোশিমায় ভয়াবহ বোমার কথা যখন শুনলেন, নির্ধারিত বক্তব্য না-দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আন্দোলন শুরু করলেন।
দ্বিতীয়বারের মত যখন নোবেল পুরস্কার পান, ‘লাইফ’ ম্যাগাজিন মন্তব্য করে – আমেরিকাকে অপদস্ত করতেই এই পুরস্কার। কারণ সেই সময় আমেরিকা সরকার তাঁকে কমিউনিস্ট ঘেঁষা হিসেবে সনাক্ত করেছিল, দুইবার তাঁর পাসপোর্টও জব্দ করেছিল।
তাঁর নাম লাইনাস পলিং।
আজ তাঁর জন্মদিন।
————

পর্ব-১ পড়তে চাইলে ক্লিক করুন

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top