সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই: পর্ব ২ // চয়ন মল্লিক

অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি ।
তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি ॥

যে আছে মম গভীর প্রাণে ভেদিবে তারে হাসির বাণে,
চকিতে চাহ মুখের পানে তুমি যে কুতূহলী।
তোমারে তাই এড়াতে চাই, ফিরিয়া যাই চলি ॥
আমার চোখে যে চাওয়াখানি ধোওয়া সে আঁখিলোরে–
তোমারে আমি দেখিতে পাই, তুমি না পাও মোরে ।।

তোমার মনে কুয়াশা আছে, আপনি ঢাকা আপন-কাছে–
নিজের অগোচরেই পাছে আমারে যাও ছলি
তোমারে তাই এড়াতে চাই, ফিরিয়া যাই চলি।।

গানটি শুনতে ক্লিক করুন: https://www.youtube.com/watch?v=PB20cimLew4

গীতবিতানের ‘প্রেম’ পর্যায়ের এই গানটি নিয়ে কথিত আছে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি নন্দিনী যখন খুব ছোট, তখন সে তার দাদু’র কাছে বসে নানা কথা আপনমনে তার অস্পষ্টভাষণে বকে যেত। সেসব না-বোঝা কথা শুনতে শুনতেই নাকি কবির এ গান লেখা। কিন্তু আমার কাছে এ গানটি যেন কবির সেই গানগুলোর অন্যতম যারা কিছু না বলেও সব কথাই বলে। তাই আমি যখন গানটি পড়লাম, আর তারপর তার সুরটি যখন মনে গুনগুনিয়ে উঠল, তখনই যেন মনের ভেতরের সেই অজানা জগতটির দুয়ারটিও গেল খুলে। মনে হল শুধু সুর দিয়েও যে এত কিছু চেনা সম্ভব, এত কথা বলা যায়, তা শুধু রবিঠাকুরই পারেন তাঁর গানের ভিতর দিয়ে।

অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি ।
তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি ॥

এ গানের স্থায়ীর প্রথম পঙক্তিতে ‘অনেক’ আর ‘কোন’ শব্দদুটি গাইবার সময় হয়ে যায় ‘অনে-এ-ক’ এবং ‘কো-ও-নো’, যা কিনা আমাদের প্রতিদিনের বলা কথার মতই একটু ঝোঁক দিয়ে বলা যাতে করে শব্দের জোরটা বাড়ে, সেই সঙ্গে বোঝাও যায় যে, সে অনেক কথাই বলেছে কিন্তু সবই নিরুচ্চারে। কিছু না বলে। সেই একই ছত্রের শেষ দুটি শব্দ–‘না বলি’–যেন সুর দিয়েই বুঝিয়ে দেয় বক্তার মনের দ্বিধা–বলতে চেয়েও বলতে না পারা। যেন এক পা এগোনো, দুই পা পেছুনো। স্থায়ীর পুরো শেষ লাইনটির চলাফেরা শুধু মুদারার স থেকে ম পর্যন্ত — আর তাতেও কড়ি-হ্ম, কোমল-ঋ আর কোমল-জ্ঞ–এর প্রাধান্যে যেন বারবার কবির হতাশাই ফুটে ওঠে। তিনি যেন সত্যিই সেই মানুষটির “ভাষা বোঝার আশা” জলাঞ্জলি দিয়েছেন।

যে আছে মম গভীর প্রাণে ভেদিবে তারে হাসির বাণে,
চকিতে চাহ মুখের পানে তুমি যে কুতূহলী।
তোমারে তাই এড়াতে চাই, ফিরিয়া যাই চলি ॥

অন্তরার প্রথম লাইনটির হঠাৎ একটানে মুদারার স থেকে তারার র্স-তে যাওয়া যেন লাগে অনেকটা ব্যথার আর্তনাদের মত। “হাসির বাণে” কবির “গভীর প্রাণে” যে তীক্ষ্ণ আঘাত বেজেছে, তারই প্রকাশ যেন ওই প্রথম কয়েকটি শব্দে। পরের পঙক্তিতেও রয়েছে সুরের সাথে কথার খেলা। “চকিতে চাহ মুখের পানে”র শুদ্ধ-র আর কোমল-জ্ঞ–এর সুরের দোলা যেন কবিপ্রিয়ার চোখের ক্ষণিক চাওয়া, আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়া—যা কিনা হয়ে ওঠে পূর্ণ দৃষ্টির চাওয়া এই ছত্রেরই শেষ শব্দের গভীর মীড়টিতে। কিন্তু তবু কবি চান তাকে এড়াতে। উদারায় বাঁধা অন্তরার শেষ লাইনটি যেন কবির সেই চাওয়ারই মনোকথন।

আমার চোখে যে চাওয়াখানি ধোওয়া সে আঁখিলোরে–
তোমারে আমি দেখিতে পাই, তুমি না পাও মোরে ।।

আমার কেমন মনে হয় যেন পুরো সঞ্চারীটি-ই কবি বলছেন স্বগোতক্তির ঢং-এ। তা না হলে উদারার কোমলতাকে এত প্রাধান্য দেয়া কেন? আর যদি তাকাই গানের বাণীর দিকে, সে-ও যেন কবির অভিমানের কথাই বলে—অশ্রুভেজা দৃষ্টি দিয়ে কবি তাঁর প্রিয়জনকে দেখতে পেলেও, সেই চোখের জলের বেড়া ডিঙিয়ে কবির চোখে তাঁর প্রিয়ার চোখ পড়ে না।

তোমার মনে কুয়াশা আছে, আপনি ঢাকা আপন-কাছে–
নিজের অগোচরেই পাছে আমারে যাও ছলি
তোমারে তাই এড়াতে চাই, ফিরিয়া যাই চলি।।

গানটির শেষ স্তবকের সুর-ও স্থায়ীর সাথে অনেকটাই মিলে যায়, তবু যেন তৈরি করে এক আলাদা ব্যঞ্জনার অর্থ। এ যেন সঞ্চারীর অভিমানকেই বয়ে এনে মিলে যায় কবির নিরাশায়। সেই নিরাশা হয়তো সৃষ্টি করে এক হতাশ হাহাকারের তাই কবি আবার চলে যান মুদারার স থেকে তারার র্স তে। আবার যেন নিজেকে এই ভেবে স্বান্তনা দেন যে, সে যে নিজের কাছে নিজেই অজানা। হয়তো তাই সে নিজের অজানিতেই কবিকে দুঃখ দিতে পারে। সে কষ্ট এড়াতেই যেন রবিঠাকুর গানটির আভোগের শেষে এসে আবার ফিরে আসেন নিজের মনের কাছে—সুর বাঁধেন উদারার কোমল-দ থেকে মুদারার স-এর গহীন গভীরতায়।।

৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺৺

অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি

রাগ: ভৈরবী

তাল: দাদরা

রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২১ চৈত্র, ১৩৩২

রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ৪ এপ্রিল, ১৯২৬

রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন

স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই: পর্ব ১ // চয়ন মল্লিক

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top