একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা ( ৮ম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

(১৬)

ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর মুখাবয়বের সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্য ছিল গুণামস্তির। কেবল গুণামস্তির গায়ের রং ছিল গাঢ় কালো এবং গালের হনূ দুটো বের হয়ে থাকা। পাম্প দিয়ে গুণামস্তির মুখটা একটু ফুলিয়ে তার মধ্যে সাদা রসুনের রং লাগিয়ে দিলে একেবারে জওহরলালের মত হয়ে পড়বে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য মাথায় একটি টুপি লাগবে।

বজালী অঞ্চলের চোর  হলেও সে কখনও পাটাছারকুচিতে গিয়েও চুরি করে। বজালী নামে কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। এটা একটি বিশাল অঞ্চল। পাঠশালার নামের ছোট শহরটি বজালীর হৃদয়। সেই হৃদয় থেকে যেসব জায়গায় রক্তের চলাচল হয়, সেটাও বজালী। পাটাছারকুচিতে সেই রক্ত যায় না।

পাঠশালার সঙ্গে পাটাছারকুচির যেন এক অহরহ অঘোষিত যুদ্ধ চলছে। সীমার ঝগড়া থাকা প্রতিবেশীর সঙ্গে যে ধরনের এক যুদ্ধ থাকে সেরকম এক যুদ্ধংদেহি মনোভাব। এই সমস্ত যুদ্ধ সক্রিয় হয়ে ওঠে ফুটবল খেলার মাঠে, ভলিবল খেলার মাঠে, যখন পাঠাছারকুচির পরাক্রমিক খেলোয়াড়ের হাতে ধরাশায়ী হওয়ার উপক্রম হয় বজালী। এমনকি মেট্রিক পরীক্ষার রেজাল্টের মধ্যেও দেখা যায়– পাটাছারকুচির কোনো ছাত্র যদি স্ট্যান্ড করে, পাঠশালা মর্মাহত হয়। এইরকম যুদ্ধের প্রভাব গুণামস্তির ওপরেও পড়ে। যদি সে পাটাছারকুচিতে চুরি করার সময় কোনোভাবে ধরা পড়ে, তাহলে তার নিস্তার নেই। পাটাছারকুচি পাঠশালার ওপরে চিহ্ন বসিয়ে দেয়।

একদিন এভাবেই মার-গুঁতো খেতে খেতে সে নাকি পাটাছারকুচিবাসীকে বলেছিল,’ তোমরা খুব বেশি মারধর কর, পাঠশালার মানুষেরা এত মারধর করে না।’

গুণামস্তি যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। কোনো একজন তার কথা শুনে এভাবে একটা ধাক্কা মেরে দিল যে ছিটকে পড়ল। আর তার সার্কাস দেখানো একটা হাত পাটাছারকুচিতে ভেঙ্গে রইল।

পাটাছারকুচি ছিল ভাগ্যবান। এইজন্য যে পাটাছারকুচির বুকের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে কালদিয়া নামের একটি নদী। পাটাছারকুচির মানুষগুলির মতোই এক অহংকারী নদী–কিছুটা যেন ক্রোধে, মুখ ফুলিয়ে রয়েছে।

পাঠশালার বিছন্নলা  নামের মৃত খালটি শুধু। শীতকালটা কচুরিপানায় ভরে থাকে। এমনকি সেই কচুরিপানাও শুকিয়ে কড়কড়ে হয়ে যাওয়া– এতটাই মৃত বিছন্নলা। কোথাও ছোটো নদীটার বুকের দু এক জায়গায় জোলো রঙের জল ছিল, যেখানে বিছন্নলা বেঁচে ছিল, তার মধ্যে কয়েকটি দাড়িকনা মাছ চরতে থাকে। ওদের ও যেন বেঁচে থাকার উৎসাহ নেই!

নদীর তীরে নাকি সভ্যতা গড়ে উঠে। এই মৃত বিছন্নলার পারে কি সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে বেদনা ছাড়া? রাহুল ভেবেছিল কালদিয়া যদি পাঠশালার বুক  দিয়ে বয়ে যেত! কত ভাগ্য পাটাছারকুচিবাসীর–ওদের আছে কালদিয়া। এক রহস‍্যময় আপোষহীন নদী। মাঝেমধ্যে মৃত মানুষও নাকি ভাসিয়ে নিয়ে আসে সেই নদী!

হাত ভাঙ্গার পরে গুণামস্তি চুরি করা ছেড়ে দিল। ডাক্তারদের ডাক্তার উমেশ ডাক্তার এবং শান্তি নার্স প্লাস্টার করা গুণামস্তির ভাঙ্গা হাতটা গলা থেকে বুক পর্যন্ত কিছুদিন ঝুলে রইল। একদিন দেখা গেল, সে বজালি হাইস্কুলের খেলার মাঠের গায়ে লেগে থাকা পাঠশালা সমবায় সমিতির বারান্দায় বাসর পেতেছে। সেই সমবায় সমিতি এক সময়ে মানুষকে সস্তায় কন্ট্রোলের কাপড়ের যোগান দিত। মিটারে ১.৩৫ টাকা দরে মাড় থাকা সেই কাপড় কিনে রাহুলের পিতা রাহুল-নীপাদের শার্ট ফ্রক সেলাই করে দুর্গাপুজোর কাপড় দিত।

সেই সার্কাস দেখানো গুণামস্তির হাত দুটি এখন কাঁপতে থাকে। মাথাটা নড়তে থাকে (জওহরলাল নেহেরুর নিশ্চয় সেরকম হয়নি)। মানুষটা কেমন যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ল। বিমর্ষ হয়ে বসে থাকে, কোনো অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া সমবায়ের বারান্দায়। কোথাও বিয়ে-শাদির খবর পেলে গিয়ে খেয়ে আসে। তারপর অনেকদিন পর্যন্ত গুণামস্তিকে আর দেখা যায় না। গুণামস্তি গুম। নাই যে নাই। পুনরায় হঠাৎ একদিন আবির্ভাব হয় গুণামস্তির। সমবায়ের বারান্দাটিতে একটি শতচ্ছিন্ন পুঁটলি মাথায় দিয়ে একটি বস্তার উপরে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায় তাকে।

হে পাঠক, গুণামস্তির কথা শুনে বিরক্তি জাগছে না তো? আরও একটু ধৈর্য ধরুন–কিছুক্ষণপরেই গুণামস্তি অন্তর্ধান হবে। তারপরে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও আর কেউ লিখবে না গুণামস্তির কথা। আর মাত্র কয়েক সারি গুণামস্তির জন্য….। তাই এভাবে লিখতে হল–

রাহুলরা যখন একদিন স্কুলে যাবে–হাইস্কুলে যাওয়ার সময় একদিন হঠাৎ সমবায়ের বারান্দায় একদল কলরব করতে থাকা লোককে গুণামস্তিকে ঘিরে থাকতে দেখল রাহুল। সেই সুপারি গাছের নিচে কলরব করার মতো এই কলরবের মধ্যেও রাহুল ঢুকে পড়ল। রাহুল দেখল,গুণামস্তি তার বস্তার বিছানার ওপরে নিচের দিকে মুখ করে কনুই দুটিতে ভর দিয়ে শরীরটা একবার নিচের দিকে একবার উপরের দিকে করে বুক ডন দিচ্ছে। কিন্তু গুণামস্তি পরে থাকা গামছাটা খুলে রেখেছে কেন? রাহুলের প্রিয় নায়কের খসখসে পাছা দুটি রাহুলের চোখের সামনে ঝলমল করে উঠল। রাহুল ভেবেছিল, গুণামস্তি ব্যায়াম করছে। কিন্তু কোনো একজন তাকে বলল,’নারীকে কীভাবে ( অশ্লীল) দেখাচ্ছে।’

একটা পঁচিশ পয়সার মুদ্রা দিলে গুণামস্তি  নির্বিবাদে কীভাবে পুরুষরা মহিলার সঙ্গে মৈথুন করে তার ভঙ্গি দেখায়। গুণামস্তি দিনের মধ্যে অনেকগুলি পঁচিশ পয়সার মুদ্রা লাভ করে। যেন বন্ধ সমবায়টা খুলে গেল। কন্ট্রোলের দামে পাঠশালাবাসী গুণামস্তিকে চাইছে।

কোনো উত্তেজনা নেই, মুখ দিয়ে মাত্র দুই একটি উঃ আঃ শব্দ করে অশ্লীল অভিনয় বিক্রি করছে গুণামস্তি। তারপরে একটা সময় গুণামস্তি হাঁটু গেড়ে বসে এবং তৎক্ষণাৎ পরে নেয় গামছাটা। রাহুল তখন দেখে, একমুঠো দানাপানি না পাওয়া দুব্বোঘাসের মাঝখান থেকে গুণামস্তির ঝিমিয়ে পড়া কালো লিঙ্গটা ঝুলে রয়েছে। জওহরলাল নেহেরুর প্রতি রাহুলের দুঃখ ফুলে-ফেঁপে উঠে। রাহুল ভাবে আর কখনও দেখব না এমন দৃশ্য, কখনও দেখব না গুণামস্তিকে। এটাই হল বিছন্নলা নামের  ছোটো নদীটির তীরে গড়ে ওঠা সভ্যতা।

সেদিন স্কুল থেকে এসে রাহুল ভাত খেতে পারেনি। দুই গ্রাস ভাত মুখে দিয়ে ভাতের থালায় জল ঢেলে দিয়ে উঁইয়ের ঢিবিটার কাছে দৌড় মেরেছিল সে! বুকটা কী ভারী লাগছিল! তার বুকে কে এতগুলি পাথর চাপিয়ে দিয়েছে! সে যেন এগোতে পারছে না। কোনোমতে উইয়ের ঢিবিটার কাছে এল এবং হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল।

গুণামস্তির খসখসে পাছা দুটি রাহুলের চোখের সামনে ভুটান পাহাড়ের চেয়েও উঁচু হয়ে গেল। আর রাহুল পড়ে রইল সেই পাহাড়ের নিচে। যে পাহাড় বিছন্নলা পারের সভ্যতা অতিক্রম করতে পারে না।

রাহুলের সঙ্গের বিপুল, ফটিকরা ভাবে রাহুল কীভাবে কবি হল, সেও তো আমাদের সঙ্গে গুণামস্তি দেখানো সেই দৃশ্য দেখেছিল! সেই রাহুলকে যখন একদিন কবিতা সুদূর প‍্যারিসে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে থাকা পিকাসো জাদুঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে রাহুল ভেবেছিল এই গুণামস্তির কথা। ভেবেছিল, পিকাসো গুণামস্তিকে মিস করছে। পিকাসোর সঙ্গে যদি সাক্ষাৎ হতো গুণামস্তি নামের এই বন‍্য নায়কটির! আজ এই পিকাসোর জাদুঘরে নিশ্চিতভাবে গুণামস্তির  একটা পোর্ট্রেট থাকত।

(১৭)

সমস্ত সভ্যতার উত্থান-পতন আছে। বিছন্নলা নদীর তীরের সভ্যতা এই সেদিনের। গজেন্দ্রনাথ, বরুণ, অমৃতপ্রভা, শশী, রাহুল, নীপা, তজো, তরুনী পিসি, গুণামস্তি এবং বেলের নিচের চায়ের দোকানে লবঙ্গ, বরফি খাওয়া মানুষগুলি যা গড়ে তুলেছিল। তার মধ্যে যোগ দিয়েছিল নটরাজ থিয়েটারের ‘সতী বেউলা’ দেখে কান্নাকাটি করা মহিলাদের চোখের জল, অসম স্টার থিয়েটার কোহিনূর এবং আবাহন থিয়েটারের আখড়া গৃহ থেকে ভেসে আসা নৃত্যনাটিকার গীত এবং নুপুরের ধ্বনিগুলি।

গান শুনে রাহুল-নীপারা জেনেছিল যে কাউকে যদি নাহর ফুল না মানায়, টগর ফুল আছে তাকে মানানোর জন্য, টগর ফুলেও যদি তাকে না মানায়, কপৌ ফুল আছে। আর কপৌফুলেও  যদি তাকে না মানায়, ‘হিয়া-ফুল’ আছে তাকে মানানোর জন্য। কিন্তু এই হিয়া-ফুল যে কি, ওরা তা জানত না।

রাহুল একদিন মালিনী দিদিকে জিজ্ঞেস করেছিল,’ হিয়া- ফুল কি?’

মালিনী সাদা ব্লাউজটার সেফটিপিন দুটো খুলে দেখিয়ে বলেছিল, ‘এই দুটো হল হিয়া-ফুল’।

রাহুল কিছুটা বিশ্বাস করল। কিছুটা বিশ্বাস করল না। কিন্তু সারা জীবন রাহুল ‘হিয়া-ফুল’কে নিয়ে দ্বিধায় রইল।

(১৮)

পাঠশালার সভ্যতা পানীশালা নামের একটি পুকুর থেকে উঠে আসা বলে শোনা যায়। বাঁশঝাড়ের নিচে শুয়ে থাকা এক ঝাঁক বাতাস যেভাবে কখনও উঠে আসে ঠিক সেভাবে হয়তো সভ্যতা উঠে আসতে পারে না । হয়তো উঠে আসতে পারে কোনো কাহিনি বা কাহিনির চরিত্র। শোনা যায় পানীশালা নামের একটি প্রকাণ্ড ঐশ্বরিক পুখরি ছিল যেখানে বাস করত কোমল অন্তরের একজন জলকুমারী। কারও বাড়িতে বিয়ে-সাদি, পূজা পার্বণ থাকলে অজস্র বাসনপত্রের যখন প্রয়োজন হয়, তখন বাড়ির গৃহস্থ সেই পুকুরের পাড়ে আসে। মাটির একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে একটি কলাপাতায় প্রয়োজনীয় সামগ্রীর নাম লিখে জলে ভাসিয়ে দেয়। পরের দিন দেখা যায় একটি সোনার নৌকা (মাঝিবিহীন) সেই সামগ্রীসমূহ পাড়ে নামিয়ে দেয়। কাজকর্ম হয়ে যাওয়ার পরে সেই গৃহস্থ বাসনপত্রগুলি ভালোভাবে ধুয়ে পুকুরের পাড়ে রেখে আসে। এরকম এক নিয়মে বজালী অঞ্চলের জনগণ পানীশালা পুকুরে বাস করা জলকুমারীর সাহায্য এবং আশীর্বাদ লাভ করে আসছিল।

কিন্তু কোনো একটি বাড়ির গৃহস্থ নাকি একবার এভাবে আনা বাসনপত্রগুলি জলকুমারীকে ফিরিয়ে দিল না। জলকুমারী অভিশাপ দিল না কিন্তু মনে বড় দুঃখ পেল এবং সেই পানীশালা পুকুর ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেল। তখন থেকে নাকি পানীশালা পুকুরের জল খারাপ হয়ে গেল। এরকম অলৌকিক কাহিনি রাহুলদের ফুলের মতো কোমল মনকে খুব আকর্ষণ করত। সেই পানীশালা পুকুরটা কোথায় ছিল তা দেখার জন্য রাহুল উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল।

সেই পানীশালা পুকুরের নামে এখন একটা গর্তও নেই। শনিবার এবং মঙ্গলবারের হাট দুটি থেকে সৃষ্টি হওয়া আবর্জনাদি গোপন ক্ষয় রোগের মতো ধীরে ধীরে পানীশালাকে একটি ডোবা করে তুলেছে। আর লোভী মানুষেরা একটু একটু করে ঠেলে ঠেলে বাঁশের বেড়া দিয়ে সেই ডোবার্টিকে শেষ করার জন্য এগিয়ে এল।

প্রকৃতপক্ষে পানীশালা পুকুর কোচ রাজা নরনারায়ণ সিংহ খনন করিয়েছিলেন। কোচ রাজবংশাবলীতে এই পানীশালা পুকুরের উল্লেখ রয়েছে। গোঁহাইকমল আলীর পাশে রাজার সৈন্যরা বিশ্রাম এবং তৃষ্ণা নিবারণ করার জন্য সেই পানিশালা পুকুর খুঁড়েছিল। বৃহত্তর বজালী অঞ্চলে নরনারায়ণ আরও কয়েকটি পুকুর খনন করিয়েছিলেন। সেই সবের মধ্যে অন্নশালা, পানীখাইতি, যোগীর পুকুর ইত্যাদি । কিন্তু এই সমস্ত পুকুরের মধ্যে পানীশালা পুকুরটি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল।

বিখ্যাত হওয়ার অন্যান্য কারণের মধ্যে একটি প্রধান কারণ ছিল এই যে সেখানে সব সময় একজন বিধবা নারী (কে জানে মালিনির মতোই ছিল) স্নান করতে আসত। অকালে বিধবা হওয়া বামুনের বিধবা। উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা একদল সন্ন্যাসী সেই পানীশালা পুকুরের পারে কিছুদিনের জন্য তাঁবু টেনে অস্থায়িভাবে বাসর পেতে ছিল । তারই একজন যুবক সন্ন্যাসী একদিন সেই বিধবার দুধে আলতা শরীরটাকে জলে খেলা করতে দেখে অবাক হল। পৃথিবী এত সুন্দর বলে ভাবতে না পারা সেই সন্ন্যাসী যার খোঁজে সংসার ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, তার চেয়েও বিরল প্রাপ্তি‐ প্রেমের বোধে সিক্ত হয়ে গেল। ভেসে গেল।

দুধে একটু সিঁদুর মিশ্রিত হয়ে গেল। আর সেই যুবক সন্ন্যাসীর ঔরসে বিধবাটি জন্মদান করল দুধ এবং সিঁদুরে নির্মিত একটি সুদর্শন পুত্র। পাঁচ বছর সেই বিধবার সঙ্গে সাংসারিক জীবন অতিবাহিত করে যুবক সন্ন্যাসীর সম্বিত ফিরে এল যে তিনি ধীরে ধীরে মায়ার জালে বন্দি হয়ে পড়েছেন।

আরেকদিন হঠাৎ উদাসীনতার মন্ত্র আউড়ে সন্ন্যাসী চলে গেল, আর বিধবা হাহাকার বুকে জড়িয়ে নিয়ে চার বছরের ছেলেকে নিয়ে থেকে গেল। একটু একটু করে বেড়ে চলা তরতাজা সন্তানটির মা নাম রাখল পুরুষোত্তম। পুরুষোত্তম হাতে বেত নিয়ে গরু চরানোর উপযুক্ত হল। একদিন বীর চিলা রায় পানীশালা  পুকুরের পাশ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যাবার সময় এক পাল গরুসহ পুরুষোত্তমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল।

দুধে আলতা ছেলেটিকে দেখে চিলা রায়  ঘোড়া থেকে নেমে এসে পুরুষোত্তমকে জিজ্ঞেস করল,

– কী নাম তোমার?

– পুরুষোত্তম!

– বাবার নাম কি?

– আমার বাবা সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসী বাড়িতে থাকে না।

– মা কোথায়?

– মা বাড়িতে আছে।

– আমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে চল। চিলারায় পুরুষোত্তমকে বলল।

চিলা রায় পুরুষোত্তমকে তুলে নিয়ে নিজের ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিয়ে নিজে লাফ মেরে উঠে পড়ল। তারপরে ধীরে ধীরে পানীশালা পুকুরের তীর ধরে পুরুষোত্তমের মায়ের কাছে এগিয়ে যেতে লাগল।

দুধে আলতা রং কেউ কেড়ে নিয়েছিল। ছিল কেবল ঠাণ্ডা দুধ। পুরুষোত্তমের মায়ের আগের চেহারা তখন আর ছিল না। অমানুষিক কষ্ট কাবু করা একটি মানুষ।

চিলারায় নিজের পরিচয় দিয়ে পুরুষোত্তমের মায়ের কাছে সন্তানটিকে চাইলেন। বললেন, ‘আমি ওকে কাশীতে পড়াব। বড় মানুষ তৈরি করব। ওকে আমার কাছে দিয়ে দাও।’

একটা প্রচণ্ড তুফান এসে পুরুষোত্তমের মায়ের খড়ের ঘরটা ভেঙ্গে দিল। সেই তুফানের নাম চিলা রায়। চিলা রায়ের মতো একজন বীরের অবাধ্য হওয়ার শক্তি পুরুষোত্তমের মায়ের ছিল না। তাই পুরুষোত্তমকে দেব না বললেও মায়ের পক্ষে ওকে রক্ষা করা কি সম্ভব হবে? চিলা রায় নিতে চাইছে যখন ধরে বেঁধে হলেও পুরুষোত্তমকে নিয়ে যাবেই। রাজা তো  প্রজাকে অনুরোধ করে না ,আদেশ করে।

চোখের জল মুছতে  মুছতে মা পুরুষোত্তমকে চিলারায়ের  হাতে  সঁপে দিল। আর নিজেকে সঁপে দিল অন্ধকার মিশ্রিত যাতনার বুকে।

নয় বছরের পুরুষোত্তমকে নিয়ে গিয়ে চিলা রায়  প্রথমে তাকে কোচবিহারে এবং পরে কাশীতে পড়ালেন।

সেই পুরুষোত্তমের সিঁদুর মিশ্রিত দুধে আলতা দুই গালে যখন কোমল কোমল দাড়ি গজাল, তখন পুরুষোত্তমকে বজালী-পরগনার জমিদারি করার দায়িত্ব দেওয়া হল।

পুরুষোত্তম হয়ে উঠল পুরুষোত্তম রায়চৌধুরী। জমিদার। অজস্র চাকর বাকরে পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা শক্তিশালী জমিদার। হাতে দুনলা বন্দুক নিয়ে পুরুষোত্তম হাতিতে উঠে শিকারে যায়, পশুর মাংস খায়। নাপিত পুরুষোত্তমের চুল কেটে দেয়, দাড়ি কামিয়ে ফিটকারি লাগিয়ে দেয়, নখ কেটে দেয়। হাত এবং পায়ের। কানের ময়লা বের করে দিয়ে আতর লাগানো তুলো কানের ফুটোতে গুঁজে দেয়।

উদাসীনতার সন্তান পুরুষোত্তম চকচক করে ওঠে পরাক্রম এবং বিলাসিতায়। তার চৌহদের সামনে দিয়ে কেউ রোদে বা বৃষ্টিতেই হোক ছাতা মেলে পার হয়ে যেতে পারে না, কেউ দোলায় উঠে যেতে পারে না। যদি কেউ যায়, তাহলে পায় নির্ঘাত শাস্তি- চাবুকের প্রহার। ব্রিটিশের শাসনকাল পর্যন্ত চৌধুরী বংশের জমিদারির সেই পুরুষানুক্রম অত্যাচার বজালীবাসী নির্বিবাদে মেনে নিয়েছিল।

চৌধুরী বংশের জমিদারিতে কাজ করা অনেক দাসী জমিদার পরিবারের যুবক এবং আধবয়সী  অর্থাৎ বাপ- বেটার দুজনেরই যৌন নির্যাতনের বলিও  হয়েছিল। সেই সমস্ত দাসী অনেক অবৈধ সন্তানের জন্ম দিয়েছিল, যারা পরবর্তীকালে সরকারি চাকরি করে বড় মানুষ হয়েছিল।

সেই পানীশালা পুকুর থেকেই বজালীর হৃদয় পাঠশালার জন্ম হয়েছিল। রাহুলরা কিছুটা বুঝতে পারা হওয়ার পরেই সেই পানীশালা পুকুর কোথায়, পানিশালা পুকুর কোথায় বলে শনিবার এবং মঙ্গলবারের হাটে বাজারে জায়গাটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াত।

ওরা দেখেছিল, সেই জায়গাটায় হেলেঞ্চা শাক জন্মেছে। আর সেই হেলেঞ্চা শাকের নিচে দিয়ে বয়ে গেছে চা পাতার জলে কালো হওয়া একটি নালা। বাদল চৌধুরী নামে একজন বাঙালি সেখানে একটি চায়ের দোকান দিয়েছে। সেই বাদলের চায়ের দোকানে সিঙ্গাড়া, চ্যাপ্টা আকারের মিষ্টি এবং কালাকান্দ পাওয়া যেত।

গজেন্দ্রনাথের চায়ের দোকানে কালো পানি যাওয়া মেলাটা কবেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবার দীর্ঘদিনের তীর্থ ভ্রমণে যাবার সময় গজেন্দ্রনাথ তাঁর চায়ের দোকানটি মেজ জামাইয়ের হাতে দিয়ে গিয়েছিল। বড় ছেলে বরুণ চা দোকান চালাতে পারা মানুষ নয় বলে গজেন্দ্রনাথ সমস্ত ব্যবসা মেজ জামাইয়ের হাতে সঁপে নিশ্চিন্ত মনে অমরনাথ, বদ্রিনাথ, কাশী বৃন্দাবনের দিকে যাত্রা করেছিল।

তীর্থ ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে গজেন্দ্রনাথ দেখল তাঁর চায়ের দোকানের আলমারিতে লবঙ্গ বরফি নেই। মুখ লাগানো টিনের তলায় মাত্র কয়েকটি নিমকি পড়ে আছে, সেগুলিও মচমচে নেই।

গজনেন্দ্রনাথ ও নিমকির মতোই স‍্যাঁৎসেতে  হয়ে পড়ল। কাউকে কোনো প্রশ্ন না করে গজেন্দ্রনাথ শুধু বলল,’ চায়ের দোকান বন্ধ’। আর বড় করুণভাবে বজালীবাসী বঞ্চিত হল গজেন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত লবঙ্গের স্বাদ থেকে। সেই স্বাদের মালিতা (কাহিনি) লিখতে পারার মতো বয়স তখন রাহুলের হয়নি। ভবিষ্যতেও রাহুল সেই মালিতা লিখতে পারবে কিনা জানি না কিন্তু মালিতা রচিত হওয়াটা উচিত।

কারণ তিনটি তাকের  মধ্যে শুয়ে থাকা গজেন্দ্রনাথের লবঙ্গগুলির স্বাদ বজালীবাসীর জিহ্বায় নয়, মাথায় ছিল। সেই স্বাদের বলয়গুলি বজালী বাসীর মাথা থেকে ধীরে ধীরে কর্পূরের মতো নাই হয়ে গেল।

একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা ( ৭ম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top