সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই: পর্ব ৩// চয়ন মল্লিক

শ্রাবণের    ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে
তোমারি    সুরটি আমার মুখের ‘পরে. বুকের ‘পরে॥
পুরবের    আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে–
নিশীথের    অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।
নিশিদিন    এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের ‘পরে
শ্রাবণের    ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।
যে শাখায়    ফুল ফোটে না, ফল ধরে না একেবারে,
তোমার ওই    বাদল-বায়ে দিক জাগায়ে সেই শাখারে।
যা-কিছু    জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা,
তাহারি    স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।
নিশিদিন    এই জীবনের তৃষার ‘পরে, ভুখের ‘পরে
শ্রাবণের    ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে॥

৫২ বছরের পরিণত রবীন্দ্রনাথ “শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে” গানটি লেখেন ১৯১৪ সনে শান্তিনিকেতনে বসে। গানটি ‘পূজা’ পর্যায়ের হলেও প্রথম ছত্রেই মন অন্য পথে ধায়। যেন মনে হয় বর্ষারই কোন গান। কবি কিন্তু নিজেও আশ্চর্যজনক ভাবে এই গানটিকে স্হান দিয়েছেন তাঁর বেশীরভাগ বর্ষার গান তিনি যে স্বরবিতানে সাজিয়েছেন, সেই কেতকী (স্বরবিতান ১১) তে। অথচ, গানটি পুরোটা গভীরভাবে পড়লেই শুধু বোঝা যায় যে, কী আকুল প্রার্থনা তিনি প্রকাশ করেছেন এর প্রতিটি ছত্রে! শুধু সুর যেন তাঁকে প্লাবিত করে, এ-ই কবির চাওয়া পুরো গানটি জুড়ে।

রবিঠাকুর বেহাগের সুরে যে কী অনন্যসাধারণ সব গান সৃষ্টি করে গেছেন এই গানটি তার একটি উদাহরণ। এমনিতেই বেহাগ আমার ভীষণ প্রিয়, তাতে যদি যোগ দেই রবীন্দ্রনাথ, তাহলে তো কোন কথাই থাকতে পারে না। কিন্তু ওই যে, গাইবার আগে গানটি পড়বার, সেটিকে নিয়ে ভাববার অভ্যাস! তাই গানটি গাইতে বসে আমার কেমন নিজেকে দিশেহারা লাগছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যদি এভাবে সুরের নাগাল পাবার ব্যাকুলতা এমন একটি গান দিয়ে প্রকাশ করে যান, আমি তো নগন্য।

অস্থায়ী দিয়েই শুরু করি। পুরো অস্থায়ীর সুরেই কেমন যেন এক চেনা ছন্দ রয়েছে। না, শুধু দাদরার ছন্দ নয়। আমি এতে পাই যেন বর্ষার জলধারার ছন্দটি।

শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে
তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে ॥

প্রথম ছত্র যেন দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি দিয়ে শুরু হয়ে মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে যায় অঝোর বর্ষণে। আবার দ্বিতীয় লাইনটিতে যখন গাইছি “তোমারি সুরটি আমার”, “আমার” গিয়ে স্থির হয় শুদ্ধ-ন’তে, আর তখনই সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ হয় সেই না-পাওয়া সুরের সঙ্গে মেলবার আকুলতা। মনের মধ্যে যেন কবির সেই চাওয়াটিই বেজে ওঠে কবিরই সুরে। কিন্তু সেই সুরের ধারাজল নয় কোন মুষলধারে বর্ষণ। এ সুর যেন ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে “মুখের পরে, বুকের পরে”—ঠিক যেমন করে সুরটি বাঁধা কড়ি-হ্ম আর শুদ্ধ-ম’এর সহজিয়া সুরে।

যদি তাকাই অন্তরার দিকে, সুরের স্রোতে ডোবার তীব্র বাসনা পাই অন্তরার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে। যখন কবির সুরে সুর মেলাই, সে বাসনা সঞ্চারিত হয় আমার মধ্যেও।

পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে—
নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে ।
নিশিদিন এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের ‘পরে।।

দিনের প্রথম আলোর মতই সহজ, একমুখী অথচ কোমল সুরে তাঁর চাওয়াটি তিনি ব্যক্ত করেছেন অন্তরার প্রথমে। পরের সুরটি যেন আসে চুপে চুপে, পা টিপে টিপে, যেন বা নিশীথের গভীর অন্ধকারের মতই নিঃশব্দে। যেন হঠাৎ করে অন্ধকারের ঘুম না ভাঙে, কিন্তু সুর যেন ঝরতে থাকে অবিরল। তারপরই আসে আবার সেই প্রবল আকাঙ্ক্ষা। তারার র্স-থেকে শুরু করে ওখানেই ঘুরে বেড়াতে থাকে যেন তাঁর বাসনার তীব্রতা সুরে সুরে—যেন সুর তাঁকে কখনোই ছেড়ে না যায়—সুখে দুঃখে যেন সে অচল থাকে।

যে শাখায় ফুল ফোটে না, ফল ধরে না একেবারে,
তোমার ওই বাদল-বায়ে দিক জাগায়ে সেই শাখারে ।

সঞ্চারীতে নিজেকে কবি তুলনা করলেন রিক্ত নিঃস্ব এক শাখার সঙ্গে—এমনকি নিজেকে কোন মহীরুহ বলতেও যেন তাঁর আপত্তি। তাই বোধহয় সেই রিক্ত শাখাটিতে ফুল না আসার, ফল না ধরার বেদনায় তিনি সুর বসালেন মুদারার স থেকে গ-এ ঘুরে ঘুরে। শুধু একবার একটু ছুঁয়ে আসা ম আর প কে, সেও যেন সেই না-পাওয়ার বেদনাকেই আরেকটু গাঢ় করে তোলা। তবু সেই শূণ্য শাখাটিতেও প্রাণ জাগতে পারে, পারে সুরের দোলা লাগতে। আর সেই সুরময় বাদল বাতাসের দোলা যেন আমাকেও জাগিয়ে তোলে মুদারার প থেকে শুদ্ধ-ন পর্যন্ত সুরের দোলায়, সুরের ফুল ফোটায় কড়ি-হ্ম থেকে প-এর মৃদুমন্দ ঢেউয়ের খেলায়।

গানটির শেষ স্তবকের সুরের সাথে অন্তরার সুরে মিল থাকলেও, এ সুর যেন সকল দৈন্যতা, জীর্ণতা ঘুচিয়ে মনের আনাচে কানাচে, ‘স্তরে স্তরে’ পৌঁছে দেয় বিন্দু বিন্দু সুর। সে সুরের ধারায় তৃপ্ত হয় জীবনের সকল অতৃপ্তি—মেটে আজন্ম তৃষ্ণা! গানটি তাই গাইলাম মনে একথাই ভেবে-

যা-কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা,
তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা ।
নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ‘পরে, ভুখের ‘পরে॥

এই-এটুকুই তো চাওয়া। শুধু তাঁর মত এমন কথার মালায় সুরকে গেঁথে চাইতে পারিনা। আমার তৃষ্ণাও তাই মেটে না।।

গানটির লিঙ্ক:https://www.youtube.com/watch?v=r3zQGDt3Jmk

সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই: পর্ব ২ // চয়ন মল্লিক

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top