একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা ( ১২ম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদ: বাসুদেব দাস

(২৬)

শহীদ ভবনের চৌহদে থাকা নার্সারি স্কুলে যখন রাহুল আর নীপা পড়ত–রাহুল ছিল নার্সারী -ক আর নীপা নার্সারী খ। সেই নার্সারি খ-তে বজালী কলেজের প্রিন্সিপালের একমাত্র মেয়েও পড়ত। রাহুলের চেয়ে সে এক বছরের বড়ো ছিল।সহজে হাসত না, উজ্জ্বল চোখের সেই মেয়েটির জন্য রাহুল রাস্তাঘাটে জিনিস খুঁজে বেড়াত। হরেশ্বর দর্জির দোকানের সামনে পোড়ানোর জন্য স্তূপ করে রাখা রংবেরঙের কাটা ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, সুন্দর ছোটো ছোটো পাথর, কারও গলার হার থেকে খসে পড়া মণি, এমনকি জ্বলজ্বল করতে থাকা কাচের টুকরো ইত্যাদি ছিল তাকে দেবার জন্য রাহুলের অমূল্য সম্পদ! রাহুল সব সময় কিছু না কিছু জিনিস খুঁজে আনত এবং স্কুলে যাবার সময় তার ছোট্ট পকেটটাতে যত্ন করে নিয়ে যেত। অন্যের অগোচরে সে সেগুলি মেয়েটির হাতে গুঁজে দিত। তার বিনিময়ে সে কখনও মেয়েটির  কাছে চেয়েছিল একটি চুম্বন। কিন্তু মেয়েটি কখনও তাকে চুমু খায়নি। উপহার গুলি সে বড়ো আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করত আর কখনও তার গালে একটা হাত দিয়ে আদর করে দিত।চুমু না খাবার জন্য তাকে কেউ শেখায়নি। মেয়েটি বোধহয় কেবল মাকেই চুমু খেত। এরকম মনে হয় যে বজালী কলেজের প্রিন্সিপাল পিতাকেও সে চুমু খায়নি; অথচ প্রিন্সিপালের ডিমের মতো সূঁচলো এবং মসৃণ মুখটা নিজের মেয়ের কাছ থেকে না পেলেও অন্য অনেকের কাছ থেকে চুমু পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা এবং যোগ্যতা ছিল। সমস্ত পুরুষের মতো তিনিও ছিলেন একজন সুঠাম নায়ক। পৃথিবীতে এরকম কোনো নায়ক আছে,যে বৈধ-অবৈধ অজস্র চুমুতে বিদ্ধ হয়নি?

সেই জন্য– কাউকে চুমু না দেওয়ার জন্য প্রিন্সিপালের মেয়ে নন্দনা রাহুলের কাছে সাধারণ ছিল না।

অন্য সবাই ছিল সাধারণ। কুসুম দিদি–যে চশমা পরত, বড়ো সুন্দর গল্প বলত, কণ্ঠস্বর ছিল তীক্ষ্ণ,বড়ো মিষ্টি এবং কান্তা দিদি– যে নামতা শিখিয়েছিল এবং অ-আ, যে রাহুলকে সব সময় কাছে ডেকে নিত এবং তার ডান গালে থাকা তিলটার ওপরে বলপেন দিয়ে এঁকে এঁকে একটা মুসুরি দানার মতো সমান  করেছিল। রাহুলের তিলটা মাটিগ-কলাই হতে খারাপ পায়নি। কান্তাদিদির জন্য রাহুলের গালটা সবসময় উন্মুখ হয়ে থাকত।

সেই আদরের দুজন দিদির ভালোবাসা থেকেও যেন রাহুলের ছোট্ট জীবনে বেশি প্রয়োজন ছিল নন্দনার আঙ্গুলের একটি স্পর্শ–তার গালে! নার্সারি স্কুল মানে কি– চিৎকার চেঁচামেচি কান্নাকাটি নাকের জল। সেই সময় পিঠে বিদ‍্যা বহন করে নেবার জন্য স্কুল ব্যাগ ছিল না- টিফিন বক্সও ছিল না, বের করে খাবার জন্য দুপুরের রোদ– ইউনিসেফ থেকে যোগান দেওয়া পাউডারের দুধে এবং বিস্কুটে সেই লাল নীল ফুটফুটে  ছেলেমেয়েরা পুষ্টি পাবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল!

নার্সারি ‘ক’ তে পড়া রাহুল স্নান করতে খুব  অপছন্দ করত। শশী ‘আজ নন্দনা আসবে, তোকে নোংরা দেখলে  কথাই বলবে না, তোর কাছে আসবেনা, আয় আয়… বলে প্রায় ফুশলিয়ে ফুশলিয়ে দমকলের কাছে নিয়ে যেত এবং চোখে মুখে সাবান মেখে স্নান করিয়ে দিত। শশী অসুস্থ হয়ে পড়া থেকে রাহুলকে স্নান করানো একটা সমস্যা হয়ে পড়েছিল।বাবা বরুণের বেতের কোব না পড়া পর্যন্ত রাহুল দমকলের কাছে যেত না। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে পার হয়ে যাওয়া বিড়াল কাঁদতে থাকা রাহুলকে দেখে যায় – বিড়াল হয়তো ভাবে কোন দুঃখে মানুষের সন্তান কাঁদে! বিড়াল কখনও ভাবে কি মানুষের কথা?

দমকলের কাছ থেকে গজেন্দ্রনাথ ধুতির আঁচলে চোখ এবং নাকের জল মুছে দিয়ে রাহুলকে সবসময় ঘরের ভেতরে– খাটটার ওপরে নিয়ে যেতে হত এবং ভেজা ধুতিটা বদলে যখন উঠোনের রশিতে মেলে দিত – সেই ধুতিটা বড়ো সুখী হত– রোদ এবং বাতাস ধুতিটা থেকে জল শুষে নেবার সময় ধুতিটা এক ধরনের আনন্দ লাভ করত।

ডিব্রুগড় থেকে আসার ৪৫ দিন পরে সেদিন শশী পুনরায় পেটের ব্যথাটা অনুভব করল। সে বিছানায় পড়েছিল। রাহুল সেদিন দমকলের পারে বাবা বরুণের বেতের দাগ এবং দুঃখ গায়ে নিয়ে দীর্ঘ কান্না জুড়ে জিদ ধরে বসে রইল যে আজ তাকে মা কোলে করে নিতে হবে। গজেন্দ্রনাথ এসে বোঝাল, অমৃতপ্রভা এসে বোঝাল, বরুণ পুনরায় কয়েকটা বেতের বারি বসিয়ে দিল–রাহুল সেদিন নট নড়ন চড়ন। বাগানের কলা গাছগুলি সবুজ কণ্ঠস্বরে তাকে বোঝাল, সুপারি গাছের জালি কাটা কণ্ঠস্বর তাকে বোঝাল, দমকলটাও এমনকি তার লৌহ কঠিন চাপা কন্ঠে তাকে বোঝাল–ওহো ! আজ রাহুল কারও বোঝানোতে শান্ত হচ্ছে না । রাহুল নয়– তার মগজে সেদিন কিছু একটা পোকা ঢুকেছিল। শয়তানের বিষ্ঠা থেকে জন্মানো পোক যা তাকে ভীষণ জেদি আর অসহিষ্ণু করে তুলেছিল। আর পুরো বাড়িটাই করে তুলেছিল বিষময়।

কান্না কান্না! লোরকার কবিতার সেই গিটারটার  মতো কান্না। শশী সহ্য করতে পারছিল না। জিনিসপত্র তোলা শশীর শরীরের পক্ষে একেবারে নিষেধ ছিল, তবু সে বিছানা থেকে উঠে এসেছিল– ঘরটা বাঁচানোর জন্য একটা শিশুর কান্না থেকে। দমকলের পার থেকে রাহুলের উলঙ্গ দেহটা কোলে তুলে নিল।শশীর চোখ থেকে টপটপ করে গরম জলের ফোঁটা গুলি রাহুলের শূন্য পেটে খসে পড়ল। কী মর্মান্তিক দৃশ্য। কান্না বন্ধ করার জন্য আরও কিছু কান্না। অমৃতপ্রভা সবার অজান্তে চোখের জল মুছতে মুছতে গোয়াল ঘরের দিকে চলে গেল।

সেই মহান কান্না বন্ধ হয়ে গেল। সেই শয়তানের পোকা  চুপ হয়ে গেল। শশী কোনোমতে রাহুলকে এনে মূল ঘরের খাটে রাখল এবং নিজের বিছানায় শুয়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে লাগল।

সেদিন থেকে শশী পুনরায় বিছানাবাসী হল। আবার তার গলার ভাত পেটে যাওয়া বন্ধ হল। আবার সেই স্যাতসেঁতে ঘরটি আঃ ইস ইত্যাদি যন্ত্রণা সূচক শব্দে ধূসর হয়ে উঠল। ঘরটা পুনরায় ব্যস্ত হয়ে উঠল। গজেন্দ্রনাথ পুনরায় দুবার করে চরণামৃত খেতে লাগল। বরুণকে খুব সকালে বাগানের শেষ প্রান্তে একটা গর্তের কাছে এলুমিনিয়ামের একটা হাড়ি প্রতিদিন নিয়ে যেতে হল। ডাক্তারেরও ডাক্তার এল‐ আবার নীপার ভূগোলের খাতার পাতা ছিঁড়ে লিখল ঔষধ- ইঞ্জেকশনের নাম। শান্তি নামের নার্সটি পুনরায় গরম জলে সিরিঞ্জ ধুয়ে নিল। এবার শান্তির মুখেও কোথা থেকে এসে একখন্ড কালো মেঘ বাসা বাঁধল। এবার আগের মতো শান্তি রাহুলদের ইঞ্জেকশনের ভয় দেখাল না।

শশী ভালো হল না। নিভে যাবার আগে প্রদীপের উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠার মতো শশীর চেহারাটা হয়তো ভালো হয়ে উঠেছিল। ডাক্তারেরও ডাক্তার বরুণ এবং গজেন্দ্রনাথের সামনে বলেছিল ‘থার্ড স্টেজ’। থার্ড স্টেজ মানে কি গজেন্দ্রনাথ বুঝতে পারেনি। বোকার মতো ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিল,’ ভালো হবে কি?’

‘ আর মাত্র কয়েকদিনের জন্য রোগি আমাদের মধ্যে আছে।’‐ ডাক্তার গজেন্দ্রনাথ এর সহ্য শক্তির ওপরে বিশ্বাস রেখে কথাটা বলল। থার্ড স্টেজ থার্ড স্টেজ… গজেন্দ্রনাথ নিজের মনে বিড়বিড় করল। গজেন্দ্রনাথ অনুভব করল তার বুকের ভেতরে থার্ড স্টেজ কিছু একটা গড়তে  আরম্ভ করেছে।

সেই নির্মাণের নাম শোকের শিল্প।

(২৭)

সেদিন ছিল অনুকূল চন্দ্র ঠাকুরের জন্মবার, অর্থাৎ শুক্রবার। রাহুলদের মূল ঘরের খাটটারপাশে একটা বড়ো আলমারির পেছনদিকে থাকা একটা ড্রেসিং আয়নার জন্য জায়গাটার নাম পড়েছিল ড্রেসিংরুম, যেখানে ছিল অনুকুল ঠাকুরের ধবধবে সাদা কাঠের আসনটা। সেখানে প্রত্যেকেই মাথা আঁচড়াত, শশী সিঁথিতে সিঁদুর দিত, সিঁদুর নেওয়ার সময় সিঁদুরের গুঁড়ো সেই ড্রেসিং টেবিলটাতে পড়েছিল। প্রতিদিন বিকেলে অনুকুল ঠাকুরের আসনের সামনে শশী ধূপধুনো জ্বালাত। শশী এখন সেই কাজ করতে না পারায় সেই কাজ করত নীপা ।নীপার সঙ্গে রাহুলও ছিল ।নীপা যদি প্রদীপ জ্বালিয়েছে, সেই প্রদীপের আলোতে ধূপ জ্বালিয়েছে রাহুল।

বরুণ অনুকুল ঠাকুরের শিষ্য ছিল। ভাই নিরোদ এবং সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে অনুকুল ঠাকুরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। গজেন্দ্রনাথ বুঝতে পারল না বাড়িতে শালগ্রাম শিলা থাকতে ছেলে বরুণ এবং নিরোদের অন্য এক ভগবানের কেন প্রয়োজন হয়েছিল!

বরুণের জন্য তার পত্নী শশীকেও অনুকুল ঠাকুরের শিষ্য হতে হয়েছিল। শশীর অসুখ চলতে থাকার ভেতরে একদিন একজন ঋত্বিক এসেছিলেন, যিনি শশীকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। ভাঙ্গাগড়ের  সৎসঙ্গ বিহারে থাকা সেই ঋত্বিকটির ‘ ‘স্টাইলিশ’  বলে নাম থাকা সেখানে থেকে নাকি স্কুল না কলেজে পড়ত। সেই ঋত্বিক কি রাহুলকে দেখতে পেয়ে বরুণ- শশীকে বলল এই ছেলেটিকে দীক্ষা দাও । সবার ভালো হবে । কথামতো কাজ। বরুণ রাহুলকে শশীর কাছে ডেকে নিয়ে গেল। আর শশী তার তপ্ত হাতে রাহুলের শীর্ণ হাতটা ধরে বলল,’ তোকেও ঠাকুরের দীক্ষা দেওয়া হবে। দীক্ষা দিলে প্রতিদিন স্নান করে উঠে ঠাকুরের আসনের সামনে বসে নাম জপ করতে হবে, তোর ভালো হবে। আমাদের সবার ভালো হবে ।আগামীকাল ঋত্বিক আসবে, তোকে দীক্ষা দেবে।’

রাহুল ‘না’ করার প্রশ্নই ছিল না; বরং উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। এতদিন রাহুল মা এবং বাবা ছাড়া অন্য কাউকে ঠাকুরের আসনের সামনে বসে মুখের ভেতরে বিড়বিড় করতে দেখেনি। তাই অনুকুল ঠাকুর রাহুলের মনে কিছু রহস্যের জন্ম দিয়ে রেখেছিল। এখন সেই রহস্যের সম্ভেদ পাওয়া যাবে। অনুকুল ঠাকুরের শিষ্য হবে রাহুল– আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল রাহুলের মন।

পরেরদিন ঋত্বিক এল। বরুণ রাহুলকে স্নান করিয়ে ঋত্বিকের কাছে হাজির করল। ঋত্বিক রাহুলকে ড্রেসিংরুমে থাকা অনুকুল ঠাকুরের আসনের সামনে নিয়ে যাবার সময় ঋত্বিক বরুণ চুলে ঘষা কেয়ো-কারপিন তেলের গন্ধ এবং গায়ে মাখা বসন্ত মালতীর গন্ধ পেয়ে সেদিকে তাকিয়ে ছিল যা সব রাখা ছিল একটি শেলফে। সেখানে শশী চুলে মাখা শালিমার নারকেল তেলের একটি ডিবেও  ছিল। ঋত্বিক নারকেল তেলের গন্ধ পেল না। খালি গা, একটা সাদা ধুতি পরে কাচ দিয়ে বাঁধানো একটা ফোটোর ভেতরে বসে ছিল ঠাকুর। ধুতির নিচে অনুকুল ঠাকুর আন্ডারপ্যান্ট পড়েছিল কিনা রাহুল বুঝতে পারল না । কিন্তু রাহুলের মনে একটা প্রশ্নের উদয় হল– ভগবান আন্ডারপ্যান্ট পরে কি? অনুকুল ঠাকুরের খালি গায়ে অবশ্যই পৈতেটা জ্বলজ্বল করে ঘোষণা করছিল যে তিনি একজন ব্রাহ্মণ ।

ঋত্বিক রাহুলকে শিখিয়ে দিল সেই বীজ মন্ত্র, যাকে গোপনে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। কাউকে না শুনিয়ে নিজের ভেতরে উচ্চারণ করতে হয়।’ রাধা স্বামী’ ‘ রাধা স্বামী’ বলে এই বীজ মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়, ঠাকুর রক্ষা করবে। আর ঠাকুরের জন্য সব সময় ইষ্টবৃত্তি হিসেবে অল্প কিছু পয়সা দিতে হয়। মাসের শেষে সেই ইষ্টবৃত্তি ঠাকুরের জন্মস্থান দেওঘরে মানিঅর্ডার করে পাঠিয়ে দিতে হয়। এটাই নিয়ম। রাহুল যেহেতু ছোটো এবং নিজের উপার্জন নেই, তাই নিজে উপার্জন না করা পর্যন্ত সে বাবার কাছ থেকে সেই ইষ্টবৃত্তির পয়শা নিতে পারবে। ঋত্বিক রাহুলকে বুঝিয়ে দিল অনুকূলচন্দ্র ঠাকুরের শিষ্যত্বের প্রাথমিক কথা। মার্কসবাদ এর ভক্তদের যেমন ‘ কমরেড’ বলা হয়, সেদিন থেকে রাহুলও অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য ‘ গুরু ভাই’ হয়ে পড়ল।

সেটা ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি কূট-কৌশল। স্নান করতে পছন্দ না করা রাহুলকে স্নান করানোর জন্য এক মহৎ ষড়যন্ত্র।

(২৮)

সেদিন অনুকূলচন্দ্র ঠাকুরের সেই জন্মবারটা ছিল দেশের কনিষ্ঠতম গুরু ভাইয়ের জীবনের কাছে সবচেয়ে নির্দয় শুক্রবার। সেদিন সকাল থেকে শশী অর্ধচেতন হয়ে পড়েছিল। কিছুই বলতে পারছিল না, খেতে পারছিল না ,চোখ দুটো বন্ধ হয়েছিল। গজেন্দ্রনাথ শশীর  নাড়ি  পরীক্ষা করে বলেছিল,’শশীকে বাইরে বের করে দিতে হবে।’ সেই অনুসারে শশীকে স‍্যাঁতসেতে শীতল অন্ধকার ডেটলের গন্ধ করতে থাকা ঘরটি থেকে বাইরের রৌদ্রে উজ্জ্বল আলোতে  নিয়ে আসা হল। একটা বাঁশের ধাড়ির বিছানা পেতে গজেন্দ্রনাথ অমৃতপ্রভাদের ঘরের প্রশস্ত বারান্দায় শুইয়ে দেওয়া হল।

প্রত্যেক শুক্রবার অনুকুল ঠাকুরের আসনের সামনে কিছু না কিছু প্রসাদ দেওয়া হত। প্রায়ই দেওয়া হত জানকি নামে বিহারি দোকান  থেকে আনা আমুল দুধের কৌটায় ভরে রাখা সাদা সাদা বাতাসার মাঝখান থেকে দশ-বারোটা বাতাসা। কখনও সেই কৌটায় বাতাসা না থাকলে দেওয়া হত একটা  চিনামাটির প্লেটে একটু চিনি। অনুকুল ঠাকুরের নিশ্চয় ডায়াবেটিস রোগ ছিল না। থাকলে গুরু ভাইরা কখনও তাকে চিনি বাতাসা এগিয়ে দিত না।

সেদিন বাতাসার কৌটাটা খালি ছিল। তাই অনুকুল ঠাকুরের জন্য জুটেছিল কেবল চিনি। অবশ্য অনুকুল ঠাকুরের সঙ্গে তার পত্নী যাকে ‘বড় মা’ এবং তার পুত্র যাকে ‘বড়দা’ বলা হত তারাও আসনটিতে গ্লাসের ফ্রেমের ভেতরে বড়ো নিশ্চিন্ত মনে বসে ছিল। ভগবান অনুকুল ঠাকুরের পরিবার খাওয়ার পরে সেই প্রসাদ এনে রাহুল মা শশীর ঠোঁটে লাগিয়ে দিতেই মা ঠোঁটটা সামান্য মেলে ধরেছিল। তিনি যেন সত্যিই কিছুটা চিনি চেয়েছিলেন– নাকি রাহুলের ছোট্ট আঙ্গুলটা চেয়েছিলেন ঠোঁটে লাগানোর জন্য।

দৃশ্যটা দেখে গজেন্দ্রনাথ একটু গঙ্গাজল শশীর মুখে ঢেলে দিল। গঙ্গাজলটা ভেতরে গেল ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য।

বিকেলেই চন্দন দাদা সাইকেল করে গিয়ে নমাটি মৌজার মৌজাদারকে খবর দিয়েছিল–’ আজ মামীর শরীর খুব খারাপ, সকাল থেকে জ্ঞান নেই।’ হরে কৃষ্ণ মামা আর রাধা মামা সাইকেল চালিয়ে এল। মুহুরী একজনকে সঙ্গে নিয়ে মৌজাদার এল একটি ট্রাকে।বরবাঙ থেকে শশীর অন্তরঙ্গ বান্ধবী, বরুণের বোন মালা পিসিও এল, হিমানী পুতলিদের পাশের বাড়িতে সমঝে  রেখে দৌড়াদৌড়ি করে এল। বউয়ের যে খুব শরীর খারাপ। বউ তো নয়, একজন গোঁসানী – মানুষের সঙ্গে থাকবে কীভাবে… নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এসে মালা পিসি কখন যে শশীর পাশে এসে দাঁড়াল নিজেই বুঝতে পারল না। মালা পিসি শশীর নিস্পন্দ মুখটা দুহাতে নাড়াতে নাড়াতে কাঁদতে লাগল–’ বউ ও বউ, এই ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের ফেলে রেখে তুমি যাবে? বাবা কীভাবে থাকবে বলতো বউ …। মালার বিলাপে উপস্থিত প্রত্যেকেই চোখ মুছতে লাগল।

রাহুল এখন যেন বুঝতে পারছিল মা শশী আগের দিন বিকেলবেলা তাকে কেন একা ডেকে নিয়েছিল এবং পাশে বসিয়ে যে কথা বলেছিল সেই সাংঘাতিক কথার মর্ম !রাহুল বিকেলে শশীর কাছে একবার যেতে শশী তাকে হাতের ইঙ্গিতে ডেকে নিয়ে পাশে বসতে বলেছিল । সে ফ‍্যাকাশে  হয়ে পড়া মায়ের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। ল্যাম্পের আলোতে সে দেখেছিল মায়ের মুখে ফুটে উঠেছে ভালোবাসার কয়েকটি বিন্দু। রেখা হতে না পারা সেই বিন্দুগুলি সে তার হাত দিয়ে আস্তে করে ছুঁয়ে দিল। তার হাতে সেই বিন্দুগুলি লেগে চলে এল।

সে মাকে বলতে চাইল– মা তুমি ভালো হয়ে যাবে, ভালো হয়ে যাবে …।কিন্তু তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল–’ মা, আমি আর কখনও তোমার কোলে উঠব না । আমাকে কোলে নেবার জন্যই তোমার শরীর বেশি খারাপ হয়েছে, মা তুমি কেবল ভালো হয়ে উঠ আমি আর তোমার কোলে উঠার জন্য জিদ  করব না, মা ,ভালো হয়ে উঠনা তুমি…।’ রাহুলের দুইগাল ভিজে গেল।

রাহুলের ভিজে গাল দুটি মা হাত দিয়ে টেনে এনে নিজের গালে জড়িয়ে নিল। ল্যাম্পের আলোতে বিদ্ধ নিয়তি মা এবং পুত্রের সেই চারটি গালকে চোখের জলে ভেজার জন্য ছেড়ে দিল মাত্র।

তারপরে মা বুকের ভেতরে আটকে থাকা কণ্ঠস্বরটা কোনোমতে বের করে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘আমি আর ভালো হব না বাছা , আমার কথা ভাবিস না । আমার মৃত্যু হলে বাবাকে আর ও একজন মা আনতে বলবি। বলবি– ফর্সা দেখে একজন মাকে আনতে। বলবি তো?’

রাহুল মাথা নেড়ে বলেছিল,’ বলব।’

সেটাই ছিল শশী পুত্রকে বলা শেষ কথা– যে কথার মর্ম উপলব্ধি করার রাহুল যোগ্য ছিল না। কথাটা বলে শশী যখন হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল রাহুল অবাক হল। শশী বোধ হয় রাহুলদের ভবিষ্যতের কিছু দৃশ্য দেখে বরুনের সংসারটির চিত্ররূপ নিমেষে একবার দেখে কেঁদে ফেলেছিল।

যে কথা শশী বরুণকে বলতে পারল না, গজেন্দ্রনাথকে বলতে পারল না, অন্তরঙ্গ বান্ধবী সদৃশ ননদ মালাকে বলতে পারল না, সে কথা শশী কেবল রাহুলকে বলে গেল। ক্যান্সারের যন্ত্রণার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাময় ছিল সে কথা। হৃদয় ভেঙ্গে যাওয়া সে কথার মর্ম রাহুল ভালোভাবে বুঝতে পারেনা বলেই শশী রাহুলের কাছে চোখের জলে ভাবতে মনে মনে একটা প্রস্তাব রেখে গেল স্বামী বরুণের জন্য।

মাকে কাঁদতে দেখে পুনরায় কান্নায় উথলে উঠল রাহুল। মা রাহুলের চোখের জল মুছে দিয়ে একটা ট্রাঙ্কের  দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল,’ ওই ট্রাঙ্কটার ভেতরে একটা গোলাকার কৌটা আছে, তোরা সেই কৌটোটা দেখিস নি, একটা চকলেটের কৌটো। আমাকে শৈশবে বাবা দিয়েছিল– ওতে কিছু টাকা আছে। বাবাকে বলবি আমার শ্রাদ্ধে খরচ করার জন্য…’

ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া শশী নিজেকে সামলে নিয়ে রাহুলকে নির্দেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘তোরা ভালোভাবে থাকবি। একে অপরকে এভাবেই ভালোবাসবি, যেভাবে আমি তোদেরকে ভালোবাসতাম। নতুন মাকে ‘মা’ বলে ডাকবি। নতুন মাকেও আমার মতো ভালোবাসবি…’

অনুকুল ঠাকুরের প্রসাদ চিনির প্লেটটা নিয়ে রাহুল হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল। কাল বিকেলে মা তাকে বলা কথাগুলির অর্থ সে এখন যেন ভালোভাবে বুঝতে পারল! তার বুকের ভেতরটা কেউ যেন চেপে ধরল। মা তাহলে সত্যিই চলে যাবে। মা মরে যাবে! আর কোনোদিন আসবেনা! কী হবে- এই ঘরটার কী হবে!

সে মাকে তার শেষ চুমুটা দিতে চাইল। সে মায়ের নিস্পন্দ মুখের দিকে ঝুঁকে গিয়ে মায়ের ঠোঁটে একটা চুমু দিতে চাইছিল মাত্র, তখনই মালচন্দ আগরওয়ালা তার কাঁধে ধরে তাকে সরিয়ে আনল, বলল,’ধ‍্যাৎ! কী করছিস?’

সে বলল, ‘মাকে একটা চুমু খাব।’

‘ এই সময়ে চুমু খেতে নেই।’– মালচন্দে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল।

রাহুল থেমে গেল। সেই চুমুটা‐ যা শেষবারের জন্য মাকে সে দিতে চাইছিল‐ ঠোঁটের কাছে এসে যে চুমু স্থবির হয়ে গেল‐ সেই চুমুটা আজও রাহুলের ঠোঁটে অস্থির হয়ে রয়েছে‐- লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই শেষ চুমুর তৃষ্ণা। একটা শেষ চুমু… একটা শেষ চুমু তার ঠোঁটে হাহাকার করতে থাকা শেষ শেষ চুমুটা কাকে দেবে রাহুল এই পৃথিবীতে?

একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা ( ১১ম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদ: বাসুদেব দাস

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top