ক্ষতচিহ্ন II কাজী লাবণ্য

                  (১)

 ওঁত পেতে থাকা বিড়াল যেমন পা পা করে এগিয়ে আসে শিকারের দিকে ধরলা তেমনি প্রতি বছর কখনও সশব্দে কখনও নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে তোজাদের ভিটার দিকে। প্রতি বছর নতুন করে আরো কয়েক ধাপ অসহায়ত্বের দিকে কুঁজো হয়ে পড়ে তোজাদের বাড়ির প্রতিটি সদস্য। বহুদিন ধরে তোজার বাবা আইজুদ্দি এই এলাকা থেকে অন্যত্র চলে যেতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো আর হয় না। আইজুদ্দির বাবার বাবা কিংবা তার বাবার বাবা এই ভিটেমাটি নিজেদের জন্য ক্রয় করেছিল। ভাগের ভাগ পেয়ে আইজুদ্দি এখানে যাপন করে যাচ্ছে নিজেদের ভাঙাচোরা জীবন।
এখান থেকে চলে গেলে, কে জায়গা দেবে বাড়ি করার! তাছাড়া নিজে এক ফালি জমি কিনে বাড়িটা সরিয়ে নিয়ে যাবে সে সামর্থ্যও তার নাই। তবে নদী যদি একেবারে গিলে খেতে আসে তখন দেখা যাবে। যদিও নদীই একমাত্র সমস্যা নয়, সমস্যা আরো আছে। একদিকে নদীর ভাঙন আরেকদিকে পানীয় পানির অভাবে আইজুদ্দিরা একেবারে নাজেহাল।
গত ক’ বছর ধরে নানা চিন্তা ভাবনা, শলা পরামর্শের পর, অভাব আর বেকারত্ম ঘোচানোর আশায় জমানো কিছু টাকা দিয়ে নয়াহাটে একটা রিকশা/ভ্যান মেরামতের দোকান খুলে বসেছে তোজা। জমানো টাকায় অকুলান হলে দোস্ত নরেনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছে।
গ্রামে এখন ধান উঠেছে। বাড়ি বাড়ি মানুষের খুলিতে ধানের গাদা। ভ্যানের চাকা থেমে থাকে না। আর থেমে থাকে না বলে তোজার মেরামতিও থেমে নেই। ধানের ভারে চলমান চাকার ব্যস্ততায় হাতে কিছু পয়সাকড়ি আসে। দুপুর গড়িয়ে গেছে। ক্ষুধায় পেটে মিলিটারির ডাবল মার্চ চলছে। বাইরের ছড়ানো ছিটানো জিনিস গুলো দ্রুত হাতে খুপরি দোকান ঘরটায় চালান করে দিয়ে ঝাঁপটা ফেলে গামছাটা একটা ঝাড়া দিয়ে মাথায় পেচিয়ে নিয়ে হাঁটা ধরে সে। রাতে দু’ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে গেছে, এখন একেবারে চিরবিরে রোদ উঠেছে। বাড়ির অনেকটা পেছনে ধরলা নদী, পাড়ার মানুষেরা নদীতেই গোসল সারে। গরু বাছুরের গোসল, পানি খাওয়ানো সব চলে নদীতে। আবার নদী শুকিয়ে ওই দূরে সরে গেলে তখন সবার কষ্ট বাড়ে।
নদীর পাড়ে এসে মাথার গামছা খুলে কোমরে জড়িয়ে লুঙ্গিটা খুলে রেখে পানিতে ঝাঁপাতে যাবে এমন সময় বুকটা ধড়াস করে ওঠে, ‘আইজ বৈকালে না বুবুক দেখতে আসপে’।
সকালে পাকা কাঁঠাল দিয়ে একপেট পান্তা খেয়ে বেরুবার মুখে মা বলেছিল,
-তুই কখন আসপু? অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলে,
-আরে, তোর ফম নাই! আইজ বৈকালে তহমিনাক দেকির আসপে।
-অ। তা আসুক। এলা মুই কি করিম? দোপোরে তো ভাত খাবার আসিম এলা।
-সে কতা নোয়ায় রে বাপ, মানুষ আসপে চা পানির যোগাড় করা নাগবে না!
-অ, আইচ্ছা। শিঙারা, জিলাপি, চাপাতা, আর খিলি পান আনিম এলা। আর কিচু নাগবে! আইচ্ছা মুই গেনু।
পা বাড়িয়ে আবার ঘুরে সে ঘরের দিকে যায়। দরজা থেকে উঁকি দিয়ে, ঘরের পেছনে চলে যায়। সেখানে কলাগাছ, আর বেহায়া বা ঢোলকলমির ঝাড় দিয়ে ঘেরা কলপাড়ে বুবু দাদীর গোসল করিয়ে দিচ্ছে। কলপাড় বটে কিন্তু কল দিয়ে পানির বদলে যেন রক্ত ঝরে। দাদীর গোসল শেষ, তোজা দড়িতে ঝুলানো ক্ষয় হওয়া গামছা খানা টেনে নিয়ে বুবুর বাড়ানো হাতে দিয়ে মৃদু কন্ঠে বলে,
-বুবু, মুই গেনু। বুবু কোনো উত্তর দেয় না। বুবু কথা না বললেও দাদী খুনখুন করে ওঠে-
-ভাই, পন্তা খালু? কাটোল পাকচে, কাটোল খালু? প্যাট ভচ্চে? ককন আসপু? আইজ বোলে তহক দেকপার আইসপে? মোক কায়ও কোনো কতা কয় না, কিন্তু মুই বোজো আইজ বৈকালে সাগাই আসপে…
-হ, মোর প্যাট ভচ্চে। থাক মুই দোকানত গেনু।
-যা ভাই যা। হে খোদা রহম করো, গরীবের কায়ো নাই, গরীবের উপর রহম করো। আইজ বৈকালে অরা যেন মোর তহক আদর করি বউ করি নিয়া যায়। মোর দোয়া কবুল করো খোদা। মুই বুড়া মানুষ চউকে দেকো না, মোর নাতনি তহর মোতন মাইয়া হয় না। অয় এত ভালো খোদা, অর একটা বিয়ার যোগাড় করি দেও খোদা।
বিরাট বড় মুনাজাত শেষে বুড়ি খুনখুন করে কাঁদতে থাকে। সব কথার শেষে তার কান্না রোগ আছে।
তহমিনা দাদীকে ধরে ধরে নিয়ে এসে ঘরের দাওয়ায় পাতা চৌকিতে বসিয়ে দেয়। এখানেই বুড়ি সারাদিন বসে থাকে। এখানেই তার খাওয়া, নামাজ পড়া, শোয়া, ঘুম সব কিছু চলে।
দাদীকে রেখে তহমিনা মাকে সাহায্য করতে গেলে মা বলে,
-শুন, কাম সউগ হয়া গেইচে, এগিলা মুই একলায় পারিম। আর সাবিনা স্কুল থাকি আইলে অয় বাকি কাম করবে এলা। তুই যাতো গা ধুইয়া, চুল গুলা শুকি ফেলাও। তহমিনা মাটির দিকে তাকিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল মাটিতে ঘষতে থাকে। এইসব দিনগুলোতে ওর মন অসম্ভব খারাপ থাকে। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারে না। সে জোর করে মায়ের কাজে হাত না দিয়ে বুকের ভেতরের একটা দীর্ঘশ্বাসকে মুক্তি দিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
-মাওরে! পেছনে ডিমের কুসুমের মতো নরম স্বরে ডেকে ওঠে মা। তহমিনার পা থেমে যায়, কিন্তু সে সহসা মুখ ফেরাতে পারে না।
-ধর, নেতো এই সোডা দিয়া ভালো করি ডলি ডলি দাঁত ঘষি, সাবোন দিয়া গাও ধুইয়া আয়। তহমিনা মুখ না ফিরিয়ে, কোন শব্দ না করে পেছনে হাত বাড়িয়ে কাগজের পুটলিটা হাতে নিয়ে গোসলে যায়। গোসলের পানির সাথে কতযে চোখের পানি মিশে যায় কে তার খবর রাখে!

(২)

ধরলা নদীর তীরবর্তী এলাকা। বহু আগে এই পাড়া ছিল গমগমে। এলাকার পানিতে এত আয়রন যে পানি পানের অযোগ্য। রক্তের মত লাল, দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেয়ে এলাকার মানুষ সারা বছর পেটের পীড়া, চুলকানিসহ নানা অসুখে ভোগে। মাথার চুল উঠে যায়। হাতের নখ, দাঁত নষ্ট হয়ে যায়। কাপড় চোপড় হয়ে যায় লালচে দাগ দাগ এবং দুই এক ধোয়ার পরেই ছিঁড়ে যায়। সংসারের হাড়ি, পাতিল, জিনিসপাতি সব নষ্ট হয়ে যায়। পানি কেউই পান করতে পারে না। যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা ডিপ টিউউয়েল বসিয়েছে, কিন্তু তেমন কোন সমাধান হয় নাই। সামর্থ্যবান মানুষেরা অনন্যোপায় হয়ে যে যার মত অন্যত্র চলে গেছে। তলানি যে কয় ঘর আছে, আইজুদ্দি তাদের একজন। তার যাবার কোন জায়গা নাই। এই পানির ভাবনা বড় মারাত্মক। বাবায় বলত পানি হইলো খোদার রহমতের নমুনা। কিন্তু সে রহমত ওদের জন্য বরাদ্দ নয়।
বর্ষাকালে নদী যখন ভরাট থাকে লোকজন নদীর পানিতে গোসল, ধোয়াধুয়ি, মাজাঘষা, সেরে নেয়। বাড়ীর কাজের জন্য অনেকেই বালতি, কলসি নিয়ে নদী থেকে পানি আনে। কিন্তু সে আর কয়দিন! সমস্যা থেকেই যায়। এ স্থায়ী সমস্যার কোন সমাধান নাই। এ অঞ্চলের মেয়েদেরকে কেউ বিয়ে করে না। সবার দাঁত লাল, নখ কালচে, মাথার চুল লালচে ছেঁড়া ছেঁড়া, পাতলা। নিজেদের পাড়ার মধ্যে কারো কারো বিয়েশাদি হয় কিন্তু এই ছোট্ট বসতিতে ক’জন আর যুবক ছেলে থাকে!

আইজুদ্দি একজন ফেরিওয়ালা। প্লাষ্টিকের থালা, বাটি, কৌটা, ইত্যাদি ফেরি করে বিভিন্ন এলাকাজুড়ে। বড় মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে, চেষ্টাও চলছে, কিন্তু নখ, দাঁতের রঙ, চুলের কারনে সব সম্বন্ধ ভেঙ্গে যায়। এই নিয়ে কতবার যে মেয়ে দেখার আয়োজন হয়েছে তার হিসেব কে রাখে! আজ আইজুদ্দি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। বিকেলে মেয়েটাকে দেখতে আসবে। নদীতে যাবার সময় নাই, সে কল চেপে ঐ লাল পানিতেই গোসল সেরে নেয়। মনে মনে ভাবে টাকা থাকলে একটা গভীর নলকূপ বসিয়ে দেখত পানি ভালো হয় কিনা। কিন্তু একটা গভীর নলকূপ বসাতে প্রচুর টাকা লাগে, অত টাকা কোথায় পাবে সে! তোজার ছোট বোন সাবিনা আর ওর ছোট ভাই তোরাব স্কুল থেকে ফেরে। সবাই গোসল সেরে অপেক্ষা করে, তোজা ভাইয়া ফিরলে একসাথে খাবে। সময় বয়ে চলে ছোটো তোরাব একসময় মাকে বলে,
-মা, মোক খুবি ভোক নাগচে। মা ওকে ভাতের থালা সাজিয়ে দিলে সে চৌকিতে দাদীর কাছে বসে দাদীসহ খেয়ে নেয়।
আইজুদ্দি বারবার বাইরের খুলিতে যাওয়া আসা করে, একসময় অতিষ্ট হয়ে বলে,
-আইজ তোজা এত দেরি করোচে ক্যানে, আইজ মানুষজন আইসপে, আর আইজ চেংড়াটা এলাও নাই!
দে, মোক ভাত দে। আজকাল ভোক সহ্য হয় না। একসময় সবাই খেয়ে নেয়। কেবল তহমিনা ভাইয়ের আসার অপেক্ষায় থাকে। আসলে ওর খেতেও ইচ্ছে করে না। তোজা তো এত দেরি করে না। মা ভাতের থালা নিয়ে গিয়ে তহমিনাকে কয়েক লোকমা খাওয়ায় দেয়। ঢোক গিলে তহমিনা বলে,
-মা, আর খাইম না। ভোক নাই।

 

(৩)
নদীতে ঝাঁপ না দিয়ে ছেড়ে রাখা লুঙ্গিটা আবার পরে নিয়ে, মাথায় গামছাখানা পেঁচিয়ে সে পা বাড়ায় নয়া হাঁটের দিকে। মাথার উপর নিদাঘ বেলাটা পড়তে পড়তেও সেদ্ধ ধানের মতো তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবে, ‘বুবুর বিয়াটা হয়া গেইলে, টাকা জমলে একটা সাইকেল কিনবে’। সাইকেলের কথা মনে হলেই তোজার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, চলার গতি বেড়ে যায়।
এতখানি পথ হেঁটে এসে দেখে পরানের দোকানে এখনও জিলাপি ভাজা শুরুই হয়নি। সব শুনে পরান বলে,
-এই, এনা বইসো তোজা দা, এই টপ্পাস করি ভাজি দিয়া দেওচো।
সবকিছু নিয়ে তোজা বাড়ির পথ ধরলে বেলার দিকে তাকিয়ে বুঝে যায় বিকেল হয়ে গেছে। সে আর নদীর দিকে না গিয়ে সোজা বাড়ির মুখে হাঁটতে থাকে। পথেই দেখা হয় নরেনের সাথে। সে হেড়ে গলায়,
‘নদীর একুল ভাঙে, ওকুল গড়ে এইতো নদীর খেলা, সকাল বেলা আমির, রে ভাই ফকির, সন্ধ্যাবেলা’… গাইতে গাইতে আসছে। গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-কিরে! তুই এলানি বাড়ি আইসোচিস! আইজ না তহমিনাক…
-আরে কইস না। ভুলে যাওয়ার ঘটনা তোজা খুলে বলে। এমনিতেও বিকেলে নরেনের আসার কথা ছিল। এমন দিনগুলাতে নরেনকে আসতে বলে দেয় তোজা। অবশ্য দরকারের সময়, না ডাকলেও ঠিক নরেনকে পাশে পায়। প্রায় সময় দুই দোস্ত নদীর পাড়ের ফুরফুরে বাতাসে বসে বসে অভাবের তীব্রতাকে মাড়িয়ে দিয়ে কিভাবে সতেজভাবে বাঁচা যায়, তার নানাবিধ রাস্তার সুলুক সন্ধান করে।

দুই দোস্ত বাড়িতে ঢুকে দেখে মানুষজন এসে গেছে। ছোট্ট আগনায় প্লাস্টিকের চেয়ার টুল দিয়ে বসানো হয়েছে। মা রান্নাঘরে, বাবা ব্যস্ত হয়ে একবার ঘর, একবার রান্নাঘর আর বাইরের দেউরির কাছে যাওয়া আসা করছে। পাশের বাড়ির ভেলু চাজিও আসছে। নরেন গিয়ে দাঁড়ালো মানুষজনের পেছনে। তোজা গেল রান্নাঘরে।

-এলানি আলু! তোর দেরি দেকি তোর বাপ এক্কেরে আউলা হয়া উটচে। ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে মা প্লেট, পিরিচে খাবার সাজাতে লাগলো।
তোজা সোজা ঘরে গেল। বুবু ওর নকশা পাড়ের সবুজ রঙের শাড়িটা পরে বসে আছে। মাথার পাতলা চুলে আর বিনুনী বাঁধা যায় না তাই হাত খোঁপা করে রেখেছে। হ্যাংলা পাতলা, গায়ের রঙ মাজা, মুখে দাগ, লালিত্যহীন বুবুটাকে এই সবুজ শাড়িতে ভালই লাগে।
তোজা গিয়ে বুবুর পাশে বসে।
-শুন, চুলারপাড়ে যা, ভাত তরকাই আচে আগে খায়া নে। পরে কাম কাজ কর। শুতি থাকিস না, উট, যা।
-হ, যাওচো। বুবু তোক খুবি সোন্দর নাগোচে।
বরপক্ষের লোকজন অস্থির হয়ে উঠেছে। যেন তারা ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছে, বা ট্রেন ধরবে, এমন তাড়া। ইতোমধ্যে, নরেন খাবার দাবার এনে দিয়েছে, তারা খেয়েও নিয়েছে। কেউ একজন বলে উঠলো,
-কই মাইয়াক ধরি আইসো, এত দেরি ক্যানে? তোজার বাপ একটা লাফ দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে দেখে কেউ নাই। দৌড়ে আবার ঘরে যায়। তোজার মাকে বলে-
-আরে, অক আনো ক্যানে! দেরি করেন ক্যানে!

(৪)
ওরা ৫/৬ জন মানুষ তহমিনাকে একের পর এক নানারকম প্রশ্নবাণে ক্লান্ত করে তোলে। এবারে একজন মুরব্বি বলে,
-মা, ওটো তো এনা হাঁটাহাঁটি করতো। হাঁটা শেষ হলে, আরেকজন বলে,
-কই মা, এই একটা সুরা মুখস্ত কন তো। সেটাও শোনা হয়। এবারে একজন বলে,
-মা, দাঁত গুলা এনা দেখান তো। তহমিনা মুখ তোলে না। আবার বলে,
-মা একনা হি করো।
একেতো ওর দাঁত লাল, তার উপর এত মানুষের মাঝে কেমন করে সে মুখ তুলে দুই ঠোঁট ফাঁক করে হি-ই করবে! লজ্জায় ওর থুঁতনি বুকের সাথে লেগে যায়।
-কই মা, হি কর ক্যানে! পাশেরজন আবার একই কথা আরো জোর দিয়ে বলে।
-কই! আরে! দাঁত দেকান বাহে… একই বাক্য যেন ইকো হতে লাগলো ৫/৬ জন মানুষের মধ্যে।

তহমিনা অনড়।
লজ্জা! প্রতিবাদ! ঠিক বোঝা যায় না। যেন দুটো পক্ষ দাঁড়িয়ে গেল।
ভেলু চাজি তহমিনার কানের কাছে মুখ নিয়া সস্নেহে বলে,
-কর মা, দেকির চাওচে, দাঁতগুলা দেখায় দেতো। তহমিনা মুখ তোলে না।
-আরে! হি করো ক্যানে বাহে, করো, করো, দাঁত দেকান…অসহিষ্ণু চিৎকার ভাসতে থাকে ছোট্ট আগনায়।
-বাপরে! এই মাইয়া তো হেকরি, জিদ্দি, কতা শোনে না! এর দাঁতত বড় সমিস্যা আচে। তখন ছেলের বাপ মুখ থেকে পানের পিক পিচিক করে ফেলে দিয়ে বলে ওঠে-
-এই মাইয়া হইবে মোর বেটার বউ! ওরে বাপরে বাপ! এয় তো খুব জিদ্দি মাইয়া।     মোর বুজা শ্যাষ, এদিককার পানি যেমন গরুর মুতের মতোন নাল, আর মাইয়া গুলার দাঁতগুলাও তরমুজের বিচির মতোন, এ বাড়িত সাগাই করা যাইবে না। হইচে তোমরা ওটো সোবায়…

তোজা দাঁড়িয়ে ছিল ছেলের বাপের পেছনেই। ঘটকের মাধ্যমে আগেই জানানো হয়েছিল, যে এই এলাকার পানিতে আয়রন আর সে পানির জন্য মেয়েদের এই সমস্যা। সেসব মেনে নিয়েই ওরা এসেছে। আর এখন নানারকম বাহানা করছে। তাছাড়া বুবুর এমন অপমান ওর কোনদিনই ভালো লাগে না।
ক্ষুধা, তৃষ্ণায়, ক্রোধে, অপমানে তোজা হঠাত মুরব্বির চেয়ারের পেছন ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়া গর্জে উঠে,
-কি! কি কইলেন! পানি গরুর মুত! ঘটক তোমাক কয় নাই, হামার এদিককার পানি লাল। হামার বইনের দাঁত লাল! চেয়ার টানাতে মুরব্বি তাল সামলাতে না পেরে হঠাত মাটিতে পড়ে যায়। তোজা সেদিকে তোয়াক্কা না করে একেবারে মুরব্বির বুকের উপর বসে গজরাতে থাকে
-কি, কতা কননা ক্যান? ঐ শালা ঘটক, তুই সউগ কতা ভাঙ্গি কইস নাই? ওদিক থেকে ঘটক ত্বরিত বলে ওঠে,
-হ, ভাইয়া কইচি ভাইয়া, সউগ কতা ভাঙ্গি কইচি। কিছু বাদ থুই নাই।
-তাইলে! ঐ বুড়া হাবড়া! মোর বইন কি ধরল্লা নদীর পানিত ভাসি আইচে! বেটার বাপ বলি তোর কতার এত ধার! তোর বেটা কি জমিদার! তায় কি দেকতে সিনেমার নায়ক! তোর বাড়িত কি তোরা শরবত খাইস! আর হামরা গরুর মুত খাই! পানি লাল সেটা কি হামার দোষ! নরেন এসে তোজার হাত ধরে টানতে থাকে,
-তোর কি মাতা আউলি গেল! চুপ করত, চুপ কর! উটি আয়…
-না, মোর মাতা একদম ঠিক আছে। ওরা জানি শুনি ক্যান মোর বুবুক অপমান করোচে, কয় হ্যাকরি, জিদ্দি। এই বুড়া! মোর বুবু হেকরি! বিয়া হওচে না বোলে বইন নিয়া কী একেবারে আতান্তরে পড়চি! এ্যা!
মুরব্বি এমনিতেই মাটিতে পড়ে গেছে, বুকের উপর বসে তোজার গর্জনে ভয় পেয়ে একেবারে বেদিশা হয়ে মিনমিনে গলায় বলে ওঠে,
-বাবা, হইচে, ছাড়ি দেও! হামাক এনা পানি দেও বাবা। নরেন দ্রুত উঠে পড়ে,
-জল! কাকী, এক গ্লাস জল দ্যান কাকি…
-ওরে বাবারে! এয় ফির হেন্দু নাকি! শ্যাষে মালাউনের হাতে পানি! নারে বাবা, জল না বাবা, হামাক কায়ো এনা পানি দেও
-শালা বুইড়া, তোর মোকোত গরুর মুত দেইম। জল না, পানি না, গরুর মুত তোর জন্য উপযুক্ত। তুই সাগাই করবু না! হাহ! তুই কায়রে বুড়া! তোর সাথে হামরায় সাগাই করমো না। যাহ!
-তোমার বাড়িত মালাউন ঘোরে ক্যান?
-শালা, ফির কতা কইস! তাতে তোর কি! ওই মালাউনের সাতে বইনের বিয়া দেইম তাও তোর ঘরত দিবার নাই। ভাগ শালা!

সকলের চেষ্টায় এক সময় হট্টগোল থেমে যায়, তারা চলে যায়, সব শান্ত হয়ে আসে।
তহমিনা ঘরে গিয়ে শাড়ি ছেড়ে ধির হাতে ভাঁজ করে রেখে নিত্য কাজে হাত লাগায়। সান্ধ্য প্রার্থনা সঙ্গীতের মত দাদীর গুনগুন কান্না শোনা যেতে থাকে…

পশ্চিমাকাশে তখন অজস্র লাল মেঘের ছড়াছড়ি। ওগুলো যেন মেঘ নয়। যেন অসংখ্য অবিবাহিতা মেয়েদের ক্ষতচিহ্ন। অপেক্ষায় আছে কখন এই অঙ্কের যবনিকা পতন হবে! বছরের পর বছর কী একই আয়োজন হবে আর পণ্ড হবে!
**

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top