কাছিম কন্যার আনুপূর্বিক জন্মগ্রহণ  II সৈকত বিশ্বাস 

দুর্দম প্রোটিন চাহিদার ধাক্কায় রাস্তা ছেড়ে শুকনো খাড়িতে নেমে পড়ল ময়জুদ্দি । কয়েক মাস পেটে মাছ মাংস নাই। পতিত জমি আর ঝোপঝাড়ের শাক লতা কঁচু দিয়ে ভাত। জীবন বাঁচে। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষের বংশগতিতে প্রোটিন চাহিদা আছে। খালবিল ডোবা খাড়িতে জন্মানো বিচিত্র মৎস্যকুল এই চাহিদা তৈরি করেছে। আজকাল সেই চাহিদা তার ভাবনাকে বার বার তাড়িত করছে। বৃষ্টি নেই বহুদিন। ডোবা গর্ত সেচে সব তুলে নিয়ে গেছে যে যতটুকু পারে। গভীর কাঁদায় লুকিয়ে থাকা শোল টাকি’র শেষ বংশধরগুলো বাদ যায়নি। অথবা সর্পিল কুঁচে। আগে বারোমিশালী মাছের ঝুড়ি নিলামে ওঠার সময় কুঁচে মাছগুলো ছুঁড়ে ফেলা হতো। এখন তা জিওল মাগুরের চাইতেও দামি।

কবে শেষবার পরিবারের পাতে মাংস দিতে পেরেছে ময়জুদ্দি, মনে নেই। তাই অবচেতন মন চৈত্র মাসের আগুন সকালটাকে থামিয়ে রেখে শুকনো বিলের রাস্তা ছেড়ে খাড়ির ঢালে নেমে পরে। ধান কাটা হয়ে গেছে। নাড়া ভর্তি হলুদ মাঠ। কুশলী ইঁদুরগুলো বর্ষা প্রলম্বিত হওয়ার খুশিতে মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত গর্তে গর্তে  লুকোচুরি খেলছে। হাঁটতে হাঁটতে ঢালের গায়ে  কি যেন খুঁজছে মধ্য চল্লিশের ময়জুদ্দি। শোলা গাছের ঝোপ মাড়িয়ে যেতে মছ মছ শব্দ হয়। ঝিরঝিরে বাতাসে বাবলা গাছের পাতাগুলো ভরতনাট্যম দেখাতে দেখতে ঝরে পড়ছে মাটিতে ।

একটা গর্তের মুখে ঢেলা সরাতেই দেখা গেল তাকে। কিন্তু চোখ বুজে আসা ঝলসানো রোদ্দুর। দুইচোখ কুঁচকে গর্তের কাছে মুখ নিয়ে যেতেই প্রথমে মনে হল সাপ। একটা লাঠি নিয়ে খোঁচা দিতেই আরেকটু ফাঁকা হলো। পাশের গর্ত থেকে ভুর ভুর করে উড়ে গেল কয়েকটা ভরুই পাখি। তাদের ধূসর বাদামি ডানার বাতাস কানে লাগে। কানের লতিতে হাত বুলাল ময়জুদ্দি। ছোটবেলায় এই ভরুই পাখির বাসা খুঁজতে গিয়ে কতবার সাপের ফনার মুখোমুখি হয়েছে সে।

কোমরের গামছা খুলে হ্যাটের মতো ধরে রোদ আটকে মুখটা আরো কাছে নিয়ে গেল গর্তের । বর্ষায় বুক ভরা জলে ডুবে থাকে বাড়াদী বিল। মাঝ বরাবর মাটির রাস্তার পাশে খাঁড়িগুলো তখন বিলের সঙ্গে একাকার । বেগুনী , নীল হলুদ শাপলা আর কতরকম জলজ ফুল। একা অথবা জোড়ায় অথবা ঝাঁক ধরে পাখি আসে।  কানি বক, ধলা বক, পানকৌড়ি অপেক্ষা করে দিনমান। তিত পুটি , টেংরা , খোলসে, টাকি, শোল, বাইম, মেনি, গুতুম  মাছের ভিড়। সেই বিল এখন শুকিয়ে খাঁ খাঁ।

কয়েকদিন ধরেই ময়জুদ্দির মাছ মাংস খেতে ইচ্ছে। এরকম ইচ্ছা মাঝে মাঝেই করে।  কিন্তু এই খরার দিনে না আছে কাজ না আছে মাছ।  শৈশব দিনে এরকম ভরুই ফাঁদ পেতে ধরেছে অনেক।  গোটা একেকটা টুকরো মায়ের হাতে সামান্য হলুদ মরিচ লবন আর দারুচিনির মিশেলে দারুণ গন্ধ ছোটাত। ঝোল দিয়ে পুরো থাকা ভাত খেয়ে পাতের মাঝখানে যত্ন করে রেখে দিত টুকরোটা ।  কয়েকবার চেটে আবার রেখে দিত। সবশেষে নরম হাড়গুলো মুড়মুড় করে চিবোতে চিবোতে শৈশবের সর্বোচ্চ সুখ উপভোগ করতো সে।

আকাশে একটুকরো ধূসর মেঘ উড়ে যাচ্ছে এখন। তার ছায়ায় ময়জুদ্দি দেখতে পেল সেই গর্তে একটা কাছিম। গ্রামের লোকে কেউ কাছো বলে কেউ কাট্টা। গর্তের দিকে হাত বাড়ায় সে । কাছিমটা নড়ে ওঠে। জ্যান্ত। এই উম্মুল খরার দিনে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। বর্ষা এলে ভরে উঠবে এই বিল। তখন আবার সাঁতরে বেড়াবে নতুন জলধারায়।

ময়জুদ্দির জিহ্বা ভিজে উঠেছে। প্রোটিনের চাহিদা নেশার মতো এসে দাঁড়িয়েছে জিভের ডগায়। হাত বাড়িয়ে ধরে। আশপাশে কেউ নেই। গামছার মধ্যে উল্টো করে বেঁধে ফেলে দ্রুত। তারপর হালকা আনন্দে ঢাল বেয়ে আবার রাস্তায় উঠে দ্রুত বাড়ির পথ ধরে।

আলী হোসেন এদিক আয়, বলেই সোজা কুয়োর পাড়ে চলে গেল ময়জুদ্দি। ওর সাত বছরের রোগা পাতলা ছেলে আলী ছুটে এল বাবার কাছে। তার হাফপ্যান্টের বোতাম নেই , গিট্ দিয়ে কোমরে বাধা। চেন না থাকায় একটু এদিক ওদিক হলেই পেন্ডুলামের মত শিশ্নটা  বের হয়ে দোল খাচ্ছে।

কি উডা ?

নবী হোসেনেক ডাক।  আলী হোসেন সেখান থেকেই চিৎকার করে ওঠে ভাই, ভাই  এদিক আয়।

ময়জুদ্দি তখনো গামছা খোলেনি।  নবী হোসেন হাত দিয়ে পরনের গামছাটি ধরে আস্তে আস্তে এল। তার খৎনা হয়েছে।  কিন্তু কোনো অনুষ্ঠান করা যায়নি। একটুকরো মাংস বা খিচুড়ি কোনো কিছুই না। ময়জুদ্দির হাত খালি।  সারা বছর কোনোমতে চলে গেলেও এসময় মাস দুতিন একেবারে শূন্য। সঞ্চয়ের দুই হাজার টাকা চলে গেল বৌয়ের চিকিসৎসায়। তার এখন ছয়মাস। একটা কন্যার শখ।  আলী হোসেন আর নবী হোসেনের পর একটা কন্যা হয়ে গেলেই ময়জুদ্দি ভ্যাসেকটমি করতে রাজি। একটা লুঙ্গি আর এক হাজার টাকা পাবে। সেভাবেই গ্রামের পরিবার পরিকল্পনা কর্মী কথা দিয়েছে।

কি উডা ?

ময়জুদ্দি গামছাটা খোলে।  আলী আর নবী দেখল একটা মাঝারি সাইজের কাছিম চিৎ করে রাখা। তার বুকের দিকটা সাদা।

আব্বা, কি করবা?  কাটবা ?

আলী হোসেনের প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই নবী হোসেন বলে – মায় শুনলি পর জিন্দেগী ঠান্ডা করে দিবিনি। নবী হোসেন খুব চটপটে। সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায় সারাদিন। দুরন্তপনা ছাপিয়ে যদি আরো কিছু বলা যায় সে তাই। উঠতি ছেলেরা তাকে নিয়ে মজা করে।  কখনো সিগারেট ধরিয়ে তাকে দিয়ে টান দেয়াই। গাছে তুলে দেয়, ছোটখাটো ফলমূল চুরি করতেও পাঠায়। খৎনা হওয়ায় এই ক’দিন সে বাড়িতে।  আজকাল দুচারটা হিন্দি শব্দ শিখে এসেছে পাড়ার ছেলেদের কাছ থেকে। জিন্দেগী, মাগার, কাহা হ্যায়, লেকিন  ধরনের শব্দ বলে বড় ভাই আলী হোসেনের ওপর হিন্দি ভাষার জ্ঞান ফলায়।

তোর মাক আমি বুঝাবোনে।  আজকাল সকলেই খায়। খারাপ কিছু না

তয় আমরা খাই না ক্যান ? সবাই জালে পাড়ায় বেচতি যায় ক্যান ?

নবী হোসেন বলে ভাই তুই কাউরে বলবিনে। আমরা কব মুরগির গোস্ত খাইছি।

কাউরে কিচ্ছু কওয়ার দরকার নাই। আগে আমি কাটে ধুয়ে ফেলি তারপর দেকপানে কি করা যায়।  ছুরি আন।  আর দুইখান কলার পাতা কাটে আন

নবী হোসেন ঘর থেকে চুরি বের করে দুটো কলার পাতা কেটে আনলো।

কাছিমটা সোজা করতেই চার পা বের করে হাঁটা শুরু করল।  ময়জুদ্দি বলে , চিৎ কর চিৎ কর।  আলী হোসেন ওটাকে চিৎ করে রাখল আবার।  ছুরিটা একটা আধলা ইটে ঘষে ধার দিয়ে এনে কাছিমের খোলসের নিচে নরম জায়গাটায় ঢুকিয়ে দিল। বাম হাতে খোলস চেপে ধরে সেই চুরি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গোল করে কেটে ফেলতেই তাজা লাল রক্তে ভিজে উঠল সবুজ কলার পাতা।

আলী হোসেন বলল, উহ ম্যালা রক্ত।

চারপাশ কেটে খোলস আর নিচের অংশের মাঝখানে হাত দিয়ে টান দিয়ে খুলে ফেলল। কাছিমটা তখনো মাথা বের করছে বাঁচার চেষ্টায়।

মরিনি।  আব্বা গলা কাটো। গলা কাটো।

ওর গলাখেন কিন্তু আমি খাবো, নবী হোসেন আগেই বলে রাখলো।

গোস্ত বেশি হবিনানে। আলী হোসেন বলল।

হাফ কেজি হবিনি। তুই ধর, বলে ময়জুদ্দিরা তিনজন বাপবেটা মিলে কাছিমটা কেটে ফেলল। পেটে কতগুলো ছোট ছোট ডিম।

সুখজান ধীরে ধীরে এসে দাঁড়িয়েছিল পিছনে ।

আপনে যে ছাওয়ালদুডোক নিয়ে এইসব অকাম করতিছেন লোকে শুনলি কি কবিনি  ?

কাউরে না বুল্লিই হলো।  আইজকাল সবাই খায়।  বিদ্যাশে যায় না ?

তাতে আমারে কি ? বিদ্যাশে তো কুত্তা বিড়াল খায় শুনিছি।

এইডে এখুন দ্যাশেই খায়।  ঢাকা গিয়ে দ্যাখ বড় বড় হোটেলে নাকি বেচে।

এক পিচ গোস্ত কিনার মুরোদ নেই আবার দ্যাশ বিদ্যাশের গল্প মারতিছেন। এই পুয়াতি প্যাটে আমি এইসব রানতি পারবোনানে কয়ে রাখলাম । কিসির তে কি হয়া যায় তার ঠিক নাই।

তোক রানতি হবিনানে বলেই ময়জুদ্দি সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে  উঠে পড়ে। মাংসটুকু চুলার পাশে কলাপাতা মুড়িয়ে রেখে আলী হোসেনকে নিয়ে মসলা কিনতে যায়।

দোকানে পৌঁছে ময়জুদ্দি বলে এক পুয়া পিয়াজ, টিন্ডি রসুন, দু ট্যাকার শুকনো মরিচ আর পাঁচ ট্যাকার গরম মসলা দেও বারেক ভাই।

গোস্ত রানবা ?

হ।

কিনলে কখন, আজ তো হাটবার না।

হাটের তে কিনি নাই।

তালি কি মোরগ জবাই দিছ ?

সেইরকমই একখেন কিছু হয়ছে।

ছোট ছাওয়ালের খৎনার খাওন ? আজ সকালে এতক্ষুন বসে গেলে দুকানে, কিছু  কলে না তো আমাক ?

মানে কুনো আয়োজন না, ছাওয়ালডা শক করিছে।

ও বুজিছি , নিজিরা নিজিরা।  এই সময় গ্রামের মৌলভী সাহেব দোকানে এসে হাজির । তাকে দেখে দোকানদার বারেক আগ বাড়িয়ে বলে ফেলল , হুজুর, ময়জুদ্দি মোরগ জবাই দেছে।  খৎনার খানা।

তাই নাকি? খৎনা দিলাম আমি আইজ সাত দিন। সকালেও তুমার বাড়িত গিয়ে নবী হোসেননেক দেকি আসলাম।  কই তুমার বৌ তো কিছু বল্লো না।

তেমুন কিছু জুগার জানতি নাই হুজুর। হাত একদম খালি।

তালি বারেক যে বল্লো মোরগ জবাই দেছো ?

বারেক  ধারণা করছে। ও কিছু দেকে নাই।

বলেই ছেলে আলী হোসেনকে বললো,  চ যাই।

মসলা নিবা না আব্বা ?

না, লাগবি নানে। বলেই ময়জুদ্দি হাঁটা শুরু করে। আলী হোসেন তার পিছনে পিছনে ছুটল। কিছুদূর গিয়ে আলী হোসেনকে বলল বাড়িত যা আছে তাই  দিয়েই রানবো।

গোস্তর মসলা নাগবি না আব্বা ?

হলি ভালো হতো। কিন্তু বারেকের দুকানে তো কিনা গেল না।

আমাক ট্যাকা দেও আমি হাটের দুকানে যাই।  গিয়ে নিয়ে আসি

হাটের দুকান বাকি দিবি না।

তালি কি গোস্ত রানবা না ?

আলী হোসেনের মুখের দিকে তাকিয়ে ময়জুদ্দির অন্ধকার লাগে। ভালো মন্দ দূরে থাক, অনেকদিন একফোঁটা প্রোটিনও পরেনি বাচ্চাদুটোর মুখে। তাই বিকল্প হিসেবে একটুকরো কাছিমের মাংস খাবার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় আলী  মুখের আলো নিভে গেছে।

হবি, বাড়িত যা আছে তাই দিয়েই হবি।

ওরা বাড়িতে ঢুকতেই দেখলো নবী হোসেন গামছা সরিয়ে নিজের শিশ্নের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো চূলকাচ্ছে , হয়তো ব্যাথা করছে। ওদের দুজনকে খালি হাতে ফিরতে দেখে সে জিজ্ঞেস করল, মসলা কোনে ?

ওরা দুজন কোনো উত্তর দিল না। ময়জুদ্দি রান্নাঘরে ঢোকে। ঠিক ঘর বলা যায় না, একটা ছাপড়া চালের নিচে মাটির উনোন।  কিছু হাড়িপাতিল থালা বাসন ছাড়া কিছু নেই। মসলা বলতে খুঁজে পাওয়া গেল দুটো প্রায় শুকনো পেঁয়াজ , কয়েকটা শুকনো মরিচ আর লবন।  ময়জুদ্দি আলী হোসেন আর নবী হোসেনের দিকে তাকায়।  এই মুহূর্তে ওদের অভিব্যক্তি ঠিক কি বলছে , প্রোটিন চাহিদা? নাকি মাংস খাওয়ার সাধ, নাকি সেটা আসলে তীব্র ক্ষুধা ?

বিদায়ী বিকেলের গন্ধ ঘিরে নিয়েছে চারপাশ। অলস কিশোরী আর গৃহবধূদের পাড়া বেড়ানো শেষ। একটু পর সন্ধ্যা নামবে বিদ্যুৎহীন এই জনপদে। নবী হোসেন কাছিমের খোলসটা ধুয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে বেড়ায়। তার গায়ে লেগে থাকা মাংসের ওপর মাছি এসে ভরে গেছে।

আব্বা, আমি যাবো আবার ?

কোনে ?

বারেক চাচার দুকানে ?

ক্যান ?

মসলা কিনতি ? হুজুর মনে হয় আর নাই।

গিয়ে কি কবি ?

তুমি যা শিকা দিবা তাই কব

যাবি ? যা।

গিয়ে কি কব ?

কবি , ইট্টু তেল আর ডালচিনি দেন।  আব্বা পরে আসে ট্যাকা দিবিনি।

আইচ্ছা , বলেই আলী হোসেন দৌড়ে উধাও।

আব্বা, বারেক চাচা আপনেক মসলা দিলো না ?

ম্যালা নকজন ছিল দুকানে , তাই কোতি পারিনি যে গোস্ত রানবো।

ক্যান ? সবাই খাতি চাবিনি ? নাকি কাছোর গোস্ত রানবা জানি জাবিনি ?

হ।

কি হ ? কুন্ডা ? ছোট ছেলে নবী হোসেনের কাটখোট্টা প্রশ্নের উত্তরে সে বলে,

দুডোই।

কথা বলতে বলতে ময়জুদ্দি কয়েকটা শুকনো ডালপালা জোগাড় করে আনল।  পাতা দিয়ে উনোন ধরাবে। নবী হোসেন তার কাছে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ  দিয়ে দেখছে। পাশে কলাপাতা মুড়িয়ে রাখা কাছিমের মাংস। ওদের উঠোনের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল রবের মা। এগিয়ে এসে কলাপাতার দিকে চোখ পড়ায় জিজ্ঞেস করল, আলীর মা কোনে ?

ঘরে।

এই ভর সন্ধেবেলা আন্ধার ঘরে কি করতিছে ? পুয়াতিকালে সন্ধের সুমায় আন্ধার ঘরে থাকতি নাই। সে কি আর রানতি পারতিছে না ?

পারে। আইজ শরীলডা খারাপ।

ও, সুমায় কাছায় আইছে। তা কি রানতিছ ময়জুদ্দি ?

ভাত।

পাতায় কি ? নবী হোসেন ময়জুদ্দির দিকে তাকায়।

মোরগ।

আমিও আমার মোরগ খুঁজতিই  বার হইছি। কাল আর বাড়িত ফেরে নাই

ইডা আপনের মোরগ না।

আমি কি তাই বুললাম ? কিন্তুক সিডাও তো ঠিক আলীর মা’র তো কুনো মোরগ ছিল না।

এমন সময় আলী দৌড়ে এল।  হাতে কাগজে মোড়ানো কাগজের ঠোঙায় কিছু একটা।

মসলা আনিছি আব্বা। বারেক চাচা ম্যালা কতা জিগাইছে। মসলা দেয়, দেয় না।  খালি জিগায় আমাক দাওয়াত দিলো না ক্যান তোর বাপ।

আমি কৈছি কি জানো, কৈছি রাত্তিরি আপনের দাওয়াত। বলে মসলা নিয়ে দোড় দিছি।

সামনে রবের মা দাঁড়িয়ে। ময়জুদ্দি আলীকে বলল তুই ঘরে যা।

ঘরে যাব ? ক্যান গোস্ত রানবা না এখুন ?

রানবো, ইট্টু পর। আরেকটা জিনিস আনতি হবি।

রবের মা বলল কলার পাতাখান খোল তো দেখি।

নবী হোসেন বলল না, ইডা খুলা যাবি না।  আপনে এখুন যান , আপ্নের মোরগ আমরা কাটি নাই।

তালিপর দেকাও ।

কি দেকাবো ? আমরা কি চোর  যে আপনার মোরগ চুরি কইরে খাবো ?

সুখজান ঝগড়া শুনে বের হয়ে এসে বলল, বুবু বাচ্চারা শক করেছে  সাপের গোস্ত খাবি।  ওই কলার পাতার ভিতরে সাপ কাটা রয়ছে ।  আপনার মোরগ না।  আপ্নে এখুন বাড়িত যান।

নবী, বাপ ওগুলান নিয়ে ঘরে যা।  আমি পরে রাধে দিবানে।

সেই রাতে ওরা চার জনেই কাছিমের মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খেল। অনেকদিন পর ওদের পাতে প্রাণীজ প্রোটিন পড়ল। খেতে খেতে নবী বললো, খাতি ভালোই। মোরগের মতোই।  ইবার থিকে পালি আর ছাড়বো নানে।

এর মাস কয়েক পর ময়জুদ্দির বৌ একটা মেয়ে সন্তান জন্ম দেয়। উপজেলা হসপিটালে নেয়ার খরচ না জোটায় শেষ পর্যন্ত সেই রবের মাকেই ধাত্রী হিসেবে ডাকা হয়। ভোর রাতে বাচ্চাটা তেনায় মুড়িয়ে রেখে ঘুম ঘুম চোখে রবের মা বলল, ইবার একখান ভালো কাপুড় কিনে না দিলি আর  হবিনানে।

সকালে এ বাড়ি ও বাড়ির লোকজন কেউ কেউ বাচ্চা দেখতে আসছে। মিষ্টি খেতে চাচ্ছে। দশটার সময় প্রথম একজন বলল ময়জুদ্দির মিয়ের মুকখেন কাছোর মতো দেকতি হয়ছে ।

কই কই দেখি বলে আরো দুএকজন এসে দেখে গেল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা গ্রাম ছড়িয়ে গেল ময়জুদ্দির কাছিম মেয়ে হয়েছে ।

বিকেল চারটায় তার বাড়ির উঠোন ভরা লোক।  অনুরোধ করে সরিয়ে কমানো করা যাচ্ছে না ভিড়।  গ্রামের বাড়ি, তিনদিক খোলা।  ধার দেনা করে দুধ কিনে আনলেও ভিড়ের চাপে মা মেয়ের খাবার সময় হচ্ছে না। বারেক দোকানদার ভিড় দেখে তার ছেলেকে দিয়ে একটা অস্থায়ী দোকান বসিয়ে দিয়েছে ময়জুদ্দির বাড়ির সামনে।  বিড়ি সিগারেট চিপস বেচাকেনা চলছে ধুম।

বাইরে কয়েকটা মোটরসাইকেল থামার শব্দ। গ্রামের একজন প্রবীণ এসে বলল

ময়জুদ্দি, বাইরে সুম্মাবাদিক আয়ছে, তুমাক খুঁজতিছে।

ক্যা সুম্বাদিকের একেনে কাম কি ?

তুমার কাছো কইন্যা দেকতি আয়ছে। ফটোক তুলবি, প্যাপারে দিবি।

আমার কইন্যা কাছো হোক না গুইসাপের নাকাল হোক তয় সুম্বাদিকির বাপের কি ?

তিনারা তো দ্যাশের ন্যায় অন্যায় নেকে।

অন্যায় ? কি অন্যায় করিছি আমি ?

শোনো, এই দুন্নিয়াত সব কিছুই খাতি নাই।  শ্যাষ মাছখান, শ্যাষ পাখিখান যদি খায়ে ফালাও,  শ্যাষ কাছোটাক যদি বাদ না দেও তালিপর  সব ফুরো যাবি। সব ধান খেয়ে ফেল্লি কি হবিনাকি , বেছন রাক্তি হবিনা ? সব খায়ে ফেল্লি দুন্ন্যা শ্যাষ।

আপ্নের নেককার দিতি ডাকেছে কিডা ?

এ সময় একদল সাংবাদিক ভিতরে এসে দাঁড়ালো। তাদের দেখে ময়জুদ্দির আরো রাগ হয়। সে উচ্চস্বরে বলতে থাকল, আমি কি খাইছি , কি খাইছি? একটা কাছো ধরে খাইছি তাই বাড়ির পর আসে আপ্নেরা এতো বড় বড় নেকচার দিতিছেন। এতো ভিড় করতিছেন। প্যাপারে নেকতি অয়ছেন। আর বড় নোকেরা যে সারা দ্যাশখেন বেচি খায়ে ফ্যালাদিতিছে, তাগের কিছু কবার পারতিছেন না ?

সেদিন রাত এগারোটার দিকে তার বাড়ির বাইরে একটা ডাক শোনা গেল।

ময়জুদ্দি , ময়জুদ্দি , ঘুমা পরিছ নাকি ?

ময়জুদ্দি বুঝল দোকানদার বারেকের গলা।  বুঝেও সে জিজ্ঞেস করলো কিডা ?

আমি বারেক।

ময়জুদ্দি খুব বিরক্ত হলেও দরজা খুললো।  কারণ বারেক একমাত্র লোক যে বিপদ আপদে বাকি দেয়।

আজ দোকানের ঝাঁপ নামাতি পারিনি।  ম্যালা ভিড়।  সব তুমার বাড়িত আসা লোকজন

কিন্তু একুন তো দেখতি পারবা না বারেক ভাই ।  মায় মিয়া দুডোই ঘুমোয়ছে।

তা তো ঘুমোবিই।  কিন্তু মানষি যা বলতিছে তা কি সঠিক ?

কি বলতিছে ?

তুমার নাকি কাছো মিয়ে হয়ছে ?

হ।

তুমি কি দেকিছো ?

না।

নিজির মিয়ার মুখখান দেখলে না আর লোকজনের কতা বিশ্বেস করে নিলে ?

এতো লোকজনের কতা অবিশ্বেস করি ক্যাম্বা ?

তো একুন কি করবা ?

কি আবার করব ? আল্লায় যা দেছে।

সিডা ঠিক।  কিন্তুক বিয়ে দিতি পারবা ?

বাইচ্চা জুম্মালো গত রাতে আর আজ তার বিয়ের কতা কতিছো ?

একদিন না একদিন ভাবতি তো হবিই ।  তালি ঘুমোও আমি কাল একবার আসে দেকি যাবোনে। আর একখেন কতা

কি ?

শহরের সুম্বাদিকরা আইছিলো শুনলাম।

হ।

প্যাপারে নেকানেকি হলি কিসির তে কি হয় তা কিডা জানে।

তালি তুমার পুরামর্শ কি ? পলা যাবো বাড়িরতি ?

না।  পলা আর কোনে যাবা ? আর তুমার তো কুনো অন্যায় নাই।  না হয় একখেন কাছো কাটে খাওয়ায়ছো পুয়াতি বৌডাক। বলেই বারেক চলে গেল।

ময়জুদ্দি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

গত রাতে ঘুম হয়নি তার। আজ সারাদিনের ধকল। ঘরে ফিরে পাঁচ মিনিটের মধ্যে নাক ডাকতে শুরু করল।  শেষ রাতের দিকে একটা স্বপ্ন দেখল সে।

তার সদ্য জন্ম নেয়া মেয়েটা সুখজানের বুকের কাছে কাঁথার মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে বের হচ্ছে। নড়াচড়া করতে করতে কাছিমের মতো গলা বের করার চেষ্টা করছে। পুরো গলাটা বের হয়ে এলে বলছে সে ,  আব্বা, ও আব্বা তুমি আমাক কাটে ফেললে ?

সদ্যজাত বাচ্চা বড়োদের মতো কথা বলছে দেখে ময়জুদ্দির ধন্দ লাগে। বাচ্চাটা আবার বলছে , দুনিয়া শুকোয় গেলিপর  আমি বাঁচার জন্যি গর্তোর ভিতর গিয়ে লুকোয়ছিলাম। ভাবতিছিলাম একদিন দ্যাশে আবার বর্ষা নামবি, চারদিক পানি থৈ থৈ করবি।  আমি আবার সাঁতার দেব। আবার ডিম পাড়বো। সেই ডিমে অনেক বাচ্চা হবি।  আর তুমি আমাক সেই সুযোগ দিলে না।  কাটে রান্না করে খায়ে ফেললে ?

এই কথা বলতে বলতে কাছিমের মুখের মত লম্বা গলা বাড়িয়ে বাচ্চাটা ময়জুদ্দির মুখের কাছে মুখ নিয়ে আসতেই তার ঘুম ভেঙে গেল।

সে দেখল ঘরের একপাশে একটা কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বলছে। সেই কেরোসিন বাতির অল্প আলো কাঁপছে।

দরজা খুলে বাইরে গিয়ে বসল সে । অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে তখন ।  রান্নাঘরের বেড়ার সঙ্গে ঝুলানো সেই কাছিমের পিঠের খোলসটা।ভোরের হালকা বাতাসে দুলে দুলে একবার খুবলে মাংস তোলা বুক দেখাচ্ছে একবার পিঠ।

ময়জুদ্দি ভাবছে কি করবে সে? মেয়েটাকে গলা টিপে মেরে পুঁতে ফেলবে ঘরের পিছনে?

যদি তাই করে তাহলে লোকজন এসে দেখতে চাইলে কি বলবে ? যদি থানা পুলিশ হয় ? নাকি বৌ ছেলে দুটো কে নিয়ে পালিয়ে যাবে? কিন্তু যাবে কোথায় খাবে কি ? আর পালিয়ে গেলে তো  চেহারা বদলাবে না মেয়েটার ।

ঘরে খাবার নেই । শুকজানের বুকে দুধ আসছে না।  আসবেই বা কিভাবে।  বাচ্চাটা পেটে আসার পর কোনোদিন তো ভালোমন্দ তো দূরের কথা পেট ভরেও খাবার পায়নি। অনেকদিন বৃষ্টি হচ্ছে না এই অঞ্চলে। মাঠ ঘাট শুকনো।  ধানের চারা তৈরি করতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।  দিন মজুরের কাজ নেই। নিজেদের খাওয়া আবার বাচ্চার দুধ। ময়জুদ্দি শোনে কাছের মসজিদে আজান হলো। শিকারের আশায় বের হওয়া একটা বাগডাস  ফিরে যেতে যেতে উঠোনের একপাশে থমকে দাড়াল। ক্লান্ত। ময়জুদ্দির চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে এখন সে । আজ কোনো শিকার পায়নি মনে হয়।

সকালে নবী আর আলী হোসেন কে ডেকে তুললো ময়জুদ্দি।  তিনজনে মিলে দড়ি, সুপুরির পাতা  আর বাঁশ দিয়ে বাড়িতে ঢোকার পথ ঘিরে একটা গেট বানালো।

তারপর শুকজান আর  সদ্য জন্ম নেয়া মেয়েটাকে তুলে এনে জলচৌকির ওপর বসিয়ে রাখলো বারান্দায়।

আলী হোসেনকে বলল, একটা কাগজে নেকে দে ‘কাছিম কন্যা দর্শন ; মাত্র দশ টাকা’।

 

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top