মোহাম্মদ রফিকের সাক্ষাৎকার II নাসিরুল ইসলাম জুয়েল

কবি মোহাম্মদ রফিকের এই সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল ‘উত্তরমেঘ’ প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, পৌষ ১৪০৮ (২০০১)। এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন কবি ও সম্পাদক নাসিরুল ইসলাম জুয়েল

[ মোহাম্মদ রফিক (২৪ অক্টোবর ১৯৪৩ – ৬ আগস্ট ২০২৩) একজন মননশীল আধুনিক কবির আত্মপ্রকাশ ১৯৬০-এর দশকে। ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন ও কবিতায় এবং আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে কাব্যিক রসদ যুগিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে ২০০৯-এ অবসর নেন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার,  একুশে পদক, মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার। প্রকাশনা: কাব্যগ্রন্থ: বৈশাখী পূর্ণিমা, ধুলোর সংসারে এই মাটি, কীর্তিনাশা, খোলা কবিতা, কপিলা, গাওদিয়া, স্বদেশী নিশ্বাস তুমিময়, মেঘে ও কাদায়, রুপকথা কিংবদন্তি, মৎস্যগন্ধা, মাতিকিসকু, বিষখালী সন্ধ্যা, কালাপানি, নোনাঝাউ, দোমাটির মুখ, ত্রয়ী, চিরহরিতের উপবাস, গীত ক কুবির। গদ্য: আত্মরক্ষার প্রতিবেদন, স্মৃতি বিস্মৃতি অন্তরাল, ভালবাসার জীবনানন্দ। আত্মজীবনীমূলক গদ্য: পথিক পরান]  – লেখালেখির উঠান
… একটা কবিতা নিয়ম মাফিক উতরে গেল কি না সেটা তার বিচারের মানদণ্ড নয়, মানদণ্ড এই যে, কবিতাটি মানুষের ভালোবাসাকে সংক্রমিত করল কি না।’

 

শুরুর কথা, অন্ধকারে অন্য মানুষ

এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করার জন্য ২০০০ সালে শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টিতে কোনো এক অন্ধকার দুপুরবেলায় এলিফ্যান্ট রোডে তাঁর বাড়িতে যেয়ে হাজির হই। এই শ্রাবণেই আমরা আমাদের ক্যাম্পাসে (চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ) একটি নাটক করতে যেয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের হাতে এক ভয়ানক রাজনৈতিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিলাম। এই সুগভীর বেদনার কথাটি তাঁকে লিখে জানাই; মানুষের অধিকারের জন্য এত রক্তপাত, এত মৃত্যু, এত চোখের জল ফেলা- এসবই বৃথা। বোধ করি এদেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই স্বাধীন দেশের মধ্যে এক একটি পরাধীন ভূখণ্ড। কুশল বিনিময়ের পরেই আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু করার জন্য আমার রেকর্ডারটি ঠিক করছিলাম; আমাদের (আমার সাথে ছিল আমার বন্ধু আমীর রিদয়) রাতের ট্রেন ধরে চট্টগ্রাম ফেরবার তাড়া ছিল। তিনি আমাদের বিপন্নতা বুঝতে পেরেই হোক আর নিছক কৌতূহলেই হোক বেশ স্নেহার্দ্র হয়ে ঘটনাটি সম্পর্কে বিশদ জানতে চাইলেন; হঠাৎ মনের ভেতর থেকে হু হু করে চেপে রাখা প্রশ্নগুলো বেরিয়ে আসতে চাইল; ভেবেছিলাম, প্রশ্নগুলো সাক্ষাৎকারের অংশ হিসাবে নয়; ব্যক্তিগতভাবে যাবার সময় করব। কারণ ব্যক্তিগত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ালেই কেবলমাত্র এই জানা প্রশ্নগুলোর জবাব নতুন করে জানতে ইচ্ছে করে; এ হয়তো নিজের সাথে নিজেরই এক গোপন বোঝাপড়া। তবে প্রশ্নগুলো ঠিক কবি মোহাম্মদ রফিককে নয়; জীবনের দীর্ঘপথ অতিক্রমণের মধ্য দিয়ে এক ব্যাপক জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে আছেন এমনই একজন অগ্রজের কাছে জীবনের প্রথম পথে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অনুজের প্রশ্ন। শেষতক তাঁর সেই জীবন-অভিজ্ঞতাগুলো ব্যক্তিগত তাপ নিবারণের কোনো ব্যাপার হয়ে থাকে নি; তাই ভাবলাম, হয়তো এভাবেই শুরু হতে পারে । … যা হোক, জিজ্ঞেস করলাম, ‘জীবনের এই যে এত অনিবার্য দ্বন্দ্ব, নিষ্ঠুরতা, মৃত্যু, অবসাদ; যেখানে ইচ্ছার কোনো স্বাধীনতা নেই, পরিপার্শ্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে যেখানে মানুষ শেষতক সর্বতোভাবেই ব্যর্থ- এই যে বিস্বাদ বিচ্ছিন্নতা- এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে কীভাবে জীবনের প্রতি, মানুষের প্রতি, নিরন্তর আগ্রহ বোধ করেন?

বাইরে তখন বৃষ্টির ঘোর বেড়েই চলেছে; প্রবল বিদ্রোহে জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢোকবার জন্য যেন পাগলপারা অবস্থা। তিনি উঠলেন, উঠে জানালা বন্ধ করলেন; তারপর কিছুক্ষণ মৌন থেকে সেই আধো অন্ধকারে বলে চললেন-

শোন, তোমাকে একটা ঘটনা বলি, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একবার আমাদের একটা দল ফেনীর ঐদিকে একটি জায়গায় ভারতে যাবার পথে হঠাৎ করে আটকে যায়। অন্ধকার রাত, টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে, সামনে কাদাজলের মোটামুটি গভীর একটা ক্ষেত্র, মাঝখান দিয়ে সরু আল; কাদাজলের ওপাশে পাহাড়; পাহাড়ের ওপরে পাকিস্তানি আর্মিরা অস্ত্র হাতে প্রস্তুত। আমাদেরকে যেতে হবে ঐ সরু আল ধরে। দলে শিশু, তরুণ, তরুণী, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা সব মিলিয়ে প্রায় একশ জন মানুষ। আমাদের গাইড বলল, পার হওয়াটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ; কারণ সামান্য একটু কাপড়ের রং চোখে পড়লেই- নির্ঘাত মৃত্যু। সবার মাঝেই বেশ ভাবান্তর দেখা গেল। যেতেই হবে; ফিরে যাবারও উপায় নেই; কারণ সকলেই অনেক দূর থেকে, অনেক পথ পাড়ি নিয়ে, দীর্ঘদিনের পায়ে হাঁটা পথের শ্রম স্বীকার করে- শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। একেবারে তীরে এসে তরী ডোবার মতো অবস্থা । শেষতক অনেক ভেবে গাইড বলল- একটা উপায় হতে পারে, সবাইকে বিবস্ত্র হতে হবে; গায়ে কোনো কাপড় রাখা চলবে না; তাহলে হয়তো অন্ধকারে আমাদের অস্তিত্ব আঁচ করতে পারবে না; তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনোভাবেই শব্দ না হয়। আশ্চর্য! মুহূর্তের মধ্যেই সবাই রাজি হয়ে গেল। তরুণ, তরুণী, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা কারো মধ্যেই শুধু পার হবার উদ্বেগ ছাড়া অন্য কোনো আশঙ্কা বা লজ্জা দেখা গেল না। কেউই এই প্রস্তাবে বিব্রত নয়। শুরু হলো সেই কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। সরু আল; এ ওর কোমর ধরে পার হচ্ছি। আমার পেছনে একজন বৃদ্ধা, সে আমার কোমর ধরে আছে। মাঝপথে যাবার পরে হঠাৎ ঝপ্ করে বৃদ্ধা সেই কাদায় পড়ে গেল। কী ভয়ংকর অবস্থা। সবাই পিছন ফিরে তাকাল। আমি বললাম, আপনারা যান; আমি উনাকে তুলে নিয়ে আসছি।

মুহূর্তেই সবাই দাঁড়িয়ে গেল; একবাক্যে সবাই বলে উঠল, ‘না, আমরা যাব না। আমরা আপনাদেরকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে পারি না।’ ভাবতে পার? জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থায় দাঁড়িয়ে মানুষের এই অমেয় মানবিকতার জায়গাটি। যেখানে সামান্য টের পেলেই মৃত্যু। মানুষের পক্ষেই সেটা সম্ভব। মানুষের মধ্যেই এই অমেয় সম্ভাবনা। বৃদ্ধাকে উদ্ধার করা পর্যন্ত সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর নির্বিঘ্নেই আমরা পার হয়ে গেলাম। ওপারে যেয়ে দেখি একটা খাটো খেজুর গাছের নিচে হারিকেন হাতে কেউ একজন বসে রয়েছে।

আমরা প্রথমে ভাবলাম রাজাকার টাজাকার হবে হয়তো। কিন্তু কাছে যেতেই ভুল ভাঙল। দেখলাম প্রায় ৬০/৭০ বছরের একজন বৃদ্ধ একবস্তা মুড়ি এবং একহাড়ি গুড় নিয়ে বসে আছে। আমাদের প্রশ্নের জবাবে সে বলল, ‘বাবা আমি এইখানে বসে প্রতিদিন আল্লার সেবা করি। আমি জানি প্রতিদিন এই পথ দিয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধা যায়; তারা বেশিরভাগই খুব ক্ষুধার্ত থাকে; আমি তাদেরকে মুড়ি আর গুড় খাওয়াই।’ সুতরাং তোমার বেদনার জায়গাটি যেমন সত্যি; এই আলোর দিকটাও ঠিক তেমনি সত্যি।

 

বাইরে তখন ‘কিং লীয়র’-এ বর্ণিত সেই ঝড়ের দৃশ্যটার মতো- বৃষ্টির প্রচণ্ড উন্মত্ততা; মোমবাতির আলোটা ভীরুতা সম্বল বিশ্বাসে একটু পর-পরই কেঁপে কেঁপে উঠে ঘরময় জমে থাকা অন্ধকারের অন্তর্গত সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে চলেছে। আমরা সেই ক্ষীণপ্রভ আলোয় তাঁর দিকে তাকিয়ে তন্নিবিষ্ট। একথা লোকমুখে আমরা আগেই শুনেছিলাম যে মোহাম্মদ রফিকের যাপিত জীবনের পাঠটাই যে কোনো উত্তম গ্রন্থ পাঠের থেকেও আনন্দলভ্য এবং জ্ঞানলভ্য। তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা আমাকে প্রাণিত করেছিল; কিন্তু আমি আমার বিস্ময়ের জায়গাটা যথাসম্ভব লুকিয়ে রেখে অতৃপ্তির জায়গাটিকে প্রকাশ করে তুলি। মোহাম্মদ রফিক তাতে আবারও নিজের মধ্যে নিমজ্জিত হন।

একবার আমার এক পতিতার সাথে খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল। আমি আর রুদ্র (রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ) গিয়েছিলাম ফরিদপুর পতিতালয়ে। তো ঐসব জায়গায় কিছু ছেলে থাকে না? যারা নেশা টেশা করে, আবার কবিতাও লেখে; সেরকম একটা ছেলের সাথে আমাদের খুব ভাব হলো; ছেলেটির নাম নিতাই। নিতাইয়ের প্রেমিকা থাকে ঐ পতিতালয়ে; নিতাইয়ের সূত্রে তার সাথে আমাদের বন্ধুত্ব। তো যা হোক, ঢাকায় ফিরে আসার বেশ কিছুদিন পরে হঠাৎ শুনতে পেলাম যে ঐ নিতাই একটা মিথ্যা খুনের দায়ে জেলে গিয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।। felt so bad. আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম ওদের কথা। আমার খুব ইচ্ছে হলো মেয়েটির সাথে দেখা করি। আজ যাই কাল যাই করে আর যাওয়া হয়ে উঠল না। তারপর অনেকদিন পরে একবার ফরিদপুরে গিয়েছিলাম। হঠাৎ নিতাইয়ের কথা মনে হতেই ভাবলাম, এবার দেখা করে যাব । এক সন্ধ্যায় আমি স্থানীয় একটি ছেলেকে সঙ্গী করে রওনা দিলাম; টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে; তার মধ্যে দিয়ে আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি। ফরিদপুর পতিতালয় ইতোমধ্যেই স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে খোঁজার পরও আমরা পেলাম না। কেউই তার সন্ধান দিতে পারে না। সবাই বলল, একজন বৃদ্ধা আছেন, তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন; সে জানলেও জানতে পারে। সেও বলতে পারল না। হঠাৎ করে অচিন্ত্য নামে রাজশাহীর এক পুলিশ অফিসারের সাথে দেখা। ‘স্যার, আপনি এখানে!’ আমি তাকে বললাম সব কথা। সে বলল, ‘স্যার আপনি এখানে অপেক্ষা করুন; আমি দেখছি কী করা যায়। যা হোক, শেষতক খুঁজে পাওয়া গেল তাকে। আমরা যখন তার ঘরে যেয়ে পৌঁছালাম, দেখলাম মেয়েটি মাতাল হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। প্রথমে আমাদেরকে চিনতে পারল না। তারপর নিতাইয়ের নাম শোনামাত্রই একমুহূর্তে তার ঘোর কেটে গেল। নিতাইয়ের নাম শুনে সেই যে হাপুস হয়ে কাঁদতে শুরু করল- আর থামে না। তারপর একসময় একটু প্রকৃতিস্থ হলো; “নিতাইয়ের বন্ধু আমার ঘরে। কোনোভাবেই না খেয়ে যাওয়া যাবে না।’ সে স্নান করে রান্না করতে গেল; খেয়ে-দেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত আমরা তার সাথে গল্প করলাম। নিতাইয়ের কথা আসতেই তার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠছিল। অথচ নিতাইয়ের কাছ থেকে তার এই জীবনে পাওয়ার আর কিছুই নেই। নিতাইয়ের কথা বলতে বলতে তার মুখের রঙ যখন পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল তখন তো আমার মনে হচ্ছিল- আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, পবিত্র মেয়েটার সাথে কথা বলছি। তুমি কী বলবে একে?

 

মানুষের এই দেবোপম আলোর দিকটার কথা ভেবেই হয়তো আমরা প্রাত্যহিক অবসাদে, ক্ষয়ে, জরাগ্রস্ত আমাদের বিপন্ন আয়োজনটাকে আবার সাজিয়ে তুলি; স্বপ্ন দেখি । কোথায় যেন পড়েছিলাম, জীবনের সৌন্দর্যটা হচ্ছে আবিষ্কার করে নিতে হয়। যে সেই যোগ্য আবিষ্কর্তা, উপভোগটা তারই বেশি। বললাম, এই সৌন্দর্যটা আবিষ্কারের চোখ থাকাটা বোধ করি কবির জন্য খুব জরুরি।

হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরেছ। আমার আরাগঁ-র একটা কথা খুব প্রিয়। একবার পিকাসো আরাগঁকে বলেছিল, ‘তুমি কী কবি হে মশাই! কবি, শিল্পী, সে তো বিভিন্ন মেয়েকে ভালোবাসবে; কিন্তু তুমি এক জীবনে একটা মেয়েকেই ভালোবেসে কাটিয়ে দিলে?’ যদিও এটা ঠিক না যে আরাগঁ জীবনে একটা মেয়েকেই ভালোবেসেছিল। প্রথম জীবনে সে অন্য একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিল; কিন্তু বিবাহিত জীবন সে একজনের সাথেই কাটিয়েছে। তো এই কথার একটা সাংঘাতিক জবাব দিয়েছিল আরাগঁ- ‘শোন পিকাসো, প্রত্যেক বয়েসেরই একটা সৌন্দর্য আছে; প্রত্যেক জীবনেরই একটা সৌন্দর্য আছে; ওটাকে আবিষ্কার করার চোখ থাকতে হয় শিল্পীর । আমার ঐ চোখ আছে। তোমার নেই।’ তো আমি মনে করি এই দেখার এবং অনুভবের বিষয়টাই হচ্ছে বড়।

 

কিন্তু দেখার এই ব্যাপারটা কি শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিক অভিপ্রায়ের উপর বা ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে। যেমন Romantic age -এর কবিরা খুব সাবজেক্টিভলি জীবনকে দেখত; এবং তাদের ব্যক্তিক লাভালাভ, ব্যক্তিক ক্লেদ কবিতায় শিল্পরূপ পেয়েছে। … কিন্তু আমি তো সমস্তের সাথে যুক্ত হয়েই বেড়ে উঠছি। কিন্তু তার পরেও এক ধরনের সেন্স অব অ্যালিয়েনেশন মানুষকে সবসময় তাড়িয়ে ফেরে; পরিপার্শ্বের সাথে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। শিল্পে এই দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?

এটা তুমি খুব দূরন্ত একটা point বলেছ। ব্যক্তিক অভিপ্রায়ের উপর তোমার এই দেখাটা নির্ভর করে না। কিন্তু ব্যক্তিক অভিপ্রায়টাও তো তৈরি হয় একটা যৌগিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাদের সাথে তুমি আছ, যে সকল সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে তুমি – বেড়ে উঠছ ….. ইত্যাদি প্রক্রিয়ায়।

তুমি যে Romantic কবিদের কথা বলছিলে; হ্যাঁ এটা ঠিক যে একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ আর্থসামাজিক কারণে মানুষের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করবার প্রচণ্ড একটা তাগিদ মানুষ অনুভব করেছে। এসব কিছুর মধ্যে থেকে ভালো সৃষ্টিও হয়েছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে দেখা গেছে যে, সেই তাগিদটা একটা সীমাবদ্ধতার ভিতরে এসে যাচ্ছে। কিন্তু যারা সেই আমিত্বের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসেছে তাদের লেখাই মহিমান্বিত হয়েছে। অর্থাৎ আমিত্ব থেকে শুরু হয় কিন্তু যখন সেই ‘আমি’কে সর্ব ‘আমি’র মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যায়- তখনই সেটা সার্থক শিল্প হয়ে ওঠে। তুমি রবীন্দ্রনাথকে দেখ, নেরুদাকে দেখ। আমাদের বাউলদের মধ্যে কী কম নিঃসঙ্গতা আছে? তাঁরা তো শুরুই করেছে সেই সৃষ্টির নিঃসঙ্গতা দিয়ে। হয়তো এখানে নিঃসঙ্গতার স্বরূপ আলাদা; কিন্তু সেখান থেকেই তাঁরা দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমান জগতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তাদের গান হচ্ছে এই সম্পর্ক স্থাপনের সিঁড়ি। আমি তো মনে করি এই নিঃসঙ্গতার ব্যাপারটি মানুষের জন্মকাহিনীর সাথে সম্পর্কিত। আমরা যদি আদম হাওয়ার কাহিনীটাকে একটা প্যারাবল চিন্তা করি, তবে কী দেখতে পাই। দেখতে পাই যে একটা লোক তার সমস্ত জীবন নির্বাসনে কাটিয়েছে। এটা তো এক ধরনের নির্বাসনই । শুধু তাই কেন যারা সেই সময়ের প্রধান কবি- কেউ রাজ সভার নির্বাসনে গেছে, কেউ দ্বীপের নির্বাসনে গেছে। হোমারের সম্পর্কে আমরা খুব বেশি কিছু জানি না। কিন্তু যেহেতু সে রাজ সভার কবি ছিল সেহেতু তার সুখে থাকার কথা না। ভার্জিল যে সুখে ছিলেন না তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মৃত্যুর পূর্বে সে তাঁর সবচেয়ে বড় কর্মটি না ছাপাবার জন্যই বলে গিয়েছিলেন। দান্তে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনাগুলি লিখেছিলেন নির্বাসনে। সুতরাং একাকিত্ব, নির্বাসন- এগুলো সৃষ্টি এবং কর্মের সাথে সংযুক্ত ব্যাপার। এবং মানুষ শুরু করেই ওখান থেকে; পরে সে তার কর্মের মধ্যে দিয়ে শেকড়গুলো খুঁজে পায়। এবং তুমি দেখবে- যে যেখান থেকেই শুরু করুক- তাকে যদি বেড়িয়ে আসতে হয়- তবে কোথাও না কোথাও এই সংযোগ সেতুটা তৈরি করতে হবে; তা না হলে শেষ পর্যন্ত সে গুড়ের মধ্যে পিঁপড়ে যেমন করে মরে থাকে- ঐভাবে মরে থাকতে বাধ্য।

 

সময় ও সংবেদ

এই সময়ে আপনার যাপিত জীবনের সুখ, দুঃখ কী?

আমি ওসব নিয়ে খুব একটা ভাবি না। নিশ্চয়ই সুখও আছে, দুঃখও আছে; কিন্তু আমার সুখ দুঃখকে আমি মোটেও বড় করে দেখি না। জীবনে বেঁচে আছি এটাই যথেষ্ট । সবচেয়ে মজা হচ্ছে- আমার বয়স যখন কম ছিল তখন দুঃখের ভার যেমন করে অনুভব করতাম এখন আর করি না। এখন আমি এটাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ বলেই ধরে নিয়েছি। আগে মানুষের সাথে দেয়া নেয়ার প্রকৃতিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল; কে তাকাল, কে তাকাল না, কে ভালোবাসল, কে ভালোবাসল না- এগুলোকে খুব মূল্য নিতাম; কিন্তু এখন এগুলোর চেয়ে মানুষ, প্রকৃতি, পাখি, স্মৃতি- এসবই প্রধান আমার কাছে । এখন দুঃখ আমাকে আক্রমণ করলেও বশীভূত করতে পারে না । এই মুহূর্তে আমার বাবা খুব অসুস্থ। আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে যাই; ঘণ্টা দুয়েক কাটাই। কিন্তু আগে বছরের পর বছর গেছে- যখন বাবার সাথে আমার কোনো সংযোগ ছিল না। আমি রাজনীতি করেছি, বাবা যেমন চেয়েছেন সেরকম কিছু করি নি; কবিতা লিখতে এসেছি- যেটা তাঁর কাছে কখনোই কোনো প্রধান বিষয় ছিল না।

এসব বিভিন্ন কারণে বাবার সাথে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এখন প্রতিদিন বাবার মুখের চামড়ার যে একটা পরিবর্তন হচ্ছে- এর ভেতরেও একটা আনন্দ খুঁজে পাই। তাঁর ঠোঁটের বাঁকানো, তাঁর হাসি- সবকিছুই একটা দেখবার বিষয় বলে মনে হয় । তিনি সবসময় যে খুব ভেবেচিন্তে কথা বলেন- তা নয়; কিন্তু সেই অসংলগ্ন কথা শুনতেই আমি প্রচণ্ড আনন্দ পাই; যেটা আমি আগে পেতাম না।

 

এই আমাদের জীবন ও তার শিল্প লাবণ্য

প্রত্যেক শিল্পীর শিল্পের পথ, একান্তই তাঁর নিজস্ব; এবং এই পথ তৈরি করতে হয় তাকেই। অনেক চড়াই উতরাই, নিজের জীবনকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখার অভিজ্ঞতা, অনেক দুর্গমতা অতিক্রম করে তবেই হতো একদিন সে তাঁর নিজস্ব পথটি খুঁজে পায়। আপনার কবিতার এই ভাষা, এই নির্মিতি, এই সংবেদন, যে অতিক্রমণের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়েছে- সে সম্পর্কে বিশদ জানতে চাই।

আমি ছেলেবেলায় মানুষ হয়েছি বাগেরহাটের বৈতপুর গ্রামে; এবং গ্রামের খুব সাধারণ মানুষদের সাথে বেড়ে উঠেছি। ছেলেবেলায় খুব দুষ্ট ছিলাম গাছে উঠতাম, মাঠের পর মাঠ দৌড়াতাম; কোথাও মেলা হচ্ছে তো সেখানে সারারাত কাটিয়ে দিলাম- এমন আর কী। বাবা তখন পিরোজপুর একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন; প্রতি বৃহস্পতিবার সাইকেলে চড়ে বাড়ি আসতেন। তো এই দুরন্তপনা বেশিদিন টিকল না। বাড়ি ছাড়তে হলো। এই বাড়ি ছাড়ার পিছনে একটা ঘটনা আছে। আমি একদিন তালগাছে উঠেছি; তালগাছে উঠেছ কখনো? তালগাছে উঠা কিন্তু খুব কঠিন কাজ। তো আমাদের গ্রামে একটা বোষ্টমী ছিল; আমাকে দেখে ও ভয় পেয়ে যায়। আমার মা তখন মুড়ি ভাজছিলেন; সেখানে যেয়ে সে বলে তোমার ছেলে তো তালগাছে উঠেছে। মা শুনে ভয়ে আতঙ্কে অস্থির ও আনমনা হয়ে পড়েন। গরম বালি তাঁর হাতের উপর পড়ে পুড়ে যায়। সেই পোড়া দাগ এখনো আছে। পরের বৃহস্পতিবারে বাবা যখন আসলেন- এই খবর শুনে তিনি আমাকে গ্রাম থেকে তাঁর স্কুলে নিয়ে গেলেন। নিয়ে গিয়ে আর কী করবেন? স্কুলটা শুরুই ছিল ক্লাশ ফোর থেকে। ক্লাশ ফোরেই ভর্তি করে দিলেন। এভাবেই শুরু হলো আমার স্কুল জীবন। বাবার ছিল বদলির চাকরি; পিরোজপুর থেকে বরিশাল, বরিশাল থেকে খুলনা। মা গ্রামে থাকতেন; এবং আমরা প্রতি সপ্তাহেই শহর থেকে নৌকাযোগে গ্রামে আসতাম। এখন আমি বুঝি যে জলের এই রূপ, এই স্মৃতিগুলো দারুণভাবে আমার ছেলেবেলায় রয়ে গেছে যা পরবর্তী কালে কবিতায় এসেছে। কিন্তু লিখব এমন কোনো ইচ্ছে ছিল না। তো এরই মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে যায়। আমি অঙ্কে খুব ভালো ছিলাম; কিন্তু আমার বাবার কী করে যেন ধারণা হয়ে গেল যে আমি বাংলায় কাঁচা। বাবা তাঁর একজন সহকর্মীর পরামর্শ মতো আমাকে বাংলা বই পড়তে দিলেন; তিনি জানলেন না যে আমার কী সর্বনাশটাই তিনি করে ছাড়লেন। প্রথম যে বইটা পড়ি সেটা বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে কঠিন বইগুলোর মধ্যে একটি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘পথে প্রবাসে’।

এরপর থেকে আমাকে যেন নেশায় পেয়ে বসল। দু’তিন ঘণ্টা ঘুমাতাম; বাকিটা সময় সারাক্ষণ শুধু পড়তাম । বাবা খুব খুশি যে আমি পড়ছি । প্রায় বেশিরভাগ বাংলা উপন্যাস সেই বয়সে পড়ে ফেলেছি। দেরি করে পড়ার মধ্যে শুধু তারাশঙ্কর।

 

মানিক?

হ্যা মানিকও একটু দেরিতে পড়েছি।

 

কোন ক্লাসে পড়তেন তখন?

ক্লাস এইটে।

 

তারপর?

এই অবস্থার মধ্যে আমরা খুলনা বদলি হয়ে গেলাম এবং যা হয় এই বয়সে, নারী জাতির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করলাম। এই সময়ে জীবনে একটা মৌলিক ঘটনা ঘটে গেল- যে ঘটনাটা আমাকে আপাদমস্তক পরিবর্তন করে দিয়েছে। তখন মেট্রিকের একটা টেস্ট পরীক্ষা হতো; সেই পরীক্ষা দিয়ে গ্রামে বেড়াতে গিয়েছি। আমার এক চাচাত ভাই- সে এসে রাতে আমাকে বলল, চল রাম যাত্রা দেখে আসি। আমি তখন জানি না রাম যাত্রা কী জিনিস। জিজ্ঞেস করলাম, নাচগান হয়? সে বলল, হয়। আমি তার সাথে রাম যাত্রা দেখতে গেলাম। যাত্রাটি হচ্ছিল জমিদার বাড়িতে। জমিদারি প্রথা যদিও উঠে গেছে- তবুও জমিদার বাবু টাবু এইসব বলার চল ছিল তখনো । ওখানে যেয়ে দেখি একপাশে মেয়েরা আর একপাশে একটু অবস্থাপন্ন যারা তাদের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। মাঝখানে রাম যাত্রা হচ্ছে। আমি যেয়ে ছেলেদের সাথে বসলাম। হঠাৎ দেখি ঐ অবস্থাপন্ন গৃহস্থদের একজন এসে আমাকে বলল, জমিদার বাবু আপনাকে ডাকে। আমি বললাম, কেন? জমিদার বাবু আমাকে ডাকে কেন? আপনাকে ঐখানে গিয়ে বসতে বলেছে। কেন? কেন? আমি ঐখানে গিয়ে বসব কেন? – যাহোক শেষ পর্যন্ত গেলাম না। পরে জমিদার বাবু উঠে এসে আমার বাবার নাম জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন যে, তুমি এসে আমাদের সাথে বস বাবা। আমি কোনোভাবেই গেলাম না। এসব ঘটনার মধ্যে থেকে হঠাৎ করে দেখলাম একটা মেয়ে বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে আর হাসছে। পরে জানতে পারলাম মেয়েটা জমিদার বাবুরই মেয়ে। পরে ওখান থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে ঐ মেয়েকে আবিষ্কার করলাম একটা ছোটখাট ভীড়ের মধ্যে এবং তখনো সে হাসছে। এই ঘটনাটা আমার মধ্যে খুব রেখাপাত করল। তারপর খুলনা চলে এলাম কিন্তু কিছুতেই ঐ হাসির ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। মেট্রিক পরীক্ষা যখন শেষ হলো তখন দ্রুত বাড়িতে চলে এলাম এবং ওদের বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার যে ঐ মেয়েটির সাথে কিন্তু আমার কখনো কথা হয় নি। মেয়েটির বাড়ির সবার সাথেই দারুণ সখ্যতা গড়ে ওঠে শুধু মেয়েটি ছাড়া। এবং এরই মধ্যে আবিষ্কার করে ফেললাম যে আমি কবিতা লিখতে শুরু করেছি। ইতোমধ্যে আমি জীবনানন্দ দাশ পড়ে ফেলেছি, রবীন্দ্রনাথ তো আগে থেকেই পড়ছি। এবং বনলতা সেনের প্রত্যেকটি কবিতা পড়ে তার অনুকরণে একটা করে কবিতা লিখতাম তখন। তারপর ঢাকা চলে এলাম, ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হলাম; এবং এরই মধ্যে রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে গেলাম। এখন বুঝি, ঐ মেয়েটির ভালোবাসার কাছে আমার ঋণ অনেক। ঐ মেয়েটির ভালোবাসাই আমাকে অসাম্প্রদায়িক করেছে; আমাকে লেখালেখিতে এনেছে; আমাকে সাম্যবাদে উদ্বুদ্ধ করেছে।

 

দুজনের মধ্যে কোনোদিন কোনো কথা হয়নি?

হ্যাঁ হয়েছে, তবে সে অনেক পরে, অন্য পরিপ্রেক্ষিতে।

 

তারপর? ৬০-এর দশকে ছাত্র ইউনিয়নকে সংগঠিত করার প্রসঙ্গে আপনার ভূমিকার কথা শুনেছি।

হ্যাঁ, তারপর আমি রাজশাহীতে চলে এলাম। এবং ছাত্র ইউনিয়ন করতে যেয়ে আমার অঞ্চলে আমাকে ব্যাপক কাজ করতে হয়েছে। খুলনা, যশোহর, বাগেরহাট এসব অঞ্চলের ছাত্র ইউনিয়ন, অন্তত আইয়ুবি আমলে, মূলত আমার হাতেই গড়া। তো একবার হয়েছে কী, বাগেরহাটে ছাত্র ইউনিয়নের একটা মিটিঙে দেখি ও এসেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ও মানুক আর না মানুক ভালোবাসার কথাটা আজ আমাকে বলতেই হবে। কিন্তু আবার ভাবলাম যে এত তাড়াহুড়ো করারই বা কী আছে। আগে দেশ উদ্ধার করা যাক তারপর বলা যাবে। তারপর আমি জেলে গেলাম।

 

আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে?

হ্যাঁ। … তারপর যেদিন জেল থেকে বেরুলাম; ঐ দিন জেল থেকে বেরিয়েই ঢাকায় চলে এলাম। আমার ছাত্রত্ব ততদিনে খারিজ হয়ে গেছে। ভাবছি কিছু টাকা পয়সা জোগাড় করে বাড়ি যাব। এমন সময় হঠাৎ একদিন রাস্তায় আমার এক ছেলেবেলার বন্ধুর সাথে দেখা। এক সাথে হোটেলে ভাত খাচ্ছি; হঠাৎ এক সময় ও আমাকে বলল কৃষ্ণার খবর জানিস? মেয়েটির নাম ছিল কৃষ্ণা। আমি বললাম, না। দেখা করার, জন্যই বাড়ি যাব। ও বলল, আর দেখা হবে না। আমি আঁতকে উঠলাম, কেন? কেন? আর দেখা হবে না কেন? আমার বন্ধুটি বলল, ওরা ভারত চলে গেছে। আমার মনে হলো আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। আমি ওখান থেকে বেরুলাম, বেরিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে ওয়ায়েজ ঘাটে এসে বসলাম। তখন বাজে রাত দশটা। রাত বয়ে যাচ্ছে… দশটা বাজে, এগারোটা বাজে, বারোটা বাজে…. আমি বসেই আছি ঘাটে। একটি তারার দিকে তাকিয়ে আছি। ভাবছি, এই তারাটি আমিও দেখছি সেও দেখছে কিন্তু আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না। আমি জানি না কী এক অচেতন ঘোরের মধ্যে সময় কেটে গেল। সারারাত ঘাটে বসে থাকলাম।. ভোর হলো। ভোরবেলা দেখলাম অনেকগুলো মেয়ে ঘাটে স্নান করতে এসেছে। হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখে ঠিক কৃষ্ণার মতো মনে হলো। মেয়েটি স্নান সেরে ঘাট থেকে উঠল এবং আমিও মেয়েটির পিছন পিছন চললাম। আমি তখন জানতাম না। ওটা একটা পতিতালয় এবং মেয়েটি একটি পতিতা। মেয়েটি ঘরে গিয়ে ঢুকল আর আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। মেয়েটি দরজা খুলে আমাকে দেখে অবাক। বলে, যাও যাও; ভাগো; সন্ধেবেলা এসো- সন্ধেবেলা। আমি তাকিয়েই আছি। বললাম, আচ্ছা যাই; আমি সন্ধেবেলা আবার আসব। সন্ধেবেলা যখন গেলাম দেখলাম মেয়েটি সেজেগুজে বসে আছে। প্রথমে মেয়েটিকে চিনতেই পারি নি। যখন চিনতে পারলাম মেয়েটি তখন ঠাট্টা-টাট্টা করছে, যেমন করে আর কী। আমার চোখে জল এসে গেল। আমি বললাম, আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে। মেয়েটি আমাকে পাত্তাই দেয় না; বলে, কী কথা? আমি বলাম, বলব, কিন্তু এখন নয়। মেয়েটির বোধ হয় একটু দয়া হলো। আমাকে বলল, ঠিক আছে; তুমি কাল দুপুরে এসো। পরদিন দুপুরবেলা গেলাম; সব শুনে মেয়েটি বলল, … কিন্তু আমি একজন পতিতা। আমি বললাম, আমি ওসব বুঝি না। যাহোক তারপর থেকে প্রতিদিন ওর ঘরে যেতে শুরু করলাম। ওর বাজার করে দিতাম, পানি এনে দিতাম, বাড়িতে চিঠি লিখে দিতাম। ইতোমধ্যে আমি সিরিয়াসলি লিখতেও শুরু করেছি। কিন্তু একদিন যেয়ে মেয়েটাকে আর পেলাম না। শুনতে পেলাম, ও কোথায় যেন চলে গেছে; কেউ জানে না। কেন যেন মনে হলো আমার আকাশটা ধীরে ধীরে বুজে আসছে। একটা খাঁখাঁ শূন্যতা চারিদিকে। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম এই শূন্যতার মধ্যেই আমাকে মাটি বানাতে হবে।

 

কৃষ্ণা এবং মুক্তিযুদ্ধ

কৃষ্ণার সাথে কি আর কোনো দিন দেখা হয় নি?

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় প্রায় অলৌকিকভাবেই কৃষ্ণার সাথে আমার দেখা হয়। কিন্তু সেদিনও স্বাভাবিক কুশল বিনিময় ছাড়া আর কিছু বলা হয়ে উঠে নি; সাহস করিনি। দেখলাম আমি যে লিখছি টিখছি এসব খবরও ও রাখে। তারপর থেকে কলকাতাতে যখন ছিলাম তখন মাঝে মাঝেই দেখা হতো। এবং একদিন আমি ভাবলাম যে ওকে বলব, তোমাকে আমি এতটাই ভালোবাসতাম। একটা স্কুলে কাজ করত ও; শেষতক একদিন গেলাম সেখানে। ভাবলাম কোনো একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বলব। বললাম, চল চা খাই কোথাও। দুজনে বেরুলাম। বেরিয়ে একটা বাসে উঠলাম। দুজনে বাসে চুপচাপ বসে আছি; হঠাৎ একজন লোক ওকে এসে বলল, তুমি গত দু’সপ্তাহে তোমার বাড়ির কোনো খবর পেয়েছ? ও বলল, হ্যাঁ পেয়েছি। লোকটি জিজ্ঞেস করল বাড়ির লোকেরা কেমন আছে? কৃষ্ণা বলল, হ্যাঁ ভালো আছে। লোকটি যেন যন্ত্রগ্রস্ত; স্বরটা আরো দৃঢ় করে বলল, না ভালো নেই। কৃষ্ণা আঁতকে উঠল, কেন? কারণ গত বৃহস্পতিবার রাত্রে রাজাকাররা তোমার বাবা, কাকা এবং বাড়ির যত পুরুষ লোক ছিল সবাইকে মেরে ফেলেছে। ও কাঁদতে ভুলে গেল; চোখ দুটো লাল এবং স্থির। খবরটা শুনে আমি প্রায় মৃত বৃক্ষের মতো নিথর হয়ে গেলাম। এত অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেকে। মনে হচ্ছিল আমিও ঐ রাজাকারদের মধ্যে একজন। জাতীয় অপরাধ যে কী, আমি সেদিন উপলব্ধি করতে পারলাম। তারপর সামনের এক স্টপেজে নেমে যাদবপুরে ওর এক কাকা থাকে সেখানে যাবার জন্য যাদবপুরের বাসে উঠে পড়ল। ও হয়তো ভেবেছিল- আমি ওর সাথে যাব। কিন্তু সে সাহস আমার হয় নি। কী করে ওর আত্মীয় স্বজনের সামনে মুখ দেখাব? কী বলব তাদের যেয়ে? ও চোখ মুছতে মুছতে বাসের জানালা দিয়ে একবার হাত নাড়ল। আমিও হাত নাড়লাম। সেই আমাদের শেষ দেখা। এই জরুরি কথাটাই তাকে এই জীবনে জানানো হয় নি যে, আমি তার জন্য কী বেদনাই না পেয়েছি। এবং পৃথিবীর সমস্ত কবিতার বিষয়বস্তু বোধ করি একটিই— তা হলো, শুধু জানানো যে পৃথিবীকে আমি কতটা ভালোবেসেছিলাম।

 

সংসার : ভিতর, বাহির

একজন ফরাসি কবির উক্তি এমন যে, ‘কবির প্রকৃতির সাথে আর যাই যাক, নারীর সাথে স্থায়ী বন্ধন যায় না’; সংসার জীবনে প্রায় দীর্ঘ পঁচিশ বছর পৃথগন্ন হয়ে আছেন; এর পিছনে ব্যক্তি মোহাম্মদ রফিকের থেকে কবি মোহাম্মদ রফিকের দায় কত খানি?

আসলে এটা ঠিক স্থির করে বলা যাবে না। কারণ স্বামী-স্ত্রী দুজনের সম্পর্ক, সম্পর্কের জট ও জটিলতা এক ধরনের রহস্যময়তা দিয়ে ঘেরা। এবং এটা যে শুধু এক পক্ষের দায় থেকে ঘটে— এটাও আমি মনে করি না। এটা হয়তো এমন একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ঘটে— যখন বোধকরি মানুষের আর কিছু করার থাকে না। হয়তো সমস্ত বিষয়টার জন্য আমি নিজেই অধিক অপরাধী; কিন্তু তার পরেও ঘটনাটা ঘটে গেছে; সামাল দেয়া যায় নি। জানি না এর পিছনে অন্য কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম কাজ করে কি না। এবং আমি এটা নিয়ে এখন খুব কষ্ট পাই; অপরাধবোধে ভুগি। কিন্তু ঐভাবে ফিরে যাবার কোনো তাগিদ বোধ করি না। একজন কবিকে সহ্য করা একজন নারীর পক্ষে বোধহয় অসম্ভব ব্যাপার। দেখা যায় অনেক কবি নারীকে খুব অপরাধী ঠাউরিয়েছেন; সেই সেক্সপীয়র থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত। কিন্তু আমি তা মনে করি না। বোদলেয়ারের সাথে জান দ্যুভালের সম্পর্ক নিয়ে ক্রিস্টফার ইশারউড একটা উক্তি করেছিলেন- আমি এখন পর্যন্ত সেটা সারবান মনে করি। উক্তিটি ছিল এমন যে, ‘আমরা তো জানি একজন নারীর পক্ষে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের বা একজন কবির বিভিন্ন ধরনের উন্মার্গগামীতা সহ্য করা কী কঠিন। এক্ষেত্রে কাউকে দায়ী করার কিছু নেই। এটা ঘটে যায়।

 

এমন কী হতে পারে যে একজন কবি তার নিজের মধ্যে অনেক স্ববিরোধিতায়, বিচিত্র বিশ্বাসে, অনেক বিচিত্র মনোজাগতিক বাস্তবতায় এমন স্বপ্ন সংকুল জীবনযাপন করেন যে সেখানে একজন নারী কেন; নারী তার কাছের মানুষ বলে হয়তো তার উপর দায়টা বেশি বর্তায়; যে কোনো মানুষের জন্যই তাকে বুঝে ওঠা বা বুঝে ওঠা গেলেও সর্বতোভাবে মেনে নেয়া খুব কঠিন।

 হ্যাঁ আমারও তাই মনে হয়। স্ববিরোধিতাই শুধু নয়, নিজের সাথে নিজের সংগ্রাম, নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া, নিজের সঙ্গে নিজের যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। চলে- সেটা; সেটাই কারণ। শুধু নারীকেই কেন বলছি, আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও এভাবে আলোড়িত হয়। শুধুমাত্র আকর্ষণ দিয়ে তো কোনো সম্পর্ক তৈরি হতে পারে না। সম্পর্কের জন্য পরিচর্যা লাগে আমার মনে হয় এই পরিচর্যাটা কবিরা করতে পারে না।

 

আমাদের বাঙালি জীবনে দাম্পত্য বা নারী পুরুষের যৌন সম্পর্কগুলো শেষতক যে অর্থ পায় সেগুলোকে আপনি কেমন ভাবে দেখেন?

এ ধরনের সম্পর্ক মূল্য পায় কাদের মধ্যে? যেখানে দুজনেই সমান সমান আমাদের বাঙালি জীবনে সেই অর্থে তো মেয়েদের কোনো পাত্তাই নেই। আমরা যে যতই বড় কথা বলি না কেন, কোনো নারীকে আমাদের সমকক্ষ ভাবা, ভাবাও হয়তো সম্ভব কিন্তু ভাষা অনুযায়ী সেটাকে বাস্তবে পরিণত করা বোধকরি সম্ভব নয়। এবং আমরা সেই অর্থে ধর্ষক না হলেও প্রত্যেকেই অত্যাচারী। সুতরাং আমাদের নারী পুরুষের সম্পর্কটাই একটা অসামঞ্জস্যতার উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের মধ্যে হয়তো ভালোবাসা আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, কল্পনা আছে কিন্তু বাস্তবের কোনো অবস্থান নেই। এখানে মেয়েদের কোথাও কোনো মূল্য আছে কি না সে ব্যাপারেই আমি সন্দিহান। এবং মধ্যবিত্ত জীবনে নারী যেন দিন দিন আরো মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। মেয়েরা সংসারে এতকিছু দেয়া সত্ত্বেও সমাজ তাদের শুধু অস্বীকারই করে চলেছে। সমস্যা হচ্ছে এখানে নারীদের একটা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু পুরুষ জাতি তার অতীত মূল্যবোধকেও ছাড়তে পারছে না। আমার ধারণা আমাদের সমস্ত সংকটই, এমনকী রাজনৈতিক সংকটও এই অস্বাভাবিক যৌন জীবনের সাথে সম্পর্কিত। কারো যদি স্বাভাবিক যৌন জীবন না থাকে তবে তার পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে বিকশিত হওয়া বা কোনো সংকটে ভার সামনে দাঁড়ানো সম্ভব হয়ে ওঠে না।

 

বাঙালি জীবনে অবদমন-এর ব্যাপারটি বোধ করি সর্ববিস্তারী।

তোমাদের সময়টা কেমন জানি না, আমরা যখন ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছি- তখন আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক দেখা সম্ভবই ছিল না। আমি আমার যত বন্ধু বান্ধবকে জানি তারা স্বীকার করবে কি না জানি না যে তাদের সবারই যৌন জীবন শুরু হয়েছে এক ধরনের অস্বাভাবিকতার ভিতর দিয়ে। একজন লোকের যৌন জীবন তার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে বিরাট ভূমিকা পালন করে এবং তার যৌন জীবনই যদি অস্বাভাবিকতার ভিতর দিয়ে তৈরি হয় তবে কী করে আশা করা যায় যে বাকি জীবনে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুব স্বাভাবিক এবং জীবনমুখী হয়ে উঠবে। একটা নারীর কল্পনা করতে করতেই তার তিরিশ বছর কেটে যায়। এবং আমি প্রতি পরিবারেই দেখেছি- পুরুষদের সমস্ত অক্ষমতার দায় তাদের স্ত্রীদের বহন করতে হচ্ছে, ভাবখানা এমন যে নারী না থাকলে তারা প্রত্যেকে একজন নেপালীয়ন বা বিটোফেন হয়ে যেত। বেশিরভাগ বাংলা কবিতা পড়ার সময় দেখ- মনে হবে যে, বাঙালি নারী পুরুষ কোনো যৌন কর্ম করে না। তাদের কবিতায় জীবনের অন্য সব অনুষঙ্গ আছে- যেমন তারা ভালোবাসার মধ্যে আছে বা অন্য আর সবকিছুর মধ্যেই আছে কিন্তু তারা যৌন কর্মের মধ্যে নেই। এবং আমাদের দেশে এই যে মাঝে মাঝে এরশাদের মতো ‘বীরপুরুষ’দের আবির্ভাব ঘটে- এর পেছনেও অবদমনের একটা ভূমিকা আছে। কারণ এই অবদমনের জন্য প্রকৃত পুরুষ হয়ে ওঠা যে কী ব্যাপার এ বিষয়টি আমাদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

 

লেখালেখি প্রসঙ্গ

সিরিয়াসলি লেখালেখি শুরু করলেন কবে থেকে?

সিরিয়াসলি লেখালেখি সেই অর্থে বলা যায় এখনো শুরু করি নি। যাহোক লেখালেখির সাথে বোধ হয় নিজেকে খুঁজে পাবার একটা ব্যাপার আছে। সেই ভাবে আমার লেখালেখির শুরু স্বাধীনতার পর থেকে। ষাটের দশকে আমি একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষ ছিলাম। পাকিস্তান, পাকিস্তানের আদর্শ, মূল্যবোধ সবকিছু মিলিয়ে নিজের জায়গাটা আমি কোথায়ও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। স্বাধীনতা আমাকে সেই জায়গাটা দিয়েছে।

 

আমরা ইতিহাসে দেখি যে অনেক পরাধীন দেশে পরাধীনতার ভাগেই লেখকের জন্য হয়েছে। এমনকী আমাদের দেশেও ……

হ্যাঁ, পরাধীন দেশেও অনেক বড় বড় লেখকের জন্ম হয়। আমাদের দেশেও হয়েছে। এবং তাঁদের মধ্যে এক ধরনের তাগিদ নিশ্চয়ই প্রচণ্ডভাবে কাজ করেছে। তাঁদের ব্যাপারটি ঠিক এই মুহূর্তে নিজের মতো করে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়; এটুকুই বলি, আমাদের স্বাধীনতাই আমাদের নিজের জায়গাটুকু খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

 

প্রথম কবে আপনার লেখা প্রকাশিত হয়?

প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় বগুড়ার একটি কাগজে। আমি তখন বগুড়া কলেজের ছাত্র। তবে সেই অর্থে প্রথম লেখা বের হয় ‘সমকালে’।

 

কত সালে?

ঠিক মনে করতে পারছি না। ৬৫/৬৬’র দিকে হবে।

 

‘কীর্তিনাশা’, ‘গাওনিয়া’ বা ‘কপিলা’র মোহাম্মদ রফিক যখন তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’র দিকে তাকান তখন তাঁর অনুভূতিটা কী হয় – সে প্রসঙ্গে জানতে চাচ্ছি।  

এখন আমার মনে হয় আমার প্রথম কবিতার বইটা না বেরুলেই ভালো হতো; এতো অক্ষম রচনা দিয়ে ভর্তি বইটা। আমি সে সময় গৌতম বুদ্ধ দিয়ে খুব প্রভাবিত ছিলাম, রিলকে দিয়ে খুব প্রভাবিত ছিলাম, সে সময় আমি রবীন্দ্রনাথে খুব নিমজ্জিত ছিলাম; এইসব বিষয়গুলি মনে হয় খুব কাঁচাভাবে বই এর মধ্যে এসেছে। তারপরেও মনে হয় বেড়ে ওঠার জন্য এর একটা ভূমিকা আছে। যেমন আমার বন্ধু বান্ধবদের মাঝে হঠাৎ করে ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রচণ্ডভাবে আধুনিক হবার প্রবণতা দেখা গেল। বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর ‘বোদলেয়ার’ অনুবাদ হবার পর থেকে সবাই যেন ভীষণভাবে পাল্টে গেল। কিন্তু আমি একই রকম থেকে গেলাম। এখন আমার মনে হয় যে, ওটাই আমার শক্তি; আমার মনে হয়েছিল যে আমাকে উঠতে গেলে আমার জায়গা থেকে উঠতে হবে; আমার কোনো কিছুকে বাদ দিয়ে বা অন্য কোনো জিনিস শরীরের উপর চাপিয়ে বা আহরণ করে কিছু হবে না; যা করার আমার আশপাশকে নিয়েই করতে হবে।

 

বৈশাখী পূর্ণিমাথেকেধূলোর সংসারে এই মাটিতে মোহাম্মদ রফিকের যে উত্তরণ সেক্ষেত্রে কোন হাওয়া, জল, মাটি- এই যোগ্য বীজতলা তৈরি সম্ভব করে তুলল?

প্রথম কথা বইটা অনেক পরে বেরিয়েছে; ৭/৮ বছর তো বটেই। এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে; আমার ব্যক্তিগত জীবনে বিপর্যয় এসেছে। এর মধ্যে আমার কবিতার ধারণায়ও বিবর্তন ঘটে গেছে। তাছাড়া কবিতার যে বিষয় আসয়ের কথা বল আঙ্গিক, ছন্দ- এসব কিছুর উপর একটা অধিকারও কবির জন্মাতে হয়; এই সময়ে ধীরে ধীরে আমার মধ্যে তার একটা পরিবর্তন চলে এল। এবং আমি এটুকু বুঝতে পেরেছি যে আমাকে তাই করতে হবে যা এর আগে করা হয় নি। শুধু তাই নয় ধীরে ধীরে নিজেকে মধ্যবিত্ত বোধগুলো থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছিলাম।

 

যেমন?

যেমন আমাদের কবিতায় দেখবে যে যখন চুমু খাওয়ার প্রসঙ্গ আসছে তখন সেখানে চুলের গন্ধের কথা আছে, ঠোঁটের অন্যান্য উপমা আসছে। কিন্তু এটা কি বাস্তব আমাদের জীবনে? আমরা যদি কোনো মেয়েকে চুমু খাই তো সেখানে মাটির গন্ধ বা জলের ঘ্রাণ আসবে। আমার কবিতায় আমি এসব থেকে সচেতনভাবেই বেরিয়ে আসতে চেয়েছি।

 

কীর্তিনাশাতেই বোধকরি প্রথম আপনি আপনার নিজস্ব ভূমিটুকুতে সার্থক অধিকার লাভ করলেন; যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে জীবনানন্দ দাশ তখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপস্থিত।

এটা তো ঘটতেই পারে। তুমি কোনোভাবেই যেমন জীবনের বেড়ে ওঠাকে অস্বীকার করতে পারবে না, ঠিক তেমনি কোনোভাবেই তুমি কবিতার বেড়ে ওঠাকেও অস্বীকার করতে পারবে না। সুতরাং যে সমস্ত কবিদের লেখার মধ্য দিয়ে আমি বেড়ে উঠেছি- তাঁদের ছাপ তো থাকবেই এবং থেকে গেছে। আর কীর্তিনাশার ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার তোমাকে দেখতে হবে যে কীর্তিনাশায় যেটাকে কবিতার বিষয় বলে- সেখানে হয়তো প্রচলিত বাংলা কবিতা থেকে বেরিয়ে আসা যত সহজে সম্ভব হয়েছে- কবিতার প্রকরণের দিক থেকে হয়তো বেরিয়ে আসাটা ততটা সহজ হয়নি। প্রকরণের ভিতরে হয়তো আমার ঐতিহ্যের বা আমার অতীত সাধকদের ছাপ রয়েই গেছে; এবং কখনো কখনো হয়তো তা সচেতনভাবেই। সেখানে আমি বোঝাতে চেয়েছি যে আমি স্বয়ম্ভু নই; এবং কবিতায় সেটা সম্ভবও নয়। আমি যেমন আমার দেশ মাটির সন্তান; তেমনি আমার যাঁরা অতীত সাধক- তাদেরও আমি সন্তান । ….. বাঙালির জীবনে নদীর প্রভাব খুবই গভীর; নদীই তাদেরকে নির্মাণ করে। আমি ছেলেবেলা খুব কাছ থেকে দেখেছি যে নদীকে কেন্দ্র করেই তাদের স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। ঐ সমস্ত বিষয়কেই আমি ধারণ করার চেষ্টা করেছি। সুতরাং প্রকরণগত দিক থেকে কীর্তিনাশাকে যে যেভাবেই নিক না কেন- এই দুর্বলতা কিন্তু আমাকে এখনো বিদ্ধ করে।

 

তবে ‘কপিলা’ পড়বার পরে মনে হয়েছে যে এই হচ্ছে আপনার নিজস্ব ভূমি যেটা সর্বতোভাবেই আপনার। এবং এইখানে দাঁড়িয়েই বুঝি আপনার এতদিনকার আধো আলো আধো অন্ধকারের আকাশটা যেন নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব সঙ্গীতে, নিজস্ব বোধে সম্পূর্ণ করে নিজেকে মেলে ধরল।

আমাকে যদি ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞেস কর- আমার প্রিয় বই কোনটা; তো আমি বলব- ‘কপিলা’। যদিও বইটা বহুল পঠিত নয় : বহুল তো দূরের কথা হয়তো পঠিতও নয় ।

 

আপনার কবিতায় বাংলা উপন্যাসের অনেক চরিত্র, প্রসঙ্গ ইত্যাদি নানাভাবে এসেছে। যেটা নতুন এবং অনুভূতিতেও আনন্দসঞ্চারী। এই প্রয়োগ সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটা জানতে চাচ্ছি।

হ্যাঁ, যেমন ধর ‘কপিলা’ নামটা গ্রহণ করার পেছনে একটা কারণ ছিল। তুমি দেখবে যে ‘কপিলা’য় নারী জাগরণের একটা প্রতিকী অর্থ দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে সারা দেশের নারী জাগরণকে মেলাবার চেষ্টা করা হয়েছে। ইউরোপে যেমন মিথ আছে, লিজেন্ড আছে; এবং আমাদের তিরিশের যুগের কবিরা সহ অনেক কবিই এটাকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। এগুলো দেখে আমার মধ্যে এক ধরনের দীনতা বোধ হয়েছে। আমার মনে হয়েছে যে আমাদের সাহিত্য থেকেও এ ধরনের চরিত্র বের করে নিয়ে আসা যেতে পারে। ইউরোপে যেমন এথেন্স মানেই হচ্ছে সভ্যতার সমার্থক একটা শব্দ। আমার কাছে মনে হয়েছে যে ‘গাওদিয়া’ বা ‘কপিলা’ এদেরকে বাঙালি জীবনের প্রতিভূ হিসাবে দাঁড় করানো যায় কি না। তবে এটা যে খুব ভেবে কিছু একটা করেছি তেমন নয়। এটা আসলে ভিতর থেকেই ঘটে গেছে।

 

এমনিতে উপন্যাস হিসাবে ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ প্রিয় নিশ্চয়ই?

হ্যাঁ, সে সময় তো প্রিয় ছিলই। তবে এখন ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ লেখা হিসাবে প্রিয় কিন্তু এটাকে ঠিক মানিকের প্রধান লেখা মনে হয় না।

 

কোনটিকে মনে হয়?

অবশ্যই ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এবং পরবর্তী কালে ‘চিহ্ন’। এতে অনেক নতুন চিন্তাভাবনা আছে এবং বিস্ময়কর সব ব্যাপার আছে। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’কে আমার ইউরোপীয় প্রভাবে লিখিত একটা উপন্যাস মনে হয়। এবং এক ধরনের সাবলীলতার অভাব বোধ হয়। সাহিত্যে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ব্যাপারটা আমার কাছে খুব মূল্যবান।

 

ইউরোপীয় কোন দিক থেকে? কাহিনী নির্মাণ?

হ্যাঁ, ঘটনার নির্মাণ, পরিচ্ছেদ বিন্যাস। ঠিক ইউরোপীয় না বলে হয়তো বলা যায়- স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে নি।

 

কিন্তু চরিত্রগুলো তো আমাদের চারপাশের মানুষগুলোকেই খুঁড়ে খুঁড়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

হ্যাঁ, তাতো বটেই। শুধু তাই নয়। এটা নিয়ে একটা মজার ব্যাপার আছে। আমরা ভাবি আউটসাইডারিজমের ধারণা হয়তো ইউরোপ থেকে এসেছে; কিন্তু মানিকের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ যখন লেখা হয়েছে- তখন কাম্যুর লেখার কথা তো চিন্তাই করা যায় না; এমনকী কাফকাও তখন প্রাগ শহরের বাইরে পঠিত নয়; মানিক কিন্তু তখনই একই বোধগুলিকে তাঁর লেখার মধ্যে নিয়ে এসেছে। সুতরাং আগে যে এক সময় ধারণা ছিল যে আধুনিক হবার জন্য নগর বা শহর দরকার। মানিকই প্রথম প্রমাণ করলেন যে আসলে এগুলোর দরকার নেই। মানুষের গভীর বিন্যাসগুলো খুঁড়ে খুঁড়ে দেখলেই এই বোধগুলো বেরিয়ে আসতে বাধ্য।

 

তাঁর নন্দন বিশ্ব, লোকনন্দন

কবি মোহাম্মদ রফিকের কবিতায় গভীরভাবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের লোকমানুষের জীবনযাপন- তার থেকে জাত হয়েছে এক আশ্চর্য স্বল্পভূতপূর্ব লোকনন্দন। এবং তা দিয়েই অন্তর্ঘাত ঘটালেন কবি। কোনো প্রশ্ন করছি নে; কিন্তু এই বিস্ময়বোধের কোনো এক যোগ্য জবাব চাচ্ছি।

আমি যেভাবে বেড়ে উঠেছি, যেভাবে নিশ্বাস নিয়েছি, যা দেখেছি- সেটাই আমার লেখা। চেষ্টা করে আমি গ্রামীণ জীবন আনব, গ্রামের মানুষদের নিয়ে লিখব- তা বোধকরি কবিতায় অন্তত সম্ভব না। এবং কেউ লিখলে সেটা আরোপিতই থেকে যাবে। তো আমার কবিতার যে নন্দন প্রসঙ্গে বলছিলে তার একটা কারণ হয়তো এই যে আমি দীর্ঘকাল মফস্বলে থেকেছি; নাগরিক জীবনের বিষয় আসয় আমি হয়তো তেমন বুঝি না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে- জীবনের মৌলিক বিষয়গুলোকে ধরার জন্যে গ্রামকে আলাদা করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ জীবনের মৌলিক অনুভূতিগুলো দু’জায়গায়ই সমানভাবে প্রকাশিত; সমানভাবে বাঙময় । একজন কবির প্রকৃত জায়গা— তার জায়গায় দাঁড়িয়ে সেগুলোকে স্পর্শ করা।

 

খুব গোড়াতে যেয়ে বললে বলতে হয় যে, সৌন্দর্যের আগাপাশতলা অবয়বটাই হচ্ছে মানুষের আরোপ করা : প্রাগৈতিহাসিক যুগে সেই অর্থে গোলাপের কোনো সৌন্দর্য ছিল না; কিংবা জ্যোৎস্নাও পথ চলবার সুবিধা ছাড়া আর কোনো অনুরণন মনে তৈরি করেছিল কি না জানি নে; হয়তো প্রথম জ্যোৎস্নায় কিছু মুগ্ধ মানুষের দল নির্বাক হয়েছিল তার রহস্যময়তায় কিংবা অপার বিস্ময়ে। যাহোক, এর শুরুর কথাটা কল্পনা করে ওঠা দুঃসাধ্য। যেকোনো ভূখণ্ডের বা দেশের সৌন্দর্যের যাবতীয় বিষয় আসয়; সে যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক— শিল্পে কিংবা জীবনে; গড়ে ওঠে সে দেশের সংস্কৃতি, লোক-মানুষের বিশ্বাস, প্রকৃতি, প্রবণতা, ভৌগলিক, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা- এসব কিছুর উপর ভিত্তি করে। এবং আমরা দেখি যে যেকোনো দেশের কবিতায় ব্যবহৃত উপমা, উদ্ভূত নন্দন- এসব কিছুরই নির্মিতি সে দেশের নাড়ির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু আমাদের আধুনিক কবিতায় (কয়েকটি উদাহরণ বা দিয়ে) সঞ্চারিত যে সৌন্দর্য দ্বারা স্নিগ্ধ হয়ে উঠি- তার সাথে কি আমাদের যাপিত জীবন বিযুক্ত নয়? এখানেও বাইরের হাওয়া এসে আমাদেরকে সে সব পথে নিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে; যে সব পথ আমাদের সকল প্রকার মূর্ত বা বিমূর্ত বাস্তবতা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন; আপনার ‘কীর্তিনাশা’তে এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

 

নিজের ব্যাপারে বলতে পারব না; তবে নিজস্ব নন্দন তৈরির পিছনে আরেকটা জিনিস দরকার হয়- সেটা হচ্ছে দার্শনিকতা। যেমন- ইউরোপের নন্দনতত্ত্বের যারা আদি গুরু; শুধু আদি গুরুই বা কেন; এখনো যাঁরা প্রধান নন্দনতাত্ত্বিক তাঁরা প্রত্যেকেই এক একজন দার্শনিক। আমাদের বাঙালি চিন্তায় কিন্তু এই জায়গাটা খুব খালি। আমাদের বাউলতত্ত্ব, সুফিতত্ত্ব- এগুলোকে ভিত্তি করেই আমাদের নান্দনিকতার বা দার্শনিকতার একটা জায়গা তৈরি হতে পারত। এমনকী আমরা যে মার্কসবাদ কায়েম করতে চেয়েছি সেটাও ইউরোপীয় মার্কসবাদ; আমাদের নয়। এজন্য আমাদের দেশে যাঁদেরকে মার্কসীয় কবি বলা হয়, লক্ষ্য করলে দেখবে যে তাঁরা আসলে ব্যক্তি প্রতিবাদের কবি; মার্কসীয় কবি নন। সমষ্টি-চৈতন্যর ব্যাপারটা কারোর মধ্যেই তেমন করে আসে নি। কিছুটা বিষ্ণুদের মধ্যে পাবে। আর কারো মধ্যেই নেই। সুতরাং একটা নিজস্ব দার্শনিকতার জায়গা তৈরি হলে- তবেই একটা নিজস্ব নান্দনিকতার জায়গা তৈরি হবে। এবং আজকে আমাদের এখানে যারা নিজস্ব নন্দনতত্ত্বের কথা বলছে- তারাও আসলে ইউরোপীয় কণ্ঠস্বরেই কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে। অবশ্য একথাও মাঝে মাঝে ভাবি যে আজকের পৃথিবীতে আমার নিজস্ব জায়গা বলে কি আদৌ কিছু আছে? বা থাকছে?

 

না থাকছে না। শিল্পে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে মিথষ্ক্রিয়া অপরিহার্য এবং আবশ্যকও বটে। কিন্তু যে উপরিপাতন এখন ঘটছে তা আমাদের লোকজ বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সম্পর্কহীন। যার ফলে এই অসম মিথষ্ক্রিয়া একটা অদ্ভুত সারশূন্যতার জন্ম দিচ্ছে। সেখানে আমাদের যদি পরিপক্ব স্থায়ী একটা জায়গা থাকত, তাহলে হয়তো উপরিপাতন দ্বারা আমরা শুধু আগ্রাসিতই হতাম না; মিথস্ক্রিয়ার প্রশ্নে সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে নতুন কোনো সম্ভবনাকে মূর্ত করে তুলতাম।

ঠিকই বলেছ; আমার যদি কোনো নন্দন-ভাবনা গড়ে তুলতে হয় তবে আমার সংস্কৃতি, আমার পরিমণ্ডলকে ঘিরেই গড়ে তুলতে হবে। আরেকটা জিনিস মনে রাখতে হবে যে, আমাকে যদি আমার জায়গা করে নিতে হয় পৃথিবীতে- তবে অন্যের জিনিস ধার করে আমার জায়গা হবে না। আমাকে আমার সব কিছু নিয়েই আমার জায়গা করতে হবে। এবং যত দিন পর্যন্ত আমি করতে পারব না তত দিন পর্যন্ত আমি চিৎকার করলেও আমার জায়গা হবে না। আজকে তুমি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য দেখ, সারা পৃথিবীতে তাঁদের বিস্তৃতিটা কেমন । তাঁরা কিন্তু তাঁদের বিষয়গুলো নিয়েই উঠে এসেছে। অবাক বিস্ময়ে পৃথিবীর লোক দেখেছে যে, এখানে এমন একটা অভিজ্ঞতা আছে, যে অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। তারপর ধরো ভারতীয় সঙ্গীত – রবিশঙ্কর, আলী আকবর, এঁরা পৃথিবীব্যাপী একটা বিস্ময় তৈরি করেছে। কেন? এর কারণ হচ্ছে- অন্য দেশের লোক যখন এঁদের গান শোনে, তখন তারা বোঝে যে এটা সম্পূর্ণভাবে এঁদের অভিজ্ঞতার ফসল।

 

কবিতায় আপনার যে কাব্যপথ অতিক্রমণ, সেখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে, ধীরে ধীরে আপনার ব্যক্তিক অনুভূতিটা একটা নৈর্বান্তিক রূপ লাভ করেছে

এটা তুমি বলতে পার যে, আমি আমিত্ব দিয়ে খুব ক্লান্ত। সেই রোমান্টিক যুগ থেকে এত ‘আমি’ ‘আমি’। দু’একজন সার্থক কবির হাতে অবশ্য সেই ‘আমি’ একটা বিশ্বমাপ পেয়েছে- কিন্তু যখন সেটা ব্যর্থ হয়েছে, তখন শুধু ক্লান্ত করেই ছেড়েছে। আমি অন্যের মধ্যে নিজের ‘আমি’কে দেখতে চেয়েছি এবং বলতে পার এগুলো আমার মুখোশ; যে মুখোশ পরেই হয়তো আমি নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। ইয়েটসের একটা কথা আছে এমন যে, ‘আমার মুখোশই হচ্ছে আমার গীতিময়তা। কবিকে শেষ পর্যন্ত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে হয়, ছড়িয়ে দিতে হয়। আমার আমিত্বকে অস্বীকার করা হয়তো আমার নিজেকে ছড়িয়ে দেবারই প্রক্রিয়া।

 

তাঁর কবিতার নির্মিতি

আপনার কবিতায় ‘যেন’, ‘মতো’ এগুলোর খুবই মিতব্যয়ী ব্যবহার; অনেক ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে; আবার বেশ কিছু ক্ষেত্রে যতি চিহ্নের ব্যবহার; এসব মিলিয়ে পাঠকের সাথে মাঝে মাঝে একটা দূরত্ব তৈরি করে।

‘যেন’ বা ‘মতো’ এগুলি আমি সচেতনভাবেই একেবারে পরিহার করার চেষ্টা করেছি। কারণ তুমি যখনই ‘যেন’ বা ‘মতো’ ব্যবহার করবে, তখনই কিন্তু তোমার বলার কথা এবং যে বিষয়কে তুমি আধার করে বলছ, তার মধ্যে একটা দূরত্ব থেকেই যায়। আমি এই দূরত্বটাকে খুব সহজভাবে ঘোচাবার চেষ্টা করেছি। আমি জানি যে অনেক পাঠকের এতে অসুবিধা হয়। বাংলা কবিতায় অভ্যন্ত পাঠক কবিতার মধ্যে এগুলি দেখতে চায়।

 

বাংলা ছন্দের প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন যে, আমাদের ছন্দটা আমাদের নিজস্ব আদলে তৈরি হতে পারত। এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছি।

মাইকেল সেই যে একটা ছন্দ তৈরি করে গেলেন, অদ্যাবধি আমরা সেই বিন্যাসের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছি। আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করছি না। বরং আমাদের সঙ্গীতের যে জগতটি আছে- আমাদের ভাটিয়ালি আছে, কীর্তন আছে, আমাদের ভাওয়াইয়া আছে; আমার মনে হয় এই ঢঙে বাংলা কবিতার ছন্দ নির্মাণের চেষ্টা নেয়া যেত। এবং আশা করি ভবিষ্যতে কেউ নেবে। আমি হয়তো তোমার বয়সে থাকলে আরেকবার চেষ্টা করে দেখতাম। কিছু কিছু চেষ্টা যে করি নি। তা কিন্তু নয়।

 

আপনার অন্য একটি কথা ছিল এমন যে, বাংলা কবিতার আরেকটি ক্ষতির দিক হচ্ছে তার সঙ্গীত বিযুক্ততা।

সঙ্গীত মানে এখানে সাঙ্গীতিক গড়ন বা আবহটাকে বোঝাতে চেয়েছি। এর সঙ্গে কবিতার একটা বিযুক্তি ঘটে গেছে। বিশেষ করে তিরিশ থেকে। এবং এটা কবিতার ক্ষতি করেছে।

 

এখানে বোধকরি একটা ভুল বোঝার অবকাশ থেকে যাচ্ছে; যেমন- বুদ্ধদেব বসুর “কঙ্কাবতী’ বা জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতা দুটিকেই যদি উদাহরণ হিসাবে নেই, তবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এগুলোর মধ্যে একটা অন্তর্নিহিত সঙ্গীত আছে বৈকি।

হ্যাঁ, তা আছে। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমাদের ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, কীৰ্ত্তন- এগুলোর বিন্যাসকে ভেঙে বাংলা কবিতায় আনা যায় কি না- সেটা ভেবে দেখতে হবে। এবং পুরানো ঢঙে নয়। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া এবং কীর্তনের ঢঙেই। যেমন ধরো, লোরকা; সে সমস্ত জিপসি গানকে তাঁর কবিতায় পুনর্নির্মাণ করেছে। তারপরেও সে জিপসি কবি তো নয়; সে তো আধুনিক কালের অন্যতম একজন কবি। আমরা লোরকার প্রশংসা করেছি, কিন্তু এই জায়গাটি বুঝতে চেষ্টা করি নি।… তবে এটা করতে গেলে আমাদের সমস্ত লোক-গানের মধ্যে ডুবে যেয়ে ভেসে উঠতে হবে। ডুবে যাওয়াটাও যেমন কঠিন, ভেসে ওঠাটাও তেমনি কঠিন। এবং সে এক দুরূহ সাধনা। আধুনিকতার খুব বড় একটা দিক হচ্ছে লোক, লোক-শিল্প, লোক-জীবন। কোনো দেশেই এগুলোকে বাদ দিয়ে আধুনিকতা বেড়ে ওঠে নি। আমাদের দেশে উঠেছে। আধুনিকতা মানেই হচ্ছে সবকিছু গ্রহণ, বর্জন নয়। কিন্তু আমরা একসময় অপাঠ্য বলে বর্জন করেছি; রুচিহীন বলে বর্জন করেছি। আমরা বুঝি নাই যে, চর্যাপদ, কবিগান, বাউলগান- এগুলো আমাদের জীবনের বিপুলাংশ দখল করে আছে। এগুলোকে বাদ দিয়ে যা তৈরি করা হবে, সেটা আর যাই হোক আমার আধুনিকতা নয়।

 

আধুনিকতা ও শিল্পের বাস্তবতা

শিল্পীর দায় আছে কী নেই- এ প্রশ্নটি অতি জিজ্ঞাসায় ক্লিশে; মাঝে মাঝে অবান্তরও বটে; কিন্তু শিল্পীর কাছে মানুষের প্রার্থনা বোধকরি নিরন্ন মানুষের শস্যবর্তী মাটির কাছে নতজানু শস্য প্রার্থনার মতোই এক দুর্মর মানবিক আকাঙ্ক্ষায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ফরাসি বিপ্লবের কাহিনী ইতিহাসে না যতটুকু এসেছে- তার চেয়ে বেশি এসেছে ফরাসি সাহিত্যে। লেনিন লিখেছিলেন, আমি রাশিয়ার কৃষক চিনতে শুরু করেছিলাম রুশ কথাসাহিত্য পড়ে। এই গুরুব্রত পালনের ক্ষমতার অধিকারী শিল্পী ছাড়া আর কে? … এমন সার্থক শিল্প তপস্যার মধ্য দিয়েই আমরা সেই দেশের বা অঞ্চলের ভৌগলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, জীবনবোধ, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, ক্লেদ, সংকট, সৌন্দর্য জানতে পারি। শুধু জানানোই কি তার দায়? তাপের মধ্যে দিয়ে তাপিত হয়ে, রসের মধ্যে দিয়ে স্নাত হয়ে, মূর্তনন্দনের মধ্যে দিয়ে নির্বাক হয়ে কোনো এক অবচেতনে এক অচ্ছেদ্য আন্তঃসম্পর্ক নির্মাণ করে তুলি। এটা শুধু মানবিক বেদনার সাথে একাত্মতা নয়। নিজের মানবিক সম্ভবনাকে আবিষ্কার করে তোলাও বটে।….. বাংলা কবিতার কথিত বীরযুগে ঈশ্বর চন্দ্র- মধুসদন- হেমচন্দ্র নবীনচন্দ্রের হাতে যে আধুনিকতার জন্ম হলো- তার মধ্যে আমরা দেখি যে মধুসূদনের হাত ধরে প্রথম শিখরস্পর্শী সূর্যের যাত্রা শুরু হলো এবং রবীন্দ্রনাথের হাতে সেটা ভাবনাতীত প্রাচুর্যে ভূমি স্পর্শ করল। কিন্তু তিরিশের দশকে ইউরোপের ভূত এমনভাবেই চাপল যে, জীবনানন্দ দাশ এবং অন্যদের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উদাহরণ বাদ দিয়ে বাংলা কবিতা থেকে মাটির গন্ধ মুছে গেল। তার নন্দন এই মাটি, নদী, ঋতুবৈচিত্র্য- এসবের সাথে লোকায়ত জীবনের সংগ্রাম সম্ভাবনায় জাত আনন্দ বেদনার গান থেকে যেন উদ্ভূত নয়। সে যেন ক্রমশই প্রাণের সাথে তার যোগ হারাচ্ছে, নাড়ির সাথে তার বন্ধনকে দুর্বল করে তুলছে- এ অভিযোগ এখন অনেকেরই। এখানে হয়তো আমাকে ভুল বোঝার একটা অবকাশ থেকে যাচ্ছে; যে কোনো শিল্প সাহিত্যই যে বৈশ্বিক মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এক অপার সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে- আমি সেটাকে অস্বীকার করছি কি না? এক্ষেত্রে বলে রাখি- আমি সে সম্ভবনাকে অস্বীকার করছি নে; বরং এই বদ্বীপ অঞ্চলের লোকায়ত বাস্তবতার সাথে শিল্পের বিভিন্ন অনুষঙ্গের যে বৈশ্বিক মিথষ্ক্রিয়া ঘটেছে, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব গতিময়; সৃষ্টিশীল এবং অঅনুভূতপূর্ব আনন্দময়।

এটা একটা দুরন্ত প্রসঙ্গ তুলেছ। এ প্রসঙ্গে বলবার আগে একটা বিষয় তোমাকে ভাবতে হবে, সমস্ত বাংলা সাহিত্যেরই বিবর্তনের একটা চমৎকার রূপ আছে। এটা সর্বত্রই ইতিহাসে ঘটে যে, যখন বাইরে থেকে অন্য একটা শক্তি আসে তখন জাতির বলো মানুষের বলো- ভিতরে যে শক্তিটা পুঞ্জীভূত থাকে, তার সাথে অবশ্যম্ভাবী সংঘাত বা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এবং এই দ্বন্দ্ব আমাদের এখানে বহু দিন থেকে ঘটেছে। যখন বৌদ্ধধর্ম আসলো তখন এই অঞ্চলের লোকজ ধর্মের সাথে একটা সংঘর্ষ হয়েছে এবং এই বৌদ্ধধর্মকে আত্মীকরণ করতে যেয়ে যে কবিতার জন্য হয়েছে আমরা তাকে বলি চর্যাপদ। একইভাবে যখন মুসলমানরা এল তখন বাইরের বিশ্বাসটাকে আত্মীকরণ করতে যেয়ে তৈরি হলো সুফিবাদ, বাউলগান, বিভিন্ন লোকগান, পদাবলী সাহিত্য। পরবর্তীকালে ইংরেজরা যখন এল, তখনো বিরাজমান শিল্প সংস্কৃতির সাথে একটা সংঘর্ষ হলো, সেখান থেকেই শুরু হলো আধুনিক সাহিত্যের যাত্রা। এবং এর যথার্থ শুরুটা হয়েছে মাইকেল থেকে। আসলে সমস্তটাই হচ্ছে একটা আত্মীকরণের প্রক্রিয়া। এর থেকে সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক বেরিয়ে এসেছে; যেমন: উপন্যাস, ছোটগল্প ইত্যাদি। এক অর্থে এটা একটা ধারাবাহিক সংগ্রামের ব্যাপার; এখনো আমরা যখন তিরিশের কবিদের নিয়ে কথা বলছি তখন সেটা সংগ্রামের অংশীদার হিসাবেই বলছি। তবে হ্যাঁ, আধুনিকতা গড়ে ওঠে সমস্ত জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আশ্রয় করে। এবং যে আধুনিকতাটা সেভাবে গড়ে ওঠে না- সে আধুনিকতা শেষ পর্যন্ত খোলসে রূপান্তরিত হতে বাধ্য। এবং অনেক ক্ষেত্রে তাইই হয়েছে। তুমি এখানে বসে কাফকার বিষয় আসয় নিয়ে, কাফকার ফর্মে লিখতে পার বটে, কিন্তু বিশ্ববিচারে তার কোনো মূল্য নেই। তিরিশের দশকের কবিদের এইখানে একটা ভ্রান্তি ছিল। তাঁরা আধুনিকতার কিছু লক্ষণকে আধুনিকতা মনে করেছিলেন এবং সেটা সম্ভবও ছিল না। কারণ আমাদের পরিবেশে বসে ইউরোপীয় আধুনিকতা সম্ভব নয়। সামান্য কিছু উদাহরণ বাদে তাঁদের বেশিরভাগের মধ্যেই একটা বর্জনের প্রবণতা ছিল, অতীতকে অস্বীকার করার প্রবণতা ছিল। কিন্তু এগুলো তো আধুনিকতার লক্ষণ নয়। আধুনিকতা মানেই হলো সব কিছু নিয়ে বেরিয়ে আসা। তারপরেও তিরিশের কবিদের কিছু কিছু অবদান তো অনস্বীকার্য। বাংলা কবিতার ইতিহাস তাঁদেরকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। কমসে কম তিরিশ আমাদেরকে কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিকে ছড়িয়ে পড়বার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। জীবনানন্দ দাশের যে গণ্ডি ছিল সেটা কোনো মহৎ কবির গণ্ডি নয়; কিন্তু তিনি সেখান থেকেই তাঁর যথাসম্ভব বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। বাংলা কবিতা তাঁর কাছে অশেষ ঋণগ্রস্ত। বিষ্ণুদের প্রথম দিককার লেখা যাই হোক; তাঁর ‘সাতভাই চম্পা’, ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ ‘সন্দ্বীপের চর’ এসব লেখার মধ্যে দিয়ে জনজীবনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বার আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়েছে। আমি সুধীন দত্তের অনেক কবিতা পছন্দ করি; কিন্তু তাঁর যে মূল জীবন দর্শন তার সাথে একাত্ম হতে পারি না। বুদ্ধদেব বসু আমাকে কখনোই টানে নি । কাজেই তুমি তোমার ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে, তোমার মাটিকে বাদ দিয়ে, তোমার বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে, আধুনিক হবার চেষ্টা অবান্তর।

 

আরেকটি প্রসঙ্গে আপনার মনোযোগ প্রার্থনা করছি। আমাদের সমাজের বিকাশটা একটা অসম বিকাশ। একই সাথে এই সমাজের মধ্যে তিনটি সময়ই বর্তমান; আধুনিকযুগ, মধ্যযুগ, প্রাচীনযুগ। আমি এমন একটি গ্রামে গিয়েছিলাম, যে গ্রামের ১৫ কি.মি. এর মধ্যে কোনো স্কুল বা বাজার নেই। সেখানকার উৎপাদন ব্যবস্থাও সেই সরল পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা। সে গ্রামের মানুষ শুধু লবণ, কেরোসিন তেল- আরও সামান্য কয়েকটি উপকরণ বাদে আর সব নিজেদের তৈরি জিনিসই ভোগ করে। তো সেখানে আশি বছরের এক বৃদ্ধার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল; কিছুদিন আগে তার হিপ বোন ফ্রাকচার (Hip bone fracture) হয়েছে; গ্রাম্য চিকিৎসা নিয়ে সে চলনশক্তিরহিত হয়ে পড়ে আছে। তার সারা জীবনের স্বপ্ন হচ্ছে আহাসপাতাল’ (হাসপাতল) দেখা; এবং সে এই ৮০ বছরের জীবনে কখনো শহর দেখে নি। পক্ষান্তরে, তারই পাশে আমরা এমন আরেকটি শহুরে সময়ের জন্ম দিয়েছি, যেখানকার মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ সীমাহীন। এই অসম সমাজের মানুষগুলোর শিল্পরুচির বিবর্তন যে একই গতিতে গড়ে উঠবে না- সে তো খুবই স্বাভাবিক। আমি হয়তো জীবনানন্দীয় বিষয় আসয় দ্বারা মুগ্ধাতিযুদ্ধ হয়ে যাচ্ছি; কিন্তু এমন মানুষও আছে; এবং নিশ্চিতভাবেই তাদের সংখ্যা বেশি; যাদের ভাবের তৃষ্ণায় জসীমউদ্দিন এখনো রসদ জুগিয়ে যাচ্ছে; বিজয় সরকার এখনও তাদের রাত্রিকে ঘুমহারা করে রাখছে; শহুরে মধ্যবিত্তকে নজরুল আবেগে তাপে ঘর ছাড়া করে ফেলছে বা ঠিক এমনিভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক- সার্বিক প্রেক্ষিত বিচারে শিল্পের আরো নানা অনুষঙ্গ; যেগুলোকে আমরা শহুরে রুচি জ্ঞানে পরিত্যাজ্য বলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে- আধুনিক হবার তৃপ্তিতে ঢেকুর তুলছি। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন দাবি করি।

আসলে এসব ব্যাপারগুলো পুনর্মূল্যায়িত হবার প্রয়োজন আছে। এবং সে প্রয়োজন দিন দিন অনুভূত হচ্ছে। তুমি বলছ জসীম উদ্দিন বা নজরুল অবমূল্যায়িত হচ্ছে; বিশ ত্রিশ বছর পরে এরকম আর থাকবে না; দেখা যাবে যে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমি মনে করি আধুনিকতার পুনর্বিন্যাস হতে বাধ্য এবং তাতে দেখা যাবে যে এত দিনকার প্রচলিত ধ্যান ধারণা অনেক পাল্টে যাবে এবং পৃথিবীতে অনেক নতুন লেখক আবিষ্কৃত হবে। ইউরোপ আমাদের শিখিয়েছে যে হোমারের চেয়ে কোনো বড় কবি নেই; কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে যে, ইস্টোনিয়ায় হোমারের চেয়ে নাকি একজন বড় কবি আছেন। আবার দেখ, আমরা এতদিন ধরে জেনে এসেছি যে নাটকের শুরু হয়েছিল গ্রিস থেকে; কিন্তু এখন দিন দিন প্রকাশিত হচ্ছে যে গ্রিস নাটকের ধারণা পেয়েছিল আফ্রিকা থেকে। এবং আফ্রিকা মোটেই কোনো অন্ধকার মহাদেশ ছিল না। শোন, তোমাকে একটা মজার ঘটনা বলি, আইওয়াতে আমেরিকান একজন লেখিকা একবার আমাকে বলল, রফিক তোমার দেশে তো খুব জেনুইন একজন গায়ক আছে; ‘উডিন’। ভদ্রমহিলা বাংলা গানের খুব ভক্ত। আমি আমার দেশের গায়ক উডিনকে কোনোভাবেই চিনতে পারছিলাম না এবং ভিতরে ভিতরে খুব লজ্জিতও হয়ে উঠছিলাম। রাত্রে আমাকে সে নিমন্ত্রণ করল; তাঁর বাসায় যেয়ে দেখলাম- আব্বাস উদ্দিনের প্রায় সবগুলো ক্যাসেটই তার সংগ্রহে। আসলে লোকজীবন ছাড়া কোনো আধুনিকতার নির্মাণ সম্ভব নয়। এবং এই শতাব্দীতে আমাদের আরো অনেক নতুন নতুন আবিষ্কারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সেখানে জসীম উদ্দিন আমাদের একটা স্তম্ভ হবে।

 

প্রসঙ্গ : উত্তরাধুনিকতা

উত্তরাধুনিকতা প্রসঙ্গে আপনার ভাবনা কী?

এসব ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। উত্তরাধুনিকতা একটা সমালোচনার ব্যাপার; এটা সাহিত্যের সমালোচনার তত্ত্ব। আমি কখনোই মনে করি না যে সৃষ্টিশীলতা সমালোচনার অনুগামী হবে; বরং সমালোচনা সৃষ্টিশীলতার অনুগামী হতে বাধ্য। কিন্তু ইদানীংকালে একটা ব্যাপার ঘটে গেছে; দেখা যাচ্ছে যে, সৃষ্টিশীলতা অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনা তত্ত্বের অনুগামী হচ্ছে। উত্তরাধুনিকতা মূলত ফরাসি এবং আমেরিকানদের ব্যাপার। ষাটের দশকে লাতিন আমেরিকান সাহিত্য যখন আমেরিকার বাজারগুলোতে আসতে শুরু করল, তখন আমেরিকানরা যাঁরা এতদিন ইংরেজদের আধুনিকতাকে জানত, তারা একটু বিস্মিত হয়ে গেল। এবং আমেরিকার একটা বৈশিষ্ট্য নতুন কোনো একটা কিছু বাজারে চালাতে পারলে পয়সাও জোটে, খ্যাতিও জোটে, আবার ভার্সিটির চাকরিরও উন্নতি হয়। সুতরাং তাঁরা তখন ওটাকে উত্তরাধুনিকতা নাম দিয়ে চালাতে চাইল। আর একটা জিনিস আমার মনে হয়েছে যে, ফরাসিদের উপর যখন আফ্রিকান সাহিত্যের প্রভাব পড়তে শুরু করল এবং তখন তাঁরা দেখল যে এই সাহিত্যকে বা প্রভাবকে তাঁরা অস্বীকারও করতে পারছে না আবার তাঁদের আধুনিকতার সংজ্ঞায় মেলাতেও পারছে না- এইজন্য তখন তাঁরা উত্তরাধুনিক, উত্তরাধুনিক বলে ধোঁয়া তুলতে শুরু করল। আমাদের তো এই সমস্যা নেই। আমাদের তো উত্তরাধুনিক, উত্তরাধুনিক বলে মাথা ঘামাবার কোনো কারণ দেখি না। আমি মনে করি এটা আধুনিকতারই সম্প্রসারিত রূপ।

 

অনেকেই তো বলছে আধুনিকতার কোনো রাজনৈতিক কনটেকস্‌ট নেই।

কে বলেছে আধুনিকতার কোনো রাজনৈতিক কনটেকস্‌ট নেই। তাহলে তুমি পাবলো নেরুদাকে কোন কালের কবি বলবে? লোরকাকে কোন কালের কবি বলবে? এলুয়ার, আরাগ বা মায়াকভস্কিকে? দ্বিতীয়ত, কবিতার রাজনৈতিক কনটেক্‌সট বলতে কী বোঝাতে চাইছ? হোমার, ভার্জিল, ওভিদ, কাতাল্লুস- এদের ভিতরে কার কবিতায় রাজনৈতিক কনটেকসটের ঘাটতি পড়েছিল? আমার তো মাঝেমধ্যে ইয়েটসকে রাজনীতি-তাড়িত কবি মনে হয়। বড় নদীতে বড় স্রোতই এসে মেশে। সুতরাং ওটা ব্যাপার নয়। ওরা যে আধুনিকতার সংজ্ঞা নির্মাণ করেছিল; সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে কষ্ট হচ্ছিল- তাই উত্তরাধুনিক নাম দিয়েছে। এটা পশ্চিমের সমস্যা; আমাদের নয়। আমাদের আধুনিকতার পুনর্বিন্যাস হওয়া প্রয়োজন।

 

কবিতায় সম্পূর্ণতা; কবিতার আত্মা

কোনো একটি কবিতায় সম্পূর্ণতার স্বাদ সঞ্চারিত করতে গেলে একটা সফল দেহাবয়বের পাশাপাশি যোগ্য কাব্যআত্মা নির্মাণ করাটাও আবশ্যক। এবং এই আত্মা নির্মাণ করার জন্য কবিকে এক সুগভীর অন্তঃক্ষরণের মধ্যে দিয়ে একটা পথ নিৰ্মাণ করতে করতে- কোনো একটা বোধিতে পৌঁছতে হয়। আমরা যে সকল মহৎ কবিকে পাঠের পরে সারা জীবন তাঁর থেকে আর বেরুতে পারি নে, সে সব ক্ষেত্রে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবিতাগুলোর আত্মার শক্তি ভেতরে ভেতরে সঞ্চারিত হয়ে কোনো এক গোপনে মুক্ত করে তুলছে। যেমন- পদাবলী সাহিত্যের পদকর্তাদের আত্মা ‘প্রেম’, বাউলদের ‘বিশ্বাস’ ইত্যাদি। এই বোধটাকে আপনার সাথে বিনিময় ঘটাতে চাই।

কথাটা খুবই সত্যি। আমাদের বাউল সাধকদের উপমা বা রবীন্দ্রনাথের উপমা দেখ; সেগুলো তিনটি স্তরে কাজ করছে। একটা হচ্ছে প্রত্যক্ষতার স্তর, মননের স্তর এবং আরো গভীরে যেয়ে সত্যের স্তর। যেমন- ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’- এটা কিন্তু আর প্রত্যক্ষতার স্তরে থাকছে না; একটা সত্যে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে একসময় চিত্রকল্পবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল; তাঁরা চিত্রকল্পকে একটা প্রত্যক্ষতার স্তরে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ এটা খুব ভালো করে বুঝেছিলেন যে, চিত্রকল্পটাকেও শেষ পর্যন্ত কোনো একটা সত্যে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। বাউলরা যেমন বিশ্বাস নিয়ে গিয়েছিলেন; জীবনানন্দ দাশ চেয়েছিলেন। ইতিহাস বোধ আর মনন দিয়ে যেতে। কিন্তু ইদানীংকালে দেখা যাচ্ছে যে কবিরা প্রত্যক্ষতার স্তরেই থেকে যাচ্ছেন বা তাঁরা মনে করছেন যে চিত্রকল্পটা একটা ক্ষণিক অনুভূতি তৈরির খেলা। আসলে তা নয়; বড় কবিদের ক্ষেত্রে চিত্রকল্পটা একটা সত্যের স্তরে গিয়ে পৌঁছায়, যেটাকে তুমি আত্মা বলছ।

 

‘খোলা কবিতা’ প্রসঙ্গ

আপনার সবচেয়ে অধিক পঠিত কবিতা হচ্ছে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে লিখিত ‘খোলা কবিতা’। ‘খোলা কবিতা’ য় এসে ‘কীর্তিনাশা’র মোহাম্মদ রফিককে বেশ কিছুটা দায়গ্রস্ত মনে হয়; কেন?

শোন, কবিকে মাঝে মাঝে সামাজিক দায়ও বহন করতে হয়। খোলা কবিতায় দেখবে আর সব বিষয় ছাড়াও মধ্যবিত্তের অবক্ষয়টা এসেছে। যার যা করার নয়- সে তাই করছে এবং প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে; এই মূল্যবোধহীনতার ব্যাপারটা এসেছে। যাহোক, তোমার জানতে চাওয়া, কবিতাটি কেন লিখেছি? কবিতাটি লেখার পরে আমাকে সামরিক ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তো তারা আমাকে প্রশ্ন করেছিল কবিতাটি কখন লিখেছি? আমি বলেছিলাম, কখন লিখেছি তার তারিখ দেয়া আছে। কিন্তু কোনো লেখাই যখন তারিখ দেয়া হয়ে থাকে ঠিক তখন লেখা হয় না; লেখাটা শুরু হয় তার আগে থেকে কিন্তু তারপরে একসময় বেরিয়ে আসে। যখন আমি ১৯৫৮ সালে মেট্রিক পাস করেছি বা যখন কেবল কথা বলতে শুরু করেছি তখন আমি দেখি যে আমার মাথার উপর পাকিস্তানি আইয়ুবি বুট। আমি সমস্ত ষাটের দশক ঘরে থাকতে পারি নি; আমাকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে দিনের পর দিন; আমার কোনো ছাত্রজীবন থাকে নি; আমাকে জেলে যেতে হয়েছে; জেলে যেয়ে এমন একটা জায়গায় আমাকে মলত্যাগ করতে হয়েছে যেখানে ছয়শো লোক প্রতিদিন সকালবেলা মলত্যাগ করে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোটা হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়; এমন একটা বিছানায় আমাকে ঘুমুতে হয়েছে যার নিচে ঠাণ্ডা মেঝে, উপরে একখানা ছেঁড়াকম্বল এবং মাথার নিচে শক্ত ইট- কারণ সামরিক বুট। দেশ স্বাধীন হলো; ভাবলাম এখন বুঝি নিজের মতো করে বাঁচা যাবে। ৭৫ সালে আবার সেই সামরিক বুট। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম; বলুন তো, বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে এদেশে কতবার সামরিক আইন জারি হয়েছে? আজকে এই সমস্ত বিষয়টা যদি আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে কী বলবেন? আমি মনে করি ‘খোলা কবিতাটি আমার বয়েসী লোকের এই অভিজ্ঞতারই বিষয়। যারা ষাটের দশকে বসবাস করে নি- তারা বুঝবে না। আমি নিজের সামনে; স্বাধীনতার পরে; ময়মনসিংহ স্টেশনে বাবাকে ১৩০ টাকায় মেয়ে বিক্রি করতে দেখেছি। আমাকে তো এসকল অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।

 

কিন্তু এ ধরনের কবিতার ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হয় যে, দুঃসময় পার হয়ে গেলে কবিতাটি ক্ষীণপ্রভ হয়ে যায়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কবিতাটি সর্বকালীন আবেদন তৈরিতে কিছুটা অক্ষম হয়ে পড়ে। যেমন- মায়োকভস্কির ‘লেনিন’ কবিতাটি; একটা অসাধারণ আবেগ জাগানিয়া কবিতা। কিন্তু …

শোন, পৃথিবী থেকে প্রতিবাদ, নির্যাতন, নিপীড়ন, ক্ষোভ, সোচ্চার হওয়া, এগুলো কোনোদিন যাবে না। এটা মানব জন্মেরই একটা নিয়তি-নির্দিষ্ট কাহিনী। তুমি কি মনে করো যে, মায়োকভস্কির কবিতা এ যুগের লোক পড়বে না? যতদিন এই অবস্থা থাকবে ততদিনই পড়বে। শেষ পর্যন্ত কোনো কবিতাই সবসময় জনপ্রিয় থাকে না। প্রায় চারশো বছর ইংল্যাণ্ডের লোকেরা ডানের কবিতা পড়ে নি; কিন্তু ডানের কবিতা আবারো ফিরে এসেছে। সুতরাং সব লেখা সব লোকেরা সবসময় পড়বে- এটা আশা করারও কারণ নেই।

 

বাংলা কবিতা দুর্বোধ্যতার অন্তরালে

বাংলা কবিতা সম্পর্কে অনেকেই দুর্বোধ্যতার অভিযোগটি তোলেন। এবং অনেকেই অভিযোগ করেন, আগে কবিতা তাদেরকে যে জায়গাতে নিয়ে যেতে পারত, এখনকার কবিতা সে জায়গায় নিয়ে যেতে অক্ষম। এই অভিযোগের যথার্থতা/অযথার্থতা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই।

অবশ্যই নিয়ে যেতে অক্ষম। একসময় আমাদের দেশের কবিরা মনে করেছেন, আমি যে দুর্বোধ্য- কারণ আমার অনুভবের জগতই দুর্বোধ্য; তাঁরা মনে করেছেন- আমি যে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি- এটার কারণ হচ্ছে আমার মনন, আমার সমৃদ্ধি, আমার বিকাশ। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তা নয়; এগুলো আসলে কাব্যিক অক্ষমতা। আমি আসল জায়গাটি চিনি নি বলে মানুষ থেকে যে আমি আলাদা হয়ে গেছি, এই জিনিসটা আমরা স্বীকার করতে চাই নি; মানুষের এই আসল জায়গাগুলো আমরা ধরতে পারি নি। আমাদের কবিতায় এই জায়গাগুলো ধরতে হবে। তা না হলে, কবিতার অনুপ্রেরণা, কবিতার কল্পনা, এগুলো আস্তে আস্তে মরে যাবে; এবং তার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। বাংলা কবিতায় তুমি কি আজকে বলতে পারবে যে কোথায়ও কোনো কল্পনার স্ফুরণ আছে। কল্পনার স্ফুরণ, আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ ছাড়া কবিতা হয় না। অন্যান্য বিষয়গুলো পরে। আমরা অন্যান্য ছোট বিষয়গুলোকে বড় করছি আর বড় বিষয়গুলিকে আমলই দিচ্ছি না। যার ফলে আসল যোগের সূত্রটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ….. একটা কবিতা নিয়ম মাফিক উত্তরে গেল কি না সেটা তার বিচারের মানলও নয়, মানদণ্ড এই যে, কবিতাটি মানুষের ভালোবাসাকে সংক্রমিত করল কি না।

 

কিন্তু একজন পাঠকের পাঠরুচির বিবর্তনের অভাবও অনেক আপাত দুর্বোধ্য কিন্তু শক্তিমান কবিকে সেই সময়ে অপাঠ্য করে রাখতে পারে।

হ্যাঁ হতে পারে। এবং এমন হয়ও, যে একজন লেখকের একটা লেখা ঠিক ঐ মুহূর্তে হয়তো সংক্রমিত করছে না বা সহজ যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু দুর্বোধ্যতাকে আদর্শ ভাবা বা আদর্শ ভেবে নিয়ে কাজ করার কোনো জায়গা নেই। আমার ব্যর্থতা হয়তো এটা হতে পারে যে আমি ভালোবাসার কথা ঠিক মতো বলতে পারি নি; বা ঠিক মতো ভালোবাসতে পারি নি। আমার ব্যর্থতা হয়তো এটা হতে পারে যে আমি সমন্বিত জীবনকে ধারণ করতে পারি নি। সেগুলোকে দুর্বোধ্যতা বা নন্দনতত্ত্বের নাম দিয়ে চালিয়ে দেবার কোনো জায়গা নেই।

 

কোথায় যেন পড়েছিলাম শব্দের দুটোই মাত্র দায় জানিয়ে দেয়া অথবা জাগিয়ে তোলা; কবিতাকে জাগিয়ে তোলার দায়ই বোধকরি সবচেয়ে বেশি বহন করতে হয় । কিন্তু ভালেরি বলেছিলেন- ‘লেখার সময় যদি তিনটা শব্দ তোমার সামনে আসে তবে সবচেয়ে দূরবর্তী শব্দটি তুমি ব্যবহার করবে; কবিতার মিস্ট্রির  প্রশ্নে সেটা গুরুত্বপূর্ণ।’ কবিতায় এ ধরনের আরোপিত রহস্যের মূল্য কোথায়?

কিছু ইংরেজ কবি বা অন্যান্য কিছু কবির কথা অনুসারে, আমাদের কবিদের মধ্যে এমন একটা ভাব, যেন কবি শব্দের দোকানদার। সে বসেই আছে শব্দ মাপার জন্য; কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা ওজনে ভারি। কিন্তু, আসলে তো তা নয়। শব্দকে উঠে আসতে হবে, যেভাবে আমাদের বাউলগান বা অন্যান্য গানে শব্দ উঠে এসেছে ঠিক তেমনিভাবে। দেখ, এসব গানে শব্দ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে এসেছে, কোনো বাঁধাতেই ঠেকিয়ে রাখা যায় নি। শব্দ তো এভাবেই উঠে আসবে; শব্দ তো মেপে কবিতায় ব্যবহার করা যাবে না। শব্দ তো শব্দের নিয়মে উঠে আসবে; শব্দ জীবনের অংশ হিসাবে উঠে আসবে তা না হলে শব্দই শব্দের থেকে হারিয়ে যাবে। শুধু তার অন্যান্য বিষয়গুলোই থাকবে। এবং আমাদের দুর্বোধ্য কবিতা যদি তোমাদের উজ্জীবিত না করে, তাহলে ধরে নিতে হবে আমরা সেটা পারি নি। আমরা কিছু ভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন ছিলাম; শুধু ভ্রাপ্তি আর অক্ষমতা মিলিয়ে আমরা সেটা করতে পারি নি।

 

শেষ প্রশ্ন

যে জীবন এখন আপনি যাপন করছেন; সেটা খুবই নিঃসঙ্গ, প্রিয়জনের প্রাত্যহিক সঙ্গ বর্জিত, জীবনের সকল স্বাভাবিক কাম্য অনুষঙ্গ বর্জিত; এটা কি এক ধরনের আউটসাইডারিজম নয়?

আমি জীবন থেকে বাইরে ঠিক তা নয়; হয়তো জীবনের ঐ ডামাডোল এখানে নেই; কিন্তু অন্যলোকের অনেক সমস্যার সাথে আমি জড়িয়ে আছি; প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছি; তাদের বেদনার ভার বইছি। আমার অস্তিত্বটা অনেকের জন্য সমস্যাও বটে। সব মিলিয়ে আমি যে জীবন থেকে দূরে আছি তাও নয়। আসলেই কি জীবন থেকে দূরে থাকা যায়? যায় না, ‘জীবন করে না ক্ষমা’। জীবন কীভাবে যেন টেনে সবাইকে তার ভিতরে নিয়ে নেয়। এবং আমি বেড়িয়ে আসতেও চাই না। এমন করে হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে একসময় নিস্তব্ধ হয়ে যাব, এটাই আমার চাওয়া।

 

বৃষ্টি অনেক আগেই থেমে গেছে। মেঘের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই রাত্রির অন্ধকারে আকাশ সমাচ্ছন্ন। আমরা তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ধীরে ধীরে রাত্রির অন্ধকার পথে পা বাড়ালাম। আমাদের কোনো তাড়া নেই; কারণ শেষ ট্রেন অনেক আগেই ছেড়ে গেছে। দু’একটি বিষণ্ন তারা অপক্ক মেঘের দেহ গলিয়ে কৌতূহলি চোখ মেলে দেখে নিচ্ছে এই সামান্য পৃথিবীর অসহায় মানুষগুলো এক অন্ধকার থেকে আর এক অন্ধকারে পা বাড়ায় কেমন নির্বাক বিস্ময়ে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top