একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা (১৮ম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদ: বাসুদেব দাস

(৪৪)

অপে মাসির কণ্ঠস্বর ছিল সবচেয়ে সুন্দর। একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠস্বর হওয়ায় কণ্ঠস্বরে গাম্ভীর্য ছিল।

এই পৃথিবীতে কেবলমাত্র অপে মাসিই ছিলেন, যে রাহুলকে ‘তুমি’ বলে ডাকত।’ তুমি’ শব্দটার মধ্যে এক ধরনের সৌন্দর্য অনুভব করেছিল রাহুল।

এই ‘তুমি’ শব্দটা রাহুল  অন্য কারও মুখে শুনেনি। বজালী নামের এই বৃহৎ এবং শিক্ষায় অগ্রসর অঞ্চলটিতে একে অপরের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহুল শুনেছিল ‘তুই’ এবং ‘আপনি’ শব্দ দুটি।

মালা পিসি ,রাধা মামাদের বাড়ি ধরে যত অতিথি ছিল প্রত্যেকেই রাহুলকে ‘ তুই’ বলেই ডাকত।স্কুলের শিক্ষকরা চৌকিদাররাও ছাত্রদের ‘তুই’ বলেই ডাকত। ওদের নিজের ভাই বোনদের মধ্যে ও সঙ্গী সাথীদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল ‘তুই’ শব্দের। চাকর বাকর, হাজিরা করা মানু্‌ষ, চো্‌র, ভিখাারি এসবের ক্ষেত্রে ব্যবহার হত কেবল  ‘তুই’ শব্দ।

এত ‘তুই’ এবং ‘আপনি’র মধ্যে ‘তুমি’ শব্দটি যেন কোথাও চাপা খেয়ে থাকা একটি সবুজ ঝর্ণা ছিল। অনেকেই ভাবার মতো ‘তুই’ শব্দটিতে একটা আপন ভাব নি্হিত হয়ে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই শব্দটি ব্যবহার হত তুচ্ছ্বার্থে। তার পরিবর্তে ‘তুমি’ শব্দটি ছিল কত মিষ্টি।।ভকুয়াটেপার মতো এত ভিতরের বালুময় জায়গায় অপে মাসি কোথা থেকে শিখেছিল সেই মিষ্টি শব্দটি? অপেমাসির ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠস্বরে গলে যাওয়া একটি কোমল শব্দের স্পর্শে রাহুল ও যেন ভেতর থেকে বলতে শুরু করেছিল।

৪৫

আর একদিন মাধ্যমিকে স্কুল লিভিং পরীক্ষায় বসল রাহুল। ওদের স্কুলটি পরীক্ষার সেন্টার হওয়ার জন্য ব্জালী অঞ্চলের অন্যান্য স্কুলের ছাত্রদেরকেও পাঠশালা মধ্য বিদ্যালয়ে এসে পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। তাই পরীক্ষাগৃহে রাহুলদের অন্য কিছু অপরিচিত ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে পরীক্ষার উত্তর লিখতে হয়েছিল।পরীক্ষা হলের গার্ডরা ছিল অন্য স্কুলের শিক্ষক। রাহুলদের পরিচিত ছিল না।

ভূগোলের পরীক্ষায় সেরকম একজন অপরিচিত স্কুলে শিক্ষক একটি তার দিয়ে ভারতবর্ষের ম্যাপটি তৈরি করে এনে তার নিজের স্কুলের পরীক্ষার্থীদের আঁকতে দিয়েছিল। ম্যাপটি খাতার পাতার নিচে রেখে কাগজটা পিষে দিলেই হল। ম্যাপটা কাগজের উপরে চিহ্নিত হয়ে পড়বে। তারপরে পেন্সিল দিয়ে উপরে রেখে দিলেই হয়ে গেল একটি সুন্দর ভারতবর্ষ।

মাস্টারটি  সেভাবে ম্যাপটা রাহুলকেও আঁকতে দিয়েছিল। কিন্তু রাহুল রাজি হল না। রাহুল সেটা এক ভীষণ পাপ কাজ হবে বলে ভেবেছিল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল দাদু গজেন্দ্রনাথ এবং শালগ্রাম শিলা।

রাহুল ভারতবর্ষটি ভালোভাবে আঁকতে পারছিল না। অসম ঠিক অসমে বা কেরালা ঠিক কেরালায় বা গুজরাট ঠিক গুজরাটে ছিল না তার ভারতবর্ষে। সে যাই হোক না কেন, সেই শিক্ষকটি রাহুলকে বলেছিল অন্যদের কিন্তু এ কথা বলে দিও না। রাহুল মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল।

একদিন পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল এবং সুরভিকে ধরে প্রায় প্রতিটি ছাত্রই পাশ করল। এখন তাদের হাই স্কুলে এডমিশন নিতে হবে। চতুর্থ শ্রেণীতে হাইস্কুলে এডমিশন নেওয়ার জন্য বয়স থাকা লিভিং পরীক্ষা পাস করার প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। পিতা স্কুলের হেডমাস্টারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে বললেন।

হেডমাস্টারের রুমে প্রবেশ করে রাহুল দেখল তার সঙ্গের ছাত্রদের একজনও নেই। ছাত্রদের পিতারা এসেছেন। হেডমাস্টার ছাত্রের পিতাদের জিজ্ঞেস করে বয়স কত লিখব।

কোনো বাপ বলে নয় বছর আবার কেউ বলে দশ বছর। সেই অনুসারে হেডমাস্টার বয়সের খালি জায়গায় বয়স লিপিবদ্ধ করে সই মেরে দিচ্ছেন। এভাবে তার সঙ্গীরা নয় বছরের দশ বছরের হয়ে গেল।

রাহুল হেডমাস্টারকে বলল, স্যার আমারও সার্টিফিকেট চাই। হেডমাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাম বল।’

সে বলল, ‘রাহুল।’

‘বয়স বল।‘ হেডমাস্টার বললেন।

রাহুল বলল,’এগারো।’

হেডমাস্টার তার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বোলালেন। হেডমাস্টার তার বয়স এগারো বলে বিশ্বাস করলেন কিনা রাহুল জানেনা। কিন্তু হেডমাস্টার বয়সের খালি জায়গাটুকুতে এগাড় বলেই লিখে দিলেন।

রাহুল আনন্দে নেচে উঠল বাহ! সে তার সঙ্গের ছাত্রদের ঠেকে আজ বড়ো হয়ে গেল।

রাহুল ভেবেছিল তার শৈশবই তার শত্রু। ছোটো হয়ে থাকার জন্য সে অনেক কিছু হারিয়েছে। হাই স্কুল কলেজে পড়া বড়ো বড়ো ছেলে-মেয়েদের দেখলে তার ঈর্ষা হয় ওরা যে কত ভাগ্যবান।

সে তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে উঠতে চায়। সে কবে বড়ো হবে? কবে বিদায় দিতে পারবে তার শৈশবকে চিহ্নিত করে থাকা হাফপেন্টগুলিকে?কখন লং প্যান্ট পরে কিলিং কিলিং বেল বাজিয়ে সে চালিয়ে যেতে পারবে সাইকেল?

সে জানেনা অপে মাসির সঙ্গে কী কথা বলার আছে! তার এরকম মনে হয় যেন অপে মাসিকে বলার তার অজস্র কথা আছে। কিন্তু সেই ছোটো হয়ে থাকার জন্যই যেন অপে মাসি তার কথাগুলি শুনতে চায় না। সে ভাবে— অপে মাসির সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলার জন্য যেন একটা লম্বা প্যান্ট এবং এটা পড়ার অভিযুক্ত হতে হবে।

চতুর্থ শ্রেণিতে বাবা বরুণ যে রাহুলকে কখনও লংপেন্ট দেবে একথা রাহুল নিশ্চিতভাবে জানে। এভাবেই রাহুলের মনে ধীরে ধীরে পোষণ হতে শুরু করে প্রিতার প্রতি ছোটো ছোটো ক্ষোভ, অভিমান।বাবা যেন তাকে  তাকে বড়ো হতে দেয় না। পিতা যেন তার প্রতিবন্ধী।যে শৈশবে প্রত্যেকেই  ভেসে যেতে চায়,সেই শৈশবকে  রাহুলের অভিশাপ বলে মনে হয়। এরকম এক হতাশার ছায়ায় রাহুল একা একা বড় হতে থাকে।

(৪৬)

ড্রেসিং রুমে থাকা অনুকুল ঠাকুরের আসনে একই পরিবারের তিনজন করে মস্ত প্রাণী বসে থাকা সত্বেও চোখের সামনে থেকে ইষ্টবৃত্তির পয়সা চুরি করে সিগারেট খাওয়া রাহুলের উপরে কাউকে কোনো ব্যবস্থা নিতে না দেখে রাহুল অধিক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল ।

বজালী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে নাম লাগিয়ে এসে পুনরায় একদিন সেই চকলেট রঙের বেগটা থেকে ১০ পয়সা বের করে নিল এবং একটি পানামা সিগারেট কিনে সেই পূর্বের জায়গাটুকুতে গেল, যেখানে সে প্রথম সিগারেট খেয়েছিল। নটরাজ থিয়েটারের গুদাম ঘরটার পেছনদিকে সেই বারান্দাটিতে সে বসল এবং সিগারেট জ্বালিয়ে টানতে লাগল।সেদিনও বারান্দায় নাম না জানা  দুই একটি গাছ বাতাসে হেলছিল দুলছিল।রাহুল ওদের সমর্থন চাইল।

কয়েক বছর পরে রাহুল যখন দশম শ্রেণিতে ইতিহাস পড়ছিল, হরিনারায়ণ গোস্বামী নামের শিক্ষকটি এভাবে উদাত্ত কণ্ঠস্বরে ইতিহাস পড়াচ্ছিলেন যেন তিনি পানিপথের যুদ্ধ দেখেছিলেন।। আকবর আওরঙ্গজেবের দিনে যেন তিনি মোগলের প্রজা ছিলেন আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়ানোর সময় তিনি কোনো মতে    গান্ধীর শিষ্য বলে পরিচয় না দিয়ে ছিলেন । ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা গান্ধী নেহেরু বিষয়ে পরীক্ষায় রাহুলকে লিখতে হয়েছিল কিন্তু সেই সংগ্রামে বজালীবাসীর ভূমিকা বিষয়ে কোনো প্রশ্ন না এলেও বজালীর বহু ঘটনা পরিঘটনা সে শিক্ষক এবং পরিবারের মানুষের মুখে শুনেছিল।

কী কারণে রাহুল ভেবেছিল যে সে যে জায়গায় বসে প্রথম সিগারেট খেয়ে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের নেত্রী চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী এবং তার দিদি রজনী প্রভা দাস  গৌরী লহকরের বাড়িতে আসার সময় ঠিক সেই জায়গাতেই প্রস্রাব করেছিল। রাহুল কেন এরকম ভেবেছিল তার কোনো কারণ সে নিজেও খুঁজে পায়নি।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বজালীতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী এবং তার দিদি অসমের প্রথম মহিলা ডাক্তার রজনীপ্রভা দাস প্রায়ই পাঠশালার গৌরী লহকরের বাড়িতে আসতেন।সেখানে তারা মাঝে মধ্যে ভাতও খেতেন। এই দুই বোন সাইকেল চালিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে ঘুরে বেড়াতেন।

সেই সময় মেয়েদের সাইকেল চালানো কথাটা মানুষ ভাবতেই পারত না।গৌরী লহকরের ছেলে ভ্রাম্যমান থিয়েটারের জনক অচ্যুত লহকর সেই সময় কিশোর ছিলেন। তিনি এমন কি চন্দ্রপ্রভা এবং রজনী প্রভাতকে ‘ও মেয়েরা সাইকেল চালাচ্ছে দেখ’বলে ক্ষ্যাপাতেন।

গজেন্দ্রনাথের বাড়িতেও নাকি চন্দ্রপ্রভা এসেছিলেন।রাহুল গজেন্দ্রনাথের মুখে এই কথা শুনে ছিল। এই গজেন্দ্রনাথের দাদা দীননাথ শর্মা সেই সময় কলকাতা থেকে আবাহন নামের বিখ্যাত পত্রিকা চালাতেন। চন্দ্রপ্রভা জানতেন এই  দীননাথেরই ভাই গজেন্দ্রনাথ।

১৯৪৩ সনের ২৬ জানুয়ারি পাঠশালা হরিমন্দিরের প্রাঙ্গণে দেশের মঙ্গলের জন্য একটি প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল।তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আয়োজন করা জনসভায় চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণ দিতে থাকা অবস্থায় পুলিশ তাকে বাধা প্রদান করে টেনে নিতে চাইছিলেন। অজস্র মহিলা পুলিশের সেই কার্য রোধ করার জন্য একটা অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে পেটিকোটের বাইরে চন্দ্রপ্রভার পরনের অন্য সমস্ত বস্ত্র খসে পড়েছিল।

পুলিশের এই ধরনের কান্ড গজেন্দ্রনাথ সহ্য করতে পারেননি । গান্ধীর প্রতি বিশ্বাসী হয়েও গজেন্দ্রনাথ ছিলেন উগ্রপন্থীর সমর্থনকারী এবং সহযোগী।গজেন্দ্রনাথ স্বাধীনতা সংগ্রামে অনশন করেছিলেন এবং রাতে রেললাইন খুলে রাখার জন্য এবং সেতুতে আগুন দিতেও গিয়েছিলেন।

স্বাধীন ভারত সরকার দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের পেনশন পাননি গজেন্দ্রনাথ। কারণ পুলিশের হাতে তিনি ধরা দেননি। পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি শান্ত-শিষ্টভাবে কারাবরণ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধের পেনশন পাওয়া ভারতীয়দের বেশিরভাগই সেই সময়ে ব্রিটিশের পুলিশের লাঠির বাড়ি খাওয়ার ভয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দেওয়া ভারতীয় ছিলেন। তাদের কাপুরুষতা ভবিষ্যতে ভাগ্যের দরজা খুলে দেবে বলে সেই সময় কেউ ভাবতে পারেনি। তাদের মধ্যে ছিল গজেন্দ্রনাথের মেজ জামাই ।

এমনকি বরুণও সেই সময়ের কথা বলেছিল। গান্ধী গুয়াহাটিতে এলে দেখতে যাবার কথা বলেছিল। তখন ব্রহ্মপুত্রের ওপরে সেতু ছিলনা। পাঠশালায় গান্ধীবাদী বলে পরিচিত রমণী শর্মা নেতৃত্ব দেওয়া একটি বাসে উঠে বরুণরা গান্ধীকে দেখতে গিয়েছিল। গান্ধীবাদী মানুষটি খড়ি, কড়াই, চাল-ডাল বাসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।আমিনগাঁওয়ের ঘাটে  দুপুরবেলা রান্না করা হয়েছিল। আর এক বাস পেটের ক্ষুধায় ক্ষুধার্ত মানুষ হলুদ মেখে  খেয়েছিল ভাতের শুভ্রতা…

সেই ভাতটুকুর জন্য বরুণ সব সময় রমণী শর্মার কাছে কৃতজ্ঞ ছিল। রমণী শর্মা বরুণদেরও শিক্ষক ছিলেন এবং রাহুলরাও তাকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিল যিনি গরমের দিনে চেয়ারে বসে বাঁশের পাখা দিয়ে হাওয়া করতে করতে সাহিত্য পড়াতেন এবং মাঝে মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ায় তার হাত থেকে পাখাটাও খসে পড়ত। রাহুল পাখা খসে পড়ার আগেই আস্তে করে মুখের ভেতরে ‘বাইরে যাই স্যার’ বলে শ্রেণি থেকে বেরিয়ে বাইরে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াত। এই বাইরে যাওয়ার অর্থ ছিল প্রস্রাব করতে যাওয়া।

সেই সময় বহুমূত্র রোগের কথা সেভাবে প্রচলিত ছিল না। কিন্তু সেই রোগের লক্ষণ অর্থাৎ বারবার প্রস্রাব করতে যাওয়া রাহুলদের মতো স্কুলের ছাত্রদের মধ্যেই বেশি ছিল। প্রতিটি ক্লাসে রাহুল একবার তো বাইরে যাবেই কখনও দুবারও যায়।

এভাবে বাইরে যাওয়া জনা তিনেক একত্রিত হয়ে কখনও কখনও স্কুল থেকে কিছুটা দূরে হাইওয়েতে বেড়াতে চলে যেত। হাইওয়ে দিয়ে আসা-যাওয়া করা বিভিন্ন প্রকৃতির গাড়ি এবং আরোহীদের দেখে দেখে ক্লাসের সেই বিরক্তিকর পাঠ গুলি থেকে বেশি তৃপ্তি পেত। কখনও রাহুলরা শ্রেণি আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই যে বেরিয়ে যায় সেই ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত তো আসেই না পরের ক্লাসটিও শেষের দিকে এসে উপস্থিত হয়। এই জন্য কখনও ওদের বিরুদ্ধে ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ যায়। মাথাটা নাড়াতে নাড়াতে ভাইস প্রিন্সিপাল নগেন বিএসসি জিজ্ঞেস করে—‘কোথায় ছিলে এতক্ষন?’

ওরা বলে—‘হাইওয়ের সেতুর দিকে।’

পুনরায় জিজ্ঞেস করা হয়— ‘কেন গিয়েছিলি?’

ওরা বলে—‘পায়খানা করতে।’

এই উত্তরে কেবল নগেন বিএসসি কী বলে সমগ্র বজালী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্বাক হতে বাধ্য। কারণ সেই বিদ্যালয়ে ছাত্রদের জন্য কোনো শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিল না। তাই কোনো ছাত্রের পায়খানা পেলে নিজেকেই ব্যবস্থা করতে হত। আর হাইওয়ের সেতুর নিচেই ছিল বজালী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় শৌচালয়।

(৪৭)

গান্ধীবাদী হওয়ার জন্য কোনো ছাত্রকে কোনোদিন মারধোর করেন নি। তিনি অহিংসা-নীতির সমর্থক না অন্ধসমর্থক কিসের জন্য জানা যায় না। তার মুখে কখনও হাসি ছিল না।ভয়ংকর দুষ্টু ছেলেদের কাণ্ডকারখানা কখনও তার মুখে হাসি ফোটাতে পারত না।

রমণী শর্মার দুটি ছেলে পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল।। কিন্তু একবার বাৎসরিক পরীক্ষায় বড়ো ছেলে পরীক্ষার গৃহে নকল করে জগদীশ চৌধুরী নামে ডেঞ্জারাস শিক্ষক মশাইয়ের হাতে ধরা পড়ে। মহিলাদের মতো কোমল মুখের এবং খুব আস্তে কথা বলা জগদীশ চৌধুরী ইংরেজি পড়াতেন কিন্তু তিনি বিখ্যাত ছিলেন পরীক্ষাগৃহে নকল ধরার ক্ষেত্রে । আর তার হাতে ধরা পড়লে কারও নিস্তার ছিল না ।

জগদীশ মাস্টার বহিষ্কার করার পরে রমণী শর্মার ছেলে বাড়ি ফিরে এল না। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরে কেউ একজন আবিষ্কার করেছিল তাদের বাগানের সুপরি গাছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আছে রমণী শর্মার বড়ো ছেলে। রাহুলরাও সেই দৃশ্য দেখতে গিয়েছিল, দেখেছিল সুপরি গাছে ঝুলে থাকা সেই মেধাবী ছেলেটি। তখনও চোখে চশমা পরা ছিল।

মানুষের মৃত্যুতে গান্ধীজি কাঁদতে মানা করেছিল কিনা জানিনা। রমনী শর্মা কাঁদেননি। বড়ো সহজভাবে তিনি মেনে নিয়েছিলেন ছেলেকে দেওয়া শাস্তি। কিন্তু তিনি প্রকাশ করেছিলেন যে ছেলে নাকি সুপুরি গাছে উঠতে জানেন না।তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন কীভাবে ছেলে সুপরি গাছে উঠেছিল।

আসলে মা-বাবার অজান্তে এবং অনুমান করতে না পারা অনেক কাজ ছেলেমেয়েরা করেছিল এই পৃথিবীতে। সন্তানরা কত শক্তিশালী বা কত দুর্বল, এ কথার আভাস পাওয়া সম্ভব ছিল না সেই সময়ে মা-বাবার।

মধুচন্দ্রিকা বলে যে একটা কথা আছে  সে কথা বরুণ ছাড়া বজালী অঞ্চলের আর কেউ জানত না।একদিন সুন্দর কাপড় চোপড় অর্থাৎ টেরিকটনের প্যান্ট এবং টেরিনের শার্ট পরে বরুণ এবং রাহুলের নতুন মা পাটের মেখেলা চাদর পরে রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়াল।বরুণ সকলের জ্ঞাতার্থে মা অমৃতপ্রভাকে লক্ষ্য করে ঘোষণা করল—‘মা  আমরা শিলং যাচ্ছি।’

রাহুলের নতুন মা পাটের কাপড়ের খসখসানির সঙ্গে অমৃতপ্রভার পা দুটি স্পর্শ করে নীরবে বরুণের পেছন পেছন বেরিয়ে গেল।আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকানে বসে থাকা গজেন্দ্রনাথকে বরুণ কিছুই বলে গেল না। ছেলে বৌমাকে এভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে গজেন্দ্রনাথ ভেতর দিকে এসে অমৃতপ্রভাকে জিজ্ঞেস করলেন—‘ওরা কোথায় গেল?’

অমৃতপ্রভা বললেন— ‘শিলঙে’

গজেন্দ্রনাথ কোনো উত্তর দিলেন না

কেউ কিছু বলল না। বলার মতো কিছু নেই, সহ্য করা ছাড়া।

রাহুল শুনেছে যে যাবার সময় আঁকাবাঁকা পাহাড়িয়া পথে সবাই নাকি বমি করে। তার মাথায় সেই চিন্তাটা ঘুরতে থাকল। মা ও বোধহয় বমি করবে। সে তাদের গোঁসাইঘরের সর্বশক্তিমান শালগ্রামশিলাকে সবার অজান্তে প্রার্থনা জানাল মায়ের যেন বমি না হয়।

(৪৮)

কিছুদদিন পরে একদিন মালিগাঁওয়ের রেলওয়ে কোয়ার্টারে থাকা নিরোদ এসে গজেন্দ্রনাথ,অমৃতপ্রভা এবং বরুণের সামনে ঘোষণা করল যে সে ভানুর সঙ্গে পরিবারটিকে নিয়ে যাবে। ওদেরকে গুয়াহাটিতে পড়াবে।নিরোদের একা কোয়ার্টারে থাকতে খুব অসুবিধা হচ্ছে ।  খুব সকালেই ডিউটিতে যেতে হয়, রান্না বান্না,ঘর ঝাড়ু দেওয়া, ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া নাইট ডিউটি আছে— মোটকথা নিরোদ  সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

গজেন্দ্রনাথ বলল—‘নিয়ে যেতে চাইছিস?’

অমৃতপ্রভা ও সায়  দিল—‘নিয়ে যেতে চাইছিস যদি নিয়ে যা। তোদের যেভাবে ভালো হয় সেটা আমাদের পক্ষে ভালো।

বরুণ কিছু বলল না।

ভালো পেয়েছে না খারাপ পেয়েছে কিছুই বুঝতে না পেরে নিরোদ জিজ্ঞেস করল –দাদা তুই কিছু বলছিস না  দেখছি।’

বরুণ বলল—‘ বাবা যদি নিয়ে যেতে বলেছে নিয়ে যা।’

দুই রাত  নিরোদ পাঠশালায় রইল। শান্ত শিষ্ট সবার প্রিয় নিরোদ এলে রাহুল নীপা  খুব খুশি হয়।নিরোদ শুকতারা এবং চাঁদ মামার গল্প বলে। ওদের সুন্দর কৌতুক বলে। প্রাত্যহিক তুচ্ছতা থেকে যেন রাহুলরা কিছুক্ষণের জন্য মুক্ত হয়। কোথাও উড়ে যাওয়ার জন্য যেন বাহুমূলে দুটো ডানা জন্মায়…।

যেদিন কাপড়-চোপড় সুন্দর করে পরে নিরোদ  ভানুর সঙ্গে অনুপদের সত্যিই যাবার জন্য প্রস্তুত হল, রাহুলদের মধ্যে কান্নার রোল উঠল।কোনোমতেই রাহুলরা যেন  মেনে নিতে পারছে না এই বিচ্ছেদ। ওদের ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া হৃদয়ের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে ভানু এবং নিরোদের বলিষ্ঠ বাহু ব্যাগ ,স্যুটকেসগুলি রিক্সায় উঠিয়ে দিল রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে।রাহুল যেন সেদিনই বুঝতে পারল ,বয়স্ক মানুষের হৃদয়ের চেয়ে ছোটো ছোটো হৃদয়গুলিকত আলাদা!রাহুলরা ছোটো ছোটো বুকের ভেতরে  প্রার্থনা করছিল ওদের ওদের শালগ্রাম শিলার কাছে  রেলগাড়ি যেন না আসে।

কিন্তু কয়লার কালো ধোঁয়া উড়িয়ে রেল এসেছিল রাহুলদের বুক থেকে অনুপদের কেড়ে নেবার জন্য।

রাহুলদের বাগানের  বাঁশের নিচের উইয়ের ঢিবির সাম্রাজ্যে নৈ্রাজ্য উপচে পড়ল। যেন সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা সেই বিছানাতে এখন দুজনের মাঝখানে একটা ফাঁক গড়ে উঠল।সেই ফাঁক যে চিরদিনের ফাঁক হয়ে যাবে সে কথা রাহুলরা জানত না।হাফ গেঞ্জি পরা ওদের শূন্য বাহুগুলি সেই ভাই বোনদের শূণ্য বাহুগুলি খুঁজে বেড়াচ্ছিল স্বপ্নে বাস্তবে।

(৪৯)

সেদিন শান্তি নার্স নার্স সকালে এসেছিল। তজো সাইকেল নিয়ে আনতে গিয়েছিল। রাহুলের নতুন মা ঘরের সেই বিশেষ খাটটাতে শুয়েছিল, যেখানে নীপা রাহুলরা ওদের ছয় ভাই বোন জীবনের প্রথম কান্না কেঁদেছিল।

চাপা উত্তেজনায় গজেন্দ্রনাথের ঘরটা শান্তির মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল। ভানু ছিল না বলে মালা পিসিকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। নাহলে এতগুলি ছেলে মেয়ের জন্য মাড়ভাত আর আলু মাখা কে রাঁধবে!

শান্তি অমৃতপ্রভাকে ফিসফিস করে জানাল  যে তার বৌমা দুটি সন্তান প্রসব করেছে । কিন্তু তার প্রথমটি মৃত, দ্বিতীয়টি বেঁচে আছে। দুটিই মেয়ে।

অমৃতপ্রভা গজেন্দ্রনাথকে জানাল—-‘ দুটো মেয়ে হয়েছিল তার একটি গর্ভেই মৃত্যু হয়েছে, অন্যটি বেঁচে আছে।’

গজেন্দ্রনাথ বললেন—-‘ শান্তিকে বল মৃত বাচ্চাটা বের করে আমার হাতে দিতে। আমি বাগানে পুঁতে রেখে আসব।’

সেই উঃ,আঃ যন্ত্রণা, রক্ত মূত্র এবং জন্মের সময়টুকুতে বরুণ ছিল না। বরুণ সেই সময় রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতির স্কুলে প্রেমচন্দের ‘কফন’ গল্পটি ছাত্রদের বোঝাচ্ছিল।

বরুণ ফিরে আসার পরে মালা যখন বরুণকে সংবাদটা দিল, বরুণ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল—’ ঠিক আছে, দুজনের দরকারও ছিল না।’

গজেন্দ্রনাথ গিয়ে গর্ভে মৃত শিশুটিকে বাগানের প্রান্তে পুঁতে এল। মালা এক ফাঁকে  এসে বেঁচে থাকা শিশুটিকে নিয়ে রাহুলদের ডাকল—’ ঐ রাহুল নীপা তোরা আয়। দেখে যা তোদের একটি বোন এসেছে।’

দৌড়ে এসে প্রত্যেকেই শিশুটাকে ঘিরে দাঁড়াল— একটি নিষ্পাপ ছোট্ট শিশু তাদের সঙ্গে খেলতে এসেছে। নিষ্পাপ ছোট্ট মুখ রাহুলের খালি বুকের ভেতরে ধীরে ধীরে ঢুকে গেল।

তিন দিন সেই আঁতুড় ঘরে রইল রাহুলের নতুন মা। মালা সেখানেই বউকে খাবার দিয়ে এল। রাহুল লক্ষ্য করল তাদের মা আগের চেয়ে গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। সে যাই হোক না কেন, ছোট্ট বোনটাকে নিয়ে রাহুলরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওদের জগৎটা আনন্দে উপচে উঠল।

(৫০)

কিন্তু ১১ দিনের দিন বাড়িতে পুনরায় হুলুস্থুল। শিশুটি রাত থেকে কেবল জলের মতো পায়খানা করছে। হোমিও ডাক্তার প্রবীণ মহন্ত ঔষধ দিলেন। না, কমল না। ডাক্তারেরও ডাক্তার উমেশ ডাক্তার এসে নিজের হাতে একটা ইঞ্জেকশন দিলেন, না জলের মতো পায়খানা বন্ধ হল না। গজেন্দ্রনাথ মন্ত্রপুত সরষের তেল পেটের মধ্যে মালিশ করলেন— না, বন্ধ হল ন।

অবশেষে আপনা থেকে বন্ধ হয়ে গেল জলের মতো পায়খানা। কিন্তু তার আগে বন্ধ হয়ে গেল হৃদয়ের ধপধপানি।

রাহুলের নতুন মায়ের কান্নায় এবার গজেন্দ্রনাথের বাড়ি কেঁপে উঠল। এই কম বয়সী মেয়েটিকে কেন সহ্য করতে হল দুটি সন্তানের মৃত্যু শোক। হৃদয় ভেঙ্গে যাওয়া সেই কান্নার দৃশ্য রাহুলদের ও কাঁদাল। ওরা সবাই সারি  পেতে বস্তায় বসে কাঁদতে লাগল।

কান্না নয়, যেন প্রার্থনা ছিল সেটা। রাহুলদের এই বাড়ি বজালী অঞ্চলের ভেতরে এই একটা কারণে পৃথক ছিল যে ওদের বাড়িতে সব সময় বিকেলবেলা প্রার্থনা হত এবং সেই প্রার্থনায় গজনেন্দ্রনাথ ছাড়া বাড়ির প্রত্যেক সদস্যকেই উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণ করতে হত। রাহুলদের কেউ সেই প্রার্থনায় উপস্থিত না থাকাটা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হত এবং তার জন্য কৈফিয়ত দিতে হত। সেই কৈফিয়তে বরুণ সন্তুষ্ট না হলে শাস্তি গ্রহণ করতে হত। বাড়িতে যদি কোনো অতিথি থাকে বা সেই সময়টিতে এসে উপস্থিত হয়, তাহলে তাকেও সেই প্রার্থনায় উপস্থিত হতে হত। শালগ্রাম শিলাকে স্নান করানোর জন্যই বোধহয় গজেন্দ্রনাথের কাছে বিকেলের সেই প্রার্থনা তুচ্ছ হয়ে পড়েছিল। তরুণী পিসিকেও প্রার্থনা করতে হত না। প্রার্থনার সময়টুকুতে তরুণী পিসি প্রায়ই শান্ত হয়ে থাকে। প্রার্থনার শেষে এক মিনিটের জন্য চোখ বুজে ধ্যান করার নিয়ম ছিল।

সেই এক মিনিট চোখ বুজে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের না করাকে ওরা ধ্যান করা বলে মনে করেছিল।

চোখ বুজে ওরা কিন্তু কিছু দৃশ্য সুন্দরভাবে দেখতে পেয়েছিল। মৌন হয়ে থেকে সেই এক মিনিটে ওদের বুকে জেগে উঠত অজস্র শব্দের গুঞ্জন। এই প্রার্থনা ওরা  প্রতিদিন বারান্দায় পূব দিকে মুখ করে বস্তা বা ধাড়িতে বসে করত।

আজও রাহুল-নীপারা  বারান্দায় বস্তা পেতে বসে পড়ল এবং আঁতুর ঘরের দিকে মুখ করে সারি  পেতে কাঁদতে লাগল।

প্রার্থনা থেকেও অর্থময় হয়ে উঠেছিল তাদের কান্নার রোল। চোখ বুজে সেদিন ওদের ধ্যান করা হচ্ছিল না। ওদের চোখগুলি খুঁজে বেড়াচ্ছিল জলে ভরা দুই চোখ।

বরুণও খুব দুঃখ পেয়েছিল নিশ্চয়। হরিশচন্দ্র নাটকে অভিনয় করার সময়  সদা  লহকরের কণ্ঠস্বর  যেমন করুণ স্বরে কাঁপতো সেভাবেই বরুণের   কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। বরুণ বলেছিল—‘ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে। আমার এই দুঃখ পাবার কথা ছিল, তাই পেয়েছি।’

গজেন্দ্রনাথ এসে রাস্তায় বসে কাঁদতে থাকা রাহুলকে ডাকল এবং বলল—‘চল আমার সঙ্গে।’

গজেন্দ্রনাথ মালা পিসির হাত থেকে মৃত সন্তানটি নিল এবং বাগানের দিকে মুখ করল। পুনরায় রাহুলের নতুন মায়ের কান্নায় বাড়িটা হাহাকার করে উঠল। গজেন্দ্রনাথ রাহুলকে বললেন—‘কোদালটা নে।’

রাহুল  কোদালটা কাঁধে তুলে নিল  এবং  গজেন্দ্রনাথের পেছন পেছন যেতে লাগল। বাগানের এক প্রান্তে একটা বাঁশ গাছের নিচে গজেন্দ্রনাথ দাঁড়াল। গজেন্দ্রনাথ  রাহুলের হাতে তার মৃত বোনকে তুলে দিল এবং কোদালটা দিয়ে একটা গর্ত খুঁড়তে লাগল।

রাহুল শেষবারের মতো  তার ছোট্ট বোনটাকে জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরাই নয়, সে তাকে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল।সে  অনুভব করল তার  বুকের ভেতরে এক টুকরো ভীষণ খালি জায়গার  সৃষ্টি হয়ে গেল।

রাহুল সারাজীবন খালি জায়গাটুকু বহন করে নিয়ে বেড়িয়েছিল,শৈশব থেকে যৌবনে,যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বে…।সেই খালি জায়গাটুকু ছিল রাহুলের জীবনের  সমস্ত সম্পদ,জীবনের অর্থ।  সেই খালি জায়গাটুকুর জন্যই  রাহুলের জীবনে সমস্ত  কিছু ঘটেছিল।

সারা জীবন রাহুল খুঁজে বেড়িয়েছিল সেই বোনকে সমস্ত নারীর চোখে…।

একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা (১৭ম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদ: বাসুদেব দাস

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top