সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই: পর্ব ১৪ (বিরহ মধুর হল) I I চয়ন মল্লিক

বিরহ মধুর হল আজি মধুরাতে।
গভীর রাগিণী উঠে বাজি বেদনাতে॥
ভরি দিয়া পূর্ণিমানিশা অধীর অদর্শনতৃষা
কী করুণ মরীচিকা আনে আঁখিপাতে॥
সুদূরের সুগন্ধধারা বায়ুভরে
পরানে আমার পথহারা ঘুরে মরে।
কার বাণী কোন্‌ সুরে তালে মর্মরে প্ল্লবজালে,
বাজে মম মঞ্জীররাজি সাথে সাথে॥

শিল্পীঃ অদিতি মহসিন: https://www.youtube.com/watch?v=11Su35QHH8Q

শিল্পীঃ শঙ্খনাদ মল্লিক: https://www.youtube.com/watch?v=pZFPaxeL3C0

আমার প্রাণের কবি বোধকরি তাঁর সবচেয়ে সুন্দর কিছু গান রচনা করে গেছেন বেহাগে। বেহাগ মানেই প্রেমের ব্যাকুলতা; বেহাগ মানে প্রিয়কে কাছে পাবার, তার কাছে যাবার আকুলতা; বেহাগ মানে বিরহ-বেদনায় প্রিয়মিলনের প্রবল বাসনা। আর সেই বিরহ যখন মধুর হয়, তখন বেজে ওঠে এক গভীর রাগিনী—সেই মধুর বিরহের গভীর সুরটিই আমার কাছে বেহাগ। সেই বেহাগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ৪৯ বছর বয়সে বেঁধেছেন এই গানটি। ‘রাজা’ নাটকের এই গানটি গীতবিতানের প্রেম পর্যায়ে রয়েছে। আর সত্যি বলতে কি, এই অনন্যসাধারণ প্রেমের গানটি আর কোনো পর্যায়ের সাথেই মিলতে পারে না।

নাটকে কখন কোন পরিস্হিতিতে এ গানটি গাওয়া হয় তার বিশদ ব্যাখ্যায় না গেলেও এটুকু বলা যায় যে এ গান রাণী সুদর্শনা’র মনের কথা। রাণী তাঁর না-দেখা ‘রাজা’র অপেক্ষায় বিরহিনী। তখন তাঁরই অনুরোধে এই গানটি তাঁকে নাটকের অন্য পাত্রপাত্রীরা গেয়ে শোনালেও পুরো গানটি যেন রাণীর অন্তরের কথাই বলে।

তবু, এ কি শুধু সুদর্শনার বিরহমিলন কথা? এমন গভীর প্রেমের সুর, এমন তীব্র মিলনের আকাঙ্খা কি সবারই মনের বাসনা নয়? ত্রিভূবনে যে সেই বাসনারাজিই বেজে চলে প্রকৃতি জুড়ে। নদীবনরাজি কাঁপে সেই বেদনাতেই। সেই তীব্র মিলনের বেদনায় যে সুর বেজে ওঠে সে সুর “অধীর অদর্শন তৃষা” মিটিয়ে মেশে অশ্রুজলে—-যেন আঁখিপাতে আনে মরীচিকার ছায়া। যার বিরহে এই গান, বাতাস যেন সুদূর থেকে তার আসার আভাস আনে। আর সেই সুগন্ধে পরাণ হয় দিশাহারা। আজ সেই মধুক্ষণে সবখানে যেন তারই বাণী শোনা যায়—-আর মিলনআনন্দে বাজে মনের মন্জীর—সাথে সাথে।

এ গানের প্রথম ছত্রের প্রতিটি অক্ষরে যেন মিশে আছে কোনো প্রেয়সীর লজ্জাবনত মুখটি। দীর্ঘ বিরহের পর মিলনের আনন্দে মেশা সুর এই একটি ছত্রেই পেয়েছে অন্য মাত্রা। তারপরেই সুর নামে উদারায়—কড়িতে কোমলে মিলে বেজে ওঠে “গভীর রাগিনী” আসন্ন বিচ্ছেদবেদনার মীড়ে।

এরপরেই দিকদিগন্ত উতল করে বেজে ওঠে তাকে না দেখবার তৃষায় আকুল হৃদয়ের অধীর কামনা। বিশ্বচরাচর আলো করা “পূর্ণচাঁদের মায়া”তে ভুলে পথিক সে হয়ত আসবে আজ। তার আসার আশায় বক্ষ চঞ্চল হয়। আঁখিপাত আচ্ছন্ন করে অশ্রুর মরীচিকা।

এই মহাসমারোহের প্রেমই আবার ফিরে পাই এই গানের সঞ্চারীতে। তার প্রথম ছত্রে একটু আগের অধীর আবেগ যেন কোন মন্ত্রে শান্ত। “সুদূরের সুগন্ধধারা” যেন সত্যিই বসন্তের এক ধীর “বায়ুভরে” ভেসে বেড়ায় মুদারার আলসভরা ঘেরাটোপে। তারপরেই মন হয়ে ওঠে উচাটন, পথহারা—তাই সুরও ছুঁয়ে আসে তারার সা থেকে। পরক্ষণেই কী এক অবশ বিহ্বলতা এসে গুনগুন করে পরানজুড়ে।

সেই “অলস মন” হঠাত জেগে ওঠে তার আসার সুরে। যে কথা সে বলে যায়, তার ভাষা বুঝা যায় না। কে গায়, কোন সুরে গায়—সবই অজানা। তবু তারই ছন্দে, তারই সুরে “মন কয়, চিনি, চিনি”। তারই সাথে সাথে বিরহিনীর মনের তার ওঠে ঝংকৃত হয়ে—তার হৃদয়ের “নূপুর বেজে যায় রিনিরিনি”।

সুর আর বাণীর মেলবন্ধনে এর চেয়ে বেশী, এর চেয়ে সুন্দর কিছু আর কী হতে পারে—আমার জানা নেই। সুরের মোচড়ে মোচড়ে তীব্র মিলনতিয়াসা, প্রিয়র অপেক্ষায় ব্যাকুল প্রহর গোণা, তারপর মধুরাতে বিরহের মধুরতর হয়ে ওঠা—এ রবিঠাকুরেই শুধু পাই। বিরহ আর প্রেমের মিলনে বেহাগের এই রূপ এইখানেই পায় সার্থকতা।।

সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই: পর্ব ১৩ (আমি বহু বাসনায়) I I চয়ন মল্লিক

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top