মোহাম্মদ ইকবালের ব্যক্তিগত নোটবুক থেকে নির্বাচিত ভাবনা (পর্ব-১)।। ভাষান্তর- জাভেদ হুসেন

এই নোটবুক মুহাম্মদ ইকবালের কাগজপত্রের মধ্যে পাওয়া গেছে। নোটবুক অনুসারে ইকবাল লেখা শুরু করেছেন ২৭ এপ্রিল ১৯১০ সালে। বেশ কয়েক মাস লিখে কোন অজ্ঞাত কারনে বন্ধ করে দেন। ইংরেজিতে লেখা এই নোটবুকের নাম কবি নিজেই দিয়েছেন Stray Reflections. ঐ সময়ে যেসব বই পড়ছিলেন সেই সব সম্পর্কে টুকড়ো মন্তব্য, সেই সময়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর ভাবনা, মন্তব্য এতে পাওয়া যাবে।

এর পরও বিভিন্ন সময়ে তিনি এরকম নোট লিখে গেছেন। এই সকল নোট বিভিন্ন ইংরেজি জার্নাল, পত্রিকার ছাপা হয়েছে ১৯৩২ পর্যন্ত।

নোটবুকে লেখা তাঁর কিছু ভাবনার সঙ্গে হয়তো আমরা একমত হতে পারবো না। তবে এখানে আমরা ইকবালের ভাবনার প্রাণশীলতা আর উর্বরতার ঝলক দেখতে পাবো। দেখতে পাবো তাঁর বিচিত্র বিষয় নিয়ে আগ্রহ।

— জাভেদ ইকবাল
(১৯৬১ সালে লেখা ভূমিকা থেকে সংক্ষেপিত অংশ)

..


শিল্প এক পবিত্র মিথ্যা


আমাদের আত্মা নিজেকে আবিষ্কার করে যখন আমরা কোনো মহৎ মনের সংস্পর্শে আসি। গ্যাটের কল্পনার অসীমতা যতদিন অনুধাবন করিনি, ততদিন নিজের সংকীর্ণতাও আবিষ্কার করা হয়নি।


মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রকৃতির আত্ম-পর্যালোচনার প্রয়াস।


দানশীল মানুষ আসলে অ-দানশীলকে সাহায্য করে, অভাবীকে নয়। কারণ অভাবীকে যা দেয়া হয় তা সমর্পিত হয় তাঁদের কাছে যারা দরিদ্রের কিছুই দেয় না। অ-দানশীল ব্যক্তি তাই অনুদার থেকে যায়, তাঁর পক্ষ হয়ে দানশীল ব্যক্তি দিয়ে যায়। এই হলো দানশীলতার অর্থনীতি


বন্ধুরা আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করো?’ আমি ভাবি, প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে এতে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলোর অর্থ জানার অধিকার আমার আছে। প্রশ্নের উত্তর পেতে আমার বন্ধুদের উচিৎ তারা ‘বিশ্বাস’ আর ‘ঈশ্বর’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন এর অর্থ আমার কাছে ব্যাখ্যা করা। বিশেষ করে শেষের দুটোর। স্বীকার করি যে এই পরিভাষাগুলো আমি বুঝি না। আর যখনই যাচাই করি, দেখি যে তারাও সেগুলোর অর্থ বোঝেন না।


খ্রিস্টানত্ব খোদাকে বর্ণনা করে প্রেম হিসেবে। ইসলাম করে ক্ষমতা হিসেবে। এই দুই ধারণা থেকে আমরা কী করে সিদ্ধান্ত নেবো? আমার মনে হয় মানবজাতি আর মহাবিশ্বের ইতিহাস সামগ্রিকভাবে নিশ্চই বলে দেবে এই দুইয়ের কোনটি বেশি সত্য। আমি দেখলাম খোদা ইতিহাসে নিজেকে প্রেমের চাইতে ক্ষমতা হিসেবেই বেশি প্রকাশ করেন। আমি খোদার প্রেম অস্বীকার করি না। আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, আমাদের ঐতিহিয়াসিক অভিজ্ঞতার নিরিখে খোদাকে ক্ষমতা হিসেবে অপেক্ষাকৃত ভালভাবে বর্ণনা করা যায়।


হেগেলেরর দর্শনের পদ্ধতি গদ্যে লেখা এক মহাকাব্য


কাব্যে লজিএর সত্য খুঁজে লাভ নেই। কল্পনার আদর্শ সত্য না, তা হলো সৌন্দর্য। তাহলে আমার মতে যা বৈজ্ঞানিক সত্যের পরিচায়ক, কবির লেখা হতে এমন উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর মহত্ব দেখানোর চেষ্টা করো না।


ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিলো পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ হিসেবে। আর দেশপ্রেম সূক্ষ্ম ধরণের পৌত্তলিকতা ও কোনো বস্তুগত বিষয়য়কে দেবত্ব আরোপ ছড়া আর কী? বিভিন্ন জাতির দেশপ্রেমের গান আমার এই ধারণা সমর্থন করে। ইসলাম কোনো ধরণের পৌত্তলিকতা সমর্থন করে না। আমাদের চিরন্তন লক্ষ্য হচ্ছে সকল ধরণের পৌত্তলিকতার বিরোধিতা করা। ইসলাম যা ধ্বংস করার কথা তা কোনো মতেই তাঁর রাজনৈতিক সম্প্রদায়্য গঠনেরই নীতি হতে পারে না। নবী যে নিজ জন্মস্থান ছেড়ে অন্য কোথাও সাফল্য পেয়েও মৃত্যবরণ করলেন, এই ঘটনার বোধহয় এরকম কোনো মরমী ঈঙ্গিত আছে।

১০
ন্যায়পরায়ণতা এক অমূল্য সম্পদ। তবে আমাদের একে অবশ্যই করূনা আনামের চোরের হাত থেকে পাহাড়া দিয়ে রাখতে হবে।

১১
দর্শন হচ্ছে ন্যায়ের লজিক, ইতিহাস হচ্ছে শক্তির লজি। ইতিহাসের লজিকের শাস্ত্র মনে হয় তার বোন খোদ লজিকের চাইতে অনেক যুক্তপূর্ণ।

১২
ম্যাথু আর্নল্ড কাব্যকে বলেছলেন জীবনের পর্যালোচনা। জীবন কাব্যের পর্যালোচনা- এ কথাও সমান সত্য।

১৩
ইহুদি জাতি দুইজন মাত্র মহান মানুষ তৈরি করেছে- খৃষ্ট ও স্পিনোজা। প্রথমজন ছিলেন পুত্রেরর মাঝে দেহধারী ঈশ্বর, আর পরের জন মহাবিশ্বের মাঝে। স্পিনোজা ছিলেন কেবল তাঁর জাতির মহত্তম শিক্ষকের পূর্ণতা।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top