একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা (২৫তম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদ: বাসুদেব দাস

(৭৮)

বরুণও কবিতা লিখত। বজালী রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতির অধ্যক্ষ হওয়ার সুবাদে তাকে কখনও অসমের বাইরেও হিন্দি কবিতা পাঠ করার জন্য যেতে হত। কিন্তু অসমিয়া কবিতাও লিখতেন। বজালী হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুলের ম্যাগাজিনের জন্য ছোটো খাটো দুই একটা প্রবন্ধ যে লেখেন নি তাও নয়।পাঠশালা সাহিত্য সভার সম্পাদক,সদস্যও হয়েছিলেন।সেই সময়ে সাহিত্য সভার বৈঠক মাসে বা পনেরো দিনে সদস্যদের বাড়িতে হত। সদস্যরা কারও বাড়িতে সংঘটিত বৈঠকে পরবর্তী বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানাত।যার বাড়িতে বৈঠক হত, সেই বাড়িতে পরিবারের প্রত্যেকেই অতিথিকে আপ্যায়নের জন্য সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ত।রাহুল ধুমারকুরে দুধ কিনতে গিয়েছিল। বৈঠকে কিছুলোক কবিতা পড়েছিল,কিছুলোক প্রবন্ধ পড়েছিল আর কেউ একজন পঠিত সাহিত্যের ওপরে পর্যালোচনা করছিল।যার ঘরে ভালো অ্যাপায়ন হত,সেই ঘরের বৈঠক ভালো হয়েছে বলে প্রত্যেকেই নীরবে স্বীকার করে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেত।

বরুণের আমন্ত্রণে এই ধরনের বৈঠক রাহুলদের বাড়িতে হত।কার কী প্রয়োজন সেটা দেখার জন্য রাহুলও বৈঠকের এক কোণে বসে থাকত।বরুণ কবিতা পড়ত—রাহুল মন দিয়ে শুনত—ইনি তার পিতা নন,অন্য এক উজ্জ্বল অপরিচিত বরুণ—যে কবিতা পড়ছে!

বরুণ বসা আরাম চেয়ারটার সামনের টেবিলের একটা ফাইলে বরুণের কবিতাগুলি থাকে।রাহুল এখন মাঝে মধ্যে সেইসব পড়ে দেখে।হাতের অক্ষরে লিখে রাখা কবিতাগুলির নিচে লেখা থাকে একটা নাম—নীরব কুমার।রাহুলের এই নামটা বড়ো ভালো লাগে।একটা শান্ত-শীতল নাম।এক ঝাঁক কোমল বাতাসের মতো শরীর জুড়িয়ে যাওয়া একটা নাম,এই নাম বরুণের। এক অন্য পরিচয়!

বরুণ একদিন রাহুলকে আরাম চেয়ারের কাছে ডেকে নিয়ে সামনের টেবিলে থাকা ফাইলটা থেকে অসমিয়া এবং হিন্দিতে লেখা অনেকগুলি কবিতা বের করে দিয়ে বলল-‘তুই এই কবিতাগুলি আলাদা আলাদা দুটি খাতায়—কপি করে রাখবি।তোর হাতের লেখা খারাপ নয়।…’

রাহুলের নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হল।নীরব কুমার তাঁর কবিতা রাহুলকে কপি করতে দিয়েছে ।রাহুল এক কথায় করে দেবে বলে ফাইলটা তার ঘরে নিয়ে গেল।প্রথমে সে নীরব কুমারের অসমিয়া কবিতাগুলি একদিক থেকে পড়তে শুরু করল। কবিতাগুলিতে অন্ত্যমিল নেই।ছন্দহীন। তার সবচেয়ে ভালো লাগল এরকম একটি কবিতা—ফুটপাথে পড়ে থাকা একজন ভিখারিনী প্রচণ্ড ঠান্ডায় নগরের কাছে একটা কাপড় চাইছে আর নগরটি সেটি দিতে অপ্রস্তুত এই ধরনের!হিন্দি কবিতাগুলিরও অনেকগুলি পড়ে দেখল কেবল প্রবেশিকা পাস করা রাহুল অনেকগুলি শব্দের অর্থ বুঝতে পারল না।

রাহুল মানস স্টোর থেকে দুটি ছোটো ছোটো বাইণ্ডিং বুক নিয়ে এল এবং কালো কালির কলমে সুন্দর করে অত্যন্ত সাবধানে কপি করতে লাগল।রাহুলের অক্ষরগুলি সুন্দর নয়,গোটা গোটা এবং লাইনগুলি হেলে না পড়া এবং পরিষ্কার করে লেখা।পরিষ্কার হলেই অনেক সুন্দর দেখায়।সুন্দর হলেও যদি অপরিষ্কার হয়,তাহলে সেই সুন্দরের কোনো মূল্য নেই।কথাটা কোনো একজন শিক্ষকের কাছ থেকে শোনা।

একটি শব্দও কাটাকুটি না করে গোটা গোটা অক্ষরে দুটো খাতায় কপি করার পরে অতিরিক্ত প্রশংসার আশায় রাহুল আরও কিছু কাজ করতে লাগল।সে খাতা দুটির মলাটে সাদা কাগজ এমনভাবে আঠা লাগিয়ে দিয়ে বইয়ের প্রচ্ছদের মতো রঙিন স্কেচ পেন দিয়ে ভেতরে থাকা একটা কবিতার নাম দিয়ে অসমিয়াটার নাম লিখল’মাটির প্রদীপ’।আর হিন্দিটার নাম লিখল ‘এক সপনা’।তারপরে বাইরের গল্প-উপন্যাসে লেখকদের নাম থাকার মতো রাহুলও হাতে লেখা বই দুটির নামের নিচে লিখে দিল কবির নাম-নীরব কুমার!

রাহুল যখন কিছুদিন পরে হাতে লেখা খাতা দুটি নীরব কুমারের হাতে তুলে দিল, তিনি আনন্দে আত্মহারা হলেন। তিনি যেন এখন নিজেকে আবিষ্কার করলেন দুটি বইয়ের স্রষ্টা হিসেবে। রাহুলকে আদর করে কয়েকটি বেশ বেশ বলে প্রশংসা করলেন এবং বললেন—বই দুটির নামও তুই ঠিকই দিয়েছিস মাটির প্রদীপ এবং একটি স্বপ্ন…। বেশ বাবা, বেশ…। এই বলে পাতাগুলো উল্টে যেতে লাগল। বইটিতে একটি বানানও  ভুল নেই এবং কাটাকুটি নেই। রাহুল এতটা সাবধানে এমনিতেই কপি করেনি, প্রশংসা পাওয়ার আশাতেই করেছিল। এখন প্রার্থিত প্রশংসা পেয়ে তার মন আনন্দে নেচে উঠল।

এখান থেকেই আরম্ভ হল রাহুলের জীবনের অন্য এক অধ্যায়। নীরব কুমারের কবিতা কপি করে থাকার সময় তারও একটি বাসনা জন্মেছিল ‘এক স্বপ্নার ‘ পরিবর্তে

‘ভাঙা স্বপ্ন’ নামের একটি হাতে লেখা কবিতার বই বের করল।তাই সেদিন থেকেই সে নিজেকে ছেড়ে দিল আবেগের বন্যায় ভেসে যাবার জন্য।যেহতু টলস্টয়,তুর্গেনিভ,কাঞ্চন বরুয়া, আব্দুল মালিক আদির উপন্যাস পড়ে সে আবেগিক ভাষার সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হয়ে উঠেছিল, তাই সে খুঁজতে লাগল সেইসব বইয়ের শোকাকুল বাক্যগুলি এবং পুনরায় নিমজ্জিত হল আবেগের সঙ্গে!সেই আবেগ নিয়ে রাহুল নির্মাণ করতে লাগল তার ভাষা।আর আবেগপূর্ণ ভাষায় সে লিখে গেল তার মনের কথাগুলি।

মনের মধ্যে তার যে আনন্দ বা দুঃখের অনুভব সেই সমস্ত আবেগের স্রোতে লিখে গেল সে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। তার মগজে কবিতা নামের পোকাটি বাসা বাঁধতে লাগল। সে সমস্ত কথায় নিজেকে আবেগপ্রবণ করে তুলল ।এখন সে অনুভব করতে লাগল শালগ্রাম কে স্নান করানোর জন্য তীব্র নীল অপরাজিতা ফুলগুলি ছিঁড়ে আনার সময় যে ফুলগুলিও কষ্ট পেত, তুলসী পাতা ছেঁড়ার সময় মৃদু শব্দগুলি ছিল যন্ত্রণাময়, শিশিরকে কেন মুক্ত বলে কবিরা সে কথা এখন সে বুঝে উঠতে পারল। এভাবেই সে আবেগিক চিন্তা ভাবনায় নিমজ্জিত হয়ে হাতে তুলে নিয়েছিল কলম এবং কাগজ আর একদিন লিখে ফেলেছিল ‘ভাঙ্গা সপোন’ নামে একটি হাতে লেখা বই নীরব কুমারের আদর্শে।

লজ্জিতভাবে একদিন রাহুল সেই হাতে লেখা কবিতা বইটি তার অসমিয়া এবং ইংরেজি শিক্ষক দুজনকে দেখাল।প্রকৃতপক্ষে এই দুজন শিক্ষক একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ায় কারণ দুজনেই এম এ পাশ।এই এম এ পাশ শিক্ষকদের যদিও হাইস্কুলের ছাত্রদের পড়ানোর কথা না,তথাপি মাথা নাড়ানো অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের নির্দেশে হাইস্কুলে শ্রেণির ভালো সেকশনে ক্লাস করতে হয়েছিল। সেই ভালো সেকশনের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটি হল রাহুল, তাই সমস্ত শিক্ষক তাকে ভালোভাবে নজরে রাখে।

অসমিয়াতে এমএ পাস ধীরেন তালুকদারকে সেই হাতে লেখা কবিতা পড়ে দেখতে দেবার সময় জিজ্ঞেস করেছিল— তুমি নিজে লিখেছ কি?’

রাহুল বলল—‘হ্যাঁ,আমি নিজেই লিখেছি।এসব আমার হাতের লেখা।‘

ধীরেন মাস্টার বললেন—‘হাতের লেখা তোমার। কিন্তু এই লেখা কথা গুলি কার?’

রাহুল চট করে উত্তর দিল—‘এগুলিও আমারই!’

‘ভাঙা স্বপ্ন’এর শেষে দুটো খালি পৃষ্ঠা থেকে গেছিল। যেখানে রাহুল লিখে রেখেছিল মন্তব্যের জন্য।

ধীরেন মাস্টার সেই পৃষ্ঠাতে লিখে দিলেন—প্রতিশ্রুতি আছে।লিখে যাও।তারপরে সই করে দিল। সইয়ের নিচে তারিখ। উৎসাহে রাহুল ভেসে গেল।সে এইবার তার মন্তব্যের খালি জায়গা পূর্ণ করার জন্য ইংরেজির এমএ ঠাকুরিয়া মাস্টারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। রাহুল জানত অসমিয়া এবং ইংরেজির এম এ রাই  সাহিত্যের কথা সবচেয়ে বেশি জানে। ঠাকুরিয়া মাস্টারকে ‘ভাঙ্গা সপোন’ বিনম্রভাবে হাতে দিয়ে দেখার জন্য বলতে তিনি পরম আগ্রহে কবিতা গুলি পড়ে দেখেন। রাহুল নামের এই অপদার্থ ছেলেটিও যে এই সমস্ত আপেক্ষিক কথা লিখতে পারে, স্বপ্ন ভাঙ্গার কথা ভাবতে পারে, তিনি ভাবতেই পারেননি। কবিতাগুলি পড়ার পরে রাহুল দেখিয়ে দিল শেষের দিকে থাকা মন্তব্যের পৃষ্ঠাটা। ঠাকুরিয়া স্যার ছিলেন ধীরেন তালুকদারের চেয়ে আরও এক ডিগ্রি বেশি।। তিনি লিখলেন—‘তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল । মনের কথাগুলি যে এভাবে প্রকাশ করতে পেরেছ, তার জন্য তোমার প্রতিভার প্রশংসা করছি। থেমে থেকোনা, লিখে যাও।’ এই বলে একটা প্রকাণ্ড সই করে দিলেন। তার নিচে তারিখ।

এই ধরনের মন্তব্যে রাহুল আকাশে উড়তে লাগল।সে একটা পাখি হল, গাছে বিশ্রাম নেবার ইচ্ছা হল না। বারবার সে মন্তব্য গুলি পড়ে দেখতে লাগল। মন্তব্যগুলি তার মুখস্থ হয়ে গেল। তার ইচ্ছা হল মন্তব্যের দুটো পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলতে। সে এইবার গেল তাদের কেমিস্ট্রি শেখানো মোহন কৃষ্ণ মিশ্র নামের শিক্ষকের বাড়িতে। তিনি ভাড়া ঘরে থাকেন কেননা এই শিক্ষকটিও  কবিতা লেখেন বলে সে শুনেছিল।স্যারের কবিতা ম্যাগাজিনে ছাপা হয় বলেও কেউ কেউ বলেছিল। রাহুল আসার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করল—‘ স্যার, আমি বিজ্ঞান শিখতে আসিনি। আমি কয়েকটি কবিতা লিখেছি। তালুকদার স্যার এবং ঠাকুরিয়া স্যার কবিতা গুলি পড়ে মন্তব্য লিখে দিয়েছেন। আপনিও পরে একটা মন্তব্য লিখে দিন!’ এই বলে রাহুল ‘ভাঙ্গা সপোন’ নামের হাতে লেখা বইটির কবিতাগুলি পড়ে দেখে বললেন—‘এসব কি লিখেছ? এগুলো কবিতা হয়নি।’ এই বলে অংক ভুল হলে যেভাবে পূরণ চিহ্ন দিয়ে অংকগুলি কেটে দেন সেভাবে তিনি সবগুলি কবিতা কেটে দিয়ে কিছুই হয়নি বলে দিলেন। ভাঙ্গা স্ব্প্ন দেখা স্বপ্ন এবার সত্যি সত্যি ভেঙ্গে গেল।

রাহুল জিজ্ঞেস করল—স্যার, কেন কবিতা হয়নি?

স্যার বললেন— কবিতা কী তুমি জান না।এইসব তোমার মনের ভাব!কবিতা নয়। মনের ভাবই কবিতা হতে পারে না। কবিতা কী জিনিস তাকে তুমি আগে জেনে নাও…’

রাহুল জিজ্ঞেস করল—‘কীভাবে জানব স্যাার?

মিশ্র সার বললেন  কবিতা পড়তে হবে।।

রাহুল জিজ্ঞেস করল কার কবিতা

মিশ্র স্যার বললেন—‘নীলমণি ফুকন, নবকান্ত বরুয়া, হীরেন ভট্টাচার্য এদের  কবিতা পড়।’

‘ভাঙ্গার স্বপ্ন’এর স্বপ্ন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়ার দিনই অর্থাৎ মিশ্র স্যার বলার দিনই রাহুল গেল বজালী প্রগতিসংঘের লাইব্রেরীতে। সেখানে দেখল নীলমণি ফুকনের একটি বই ‘আরু কি নৈশব্দ’  নবকান্ত বরুয়ার ‘একটি দুটি এগারোটি তারা’ আর হীরেন ভট্টাচার্যের ‘মোর দেশ মোর প্রেমর কবিতা’—এই তিনটি একটি আলমারিতে অন্য বইগুলির চাপের মধ্যে কোনোরকম ভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। বই তিনটি বাড়িতে নিয়ে এসে সে গোগ্রাাসে  পড়তে শুরু করল।হীরেন ভট্টাচার্য ছাড়া অন্য দুজনের কবিতা সে কিছুই বুঝতে পারল না। একেবারে বুঝতে পারেনি বলেই তার মনটা বারবার ‘আরু কি নৈশব্দ’নামের কবিতা বইটির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হল। সে বুঝতে পারল—সে যেগুলি লিখেছিল কবিতা বলে সেগুলি কবিতা নয়। কবিতায় মনের ভাব বোঝা যায় না। সেদিন থেকে রাহুল অস্থির অশান্ত হয়ে পড়ল এবং ক্লান্ত হল। ভাষা তাকে ভালোভাবেই বিদ্ধ করল। সেই এই তিনজন কবির সঙ্গে দেখা করার জন্য কাতর হয়ে পড়ল। সে দেখতে পেল বইগুলোতে কবি কয়েকজনের বাসস্থানের ঠিকানা আছে। সেই তিনটি ঠিকানায় তিনজন কবির কাছে সে একটি করে চিঠি লিখল এবং পোস্ট করে দিল। ডাকঘরটা ছিল রাহুলদের বাড়ির সামনে। রাস্তাটা পার হলেই দেখা যায়, টংকি মহাজনের ভাড়াবাড়িতে ।রাহুল অধীর অপেক্ষায় সেই ডাকঘরের দিকে তাকিয়ে থাকল। সেই চিঠির উত্তরের জন্য পিওনকে দেখলে সে জিজ্ঞেস করে—কোনো চিঠি এসেছে নাকি তার নামে? সে গোপনে দেওয়া চিঠির উত্তরও আসবে গোপনে, বরুণের অজ্ঞাতে।

(৭৯)

একদিন সে চাওয়া মতোই একটি চিঠির উত্তর পিয়ন তার হাতে দিয়ে গেল। ভাস্কর্যের মতো অক্ষরে লেখা এনভেলাপটার দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল না এটা কার উত্তর হতে পারে! সে চিঠিটা খুব সন্তর্পনে খুলল— নীলমণি ফুকনের চিঠি! যার কবিতার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারেনি, সেই কবির  চিঠি। সবচেয়ে রহস্যময় এবং ভারী ভারী— বুঝতে না পারা বাক্যগুলিতে লেখা কবির  চিঠি…! রাহুলের ভেতরের ঘর দুয়ার উপচে পড়ল আনন্দের আতিশয্যে। সে বারবার চিঠিটা পড়তে লাগল। নীলমণি ফুকন উপদেশ দিয়েছেন— রবীন্দ্রনাথ পড়বে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং নাটকগুলি।বজালী প্রগতি সংঘের লাইব্রেরিতে রাহুল রবীন্দ্রনাথের খোঁজে গেল।

রবীন্দ্রনাথ ঘুমিয়ে ছিল লাল কালো রংয়ের একটা আলমারির নিচের সেলফে, আলো থেকে বঞ্চিত, স্পর্শহীন …। রবীন্দ্রনাথের সপ্ত নাটকের প্রথম এবং দ্বিতীয় খন্ড দুটিই ছিল পরস্পরকে জড়িয়ে । নবকান্ত বরুয়া অনুবাদ করা দুটি খন্ডের প্রথম খন্ডটি হাতে নিয়ে যখন রাহুল লাইব্রেরিয়ানের কাছে এল, লাইব্রেরিয়ান জিজ্ঞেস করল—-’ এটা নিয়ে কি করবি? এটা তুই কিছুই বুঝতে পারবি না। আজ পর্যন্ত পাঠশালার কেউ এই বইটি পড়তে নেয় নি!… তুই বুঝতে পারবি না, রেখে আয়!’

রাহুল বলল—-’ বুঝতে পারব বুঝতে পারব…’ এই বলে রবীন্দ্রনাথকে বুকে চেপে ধরে নিয়ে এল।

‘রক্তকরবী’ এবং ‘মুক্তধারা’ নাটক দুটির সংলাপ গুলি রাহুলকে এভাবে বিদ্ধ করল যে সে ভাষার আলাদা একটি জগতে সাঁতার কাটতে লাগল। সে আগের চেয়ে অনেক বেশি আবেগিক এবং সংবেদনশীল হয়ে উঠল। সে কবিতা আগের মতোই লিখে যেতে লাগল যদিও তার ভাষা পরিবর্তিত হয়ে গেল। সে মনের ভাব সমূহকে হুবহু রূপে প্রকাশ করা থেকে দূরে সরে এল। সে নিজের মনকে খুঁজে পেল না। নিজের মনকে খুঁজে বেড়াতে লাগল এবং দেখল একটি নীরবতার দ্বীপে সে বসে রয়েছে…।

এরকম একটি দিনে একদিন সকালবেলা পাঠশালা নামের ছোটো অঞ্চলটিতে ছড়িয়ে পড়ল যে মোহনকৃষ্ণ মিশ্র নামের বজালী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার থাকা ভাড়া করে আত্মহত্যা করেছে। রাহুল স্তব্ধ হয়ে গেল। যে তাকে কবিতার শুদ্ধ রাস্তাটা দেখিয়েছিল, তিনিই নাই হয়ে গেলেন? রাহুল কেঁদে উঠল। কিন্তু এটাই তার সান্ত্বনা ছিল যে মিশ্র স্যার আত্মহত্যা করেছেন! এই আত্মহত্যার মৃত্যুকে রাহুল মহৎ বলে মনে করে।

মোহনকৃষ্ণ মিশ্র স্যার দেওয়া উপদেশের পরে রাহুল এখন যে সমস্ত কবিতা লিখছে সেইসব দেখানোর জন্য তার মানুষ নাই হয়ে গেল। তাই সে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে দেখার জন্য দুই একটি কবিতা কবিতার পত্রিকায় পাঠাতে শুরু করল। গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত ‘পান্থপাদপ’ এবং নলবারী থেকে প্রকাশিত ‘ সেউজী সেউজী ‘ নামের পত্রিকা দুটিতে তার কবিতা প্রকাশিত হতে লাগল। পিতা বরুণের হাতে পিয়ন দিয়ে যাওয়া বুক পোস্টে  আসা পত্রিকা দুটির পাতা উলটে দেখে যে ছেলের কবিতা। এভাবে মাসিক পাক্ষিক কবিতার পত্রিকায় রাহুলের কবিতা নিয়মিত বের হতে দেখে বরুণ চিন্তিত হল। বরুণ ভাবল বড়ো পুত্র ধ্বংস! কবিতা লিখতে শুরু করেছে যখন পড়াশোনার সর্বনাশ হল। ভবিষ্যৎ শেষ! তাই একদিন রাহুলকে কাছে ডেকে এনে বলল— যা কবিতা লিখেছিস, লিখেছিস। এখন আর লিখবি না। আগামী বছর তো মেট্রিক পরীক্ষা। কবিতা লিখতে থাকলে তোর পরীক্ষা খারাপ হবেই। আর লিখিস না।’

রাহুল লিখবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিল। কিন্তু ‘রক্ত করবী’ এবং ‘মুক্তধারা’ পড়ার পরে মেট্রিক পরীক্ষা কী সেটা সে বুঝতে পারছিল না। কবিতা লেখা থেকে সে সরে থাকবে কীভাবে– বরং আরও বেশি হতে লাগল। কবিতা তাকে ছাড়ছে না। ফুলের বইগুলি সামনে রাখে, কিন্তু সে অক্ষর দেখতে পায় না, সে দেখে সাগর, পাখি ,শীল ,বৃষ্টি ,মাঠ…। শব্দগুলি থেকে সে দূরে থাকতে পারল না। কিন্তু সে সেগুলি প্রকাশ করতে পারল না। কারন সে কবিতা লিখবে না বলে বরুণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কাজেই সে বরুণের কাছে গোপন রাখার জন্য ঠিক বরুণের মতোই একটা কাজ করল—বরুণ যেভাবে একটা ছদ্মনাম নিয়েছিল, নীরব কুমার— ঠিক সেই ধরনেই সেও নিজেকে একটা নাম দিল— একটা ছদ্মনাম! এখন সে আর কার ও দৃষ্টিতে পড়বে না। এই নাম নিয়ে মেট্রিক পরীক্ষা দিতে হবে না, এই নামে কোনো এডমিট কার্ড আসতে পারবে না! বরুনকে কেউ যদি সন্তানদের নাম লিখতে বলে, এই নামটা লিখবে না! এই ছদ্মনামের আড়ালে লুকিয়ে রইল রাহুলের নতুন জীবন!

রাহুলের একটা জীবন স্কুলে যায়। মানসস্টোরে বই বিক্রি করে , ধুমারকুর  থেকে দুধ আনে, জিন্টি রিকিদের সঙ্গে খেলাধুলা করে। আর অন্য জীবন রবীন্দ্রনাথ পড়ে। রাহুলের বুকের অরণ্যে খুঁজে বেড়ায় ঝরা পাতার অরণ্য …

(৮০)

রাহুলের এখন দুটি জীবন আরম্ভ হল। একটি সামাজিক জীবন, অন্যটি একান্ত ব্যক্তিগত জীবন। রাহুল ধীরে ধীরে অনুভব করতে লাগল যে এই জীবন অন্য জীবনটিকে  সহ্য করে না। এক জীবন অন্যজীবনের শত্রু।

গরমের বন্ধে রাহুল যখন রবীন্দ্রনাথের নাটক গুলি পড়তে থাকে, নাটক গুলির কিছু সংলাপ রাহুলকে ছিন্নভিন্ন করে। টপটপ করে ঝরে পড়া তার চোখের জল বইয়ের পৃষ্ঠা ভাসিয়ে দেয়। যেসব পৃষ্ঠা তাকে কাঁদায়, সেই পৃষ্ঠাগুলি সে পুনরায় পড়ে… তারপর সেই পৃষ্ঠাগুলিতে সে চিহ্ন দিয়ে রাখে, যাতে সেই পৃষ্ঠাগুলি পুনরায় পড়ে সহজে কাঁদতে পারে। সেই সব পৃষ্ঠায় সে নিজেকে ছেড়ে আসে…

পৃষ্ঠাটা উল্টে অন্য পৃষ্ঠায় যেতে চেষ্টা করতেই বরুণ তাকে ডাকল—’ রাহুল এখনই বাইরে বেরিয়ে আয় তো।’

রাহুল বেরিয়ে আসে। বরুন বলে–’ যা ধুমারকুরে যা, আট দশ লিটার দুধ নিয়ে আয়।… আজ রাতে পায়েস খাব।… একটা ছাতি নিয়ে যা। বড্ড রোদ!

মা চন্দ্রপ্রভা দুধ আনা বাসনটা ধুয়ে মুছে বের করে দেয়। বাসনটা সেই তখনকার, গজেন্দ্রনাথের বেলের নিচের চায়ের দোকানের সময়কার। রাহুলের এবার দ্রুত মনে পড়ে যায় সেই চায়ের দোকানটাকে। বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছিল রাহুল নীপাদের। কেননা ওরা গজেন্দ্রনাথের লবঙ্গ নিমকির অভাবে পুষ্টিহীনতায়  ভুগছিল।

এই বাড়ির প্রত্যেকেই পায়েস খুব ভালোবাসে। সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে বরুণ। যেদিন ধুমারকুরের সাপ্তাহিক বাজার থেকে দুধ আনা হয় সেদিন রাতে বাড়িতে ভাত বানানো হয় না। প্রত্যেকে পায়েস খেয়েই পেট ভরায়। থালা ভরে পায়েস দেওয়া হয় সবাইকে। চামচ ছাড়া হাত দিয়ে চেটে চেটে খায় সবাই। রাহুল, লক্ষ্য ,বরুণ একান্ত মনে পায়েস খেয়ে চলেছে… পায়েস খেতে থাকার সময় আনন্দে মানুষটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

১৫-২০ দিন পরে পরে এভাবে রাহুল বা জিন্টুকে ধুমারকুরে দুধ কিনতে পাঠিয়ে দেওয়া হত। আজকের পাঁচ কিলোমিটার দূরের এই ধুমারকুরের সাপ্তাহিক বাজার বসে দুপুরবেলা এবং বিকেলের আগে আগে শেষ হয়ে যায়। বাজারে প্রচুর পরিমাণে গরুর দুধ পাওয়া যায় এবং দামে ও সস্তা। এখানে অসমিয়া দোকানে ব্যাবসায়ী প্রায় আসেই না। অসমিয়া গ্রাহক ও কম। আশেপাশে কয়েকটি বাঙালি গ্রাম রয়েছে বলে বাঙালিদের সমাগম বেশি। দুই একজন দুধ বিক্রেতার সঙ্গে রাহুল জিন্টুর এখন পরিচয় ও হয়ে গেছে।

দুধ আনার পয়সা দেবে গজেন্দ্রনাথ। রাহুল চন্দ্রপ্রভা ধুয়ে রাখা বাসনটা নিয়ে গজেন্দ্রনাথের দোকানে ঢুকে পয়সা নিয়ে চলে যায়। কিছুটা গিয়েই ন্যাশনাল হাইওয়েতে উঠে পড়ে। ন্যাশনাল হাইওয়েতে দপদপ করে চলতে থাকা ট্রাক গুলির গর্জনের আশেপাশে সাইকেল চালিয়ে যেতে থাকার সময় রাহুলের কখনও ইচ্ছা করে— সামনের দিক থেকে আসতে থাকা ট্রাকটাকে সে সাইকেলে সজোরে ধাক্কা মারবে…

এই মনটা তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের মন, একান্ত গোপন মন, যা রবীন্দ্রনাথ পড়ে  এবং মনে মনে কাঁদে…। এই মনটা সাইকেল চালিয়ে দুধ কিনতে যেতে থাকা ছেলেটির কাছ থেকে চলে আসতে চায়, তার সঙ্গে বাস করতে চায় না… এই ধরনের দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে রাহুলের বুকটাকে ভারী করে রাখতে লাগল। সে যখনই ধুমারকুরে যায়, তার ইচ্ছা করে এভাবে ট্রাকগুলিকে ধাক্কা মারতে। সে ভাবে— এক মুহূর্তের কাজ, তারপরে সবকিছু শেষ। মুক্তি। এই  ধরনের এক প্রবৃত্তি তার মাথায় ক্রমশ গড়ে উঠতে থাকে। তার মনে পোষণ হতে লাগল যে আত্মহত্যা করা মানুষগুলি বেশি শক্তিশালী। মানুষের যাকে সবচেয়ে বেশি ভয়, অর্থাৎ মৃত্যুভয়— সেই মৃত্যুকে জয় করাটা কতটা শক্তিশালী মানুষের কাজ! তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রতি এক সম্মানবোধ জন্মাতে লাগল এবং নিজেকে ধ্বংস করে ফেলার একটা ইচ্ছা স্থায়ী হয়ে গেল।

কোথাও বাসে যেতে থাকলে সে এখন অন্তঃকরণ দিয়ে চায় — বাসটা এমন একটি দুর্ঘটনায় পড়ুক, যাতে কেউ না বাঁচে! রেলে উঠার সময় হ্যান্ডেল ধরে সে ভাবে আজ যেন এক বড়ো এক্সিডেন্ট হয় এবং সবকিছু শেষ হয়ে যায়। না হলে তার পিসি তরুণী খাওয়া গার্ডিনাল‐-৬০ নামের ট্যাবলেট গুলি আছে না, সেই ট্যাবলেট দশটি খেয়ে ফেললেও সবকিছু শেষ। এ কথা সে জানে!

মোটের ওপর সে নিজেকে বিশ্বাস করাতে চায় যে তার হাতে সমাধানের একটি পথ আছে।

কিন্তু কার হাতে?

রাহুলের ব্যক্তিগত জীবনের?

সেই জীবনটাকে যে রাহুলের সামাজিক জীবন টেনে ধরে! দুটি জীবন তর্ক করে একে অপরকে নিয়ে ওদের অপরিণত যুক্তির দ্বারা।

অবশেষে বোধহয় দুটি জীবন এক সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে দুজনের কাছাকাছি, এখানে সন্ধি হয় এই শর্তে যে জীবনটাকে কাটানোর জন্য ওরা ভয় করবে না। জীবন যেদিকে নিয়ে যায় ওরা সেদিকেই চলে যাবে…

এই সন্ধি ছাড়া রাহুল বড়ো হতে পারত না!

ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে প্রচন্ড বেগে আসা ট্রাক গুলির হর্ন এবং গর্জনগুলিকে সাইড দিয়ে দিয়ে যখন ধুমারকুরের দুধ ভর্তি বাসন সাইকেল থেকে নামে— প্রত্যেকেরই মুখে হাসি ফুটে উঠে। বরুণ বলে বেশ! বাবা বেশ!

রাহুলদের এই ধরনের কাজে বরুণ বাবা শব্দটি প্রয়োগ করে ভালোবাসার প্রকাশ করত। এই আদরের শব্দটি শোনার জন্য রাহুল জিন্টুরা নিজেকে রক্তাক্ত করতে পারত। এই শব্দটিতে কতটা শক্তি থাকতে পারে সে কথা বরুন ছাড়া অন্য কেউ এই পৃথিবীতে জানত না!

কিন্তু এই শব্দটি যারা আনন্দের সবচেয়ে বেশি লাভ লুটে ছিল রাহুলের জীবন। কেননা শব্দটি একটি সাঁকো তৈরি করে দিয়েছিল রাহুলের দুটি জীবনের মধ্যে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top