একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা ( শেষ পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদ: বাসুদেব দাস

(৮১)
এই যে দুটো জীবন আরম্ভ হল, রাহুলের ছদ্মনামী জীবনটা কিন্তু দুটো জীবনকে করে তুলল অস্থির এবং নিঃসঙ্গ। তার বাড়িতে থাকার ইচ্ছা হল না। সে গিয়ে একা একা রেল স্টেশনের একটা বেঞ্চে মাঝেমধ্যে বসে থাকে। একটা রেল আসার অপেক্ষা করে। রেল গাড়িতে কে আসবে সে কিছুই জানে না। কারও জন্য সে পথ চেয়ে নেই। কেবল একটা রেল এসে কিছুক্ষণের জন্য স্টেশনটা প্রাণময় করে তোলা এবং চলে যাওয়া স্টেশনটাকে নিঃসঙ্গ করে… এই নিঃসঙ্গতার দৃশ্যটাই আর ভালো লাগে। এর সঙ্গে তার জীবনের কোথায় যেন মিল রয়েছে।
এই নিঃসঙ্গতার অনুভব হয়তো রাহুলের ছদ্মনামী জীবনেই নির্মাণ করে নেওয়া এক আন্তরিক অবস্থা। যেখানে কেবল কবিতা থেকে কবিতায় যাত্রা…
এই নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় যে রাহুলও আক্রান্ত। এই নিঃসঙ্গতার মুক্তি চেয়ে রাহুল একদিন সিদ্ধান্ত নিল গজেন্দ্রনাথের মন্ত্রের বইয়ে পাওয়া সেই মেয়েদের ভোলানো মন্ত্রে থাকা সজারুর কাটা খুঁজে বের করার। এখন তার সেই সজারু কাঁটা চাই। কোথায় পাবে? কোথায় খুঁজবে?
সে তার বুকের রক্ত দিয়ে লিখবে চম্পা রেণ্ডির নাম।
আর বোনটা তো মরে আছেই ভেতরে। দুটো জীবনের দুটি নারী।
সে শনিবারের হাটে সপ্তাহে সপ্তাহে খুঁজে গেল– শনিবারের হাটে একজন হলেও এরকম দোকানদার একজন এসে বসে, যেখানে থাকে পূজা পার্বণের বিভিন্ন সামগ্রী–কড়ি, শঙ্খ শামুক কুশ- বন, ছোটো ছোটো মন্দিরের চূড়ায় পোতার জন্য ধার না থাকা ত্রিশূল, ঘোড়ার নাল, তুলসী মালা, কোষা-অর্ঘ্যা, হরিণের চামড়া,শক্তি পূজার জন্য লাল কাপড়, শব ঢাকার জন্য সাদা কাপড়, ধুনোদানি ইত্যাদি… রাহুলের কেবল চাই সজারুর কাঁটা। রাহুল জিজ্ঞেস করায় দোকানি বলে — আজ নেই আগামী সপ্তাহে পেতে পার।
আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত দিন আর কাটে না রাহুলের । আগামী সপ্তাহের হাটে গিয়ে দেখে — সেদিন দোকানিটা আসেইনি ¡ এভাবে সজারুর কাঁটা বিনা দিনগুলি যতই রাহুলের কাছ থেকে পার হয়ে যাচ্ছে, ততই সে কাতর হয়ে পড়েছে। একদিন বহুদিন পরে শনিবারের হাটে সে দোকানদারটিকে পেয়ে গেল। রাহুল বড়ো কোমল কণ্ঠে দোকানিকে জিজ্ঞেস করল—’ সজারুর কাঁটা এনেছেন কি?’
দোকানি খুব সুন্দর ভাবে মিথ্যা কথা বললেন, যে মিথ্যার ওপরে কোনো অভিযোগ করা যায় না। বললেন—’ না পেলাম না বাপু। তোর জন্য তিন দিন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালাম, সজারুর কাঁটা পাওয়ার আশায়। তারপর মুখের কাছে ডেকে এনে ফিসফিস করার মতো করে বলল—’ বামাখাটার শুক্র উজার কাছে পাবি।’
পরের দিন রবিবার সকালবেলা পাঁচ কিলোমিটার দূরে বামাখাটার শুক্র ওজার কাছে রাহুল এসে উপস্থিত হল। সাইকেল করে অনেককে জিজ্ঞেস করে এসে দেখল শুক্র ওজা উঠোনে একটা পিড়ি পেতে বসে আছে। খালি গা, কাঁধে পড়ে আছে একটা লাল গামছা, চেহারা খুব একটা ভালো নয়। রাহুল জিজ্ঞেস করল—‘আমি শুক্র ওজার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘আমিই শুক্র ওজা। কী দরকার বাপু ?কোথা থেকে এসেছিস?’
বাপু বলল— আমি পাঠশালা থেকে এসেছি। আমার সজারুর কাঁটা চাই।
শুক্র ওজা কিছুটা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল—কী করবি?’
বাপু মিথ্যা কথা বলল— আমার দাদুর চাই। আমার দাদুর নাম গজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কোনো একটা কাজে প্রয়োজন।
গজেন্দ্রনাথের নাম বলতেই শুক্র ওজা একটু থমকে গেলেন। তারপর বসা থেকে ওঠে ঘরের ভেতরে গেলেন এবং পুরোনো একটা মরচে ধরা টিনের বাক্স থেকে সজারুর একটা কাঁটা বের করে আনলেন। রাহুলের হাতে দিলেন। রাহুলের হাতটা শীতল হয়ে গেল।তার অস্থিরতা এবং কাতরতার সামান্য উপশম হল। আনন্দে আত্মহারা রাহুল ওজার দিকে একটা দু টাকার নোট এগিয়ে দিল। সেই দুই টাকা সে বহুদিন ধরে দশ পয়সা কুড়ি পয়সা করে সঞ্চয় করেছিল। বরপেটা রোডের ভবানী ঔষধালয় থেকে আয়ুর্বেদিক ঔষধ আনতে গিয়ে সে মাঝেমধ্যে রেলের টিকিট না কেটে সে পয়সাটা জমা করে রাখত। এভাবেই সঞ্চয় করা তার কষ্টের দুই টাকা সে আজ সঠিক কাজেই ব্যবহার করেছে।
শুক্র ওজা বলল—’ দাঁড়া বাপু, এক টাকাই রাখব। জিনিসটা গজেন্দ্রনাথের প্রয়োজন বলে।’ এই বলে ঘরের ভেতর থেকে দুটি আধুলি এনে রাহুলকে ফিরিয়ে দিলেন ।
শুক্র ওজা আধুলি দুটো ফিরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। তিনি রাহুলের একটা হাত ধরে বললেন—’ বাপু তোর ভেতরে দেখছি একটা শব দেহ আছে। আর মৃতদেহটা বাড়ছে দেখছি। কোথায় পেলি এই শবদেহ!’
ও ওটা আমার বোনের। শৈশবেই মারা গিয়েছিল। আমি তাকে আমার ভেতরে পুঁতে রেখেছি।
রাহুল বলতে চাইছিল—’ আপনি এক্সরে মেশিন নাকি?’ কিন্তু অভদ্রতা করা হবে ভেবে বলল না।
ওজা বলল— ‘যা যা, কোনো বিপদ না হলেই হল!’

রাহুল সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে শুক্র ওজার উঠোন থেকে চলে এল এবং পেডেল মেরে মেরে তার নিজের জগতের বাস্তবতায় নেমে এল। এই বাস্তব জগতের কথা সে কাউকে বলতে পারেনা। এই গোপন কথা সে কাকে বলবে? কে বুঝতে পারবে ?সে নিজেই তো বুঝতে পারে না ।সে তার এই রহস্যময় অবুঝ জগতটা দিয়ে দিল তার ছদ্মবেশীকে…
যে জগতে রাহুলের বুকে বেড়ে উঠছিল তার ছোটোবোনের ছোট্ট শবটি! সেই মৃত বোনটিকে যখন সে আর দাদা বাগানে পুঁতে রাখতে গিয়েছিল তখনই তাকে পুঁতে রাখা গর্তটি থেকে উঠে এসে সে চট করে তার বুকের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। সে অনুভব করে তার বুকে সে বেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বোনও বড়ো হচ্ছে। সে অনুভব করে— একটি মেয়ে যেভাবে বড়ো হয় ঠিক সেভাবে তারও চুলগুলি লম্বা হচ্ছে, তার বুকে ও স্পষ্ট করে বেড়ে উঠছে স্তন দুটি, তার নাভির নিচে বেড়ে চলেছে একগুচ্ছ দুব্বো ঘাস…
সবাই ভেবেছিল বোনটির মৃত্যু হয়েছে!
মনে করা হল তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যদি বোনটি বেঁচে থাকত— আমাদের মতো এই জগতে— বরুণের ঘরে লালিত পালিত হত, তাহলে?
তাহলে কী হত?
বোন আর রাহুলরা একসঙ্গে বড়ো হত না? আদর করে রাহুল তাকে জামা পরিয়ে দিত।জাইঙ্গা পরিয়ে দিত, ভাত খাইয়ে দিত, জল খাইয়ে দিত, ভাতের থালে মাছ বেছে দিত ।একসঙ্গে বাগানে আসত, স্কুলে যেত, বোনের চুলে ব্যান্ড বেঁধে দি্ত,‌ জুতো পরিয়ে দিত, বোন হাসলে সেও হাসত, বোন কাঁদলে চোখের জল মুছিয়ে দিত, চুমু খেত ,লুডু খেলতো , সব সময় তাকে জিতিয়ে দত।
একদিন বোন মেয়েদের স্কুলে পড়তে যেত। ইতস্তত করে রাহুল যেত ছেলেদের স্কুলে। একদিন বয়স দুজনেরই শত্রু হয়ে উঠত। দুজন দুজনকে ছুঁতে পারত না তথাপি দুজনেই দুজনকে মা-বাবার অজান্তে চুমু খেত। ভাইদের অজান্তে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরত ।চুমুতে ভরিয়ে দিত দুজনে দুজনের চোখ, গাল, গলা, ঠোঁট… সত্য কথা বলতে গেলে দুজনেই দুজনের প্রেমে পড়ত।একে অপরের জন্য মরতে পারত।
এখনও সেটাই হল—রাহুলের জন্য বোন মরে পড়ে রইল। কারণ ঈশ্বর জানত ওরা দুটি একসঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে না। কারণ এই ধরনের প্রেমের সম্মতি পৃথিবীতে নেই।
রাহুল ভাবে যদি বোন বেঁচে থাকত বড়ো হলে দুজনেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যেত। দুজনেই বিয়ে করত। বাচ্চা হত…
এই হল রাহুল! যার এক পাশে ঈশ্বর অন্য পাশে শয়তান। দুজনেই তার আত্মার দাম জিজ্ঞেস করে। আর সে ওপর দিকে মুখ করে বিছানায় পড়ে থাকে। রাহুল একটা বন্য স্বপ্ন দেখে…
ঈশ্বরের বিশৃঙ্খলা লেগে যায়
রাহুল একটি অন্ধ যাত্রা…
শয়তানের বিশৃঙ্খলা লেগে যায়।

(৮২)
আর একদিন শ্মশান থেকে সবাই ফিরে এসেছিল।আর যারা শ্মশানে যায়নি তারাও এসেছিল।বজালী উচ্চতর মাধ্যমিক স্কুলের মাঠ ছিল না সেটা। কেউ জানত না মাঠটাকে। এমনকি কীভাবে তারা এই মাঠটায় এসে পৌঁছেছিল সেটাও ভুলে গিয়েছিল। সবাই এসেছিল গুনামস্তি,তজো, বরুণ, শশী, অমৃতপ্রভা,গজেন্দ্রনাথ, তরুণী পিসি, বাঙর পিসি, ওপে মাসি, নতুন মা,অনন্ত মহাজন, টংকে মহাজন,সনাতন, মোহন তালুকদার,পারুল, শুক্র ওজা, জয়ন্ত এবং পঙ্কজ, মালিনী, সদামামা,রমণী শর্মা ,সতীশ শর্মা,রাধা মামা, দিগম্বর, নৃপেন শর্মা, রেন্ডি জয় মূর্তি উজ্জলের মা মিশ্র স্যার রাহুলের কথা বলে যার কথা বলা হলো আর যাওয়ার কথা বলা হল না সেই সবাই এসে ধীরে ধীরে জমায়েত হল সেই মাঠটাতে কেউ চিনতে পারল না মাঠটা সেদিনের জন্য রাহুল ভাড়ায় নিয়েছিল মাঠটা। রাহুল সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল কেবল ঈশ্বর এবং শয়তানের।। মাটিতে প্রবেশ করার রাস্তায় লাল কালিতে লেখা ছিল ঈশ্বর এবং শয়তানের প্রবেশ নিষেধ কেননা মানুষের জীবন ঈশ্বর এবং শয়তানের খেলা। এই খেলা দেখার জন্য ঈশ্বর মানুষকে দেয় রোগ শোক জড়া মৃত্যু। আর শয়তান দেয় হিংসা লুণ্ঠন অপরাধ দুর্নীতি নৃশংসতা ইত্যাদি। দুজন দুজনের শত্রু নয় দুজন একত্রিত হয়ে মানুষের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে ধ্বংস করে দিয়েছে এই ঈশ্বর এবং শয়তানের বিষ প্রবেশ না করলে মানুষ কত সুন্দর হয়ে থাকতো মানুষ মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতো দেখে দেখে মুগ্ধ হত একে অপরের জন্য হয়ে পড়ত এক একটি জীবন্ত ভাস্কর্য। কিন্তু ঈশ্বর এবং শয়তান মানুষকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে অহরল লিপ্ত হয়ে থাকে।
মানুষরা এসে এসে জমায়েত হওয়া শেষ হয়েছিল।সময়ের কোন হিসাব ছিল না ছিল না ক্ষুধা তৃষ্ণা ।ক্ষুধা তৃষ্ণা ছিল কথা বলার এবং হাসার। কেবল কথা এবং হাসির মাঠ হয়ে উঠেছিল সেটা। যেখানে সবাই একে অপরকে চেনে।।। কেউ কারও শত্রু নয়। কেউ নয় কারও মিত্র। সেখানে সম্পর্ক গুলি নেই।। বরুণ শশীর স্বামী নয়। রাহুুল নয় বরুনের ছেলে। গজেন্দ্রনাথ নয় বরুনের পিতা ।অমৃতপ্রভা নয় শশীর শাশুড়ি।
দেখা গেছে অমৃত প্রভা এবং উজ্জলের মা কি যে হাসতে হাসতে কথা বলছে। টংকে মহাজন সেখানে ল্যাংচা ল্যাংচা হাঁটছে না স্বনন্ত মহাজন বজেন্দ্রনাথের সঙ্গে উচ্চস্বরে হেসে এসে কথা বলছি দীনেশ শর্মা এবং বরুণ দুজনেই দেখছি কাঁধে ধরাধরি করে কথা বলছে গুনাহ মস্তি বরণ এর কাছে এসে বলছে তুমি আমাকে যে লাইক পোস্টে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলে কতজন মজা করেছিলাম আমরা নয় কি প্রত্যেকের জন্য একে অপরের সঙ্গে করা ব্যবহার এবং শত্রুতা গুলিকে নিয়ে হাসাহাসি করছে।
রাহুল এখন বুঝতে পারলে যে সেইসব ছিল জীবন যাপন করার মজা সে মিঠা মিঠা জীবনটাতে অনাবশ্যক কথাগুলি ভাবল। সে মিথ্যাই এতদিন ধরে কাউকে শত্রু বলে ভাবতে থাকল। সে মিথ্যাই দুটি জগতে বাস করতে গেল। অজস্র গ্রহ-নক্ষত্রের টানা হেঁচড়ার মধ্যে আসলে তার জীবন ছিলই না। তথাপি কোন কিছু না জানার জন্যই সে নিজের জীবন একটুখানি বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিল যার ফলে সে তাকে নিতে হয়েছিল একটি ছদ্মনাম। সেই ছোট্ট জীবনেরই আয়োজন এটা এখানে রাহুল লক্ষ্য করল প্রত্যেকে যেন নিজের নিজের ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে এক একটি উদাসীন চরিত্র অথচ প্রত্যেকেই একের প্রতি অপরের মায়া জন্মাচ্ছে সে দেখছে প্রত্যেকেই একে অপরকে স্পর্শ করে দেখছে আর ছুঁয়ে দেখি যেন হাসি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে মানুষগুলি। অশ্রুর স্থান নেই।অনুতাপের স্থান নেই ঈশ্বর এতদিন কারো ঠোঁটে আসতে না পারা হাসিিতে হাসছেে আজ মানুষগুলি। রাহুল ব্যস্ত হয়ে এপার থেকে ওপারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে সবাইকে ডেকে চলেছে।কারন সেই ছিল এই হাসির অনুষ্ঠানের আয়োজক।
মানুষগুলি দেখছিল মাঠের এক কোণে শুয়ে রয়েছে একটি যুবতী কিন্তু কেউ তাকে চিনতে পারছে না প্রত্যেকেই ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দেখতে শুরু করল গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটি না কেউ চিনতে পারল না প্রত্যেকেই রাহুলকে জিজ্ঞেস করল শুয়ে থাকা মেয়েটি কে
রাহুল বলল না সে শুয়ে নেই সে মারা গেছে এটি আমার সেই জন্মের কিছুদিন পরে মরে যাওয়া ছোট বোন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার ঘন্টা বেজে উঠল।
অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল।

সংলগ্ন:

শৈশব

(১)
শৈশব
একটা উই-ঢিবি ছিল সেখানে।
আর পাশে ছিল বাঁশ গাছের পরিবাররা,প্রৌঢ় পুরুষরা ছিল
ভলুকা বাঁশ,আর জাতি বাঁশগুলি ছিল ওদের সুন্দরী সুন্দরী স্ত্রীরা
যার আঁচলে ধরেছিল বিজুলী বাঁশগুলি,
যেন ওদের ছেলে-মেয়েরা।
আমরাও খেলেছিলাম ওদের ডালে ডালে পাতায় পাতায় ছায়ায় ছায়ায়
ওদের সঙ্গে দেখে ভলুকা বাঁশগুলি আমাদের দিকে তাকিয়ে গোঙ্গাচ্ছিল।
আর আমার সবচেয়ে আদরের বোনটি ছিল উঁইয়ের ঢিবিতে বসে
যার বুকে দুটি স্তনের চিহ্ন ছিল।
(২)
আনারসের ঝোপে ছিল বড়ো বড়ো সাপগুলি আর
হাতে ছিল আমাদের ছোটো ছোটো লাঠি
লোম পর্যন্ত শিহরণ নিয়ে বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।চিবোচ্ছিলাম
সবুজ গন্ধ আর টেঙেচি পাতা।বিছানাটা ছিল
বাঁশের চাঙ দিয়ে তৈরি।স্বপ্নগুলি ছিল বালিশের নিচেও বন্য।
একটা লম্বা দরজা না থাকা পুরোনো আলমারি শ্লেট-পেন্সিলগুলির কাছে
যেখানে আমি যত্ন করে রেখেছিলাম চকচকে ছোটো ছোটো পাথরগুলি,ভাঙ্গা ছেঁড়া এবং
বেঁকে থাকা স্বপ্নগুলি।
গলে যাওয়া স্বপ্ন একটার নিচে
কখনও পিতা আমাকে মেরেছিল,আশ মিটিয়ে।আর আমাদের
আর আমাদের পিঠে দাগ বয়ে গিয়েছিল অপ্রেমের।
দুপুরের মাঠে মাঠে
অন্য পুরোটাই যেন ছিল আনন্দ
নরা কাটছিলাম,আর স্তূপগুলিতে খুঁড়ছিলাম হলদে খোড়ল
যেখানে আমাদের ছোটো ছোটো শরীরগুলি মৈ্থুনের ভঙ্গি নিয়েছিল,
আর আমরা পেয়ারার মতো গন্ধ করছিলাম।
(৩)
আর একদিন দাদু আমাকে পরিয়েছিল
দুঃখের রঙের একটি ধুতি।হাতে একটা মশাল নিয়ে
একঝাঁক ফোঁপানি ভেদ করে মায়ের শবের পেছন পেছন গিয়েছিলাম।
মৃত ডোবাটার পাশে ছিল শ্মশানটা।মায়ের বিছানা ছিল না।
সেটা ছিল আমার যন্ত্রণার প্রথম দীর্ঘ দিন
কেন না আগুনের মাঝখান থেকে আমাকে দেখে মা ফিরে আসতে চেয়েছিল,
বাবাকে দেখে নয়।আর দুর্ভাগা হাতদুটি
জড়িয়ে ধরেছিল দাদুর শুভ্র বাহু।

(৪)
আর আমি ভালোবাসতাম চুমু খেতে বুড়ো মানুষের ঠোঁট আর
নাকগুলি।যা দাদুর কপাল এবং গালের রেখাগুলিতে
ছড়িয়ে পড়েছিল।কালো চাকর একটা আমাকে দেখিয়েছিল
কাপড় খুলে তার নাভির নিচ দিয়ে নেমে যাওয়া আরণ্যক পথ।
তারই কোনো রাতে বিধবা রঙের এক যুবতি তার না পোহানো
রাতগুলিতে আমাকে চুষেছিল। আর আমি
ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম কাঁচা মাংসের শুভ্র স্তন আর তার
কৃ্ষ্ণবর্ণ অন্ধকার কল্লোল।

এভাবেই নানা বর্ণের একটুকরো আলোর মধ্যে
দয়াহীন পাঠশালা,পুরোনো বইয়ের স্তূপ এবং আরশোলার মধ্যে
বিবর্ণ হওয়া স্বপ্ন এবং ভালো না লাগা খেলাগুলির মধ্যে
একটা গাছের মতো দীর্ঘ হয়ে উঠছিলাম।সবুজ থেকে
হলুদ পর্যন্ত এই পথটুকু আমি যেন দ্রুত পার হয়ে নিশ্বাস নিয়েছিলাম
যন্ত্রণার বক্ররেখাগুলিতে।
সেই সবুজ কথাবার্তার দুপুরবেলা এবং বিকেলগুলির
শুকনো মুগা রঙের স্তূপগুলি অতিক্রম করে এখন আমি এক
গন্তব্যহীন পথিকের মতো কোথাও যাচ্ছি। আমার নিয়তি
সবুজ আপাদমস্তক জামা পড়ে বিচরণ করছে আমার শৈশবে।
আর আমি যে গান নিজে রচনা করেছি সেই গান ভবিষ্যতিন শরীরের।

এবং এক টুকরো শৈশব

উরুর একটা ব্যাধি থেকে আমাকে
বাঁচিয়েছিল নাকি কালো এক টুকরো পাথর
যে বেলপাতা তুলসী এবং অপরাজিতা ফুলে নীল হওয়া
একটি তামার কাঁসিতে নেমে ধূপধুনোর গন্ধ এবং শঙ্খ ঘন্টাধ্বনির
ঘুরপাকের নিচে স্নান করেছিল দুধ দিয়ে।
বাঁচিয়েছিল নাকি আমাকে কালো সেই পাথরের টুকরো, রোগশয্যার মধ্যে
পাকা চাপড়ার যুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিলাম যাকে, প্যান্টের পকেটে
খামচে ধরেছিলাম যার অলৌকিকতা!
ছিল নাকি একদিন আমার সঙ্গে অভিমানে শুয়ে
সেই টুকরো পাথরে ভাঁড়ার ঘরে!কুচকুচে
কুচকুচে কালো সেই শালগ্রাম শিলা এখন কোথায়

আর আমাকে তৃতীয় চোখ দানের জন্য আয়োজিত উৎসবের ভূমিকা ছিল
সেই কালো পাথরের টুকরোকে স্নান করিয়ে নেমে আসা দাদুর
কাাশ বুকের ছায়া। হোমের আগুনে পোড়া আমার গাল এবং
ধোঁয়ায় বের করা আমার চোখের ঝরনা মুছে দিতে পারছিল না ঠাকুরমা।
ভিক্ষাং দেহি… হাঁটু গেড়ে ফুঁপিয়ে উঠেছিলাম
যখন মহিলাদের দলের মধ্যে জেনেছিলাম নাকি কোন নারী
আমার ভবিষ্যৎ! সাদা কাপড়ের চার দেওয়ালের মধ্যে মুখস্ত করেছিলাম
মহাপৃথিবীর প্রশস্তি মন্ত্র যাকে আমি বহন করে নিয়েছিলাম কোনো নারীর
কর্ণকুহরে।কমন্ডলু এবং সমিধের ডাল নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় উঠোন
পার হয়েছিলাম সন্ন্যাসের লক্ষ্মণরেখা।জ্বলজ্বল করছিলাম আমি
ঝলমল করছিলাম উপবীত পরে স্বপ্নের আমি হতে পেরে…
কে আমাকে ফিরিয়ে এনেছিল কে
মাটির শয্যায় শুয়ে সেই রাতে দেখেছিলাম স্বপ্নে
আমার তৃতীয় চোখের গভীরে সাপের অরণ্য

আমার ফুলের মতো কোমল হাতে দড়ি পরতে পেয়ে কাজলী
চেটেছিল আমার হাত। মুগী শিঙে গুঁতিয়েছিল আমাকে।
সেই খাইয়েছিল দুধরাজ সাপ এবং আমাকে দুধের ফেনা।
বুকের ঘাস থেকে কেটে দিয়েছিল ওদের সবুজ, এবং দানের পাত্রে
চোখের নুন লবণাক্ত করেছিল ওদের দীর্ঘ জিভ।
কাছিমের খোলস পরা খসে পরা চালের গোয়ালঘর ছিল
যেন লাল নীল স্বপ্নের গজিয়ে উঠা গুঞ্জন
যে অদৃশ্য হয়েছিল সেই নিঃসঙ্গ জরা টকপাতা গাছের কাজল ছায়ায়
যেখানে কেউ রূপকথার একটা দানো পুষেছিল

ভাঁড়ারটা ছিল গোবর মাটিতে লেপা
আর সেখানে বিরাজ করছিল সবচেয়ে রহস্যময় ছায়া।
ধানের শুঙ এবং ধুলোর উষ্ণতায় পরিপূর্ণ আমার শৈশব
আঙুলে ভর দিয়ে উঠেছিল ভাঁড়ারে।
টুকড়িতে টুকড়িতে তুলে দিয়েছিলাম ঠাকুরমার মাথায়
অজন্ম শোক এবং ক্ষুধার আনন্দ,
রোদে মেলে দিয়ে তাকে ঝেড়েছিল ঠাকুরমা। আর ইঁদুরের মতো
গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে ঢুকে গিয়েছিলাম ধানের মধ্যে
আর উঠে এসেছিলাম হলদে একটা ধানের মাঠ হয়ে।
কী উৎসব ছিল সেটা সকালের কোমল বাহুতে উদযাপিত…

নদী ছিল না। একটা মৃত খালের পারে পারে চিৎকার করে দৌড়েছিলাম
বামি মাছের গর্তে পাক খাচ্ছিল ঠান্ডা জল, যা স্বপ্নে
আমার বালিশের মধ্য দিয়ে বয়ে যেত। দারিকণা বাঁচিয়েছিলাম আমার বুকে
আর মরা মাছের গন্ধ শুঁকেছিল কে আমার ঠোঁটে!
কচু পাতার খোলায় নিয়ে বেড়িয়েছিলাম কলজের টোপ
নক্সা কাটা মাছের জন্য।
ভেসে যাবার জন্য নদী ছিল না আমার আঙ্গুল থেকে কাগজের নৌকা,
কেবল মৃত খাল ডোবা এবং কচুরিপানার পুকুরে
আমার বুকের জল ছিল পাক খেয়ে

যখন দেবতার মতো গন্ধ নিয়ে পিতার চোখ জ্বলছিল
লুকোচুরির লিচু গাছ থেকে খসে পড়েছিলাম। আর
শিরশিরানি ঘিরে থাকা মানকচুর ঝোপ ছিল শেষ আশ্রয়।
খডগুলিও ঢাকতে পারছিল না আমাদের,
দাদুর ধুতির আঁচলটাও, আলমারির পেছনদিক
আর বিছানার ভেজা তলাও, চোখের জল এবং
অনাহার ফ্যাকাসে মুখগুলিও…
হেলে দুলে আস্তাকুঁড়ে
যেখানে যেতে পারত না পিতার দুই পা

বেঁকা হয়ে যাওয়া পঙ্গু মৃগী ক্ষতবিক্ষত করা পঙ্গু পিসি
যার ঋতুস্রাব মুছে দিতে হত ঠাকুরমাকে, সেই গভীর রহস্যের
মধ্য দিয়ে দৌড়েছিলাম কাঁঠাল পাতার চরকিতে বাতাস ঘুরিয়ে।
ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল একজন বৈদ্য
হরণ করে নেবার জন্য আমার বুকের অনামী ব্যথা, যার জন্য
এতগুলি আকণ পাতা অকারণে পুড়ে মরে ছিল!
আর বুড়ো গোলাপ গাছটা, যার সুগন্ধি ছায়ার নিচে
মাতাল ছিলাম আমরা— বাসস্থান গড়েছিল কার্শলা সাপগুলি
কিন্তু ব্রাহ্মি শাকের তেতোয় গড়া আমাদের মগজ ধরে এনেছিল
নিম গাছের জন্য কপৌ ফুলগুলি, যা আমার দুপুরবেলায় আর লাগল না

তামার পাত্রে জল খেয়ে আমার নিয়তি
কেন ঘুরে বেড়ায় কেন ঘুরে বেড়ায় আমার শৈশবে আমার খোঁজে
শরীরের সুন্দর পথে গিয়ে আমি যে
একটা আয়নার ভেতরে বাস করছি
ও নিয়তি আমার, খুঁজে পাবেনা তুমি যে আমার কোন ছায়া

চোর

সুপারির বাগানে পিতা ধরেছিল তাকে
আর আমাদের চিৎকারের পারে পারে
ছোটো ছোটো বেতের তালে তালে ফুঁপিয়ে উঠেছিল সে (অভিনয়ের চোখ কচলে)
পিতার ফুলে উঠা গর্বিত বুকের বাষ্পে আমরাও
শক্তিমান হয়ে উঠেছিলাম সেদিন, তাকে হাতে পায়ে বেঁধেছিলাম
শনিবারের হাটে। এটাই তার নির্দিষ্ট শাস্তি—
সারা দুপুর সেই জ্বলজ্বল করে পাকা সুপারির থোকা গুলিতে।

প্রাচীন চোর সে
তার খসখসে ত্বকের ভাঁজে বেতের দাগ সুপ্ত।
সুপারির পাতায় পাতায় পাখির চেয়েও দ্রুত বেগে লাফিয়ে বেড়ায় সে ।
জল আনা টিন লোটা ঘটি দা আর কখন ও বা কারুর
একটা ধবধবে ধুতি তার জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখের লক্ষ্য।
আর কী মোহময় দৃশ্য যখন বাগানে বাগানে জনগণ তেড়ে যাওয়ায়
লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যায় সে বেড়ার পরে বেড়া
ডোবার পরে ডোবা… উদ্বেল হয়ে উড়ে যায়
তার ধুতি সবুজ ভেদ করে ছিঁড়ে… কীভাবে জ্বল জ্বল করতে করতে
অদৃশ্য হয়ে যায় ঘর্মাক্ত মাংসপেশী… রহস্যময় আনন্দের
জোয়ার তুলে আমাদের শরীর আর মনে।
এভাবেই আপন হয়ে উঠে সে। আমাদের সমগ্র গ্রামের সমস্ত গৃহস্থ গাছ লতা বন
অপেক্ষা করে থাকে,
উদগ্রীব, অন্ধকারে খুঁজে তার তেজস্বী আগমন


আর সে দিগন্তে হাসে
ফ্যাকাশে হনূ বের হওয়া স্থিতপ্রজ্ঞ রেখায় অঙ্কিত তার মুখটা দিয়ে।
আমার ছোট্ট সবুজ জগতে হয়ে পড়ে সেই
সবচেয়ে রহস্যতম প্রাণী তার বন্য জীবন নিয়ে।
আর সে শুষেছিল নাকি আমাকেও তার আদি মুদ্রায়
কেননা দাদুর বালিশের নিচ থেকে চুরি করে আমি
বিড়ি দিয়েছিলাম তাকে…

ধূলিসাৎ
আমার অতীতের পোড়ো বাড়ি এখন কংক্রিট
পাথর ইটের গাছপালা কাঁচের পাতায় নিঃশ্বাস নেয়
এই আয়নার
অরণ্যে হারিয়ে গেল কোথায় হারিয়ে গেল কোথায়
সেই রহস্যতম প্রাচীন প্রাণী আমার।
খুঁজে বেড়াই আমি সে চুরি করুক আমার খাবার টেবিল থেকে লোহার আপেলগুলিকে
ব্রোঞ্জের আঙ্গুর গুলিকে মাংস ছুরিটাকে এবং আমার ফ্রিজ থেকে
সাদা ঠাণ্ডা হাসি গুলিকে…
কিন্তু সে যে কেবল আমার স্বপ্নে চুপি চুপি নঙলা খোলে

*একসময়ের পাঠশালা অঞ্চলের বিখ্যাত চোর গুণামন্তির স্মরণে।

নীলিম কুমার
কখন কীভাবে তিনি আমার কাছে এসেছিলেন জানি না
তাঁর নাম নীলিম কুমার
এত কাতরভাবে তিনি আমার
হাত দুটি চেয়েছিলেন
আমার ঠোঁট দুটি চেয়েছিলেন যে

আমি তাকে আমার হাতদুটি দিয়ে দিয়েছিলাম
আমার ঠোঁট দুটি দিয়ে দিয়েছিলাম
সেই হাতে তিনি
কবিতা লেখেন আগুনকে আলিঙ্গণ করেন
সেই ঠোঁট দিয়ে তিনি
চুমু খান এবং শিস বাজিয়ে বেড়ান

মানুষের দিকে তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন
তিনি আলিঙ্গণ করতে চান চুমু খেতে চান মানুষকে
তিনি মানুষ
মানুষের সমস্ত সদভ্যাস এবং বদভ্যাস তিনি লালন করেন
তিনি লালন করেন মানুষের সমস্ত আলো এবং অন্ধকার

তিনি পুরুষের মধ্যে পুরুষকে খোঁজেন
নারীর মধ্যে নারীকে চান
তিনি চান পৃ্থিবীর স্বাভাবিক রং
তিনি জেদি অহঙ্কারি
ক্রোধী নিয়ম না মানা
প্রবল স্পর্শকাতর
যন্ত্রণাবিলাসী
তাঁর এক ঘৃণ্য জীবন
প্রেম বয়ে নিয়ে বেড়ানোয় তাঁর বুকে
এক টুকরো ঘা

তিনি আমাকে প্রায়ই ফেলে রেখে চলে যান
মানুষের ঘরে ঘরে উঠোনে উঠোনে
দোকানে দোকানে বাজারে বাজারে
গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে তিনি ঘুরে বেড়ান
তিনি যেন এক নির্বাসিত আগুনে পোড়া মানুষ
ক্ষুধা পেলে তিনি আমার কাছে আসেন
তৃষ্ণা পেলে তিনি আমার কাছে আসেন
বুকের সেই ঘাটুকুর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি
আমার কাছে আসেন
আমার তাকে ভাত খাইয়ে দিতে হয়
কাপড় পরিয়ে দিতে হয় আর
আমার বুকের বিছানায় ঘুম পারানি গান গেয়ে শুইয়ে রাখতে হয়

তার বিনিময়ে
তিনি আমার জীবনের কবিতা লেখেন

আসলে তিনি তাঁর জীবনের কবিতাই লেখেন
কিন্তু যা লেখেন সেই সমস্ত কিছু আমার জীবনের কথা

কখন কীভাবে তিনি আমার কাছে এসেছিলেন জানিনা
তিনি এখন তোমাদের কাছে ও এসেছেন
তিনি চাইছেন তোমাদের হাতগুলি তাঁর
হাতের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে
তোমাদের ঠোঁট গুলি তাঁর ঠোঁটে লাগানোর জন্য
দেখো কত কাতর ভাবে তিনি তোমাদের সামনে অপেক্ষা করছেন
তিনি নীলিম কুমার

শৈশবে

শৈশবে মা বাবাকে আমরা কখনও
বড়ো বিরক্ত করেছিলাম
তখন তারা বলেছিলেন—
‘তুই এখনই মরে যাস না কেন’
আর আমি
তখনই মরে গিয়েছিলাম

মা-বাবা জানল না যে
এতদিনে তাঁরা
লালন-পালন করল
আমার শবটাকে!

একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা (২৫তম পর্ব) // নীলিম কুমার II অসমিয়া থেকে অনুবাদ: বাসুদেব দাস

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top