পিঞ্জর (পর্ব ২) // অমৃতা প্রীতম, অনুবাদ: জাভেদ ইকবাল

অধ্যায় ২

একদিন সুতলী-বোনা পিঁড়িতে বসে, পুরো’র মা তার ছোট্ট ছেলেকে স্তন্যপান করাচ্ছিল। পুরো তখন পালংশাক রাঁধবে বলে ঠিক করলো। শাকের কচি কচি পাতা বেছে নিয়ে, ওগুলো হাতে ছিঁড়ে, ছোট ছোট টুকরো করলো; পানিতে দুইবার ভালো করে ধুয়ে নিলো। এরপর মোটা সুতোর দলাপাকানো একটা মাজুনি দিয়ে ও রান্নার পাত্রটা ধুয়ে নিয়ে, পালংশাক আর সাথে ছোলার ডাল চাপিয়ে দিলো। তারপর, জ্বাল মধ্যম আঁচে রেখে, পাত্রটা কানায় কানায় মটরশুঁটি ঢেলে ভরে ফেললো। কিছুক্ষণ পর পুরো আরো কিছু জ্বালানী চুলোর মধ্যে ঠেলে দিলো।
মেয়ের বিয়ের ক্ষণ একেবারে ঘনিয়ে এসেছে। কি সুন্দর, আর কি কাজের মেয়ে তার পুরো! উঠোনে চলতে-ফিরতেই কত কত কাজ যে মেয়েটা সেরে ফেলে। পুরো’র সখীরা ইশারা-ইঙ্গিতে বলতো- ‘ওর যৌবনও তো ভরে ভরে উঠছে!’ মেয়ের ফর্সা মুখটা থেকে মায়ের চোখ সরতে চায় না। ওর মা ওকে আকুতি নিয়ে, স্নেহভরা দু’চোখ ভরে দেখে নেয়। হয়তো মা মনে মনে ভাবছিল, মেয়ে যে এখন শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। তখন মায়ের ঘর খাঁ খাঁ করবে। পুরো ওর মায়ের ডান হাত হয়ে উঠেছিল; খুব বেশি চেষ্টা কিংবা কষ্ট না করেও, পুরো রান্নাবান্না করে ঘরদোর গুছিয়ে রাখতে শিখে গিয়েছিল। পুরো’র মা দেখলো, মেয়ে তার রান্নার কাজে ব্যস্ত। বুক মথিত করে, দুই ঠোঁট কাঁপিয়ে, মায়ের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কয়েকদিনের মধ্যে তার এই মেয়ে অন্যের বাড়িতে চলে যাবে, মেয়েটা পরের হয়ে যাবে। বাড়িটা তখন একেবারে খাঁ খাঁ করবে, চিন্তা করতেই তার চোখ অশ্রু ছলছল করে ওঠে। পুরোর মা, গ্রামদেশে মেয়ে বিদায়ের প্রচলিত একটা মাতম গেয়ে ওঠে:

মা’রে, আমায় বুকে জড়িয়ে ধর
দিতে পারিস্ শুধু একটা উত্তর?
গল্প ফাঁদিস না
বল না আমায় মা-
রাতের কালে, ‘বিদায়’ যদি দিবিই আমায়
তবে তোর গর্ভে কেন ধরেছিলি?

আবেগে বাকরুদ্ধ মা ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। এরপর নিজেকে একটু বশে এনে আবারো কাঁপা কাঁপা গলায় গাইতে শুরু করে-

সুতো কাটার চরকা আছে, সাদা তুলোর আঁটি,
নকশা কেটে বুনে নেবো বিছানা চাদর বাটী।
ছেলেরা পাবে ঘরদোর আর প্রাসাদ অট্টালিকা,
মেয়েরা যাবে নির্বাসনে, দূর পরদেশে একা!

পুরো আবেগতাড়িত হয়ে, ছুটে গিয়ে ওর মায়ের হাঁটুর কাছে আছড়ে পড়ে। কান্নায় দু’জনে ভাসাভাসি হয়।

উঠোনময় বিকালের ছায়া দীর্ঘতর হতে থাকে। পুরো’র মা’র মনে আসে যে, ঘরে আজ একটামাত্র সবজী রান্না হয়েছে, আর পুরো’র বাগদত্তের বাড়ি থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে কেউ যদি এসে পড়ে, তাহলে বিব্রতকর অবস্থা হবে। মা তাই পুরোকে ছোটবোনের হাত ধরে ক্ষেতে গিয়ে দু’মুঠো ভেন্ডি তুলে আনতে বললো। আর সেই সাথে পায়েশ রান্নার জন্য, একমুঠো চালের সাথে দুধ-গুড় মিশিয়ে চুলোয় চড়িয়ে দিতে বললো।

পুরো’র কেমন জানি অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি হয়; তবু ছোট বোনদের একজনকে সাথে নিয়ে ও ক্ষেতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। অন্যমনস্ক পুরো কয়েক মুঠো ভেন্ডি আর লাল বরবটি তুলে বোনকে নিয়ে বাড়িমুখে রওনা দেয়। ফিরতে ফিরতে পুরো’র মনে উদয় হয় যে, বিয়ের পর সে তার মা, তার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাবে; বোনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, তুলতুলে ছোট্ট ভাইকে ছেড়ে দূরে চলে যাবে। আচমকা, একটা ভয় জেগে ওঠার মতো পুরোর মনে হয়, রশিদের সাথে তার যদি দেখা হয়ে যায়, তো! ভয়ে পুরো’র পায়ের গতি বেড়ে যায়। ছোটবোন পুরো’র জোরে হাঁটার সাথে তাল রাখতে না পেরে, চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে: ‘দৌড়াচ্ছো কেন পুরো?’ মেয়েটা রূদ্ধশ্বাসে পুরো’র সাথে তাল মেলাবার চেষ্টা করে হাঁফিয়ে ওঠে।

এমন সময়ে পুরো’র পিছন দিক থেকে একটা ঘোড়া, ক্ষুরের আওয়াজ তুলে দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসতে থাকে। পুরো তখনো আলপথ থেকে হাঁটা পথে নেমে আসতে পারেনি- আচমকা সে বুঝতে পারে, ঘোড়া অথবা ঘোড়-সওয়ারির সাথে তার ডান কাঁধে জোরালো একটা ধাক্কা লেগে গেল। পুরো পড়েই যাচ্ছিল, এর মধ্যে কে যেন তার কাঁধ ধরে বসলো। পরমুহুর্তে ওর শরীরটা শূন্যে একটা পাক খেলো, পুরো টের পেলো- শক্ত একটা হাত ওকে পেঁচিয়ে শূন্যে তুলে ফেলছে। এরপর পুরো নিজেকে ঘোড়ার পিঠের ওপর উপুড়-শোয়া অবস্থায় আবিষ্কার করলো…. ওর বোন পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে কাঁপতে লাগলো।

ঘোড়সওয়ার উড়তে উড়তে ছাত্তোয়ানি গ্রামের মাঠ-ঘাটের মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে চললো। আর বাঁচার জন্য পুরো’র চিৎকার ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠলো, একসময় সেই আর্তচিৎকার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

পুরো জানে না ঘোড়াটা কোথা থেকে উদয় হয়েছিল, ঘোড়ার সওয়ারী-ই বা কে ছিল, কিংবা ওকে কতদূর, কোথায় নিয়ে যাওয়া হলো; না কিচ্ছু না। পুরো একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। যখন ওর জ্ঞান ফিরলো, পুরো নিজেকে একটা চারপাইয়ের ওপর শোয়া অবস্থায় আবিষ্কার করলো। মুহুর্তের মধ্যে ওর সবকিছু মনে পড়ে গেল। সে চারপাই থেকে উঠে, দেয়ালে মাথা খুটতে লাগলো, আর যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়ে পড়লো দুই হাতে দরোজার ওপর আঘাতের পর আঘাত করে গেল। ব্যথা, যন্ত্রণা নিয়ে সে চারপাইয়ের উপর আছড়ে পড়ে আবার বেহুশ হয়ে গেল।

এরপর যখন পুরো’র হুশ ফিরলো, কেউ যেন তখন ওর কপালে গরম ঘি মালিশ করছে। এক মুহর্তের জন্য মনে হলো যে, ওর বালিশের পাশে বসে ওর মা মাথা ডলে দিচ্ছে। যন্ত্রণামথিত এক কান্না ওর বুক চিরে বেরিয়ে আসলো, ‘আম্মা!’
পুরো’র গায়ে প্রচন্ড জ্বর চলে এসেছে। ‘আমার অপরাধ ক্ষমা করো! একবার হুশে ফিরে আমার সাথে কথা বলো!’ ওর পাশ থেকে একটা কন্ঠস্বর বলে উঠলো। জ্বরগ্রস্থ পুরো মাথাটা উঁচু করলো, দেখলো- রশিদ ওর শিয়রে বসে। আর অমনি এক চিৎকার দিয়ে, তৃতীয়বারের মতো সে জ্ঞান হারিয়ে চারপাইয়ের ওপর পড়ে গেল।

পুরো ওর চেতনাহীনতায় একটা স্বপ্ন দেখতে থাকলো: যে, একটা গুহায় ও আটকা পড়েছে, একটা কালো ভাল্লুক তার বড়বড় নখ দিয়ে ওর চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। ভয়ে তার আকৃতি কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসছে, আর ভাল্লুক বড় থেকে আরো বড় হচ্ছে। এরপর ভাল্লুকটা পুরোকে তার লোমশ বুকে আলিঙ্গনবদ্ধ করে নিলো।

পুরো আস্তে আস্তে করে চোখ মেললো, ঘরের ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকালো। কে যেন ওর পায়ের তলায় হাতের তালু দিয়ে ঘষঁছে। লোকটা ওর কাঁধ টিপে দিলো, আর ঝিনুক ভরে ভরে পানি ওর দুই ঠোঁটের মধ্যে ঢেলে দিলো। আচ্ছা, এটা কি ভাল্লুকের গুহা, নাকি রশিদের ঘর?

পুরো’র বাবা-মা-ভাই-বোন সবার কথা মনে আসে; কিন্তু ওর মনে হতে থাকে যে, এই ভালুকটার কাছে সে অনেক অনেক বছর ধরে আটকা পড়ে আছে; রশিদের সুরত দেখতে দেখতে ওর যেন অভ্যেস হয়ে গেছে। রশিদও পুরোকে কিছু বলে না; না পুরো রশিদকে কিছুর জন্য ডাকে। তার মাথা ব্যথা করতে থাকে, ঘুরাতে থাকে।নীল হয়ে যাওয়া পুরো’র মুখের মধ্যে রশিদ এক চামচ গরম ঘি, গুড়ের সাথে মিশিয়ে ঢেলে দিলো। পুরো একটুখানি মুখে টেনে নিলো, বাকিটা থু করে ফেলে দিলো। এরপর সে আচমকা উঠে পড়ে, চারপায়ের সাথের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলো; জিজ্ঞেস করলো, ‘আমি এখন কোথায়?’
‘আমার সাথে,’ তাৎক্ষণিক এক সহজ উত্তর পাওয়া গেল। রশিদ কাঠের ছোট একটা পিঁড়ি নিয়ে চারপাইয়ের সামনে বসে আছে। চোখ মাটিতে নামিয়ে নিয়েছে সে, আগের কয়েকবারের মতো পুরো’র চোখে চোখ রাখার সাহস এই মুহুর্তে তার নেই।
‘আমাকে তুমি এখানে কেন নিয়ে এসেছো?’ সাহস করে, জোর গলায় পুরো জিজ্ঞাসা করলো।
‘এর উত্তর তোমাকে পরে দেবো,’ বলে দরোজা হাট করে খোলা রেখে, রশিদ ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।
পুরো তাকিয়ে দেখলো, সামনে একটা উঠোন, তারপর আরেকটা ঘর। ঐ ঘরটার ভিতর দিয়ে বাইরের রাস্তায় উঠে পড়ার একটা দরজা। চারপাই ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো পুরো; ওর দুই পা কাঁপছে, পৃথিবী টলে টলে উঠছে। ঐ অবস্থার মধ্যেও সে ঘুরে-ফিরে চারদিক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো; ঘরের দেয়ালগুলোও হাত দিয়ে পরীক্ষা করলো। ওর ভয় হতে লাগলো যে, দেয়াল ফুঁড়ে এক্ষুনি কেউ একজন বেরিয়ে এসে ওকে চারপাইয়ের সাথে ঠেসে-চেপে ধরবে। কিন্তু শেষমেষ দেয়াল থেকে কেউ বেরিয়ে আসে না। একটু পর, সাহস করে সে উঠোনে এসে পড়লো; এক কোনায় ছাই স্তুপ করে রাখা, তার পাশে একটা তাওয়া, একটা কাঁসার পাত্র, আরেকটা কড়াই। দেয়ালের কুলুঙ্গিতে পানির একটা কলসি। বাড়িতে অন্য কোনো জীবনের চিহ্ন নেই।
জড়, দ্বিধাগ্রস্থ পায়ে পুরো বাইরে যাওয়ার সদর দরোজার কাছে গেল। দরজাটা যেন তার কিসমতের মতো শক্ত হয়ে আটকানো ছিল। মনের মধ্যে সবটুকু সাহস, শরীরের সবটুকু শক্তি এক করে সে দরোজার ওপর ওর মাথাটা রাখলো, দুই হাত দিয়ে দরোজার ওপর আছড়ে পড়ে আঘাত করতে শুরু করলো। কিন্তু দরজা সেই অনড়, অক্ষত থাকলো; দরোজার ওপর জোরালো আঘাতের শব্দও কারোর কানে পৌঁছালো না। দরোজার ছোট চিড় দিয়েও সে উঁকি মারলো, বিশাল ফাঁকা জায়গা তার নজরে পড়লো। কিন্তু কোনো বাড়িঘর, দোকানপাট, হাট-বাজার, কুঁড়েঘর, এমকি জীবনের কোনো চিহ্নও কোথাও চোখে পড়লো না। পুরো’র কান্নায়, অশ্রুজলে ভাসাভাসিতে, বেদনাতুর মুখের ওপর দরজাটা জগদ্দল অনড় হয়ে থাকলো। সে জামার এক কোনা দিয়ে চোখের পানি মুছলো, মুখ মুছলো, আর উল্টো ঘুরে কুলুঙ্গির কাছে গেল। এরপর এক হাতের তালুতে কিছুটা পানি ঢেলে নিয়ে, চোখে-মুখে ছিটালো।
এমন সময় বাইরে থেকে সদর দরজা খুলে গেল। রশিদ ভেতরে ঢুকে পড়ে খিল আটকে দিলো। এরপর দরোজায় দুই দুইটা তালা মেরে দিল।
‘পুরো, কেন এতো সময় ধরে শরীরের শক্তি নষ্ট করছো? তারচেয়ে ভিতরে এসে কিছু খেয়ে নাও। দুইদিন হয়ে গেল, তোমার পেটে কোনো দানাপানি পড়েনি,’ রশিদ বললো। সে শুধু কথাগুলোই বললো; পুরো’র হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যাবার কোনো চেষ্টা করলো না। এমনকি কামপরবশত হয়েও তার দিকে তাকালো না।
‘রশিদ, তুমি দয়া করো! আমাকে আমার পরিবারের কাছে নিয়ে চলো!’ এই আর্তি জানিয়ে পুরো রশিদের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে, পা জড়িয়ে ধরে।
রশিদ পুরোকে তার শক্তপোক্ত দুই হাত দিয়ে তুলে দাঁড় করায়। এরপর সে পুরোকে কষে নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে নিয়ে বললো, ‘তাহলে আমার অন্তরের আগুন কে নেভাবে, শুনি?’ হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করা পুরোকে রশিদ শক্তভাবে নিজ আলিঙ্গনে ধরে রাখে। পুরো যতোভাবেই নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো না কেন, কোনোভাবেই রশিদের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হতে পারলো না।
দিনটা পার হয়ে গেল, পার হলো রাতও। সদর দরোজাও তালাবন্ধ হয়ে থাকলো; প্রহরীর মতো রশিদ সেই বন্ধ দরজা আগলে রাখলো। কয়েকদিন পর থেকে রশিদ পুরোকে তারাজ¦লা ভোরে একবার, আর রাত নামার মুহুর্তে, গোধূলিলগ্নে আরেকবার কিছুক্ষণের জন্য বাইরে হাঁটিয়ে আনতো। রশিদ নিজে মাঝেমধ্যে ঘন্টা, দুই ঘন্টার জন্য বাইরে থেকে ঘুরে আসতো। এই সময়ে পুরো খেয়াল করে দেখলো যে, এই কুঁড়েঘরটা বিশাল একটা ফল বাগানের মধ্যে অবস্থিত। সেখানে আর কোনো বাড়িঘর নেই। কুঁড়েঘরটা সম্ভবত বাগানের মালির থাকার জন্য বানানো হয়েছে। তবে সে কাউকে ফলের বা গাছগাছালি’র যতœ নিতে দেখলো না।
পুরোর দিনগুলো দীর্ঘ হয়ে উঠলো, রাতগুলো সীমাহীন, অতল। অবশ্য একটা ব্যাপারে সে রশিদের কাছে মনে মনে কৃতজ্ঞ ছিল যে, রশিদ এখনো পর্যন্ত তাকে কটু কিংবা খারাপ কোনো কথা বলেনি, তার সম্ভ্রমে এতটুকু আঁচ লাগতে দেয়নি। তার সম্ভ্রম অকলুষিত, কলঙ্কহীন ছিল। পুরো’র এই কয়দিনের অনুনয়-বিনয়, সানুনয় প্রার্থনা রশিদ যেমন কানে তোলেনি, তেমনি পুরো’র এত এত অভিশাপকে, শাপ-শাপান্তকেও রশিদ কোনো পাত্তা দেয়নি, আমলে নেয়নি।
পুরো’র নিজের মতো করা হিসাবমতে, টানা একপক্ষকাল সে বন্দিদশা পার করে ফেলেছে।
একদিন রশিদ একটা উজ্জ্বল, লালরঙা রেশমের জোড়া পুরো’র চোখের সামনে এনে ধরলো। এর আগে অবশ্য রশিদ তাকেবদলে পরার জন্য দুই জোড়া সুতি পোশাক এনে দিয়েছে। এবার রশিদ বিয়ের রেশমী জোড়া হাতে ধরে, কোনো ভনিতা ছাড়াই স্পষ্ট করে বললো, ‘কাল সকালে গোছল করে সাফসুত্র হয়ে, তুমি এই জোড়া পরে নেবে; একজন মৌলভী এসে আমাদের নিকাহ করিয়ে যাবে। ঠিকঠাক তৈরি হয়ে নিও।’
পুরো’র মন ধক করে ওঠে; এখনো পর্যন্ত যা ঘটেনি, তাও কি শেষমেষ ঘটে যাবে?
এই কথায় সে রশিদের পায়ে পড়ে আবারো ওকে ছেড়ে দেবার আকুতি জানায়। কিন্তু রশিদ অনড় থাকে, ‘পুরো, তোমার এই অনুনয়-বিনয়ে বিন্দুমাত্র লাভ হবে না। আমাকে এমন অনুভ‚তি দিয়ো না, যেন আমি কোনো মানুষ খুন করে বসেছি। আল্লাহ-পাকের কসম কেটে বলছি, তুমি যে সারাদিন ধরে কাঁদো আমার তা মোটেই সহ্য হয় না, কষ্ট লাগে,’ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রশিদ বলে। পুরো বুঝে উঠতে পারে না যে, রশিদ যদি এমন মেহেরবানই হয়, তাহলে সে কেন তার মাথার ওপর এই মুসিবত নিয়ে আসলো?
‘তোমার আল্লাহ’র নাম নিয়ে তুমি বলো, আমার সাথে এমন কেন করলে তুমি?’ পুরো জানতে চায়।
‘পুরো, তোমার সাথে আমার এই কাজটা অনেকটা লেন-দেনের মতো,’ রশিদ সাধাসিধা উত্তর করে। ‘কিন্তু তুমি এসব নিয়ে ভেবে ভেবে কষ্ট পাচ্ছো কেন? যা হবার তা তো হয়ে গিয়েছে। আমি ওয়াদা করছি, সারাজীবন তোমাকে কোনো কষ্ট দেবো না; তোমার আর একটা কোনো ক্ষতি হবে না, আঁচড় লাগবে না।’ পুরো হয়রান, পেরেশান হয়ে পড়ে; এ কেমন লোক?
এরপর খানিকটা থেমে রশিদ বললো, ‘তুমি কি জানো আমাদের শেখ বংশ আর তোমাদের সাহা বংশ, আমার দাদা-পরদাদার আমল থেকে বিবাদে জড়িয়ে আছে? আমার দাদা আমাদের বংশীয় ভিটেবাড়ি তোমার দাদার কাছে বন্ধক রেখে, চক্রবৃদ্ধি সুদে পাঁচশো রুপি টাকা ধার দিয়েছিল। তা, সেই ধার আমরা শোধও করতে পারিনি, বাড়িটাও বন্ধকী থেকে ছাড়াতে পারিনি। তোমার দাদা ক্ষিপ্ত হয়ে, লোকজন নিয়ে আমাদের বাড়ির ওপর আক্রমণ চালালো, আর আমাদের সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। ব্যস, আমরা বাস্তুহারা হয়ে গেলাম। ঘটনার কিন্তু ওখানেই শেষ নয়। তোমার দাদার লোকেরা আমাদের বাড়ির মহিলাদের মুখের ওপর বিশ্রি বিশ্রি, যাচ্ছে-না-তাই সব কথা বলতো; আর তোমার কাকা তো সবার চাইতে এককাঠি এগিয়ে গেল- আমার বাবার বোন, মানে আমার ফুফুকে তোমার কাকা তুলে নিয়ে গিয়ে তার বাড়িতে তিন তিনটা রাত আটকে রাখলো। তোমার দাদা কিন্তু এসবকিছুই জানতেন!
‘শেখদের অবস্থা তখন একগোছা আখের মতো, যার থেকে সাহা’রা সব রস নিংড়ে-শুয়ে নিয়েছে। পরিবারের সবাই ভয়ানক কান্না কেঁদেছে, রক্ত-কান্না; আর এই জুলুম সহ্য করে গিয়েছে। আমার দাদা তার ছেলেদের, মানে আমার বাপ-চাচাদের কোরআন শরীফ ছুঁইয়ে ওয়াদা করিয়েছিলেন যে, তারা এই অপমানের বদলা নেবেই নেবে। এখন, আমরা যখন তোমার বিয়ের পাকা খবর জানতে পারলাম, কিভাবে প্রতিশোধটা শুধে নেওয়া যায়, সে নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হলো। চাচারা আমাকে বেছে নিলেন; তারা কোরআন ছুঁইয়ে আমাকে কসম কাটালেন যে, আমি সাহাদের মেয়ের এই বিয়ে হওয়ার আগেই তাকে অপহরণ করবো।’
অসহায় পুরো হাল ছেড়ে দিয়ে, আলুথালু হয়ে পড়ে তার নিয়তির গল্প শুনলো। রশিদ বলে গেল: ‘আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, প্রথম যেদিন তোমাকে দেখলাম, সত্যি সত্যি তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছি। শেখদের প্ররোচনা আর আমার ভালোবাসাই এ কাজ করতে আমাকে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমি কসম কেটে বলছি, আমি তোমাকে এতোটা দুঃখী দেখে সহ্য করতে পারছি না।’
পুরো তার দুই হাত মাথার ওপর রাখে; এরপর বলে, ‘আমার কাকা তোমার পিসীকে অপহরণ করেছিল, ঠিক আছে, কিন্তু তাতে আমার দোষটা কোথায়? আমি কি দোষটা করেছি? তুমি আমাকে বাপ-মা হারা, বাস্তুহারা অসহায় এক মেয়ে বানিয়ে দিলে?’ বলে সে দুই হাতের মধ্যে মাথাটা গুঁজে নেয়, কান্নায় ভাসাভাসি হতে থাকে ওর চোখ-মুখ।
‘চাচাদেরও আমি ঠিক এই কথাই বলেছিলাম; কিন্তু চাচারা আমাকে দারুণ উপহাস করলেন।’
আর ওদের প্ররোচনায়, ষড়যন্ত্রে তুমি আমার প্রানটা কেড়ে নিলে!’ ক্রন্দনরত পুরো চিৎকার করে ওঠে।
‘পুরো, আমি এই তামাম দুনিয়াকে তোমার পায়ের কাছে এনে দেবো,’ আবেগমথিত কন্ঠে রশিদ বলে ওঠে, ‘যদ্দিন আমার এই দেহে প্রাণ আছে, আমি তোমাকে ভালোবেসে যাবো। তোমার কাকা আমার ফুফু’র সাথে যে আচরণটা করেছিল, আমি কখনোই তোমার সাথে তা করবো না। তিনরাত ঘরে রেখে, ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো না।’
‘রশিদ, আমাকে একবার হলেও আমার মায়ের সাথে দেখা করতে দাও!’
‘ওরে বোকা মেয়ে, ঐ বাড়িতে এখন তোমার আর কোনো স্থান নেই! তোমাকে যদি তোমার পরিবার একটা বারের জন্যও বাড়িতে ঢুকতে দেয়, তাহলে তোমাদের হিন্দু আত্মীয়-স্বজন আর পরিচিতজনেরা একজনও কেউ তোমাদের বাড়ির জল স্পর্শ করবে না। আর সেখানে তুমি আমার সাথে এখানে আছো পনের দিন হলো।’
‘আমিতো শুধু তোমার দেওয়া খাবার আর পানি খেয়েছি মাত্র, আমি….’ পুরো বাকিটুকু আর কথায় ফুটিয়ে তুলতে পারে না। তবে, পুরো কি বোঝাতে চেয়েছিল রশিদ তা বুঝে নেয়।
‘কে তোমার কথা বিশ্বাস করবে? এ তো আমার ভালোমানুষি যে, আমি আগে তোমাকে শাদী করবো আর তারপর….’ রশিদ একটু অস্বস্তি নিয়ে, নরম চোখে পুরো’র মুখের দিকে তাকায়।
পুরো’র তার বাগদত্ত রামচন্দ্রের কথা মনে পড়ে। নিজের বিয়ে কেমন হবে, কিভাবে হবে, তা নিয়ে তার মনে কত কত যে ছবি আঁকা ছিল! হলুদ বাটা ওর অঙ্গে মাখানো হবে, তেলে গোছল করিয়ে সাজাতে বসানো হবে, দু’হাতে হাতির দাঁতের একগাদা, লাল লাল শাখাচুড়ি পরানো হবে। কড়ি-ঝিনুকের রেশমী ঝালর দুই কব্জিতে বাঁধা হবে। খাঁটি রেশমের জোড়া পরবে সে, এরপর পালকি চড়ে রামচন্দ্রের বাড়িতে গমন করবে। সে হবে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নববধূ, আর তারপর….
‘আমার অসহায় বাবা-মা কি ভয়ানক উদ্বেগের মধ্যে সময় যে পার করছে!’ শেষমেশ পুরো নীরবতা ভাঙ্গলো।
গলায় আলাদা কোনো কোমলতা কিংবা করুণা না ঢেলে রশিদ বললো, ‘আমার মনে হয় ওনারা কান্নাকাটি করে করে একইরকম ভাবে বুক চাপড়ে আর্তনাদ করে করে সময়টা কাটিয়েছেন, যেমনটা আমার ফুফুকে অপহরণের পর আমার দাদা-চাচারা করেছিল।’ এরপর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে রশিদ বলে চলে: ‘পুলিশ তোমাকে তালাশ করে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কোনোপ্রকার সূত্র পাচ্ছে না বলে তোমাদের পরিবারকে জানিয়েছে। তা, পুলিশ কিছু জানবে কিভাবে? পুলিশকে তো আমরা গুনে গুনে পাঁচশো রুপি দিয়েছি। সবকিছু এখন আমাদের হাতে; এখানকার বেশিরভাগ গ্রামবাসী মুসলমান, কোনো শালার হিন্দু আমাদের দিকে চোখ তুলেও তাকাবে না। ওরা বরং নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে, কেননা এখনো ওদের জানামাল, সম্পদ নিরাপদে আছে। ওরা খুব ভালো করেই জানে যে, ধড়ের ওপর মাথাটা আস্ত রাখতে হলে, ওদের মুখ বুজে চুপচাপ থাকাই ভালো।’ রশিদের কন্ঠে ঝাঁঝ, তিক্ততা, রুক্ষতা চলে আসে। মনে হয়, ওর ভেতরে প্রতিশোধের পুরোনো আগুন পুরোপুরি নেভেনি, কোথায় যেন ধিক ধিক করে জ্বলে আছে।
রশিদের কথা শুনে পুরো’র মনটা ঘৃণায় ভরে ওঠে। লোকটা তাকে তার জন্মের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে, তার ভবিষ্যতকে চুরমার করে দিয়েছে। পুরোর বাবা-মা সম্ভবত ওকে ফিরে পাবার সকল আশা ছেড়ে দিয়ে, গ্রাম ছেড়ে হয়তো অন্যত্র চলে গিয়েছে।
‘আমার বাবা-মা কি সিয়ামে চলে গিয়েছে?’ শান্তস্বরে পুরো জানতে চায়।
‘না, এখনো যায় নি।’
‘আমার গ্রাম থেকে কত দূরে আছি আমরা?’
‘বেশি দূরে না; তোমার গ্রামের পিছন দিকে মাধোকিয়া’র কুয়োর কাছে, আমার বাগানের মধ্যে আছো। কিন্তু গ্রামে ফিরে যাবার কথা স্বপ্নেও এনো না। বিষয়টা একটু ঠান্ডা হোক, সব মীমাংসা হয়ে যাক, ছয়টা মাস অন্তত কাটুক, তখন আমিই তোমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাবো,’ বলে রশিদ হাসতে থাকে; পুরো চুপসে চুপ হয়ে যায়।

পিঞ্জর (পর্ব ১) // অমৃতা প্রীতম, অনুবাদ: জাভেদ ইকবাল

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top