কাওড়ামঙ্গল (পর্ব ২) II রোমেল রহমান

সিনানে যাইতে কন্যা সখিসঙ্গে আসে,
তোমারে দেখিয়া কন্যা মনরঙ্গে ভাসে!

সুবোধ রান্নায় ব্যস্ত।  চুলোয় হাড়ি।  পেছন থেকে ৪/৫ জন মেয়ের একটা দল এসে সুবোধকে নাড়ায়।এর মধ্যে একটা বিশেষ মেয়ে আছে যার নাম অঞ্জনা।  অঞ্জনার স্বামী বিবাগী হয়েছে।ফেরে না ঘরে।অঞ্জনার সঙ্গে সুবোধের একটা চিকন ভালবাসবাসি আছে।  তারা চোখাচুখি করে।অন্য মেয়েরা রসিকতা করতে থাকে,

তরুণী ১ : কি রান্তিছো তুমরা?

সুবোধ লাফিয়ে উঠে পিছনে তাকিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খায়। অন্য মেয়েরা হেসে লুটিয়ে পড়ে।  অন্য একজন বলে ওঠে,

তরুণী ২ : এ বিটা গেলো বচ্ছর আইলো সেই বিটা না?

তরুণী ৩ : সেরামই তো লাগতেছে।তয় শুকোয় গেইছে। ঘুম হয় না মনে কয় স্বপ্নদোষে তাই না?

সবাই হেসে ওঠে।  অঞ্জনা ধমক দিয়ে বলে।

অঞ্জনা : তা কি রান্তিছো দেহি?

সুবোধ : চিংড়ে দিয়ে কচুর ঘোন্ট আর ভাত।খায়ে যাও তুমরা, টেস্‌ লাগবেনে হেভি।

তরুণী ৩ : তা সব কচু তুমরা খায়ে ফেলালি শুয়োর খাবেনে কী?

সুবোধ আহত হয়।আহত স্বরে বলে,

সুবোধ : তা যে দেশে যে ফল বেশি সেই দেশে আইসে সেই ফলই তো রাইন্দে খাবো, নাকি?

তরুণী ১ : ওরে এই কাব্রা বিটা কি ভুদাই নিকি? কচুরে ফল কচ্চে। হি হি হি…!

সবাই হল্লা করে হাসে।  সুবোধ বোকা হয়ে যায়।  তার কাছে রাক্ষুসির মতন নির্মম মনে হয় এই মেয়েগুলোকে! মেয়েদের মধ্যে একজন ঝুকে এসে একটা শিল্লুক বলে,

তরুণী ২ :

আলে খাটো বালে খাটো ফর্সা বিটার মুখ
বিটি বিটি দেখতি বিটার নাই খালি বুক।
কও দিনি জিনিসটা খিডা? নাকি লোকটা খিডা?

সবাই হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে।  সুবোধ অসহায় হয়ে পড়ে।  অঞ্জনা কপট ধমক দেয়।

অঞ্জনা : হেঁই চল দিনি।উনার পিছনে লাইগে লাভ নেই, তরকারি পুইড়ে যাচ্ছে টের পাচ্ছিসনে?

মেয়েগুলো হাসতে হাসতে এগিয়ে যায়।সুবোধ তাদের পেছন দিকে তাকিয়ে থাকে পিপাসা নিয়ে। অঞ্জনা ঘুরে তাকায়। সুবোধ তাকিয়ে থাকে। তাদের বোবা চোখ কি বলে তা আপাতত টের পাওয়া যায় না, তবে তারা হয়তো টের পায় এই কল্লোলের মধ্যে চোখে চোখ রাখার নীরব প্রতীক।

শান্তি তোমার পায়ের ঘুঙ্গুর
সুখ মাজার বিছা,
কখন খুলিয়া পড়ে
দংশে কাঁকড়াবিছা।

সন্ধ্যায় পাল নিয়ে ফেরে কাওড়ারা।  যেখানে বাথান দেবে সেখানে এনে জড়ো করে।  পাল গুছিয়ে যে যার মতন গোছগাছ করতে থাকে।  সুবোধ খাবার দেয় থালে থালে। হরিপদ, দিনেশ ভাতের থালা নিয়ে এক পাশে বসে গোগ্রাসে গিলতে থাকে, কাঁচা মরিচ কামড়ে কামড়ে।  অন্য দিকে একটা মর্দা শূকর একটা মাদির পিছন শুঁকছে।  দিপেন মনোযোগ দিয়ে এই দৃশ্য দেখতে থাকে।  সুবোধ ভাত বাড়তে বাড়তে একা একা বকবক করতে থাকে।

সুবোধ : এদিকি কলাম ভালো খাবার আছে তাই না সর্দার?

মঙ্গল তাকায় ঘাড় ঘুরিয়ে কিন্তু কিছু বলে না।

সুবোধ : লোকজনও ভালো।তয় এট্টু খুঁচা মারার অভ্যেস আছে।

হরিপদ : তুই খুঁচা খাইছির নাকি?

সুবোধ : আমারে আবার খুঁচাবে খিডা?

হরিপদ : খুঁচাতি পারে।একা ছিলিস! দেখতি শুনটি তো খারাপ না তুই।

দিপেন এগিয়ে আসে মঙ্গলের কাছে।হাঁটু মুড়ে বসে মঙ্গলের কানের কাছে বলে…

দিপেন : কাকা কয়ডা শুয়োর কিরাম জানি করতেছে।

শঙ্কিত মঙ্গল জিজ্ঞেস করে,

মঙ্গল : কিরাম?

দিপেন : গা কাপ্তেছে মনে হচ্ছে।

মঙ্গল : তাপ কিরাম গায়ে।

দিপেন : এহনো সিরাম ঠ্যাকলো না।

মঙ্গল : কই চল্‌ দিনি।

দিপেন : মাঠের থে কিছু লাগিছে নিকি? এহেনের বিলডায় কিরাম জানি এট্টা ভয় ভয় ঘিরাণ।

মঙ্গল : চল্‌ আগে দেইখে নিই।

তোমার মূরতি দেইখ্যা অন্ধকার যায়,
কিন্তু তোমার দেখা সবাই কি পায়?

ভোরে দুটো মরা শুয়োরের পাশে চিন্তিত চোখমুখ নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় মঙ্গল আর দিপেনকে।একটা বদনা নিয়ে বাগানের দিক থেকে হেঁটে এগিয়ে আসে দিনেশ। মঙ্গল সর্দার ঝিম মেরে থাকে।

মঙ্গল :  আর কোন শুয়োরের মধ্যি এরাম ঝামেলা দেখিছিস?

দিপেন : না কাকা।

মঙ্গল : ভালোয় ভালোয় কাটলি হয় অল্পে।

দিপেন : হয়।

মঙ্গল : আচ্ছা খেয়াল রাখ।  ঝামেলা দেখলিই কবি। হেঁই হরিপদ?

হরিপদ জামা পড়তে পড়তে এগিয়ে আসে। টের পায় সর্দারের মেজাজ খারাপ।

হরিপদ : কিরাম যন্ত্রণা হলো কও দিনি সর্দার কাকা? পাল ন্যে নামতি না নামতিই এরাম হল?

মঙ্গল :  শোন, তুই তো সদাই কিনতি বাজারে যাইস! এট্টু খোঁজ নিবি আজকেরে, এই এলাকায় আনন্দ ঠাকুরের পাল ঢোকেছে নাকি।যদি খবর পাইস আছে তালি চইলে যাবি ঠাকুরের কাছে, আমার পেন্নাম কবি।

দিপেন : ঠাকুর কি মন্তর দেবে কাকা?

মঙ্গল : দেহা যাক।তার দর্শন পাওয়াই তো ভাগ্যের।

দিপেন : আনন্দ ঠাকুরের পালের এট্টা মর্দা নিতি পাল্লি কলাম হেভি হতো!

হরিপদ : সে কি আর আমাগের মহাজনের বুদ্ধিতে আছে? ঠাকুরের পালের ছাউ লোকে দাম দ্যে ন্যে যায়।

মঙ্গল : হ্যে দিপেন,  মরা দুইডেরে পুইতে ফেলা।

দিপেন : কাকা এট্টু বাড়ি যাতি পাল্লি ভালো হতো।  দাদনে টাকা নিইলাম বিয়ের সময় তার কিস্তি…

হরিপদ দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে মুখ হাতে ঢেকে বেরিয়ে যায়।  মঙ্গল চরম বিরক্তি নিয়ে তাকায় দিপেনের দিকে।  দিপেন আমতা আমতা স্বরে বলে,

দিপেন : না লাগবে না, এম্নি কচ্ছিলাম।

মরা শুয়োর দুটোর ঠ্যাং জোড়া ধরে টেনে সরিয়ে নিয়ে যায় দিপেন।

জবানে চাবানো কথা মধুময় বিষ
কানে গেলে কামনার লোমে ওঠে শিস।

সকালে কাওড়া পাড়ার মেয়ে বউয়েরা পুকুর ঘাটে রসিকতায় মজেছে কালিকে নিয়ে। নীলে বিধবার সাদা থান পরা। দুজন কোমর জলে দাঁড়ানো।একজন পায়ের গোড়ালি মাজছে। কোলে কাপড় নিয়ে কয়েজকজন ঘাটে বসা, গুল নিচ্ছে। কালি কাঁসার থাল বাসন মেজে ঝকঝকে করার কসরতে মগ্ন, তার শরীরের কাঁপনের দিকে তাকিয়ে আছে নীলে! এক কিশোরী সাতার দিচ্ছে। তখন নীলে বলে ওঠে,

নীলে : দেখি লো নতুন মাগী তোর কাপড় খসা দিনি।দেখি তোর মাই দুডো, দিপেন ঠাকুরপো কী কইরে থুইয়ে গেইছে।

কালি লজ্জায় গুটিয়ে যায় আচমকা।কিন্তু ভালও লাগে।

কেতু : এহন কিরাম ভ্যাদা সাইজে রইছে মাগীডা।ভাতার ঘরে থাকলি কলকল করতি থাহে।কেডা যে কারে ঠাপায়।

সবাই হো হো স্বরে হেসে ওঠে।কালি লজ্জায় ঘন হয়ে যায়।

কেতু : তা তোর ভাতার যাবার সময় কী কয়ে গেইল ক দিনি? আমারডার তো আর ফেরার নাম নেই।ফেরবে ক্যান? শুয়োরই তো সংসার তার।

কালির মুখে শঙ্কার ছাপ ফুটে ওঠে।

নীলে : মর্দা পুষতি না জানলি সে মর্দা ঘরে ফেরে না।

কেতু : তা-ই হবে।

উদাস হয়ে যায় কেতু। তার দিকে তাকায় নীলে।ব্যাপারটা খেয়াল করে নারায়ণী বলে ওঠে,

নারায়ণী : তা নতুন বউ তোর বুক দুইডে তো ম্যালা ছোট রে।  বিয়ের আগে কেউ কচলাইনি?

কালি এবার হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে পড়ে।  অন্য মহিলারাও অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

নারায়ণী : এ মাই দিয়ে ভাতার বাইন্ধে রাখপি কিরাম কইরে? দেখিস আবার অন্য কোন মাগীর ওলান চোষপে।

সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় এই বাক্য গুলোয়।দিপালি বিরক্ত হয়ে বলে বসে,

দিপালি : হ্যাঁ রে নারাণী, মুখে তোর এতো বিষ ক্যান রে? এট্টুখান বাচ্চা মাইয়ে আমাগের নতুন বউ তারে এমন কথা দিয়ে কাটতি হয়?

নারায়ণী পাল্টা বলে বসে : তোমার এতো লাগে ক্যান? তোমার মাই দুডো তো ছোট না।

মুহূর্তে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ে।নারায়ণী জলে ঝাঁপ দেয়।কালিও হেসে দেয়।

কেতু শুধু উদাস চোখে দূরে তাকিয়ে থাকে।

জমিনে পাখির বীজ বৃক্ষ হইলে পরে,
মানুষ মালিক হইতে রক্তারক্তি করে।

বিলে শুয়োর চরাচ্ছে মঙ্গলের দল।  দূরে রাস্তায় একটা বাইক থামে।  বাইকে তিনজন। মাঝখানে বসা যিনি সামান্য চাপদাঁড়ি মুখে।নতুন পয়সাওয়ালা।এই জমি কিনেছেন।বাইক চালাচ্ছে পাতলা টাইপ এক লোক।  পেছনের জন মুষ্ক মতন।বডি গার্ড। হাত ইশারায় ডাক দেয় মঙ্গলকে।

বাইক চালক :  হেঁই কাওরাগের লিডার খিডা এহেনে?

দূর থেকে মঙ্গল হাত উঁচু করে এগিয়ে আসতে থাকে।

বডি গার্ড :  তুরা যে এহেনে শুয়োর চরাচ্ছিস তার পারমিশন নিছিস?

মঙ্গল এগিয়ে আসতে আসতে বলে,

মঙ্গল : বাপ ঠাকুরদার আমলের থে প্রতি বচ্ছরই তো খাওয়াই দাদা, আগে তো পারমিশন লাগিনি।

বাইক চালক : হেঁই কাওড়ার বাচ্চা মুখেমুখে তর্ক? নাপাক পশু নিয়ে কারবার করিস আবার কথা কইস?

বডি গার্ড : এই জমি বিক্কির হয়ে গেইছে।এহন উনি মালিক উনার জমিতে শুয়োর চরানো যাবে না।

মঙ্গল : জমিতে কি বাবু মালাউন আর মিয়া লেহা থাহে? এরাও ভগবানের জীব, নামায় যহন ফেলিছি আজকেরে খাক?

বডি গার্ড লোকটা, মালিক এবং বাইক চালকের দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে!

বডি গার্ড : এ বিটা ঘ্যাঁচড়া আছে।আপ্নারা বাজারে যাইয়ে বসতি লাগেন, আমি চোদন দিয়ে আসতিছি।

বাইকে অন্য দুজন চলে যায়।বডি গার্ড লোকটা নেমে আসে রাস্তা থেকে বিলে,  মঙ্গলের সামনে। সন্ত্রস্ত মঙ্গল বিনয়ের সুরে বলে : দাদা নামায় ফেলিছি যহন আজকেরে এট্টু ক্ষমা দেন? অসহায় জীব এরা।

বডি গার্ড : আছো কয়দিন ইদিকে?

মঙ্গল : আছি দাদা যেই কয়দিন ভালো খাবার পাবো মাটিতে।

বডি গার্ড : আমার এট্টা উপকার করা লাগবে।দাম দেবো ভয় নেই।তায় জিনিসটা ভালো হওয়া লাগবে।

মঙ্গল বুঝে ফেলে লোকটার চাহিদা! কাওড়া, বেদে এইসব সম্প্রদায়ের কাছে এরা আসে গোপনে। বিশেষ গাছড়া, ওষুধের জন্য মুলামুলি করে। মঙ্গল শক্তি ফিরে পেয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি আঁকে।

মঙ্গল : ওষুধ লাগবে?

বডি গার্ড : হয়।  ভালো জিনিস হওয়া লাগবে।  এক ফোঁটা খালি যাতে অনেকক্ষণ খাড়ায় থাহে। তোমরা তো তুকতাক, কবিরাজি করো।

মঙ্গল : দাদা কি বিয়ে করিছেন?

বডি গার্ড : তা দ্যে দরকার কি?

মঙ্গল : ওষুধ দেবো তো তাই

বডি গার্ড : বউ থাহে বাড়ি।এম্নি মেয়েছেলে আছে কয়ডা।তাগে কাছে যাই।  ব্যস্ত মানুষ সাহেবের বডি গার্ড বোঝ না?

মঙ্গল : আচ্ছা।হবেনে।

বডি গার্ড : আস্পো কবে?

মঙ্গল : দুই তিনদিন পর আসেন।ইদিকেই থাকপানি।

বডি গার্ড : মাল যেন ভালো হয়?

মঙ্গল : নাম্বে নানে সহজে।

বডি গার্ড : হে হে।  আজকের মতন চড়াও এই মাঠে। আমি সাহেবরে ম্যানেজ দিবানি!

দিপেন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,

দিপেন : কী কয়ে গেলো কাকা?

মঙ্গল : ধোন!

দিপেন বিব্রত হয়ে যায়।

দিপেন : কাকা শুয়োর তো আরও কয়ডা কাপ্তেছে।

মঙ্গল : কইস কী?

দিপেন : হয়।মনে হচ্ছে মরবে।

মঙ্গল দ্রুত এগিয়ে যায় অসুস্থ শুয়োর গুলোর কাছে। হরিপদকে ডাক দেয়।

মঙ্গল : হরি… হেঁই হরি

হরিপদ দৌড় আসে।

মঙ্গল : খোঁজ কর আনন্দ ঠাকুর আছে কই। যদি পাইস তালি আমার পেন্নাম দিয়ে নিয়াস্পি।পালে অসুখ লাগিছে জানাবি। অসুখ ছাড়াতি না পারলি সব শেষ।

হরিপদ বেরিয়ে যায় ব্যস্ত।

কাওড়ামঙ্গল (পর্ব ১) II রোমেল রহমান

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top