প্রাণে গুলে যাওয়া রঙ । ফণীশ্বরনাথ রেণু ।। মূল হিন্দি থেকে অনুবাদ : সফিকুন্নবী সামাদী

শৈশবের মধুময় স্মৃতি, নীল আকাশে উড়ন্ত রঙবেরঙের ঘুড়ি এবং মনমোহন রঙিন খেলনার আকর্ষণকে আমি জেনেশুনেই ছেড়ে দিই। সেইসব দিনে আমি স্বয়ং কতজনের রঙিন আশা আর কল্পনার কেন্দ্র ছিলাম।
মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে যেদিন শরীরবিজ্ঞানের প্রথম লেকচার শুনে ফিরি, আমার চোখের সামনে সাত রঙ নাচতে শুরু করে। আর যেদিন এমবিবিএস ডিগ্রী পেয়ে যাই, সার্জিক্যাল ওয়ার্ডের হাউজ সার্জন হয়ে নিজের ডিউটি রুমে চার্জ নেবার জন্য যাচ্ছিলাম, খলবল করা আমার পরিচিত অনিন্দ্য সুন্দরী নার্স মিস চ্যাটার্জি এসে প্রথমবার সম্বোধন করে, ‘হ্যালো! ডক্টর…!!’ তখন আমি অভ্যাস এবং স্বভাবশত ওকে একটা বড় চিমটি কেটে উচ্চকণ্ঠে হাসবার চেষ্টায়ও গম্ভীর হয়ে যাই। তখন আমি আর এক বেপরোয়া স্টুডেন্ট নেই, ডাক্তারের দায়িত্বপূর্ণ পদ পেয়েছি যে! আমার ঠোঁটে গম্ভীর হাসি দেখে সে আমার হৃদয়ের গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারপর আমি তার সদাপ্রসন্ন মুখমণ্ডলে কখনোই সেই সতেজতা, সেই রঙ দেখতে পাইনি। ধীরে ধীরে সে শুকিয়ে যায়, কালো হয়ে যায়। আমি সবকিছু স্মরণ করেও, সবকিছু বুঝেও নিজেকে ভুলাতে থাকি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে উইমেন হসপিটালের ১২ নম্বর বেডে পড়ে পড়ে, নার্সদের দিয়ে ‘কেবল এক বার’ দেখে যাবার সংবাদ পাঠাতে থাকে; কিন্তু আমি যাবার আগ্রহও প্রকাশ করিনি। আমি যাইনি, কিন্তু নিরাশ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবার সময় তার ওষ্ঠে যে ঘৃণা আঁকা থাকতে পারে, সেই ঘৃণাপূর্ণ হাসির কল্পনা আমি অবশ্যই করতে পারি। যখন যখন তার কল্পনা করি, আমার চেহারায় আত্মগ্লানির কালো তুলি দৌড়ে যায়।
হাউজ সার্জনের মেয়াদ সমাপ্ত করে বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে আমার পূজনীয়া মাতা জীবনযাত্রা শেষ করে ফেলেন। তাঁর মুখে ওষুধ দূরে থাক, এক ফোঁটা পানিও দিতে পারিনি। পিতা তো আমাকে দেড় বছর বয়সে মায়ের কোলে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অগম, অগোচর ভগবানকে যে শ্রদ্ধা এবং ভক্তিতে পূজা করা হয়, সেই শ্রদ্ধা এবং ভক্তিতে আমি তাঁর পূজা করতাম। কিন্তু তাঁর জন্য কখনো গলা ফাটিয়ে কাঁদিনি। মাতৃহীন হবার পর আমি বুঝতে পারি যে মায়ের স্নেহাঞ্চলের ছায়ায় সমস্ত দুনিয়া রঙিন মনে হত আর এখন দুনিয়ার সমস্ত রঙ মরুভূমির সাদায় পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

নিজের গ্রামকে, নিজের ঘরকে ছাড়বার কল্পনাতেই আমার প্রাণ ফেটে যায়। গ্রামে জীবন কাটাচ্ছিলাম এবং আমার ‘মাতৃ-ঔষধালয়’ও চলছিল। ম্যালেরিয়া এবং কলেরার সময় মুমূর্ষু প্রাণীদের মধ্যে সামান্য দুয়েক ব্যক্তিকেও মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে আমি আমার শিক্ষাকে সফল মনে করতাম। গ্রামের প্রতিষ্ঠিত জমিদার শ্রী কেদারনাথ ঠাকুর আমার প্রতি খুব প্রসন্ন ছিলেন, তাঁর গৃহিণী আমাকে নিজের পুত্র ঘনশ্যামের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। ঔষধালয়ের আকর্ষণ, জমিদার দম্পতির স্নেহ আর গ্রামের মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আমার হৃদয়ের ঘা শুকাচ্ছিল। একদিন যখন জমিদার দম্পতি আমাকে আদরযত্ন করে খাইয়ে-দাইয়ে একান্ত এক কক্ষে নিয়ে নিজেদের মনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন, আমার মাথা ঘুরতে থাকে। জমিদার মশাই বলছিলেন আমি যেন তার বিধবা ভ্রাতৃবধূর একমাত্র প্রিয় পুত্র ভোলানাথকে বিষপ্রয়োগে মেরে ফেলি। তার সামান্য জ্বর হয়েছে, এইতো সুযোগ। জমিদার মশাইয়ের ছোট ভাই ছিলেন বদ্রীনাথ ঠাকুর, যাঁর মৃত্যুর রহস্যও তিনি বলেন। ‘মাফ করবেন, ছি ছি’ বলে আমি পাগলের মতো চিৎকার করে তাঁর সেই কক্ষ থেকে দৌড়ে চলে এসেছিলাম। সেদিন থেকে লাগাতার কয়েক রাত, সমস্ত রাত জেগে, আমি জমিদার মশাইয়ের দোতলা বাড়ির জানালার রঙিন কাচের দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই কক্ষে আলো জ্বলতে থাকে আর আমার মনে হয়, ‘অসহায় ভোলার জীবন-প্রদীপ জ্বলছে।’ যেদিন বিধবা তার প্রিয় অসুস্থ পুত্রকে নিয়ে মায়ের বাড়ি চলে যায়, সেই রাতে আমি আনন্দে বিভোর হয়ে ঘুমাই, কিন্তু স্বপ্নেও ওইসব রঙিন কাচ থেকে ছেনে বেরিয়ে আসা আলো দেখতে থাকি।
জমিদার মশাই আমাকে এবং আমার মাতৃ-ঔষধালয়কে মুছে দেবার জন্য কোমর বেঁধে লেগেছিলেন। গরিব রোগী ঔষধালয়ে আসবার সাহস করবে কী করে? রোগীর আসা-যাওয়া একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাধিয়ার মা জমিদার মশাইয়ের পরোয়া না করে রাধিয়াকে ইনজেকশন দেয়াবার জন্য অবশ্যই পৌঁছে যেত। রাধিয়ার মাকে আমি বুদ্ধি হবার পর থেকেই চিনতাম। এই রঙিন দুনিয়াতে এসে মায়ের কোলের আগে তার কোলেই আমি আশ্রয় পেয়েছিলাম, একথা শতবার শুনিয়েছে আমাকে। রাধিয়ার মা আমাদের পরিবারের কাজের লোক ছিল, কিন্তু আমি তাকে চাচি ডাকতাম। কলেজে আমার যখনই বাড়ির কথা মনে পড়ত, চোখের সামনে দুটি মূর্তি নেচে যেত, একটি আমার মায়ের আরেকটি চাচির (রাধিয়ার মায়ের)। এই দুখিনী বিধবা হয়ে গিয়েছে, তার একমাত্র কন্যা রাধিয়াও যুবতী হতে হতেই বিধবা হয়ে গেছে, কিন্তু আমার জন্য তো সে সেই চাচি। রাধিয়ার ‘প্লিহা’ হয়েছিল। চিকিৎসায় সে যখন পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে যায়, একদিন তার মা দৌড়ে এসে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলে, ‘দেখো লাল্লা! এরা সবাই পানিতে আগুন লাগাচ্ছে। বংশের লোক আর গ্রামের মানুষের পঞ্চায়েত বসেছিল, পঞ্চায়েত রাধিয়ার ওপর দোষারোপ করেছে যে তোমার আর রাধিয়ার মধ্যে অনুচিত সম্পর্কের ফলে রাধিয়ার গর্ভ হয়েছে আর তুমি সুই দিয়ে গর্ভপাত…।’ শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। রাধিয়া আমার খাবার তৈরি করে, বাসন-কোসন মাজে, ঘরের চাবিও ওর কাছেই থাকে। আমার খাওয়া-দাওয়া, শোয়া-বসার চিন্তা আমার চেয়ে বেশি ওরই। আমি যে ওর ভাইয়া। কিন্তু…!… আমি রাধিয়ার মাকে করুণভাবে জিজ্ঞাসা করি, ‘চাচি, তুমিও কি এই কথাকে সত্য মনে কর?’ সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘তুমি কী বলছ লাল্লা! এ কী করে হয়? আমি সব জানি। বড় বউকে (জমিদার মশাইয়ের ভ্রাতৃবধূ) আমি মায়ের বাড়ি চলে যেতে বলেছিলাম, জমিদার মশাই একথা জেনে গিয়েছেন। এ থেকেই এসব হয়েছে।’ সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছে।
পরদিন সকালবেলা বিছানায় পড়ে-পড়েই আমি শুনি, রাধিয়ার মা রাধিয়াকে নিয়ে নাজানি কোথায় চলে গেছে। পূর্ব আকাশে ঊষার লালিমা ছড়াচ্ছিল আর আমার চোখে সমস্ত দুনিয়া পাণ্ডুর দেখাচ্ছিল!

‘মগহিয়া-ডোম এক যাযাবর গোত্র। এই গোত্র নারী-পুরুষ-শিশুর সাথে দল বেঁধে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ডেরা ফেলে ঘুরে বেড়ায়। এ বড় নির্ভয় জাত। পুরুষেরা দিনের বেলা জঙ্গলে গিয়ে শিয়ালের ডাক দিয়ে তাদের শিকার করে আর রাতের বেলা চুরি করে; কখনো কখনো দল বেঁধে ডাকাতিও করে। নারী আর শিশুরা গ্রামে ভিক্ষা করে। যুবতী মেয়েরা খারাপ পেশাও করে! বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ছাউনিতে বসে তাদের গাধাগুলোর দেখভাল করে।’

উপর্যুক্ত রিপোর্ট আমি এক বন্ধু পুলিশ ইন্সপেক্টরের ডাইরিতে পড়েছিলাম।

ফাগুন মাস। মগহিয়া ডোমদের একটি দল গ্রামের বাইরে একটি মাঠে ডেরা ফেলেছে। পরদিন গ্রামে নোংরা ঘাগরা পরা মেয়েদের ভিক্ষা করতে দেখা যায়। ‘ভিক্ষা করতে’ বলা ঠিক হবে না, কেননা যেভাবে তারা ভিক্ষা চায়, তাকে ‘ভিক্ষা করা’ নয়, খোরাকি উসুল করা বলা যায়। লোক চুপচাপ ভিক্ষা দিয়ে দেয়, তাদের সাথে কথা বলতে হয় লোকজন ভয় পায় অথবা একে নিজের অপমান মনে করে।
‘অই মোটকি মালকিনিয়াঁ…য়াঁ…য়াঁ! বুড়া সময় তুরা সাজ-রঙ থিকে ছুট্টি না পাও… অ্…! হামাকে ভিখ দিয়ে দে চলি জাই।’
অন্যজন ওদিকে চিৎকার করে, ‘ভিখ দিবি না দরজাত পেশাব করি দিব?’
আরেকজন কোনো ঘৃণাপূর্ণ প্রশ্ন বা ব্যঙ্গপূর্ণ কটাক্ষের উত্তর দেয়, ‘অরি হাঁ, হাঁ! সিয়াল খাই হামরা সব।…বেগানার বহুরানি হই…তো দিন-ভর…!’
আমি আমার ঘরে শুয়ে শুয়ে শলোকভের ‘এ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্যা ডন’ পড়ছিলাম। এমন সময় দরজার কাছে এসে কেউ হাঁক দেয়, ‘অরি ওঁ…য়্…য়্…য়্… মালকিনিয়াঁ…য়াঁ…।’
‘আরে এখানে কোনো মালকিন-টালকিন নেই।’ আমি ভেতর থেকেই শক্ত গলায় বলি। সে আমার বারান্দায়, খোলা দরজার সামনে এসে কিছু বলতে বলতে থেমে যায়। আমি দেখি, বড় বড় সুন্দর চোখের, কানে ঝুমকা, গলার পিতল আর কাঁসার গহনা পরা স্বাস্থ্যবতী কিন্তু নোংরা, সুন্দর যুবতী, বগলে ভিক্ষার ঝোলা ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে ভালো করে দেখে দৃষ্টি নত করে সে বলে, ‘মালকিন না আছে তো তু হি দিয়ে দে।’
‘কী দিয়ে দেব?’
‘অরে মালিকের দরবার, সোনা-রূপা পিন্ধিব, রেশম-মলমল গাওয়ত দিব, খাওয়ন লাগিব ঝুঠা-কাঁটা…।’ বলতে বলতে সে হাসে।
আমিও আমার হাসি চাপতে পারি না। বলি, ‘এখানে তো বোতলে খালি ওষুধ আছে। বলিস তো দিয়ে দিই?’
সে একবার ভালো করে আমাকে দেখে। আমার চোখে চোখ বিঁধিয়ে সে বলে, ‘তু বৈদ্য আছিস?’
‘হ্যাঁ।’
সে বসতে বসতে কণ্ঠকে একটু কর্কশ করে বলে, ‘বাজ পড়ে তুর দাওয়াইতে, হামার দাওয়াই না চাই, এক মুট্ঠি কুছু দিয়ে দে, চলি জাই!’
আমি এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তার সুরত, তার চোখ এবং তার ভাষা বলছিল যে সে সভ্য সমাজের দেনা। সে তার মিষ্টি ভাষাকে জবরদস্তি কর্কশ করবার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। আমাকে চোখ বিঁধিয়ে দেখে বলে, ‘আঁখি ফাটায় কী দেখছিস রে তু হামাকে, বড়া-বড়া হাকিম-দারোগার আঁখির লালি ঝারি দিলাম, হাঁ।’
আমি মানিব্যাগ থেকে একটি আটানি বের করে ছুড়ে দিই। আটানি মাটি থেকে উঠিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘অরে রামাঁ! ই আঠানি না বাচ পাইব, দেখহি হামার মরদ মারি কাড়ি লইব, দারু পিতে লাগিব। কুছু এক মুট্ঠি খাওয়ন লাগি দিয়ে দে রাজা!’
শেষ শব্দগুলোতে সে যে বেদনা ঢেলে দেয়, আমার কাছে খুব স্বাভাবিক লাগে। আমি উঠে সামান্য চাল দিয়ে দিই। যেতে যেতে সে আমার দিকে তাকিয়ে, কিঞ্চিত মৃদু হেসে বলে, ‘ইখন ত হামি রোজ আইব।’
সে চলে গেলে আমি কয়েক ঘণ্টা ধরে বসে এই অসভ্য আর বর্বর জাতের যুবতীর সম্বন্ধে ভাবতে থাকি।
সে পরের দিনও আসে, তারপরের দিনও আসে এবং রোজ আসতে থাকে। একদিন আমি হেসে বলি, ‘তোমরা এভাবে মানুষকে ভয় দেখিয়ে, গালি দিয়ে কেন ভিক্ষা কর?’
‘তু কেনে দাওয়াইতে পানি মিলাই লোগকে ঠগাস?’
‘ওষুধে পানি মেশাতেই হয়, পানি ছাড়া ওষুধ হয় না।
‘ত ধমক-গালি বিনা কুছু মিলে না, জানি রাখা।’ সে হেসে ফেলে। আমি স্বীকার করছি, ওর হাসি আমাকে মোহমুগ্ধ করে ফেলে। তার হাসিতে জাদু ছিল। একদিন আমি জিজ্ঞাসা করেই ফেলি, ‘তোমরা জাদুও জান?’
সে খিলখিল করে হেসে ওঠে, ‘অরে রাজা! তু কিউকর জানিস?’
‘এমনি জিজ্ঞাসা করছি।’
সে হাসি থামিয়ে বলে, ‘হামি না জানি জাদু-বাদু। বুড়ি লোগের পিছে ত না দেখি, গাওয়র সব জওয়ান লাগি থাকে, এ বুড়ি বুলে দে, এ বুড়ি বুলে দে! চাওয়ল-দাল-আটা-তরকারি সব ঢের ঢের লিয়ে আসে।’
‘সেটা কেন?’
‘মন উচাটনওয়ালা জাদু সিখার লাগি।’ সে হাসছিল।
আমি বিস্ময় প্রকাশ করে বলি, ‘বুড়ি কি সত্যি সত্যি বশীকরণ মন্ত্র জানে?’
আমাকে বিস্মিত হতে দেখে খটখট করে হেসে ওঠে সে, ‘তু সিখে আইছিস বৈদ্য রাজা।’

হোলির দিন। পুরো গ্রামে হইহুল্লোড়। বৃদ্ধ আর শিশুদের মধ্যেও যৌবনের ঢেউ লেগেছে। অশ্লীল আর শ্লীল গানের মত্ততা-ভরা হাওয়ার ঝাপটা তরঙ্গিত হয়ে আমার ঘরেও পৌঁছে যায়। আমিও থেকে থেকে হোলির বাহানায় মর্সিয়া গুনগুন করছি, ‘কা কে সংগ খেলূঁ ফাগ!(কার সাথে খেলব আবীর!)
‘অরে তু কেনে না খেলত হোলি বৈদ্য রাজা!’ ও হঠাৎ এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। একটা অ্যালুমিনিয়ামের বড় বাটিতে মালপোয়া চেয়ে নিয়ে এসেছে। একটা মালপোয়া সে দাঁত দিয়ে কামড়ে খাচ্ছে!
আমার বিস্ময় হয়। হোলির দিন, ভালো ঘরের মেয়েরা বাইরে পা রাখবার সাহস করে না, আর এ নির্ভয় হয়ে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সে আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘তু কেনে না খেলত হোলি?’ আমার মুখ থেকে মর্সিয়ার ‘ভাষা-টীকা’ বেরিয়ে আসে, ‘কিসকে সাথ খেলূঁ?'(কার সাথে খেলব?)
মালপোয়া দাঁতে চিবোতে চিবোতে ও গম্ভীর হয়ে যায়। আমি আবার জিজ্ঞাসা করি, ‘তুমি আজ কেন এলে?’
‘মালপুয়া মাগার লাইগি!’
‘লোকে কিছু বলেনি?’
নিজের নাক গর্বের সঙ্গে ফুলিয়ে সে বলে, ‘ কার হিম্মত আছে কুছু বুলে। হুঁ!’ সে বসে পড়ে।
‘কেউ রঙ দেয়নি?’
সে খেতে খেতে পরোয়াহীনভাবে বলে, ‘তু দিয়ে দে। দিয়ে দেখা।’
‘যদি দিয়ে দিই তো?’
‘দিয়ে দে!’
আমি লাল কালির দোয়াত নিয়ে উঠি, সে হেসে হাঁটুতে চিবুক লাগিয়ে বলে, ‘পিঠতে দে!’
আমি তার পিঠে দোয়াত ঢেলে দিই। তার নোংরা চোলীর(ব্লাউজের মতো মেয়েদের পোশাক, তবে আকারে একটু ছোট) ওপর লাল রোশনাই চমক দিয়ে ওঠে, তার হাসি আরো রঙিন হয়ে যায়। সে হাসতে হাসতে চলে যায়। আমার মনে আছে, আমার চোখেও গোলাপী লালিমা দৌড়ে গিয়েছিল।

সেদিনই দুপুরের পর সে দৌড়ে আসে। ধরে আসা কণ্ঠে সে বলে, ‘বৈদ্য রাজা! এক জারা গিয়ে দেখ। হামার মরদের কি হয়ে গেল! উলটী আর পেট চলন হল! জড়ী-বুটী দিতে দিতে কুছু কম না হল। তু চল বৈদ্য রাজা!’
‘কী হয়েছে?’ আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করি।
‘হামার মরদের উলটী আর পেট চলন হল।’সে হাঁপাচ্ছে।
ইমারজেন্সি ব্যাগ নিয়ে আমি তার সাথে রওয়ানা হয়ে যাই। ও আগে আগে দৌড়াচ্ছে আর দেব-দেবীকে ডেকে কাঁদতে কাঁদতে মানত মানছে।
গ্রামের বাইরের মাঠে তাদের ছাউনি। গিয়ে দেখি এক বলিষ্ঠ নওজোয়ান মাটির ওপর পড়ে ছটফট করছে। আমি পরীক্ষা করে দেখি, ‘পিওর কলেরা।’
ও আমার পাশে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমি বলি, ‘একে আমার ওখানে নিয়ে চলো। ওখানেই সুই দেব।’ স্যালাইন দিতেই ঠিক হয়ে যাবে, আমি মনে মনে বলি।
‘ সব ত চলে জাইছে!’ সে করুণ স্বরে বলে।
আমি দেখি, ছাউনিতে হৈহুল্লোড় পড়ে গেছে। সকলে নিজের নিজের ডেরা ভাঙছে। গাধার ওপর সামান তুলে দিচ্ছে।
‘তো এরা তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে?
‘হুঁ!’ ও কেঁদে ফেলে।
‘তুমি একে নিয়ে চলো, এখনই তাড়াতাড়ি আরাম হয়ে যাবে।’
পাশেই গাধা হাঁটছিল, সে হাঁক দেয়। এক যুবক এসে দূর থেকেই কিছু বলে। যুবক একবার আমার দিকে তাকায়, তারপর চলে যায়। গাধার ওপর সামান তুলে সে জোর লাগিয়ে রোগীকে উঠায় এবং গাধার ওপর তুলে দেয়। এক হ্যাংলা-পাতলা কালো বৃদ্ধও এসে কিছু বলে, কিন্তু সে মৌন থাকে। পথে আমি জিজ্ঞাসা করি, ‘ছোকরা কী বলছিল?’
‘কী কহবে আর! চল হামার সাথ, ইখানে কী ভরসা?’
‘আর ওই বুড়ো…?’
‘বুড়া হামার মরদের বাপ আছে। কহল, চল হামার সাথ,রানি বানায় রাখব।’
আমি যুবককে বারান্দায় শুয়ে স্যালাইন দিতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় জমিদার মশাই গ্রামের কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোককে নিয়ে চলে আসেন। তিনি ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে দূর থেকেই বলেন, ‘তুমি তো সীমা পার করে দিয়েছ। ছি ছি! সামান্যও লজ্জা করে না! এক ভদ্র পরিবারের সন্তান হয়ে এই নীচ জাতের ছোকরীর জন্য মরছ। তোমার নিজের ইজ্জতের পরোয়া নেই, কিন্তু গ্রামবাসীর ইজ্জতের চিন্তাও করলে না! ছি ছি!’
‘ছি ছি কেন?… এর কলেরা হয়েছে, আমি একজন ডাক্তার, ওষুধ…’ আমার কথা শেষ হতে পারে না, সকলে একসঙ্গে চিৎকার করে বলে, ‘কী, কলেরা?’
‘হে ভগবান! এ তো নিজের সাথে গ্রামের সকলকে নিয়ে ঢুববে। দেখছেন তো আপনারা!’ জমিদার মশাই গ্রামবাসীর দিকে ঘুরে বলেন। তারপর আর কী, আমার ওপর গালির বর্ষণ হতে থাকে। আমি হতবুদ্ধি হয়ে হাতে সিরিঞ্জ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সেদিন যুবতী পরিস্থিতি বুঝে ফেলে। সে আমার দিকে একবার তাকায়, তারপর জোর লাগিয়ে ওই অর্ধমৃত যুবককে উঠিয়ে গাধার ওপর তুলে দেয়। উঠানোর সময় যুবক মুখ বাঁকিয়ে জল চায়। অসহায় যুবতীর চোখে জলের বর্ষণ হয়। সে যেতে যেতে আমার দিকে একবার তাকায় আর গাধাকে হাঁক দিতে থাকে।
‘ছি ছি, বেহায়া! নির্লজ্জ!! পুরো গ্রামের সর্বনাশ করবে।’ বলে গ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণও প্রস্থান করেন। আমি হাতে সিরিঞ্জ নিয়ে চুপচাপ দেখতে থাকি। গোধূলি বেলা, দূরে বহুদূরে তার দল রঙিন ধুলো উড়িয়ে যাচ্ছে। গাধার ওপর নিজের প্রিয়তমকে চাপিয়ে, ঘাগরার কিনারা দিয়ে অশ্রু মুছতে মুছতে সেও ওদিকেই যাচ্ছে। সে যতটাই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পিঠের ওপর লাল রোশনাইয়ের রঙ আরো গভীর দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই লালিমা অগ্নিশিখার মতো আমার ধমনীতে ঢুকে যায় আর সেদিন থেকেই আমি আগুনের সাথে খেলতে শুরু করি।

কঠোর কারাবাস থেকে মুক্ত হয়ে সৌভাগ্যবশত সেনেটরিয়ামে জায়গা পেয়ে গিয়েছি। দেয়ালে ‘টেম্পারেচার চার্ট’ ঝুলছে। চার্টের ওপর একটা লম্বা লাল রেখা টানা হয়েছে, তার ওপর-নিচে উঠে যাওয়া এবং নেমে আসা জ্বরের গতি রোশনাই দিয়ে অঙ্কিত হয়েছে। আমি চার্টের দিকে তাকিয়ে থাকি, একে দেখে নানা রকম কল্পনা করি, কাশীর গঙ্গার তীরে তীরে ছোট-বড় মন্দিরের গম্বুজ… আর নিচে… গঙ্গার নির্মল জলে তাদের প্রতিচ্ছায়া…!!
অন্য চার্টে আমার হিস্ট্রি লেখা রয়েছে। ‘ডেট অব ডেথ’-এর সামনে এখনো জায়গা খালি। ওই স্থান পূর্ণ হতে আমি দেখতে পাব না!
জ্বর! কাশি!! রক্ত-বমি!! উফ্?
মুখে সফেদ নেকাব লাগিয়ে ডাক্তার আসে, নার্স আসে। আমার অবস্থা দেখে তাদের চেহারায় যে রঙ ওঠে-নামে, তাকেও লক্ষ্য করি।
কোকিলের কুহু-কুহু, মত্ততা-ভরা ফাগুনের হাওয়া এবং ওয়ার্ডবয়ের ‘রংগ দে চুনরী হমারী…!'(রাঙিয়ে দাও দোপাট্টা আমার…!) গীত শুনে আমি আন্দাজ করি, ‘হোলি আসছে!’
চোখের সামনে প্রাণে গুলে যাওয়া সকল রঙ এক-এক করে দৌড়ে যায়, কালো… নীল… হলুদ… সবুজ… লাল… সফেদ…!!

মার্চ ১৯৪৫

::
[ফণীশ্বরনাথ রেণু (১৯২১-১৯৭৭) মুন্সী প্রেমচন্দের পর হিন্দী কথাসাহিত্যের সবচাইতে প্রভাবশালী লেখক। সতীনাথ ভাদুড়ীর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের কারণে বঙ্গদেশে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে সতীনাথ ভাদুড়ীর ভাবশিষ্যও বলে থাকেন। ‘ময়লা আঁচল’ উপন্যাসের কারণে তার পরিচিতি বাড়লেও তিনি কিছু অসাধারণ ছোটগল্প লিখেছেন, লিখেছেন স্মৃতিকথা এবং রিপোর্টাজ। গ্রামীণ ভারতের, বিশেষত বিহার অঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের জীবন এবং দারিদ্র্য-বঞ্চনাকে তুলে ধরবার জন্যে তিনি সমাদৃত হয়েছিলেন সাহিত্যিক সমাজে। ভাষাভঙ্গি এবং শব্দ ব্যবহারেও গ্রামীণ বিহারকে উপস্থাপন করেছেন তিনি তাঁর রচনায়।]

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top