পাকুড়-ঠাকুর // সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়        

সখ করে প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি বানিয়েছে মৌমন আর  মঞ্জরী।  আদিগন্ত খোলা আকাশ দেখার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার জন্য অনবদ্য সে বাড়ির খোলা ছাদটা। উত্তর-পশ্চিম কোণের মস্ত পাকুড়গাছটা এ ছাদের শোভা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সারাদিন হাজার রকম পাখি এসে বসে এডালে ওডালে। ঘন পাতার আড়াল থেকে তাদের ডাক শুনতে পেলেও সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়না। খোলা মাঠের হাওয়ায় গুরুগম্ভীর হিল্লোল ওঠে গাছটার সারা অঙ্গ জুড়ে। পাখির কুজন আর পাকুড় গাছের শরীরী ভাষার আবহে জমে ওঠে গল্পদাদুর আসর।

অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ পাকুড় গাছটা এ গ্রামের অনেক বদলের সাক্ষী। লখিমপুর জাগৃতি সঙ্ঘের ক্লাবঘরটা আজ যেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, সেখানে ছিল ভবতোষ হাঁসদার মাটির বাড়ি। বাড়ির পাশের টলটলে পুকুরটায় হাঁসগুলো চরে বেড়াতো সারাদিন। ঘোষেদের ছেলেগুলোর সেদিকে খুব নজর। শীতের দিনে হাঁসের মাংস আর সরুচালের ভাত খাওয়ার মজাই যে আলাদা। ভবতোষ আর তার পরিবার বুক দিয়ে আগলে রাখতো হাঁসগুলোকে। হাঁস তাদের বংশের ঠাকুর। তার কোন ক্ষতি হলে গোটা পরিবারের চরম ক্ষতি হয়ে যাবে যে। পুকুরটাকে ঘিরে তাল আর খেজুর গাছ ছিল বেশ কয়েকটা। সরকার মশাই- এর কড়া হুকুম ছিল তাঁর নাতি-নাতনীদের তালের বড়া আর নলেন গুড়ের যেন কোন অভাব না হয়।

লখিমপুরের মানুষগুলোর কাছে পাকুড়তলার মত পবিত্র স্থান আর ছিল না। জমিতে বীজ ফেলাই হোক বা ক্ষেতের ফসল তোলার শুরু, বাড়িতে কেউ জন্মাক বা কেউ সগগে যাক, সরকার মশাই-এর পাকুড়তলায়  পেন্নাম ঠুকতে আসতো গ্রামের বাচ্চা  বুড়ো সবাই। সরকার মশাই-এর জমির কোথায় যে শুরু আর কোথায় যে শেষ তা ঠাহর করার সাহস বা ক্ষমতা কোনওটাই ছিল না লখিমপুর গাঁ-এর লোকজনের।

ভবতোষের বাড়ি থেকে পাকুড়তলা অবধি লম্বাটে জমিটা সরকার মশাই হাঁসদা পরিবারের নামে দানপত্র করে দিয়েছিলেন। সম্বৎসর চাষ দিতো ভবতোষ। ধান, সরষে, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ধনেপাতা, বেগুন, পালংশাক, মুলো কি না ফলাতো সে জমিতে। বাবু বলতেন –

“ভবা রে তোর হাতে যে কি যাদু আছে! যা ফলাস তাই সোনা রে বাপ!”

মনিবের মুখে এমন প্রশংসা শুনে মাথা নীচু করে ভবতোষ বলত- “জোহার জোহার”। পাকুড়তলায় নিবেদন করে আসতো ক্ষেতের নতুন ফসল।

চার চারটে মেয়ে হওয়ার পর গিন্নী মার কোল আলো করে এলো রণজয়। সেবার ভবতোষের বৌ লক্ষ্মীমণি ছিল গিন্নীমার ধাই। গিন্নীমার স্থির বিশ্বাস লক্ষীমণির হাতের গুণেই এবার তিনি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। গিন্নীমার নয়নের মণি হয়ে উঠল লক্ষ্মীমণি। সারা লখিমপুরে খবর ছড়িয়ে গেল ভবতোষের মত ওর বৌ এর হাতেও যাদু আছে। ‘ছেলে’ ফলনোর যাদু।

সরকার মশাই-এর গড়গড়ায় তামাক ভরে দেওয়া থেকে, গিন্নীমা’র চুলের কেয়ারি, খোকাবাবুর কাঁতাকানি পরিষ্কার করা থেকে সরকার বাড়ির লন্ঠন জ্বালানো লক্ষ্মীমণির দম ফেলার সময় থাকতো না। তবু সারা লখিমপুরের কোনও বাড়ির বৌ পোয়াতি হলেই লক্ষীমণিকে প্রায় আগাম বায়না করে রাখা হতো ধাইমা’র কাজের জন্য। আর ভবতোষ, সে তো সরকার মশাই-এর খাস কর্মচারী।  ক্ষেতের  চাষবাস দেখাশোনা  থেকে শুরু করে সরকার বাড়ির অতিথি, বাবুর বন্ধুবান্ধবদের ফাই-ফরমাস খাটা, পুকুরে জেলেদের সঙ্গে মাছের ওজন হিসেব করা থেকে শুরু করে তেলের কলে পাঠানো সর্ষের বস্তার হিসেব রাখা সবকিছুতেই ভবতোষ না থাকলে সরকার মশাই ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারতেন  না।

এভাবেই গড়িয়ে যাচ্ছিল ভবতোষ আর লক্ষ্মীমণির টানাটানির সংসার। দেখতে দেখতে খোকাবাবু বেশ খানিকটা বড়ো হল। সরকার মশাই সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে গাঁয়ের ইস্কুলে নয়, শহরের ইস্কুলে পড়াবেন। এ কথা শুনেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে হাঁসদা দম্পতির। খোকাবাবু লখিমপুরে থাকবে না? এমন সুন্দর বাসের চাল, গোবরসারের সবজি, খাঁটি দুধ, দই, রাবড়ি, কলে পেষা তেল, এসব ছেড়ে খোকাবাবু কি খেয়ে থাকবেন? আর গিন্নীমা! তিনি কি করে ছেড়ে থাকবেন তাঁর কলজে ছেঁড়া ধন! সরকার মশাই তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। গাঁয়ের ইস্কুলে পড়লে ছেলে মানুষ হবে না, তাই শহরে তাকে পাঠাতেই হবে।

পাকুড়তলায় সিধে দেন গিন্নীমা। ‘যেমন করে হোক ওনার মতি ফেরাও ঠাকুর। দুধের ছেলেটাকে ছেড়ে আমি কি করে……!’

হাঁস ঠাকুরের কাছে কেঁদে পড়ে লক্ষীমণি – ‘জোহার জোহার। বাবুমশাই এ কি করতিচে? আটকাইনতে হবে যেমন করেই হোক’।

‘ও পাকুড়-ঠাকুর ঘরের কচি মেরমটো বলি চড়াইনবো তোমার পায়ে। খোকাবাবুকে গেরামে রেইখে দাও।’

 

সরকার মশাই-এর জেদের কাছে সবঠাকুরের ক্ষমতাই সীমিত হয়ে গেছিল সেদিন। জিতে গিয়েছিল গিন্নী মা’র নীরব প্রতিবাদ। গিন্নীমা সাফ জানিয়ে দিলেন ছেলেকে ছেড়ে তিনি থাকতে পারবেন না। তাই শহরে যদি পাঠাতেই হয়, মা ছেলে দু’জনকেই পাঠাতে হবে। অগত্যা বাসুদেব পাটোয়ারিকে তলব করলেন সরকার মশাই। বাসুদেব তাঁর শহরের সম্পত্তির গোমস্তা। নামে শহর হলেও সে একটু উন্নতমানের গাঁ। লখিমপুরের মত ফি বছর বানের জলে ভাসেনা এই যা ফারাক। আর আছে বলতে কি যেন এক আশ্রমের ইস্কুল, সেখানে নাকি খুব ভালো লেখাপড়া হয়। সাধু মাষ্টাররা ছেলেদের এত ভালো করে লেখাপড়া করান যে ছেলেরা সব ‘ফাস-সেকেন’ হয় বড় বড় পরীক্ষায়।

ছেলেকে নিয়ে গিন্নীমা চলে যাওয়ার পর থেকেই সরকার মশাই-এর শরীরটা কেমন কমজুরি হয়ে গেল। চাকরবাকররা তাঁর সেবা যত্নে কোন খামতি রাখে না, জমিদারির কাজের পরে গপ্পগাছা করে বাবুর  সময় কাটিয়ে দেয় ভবতোষ। কখনও কখনও ইচ্ছে করে বোকার মতো কিছু কথা বলে যাতে বাবুর মুখ থেকে হারিয়ে যাওয়া হাসিটার একটু ঝলক অন্তত: দেখা যায়।

রণজয়ের বয়সী ঘোষেদের বাড়ির ছেলেটা গাঁয়ের ইস্কুলেই ভর্তি হয়েছে। রোজ সকালে ইস্কুলের জামা জুতো পরে হাতে টিনের সুটকেশ নিয়ে মা’র সাথে পাকুড়তলায় পেন্নাম করতে আসে গোবিন্দ। হরেক রকম পাখি দেখে তাদের নাম জানতে চায় গোবিন্দর কৌতুহলী মন। মা কিছু বলতে পারে, আর যেটা পারে না তা চিনিয়ে দেন  পাকুড়তলার মিঠে রোদে আরাম কেদারায় বসে থাকা সরকার মশাই। নিজের গাছে আসা পাখি পরের ছেলেকে চেনাতে একটু আফশোসই হয় সরকারবাবুর, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় পাখি চিনে কি হবে! ছেলে মস্ত বড় ইস্কুলে পড়ছে, কত্ত বড় মানুষ হবে, গাঁয়ে এলে সবাই কত মান্যিগণ্যি করবে তাকে, গাঁয়ের পঞ্চায়েতের মাথা হবে একদিন।

অনেকদিন ছেলে আর ছেলের মা’র সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। সরকার মশাই ঠিক করলেন এবার ক’দিন নরেন্দ্রপুরের জমিদারীর দেখাশোনা করবেন। লখিমপুরের দায়িত্ব দিলেন ছোট সরকার মশাইকে। আর ভবতোষ তো আছেই। দরকার হলে বাসুদেবকে পাঠিয়ে খবরাখবর করা যাবেখন। রণজয়ের ছুটিছাটা পড়লে আবার সপরিবার আসবেন লখিমপুরে।

দায়িত্ব নিলেন বটে কিন্তু জমিদারি সামলানো যে ছোট সরকারের কম্ম নয় সে কথা বিলক্ষণ বুঝেছিল ভবতোষ। লেখাপড়া বিশেষ জানেনা বলে খাতাপত্তরের দিকটা কিছু করে উঠতে পারে না সে কিন্তু বাদবাকি সবটা জান লড়িয়ে রক্ষা করে ভবতোষ আর সরকার মশাই-এর  কয়েকশো কর্মচারী।

সেদিন সরকার বাড়ির বৈঠকখানায় ছোট সরকারের একদল বন্ধু এসেছিল। চা আর পাঁপড়ভাজা নিয়ে বৈঠকখানায় ঢুকে একজনকে দেখে প্রাণ উড়ে গেল লক্ষ্মীমণির। এ তো চরণ মুর্মু!  জঙ্গলের ডাকাতটো বটে। এর সাথে ছোট সরকারের কীসের পিরীত! চরণ মুর্মু তার কঠিন নিষ্প্রাণ দৃষ্টি নিয়ে তাকায় লক্ষ্মীমণির দিকে। চোখদুটো যেন হুঁশিয়ারি দিতে চায়। বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে লক্ষ্মীমণির।

সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর বিছানায় পড়তেই চোখে জম্মের ঘুম নেমে আসে ভবতোষের। লক্ষ্মীমণির তেল চকচকে হাতদুটোয় লাল কড়া দুটো আজও ভবতোষের ঘুম কেড়ে নেয়। পাথরের মতো সুঠাম শরীলটায় আলুথালু  করে জড়ানো গোলাপী শাড়িটা আড়াল করে রাখে ভবতোষের অন্তরের দুগগিটোকে। হাঁসঠাকুরের মত সরু গলাটায় আলতো করে হাত রাখে ভবতোষ।  সোয়ামীর কালো হাতের চেটোটো জলে জলে সাদা হয়ে যিছে। তার মধ্যি নদীর ধারাটোর পারা ইদিক উদিক চলে যিছে হাতের রেখাগুলান। সে নদীর ধারায় নিজেকে ভাসিয়ে দেয় লক্ষ্মীমণি। বাঁ হাতে কুপি টা নিভিয়ে দেয় ভবতোষ।

‘আজ ছোট সরকারের ঘরটোতে চরণ মুর্মু এসেচিল জানিস!’

লক্ষ্মীকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভবতোষ।

‘কি বলতিচিস তুই! ঐ ডাকাতটো!’

‘হ্যাঁ রে কেমন চামচিকের পারা চোখদুখান। বুকের রক্ত যেন চুষ্যে লিয়ে যিতেছে’

‘ইটো তো ভালো কথা লয় বটে। শুধাইতে হবে ছোট সরকারকে।’

দমকা হাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেল ভবতোষের ঘরের জানলাটা। হাওয়ার ঝাপটায় পাকুড়গাছটা  নৃত্যরত নটরাজ। পুঞ্জিভূত ক্ষোভ যেন উগরে দিতে চায়। লখিমপুরের অনাচার, অযাচিত মানুষের প্রবেশে বোধহয় রুষ্ট হয়েছেন পাকুড়-ঠাকুর।

সকাল থেকেই সেদিন লখিমপুরে পুলিশের আনাগোনা।  গাদাখানেক  পুলিশ ঘিরে ফেলেছে গোটা সরকারবাড়ি। বাড়ির ভিতর থেকে কারো কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। অনেক কাকুতি মিনতি করে ছোট সরকারের ঘরে পৌঁছেছে ভবতোষ। লাল রঙের কি একটা ছোট্ট নোটবই কোলে নিয়ে বসে আছে ছোট সরকার।

‘কি হইয়েচে বাবু! এত পুলিশ কেন এসেচে বটে?’

কোন জবাব পাওয়ার আগেই দুজন কন্সটেবল এসে হাজির। মাথা নীচু করে পুলিশের ভ্যানে গিয়ে উঠলেন ছোট সরকার। সারা লখিমপুরের মানুষ ভেঙে পড়েছে ভ্যানটার উপর। ঘটনার আকস্মিকতায় ভবতোষের মাথা কেমন গুলিয়ে গেছে। ভয়ে সাদা তার চেহারা। কোনওরকমে একবার জিগ্যেস করে ছোটবাবুকে –

‘এই এত্তো জমির কি হবে বাবু?’

ধুলো উড়িয়ে ছুটতে শুরু করেছে ভ্যান। পিছনের জালটা ধরে সটান দাঁড়িয়ে গমগমে গলায় ছোটবাবু বললেন- ‘লাঙল যার জমি তার’। ছোট বাবুর এই ঘোষণা আকাশবাণীর মত ছড়িয়ে পড়ল লখিমপুরের মাঠে, বনে, জঙ্গলে। পাকুড়-ঠাকুরের পায়ের তলায় মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেল অনেক অস্ত্র। অস্ত্র রাখার অপরাধে ছোটবাবুর লখিমপুরে ফেরার আশা চিরতরে নিভে গেল।

বাড়ির দলিলে জমি হস্তান্তরের লম্বা ইতিহাস পড়েছে মৌমন। রণজয় সরকার এই ইতিহাসেরই একটি কাগুজে চরিত্র। আসল ইতিহাস লেখা আছে পাকুড়-ঠাকুরের বুকে। পাকুড় গাছটার পাশে দাঁড়ালে যতদূর দেখা যায় এখন শুধুই কাঁটা তারের বেড়া। সরকার মশাইয়ের জমির এখন অগুনতি মালিক। তবে লাঙল যাদের হাতে ছিল, তারা কেউই এ জমির মালিক হতে পারেনি।

ভবতোষের ছেলে নিরঞ্জন এখন লখিমপুরের নেতাটো বটে। বাবার লম্বাপারা জমি খানায় হাঁকিয়েছে মস্ত দোতলা বাড়ি। জাগৃতি সঙ্ঘের দাপুটে পেসিডেন এই নিরক্ষর নিরঞ্জন। কেলাবের মন্দির বানানোর জন্য প্রায় হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করে, সঙ্গে তার গোটা আষ্টেক চ্যালা চামুন্ডো। পাকুড়-ঠাকুর অবাক হয়ে ভাবেন – এই সেই ভবতোষের ব্যাটা! সারাজীবন কোমরে গামছা বেঁধে মুনিবের সেবা করে গেল যে ভবতোষ, তার ব্যাটাটো গতরে না খেটেই মুনিব হয়ে গেল বটে!

বছর কয়েক আগে লখিমপুরে এসেছিল রণজয়। ধুমসো একটা কালো গাড়ি থেকে নেমে দু’দন্ড দাঁড়িয়েছিল পাকুড়তলায়। বাপ-কাকার জমিদারির শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিয়ে চুকিয়ে দিয়ে গেল লখিমপুরের পাট। সত্যিই পাট চুকল কি?

একদল চ্যালা নিয়ে নিরঞ্জন এসেছে রণজয়ের শহুরে বাসায়। জমি কেনা-বেচার ব্যবসা করে ইদানীং বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে লখিমপুরের খোকাবাবু।

‘গাঁয়ের মন্দিরের জন্য তোমায় বড় ডোনেশান দিতে হবে দাদা। আমরা কোন কথা শুনব না।’

রণজয়ের বাড়ির বারান্দায় বসে দর কষাকষি চলছে। বাড়িটার সামনে এক চিলতে খোলা জমি এখনও হাত বদলের অপেক্ষায়। চারদিকে শুধু উঁচু উঁচু বাড়ি। গাছ নেই, পাখি নেই, নেই এতটুকু খোলা আকাশ। হাতের সোনার বালাটা ঘোরাতে ঘোরাতে নিরঞ্জন বলে চলে-

‘পূজোর কটাদিন তোমাকে কিন্তু গাঁ এ থাকতে হবে দাদা’

নিরঞ্জনের কথাগুলো কাঁদানে গ্যাসের সেলের মতো মনে হয় রণজয়ের। কি নিদারুণ জ্বালা ধরায়। পাকুড় গাছটার শান্ত ছায়ার কথা মনে পড়ে, বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে।

‘নিরঞ্জন, গাঁয়ে না হয় গেলাম কিন্তু থাকব কোথায়?’

‘কেন দাদা! আমার বাড়িতে থাকবে! সব রকম সুবিধে আছে তোমার কোনও পবলেম হবে না’

সামনের চিলতে জমিটায় ঝপ করে নেমে এলো বিশাল চিলটা। মাটিতে খুঁটে খুঁটে খাবার খুঁজছে। খাবারের খোঁজে উঁচু আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসা চিলটাকে তাড়া করতে একটা কাকও আসেনি। তারা যেন করুণা করে ছেড়ে দিয়েছে যুদ্ধের ময়দান। ঠিক যেমন আজ নিরঞ্জন করুণা করছে রণজয়কে। চরে বেড়ানোর মত এক চিলতে জমি এই চিলটারও আছে, লখিমপুরে  পা রাখার জন্য রণজয়ের তো সেটুকুও  আর নেই। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শুধুই কাঁটাতারের বেড়া, যাদের মালিকের নাম  পাকুড়-ঠাকুর ছাড়া আর কেউ জানেনা।

 

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top