লেখালেখির উঠানঃ একটি পর্যালোচনা ।। মনজুরুল ইসলাম

সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের নিঃসঙ্গ যাপন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রত্যাশিত। বস্তুত, সে প্রেক্ষিতে সেই নিঃসঙ্গ মানুষের পক্ষে পুরোপুরি ভালো থাকাও অসম্ভব। মূলত, পৃথিবীতে ভালো থাকবার অথবা পৃথিবীকে ভালো রাখবার এই যে প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি, এই প্রবৃত্তির চরিতার্থ তখনই সম্ভব হয়ে উঠবে যখন সবাইকে নিয়ে ভাল থাকবার চিন্তাটি রাষ্ট্র থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায় অবধি বিস্তৃত থাকবে। কিন্তু চিন্তার এই উর্বর বীজটি উদগমিত করবার ক্ষেত্রে কারা প্রধান ভূমিকা পালন করবেন? তাদের সৃজিত চিন্তার সেই বীজটিকে গণ-মানসে প্রক্ষিপ্ত করবার ক্ষেত্রে কারা কিংবা ঠিক কোন মাধ্যম সক্রিয় অবদান রাখতে পারবে? অবশ্যই চিন্তাশীল মানুষ, যারা অতীতে একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে অবিরাম ভেবেছিলেন, বর্তমানে ভাবছেন এবং ভবিষ্যতেও ভাববেন। এখন দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর প্রদানের নিমিত্তে যদি সাহিত্যের ক্ষেত্রটিকে বিবেচনা করা হয় তাহলে সাহিত্যের বীজটি উদগমিত হবার পর সেটির শুশ্রুষা, বেড়ে উঠা এবং ধারণের জন্যে কোনো ধরনের দ্বিধা ব্যতিরেকেই সাহিত্য পত্রিকার অবদানের কথা ব্যক্ত করা যায়।

প্রকৃত অর্থে, একটি সমাজ যত উচ্চমার্গীয় চিন্তাই প্রসব করুক না কেন, যদি সেই সমাজে বসবাসরত মানুষজনের মধ্যে পাঠাভ্যাস না থাকে তবে কালের গহ্বরে হয়ত কোনো এক সময় সেই চিন্তাগুলি বিলীন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে সাহিত্য পত্রিকা সেই চিন্তাগুলিকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে তেমনি জাতীয় পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পালন করতে পারবে একটি উচ্চমূল্য ভূমিকা। বিশেষত, পাঠকদের আগ্রহী তুলবে ধ্রুপদী গ্রন্থ পাঠের ক্ষেত্রে, সৃষ্টি করবে সময়ের ওপর প্রভাব বিস্তারী এক একটি মৌলিক দর্শনের। এবং সেই কাক্ষিত দর্শন সৃষ্টির ক্ষেত্রে নেপথ্য শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালনের অক্লান্ত প্রয়াসটিই লক্ষ করা যাচ্ছে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা লেখালেখির উঠান এর প্রচেষ্টা বৃত্তে।

একটি ধ্রুপদী সৃষ্টি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যিক এবং অন্তর্জাত প্রতিভার কণ্টকবিহীন সমন্বয়ের যে প্রয়োজনীয়তার কথা টি. এস. ইলিয়ট ব্যক্ত করে গেছেন সেই তত্ত্বটি প্রয়োগের অত্যুত্তম প্রচেষ্টা স্পষ্টভাবেই লক্ষিত লেখালেখির উঠান পত্রিকায়। দেশী- বিদেশী কালজয়ী সাহিত্যিকদের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের কণ্ঠস্বরগুলিকে একই মোড়কে আবৃত করে বর্তমান সময়ের অপ্রত্যাশিত সংকটগুলিকে মোচনের দৃঢ় পদক্ষেপ সেই তত্ত্বের প্রায়েগিক দিকটিকেই প্রতিফলিত করে। সেই ধারবাহিক স্বকীয়তাটিকে অটুট রেখেই সম্প্রতি ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছে লেখালেখির উঠানের দ্বিতীয় সংখ্যা। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার ওপর রচিত লেখাসমূহকে একত্রিত করে সাজানো হয়েছে সংখ্যাটি।
আক্রান্ত জীবনানন্দ প্রবন্ধটিতে কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র সাহিত্য জীবনে যে তীর্যক আক্রমনের স্বীকার হয়েছিলেন তার একটি সার্থক নির্মাণ করেছেন প্রাবন্ধিক এ. টি. এম মোস্তফা কামাল। রবীন্দ্রনাথ, সজনীকান্ত থেকে শুরু করে সমকাল ও উত্তরকালের সাহিত্যিকদের জীবনানন্দের কাব্য সৃজনের ওপর নেতিবাচক আক্রমণ বিধৃত হয়েছে যথাযথ প্রমাণসহ। একইসাথে জীবনানন্দ দাশের নিরলস পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বৃক্ষের মতো অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধদেব বসু ও সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ভূমিকার কথাও বর্ণিত হয়েছে। প্রবন্ধটির গুরুত্ব হয়ত দীর্ঘ সময় অটুট থাকবে তথ্য বর্ণনার পরিমিত সমন্বয় এবং তার সাবলীল উপস্থাপনার কারণে। তবে প্রবন্ধটির শুরুর দিকে লেখক যেভাবে একজন প্রকৃত সমালোচকের অপরিহার্য বিশিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছেন সেটির সূত্র ধরে যদি প্রবন্ধের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে সমালোচনার প্রেক্ষিত সংক্ষিপ্ত পরিসরে ব্যাখ্যা করতেন তবে সেটি সমালোচনার প্রকৃত রূপ সম্পর্কে একটি ধারণা পেতে সহায়ক হতো। সত্যিকারের সাহিত্য সৃজনে সমালোচনার প্রভাব বিস্তারী ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার ওপর ধারণা গ্রহণ লেখকের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি তাদের মনোজগতে সমালোচনা সহ্য কিংবা গ্রহণের মানসিকতাও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

ছোট ছোট বাক্যে ছন্দোবদ্ধভাবে এগিয়ে চলা মুনীর নিয়াজি: গিয়ে ডাক দিয়ে দেখি প্রবন্ধটিতে চিত্রিত হয়েছে একজন নিভৃতচারী কবি ও তার কবিতার ব্যঞ্জনার কথা। বর্ণিত হয়েছে, একজন কবির মুক্তভাবে পথ চলার অধিকারের কথা। একইসাথে দেশভাগের কারণে মননে জমে থাকা অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা। এবং এই অব্যক্ত যন্ত্রণা যে কবিতা বুননে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রবন্ধটিতে। উর্দু কবিতায় শব্দ ব্যবহারের বৈচিত্র্য নিয়ে আসাই যেখানে মৌল উদ্দেশ্য বলে প্রতিভাত ছিলো, সে ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে শব্দকে কীভাাবে কাজে লাগিয়ে পংক্তির গুরুত্বকে বাঙময় করে তোলা যায় সেটিই দেখিয়েছেন কবি মুনীর নিয়াজী। সন্দেহাতীতভাবে তার সঠিক উপস্থাপন এ প্রবন্ধটি। শব্দের এই অভাবনীয় প্রয়োগ চিন্তক ও বহুভাষী অনুবাদক জাভেদ হুসেন কিছু পংক্তি অনুবাদের মাধ্যমে সংযুুক্ত করেছেন যা সাধারণ পাঠকবৃন্দের মুনীর নিয়াজীকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। রচনার শেষ ভাগে লেখকের পরিণতি কেমন হয়েছিল সে সম্পর্কে জানবার ক্ষেত্রে একটি অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে প্রবন্ধটিতে। সেটির সংযুক্তি হয়ত মুনীর নিয়াজী সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকের মধ্যে যে অপূর্ণতা তা পূরণ হতো।

আত্মস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে যেসব লেখক জীবনের বৈষয়িক দিকটিকে উপেক্ষা করেছেন, সমাজকে এগিয়ে নিতে ব্রত রয়েছেন তারাই সম্মুখীন হয়েছেন সীমাহীন প্রতিবন্ধকতার। আর্থিক ও পারিবারিক সংকটে পড়লেও নিজ সৃষ্টির সঙ্গে আপোষ করেননি কখনোই। আন্দ্রেই প্লাতোনোভ তেমনই একজন রুশ লেখক যিনি স্তালিনের মতো নেতৃত্বের কাছ থেকে প্রবল যন্ত্রণাদায়ক অবজ্ঞা গ্রহণের পরেও সৃজন করেছেন কালজয়ী সাহিত্য, আপোষ করেননি কখনো। রুশ সাহিত্যের প্রসঙ্গ আসলেই স্বাভাবিকভাবেই গোর্কি, চেকভ এবং তলস্তয়ের প্রতিমূর্তি আমাদের মনোজগতে আপনাআপনি ফুটে উঠে। প্রাবন্ধিক রুখসানা কাজল তার রচনাটিতে আন্দ্রেই প্লাতোনেভর সাহিত্য ও পারিবারিক জীবনের প্রতিটি স্তরকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে যে কোনো পাঠককেরই প্লাতোনোভকে জানার ক্ষেত্রে একটি অকৃত্রিম আগ্রহের সৃষ্টি হবে। তবে প্রবন্ধটি আরো দীর্ঘ হলে প্লাতোনাভের সৃষ্টি সম্পর্কে আরো অধিক পরিমাণে জানবার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হতো পারতো।

রাষ্ট্রিক সংকট নিরসনে একজন ব্যক্তি কিম্বা একটি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার মানচিত্রটি কেমন হওয়া উচিত? সাহিত্যিক কিম্বা সংগঠনের সংস্কৃতিকর্মীবৃন্দ কি পুঁজিবাদী শক্তির সাথে আপোষ করে সাহিত্য সৃজন থেকে শুরু করে সংস্কৃতি চর্চা করবেন? নাকি গণমানুষের স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করতে লেখকের প্রতিবাদী লেখার ব্যবহার অথবা প্রচারে ব্যাপৃত থাকবেন? যে কোনো সময়েই পরিস্থিতি যদি আত্মস্বার্থকে অক্ষুণœ রাখবার প্রয়াসে প্রতিবাদী পদক্ষেপ গ্রহণে পিছপা হবার বাসনাকে ধারণ করে তবে তা নিশ্চিতভাবেই সেই সমাজকে পিছিয়ে নেবে। বিশেষত, রবীন্দ্রনাথের মতো বিখ্যাত লেখকের কবিতা থেকে শুরু করে প্রতিবাদী সব ধরনের লিখনীকে যদি শীতল জলের গহ্বরে রেখে নিজেদের ভবিষ্যৎকে শীতল রাখবার প্রচেষ্টা করা হয় তবে তা খুব বেশিদিন শীতল থাকবে না। প্রকৃত রূপটির উন্মোচন হতে খুব বেশী সময়েরও প্রয়োজন হবে না। যে কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠনেরই মৌল উদ্দেশ্য যে প্রত্যক্ষ কিম্বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়া উচিত সেটি অস্বীকার করা প্রকৃত অর্থেই সে সংগঠনের জন্য ব্যর্থতার। অথবা সে ধরনের সংগঠনকে সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া কতটা যৌক্তিক তা প্রশ্নসাপেক্ষ। রবীন্দ্রনাট্যের রাজাগণ: রাজনৈতিক পাঠের আলোয় প্রবন্ধটিতে প্রাবন্ধিক হুমায়ুন আজম রেওয়াজ জনস্বার্থে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিকে অস্বীকার করে টমাস মুরের ইউটোপীয় সমাজ বিনির্মাণে অবৈজ্ঞানিক স্বপ্ন লালনের বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং বৈশি^ক প্রেক্ষাপটের সাথে দেশীয় প্রেক্ষাপটের মেলবন্ধন সৃষ্টির প্রচেষ্টাটিও প্রবন্ধটিকে নিয়ে গেছে একটি শক্ত ভিতের ওপর।

সেকেন্দার সুমন রচিত স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ ম্যাসিডোনিয়ার অলিভেরা ডসেভস্কা: কবি ও কবিতায় লেখকের সাথে একজন বিদেশী কবির মানবাধিকার কর্মীর পরিচিত ও লেখালেখির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা বিষয়ে বিভিন্ন বিষয়ে ফুটে উঠেছে। প্রবন্ধটির শেষে অলিভেরা ডসেভস্কার দুটি কবিতাও অনূদিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধের একটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখ্য আর সেটি হলো- লেখকের লেখালেখির ক্ষেত্রে আত্মসংকটের অকপট স্বীকারোক্তি যা সমসময়ে খুবই বিরল। বস্তুত এই আত্মসংকটের প্রকাশভঙ্গিই প্রবন্ধটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়বার ক্ষেত্রে তাড়িত করেছে। বিশেষভাবে, লেখক নিজের দীনতার কথা যেভাবে স্বীকার করেছেন প্রকৃত অর্থে ততটা তার লেখায় প্রকাশ পায় নি। বরং একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার আখ্যান পাঠককে একটি বিশেষ মোহের দ্বারা আচ্ছন্ন করতে পেরেছে।
উপর্য্ক্তু পাঁচটি প্রবন্ধের পাশাপাশি সর্বশেষ ট্রটস্কি ও ফ্রিদা কাহলো: ইন বিটুইন দ্যা কাসেটস প্রবন্ধটিতে ট্রটস্কির সাংগ্রামিক জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ এবং উপহার হিসেবে তার জন্য অঙ্কিত বিট্যুইন দ্য ক্যাসেট্স পেন্টিংয়ের বর্ণনা করেছেন প্রাবন্ধিক আলতাফ পারভেজ। প্রবন্ধটিতে বিটুইন দ্যা ক্যাটেনস ছবির একটি চিত্র সংয্ক্তু করলে আরো জীবন্ত হয়ে উঠতো বলে মনে হয়েছে।

বৃদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে যখন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, সমস্ত প্রাণীকূল ও প্রকৃতির প্রকৃত রূপকে নির্ভার পদচারণার সুযোগ করে দিতে সক্ষম হবে ঠিক তখনই মানুষ হিসেবে তাদের স্বকীয়তা প্রোজ্জ্বলরূপে প্রতীত হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মানুষের মাঝে সেই অনুভূতিলব্ধ দায়বদ্ধতাটি ক্রিয়াশীল নয় আজ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। এবং এ বিষয়টিই অত্যন্ত সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে বিড়াল শিরোনামের গল্পটিতে। গল্পকার মিজানুর রহমান নাসিমের বয়ানে “পৃথিবী সত্যিই শুধু মানুষের দখলে। এখানে অন্যদের নির্ভার হওয়ার সুযোগ নেই। এখানে ইতর প্রাণীদের, বিড়ালের, পথ কুকুরের, শেয়ালের চোখের দিকে তাকালেই তাদের চোখের মনিতে ফুঠে ওঠে অনুকম্পা প্রাপ্তির আশা। কিন্তু তারা যে প্রতিনিয়ত অনুকম্পা থেকে বঞ্চিত হয়ে উদ্ধাস্তু ফেরারীর মতো জীবন যাপন করে তারই সুনিপূণ উপস্থাপনা গল্পটি। গতানুগতিক ভাবনা ও পরিবেশনার থেকে স্বতন্ত্র এ গল্পটি যেন সূচনালগ্নে বর্ণিত শোভমান রচনার একটি আদর্শ উদাহরণ।

যজ্ঞ গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি পরিবারের ওপর নৃশংস নির্যাতনের চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। তবে গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র হাকিম এবং মতিনের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুরাইয়ার ওপর আক্রমণের বিশ্বসযোগ্যতাটিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে পূর্ব থেকেই একটি ইঙ্গিত প্রদান করতে পারলে বোধকরি ভালো হতো। বস্তুত গল্পের শুরুর দিকে তারা যে এমন একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত হতে পারে তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে গল্পকার মুবিন খানের গল্পটি সেই সময়ের একটি আবহকে পাঠকমনে সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছেন যা নিশ্চিতভাবেই ব্যক্ত করা যায়।
ব্যক্তিস্বার্থের কাছে আবেগের মূল্য যে কতটা ঠুনকো তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন হীরালালের দেশত্যাগ গল্পটি। গল্পকার খোকন দাস সীমাবদ্ধতাকে পুষিয়ে না রেখে বরং অকপটভাবে যে দর্শনটিকে স্থাপন করতে চেয়েছেন সেক্ষেত্রে তিনি সার্থক হয়েছেন বলে সহজেই অনুমেয়। স্বদেশের সাথে ব্যক্তির নিগূঢ় সম্পর্কের বন্ধন যে পারিবারিক বন্ধনের থেকেও অনেক মজবুত তা তার সরল উপস্থাপনে পাঠকের বোধবৃত্তে অনায়াসেই প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

রেজওয়ান তানিম রচিত অন্ধ নিসর্গে আলো অলঙ্কারে গল্পটিতে শুরুর দিকে বর্ণনার অতিরেকতা পরিলক্ষিত হলেও গল্প যতই সামনের দিকে এগিয়ে গেছে ততই উত্তেজনার আবহ পাঠকের মননে রেখাপাত করেছে। স্বভাবজাত ধারার থেকে ভিন্ন ধারার একটি চরিত্রের সাথে যেন লীন হয়ে গিয়েছে পাঠকের মনন। গল্পের মূল চরিত্র মোবারক মনিরের অন্তিম পরিণতিটি প্রত্যক্ষের একটি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে আপনাআপনি। মনিরের মনোজগতে স্থিত কষ্টগুলি বাস্তব প্রেক্ষাপটে ঘটিত হয়ত অনেক প্রতিভাবান লেখকের মাঝে অন্তরিত রয়েছে।
পবিত্র চক্রবর্তীর আংলাবুড়োর সংসার গল্পটিতে মূল চরিত্র আংলাবুড়োর মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতার একটি চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। জীবনবোধ ও জীবনাদর্শনের অভাব যে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে তা ফুটিয়ে উঠেছে গল্পটিতে। তবে গল্পটির বুনন আরো ঘন হলে হয়ত অধিকতর আগ্রহ নিয়ে পাঠের আগ্রহটি পাঠকের মননে সক্রিয় হতো।

ভোর শিরোনামে রোমেল রহমানের অণুগল্পটিতে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের গল্পের প্রভাব লক্ষ করা গেছে। গল্পটি মূলত চিন্তার স্বাধীনতাকে হরণ করবার যে রাষ্ট্রিক প্রচেষ্টা তার একটি প্রতীকী উপস্থাপন। গল্পে প্রথম বাচ্চা পাখিটি যখন তাদের নাগরিকত্ব হরণের বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো , তাহলে কি তারা আমাদেরকে মেরে ফেলবে? তখন তার মা উত্তরে বলে, “ আমরা কি আর বেঁচে আছি?” প্রত্যুত্তরে দ্বিতীয় বাচ্চা পাখিটি বলে উঠে, ‘‘মা আকাশটা কি আমাদের আছে?’’ পাখিটি ডুকরে বলে উঠে- না। চিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ যে মূলত শরীর নিয়েই বেঁচে থাকা সেটির সার্থক উপস্থাপন গল্পটি।

মাহমুদুল হক আরিফের দ্বিতীয় অণুগল্পটি সমসময়ের নেতিবাচক জীবনপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের অস্থির পৃথিবী সৃষ্টির একটি চিত্রকল্প। উপস্থাপনায় মূল ধারণাকে পাঠকের মনোজগতে অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে আরো বৃদ্ধিদীপ্ত কৌশলের প্রয়োগ করা যেতে পারতো।
পাঁচটি মৌলিক গল্প ব্যতিত দুটো অনূদিত গল্পও স্থান পেয়েছে উঠানের এ সংখ্যাটিতে। প্রথম অসমিয়া গল্পটির রচয়িতা সৈয়দ আবুল মালিক যার শিরোনাম মরিয়ম পিসির বিয়ে, অনুবাদ করেছেন বাসুদেব দাস। গল্পটির ঘটনাপ্রবাহ অনুধাবনে বেগ পেতে না হলেও উপস্থাপনা শৈলীর নান্দনিকতায় গল্পটির গতি বৃদ্ধি পেত অবলীলায়। তবে গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র রহিমের আত্মসম্মানবোধের গভীরতার পাশাপাশি আর্থিক সীমাবদ্ধতা যে কীভাবে একটি অমোঘ শৈশব সম্পর্কের বাঁধা সৃষ্টি করে তার উপস্থাপন পাঠককে নিশ্চিতভাবে নাড়া দেবে।
সর্বশেষ, নাহার তৃণা অনূদিত ম্যাচের কাঠি গল্পটির উপস্থাপন সাবলীল হলেও কিছু শব্দের ব্যবহার যেমন হ্যাপায়, ঝক্কি, ঘোৎঘোৎ কিংবা গোষ্ঠী কিলাই পাঠে সুখানুভূতির আবেশ সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হয়েছে।

তিনটি অনূদিত সাক্ষাৎকারের প্রথমটিতে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখালেখির সূত্রপাত, রাজনৈতিক চিন্তা এবং কলম্বিয়ার ইতিহাসের বর্ণনা উঠে এসেছে। অনুবাদক গৌরাঙ্গ হালদারের সাবলীল অনুবাদ সাক্ষাৎকারটিকে করে তুলেছে প্রাণবন্ত। একই সাথে মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারটিতেও পোলিশ ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারজুকের সাহিত্য আলোচনার পাশাপাশি বিশ^সাহিত্যকে সহজলভ্য করবার নিমিত্তে অনুবাদকবৃন্দের ভূমিকার কথা গুরুত্বের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। কথাসাহিত্যিক ওলগা তোকারজুকের বয়ানটি এক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ- “আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করি সাহিত্যের কোনো সীমানা নেই। জগতে একটামাত্র সাহিত্যই আছে, এবং সেটি প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে একাধিক ভাষা ব্যবহার করে থাকে। এ কারণেই অনুবাদকগণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা ভাষাসমূহের মধ্যবর্তী পলকা সংযোজনকারীর মতো আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন, জগতে সকল সাহিত্যই একটি মাত্র সাহিত্য। ’’

রাফসান গালিব অনূদিত সর্বশেষ সাক্ষাৎকারটিতে সূফীবাদী সংগীত চর্চায় শিল্পী আবিদা পারভীনের ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলি উঠে এসেছে। বর্ণিত হয়েছে সূফিবাদ সম্পর্কে শিল্পীর ব্যক্তিগত চিন্তা, যাপিত জীবনের মানচিত্র। গুরুত্বপূর্ণভাবে, সংগীত চর্চার উদ্দেশ্য যে শ্রোতাদের প্রশংসা গ্রহণের পরিবর্তে তাদের একত্রিত করে সৃষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
উর্দু সাহিত্যের প্রথিতযশা কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সাথে লেখক হাইকেল হাশমীর ব্যক্তিগত সাক্ষাতের বিষয়টি ঢাকায় যখন ফয়েজ আহমদ ফয়েজকে দেখলাম স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য। প্রকৃত অর্থে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, একইসাথে তথ্যসমৃদ্ধ। কিন্তু শুরু থেকে শেষ অবধি বর্ণনাটিতে পাঠককে টেনে নিয়ে যাওয়া কিম্বা ধরে রাখবার ক্ষেত্রে কোনো আকর্ষণ লক্ষ করা যায় নি। লেখক ইচ্ছে করলেই ন্যূনপক্ষে একটি উপসংহার টানতে পারতেন। বস্তুত সেটিও দেখা যায়নি।

নভেরা হোসেনের এলিজি- শামীম কবির শিরোনামের প্রবন্ধটিতে একজন কবির, মূলত বোহেময়িান কবির জীবনযাপনের মানচিত্রটি চিত্রিত হয়েছে। প্রাবন্ধিকের শৈল্পিক উপস্থাপনায় আগ্রহ জেগেছে বোহেমিয়ান সেই কবির কবিতা সম্পর্কে জানতে। ‘‘বিশেষত এই ঘরে একজন কবি’’ কবিতাটির শিল্পমান ও ভাবনার গভীরতা এই আগ্রহটিকে তাড়িত করেছে।
‘‘ তথাকথিত পূর্ণাঙ্গ মানুষের সংজ্ঞায় যারা পড়ে না, অথবা স্বাভাবিক মানুষের যে ছক সমাজ বা রাষ্ট্র তৈরি করে রেখেছে, বাস্তবতা হলো সেই সমাজ ও রাষ্ট্রের বাইরেও মানুষ রয়েছে। তাদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে, তাদের প্রতি প্রতিনিয়ত আমনবিক আচরণ করে কি এই সমাজ বা রাষ্ট্র নিজেরই বিপদ ডেকে আনছে না?’’ মূলত, বুর্জোয়া কিম্বা পেটি বুর্জোয়ারা ভোগবৃত্তির সর্বোচ্চ স্তরে নিজেদের অবস্থানকে সংহত করতেই সামাজিক কাঠামোর এমন একটি অমানবিক এবং অস্বাভাবিক কাঠামো নির্মাণ করে রেখেছেন। দুর্ভেদ্য এই কারাগার থেকে মুক্তি সম্ভব কেবল দীর্ঘ সময়ের রাজনীতি পাঠ ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ওপর অবাধ বিচরণ। এবং অবশ্যই যা সকল মানুষের জন্য। নইলে জোকারদের মতো চিরদিনই পরাধীনতার চুরি পড়েই এক বিপর্যস্ত জীবনের প্রশ^স্ত পথের দিকে যাত্রা করতে হবে বুর্জোয়াদের কাছে অমানুষ হিসেবে বিবেচিত কোটি কোটি জোকারের দলকে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষক বিধান রিবেরু প্রবন্ধটির প্রথম পাঠে পাঠককে অবগত করেছেন আলোচিত চলচ্চিত্র জোকারের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে। দ্বিতীয় পাঠে চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রসহ চলচ্চিত্রের প্রতীকী বিষয়গুলিকে বিশ্লেষণ করেছেন সুসংহতভাবে। সর্বশেষ, গণমানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে চাইলে যে একটি দীর্ঘ বুদ্ধিভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন তার প্রয়োজনীয়তাও ব্যাখ্যা করেছেন লেখক।

গালিবের দরবারে ফাতিমা জাহান সৃজিত একটি প্রবন্ধ যা বিবেচিত হয়েছে ভ্রমণ সাহিত্য হিসেবে। গতানুগতিক উপস্থাপনার থেকে কাব্যিক উপস্থাপনা লেখাটির একটি বিশেষ স্বকীয়তা। তবে মূল বিষয়টি উপস্থাপনে এত দীর্ঘ সময়ের স্থিতি হয়ত পাঠকের ক্ষেত্রে বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে পারে। পাশাপাশি মির্জা গালিবের ব্যক্তিগত জীবনের পরিচিতি ভ্রমণ সাহিত্য হিসেবে লেখকের প্রারম্ভিক উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
আসলাম আহসান রচিত চলচ্চিত্রের গানে আমাদের স্বকীয় ভিত্তি প্রবন্ধটিতে রয়েছে চলচ্চিত্রের অতীত উপাখ্যান। একই সাথে রয়েছে বাংলা গানের স্বকীয় ভিত্তি প্রতিষ্ঠার নেপথ্য কাহিনী। বস্তুত, তথ্যসমৃদ্ধ এই প্রবন্ধটি আমাদের অনায়াসেই পরিচয় করিয়ে দেবে চলচ্চিত্রের প্রথম সবাক নির্মাণ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত ধ্রুপদী সব সংগীতের সৃষ্টি ইতিহাস। একই সাথে, এই সৃষ্টির পেছনে থাকা কারিগরদের অনবদ্য ভূমিকার কথা।

সর্বশেষ, মাশরুর আরেফিন সৃজিত ‘আলথুসার’ উপন্যাসটির ওপর একটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পাওয়া যায় আশানুর রহমানের উপন্যাস  আলথুসার’- রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও জটিল জীবনের শ্বাসরুদ্ধকর বয়ান প্রবন্ধটিতে। বহুমাত্রিক প্রেক্ষাপটকে একীভূত করে ঔপন্যাসিক মাশরুর আরেফিন তার উপন্যাসটিকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তার প্রতিটি বিষয়ই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে আশানুর রহমানের লেখায়। সন্দেহাতীতভাবে, তার এই মেদহীন ধারাবাহিক বর্ণনা পাঠককে উপন্যাসটি পাঠের ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তুলবে। বস্তুত, কাহিনীনির্ভর উপন্যাস পাঠে অবশম্ভাবীরূপে আমরা পরোক্ষ দর্শনের সান্নিধ্য লাভ করে থাকি। কিন্তু, প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির পাঠ যখন গল্পের মধ্যে দিয়ে বৈশি^ক সংকটকে তুলে ধরে এবং সেই সংকটগুলিকে সমাধানের পথ প্রদর্শন করে তখন কাল ও বাস্তবতা বিবেচনায় পাঠকের কাছে তা হয়ে ওঠে এক ধরনের মৌলিক প্রাপ্তি। লেখকের বয়ানে, ‘‘ আর এই উপন্যাসে স্যামুয়েল ও লেখকের কয়েকটা মাত্র বাক্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে লেখক তাঁর পাঠকদের পরিচয় করাতে থাকেন কয়েক দশক ধরে চলা মার্কসবাদ ও পরিবর্তনকামী রাজনীতি নিয়ে বিতর্কের মূল সূত্রগুলোতে। একজন পাঠক হিসেবে নিঃসন্দেহে এটা একটা বড় অভিজ্ঞতা। ’’ প্রাপ্তির এই প্রয়োজনীয়তাকে আলুথুসার উপন্যাসটি যে পাঠক মননে উপলব্ধি করাতে সক্ষম হবে তা আলোচনার মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূলত, উপন্যাসটির ভাবসৌন্দর্য ও অঙ্গসৌষ্ঠবের দীর্ঘ বর্ণনার মধ্যে দিয়েই গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। সুতরাং শেষের দিকে উপন্যাসটি সম্পর্কে লেখকের ইতিবাচক মন্তব্যের সংযুক্তি অতিরেকতা মনে হয়েছে। আলোচক এখানে বিষয়টি সংক্ষিপ্ত করতে পারতেন।

উপর্যুক্ত আলোচিত লেখাগুলি ছাড়াও সংখ্যাটিতে স্থান পেয়েছে সমসময়ের একুশ জন কবির কবিতা। তারা হলেন নুরুল হক, নাসিরুল ইসলাম, হাসান রোবায়েত, শামীম আজাদ, কচি রেজা, বেনজামিন রিয়াজী, আশিসরঞ্জন নাথ, ফেরদৌস নাহার, মেঘ অদিতি, ফারুক আফিনদী, সাবেরা তাবাসসুম, বদরে মুনীর, তৈমুর খান, মাহী ফ্লোরা, রওশন রুবী, তসলিম হাসান, মনিরা মিঠি, হানিফ রাশেদীন, নাদিয়া জান্নাত, মহসীন আলম শুভ্র এবং তানহিম আহমেদ। পাশাপাশি বারোটি বিদেশী কবিতার অনুবাদ পাঠকদের পরিচিয় করিয়ে দিয়েছে নানামুখী প্রগাঢ় অনুভূতির সাথে। কবিতাগুলির কবি ও অনুবাদক যথাক্রমে হূবনাথ পা-ে ( সফিকুন্নবী সামাদী), ইউনুস এমর ( বদরুজ্জামান আলমগীর), মিখাইল লেএরমন্তফ (মুহম্মদ তানিম নওশাদ), মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি ( মনজুরুল ইসলাম), ইয়েটস ( মোহাম্মদ সাইদ হাসান খান), বদর শাকির আস সাইয়াব ( তুহিন খান), তাও তে চিং (দুলু সরকার) এবং সমসাময়িক হিন্দি কবিতা ( অজিত দাশ)।

এখানেই বলা রাখা শ্রেয়, সংখ্যাটির প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন অজিত দাশ। একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে মনে হয়, প্রচ্ছদটিতে অন্তরিত রয়েছে অজস্র মানুষের অব্যক্ত কথা বলার অনিঃশেষ আকুতি। অথবা শব্দশিল্পীদের দ্বারা যে কথাগুলি ব্যক্ত হয়েছে সংখ্যাটিতে তা তাদেরই কথা, তাদের অধিকারকে নিশ্চিত করার কথা, তাদেরকে মুক্তির পথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অঙ্গীকারের কথা।
যাই হোক, একটি বিষয় অত্যন্ত ইতিবাচক, সেই সাথে আশ্চর্যেরও যে, আমাদের এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে মাতৃভাষার পাশাপাশি আরো চল্লিশটি ভাষা রয়েছে (সাঁওতালি, মাহলে, কোল, কোরা বা কোদা, মুন্দারি, খারিয়া, সাউরা, খাসি, মাল্টো, তেলেগু, গারো/ মান্দি, হাজং, কোচ, লালেং/ পাত্র, মারমা, কোকবরক, খুমি, খিয়াং, লুসাই, তংচঙ্গা, ম্রো, রাখাইন, পাংখুয়া, বাউম, রেংমিট্চা, চক, মণিপুরী মেইথেই, লিঙ্গম, সাদরি, মাদ্রাজি, থর, উর্দু, ওড়িয়া , অহমিয়া, মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া, কানপুরী, চাকমা, নেপালি এবং কন্দো) যা অবশ্যই আমাদের এক অমূল্য সম্পদ। লিপিহীন (দু’একটি বাদে) এই ভাষাগুলিকে আধুনিক সমাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারলে অবশ্যই তা বর্হিবিশে^র কাছে একটি দৃষ্টান্ত হবে এবং এই সব ভাষার অধিবাসীরা মাতৃভাষায় আরাধ্য জ্ঞান চর্চার স্বাদ পাবে।

দুঃখজনক হলেও আমাদের দেশে কোনো ভাষানীতি নেই যার মাধ্যমে আমরা বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষাগুলিকে সংরক্ষণ এবং এর উৎকর্ষ সাধন করতে পারি। বস্তুত, ভাষা তা যত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীরই হোক না কেন সেটির মাধ্যমে সেই মাতৃভাষীর শিক্ষা গ্রহণের অধিকারের বোধটিকে জাগ্রত করার দায়টিকে আধুনিক সমাজ কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারে না। “স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তা একমাত্র মাতৃভাষাতেই করা সম্ভব। চিন্তাশক্তির অধিকারী হয়েছে বলেই তো মানুষ জাতি সকল প্রাণীর উপরে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, জলেস্থলে অন্তরীক্ষে তার রাজ্যপাট বিস্তার করেছে (যতীন সরকার, ভাষা বিষয়ক নির্বাচিত প্রবন্ধ,২০১৫)।

সুতরাং মাতৃভাষায় চিন্তার স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করা একটি আদর্শ রাষ্ট্রের অবশ্য দায়। এই দায়টি পালনের প্রচেষ্টা লক্ষিত হয় লেখালেখির উঠানের এই সংখ্যায়। উর্দু (শামীম জামানভি), মারমা ( অং মারমা), চাকমা (মৃত্তিকা চাকমা এবং সুদীপ্ত চাকমা মিকাডো) মান্দি (শাওন রিছিল) কবিতার সংযোজন নিঃসন্দেহে সংখ্যাটির একটি বিশেষ স্বকীয়তা। সম্পাদক মাজহার জীবনের বয়ানে, ‘‘ সাহিত্যের পরিসরে আমাদের বড় আগ্রহের জায়গা হলো বাংলা অঞ্চলে বাংলাভাষা বহির্ভূত অন্যান্য ভাষার সাহিত্য। লেখালেখির উঠানে নিয়মিত এইরূপ সাহিত্যের অনুবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। অসমিয়া, গারো মনিপুরী, সান্তাল, চাকমা, মারমা, উর্দু ইত্যাদি ভাষার গল্প-কবিতার অনুবাদ প্রকাশে উঠান বিশেষ মনোযোগী।’’

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top